হক্কানি

উলামায়ে হক্কানি ও উলামায়ে সূ : পরিচিতি ও  প্রকৃতি পর্ব ২

উলামায়ে হক্কানি ও উলামায়ে সূ : পরিচিতি ও  প্রকৃতি পর্ব ২  – মাওলানা আবদুল্লাহ রাশেদ (হাফিযাহুল্লাহ)

উলামায়ে হক্কানি ও উলামায়ে সূ : পরিচিতি ও  প্রকৃতি

পর্ব ২

মাওলানা আবদুল্লাহ রাশেদ (হাফিযাহুল্লাহ)

 

  • দুনিয়ার তুচ্ছ স্বার্থে সত্য গোপন করা এবং হক-বাতিল গুলিয়ে ফেলা

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُونَهُ فَنَبَذُوهُ وَرَاءَ ظُهُورِهِمْ وَاشْتَرَوْا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَبِئْسَ مَا يَشْتَرُونَ

“স্মরণ করুন, যাদের কিতাব দেয়া হয়েছে, আল্লাহ যখন তাদের থেকে এ অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, তোমরা অবশ্যই তা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দেবে এবং তা গোপন করবে না। এরপর তারা সে অঙ্গীকার পিঠের পশ্চাতে ছুঁড়ে ফেলে দিল এবং এর বিনিময়ে খরিদ করল সামান্য মূল্য। কত নিকৃষ্ট মূল্যই না তারা খরিদ করছে।” –সূরা আলে ইমরান (৩): ১৮৭

 

অন্যত্র ইরশাদ করেন,

إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَى مِنْ بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ أُولَئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ

“আমি যেসকল সুস্পষ্ট বিধান ও (সঠিক) পথের দিশা দানকারী প্রমাণাদি নাযিল করেছি, আমি মানুষের জন্য কিতাবে স্পষ্টভাবে তা বর্ণনা করে দেয়ার পরও যারা তা গোপন করে, তাদের উপর আল্লাহ তাআলা লা’নত করেন এবং লা’নত করে অন্য সকল লা’নতকারীও।” –সূরা বাকারা (২): ১৫৯

 

আরেক আয়াতে বলেন,

يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تَلْبِسُونَ الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُونَ الْحَقَّ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ (71) آل عمران

“হে কিতাবিরা! তোমরা কেনো সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করছো এবং জেনেশুনে সত্য গোপন করছো?” –সূরা আলে ইমরান (৩):৭১

 

দুনিয়ার ধন-সম্পদ, মান-মর্যাদা এবং নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের লোভে এরা সত্য কথা বলতো না। গোপন করে রাখতো। হক বাতিল গুলিয়ে ফেলতো। অনেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাদের এ ঘৃণ্য কর্মের সমালোচনা করেছেন। এক আয়াতে বলেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ كَثِيرًا مِنَ الْأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَيَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ (34) التوبة

“হে ঈমানদারগণ! (আহলে কিতাবের) বহু আলেম ও আবেদ অন্যায়ভাবে মানুষের ধন-সম্পদ গ্রাস করে এবং (তাদের) আল্লাহর পথ থেকে ফিরিয়ে রাখে।” –সূরা তাওবা (৯):৩৪

 

ইবনে কাসির রহ. (৭৭৪হি.) বলেন,

والمقصود: التحذير من علماء السوء وعباد الضلال كما قال سفيان بن عيينة: من فسد من علمائنا كان فيه شبه من اليهود، ومن فسد من عبادنا كان فيه شبه من النصارى… والحاصل التحذير من التشبه بهم في أحوالهم وأقوالهم؛ ولهذا قال تعالى: {ليأكلون أموال الناس بالباطل} وذلك أنهم يأكلون الدنيا بالدين ومناصبهم ورياستهم في الناس، يأكلون أموالهم بذلك، كما كان لأحبار اليهود على أهل الجاهلية شرف، ولهم عندهم خرج وهدايا وضرائب تجيء إليهم، فلما بعث الله رسوله، صلوات الله وسلامه عليه استمروا على ضلالهم وكفرهم وعنادهم، طمعا منهم أن تبقى لهم تلك الرياسات، فأطفأها الله بنور النبوة، وسلبهم إياها، وعوضهم بالذلة والمسكنة، وباءوا بغضب من الله. وقوله تعالى: {ويصدون عن سبيل الله} أي: وهم مع أكلهم الحرام يصدون الناس عن اتباع الحق، ويلبسون الحق بالباطل، ويظهرون لمن اتبعهم من الجهلة أنهم يدعون إلى الخير، وليسوا كما يزعمون، بل هم دعاة إلى النار –تفسير ابن كثير، ج: 4، ص: 138؛ ط. دار طيبة للنشر والتوزيع

“উদ্দেশ্য হল, উলামায়ে সূ এবং গোমরা আবেদদের ব্যাপারে সতর্ক করা। যেমনটা সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রহ. বলেন, ‘আমাদের যেসব আলেম বিচ্যুতির শিকার হবে তাদের মধ্যে ইহুদিদের সাদৃশ্য রয়েছে আর যেসব আবেদ বিচ্যুত হবে তাদের মধ্যে খ্রিস্টানদের সাদৃশ্য রয়েছে’।

