হাদীস ও উলামায়ে কিরাম কর্তৃক হাদীসের ব্যাখ্যা এবং  বাস্তবতার আলোকে সহীহ মানহাজের বিপ্লবী কাফেলার অবিচ্ছিন্ন অস্তিত্ব ও ত্বাইফা মানসুরা 

আবু উমারা হাসসান আলহানাফি

হাদীস ও উলামায়ে কিরাম কর্তৃক হাদীসের ব্যাখ্যা এবং  বাস্তবতার আলোকে সহীহ মানহাজের বিপ্লবী কাফেলার অবিচ্ছিন্ন অস্তিত্ব ও ত্বাইফা মানসুরা 

পিডিএফ ডাউনলোড করুন
ওয়ার্ড ডাউনলোড করুন

إن الحمد لله وحده، والصلاة والسلام على من لا نبي بعده. أما بعد!

প্রতিটি ফরয ইবাদত বিধিত হওয়ার পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত চলমান থাকা একটি স্বাভাবিক বিষয়; চাই তা ফরযে আইন হোক বা ফরযে কিফায়া। তেমনিভাবে যথার্থ তথা ঠিক পদ্ধতিতে প্রতিটি ইবাদত আঞ্জাম দেয়ার জন্য কোনো না কোনো কাফেলা বিদ্যমান থাকার বিষয়টিও স্বাভাবিক; যদিও ক্ষেত্রবিশেষ কাফেলা বৃহৎ হবে বা ক্ষুদ্রতর হবে।

এটি যেমনিভাবে ‘তাশরি‘ তথা শরীআতের দাবি তেমনিভাবে ‘তাকবিন’ তথা পৃথিবী এ নীতিতে চলে আসছে এবং চলতে থাকবে। কিয়ামত পর্যন্ত চলমান বিশেষ কোনো ইবাদত বিশেষ কোনো সময়ে পৃথিবীর কোনো প্রান্তে কারো উপর ফরয না হওয়ার দাবি যেমনি অস্বাভাবিক, তেমনি বিশেষ কোনো ইবাদত বিশেষ কোনো সময়ে ঠিক পদ্ধতিতে আঞ্জাম দেয়ার মতো কোনো কাফেলা না থাকার দাবিও অযৌক্তিক। সুতরাং অন্যান্য ইবাদতের ন্যায় কিয়ামত পর্যন্ত চলমান খুবই গুরুত্বপূর্ণ ও ঈমানের পর অন্যতম উত্তম ইবাদত জিহাদের ক্ষেত্রেও এই কথাগুলো প্রযোজ্য।

কিয়ামত পর্যন্ত জিহাদ চলমান থাকার মতো একটি স্বীকৃত  বিষয় নিয়ে এ প্রবন্ধে আলোচনা করা আমাদের মূল উদ্দেশ্য নয়। কিন্তু বিশেষ করে বর্তমান সময়ে সহীহ মানহাজের জিহাদি কাফেলার অস্তিত্বের প্রশ্নে যেহেতু কেউ কেউ ভিন্ন কথা বলছেন; অর্থাৎ কেউ কেউ দাবি করছেন, বর্তমানে কোনো কোনো কাফেলা নিজেদেরকে জিহাদি কাফেলা দাবি করে জিহাদ করলেও কারো জিহাদই হক্ব তথা ঠিক পদ্ধতিতে হচ্ছে না কিংবা কেউ কেউ জিহাদি কাফেলার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করছেন।

তাই প্রথমত আমরা হাদীস, উলামায়ে কিরাম কর্তৃক হাদীসের ব্যাখ্যা ও বাস্তবতার আলোকে বুঝার চেষ্টা করবো যে, এমনটি দাবি করার সুযোগ আছে কি না, বা কিয়ামত পর্যন্ত পৃথিবী এই মহান কাফেলা শূন্য হয়েছে কি না,সর্বোপরি হবে কি না। না কি কমপক্ষে একটি সহীহ মানহাজের জিহাদি কাফেলার অস্তিত্বের স্বীকৃতি দেয়া আবশ্যক। দ্বিতীয়ত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে কিয়ামত পর্যন্ত ‘ত্বাইফা মানসুরা’ তথা সাহায্যপ্রাপ্ত দলের বিদ্যমান থাকার সুসংবাদ দিয়েছেন, সে সুসংবাদ কোন ‘ত্বাইফা’র ক্ষেত্রে প্রযোজ্য; আমরা তা নিয়ে আলোচনা করবো, ইনশাআল্লাহ।

মোটকথা, আমাদের এ প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয় দু’টি: ক. সহীহ মানহাজের জিহাদি কাফেলার অবিচ্ছিন্ন অস্তিত্ব। খ. ‘ত্বাইফা মানসুরা’র ‘মিসদাক’ প্রতিপাদ্য।

 

ক. সহীহ মানহাজের জিহাদি কাফেলার অবিচ্ছিন্ন অস্তিত্ব

জিহাদ ফরয হওয়ার পর থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সবসময় সহীহ মানহাজের কমপক্ষে একটি জিহাদি কাফেলা বিদ্যমান থাকার বিষয়টি ওই সকল হাদীসের আলোকেও স্পষ্ট, যে সকল হাদীসে কিয়ামত পর্যন্ত জিহাদ চলমান থাকার কথা বলা হয়েছে। কেননা হক্ব তথা ঠিক পদ্ধতিতে কোনো ইবাদত আঞ্জাম দেয়ার মতো কোনো কাফেলা না থাকলে তা চলমান থাকার দাবি করা যথাযথ হয় না।

সুতরাং কিয়ামত পর্যন্ত জিহাদ চলমান থাকার হাদীসগুলোই দাবি করে কিয়ামত পর্যন্ত সবসময় কমপক্ষে একটি কাফেলা জিহাদের কার্যক্রম ঠিক পদ্ধতিতে আঞ্জাম দেবে। কিন্তু আমরা আলোচনা দীর্ঘ না করে এখানে শুধু ওই ‘মাশহুর’ হাদীসের আলোকেই কথা বলবো যা এ ব্যাপারে স্পষ্ট ও মর্ম নির্দেশে অকাট্য।

হাদীসটি অনেক সাহাবী (রা) থেকে বিভিন্ন সনদে সহীহ মুসলিমসহ হাদীসের বিভিন্ন কিতাবে সহীহ সনদে বর্ণিত হয়েছে। তাই সনদ নিয়ে আলোচনা করার প্রয়োজন নেই। আমরা এখানে প্রসিদ্ধ কয়েকজন সাহাবী (রা)-এর সূত্রে তা উল্লেখ করছি;

জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রাযি) (মৃ: ৭৮ হি.)