এক কথায় বলা যায়, কথায়, কাজে এবং চালচলনে তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন থেকে সতর্ক করা উদ্দেশ্য। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তারা অন্যায়ভাবে মানুষের ধন-সম্পদ গ্রাস করে’। কেননা, তারা দ্বীন বিক্রি করে দুনিয়া ভক্ষণ করে। পদমর্যাদা এবং নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের বলে জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করে। তা এভাবে যে, জাহিলি যামানার লোকদের কাছে ইহুদি আলেমরা ছিল সম্মানের পাত্র। লোকেদেরপক্ষ থেকে তাদের কাছে নিয়মিত হাদিয়া তোহফা আসতো। তাদের জন্য নির্ধারিত অর্থ ধার্য থাকত যা তারা নিয়মিত পেত। আল্লাহ তাআলা যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে নবী বানিয়ে পাঠালেন, তখনও তারা তাদের নেতৃত্ব বহাল রাখার লোভে গোমরাহি, কুফর ও একগুঁয়েমিতে অটল রইল। অবশেষে আল্লাহ তাআলা নূরে নবুওয়াতের কিরণ দ্বারা তা নিষ্প্রভ করে দিলেন। তাদের থেকে সব ছিনিয়ে নিলেন। তারা পেল লাঞ্চনা আর গঞ্জনা। বয়ে ফিরলো আল্লাহর ক্রোধ। (এই বাক্য একটু অন্যভাবে বলা দরকার।

আল্লাহ তাআলার বাণী, ‘তারা আল্লাহর পথ থেকে লোকদের ফিরিয়ে রাখে’ অর্থাৎ তারা হারাম ভক্ষণের পাশাপাশি লোকদেরকে হকের অনুসরণ থেকে ফিরিয়ে রাখে। হক-বাতিল গুলিয়ে ফেলে। তাদের জাহেল অনুসারিদের তারা দেখাতে চায় যে, তারা তাদেরকে ভালোর দিকে ডাকছে, অথচ বাস্তবে এমন নয়, বরং তারা জাহান্নামের দাঈ।” –তাফসিরে ইবনে কাসির : ৪/১৩৮

 

তিনি আরও বলেন,

يقول تعالى: {إن الذين يكتمون} [مما يشهد له بالرسالة] {ما أنزل الله من الكتاب} يعني اليهود الذين كتموا صفة محمد صلى الله عليه وسلم في كتبهم التي بأيديهم، مما تشهد له بالرسالة والنبوة، فكتموا ذلك لئلا تذهب رياستهم وما كانوا يأخذونه من العرب من الهدايا والتحف على تعظيمهم إياهم، فخشوا -لعنهم الله -إن أظهروا ذلك أن يتبعه الناس ويتركوهم، فكتموا ذلك إبقاء على ما كان يحصل لهم من ذلك، وهو نزر يسير، فباعوا أنفسهم بذلك، واعتاضوا عن الهدى واتباع الحق وتصديق الرسول والإيمان بما جاء عن الله بذلك النزر اليسير –تفسير ابن كثير، ج: 1، ص: 483؛ ط. دار طيبة للنشر والتوزيع

“আল্লাহ তাআলা বলছেন, ইহুদিদের কিতাবে মুহাম্মাদ ﷺ এর যেসব সিফাত বিবৃত ছিল, যেগুলো তাঁর নবুওয়াত ও রিসালাতের সাক্ষী- ইহুদিরা সেগুলো গোপন করেছে। গোপন করেছে যেন তাদের নেতৃত্ব ছুটে না যায়। আরবদের থেকে যেসব হাদিয়া তোহফা আর সম্মান পেতো সেগুলো যেন বন্ধ না হয়ে যায়। তাদের ভয় হলো –আল্লাহ তাদের উপর লা’নত বর্ষণ করুন- যদি তারা তা প্রকাশ করে দেয় তাহলে লোকজন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর অনুসারী হয়ে যাবে এবং তাদের পরিত্যাগ করবে। যে তুচ্ছ স্বার্থ তারা লাভ করতো তা বহাল রাখতে তারা সত্য গোপন করলো। এ সামান্য মোহে নিজেদের বিক্রি করে দিল। হকের অনুসরণ, রাসূলুল্লাহ ﷺ -একে সত্যায়ন এবং আল্লাহর তরফ থেকে তিনি যা নিয়ে এসেছেন তাতে ঈমান আনার বিপরীতে তারা এ নগণ্য বস্তুকে গ্রহণ করল।” –তাফসিরে ইবনে কাসির : ১/৪৮৩

আজ যারা হাদিয়া-তোহফা, বেতন-ভাতা আর চাকরি-বাকরির লোভে সঠিক মাসআলা বলছে না, এদের সাথে তাদের কতই না মিল!

 

  • তাহরিফ-অপব্যাখ্যা এবং দ্বীনের নামে মিথ্যাচার

অপব্যাখ্যা তো ইহুদিদের শিয়ার (প্রতীক)। বহু আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাদের এ বিষয়টির কথা উল্লেখ করেছেন। নিম্নে মাত্র কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করছি,

أَفَتَطْمَعُونَ أَنْ يُؤْمِنُوا لَكُمْ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِنْ بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ وَهُمْ يَعْلَمُونَ

“তবুও কি তোমরা (হে মুসলমানরা) আশা করছো যে, ওরা তোমাদের কথায় ঈমান আনবে? অথচ ওদের একটা দল তো এমন ছিল যে, আল্লাহর বাণী শুনত এরপর বুঝে শুনে তা বিকৃত করতো। অথচ ওরা জানতো (যে, তারা অন্যায় করছে)।” –সূরা বাকারা (২):৭৫

অর্থাৎ তুর পাহাড়ে একদল ইহুদি সরাসরি আল্লাহর কালাম শুনে এসেছে। এসে বিকৃত করে উল্টো বলেছে। তাওরাতে আল্লাহর স্পষ্ট বাণী ও নির্দেশ তারা দেখেছে। দেখার এবং বুঝার পরও শুধু মনমতো না হওয়ায় জেনেশুনে বিকৃত করেছে।

فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَذَا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا يَكْسِبُونَ (79) البقرة

“অতএব, ধ্বংস ওদের কপালে যারা নিজ হাতে কিতাব লেখে, অতঃপর বলে, ‘এ (কিতাব) আল্লাহর পক্ষ থেকে (নাযিলকৃত)’- যাতে এর বিনিময়ে সামান্য মূল্য লাভ করতে পারে। অতএব, ওদের কপালে ধ্বংস- স্বীয় হাতের এ লেখার কারণে এবং ধ্বংস নিজেদের এ উপার্জনের কারণে।” –সূরা বাকারা (২):৭৯