عن جابر بن عبد الله قال: سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: لا تزال طائفة من أمتي يقاتلون على الحق ظاهرين إلى يوم القيامة. قال: فينزل عيسى ابن مريم، فيقول أميرهم: تعال! صل بنا، فيقول: لا! إن بعضكم على بعض أمراء، تكرمة الله هذه الأمة. (مسند أحمد، 23/335، رقم الحديث: 15127 و23/63، رقم الحديث: 14720، مؤسسة الرسالة، صحيح مسلم، كتاب الإيمان، باب نزول عيسى بن مريم…، ص 125، رقم الحديث: 395، وكتاب الإمارة، باب قوله صلى الله عليه وسلم: لا تزال طائفة من أمتي…، ص 824، رقم الحديث: 4954، مؤسسة الرسالة ناشرون

‘জাবির ইবন আব্দুল্লাহ (রাযি) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, আমার উম্মতের এক দল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে/সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য বিজয়ী হয়ে কিয়ামত পর্যন্ত সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যাবে।

তিনি বলেন, অতঃপর ঈসা ইবন মারইয়াম (আ) অবতরণ করলে তাদের আমীর বলবেন, আসুন! আমাদেরকে নিয়ে সালাত আদায় করুন। তিনি বলবেন, না! তোমাদের থেকেই একজন অন্যদের আমীর হবে। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে এই উম্মতের সম্মান’। (মুসনাদে আহমাদ, ২৩/৩৩৫, হাদীস নং: ১৫১২৭ ও ২৩/৬৩, হাদীস নং: ১৪৭২০, সহীহ মুসলিম, পৃ: ১২৫, হাদীস নং: ৩৯৫ ও পৃ: ৮২৪, হাদীস নং: ৪৯৫৪)

মুআবিয়া ইবন আবু সুফিয়ান (রাযি) (মৃ: ৬০ হি.)

عن يزيد بن الأصم قال: سمعت معاوية بن أبى سفيان ذكر حديثاً رواه عن النبي صلى الله عليه وسلم -لم أسمعه روى عن النبي صلى الله عليه وسلم حديثاً غيره- أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: من يرد الله به خيراً يفقهه فى الدين، ولا تزال عصابة من المسلمين يقاتلون على الحق ظاهرين على من ناوأهم إلى يوم القيامة. (مسند أحمد، 28/62، رقم الحديث: 16849، صحيح مسلم، كتاب الإمارة، باب قوله صلى الله عليه وسلم: لا تزال طائفة من أمتي…، ص 824، رقم الحديث: 4956)

‘ইয়াযিদ ইবনুল আসাম (রহ) বলেন, আমি মুআবিয়া ইবন আবু সুফিয়ান(রাযি)কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করতে শুনেছি -তাঁকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অন্য কোনো হাদীস বর্ণনা করতে আমি শুনিনি-, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তাআলা যার ব্যাপারে কল্যাণের ইচ্ছে করেন তাকে দ্বীনের ‘তাফাক্কুহ’ দান করেন।

আর মুসলিমদের একদল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে/সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য শত্রুদের উপর বিজয়ী হয়ে কিয়ামত পর্যন্ত সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যাবে’। (মুসনাদে আহমাদ, ২৮/৬২, হাদীস নং: ১৬৮৪৯, সহীহ মুসলিম, পৃ: ৮২৪, হাদীস নং: ৪৯৫৬)

জাবির ইবন সামুরা (রাযি) (মৃ: ৭২ হি.)

عن جابر بن سمرة عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه قال: لن يبرح هذا الدين قائماً يقاتل عليه عصابة من المسلمين حتى تقوم الساعة. (مسند أحمد، 34/499، رقم الحديث: 20985 34/439، رقم الحديث: 20859 34/514، رقم الحديث: 21011، صحيح مسلم، كتاب الإمارة، باب قوله صلى الله عليه وسلم: لا تزال طائفة من أمتي…، ص 823، رقم الحديث: 4953)

‘জাবির ইবন সামুরা (রাযি) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, এই দ্বীন আপন অবস্থানের উপর টিকে থাকবে এভাবে যে, মুসলিমদের একদল এই দ্বীনের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যাবে’। (মুসনাদে আহমাদ, ৩৪/৪৯৯, হাদীস নং: ২০৯৮৫, ৩৪/৪৩৯, হাদীস নং: ২০৮৫৯ ও ৩৪/৫১৪, হাদীস নং: ২১০১১, সহীহ মুসলিম, পৃ: ৮২৩, হাদীস নং: ৪৯৫৩)

উকবা ইবন আমির (রাযি) (মৃ: ৫৮ হি.)

عن عقبة بن عامر قال: سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول:لا تزال عصابة من أمتي يقاتلون على أمر الله قاهرين لعدوهم، لايضرهم من خالفهم، حتى تأتيهم الساعة وهم على ذلك. (صحيح مسلم، كتاب الإمارة، باب قوله صلى الله عليه وسلم: لا تزال طائفة من أمتي…، ص 824، رقم الحديث: 4957)

‘উকবা ইবন আমির (রাযি) থেকে বর্ণিত তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, আমার উম্মতের একদল শত্রুদের পরাস্তকারী হয়ে আল্লাহর নির্দেশের উপর অবিচল থেকে/আল্লাহর বিধান প্রতিষ্ঠার জন্য সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যাবে। তাদের বিরোধীরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কিয়ামত পর্যন্ত তারা এ অবস্থার উপর চলমান থাকবে’। (সহীহ মুসলিম, পৃ: ৮২৪, হাদীস নং: ৪৯৫৭)

ইমরান ইবন হুসাইন (রাযি) (মৃ: ৫২ হি.)

عن عمران بن حصين أن النبي صلى الله عليه وسلم قال: لا تزال طائفة من أمتي يقاتلون على الحق ظاهرين على من ناوأهم حتى يقاتل آخرهم المسيح الدجال. (مسند أحمد، 33/149، رقم الحديث: 19920، سنن أبي داود، كتاب الجهاد، بابٌ في دوام الجهاد، ص 549، رقم الحديث: 2484، مؤسسة الرسالة ناشرون، المستدرك للحاكم، كتاب الجهاد، 2/201-202، رقم الحديث: 2439، وكتاب الفتن والملاحم، 5/363، رقم الحديث: 8563، دار الفكر

قال الحاكم: هذا حديث صحيح على شرط مسلم ولم يخرجاه، (ولم يتعقبه الذهبي). وقال الشيخ شعيب الأرنؤوط في تعليقه على المسند: إسناده صحيح على شرط مسلم.