وَإِنَّ مِنْهُمْ لَفَرِيقًا يَلْوُونَ أَلْسِنَتَهُمْ بِالْكِتَابِ لِتَحْسَبُوهُ مِنَ الْكِتَابِ وَمَا هُوَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَقُولُونَ هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَمَا هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَيَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ وَهُمْ يَعْلَمُونَ (78) آل عمران

“নিঃসন্দেহে তাদের একটা দল এমন রয়েছে যারা নিজেদের জিহ্বা মোচড়িয়ে কিতাব পড়ে, যাতে তোমরা তাকে কিতাবের অংশ মনে কর, অথচ তা কিতাবের অংশ নয়। ওরা বলে, ‘এ আল্লাহর নিকট থেকে (নাযিলকৃত)’- অথচ তা আল্লাহর নিকট থেকে (নাযিলকৃত) নয়। আর এরা জেনেশুনে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে।” –সূরা আলে ইমরান (৩):৭৮

 

আল্লাহ তাআলা তাদের কয়েক ধরনের অপব্যাখ্যার বিবরণ দিয়েছেন:

– কিতাবের শব্দ আপন জায়গায় রেখে উদ্দেশ্য ও মর্ম বিকৃত করা।

– নিজে থেকে কিতাব লিখে আল্লাহর নাযিলকৃত বলে চালিয়ে দেয়া।

– কিতাব পড়ার সময় বাড়িয়ে কমিয়ে নিজেদের মতলবমতো পড়া যাতে শ্রোতারা এ বাড়ানো কমোনো অংশটাকেও মূল কিতাবের অংশ মনে করে।

– এছাড়াও আরও বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা দ্বীনের নামে চালিয়ে দেয়া।

এসব কিছুর উদ্দেশ্য দুনিয়া উপার্জন করা, যেমনটা আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন।

আজ যারা কুরআন হাদিস ও পূর্ববর্তী আলেমদের কিতাবাদির মনমতো ব্যাখ্যা করছে, এদের সাথে তাদের কতই না মিল! যারা কিতালের অর্থ দাওয়াত করছেন, জিহাদের অর্থ তাবলিগ করছেন, গণতন্ত্রকে জিহাদ বলছেন, নফসের জিহাদকেই আসল জিহাদ বলে কিতাল পরিত্যাগ করছেন, যিকিরকে জিহাদের চেয়ে শ্রেষ্ট বলে জিহাদ পরিত্যাগ করছেন, সালাফের বক্তব্যে ‘আহলে হাদিস’ ইত্যাদি পরিভাষা দ্বারা নিজেদের দলকে উদ্দেশ্য নিচ্ছেন- তাদের সাথে এদের কতই না মিল!

তদ্রূপ, যারা ইমামুল মুসলিমিন, দারুল ইসলাম, দারুল হারব, উলুল আমর ইত্যাদি পরিভাষার আজগুবি মতলব বের করছেন, জিহাদের জন্য কুরআন-সুন্নাহ বহির্ভূত হাজারো শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন; মুজাহিদদেরকে খাওয়ারেজ, তাকফিরি, উগ্রপন্থী ইত্যাদি বিশেষণ দিচ্ছেন, গাজওয়ায়ে হিন্দের কিংবা কাশ্মির জিহাদের প্রস্তুতি নিলে হারাম হবে বলছেন তাদের সাথে এদের কতই না মিল!

 

  • যে বিষয়ে ইলম নেই সে বিষয়েও ফতোয়া দেয়া

এ বালা বর্তমানে মহামারি আকার ধারণ করেছে। যে কেউ যেকোনো বিষয়ে ফতোয়া দিয়ে দিচ্ছে। বিশেষত জিহাদ কিতালের ব্যাপারে। যারা জীবনে একটি বারের জন্যও জিহাদের অধ্যায় পড়ে দেখেননি, তারাই আজ জিহাদ নিয়ে উল্টো-সিধে ফতোয়া দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করছেন। এ সিফাত ছিল ইহুদিদের- যে বিষয়ে ইলম নেই সে বিষয়েও কথা বলা।

ইহুদিরা দাবি করতো হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম ইহুদি ছিলেন আর তারা তাঁরই উত্তরসূরি। খ্রিস্টানরাও অনুরূপ দাবি করতো। অথচ ইহুদি জাতির সূচনা হয় হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের অনেক পরে তার বংশধরদের থেকে। তাহলে তিনি কীভাবে ইহুদি হবেন? আর খ্রিস্টান জাতির সূচনা তো হযরত মূসা আলাইহিস সালামেরও অনেক পরে। তাহলে ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম কীভাবে খ্রিস্টান হবেন? আল্লাহ তাআলা তাদের এহেন স্বভাবের সমালোচনা করে ইরশাদ করেন,

يَاأَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تُحَاجُّونَ فِي إِبْرَاهِيمَ وَمَا أُنْزِلَتِ التَّوْرَاةُ وَالْإِنْجِيلُ إِلَّا مِنْ بَعْدِهِ أَفَلَا تَعْقِلُونَ (65) هَاأَنْتُمْ هَؤُلَاءِ حَاجَجْتُمْ فِيمَا لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ فَلِمَ تُحَاجُّونَ فِيمَا لَيْسَ لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ (66) مَا كَانَ إِبْرَاهِيمُ يَهُودِيًّا وَلَا نَصْرَانِيًّا وَلَكِنْ كَانَ حَنِيفًا مُسْلِمًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ (67) -آل عمران