‘ইমরান ইবন হুসাইন (রাযি) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, মুসলিমদের একদল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে/সত্য প্রতিষ্ঠার জন্য শত্রুদের উপর বিজয়ী হয়ে তাদের সর্বশেষ দল দাজ্জালের সঙ্গে যুদ্ধ করা পর্যন্ত সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যাবে’। (মুসনাদে আহমাদ, ৩৩/১৪৯, হাদীস নং: ১৯৯২০, সুনানে আবু দাউদ, পৃ: ৫৪৯, হাদীস নং: ২৪৮৪, মুসতাদরাকে হাকীম, ২/২০১-২০২, হাদীস নং: ২৪৩৯ ও ৫/৩৬৩, হাদীস নং: ৮৫৬৩)

সালামা ইবন নুফাইল (রাযি)

عن سلمة بن نفيل أنه أتى النبي صلى الله عليه وسلم فقال: إني أسمت الخيل وألقيت السلاح، ووضعت الحرب أوزارها، قلت: لا قتال. فقال له النبي صلى الله عليه وسلم: الآن جاء القتال، لا تزال طائفة من أمتي ظاهرين على الناس، يزيغ الله قلوب أقوام فيقاتلونهم، ويرزقهم الله منهم، حتى يأتي أمر الله عز وجل وهم على ذلك…… (مسند أحمد، 28/164-165، رقم الحديث: 16965، سنن النسائي -المجتبى-، كتاب الخيل والسبق والرمي، ص 837، رقم الحديث: 3561، مؤسسة الرسالة ناشرون

‘সালামা ইবন নুফাইল (রাযি) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললেন, আমি ঘোড়াকে ঘাস পাতা খেয়ে বিচরণের জন্য ছেড়ে দিয়েছি এবং অস্ত্র রেখে দিয়েছি, কেননা যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। তাই আমি বললাম, এখন আর যুদ্ধ নেই। তখন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, সশস্ত্র যুদ্ধের সময় এখন এসেছে। আমার উম্মতের একদল মানুষদের উপর বিজয়ী হয়ে থাকবে।

অনেক জাতির (কাফিরদের) অন্তর আল্লাহ তাআলা ঈমান থেকে বিচ্যুত করবেন, ফলে তারা তাদের সঙ্গে যুদ্ধ করবে। আল্লাহ তাআলা কাফিরদের থেকে প্রাপ্য গনিমত দ্বারা ওই ‘ত্বাইফা’কে রিযিক পৌঁছাবেন। আল্লাহর নির্দেশ (কিয়ামত) আসা পর্যন্ত তারা এ অবস্থার উপর চলমান থাকবে।…………’ (মুসনাদে আহমাদ, ২৮/১৬৪-১৬৫, হাদীস নং: ১৬৯৬৫, সুনানে নাসায়ি, পৃ: ৮৩৭, হাদীস নং: ৩৫৬১)

আমরা এখানে ওই বর্ণনাগুলোই উল্লেখ করেছি যাতে আলোচ্য ‘ত্বাইফা’র পরিচয় হিসেবে ‘ক্বিতাল’ তথা সশস্ত্র যুদ্ধের বিষয়টি স্পষ্ট বলা হয়েছে। অন্যথায় হাদীসটি আরো অনেক সূত্রে বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর দিকে আমরা ‘ত্বাইফা মানসুরা’র ‘মিসদাক’ প্রতিপাদ্য নিয়ে আলোচনার সময় ইঙ্গিত করবো, ইনশাআল্লাহ।

হাদীসটির উল্লিখিত বর্ণনাসমূহের আলোকে স্পষ্ট যে, ক. দ্বীনের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত একটি বিশেষ দলের কার্যক্রম চলমান থাকবে। খ. দলটি সশস্ত্র যুদ্ধ তথা মুজাহিদদের কাফেলা হবে। গ. দলটি সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে তথা তাদের কার্যক্রম সহীহ মানহাজে পরিচালিত হবে। ঘ. কারো বিরোধিতা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। ঙ. তাদের সর্বশেষ কাফেলা দাজ্জালের সঙ্গে যুদ্ধ করবে।

উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় উলামায়ে কিরামের বক্তব্য

আলোচ্য হাদীসের ভাষ্য ও মর্ম একজন সাধারণ আলিমের জন্যও সুস্পষ্ট ও অকাট্য। তবুও আমরা বিষয়টি আরো স্পষ্ট করার জন্য উলামায়ে কিরাম কর্তৃক কিছু ব্যাখ্যা উল্লেখ করছি;

ইমাম আবু দাউদ (রহ) (মৃ: ২৭৫ হি.)

ইমাম আবু দাউদ (রহ) কর্তৃক ‘জিহাদ চলমান থাকার অধ্যায়’-এর অধীনে উক্ত হাদীস উল্লেখ করা থেকে স্পষ্ট যে, হাদীসটি সহীহ মানহাজের জিহাদি কাফেলা সবসময় বিদ্যমান থাকার বিষয়টি নির্দেশ করে।

ইমাম খাত্তাবি (রহ) (মৃ: ৩৮৮ হি.)

قلت: فيه بيان أن الجهاد لا ينقطع أبداً. (معالم السنن، ২/২০৪، دار الكتب العلمية

‘উক্ত হাদীসে জিহাদ কখনো স্থগিত না হওয়ার কথা বলা হয়েছে’। (মাআলিমুস সুনান, ২/২০৪)

আবুল মুযাফফর সামআনি (রহ) (মৃ: ৪৮৯ হি.)

وقد ثبت أن النبي قال: لا تزال طائفة من أمتي يقاتلون على الحق حتى تقوم الساعة. وفي رواية أخرى: حتى يكون آخر من يقاتلون الدجال. وفي الجملة لا تضع الحرب أوزارها ما بقي في العالم كافر حربي. (تفسير السمعاني، سورة محمد، الآية: 4، 5/169، دار الوطن

‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত, তিনি বলেছেন, আমার উম্মতের একদল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে কিয়ামত পর্যন্ত সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যাবে। অন্য বর্ণনায় আছে, তাদের সর্বশেষ দল হবে যারা দাজ্জালের সঙ্গে যুদ্ধ করবে। মোটকথা, যতোদিন পৃথিবীতে ‘হারবি’ কাফির অবশিষ্ট থাকবে, ততোদিন যুদ্ধ বন্ধ হবে না’। (তাফসিরে সামআনি, ৫/১৬৯)

মুযহিরুদ্দিন মুযহিরি (রহ)(মৃ: ৭২৭ হি.)

يعني أبداً يكون الجهاد موجوداً، ويكون الثابتون على الحق والمظهرون لدين الله تعالى موجودين إلى يوم القيامة، فإن لم يكونوا في بلد يكونوا في بلد أخرى…………

لن يزال هذا الدين يجاهد عليه جماعة من المسلمين إلى يوم القيامة، يعني: لا يخلو وجه الأرض من الجهاد، إن لم يكن في ناحية يكون في ناحية أخرى. (المفاتيح في شرح المصابيح للمظهري، كتاب الإيمان، باب الاعتصام بالكتاب والسنة، 1/262، وكتاب الجهاد، 4/341، وزارة الأوقاف الكويتية

‘অর্থাৎ জিহাদ সবসময় থাকবে এবং সত্যের উপর অটল ও আল্লাহ তাআলার দ্বীনকে বিজয় দানকারী কাফেলা কিয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে। এক অঞ্চলে না থাকলে অন্য অঞ্চলে থাকবে।…

এই দ্বীনের জন্য কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিমদের একটি জামাআত জিহাদ করতেই থাকবে। অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠ কখনো জিহাদহীন হবে না; এক প্রান্তে না হলে অন্য প্রান্তে হবে’। (আলমাফাতিহ, ১/২৬২ ও ৪/৩৪১)

শারাফুদ্দিন তিবি (রহ) (মৃ: ৭৪৩ হি.)

أي يظاهرون بالمقاتلة على أعداء الدين، يعني أن هذا الدين لم يزل قائماً بسبب مقاتلة هذه الطائقة. وما أظن هذه العصابة إلا الفئة المنصورة بالشام والمغرب…….

قوله: “يقاتل آخرهم المسيح الدجال” أي لا تنقطع تلك الطائفة المنصورة، بل تبقى إلي أن يقاتل آخرهم الدجال. أي إلي قيام الساعة….. (الكاشف عن حقائق السنن -شرح الطيبي-، كتاب الجهاد، ص، 2632، 2644، مكتبة نزار مصطفى الباز، مكة المكرمة

‘তারা যুদ্ধের মাধ্যমে দ্বীনের শত্রুদের উপর বিজয়ী থাকবে। অর্থাৎ এই ‘ত্বাইফা’র যুদ্ধের কারণে দ্বীন আপন অবস্থানের উপর টিকে থাকবে। আমার মতে এই দল শাম ও মাগরিবের সাহায্যপ্রাপ্ত দল।…

‘তাদের শেষ দল দাজ্জালের সঙ্গে যুদ্ধ করবে’ অর্থাৎ ওই ‘ত্বাইফা মানসুরা’ বিলুপ্ত হবে না, বরং তাদের শেষ দল দাজ্জালের সঙ্গে যুদ্ধ করা তথা কিয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে।…………..’ (শরহে তিবি, পৃ: ২৬৩২ ও ২৬৪৪)

ইবন হাজার আসকালানি (রহ) (মৃ: ৮৫২ হি.)

وفي الحديث الترغيب في الغزو على الخيل، وفيه أيضاً بشرى ببقاء الإسلام وأهله إلى يوم القيامة، لأن من لازم بقاء الجهاد بقاء المجاهدين وهم المسلمون، وهو مثل الحديث الآخر: “لا تزال طائفة من أمتي يقاتلون على الحق” الحديث. (فتح الباري، كتاب الجهاد، باب الجهاد ماض مع البر والفاجر، 9/108، الرسالة العالمية

‘উক্ত হাদীসে ঘোড়ায় চড়ে যুদ্ধের ব্যাপারে উৎসাহপ্রদান করা হয়েছে। এছাড়াও তাতে কিয়ামত পর্যন্ত ইসলাম ও মুসলমানদের টিকে থাকার বিষয়ে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে। কেননা জিহাদের অস্তিত্বের জন্য মুজাহিদদের অস্তিত্ব আবশ্যক; আর মুজাহিদ তো মুসলমানরাই। আর এটি ওই হাদীসের ন্যায় যাতে বলা হয়েছে ‘আমার উম্মতের একদল সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে সশস্ত্র লড়াই চালিয়ে যাবে’। (ফাতহুল বারী, ৯/১০৮)

ইবনুল মালাক রুমি (রহ) (মৃ: ৮৫৪ হি.)

يعني: لا يخلو وجه الأرض من الجهاد، إن لم يكن في ناحية يكون في ناحية أخرى. (شرح المصابيح لابن الملك، كتاب الجهاد، 4/312، إدارة الثقافة الإسلامية

‘অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠ কখনো জিহাদহীন হবে না; এক প্রান্তে না হলে অন্য প্রান্তে হবে’। (শারহুল মাসাবিহ, ৪/৩১২)

মোল্লা আলী কারী (রহ) (মৃ: ১০১৪)

والمعنى لا يخلو وجه الأرض من الجهاد، إن لم يكن في ناحية يكون في ناحية أخرى………. قلت: والأغلب في هذا الزمان بالروم نصرهم الله وخذل أعدائهم…………. فالتحقيق أن المراد بالطائفة الجماعة المجاهدة لا على التعيين، فإن في ما وراء النهر أيضاً طائفة يقاتلون الكفرة قوّاهم الله تعالى، وجزى المجاهدين عنا خيراً حيث قاموا بفرض الكفاية، وأعطوا التوفيق والعناية. (مرقاة المفاتيح، كتاب الجهاد، 7/334، دار الكتب العلمية

‘অর্থাৎ ভূপৃষ্ঠ কখনো জিহাদহীন হবে না; এক প্রান্তে না হলে অন্য প্রান্তে হবে।… আমার বক্তব্য হচ্ছে, বর্তমানে ওই ‘ত্বাইফা’র অধিকাংশ অবস্থান রোমে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে সাহায্য করুন এবং তাদের শত্রুদেরকে অপদস্থ করুন।…

বিশ্লেষণধর্মী কথা হচ্ছে, ‘ত্বাইফা’ দ্বারা অনির্দিষ্ট মুজাহিদদের জামাআত উদ্দেশ্য। কেননা ‘মা-ওয়ারাউন নাহরেও কাফেলা রয়েছে যারা কাফিরদের বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করছে। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে শক্তিশালী করুন এবং আমাদের পক্ষ থেকে তাদেরকে উত্তম বিনিময় দান করুন। কেননা তারা ফরযে কিফায়া আঞ্জাম দিচ্ছে এবং তাদেরকে জিহাদের ব্যাপারে যত্নবান হওয়ার তাওফীক দেয়া হয়েছে’। (মিরকাত, ৭/৩৩৪)

আব্দুর রাউফ মুনাবি (রহ)(মৃ: ১০৩১ হি.)