“হে কিতাবিরা! তোমরা ইব্রাহিম সম্বন্ধে কেন বিতর্ক করছো, অথচ তাওরাত-ইনজিল তো নাযিল হয়েছিল তার পরে? তোমাদের কি বুদ্ধিশুদ্ধি নেই? দেখ, তোমরাই ওই সব লোক যে, (ইতিপূর্বে) তোমরা এমন বিষয়ে বিতর্ক করেছ যে বিষয়ে তোমাদের কিঞ্চিত জ্ঞান ছিল। এখন কেন তোমরা এমন বিষয়ে বিতর্ক করছ যে বিষয়ে তোমাদের মোটেই জ্ঞান নেই? প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই জানেন আর তোমরা জানো না। ইব্রাহিম ইহুদিও ছিলেন না খ্রিস্টানও ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন হানিফ (সকল মিথ্যা ধর্ম-বিমুখ) ও মুসলিম (আল্লাহর অনুগত)। তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।” –সূরা আলে ইমরান (৩):৬৫-৬৭

ইমাম তাবারি রহ. হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন,

اجتمعت نصارى نجران وأحبارُ يهود عند رسول الله صلى الله عليه وسلم فتنازعوا عنده، فقالت الأحبار: ما كان إبراهيمُ إلا يهوديًّا، وقالت النصارى: ما كان إبراهيم إلا نصرانيًّا! فأنزل الله عز وجل فيهم:”يا أهل الكتاب الخ – جامع البيان في تأويل القرآن، ج: 6، ص: 490، ط. مؤسسة الرسالة، ت: أحمد شاكر

“নাজরানের খ্রিস্টানরা এবং ইহুদি আলেমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে একত্র হয়ে বিবাদ শুরু করল। ইহুদি আলেমরা বলল, ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম ইহুদি বৈ কিছু ছিলেন না। খ্রিস্টানরা বলল, ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম খ্রিস্টান বৈ কিছু ছিলেন না। তখন আল্লাহ তাআলা এদের ব্যাপারে এ আয়াত নাযিল করেন, ‘হে কিতাবিরা…’।” –তাফসিরে তাবারি:৬/৪৯০

 

  • মুহকাম-স্পষ্ট আয়াত, হাদিস ও বক্তব্য বাদ দিয়ে মুতাশাবিহ-অস্পষ্ট আয়াত, হাদিস ও বক্তব্য নিয়ে টানাটানি করা

এ ধরনের বক্র প্রকৃতির লোকদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা নিম্নোক্ত আয়াতে সতর্ক করেছেন,

هُوَ الَّذِي أَنْزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ فَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَاءَ الْفِتْنَةِ وَابْتِغَاءَ تَأْوِيلِهِ –

“তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি আপনার উপর এই কিতাব নাযিল করেছেন, (যেখানে রয়েছে দু’ধরণের আয়াত) এর কিছু আয়াত হচ্ছে মুহকাম (সুস্পষ্ট দ্বর্থ্যহীন) এবং এগুলোই হচ্ছে কিতাবের মূল অংশ; আর কিছু আয়াত আছে মুতাশাবিহ (রূপক)। যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে, তারা (সমাজে) ফিতনা বিস্তারের এবং আল্লাহর কিতাবের অপব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে কিতাবের মুতাশাবিহ আয়াতগুলোর পেছনে পড়ে।”–সূরা আলে ইমরান (৩) : ৭

 

হাফেয ইবনে কাসির রহ. (৭৭৪ হি.) বলেন,

}فأما الذين في قلوبهم زيغ} أي: ضلال وخروج عن الحق إلى الباطل {فيتبعون ما تشابه منه} أي: إنما يأخذون منه بالمتشابه الذي يمكنهم أن يحرفوه إلى مقاصدهم الفاسدة، وينزلوه عليها، لاحتمال لفظه لما يصرفونه فأما المحكم فلا نصيب لهم فيه؛ لأنه دامغ لهم وحجة عليهم، ولهذا قال: {ابتغاء الفتنة} أي: الإضلال لأتباعهم، إيهاما لهم أنهم يحتجون على بدعتهم بالقرآن. –تفسير ابن كثير، ج: 2، ص: 8؛ ط. دار طيبة للنشر والتوزيع

“‘যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে’ অর্থাৎ গোমরাহি রয়েছে এবং হক ছেড়ে বাতিলের দিকে চলে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে ‘তারা কিতাবের মুতাশাবিহ আয়াতগুলোর পেছনে পড়ে’- অর্থাৎ তারা কেবল মুতাশাবিহ আয়াতগুলোকে ধরে, যেগুলোর অপব্যাখ্যা করে নিজের বদ মতলবের জন্য কাজে লাগানো সম্ভবপর হয়। কারণ, সেগুলোর (বাহ্যিক) শব্দ এমন হয়ে থাকে যে, তাতে (অপব্যাখ্যা করলে) তাদের বদ মতলবের (উপর ফিট করার) সুযোগও থাকে। পক্ষান্তরে, মুহকাম আয়াতে এ ধরণের কোন সুযোগ থাকে না। কেননা, সেগুলো তাদের মাথা ভেঙে দেয়ার মতো এবং তাদের বিপক্ষে দলীল। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘ফিতনা বিস্তারের উদ্দেশ্যে’ অর্থাৎ তাদের অনুসারীদের এভাবে দেখিয়ে গোমরাহ করার উদ্দেশ্যে যে, তারা দেখাচ্ছে তাদের বিদআতের পক্ষে তারা কুরআন দিয়ে দলীল দিচ্ছে।”-তাফসিরে ইবনে কাসির : ২/৮

لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ- لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ এ জাতীয় আয়াত দিয়ে যারা জিহাদ হারাম ফতোয়া দিয়ে দিচ্ছেন আর কুরআনে কারীম অসংখ্য সুস্পষ্ট আয়াত, হাদিসের বিশাল ভাণ্ডার, রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরামের সিরাত, হাজারো ফিকহের কিতাবের দ্ব্যর্থহীন সিদ্ধান্ত সব কিছু বাদ দিয়ে দিচ্ছেন তাদের অন্তরে বক্রতা নেই কীভাবে বলা যায়? আল্লাহ তাআলা যেন আয়াতে এসব লোকের কথাই বলছেন।

 

  • নাহি আনিল মুনকার তথা অন্যায় প্রতিহত না করা

অন্যায় দেখলে সামর্থ্যানুযায়ী প্রতিবাদ করা ও প্রতিহত করা ফরয। বিশেষত উলামাদের দায়িত্ব এ ব্যাপারে বেশি। আর যাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা রয়েছে এবং এ কাজের জন্যই তারা নিয়োজিত তাদের দায়িত্ব আরও বেশি। যারা অন্যায় থেকে বিরত না হবে তাদের শাস্তি দিতে হবে। প্রয়োজনে বয়কট করতে হবে। সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ وَإِمَّا يُنْسِيَنَّكَ الشَّيْطَانُ فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَى مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ –

“যারা আমার আয়াতসমূহের সমালোচনায় রত থাকে তাদেরকে যখন দেখবে তাদের থেকে দূরে সরে যাবে, যতক্ষণ না তারা অন্য বিষয়ে প্রবৃত্ত হয়। যদি শয়তান কখনও তোমাকে এটা ভুলিয়ে দেয় তাহলে স্মরণ হওয়ার পর আর জালিম লোকদের সাথে বসবে না।” –সূরা আনআম (৬):৬৮

অন্যত্র ইরশাদ করেন,

وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ إِنَّكُمْ إِذًا مِثْلُهُمْ إِنَّ اللَّهَ جَامِعُ الْمُنَافِقِينَ وَالْكَافِرِينَ فِي جَهَنَّمَ جَمِيعًا –

“তিনি ইতিপূর্বেও কিতাবে তোমাদের প্রতি এই নির্দেশ নাযিল করেছেন যে, যখন তোমরা শুনবে আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করা হচ্ছে ও তার সাথে বিদ্রূপ করা হচ্ছে তখন তোমরা তাদের সাথে বসবে না, যে পর্যন্ত না তারা অন্য কোনো প্রসঙ্গে লিপ্ত হবে। অন্যথায় তোমরাও তাদের মতো হয়ে যাবে। নিশ্চিত জেনো, আল্লাহ সকল মুনাফিক ও কাফিরকে জাহান্নামে একত্র করবেন।” –সূরা নিসা (৪):১৪০

বনি ইসরাঈল ছিল এর ব্যতিক্রম। মুখে মুখে কিছু প্রতিবাদ করলেও পাপাচারির সাথে মাখামাখি আর দহরম মহরম সম্পর্ক আগের মতোই থাকত। এভাবে পাপাচারে গোটা সমাজ ভরে গেল, কিছুই প্রতিহত করা হলো না। আল্লাহ তাআলা এদের প্রতি অসন্তুষ্ট হলেন। এদের উপর আল্লাহর লা’নত পতিত হল। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

}لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُودَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ ◌ كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَنْ مُنْكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ} المائدة

“বনি ইসরাঈলের মধ্যে যারা কুফরি করেছে, তাদের উপর দাঊদ ও ঈসা ইবনে মারয়ামের যবানিতে লা’নত বর্ষিত হয়েছে। এটা এ জন্য যে, তারা নাফরমানি করেছিল এবং তারা সীমালঙ্ঘন করতো। তারা যেসব গর্হিত কাজ করতো, তা থেকে একে অপরকে বারণ করতে না। (বারণ না করে) কত নিকৃষ্ট কাজই না তারা করতো।” –সূরা মায়েদা (৫):৭৮-৭৯

বারণ না করাকে আল্লাহ তাআলা বড়ই নিকৃষ্ট আখ্যা দিয়েছেন।

মুসনাদে আহমাদে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন,

لما وقعت بنو إسرائيل في المعاصي، نهتهم علماؤهم، فلم ينتهوا، فجالسوهم في مجالسهم – قال يزيد: أحسبه قال: وأسواقهم – وواكلوهم وشاربوهم، فضرب الله قلوب بعضهم ببعض، ولعنهم على لسان داود، وعيسى ابن مريم -مسند الإمام أحمد، رقم: 3713؛ ط. الرسالة، ت: شعيب الأرنؤوط، عادل مرشد، وآخرون، قالوا فى التحقيق: إسناده ضعيف لانقطاعه، أبو عبيدة -وهو ابن عبد الله بن مسعود- لم يسمع من أبيه، وشريك بن عبد الله -وهو النخعي القاضي- سيىء الحفظ، وبقية رجاله ثقات. يزيد: هو ابن هارون. اهـ

“বনি ইসরাঈল যখন নাফরমানিতে লিপ্ত হল, তাদের উলামারা তাদের বারণ করল, কিন্তু তারা বিরত হল না। এরপরও মজলিসে, বাজারে তারা তাদের সাথে একসাথে উঠা-বসা করত, একসাথে খাওয়া-পরা করত। তখন আল্লাহ তাআলা একের অন্তর অন্যের মতো করে দিলেন এবং দাউদ ও ঈসা ইবনে মারইয়াম – আলাইহিমুস সালাম- এর যবানিতে তাদের উপর লা’নত বর্ষণ করলেন।” –মুসনাদে আহমাদ:৩৭১৩

অর্থাৎ পাপাচারীদের দমন ও বয়কট না করার কারণে অবশেষে উলামাদের অন্তরও বিকৃত হয়ে গেল।

হাসান বসরি রহ. যথার্থই বলেছেন,

عقوبة العالم موت قلبه -جامع بيان العلم وفضله- ابن عبد البر ، ج: ، ص: ، رقم: ، ط. دار ابن الجوزي

“আলেমের শাস্তি হল অন্তর মরে যাওয়া।” –জামিউ বায়ানিল ইলম (ইবনে আব্দুল বার) : ১/৬৬৬

 

অন্যায় প্রতিহত না করার কারণে আল্লাহ তাআলা তাদের উলামাদেরকে কঠিন ধমকি দিয়ে বলেন,

لَوْلَا يَنْهَاهُمُ الرَّبَّانِيُّونَ وَالْأَحْبَارُ عَنْ قَوْلِهِمُ الْإِثْمَ وَأَكْلِهِمُ السُّحْتَ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَصْنَعُونَ (63) المائدة