يعني أن هذا الدين لم يزل قائماً بسبب مقاتلة هذه الطائفة، وفيه بشارة بظهور أمر هذه الأمة على سائر الأمم إلى قيام الساعة”. (فيض القدير، 7/92-93، دار الحديث، التيسير، 2/203)

‘অর্থাৎ এই ‘ত্বাইফা’র যুদ্ধের কারণে দ্বীন আপন অবস্থানের উপর টিকে থাকবে। এবং তাতে কিয়ামত পর্যন্ত সকল জাতির উপর এই উম্মতের বিজয়ী হওয়ার সুসংবাদ দেয়া হয়েছে’। (ফায়যুল কাদির, ৭/৯২-৯৩, আততাইসির, ২/৩০৩)

শাব্বির আহমাদ উসমানি (রহ) (মৃ: ১৩৬৯ হি.)

الظاهر أنها عصابة الغزاة والمجاهدين في سبيل الله، كما يدل لفظ “يقاتلون”، وقيل: إن المقاتلة أعم من أن تكون حسية أو معنوية. (فتح الملهم، كتاب الإيمان، باب بيان نزول عيسى بن مريم….، 2/137، دار القلم

‘বাহ্যত তারা আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদ ও যুদ্ধরত দল। “يقاتلون” শব্দ এটির নির্দেশক। এমন কথাও বলা হয়েছে যে, যুদ্ধ ব্যাপক অর্থে; চাই ‘হিসসি’ তথা অস্ত্রের হোক বা ‘মা‘নাবি’ তথা দলীল ইত্যাদির হোক।(১) (ফাতহুল মুলহিম, ২/১৩৭)

হাদীসের ভাষ্য ও মর্ম এবং উলামায়ে কিরাম কর্তৃক হাদীসের ব্যাখ্যার আলোকে প্রথমত, স্পষ্ট যে, কিয়ামত পর্যন্ত সর্বকালে পৃথিবীর কোনো না কোনো অঞ্চলে সহীহ মানহাজের কমপক্ষে একটি জিহাদি কাফেলা অবশ্যই বিদ্যমান ছিল, আছে এবং থাকবে। ভূপৃষ্ঠ কখনো এই মহান কাফেলা শূন্য হবে না। ইতিহাসও এটির সাক্ষ্য দেয়।

কোনো কোনো বর্ণনায় যে ‘শামের’ কথা এসেছে, তা এ ব্যাপারে শামের বৈশিষ্ট্য বুঝানোর জন্য। কেননা শাম সর্বযুগেই জিহাদ ও ‘রিবাত’-এর ভূমি। ইতিহাস এমনই সাক্ষ্য দেবে যে, শামে সর্বকালেই কোনো না কোনো সহীহ মানহাজের জিহাদি কাফেলা ছিল।

কিয়ামত পর্যন্ত তা থাকবে এবং সেখানেই দাজ্জালের সঙ্গে এই কাফেলা যুদ্ধ করবে।(২)  সুতরাং এমনটি বলার সুযোগ নেই যেমনটি সহীহ মানহাজের জিহাদি কাফেলার সর্বকালে ও বর্তমানে বিদ্যমান থাকার প্রশ্নে একজন বলেছেন, ‘চল্লিশ/পঞ্চাশ বছরের ভেতরে কখনও কোথাও কোনো একটি থাকতে পারে’। আর বর্তমান সময়ের ব্যাপারে বলেছেন, ‘আমি নাই বলছি না, হয়তো বা আছে’। এমন দীর্ঘমেয়াদি পরিধি নির্ধারণ করে; তাও আবার সংশয় রেখে কথা বলার সুযোগ নেই।

 

দ্বিতীয়ত, এই ‘ত্বাইফা’ জিহাদি কাফেলা। ‘ক্বিতাল’ তথা সশস্ত্র যুদ্ধের কথা স্পষ্ট থাকা সত্ত্বেও অন্য কোনো জামাআত উদ্দেশ্য নেয়া অযৌক্তিক। আমাদের জানা মতে ‘ক্বিতাল’ সম্বলিত বর্ণনার ব্যাখ্যায় অন্য জামাআতের কথা ইমাম বুখারী (রহ) ব্যতীত পূর্ববর্তী কোনো ইমাম(রহ) থেকে বর্ণিত হয়নি।

যে সকল বর্ণনায় ‘ক্বিতাল’-এর বিষয়টি উল্লেখ হয়নি সে সকল বর্ণনার ব্যাখ্যায় ইমাম আহমাদ (রহ)সহ অন্যান্য ইমামের (রহ) ভিন্ন ব্যাখ্যা বর্ণিত হয়েছে; যা সংক্রান্ত বিস্তারিত আলোচনা সামনে আসছে। হাঁ! পরবর্তী ব্যাখ্যাদাতাদের কেউ কেউ পার্থক্য না করে যেকোনো বর্ণনার অধীনে একাধিক মতামত উল্লেখ করে দিয়েছেন।

ইমাম বুখারী (রহ) ‘ক্বিতাল’ সম্বলিত বর্ণনা সনদবিহীন স্বতন্ত্র অধ্যায়ের শিরোনাম হিসেবে উল্লেখ করে ব্যাখ্যায় বলেছেন “وهم أهل العلم”। (দেখুন: সহীহ বুখারী, কিতাবুল ই‘তিসাম বিল কিতাবি ওয়াসসুন্নাহ, পৃ: ১৬৮১)। অন্য ‘নুসখা’য় আছে “وهم من أهل العلم”। (দেখুন: যাকারিয়া আনসারি -মৃ: ৯২৬ হি.- কর্তৃক সহীহ বুখারীর ব্যাখ্যাগ্রন্থ ‘মিনহাতুল বারী’ ১০/২৯৩, মাকতাবাতুর রুশদ)। এটিকে ইমাম বুখারী(রহ)-এর ‘যাল্লাত’ আখ্যা না দিয়েও বল যায় যে, তিনি ‘ত্বাইফা’র ব্যাখ্যায় মুজাহিদদের থেকে যারা আহলে ইলম তাদেরকে নির্দিষ্ট করেছেন। দ্বিতীয় ‘নুসখা’র ব্যবহার এই ব্যাখ্যাকে আরো স্পষ্ট করে।

তৃতীয়ত, অন্যান্য জামাআতকে আলোচ্য হাদীসের অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ‘ক্বিতাল’কে “مادي” ও “معنوي” তথা ‘অস্ত্রের মাধ্যমে ক্বিতাল ও দলীলের মাধ্যমে ক্বিতাল’ বলে দু’ভাগে ভাগ করা খুবই আপত্তিকর। বড়দের (রহ) কেউ করে থাকলে অবশ্যই তা ‘যাল্লাত’ পদস্খলন সাব্যস্ত হবে। এটি কতমুখী ‘তাহরিফ’ অপব্যাখ্যার রাস্তা খুলে দেবে তা একটু ভাবা প্রয়োজন।

‘ক্বিতাল’ সংক্রান্ত আয়াত ও হাদীসের বাস্তবতাই বিলুপ্ত হয়ে যাবে। দ্বীনের প্রতিটি কাজের, প্রতিটি দ্বীনি জামাআতের ভিন্ন ভিন্ন ফযিলত রয়েছে। নির্দিষ্ট কোনো কাফেলার জন্য বর্ণিত ফযিলতের অধীনে কেন অন্যান্য জামাআতকে টেনে এনে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে?

এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা উচিত, কোনো কাফেলার দিকে কোনো দ্বীনি কাজের নিসবত হওয়ার অর্থ এই নয় যে, তারা প্রতিটি ক্ষণে-মুহূর্তে তাতে লিপ্ত থাকে। সে হিসেবে জিহাদি কাফেলার পরিচয়ে ‘সর্বদা লড়াই চালিয়ে যাওয়ার’ অর্থ এই নয়, তারা প্রতিটি ক্ষণে-মুহূর্তে অস্ত্র হাতে যুদ্ধের ময়দানে উপস্থিত থাকবে। সাধারণ ‘উরফ’ ব্যবহারের আলোকেই স্পষ্ট যে, জিহাদি কাফেলা দ্বারা উদ্দেশ্য জিহাদ যাদের মৌলিক ‘মাশগালা’ কর্ম।

কখনো সশস্ত্র যুদ্ধ করছেন, কখনো প্রস্তুতি গ্রহণ করছেন বা কখনো শত্রুদের অবস্থানের ছক এঁকে পরিকল্পনা স্থির করছেন ইত্যাদি ইত্যাদি। এ কথাগুলো তো স্পষ্ট। কিন্তু ‘প্রতিটি ক্ষণে-মুহূর্তে অস্ত্র হাতে ময়দানে থাকা আবশ্যক নয়’ এ বাস্তবতার সুযোগ নিয়ে কেউ কেউ ওই সকল জামাআতকেও এই হাদীসের অন্তর্ভুক্ত করেছেন, যারা হয়তো জিহাদকে জরুরিও মনে করেন ও মহব্বতও করেন, কিন্তু জিহাদ নিয়ে তাদের কোনো বিশেষ চিন্তা-ফিকির, পরিকল্পনা ও কর্ম নেই; তথা জিহাদ তাদের ‘মাশগালা’ নয়।

আবার এই সুযোগে উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় দলীলের মাধ্যমে ক্বিতালের প্রাধান্যের দিকে ঝোঁক প্রকাশ করেন; কেননা তা সর্বদা চলমান আর অস্ত্রের ক্বিতাল সর্বদা চলমান নয়। শায়খ নাসিরুদ্দিন আলবানি(রহ) থেকে (মৃ: ১৪২০ হি.) এমনই আচরণ প্রকাশ পেয়েছে। (দেখুন: আলবানি (রহ)-এর দরসের রেকর্ড থেকে জমা করা দরস সংকলন, ১১/৭, শামেলা)

প্রথম বিষয়ের আলোচনা আমরা এখানেই শেষ করছি। পূর্ণ আলোচনা থেকে আশা করি ‘সহীহ মানহাজের জিহাদি কাফেলার অবিচ্ছিন্ন অস্তিত্বের’ বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। আমরা এখন দ্বিতীয় বিষয়ের আলোচনা শুরু করবো।

খ. ‘ত্বাইফা মানসুরা’র ‘মিসদাক’ প্রতিপাদ্য

সর্বদা বিদ্যমান ‘ত্বাইফা’, যার জন্য কোনো কোনো বর্ণনায় ‘মানসুর’ শব্দ ব্যবহার হয়েছে; তথা ‘ত্বাইফা মানসুরা’ দ্বারা কোন দল উদ্দেশ্য তা নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করার প্রয়োজন ছিল না। উপর্যুক্ত আলোচনাই যথেষ্ট ছিল তা নির্ণয়ের জন্য। কিন্তু ‘ক্বিতাল’-এর প্রসঙ্গ উল্লেখ না হওয়ার বর্ণনাগুলো কেন্দ্র করে একাধিক ইমাম (রহ) থেকে ‘ত্বাইফা’র ব্যাখ্যায় ভিন্ন জামাআতের কথা বর্ণিত হয়েছে। তাই এই বিষয়ে কিছুটা বিস্তারিত কথা বলার চেষ্টা করবো, ইনশাআল্লাহ।

ক্বিতাল’-এর বিষয় উল্লেখ ব্যতীত বর্ণনাও অনেক সাহাবী (রা) সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। আমরা সংক্ষেপে সেগুলো থেকে কয়েকটি বর্ণনা উল্লেখ করছি;

মুগিরা ইবন শু‘বা (রাযি) (মৃ: ৫০ হি.)

عن المغيرة بن شعبة قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: لا يزال من أمتي قوم ظاهرين على الناس حتى يأتيهم أمر الله وهم ظاهرون. (مسند أحمد، 30/63، 103و142، رقم الحديث: 18135، 18166 و18203، صحيح البخاري، كتاب المناقب، ص 930، رقم الحديث: 3640، -في عدة مواضع أخر- صحيح مسلم، كتاب الإمارة، باب قوله صلى الله عليه وسلم: لا تزال طائفة من أمتي…، ص 823، رقم الحديث: 4951 و4952)

‘মুগিরা ইবন শু‘বা (রাযি) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার উম্মতের একটি সম্প্রদায় সর্বদা মানুষের উপর বিজয়ী থাকবে। আল্লাহর নির্দেশ (কিয়ামত) আসা পর্যন্ত তারা বিজয়ী থাকবে’। (মুসনাদে আহমাদ, ৩০/৬৩, ১০৩ ও ১৪২, হাদীস নং: ১৮১৩৫, ১৮১৬৬ ও ১৮২০৩, সহীহ বুখারী, পৃ: ৯৩০, হাদীস নং: ৩৬৪০, আরো বিভিন্ন অধ্যায়ে- সহীহ মুসলিম, পৃ: ৮২৩, হাদীস নং: ৪৯৫১ ও ৪৯৫২)

সাওবান (রাযি) (মৃ: ৫৪ হি.)