“রাব্বানি ও আহবাররা কেন তাদের নিষেধ করত না পাপের কথা বলা এবং হারাম খাওয়া থেকে? (নিষেধ না করে) কত নিকৃষ্ট কাজই না তারা করত।” –সূরা মায়েদা (৫) : ৬৩

 

ইবনে কাসির রহ. বলেন,

والربانيون وهم: العلماء العمال أرباب الولايات عليهم، والأحبار: وهم العلماء فقط. –تفسير القرآن العظيم ، ج: 3، ص: 144؛ ط. دار طيبة للنشر والتوزيع

“রাব্বানি হল পদধারী নেতৃত্বশীল উলামা আর আহবার হল সাধারণ উলামা (যাদের রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব নেই)।” –তাফসিরে ইবনে কাসির : ৩/১৪৪

অর্থাৎ সাধারণ উলামারা তো করতোই না, রাষ্ট্রীয়ভাবে যাদের অন্যায় প্রতিহত করার ক্ষমতা ছিল তারাও করতো না।

 

ইমাম ইবনে জারির রহ. বলেন,

وكان العلماء يقولون: ما في القرآن آية أشدَّ توبيخًا للعلماء من هذه الآية، ولا أخوفَ عليهم منها. … عن الضحاك بن مزاحم في قوله:”لولا

ينهاهم الربانيون والأحبار عن قولهم الإثم” قال: ما في القرآن آية، أخوف عندي منها: أَنَّا لا ننهى. … عن ابن عباس قال: ما في القرآن آية أشدَّ توبيخًا من هذه الآية: (لولا ينهاهم الربانيون والأحبار عن قولهم الإثم وأكلهم السحت لبئس ما كانوا يعملون) –جامع البيان في تأويل القرآن، ج: 10، ص: 449؛ ط. مؤسسة الرسالة، ت: أحمد شاكر

“উলামায়ে কেরাম বলতেন, ‘কুরআনের অন্য কোনো আয়াতে এত শক্ত ধমকি উলামাদের দেয়া হয়নি, এর চেয়ে ভীতিও অন্য কোনো আয়াতে প্রদর্শন করা হয়নি’।

যাহহাক রহ. বলেন, ‘আমার মতে কুরআনে কারীমে এ আয়াতের চেয়ে অধিক ভীতি প্রদর্শনকারী কোনো আয়াত নেই; যদি আমরা অন্যায়ে বাধা না দিই’।

হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘এ আয়াতের চেয়ে শক্ত ধমকি অন্য কোনো আয়াতে দেয়া হয়নি।” -তাফসিরে তাবারি : ১০/৪৪৯

আজ যখন গোটা সমাজ শিরক-কুফর, অন্যায়-অবিচার ও জুলুম-অত্যাচারের গহীন অন্ধকারে নিমজ্জিত তখন যারা শুধু দরস-তাদরিস আর মসজিদ-খানকাহ নিয়ে পড়ে আছেন আর বলছেন ‘ওসব রাষ্ট্রের দায়িত্ব’- আল্লাহ তাআলার এ ধমকিটা তাদের উপর পড়ে কি না একটু ফিকির করা উচিৎ। আমাদের অন্তরও বিকৃত হয়ে যাচ্ছে কি না, আমাদের উপরও লা’নত পতিত হচ্ছে কি না, আমরাও আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যাচ্ছি কি না- একটু ফিকির করা উচিৎ। আর যারা ফাসেক-ফুজ্জার, তাগুত-মুরতাদদের সাথে সখ্য গড়ে তুলেছেন তাদের কথা তো বলাই বাহুল্য।

 

  • শক্তের ভক্ত নরমের যম: আল্লাহর বিধান প্রয়োগে স্বজনপ্রীতি

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,

إنما أهلك الذين قبلكم أنهم كانوا إذا سرق فيهم الشريف تركوه وإذا سرق فيهم الضعيف أقاموا عليه الحد -صحيح البخاري، رقم: 3288؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا

“তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের তো এ কর্মই ধ্বংস করেছে যে, সম্ভ্রান্ত লোক চুরি করলে ছেড়ে দিত, আর দুর্বল লোক চুরি করলে হদ কায়েম করত”-সহীহ বুখারি:৩২৮৮

 

অন্য হাদিসে এসেছে,

إن بني إسرائيل كان إذا سرق فيهم الشريف تركوه وإذا سرق فيهم الضعيف قطعوه -صحيح البخاري، رقم: 3526؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا

“বনি ইসরাঈলের অভ্যাস ছিল, সম্ভ্রান্ত কেউ চুরি করলে তাকে ছেড়ে দিত আর দুর্বল কেউ চুরি করলে তার হাত কেটে দিত।” –সহীহ বুখারি:৩৫২৬

অন্য হাদিসে ইহুদি আলেমের স্বীকারোক্তি এসেছে,

كثر في أشرافنا، فكنا إذا أخذنا الشريف تركناه، وإذا أخذنا الضعيف أقمنا عليه الحد -صحيح مسلم، رقم: 4536؛ ط. دار الجيل بيروت + دار الأفاق الجديدة ـ بيروت

“আমাদের সম্ভ্রান্তদের মাঝে যিনা খুব বেড়ে গেল। আমরা কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে ধরে ফেললে ছেড়ে দিতাম। আর কোনো দুর্বল লোককে ধরে ফেললে হদ কায়েম করতাম।” -সহীহ মুসলিম : ৪৫৩৬

এভাবে একদিকে তারা নাহি আনিল মুনকার ছেড়ে দিল, অন্যদিকে অপরাধীর উপর আল্লাহর বিধান প্রয়োগও বন্ধ করে দিতে লাগল। অবশেষে সুবিধামাফিক আল্লাহর বিধান পরিবর্তন করে কুফরি বিধান জারি করে দিল। সামনের পয়েন্টে ইনশাআল্লাহ সে আলোচনা আসছে।

আজ যারা মুজাহিদদের সামান্য দোষত্রুটি পেলেই সমালোচনার বাজার গরম করেন, অথচ তাগুত মুরতাদরা প্রতিনিয়ত হাজারো লাখো ফিসক-কুফর করে যাচ্ছে সেগুলোতে মুখে কুলুপ এটে রাখেন, তাদের একটু ভাবা উচিৎ- আমরা ইহুদি স্বভাবের হয়ে যাচ্ছি না তো? অন্যায়ের প্রতিবাদই যদি উদ্দেশ্য তাহলে এখানে আমরা চুপ কেন?