عن ثوبان قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: لا تزال طائفة من أمتي على الحق ظاهرين، لا يضرهم من خذلهم حتى يأتي أمر الله. (مسند أحمد، 37/88، رقم الحديث: 22403، صحيح مسلم، كتاب الإمارة، باب قوله صلى الله عليه وسلم: لا تزال طائفة من أمتي…، ص 823، رقم الحديث: 4950، جامع الترمذي، أبواب الفتن، باب في الأئمة المضلين، ص 829، رقم الحديث: 2379، مؤسسة الرسالة ناشرون، سنن ابن ماجه، أبواب السنة، باب اتباع سنة رسول الله صلى الله عليه وسلم، ص 62، رقم الحديث: 10، مؤسسة الرسالة ناشرون

‘সাওবান (রাযি) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আমার উম্মতের একদল সর্বদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকবে বিরোধিতাকারীরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না’। (মুসনাদে আহমাদ, ৩৭/৮৮, হাদীস নং: ২২৪০৩, সহীহ মুসলিম, পৃ: ৮২৩, হাদীস নং: ৪৯৫০, জামে তিরিমিযি, পৃ: ৮২৯, হাদীস নং: ২৩৭৯, সুনানে ইবন মাজাহ, পৃ: ৬২, হাদিস নং: ১০)

মুআবিয়া ইবন আবু সুফিয়ান (রাযি) (মৃ: ৬০ হি.)

عن معاوية بن أبي سفيان قال: سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: من يرد الله به خيراً يفقهه فى الدين، ولن تزال هذه الأمة أمة قائمة على أمر الله، لا يضرهم من خالفهم حتى يأتي أمر الله وهم ظاهرون على الناس. (مسند أحمد، 28/127-129، رقم الحديث: 16931 16932، صحيح البخاري، كتاب العلم، باب من يرد الله به خيراً يفقهه في الدين، ص 211، رقم الحديث: 71، -في عدة مواضع أخر- صحيح مسلم، كتاب الإمارة، باب قوله صلى الله عليه وسلم: لا تزال طائفة من أمتي…، ص 824، رقم الحديث: 4955)

‘মুআবিয়া ইবন আবু সুফিয়ান (রাযি) বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, আল্লাহ তাআলা যার ব্যাপারে কল্যাণের ইচ্ছে করেন তাকে দ্বীনের ‘তাফাক্কুহ’ দান করেন। এই উম্মতের একদল সর্বদা আল্লাহর নির্দেশের উপর অটল থাকবে। আল্লাহর নির্দেশ (কিয়ামত) আসা পর্যন্ত বিরোধীরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না এবং তারা মানুষের উপর বিজয়ী থাকবে’। (মুসনাদে আহমাদ, ২৮/১২৭-১২৯, সহীহ বুখারী, পৃ: ২১১, হাদীস নং: ৭১, -আরো বিভিন্ন অধ্যায়ে,সহীহ মুসলিম, পৃ: ৮২৪, হাদীস নং: ৪৯৫৫)

কুররা আলমুযানি (রাযি)

عن قرة المزني عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: إذا فسد أهل الشام فلا خير فيكم، ولن تزال طائفة من أمتي منصورين، لا يضرهم من خذلهم حتى تقوم الساعة. (مسند أحمد، 33/472، رقم الحديث: 20361، جامع الترمذي، أبواب الفتن، باب ما جاء في الشام، ص 821، رقم الحديث: 2337، سنن ابن ماجه، أبواب السنة، باب اتباع سنة رسول الله صلى الله عليه وسلم، ص 62، رقم الحديث: 6

قال الترمذي: هذا حديث حسن صحيح.

‘কুররা আলমুযানি (রাযি) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, শামবাসীর অবস্থা বিকৃত হয়ে গেলে তোমাদের মাঝে আর কল্যাণ অবশিষ্ট থাকবে না। আমার উম্মতের একদল সর্বদা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে; কিয়ামত আসা পর্যন্ত ব্যর্থকারীরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না’। (মুসনাদে আহমাদ, ৩৩/৪৭২, হাদীস নং: ২০৩৬১, জামে তিরমিযি, পৃ: ৮২১, হাদীস নং: ২৩৩৭, সুনানে ইবন মাজাহ, পৃ: ৬২, হাদীস নং: ৬)

এ মর্মের হাদীস উমর ইবনুল খাত্তাব, যায়িদ ইবন আরকাম, ইমরান ইবন হুসাইন, আবু হুরায়রা ও আবু উমামা রাযিআল্লাহু আনহুমসহ অনেকের থেকে বর্ণিত হয়েছে। বিস্তারিত দেখতে পারি, তারিখে দিমাশক, ইবন আসাকির -মৃ: ৫৭১ হি.- (১/২৫৪-২৬৯) ও শায়খ শুআইব  আরনাউত (রহ) কর্তৃক মুসনাদে আহমাদের টীকা, (১৪/২৫-২৭)।

 

উল্লিখিত হাদীসে ‘ত্বাইফা’ দ্বারা উদ্দেশ্য জিহাদি কাফেলা

একটি স্বীকৃত মূলনীতি সকলের জানা আছে যে, কোনো হাদীসের ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে সবচেয়ে উত্তম পদ্ধতি হচ্ছে এক বর্ণনার ব্যাখ্যা অন্য বর্ণনা দিয়ে বা এক হাদীসের ব্যাখ্যা অন্য হাদীস দিয়ে করা। এই মূলনীতির আলোকে আমরা স্পষ্ট বলতে পারি, যেহেতু বিভিন্ন বর্ণনায় ‘ত্বাইফা’র পরিচয়ে ‘ক্বিতাল’-এর বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে, সুতরাং যে সকল বর্ণনায় ‘ক্বিতাল’-এর কথা উল্লেখ হয়নি তা থেকেও জিহাদি কাফেলাই উদ্দেশ্য। অন্য কোনো কাফেলা উদ্দেশ্য নেয়ার পক্ষে যৌক্তিক কোনো দলীল নেই। যেমনটি মুজাহিদ ব্যতীত অন্য কোনো কাফেলা উদ্দেশ্য নেয়ার ব্যাপারে আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি (রহ)-এর বিস্ময়ের বিষয়টি সামনে আসছে।

উলামায়ে কিরাম (রহ) কর্তৃক ‘ক্বিতাল’ সম্বলিত বর্ণনার ব্যাখ্যা আমাদের সামনে এসেছে। ‘ক্বিতাল’-এর উল্লেখ ব্যতীত বর্ণনার ব্যাখ্যায়ও একাধিক ইমাম (রহ) জিহাদি কাফেলার কথা বলেছেন। যদিও তাদের কারো কারো ভিন্ন কথাও আছে। যেমন;

ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ) (মৃ: ২৪১ হি.)