মুজাহিদরা বেসামরিক কুফফারদের উপর কোনো হামলা করলে আমাদের কেউ কেউ তীব্র নিন্দা জানান, পত্রিকায় বিবৃতি দেন অথচ কাফের মুশরেকদের বিমানগুলো যখন নারী-শিশু-বৃদ্ধের কোনো পার্থক্য না করে মুসলিম জনসাধারণের উপর টনকে টন বোমা ফেলে তখন তারা কোনও কথা বলেন না।

কাফের-মুশরিক এবং মুরতাদদের বন্দীশালাগুলোতে আমাদের হাজারো লাখো ভাই-বোন ধুকে ধুকে মরছেন অথচ এ সব ব্যাপারে তারা কোনও কথা বলেন না। তাদের একটু ভাবা উচিত, আমরা ইহুদি স্বভাবের হয়ে যাচ্ছি না তো?

 

  • আল্লাহর বিধান পরিবর্তন করে কুফরি বিধান প্রবর্তন

ইহুদি আলেমরা যখন সমাজের সম্ভ্রান্ত লোকদের সাথে স্বজনপ্রীতি করে জনসাধারণের সমালোচনার সম্মুখীন হল, তখন তারা ব্যভিচারের শাস্তিই পাল্টে ফেলল। রজম তথা পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করার পরিবর্তে ভিন্ন শাস্তি প্রবর্তন করল। যেন ধনী-গরিব সবার উপরই প্রয়োগ করা যায়। সমালোচনার সম্মুখীন না হতে হয়। এভাবে তারা আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে কুফরি আইন প্রবর্তন করল। সহীহ মুসলিমে এসেছে,

عن البراء بن عازب، قال: مر على النبي صلى الله عليه وسلم بيهودي محمما مجلودا، فدعاهم صلى الله عليه وسلم، فقال: «هكذا تجدون حد الزاني في كتابكم؟»، قالوا: نعم، فدعا رجلا من علمائهم، فقال: «أنشدك بالله الذي أنزل التوراة على موسى، أهكذا تجدون حد الزاني في كتابكم» قال: لا، ولولا أنك نشدتني بهذا لم أخبرك، نجده الرجم، ولكنه كثر في أشرافنا، فكنا إذا أخذنا الشريف تركناه، وإذا أخذنا الضعيف أقمنا عليه الحد، قلنا: تعالوا فلنجتمع على شيء نقيمه على الشريف والوضيع، فجعلنا التحميم، والجلد مكان الرجم -صحيح مسلم، رقم: 4536؛ ط. دار الجيل بيروت + دار الأفاق الجديدة ـ بيروت

“হযরত বারা ইবনে আযিব রাদি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ইহুদির মুখে চুনকালী মেখে কালো করে বেত্রাঘাত করতে করতে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সামনে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তা দেখে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি তোমাদের কিতাবে যিনার শাস্তি এমনই দেখতে পাও’? তারা উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ’। তখন তিনি তাদের আলেমদের একজনকে ডেকে কসম দিলেন, ‘ওই আল্লাহর কসম দিয়ে তোমাকে জিজ্ঞেস করছি যিনি মূসা আলাইহিস সালামের উপর তাওরাত নাযিল করেছেন, তোমরা কি তোমাদের কিতাবে যিনার শাস্তি এমনি দেখতে পাও’? সে উত্তর দিল, ‘না’। আপনি যদি আমাকে কসম না দিতেন তাহলে এই সত্য সংবাদটা আমি দিতাম না। আমাদের কিতাবে যিনার শাস্তি হল রজম (প্রস্তারাঘাতে হত্যা)। কিন্তু আমাদের সম্ভ্রান্তদের মাঝে যিনা খুব বেড়ে গেল। আমরা কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে ধরে ফেললে ছেড়ে দিতাম। আর কোন দুর্বল লোককে ধরে ফেললে হদ কায়েম করতাম। এরপর আমরা প্রস্তাব দিলাম, চল আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যিনার এমন কোনো শাস্তি নির্ধারণ করি যা সম্ভ্রান্ত-নিম্নশ্রেণী সকলের উপরই প্রয়োগ করতে পারবো। অতঃপর আমরা রজমের বদলে চুনকালী মেখে বেত্রাঘাত করাকে শাস্তিরূপে নির্ধারণ করলাম।” -সহীহ মুসলিম : ৪৫৩৬

সহীহ মুসলিমের উক্ত হাদিসের শেষে বর্ণনাকারি সাহাবি বলেন, এদের ব্যাপারেই এ আয়াত নাযিল হয়,

وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ

“আল্লাহ তাআলা যে বিধান নাযিল করেছেন যারা সে অনুযায়ী বিচার ফায়সালা করে না তারাই (প্রকৃত) কাফের।” –সূরা মায়েদা (৫) : ৪৪

আজ আমরা যারা কুফরি শাসনের প্রবর্তক তাগুতদের উলুল আমর ফতোয়া দিচ্ছি, তাদের আনুগত্য করাকে ফরয বলছি, তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাকে হারাম বলছি, রাষ্ট্রীয় আইন মান্য করাকে আবশ্যক বলছি, তাদের উচিৎ নিজেদের অবস্থা নিয়ে একটু গভীরভাবে চিন্তা করা, আমরাও ওই সব সুবিধাবাদি ইহুদিদের মতো হয়ে যাচ্ছি না তো, যারা কুফরি বিধানগুলোকে পরিবর্তন করার চেষ্টা না করে ওগুলোরই আনুগত্য করে যেত কিংবা অন্তত চুপ থাকত।

 

  • দুনিয়ার স্বার্থে জালিম ও তাগুত শাসকের পক্ষ নেয়া

বদর যুদ্ধের পর কা’ব বিন আশরাফ মক্কায় গিয়ে আবু সুফিয়ানকে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে উৎসাহ দেয় এবং বলে, তারা যে শিরকি ধর্মে আছে তা নাকি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আনীত ধর্মের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। এতে মক্কাবাসী উদ্বুদ্ধ হয় এবং খন্দকের যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। আল্লাহ তাআলা এদের এ দুষ্কৃতির কথা তুলে ধরে বলেন,

أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِنَ الْكِتَابِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ وَيَقُولُونَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا هَؤُلَاءِ أَهْدَى مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا سَبِيلًا

“আপনি কি ওদের দেখেন না যাদের কিতাবের একটা অংশ (অর্থাৎ তাওরাতের কিছু জ্ঞান) দেয়া হয়েছে? ওরা মূর্তি ও তাগুতকে সমর্থন করে এবং (মূর্তিপূজারি) কাফেরদের সম্বন্ধে বলে, মুমিনদের অপেক্ষা ওরাই না’কি অধিক সরল পথে আছে।” –সূরা নিসা (৪):৫১

ইমাম তাবারি রহ. ইকরিমা রহ. এর সূত্রে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন,

لما قدم كعب بن الأشرف مكة، قالت له قريش: أنت حَبْر أهل المدينة وسيدهم؟ قال: نعم. قالوا: ألا ترى إلى هذا الصُّنبور المنبتر من قومه، يزعم أنه خير منا، ونحن أهل الحجيج وأهل السِّدانة وأهل السِّقاية؟ قال: أنتم خير منه. قال: فأنزلت: (إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الأَبْتَرُ) [سورة الكوثر: 3] ، وأنزلت:”ألم تر إلى الذين أوتوا نصيبًا من الكتاب يؤمنون بالجبت والطاغوت” إلى قوله:”فلن تجد له نصيرًا”. –جامع البيان في تأويل القرآن، ج: 8، ص: 466-467؛ ط. مؤسسة الرسالة، ت: أحمد شاكر

“কা’ব বিন আশরাফ মক্কায় আসলে কুরাইশরা জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কি মদীনার বড় আলেম এবং তাদের সর্দার’? সে উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ’। তারা বলল, ‘এই নির্বংশ পরগাছাটাকে দেখ না (নাউজুবিল্লাহ! রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে উদ্দেশ্য নিচ্ছে) সে দাবি করছে, সে নাকি আমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ? অথচ হাজিদের দেখাশুনার মহান দায়িত্ব আমরা পালন করি, পবিত্র কা’বার রক্ষণাবেক্ষণ এবং হাজিদের পানি পান করানোর সুমহান কর্মও আমরাই আঞ্জাম দিই’! কা’ব বিন আশরাফ উত্তরে বলল, ‘বরং তোমরাই তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ’। তখন নাযিল হয়, إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الأَبْتَرُএবং ألم تر إلى الذين …।” –তাফসিরে তাবারি : ৮/৪৬৬-৪৬৭

হাফেয ইবনে কাসির রহ. বলেন,

وإنما قالوا لهم ذلك ليستميلوهم إلى نصرتهم –تفسير القرآن العظيم ، ج: 2، ص: 334؛ ط. دار طيبة للنشر والتوزيع

“এ কথা বলেছে শুধু তাদের থেকে সাহায্য লাভের জন্য।” –তাফসিরে ইবনে কাসির : ২/৩৩৪

জাহিলি যামানায় মদীনায় ইহুদিদের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা ছিল না। তারা মদিনার স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে মিলে মিশে থাকত, যাদের অধিকাংশই পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর উপর ঈমান নিয়ে আনসার হয়ে যান। এরপর ইহুদিরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বিরুদ্ধে মক্কাবাসীর সাথে লেজুর করতে চেষ্টা করল। এ উদ্দেশ্যে জেনেশুনে সত্য গোপন করল। জালেম ও কাফের মক্কাবাসীর পক্ষ নিল। তাদের বাতিল দ্বীন ধর্মকে রাসূল ﷺ এর ধর্মের চেয়ে এবং তাদেরকে মুসলমানদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে দিল। বলে দিল, মুহাম্মাদ ﷺ বাতিলের উপর আছে, তারাই হকের উপর আছে। এভাবে গোমরাহ মক্কাবাসীর গোমরাহি আরও বৃদ্ধি করল। আর এ কাজটি করেছে তাদের সবচেয়ে বড় আলেম লোকটি।

আজ যেসব আলেম তাগুতদের সাথে লেজুরবৃত্তি করছেন, নিজেদের দল কিংবা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার জন্য এবং শাসকদের সুদৃষ্টি লাভের জন্য তাদের শাসনের বৈধতা দিচ্ছেন; বিপরীতে মুজাহিদদের খারিজি, তাকফিরি, উগ্রপন্থী, জযবাতি, চরিত্রহীন ইত্যাদি বলে গালিগালাজ করছেন, অপবাদ দিচ্ছেন- কা’ব বিন আশরাফের সাথে তাদের কতই না মিল! এসব আলেমের এসব ফতোয়ার কারণেই তাগুত শাসকরা এখনও ক্ষমতায় টিকে আছে। এদের ফতোয়ার কারণেই তাগুতরা নিজেদের হক মনে করছে আর মুজাহিদদের মনে করছে জঙ্গি। ইয়া আল্লাহ! তুমি হিফাজত কর। এরা যদি সঠিক ফতোয়া দিত তাহলে জাতি আজ বিভ্রান্ত হতো না।