وسئل (الإمام أحمد) عن حديث النبي صلى الله عليه وسلم: “لا تزال طائفة من أمتي ظاهرين على الحق، لا يضرهم من خالفهم حتى يأتي أمر الله، وهم على ذلك”. قال: هم أهل المغرب، إنهم هم الذين يقاتلون الروم، كل من قاتل المشركين فهو على الحق. (مسائل الإمام أحمد بن حنبل رواية إسحاق بن أبراهيم ابن هانئ النيسابوري -المتوفى 275ه-، 2/192، رقم المسألة: 2041، المكتب الإسلامي

‘ইমাম আহমাদ (রহ) কে ‘আমার উম্মতের একদল সর্বদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিজয়ী থাকবে। বিরোধীরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না এবং আল্লাহর নির্দেশ (কিয়ামত) আসা পর্যন্ত তারা এ অবস্থার উপরই থাকবে’ হাদীসের ব্যাখ্যা সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়েছে। তিনি উত্তরে বললেন, তারা আহলে মাগরিব। কেননা তারাই রোমানদের সঙ্গে সশস্ত্র যুদ্ধ করছে। যারাই মুশরিকদের সঙ্গে যুদ্ধ করে তারাই সত্যের উপর অবিচল’। (মাসায়েলুল ইমাম আহমাদ -ইবন হানির বর্ণনা-, ২/১৯২, মাসআলা নং: ২০৪১)

ইমাম মুসলিম (রহ) (মৃ: ২৬১ হি.)

ইমাম মুসলিম (রহ) কর্তৃক উক্ত হাদীসের ‘ক্বিতাল’ সম্বলিত বর্ণনা ও ‘ক্বিতাল’-এর উল্লেখ ব্যতীত বর্ণনা; সবগুলোকে একসঙ্গে উল্লেখ করা এবং এগুলোকে জিহাদ সংক্রান্ত অন্যান্য হাদীসের সঙ্গে উল্লেখ করা থেকে স্পষ্ট যে, তাঁর দৃষ্টিতে এই ‘ত্বাইফা’ দ্বারা জিহাদি কাফেলা উদ্দেশ্য।

ইবন তাইমিয়া (রহ) (মৃ: ৭২৮ হি.)

إن النبي صلى الله عليه وسلم قد ثبت عنه من وجوه كثيرة أنه قال: لا تزال طائفة من أمتي ظاهرين على الحق، لا يضرهم من خذلهم ولا من خالفهم إلى قيام الساعة، وثبت أنهم بالشام. فهذه الفتنة قد تفرق الناس فيها ثلاث فرق: الطائفة المنصورة وهم المجاهدون لهؤلاء القوم المفسدين……….. (مجموع الفتاوى، 28/416، مجمع الملك فهد

‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বহু সূত্রে প্রমাণিত যে, তিনি বলেছেন, ‘আমার উম্মতের একদল সর্বদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিজয়ী থাকবে। কিয়ামত পর্যন্ত বিরোধীরা ও ব্যর্থকারীরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। এবং এটিও প্রমাণিত যে তাদের অবস্থান শামে হবে। তো এই (তাতারিদের) ফিতনায় মানুষ তিনভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। একটি ‘ত্বাইফা মানসুরা’ তথা সাহয্যপ্রাপ্ত দল। আর তারা হচ্ছে ওই ফাসাদ সৃষ্টিকারী তাতারিদের সঙ্গে জিহাদে লিপ্ত কাফেলা।…’ (মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৮/৪১৬)

أما الطائفة بالشام ومصر ونحوهما، فهم في هذا الوقت المقاتلون عن دين الإسلام، وهم من أحق الناس دخولاً في الطائفة المنصورة التي ذكرها النبي صلى الله عليه وسلم بقوله في الأحاديث الصحيحة المستفيضة عنه: لا تزال طائفة من أمتي ظاهرين على الحق، لا يضرهم من خالفهم ولا من خذلهم حتى تقوم الساعة. مجموع الفتاوى، 28/531)

‘শাম, মিসর ইত্যাদি ভূখণ্ডে অবস্থিত ‘ত্বাইফা’; তারা বর্তমানে দ্বীন ইসলামের পক্ষে সশস্ত্র জিহাদ করছে। ‘ত্বাইফা মানসুরা’র অন্তর্ভুক্ত হওয়ার অধিকারের ক্ষেত্রে তারাই অন্যতম; যে ‘ত্বাইফা’র কথা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সহীহ ‘মাশহুর’ সূত্রে প্রমাণিত। তিনি (সা) বলেন, ‘আমার উম্মতের একদল সর্বদা সত্যের উপর বিজয়ী থাকবে। কিয়ামত পর্যন্ত বিরোধীরা ও ব্যর্থকারীরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না’। (মাজমুউল ফাতাওয়া, ২৮/৫৩১)

আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি (রহ) (মৃ: ১৩৫২ হি.)

 

যারা ‘ত্বাইফা’ দ্বারা অন্যান্য কাফেলা উদ্দেশ্য নিয়েছেন তাদের ব্যাপারে বিস্ময় প্রকাশ করতে গিয়ে আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি (রহ) বলেন,

واختلف في تعيين مصداقه، وكل ادعى بما بدا له. قلت: كيف مع أنه منصوص في الحديث وهم المجاهدون في سبيل الله؟…………..

أي لا يخلو زمان إلا وتوجد فيه تلك الطائفة القائمة على الحق، لا أنهم يكثرون في كل زمان، ولا أنهم يغلبون على من سواهم كما سبق إلى بعض الأفهام، حتى أن غلبة الدين في زمن عيسى عليه الصلاة والسلام عندي ليس كما اشتهر على الألسنة، بل الموعود هو الغلبة حيث يظهر عليه الصلاة والسلام وفيما حواليه.

أما فيما وراء ذلك فلم يتعرض إليه الحديث، والعمومات كلها واردة في البلاد التي يظهر فيها ولا تتجاوز فيما وراءها، وإنما هو من بداهة الوهم والسبق إلى ما اشتهر بين الأنام. (فيض الباري، كتاب العلم، باب من يرد الله به خيراً يفقهه في الدين، 1/253-254، دار الكتب العلمية

‘এই ‘ত্বাইফা’র ‘মিসদাক’ নির্ণয়ে মতানৈক্য হয়েছে। প্রত্যেকে তার কাছে যা স্পষ্ট হয়েছে সেটির দাবি করেছেন। আমার বক্তব্য হচ্ছে, তারা আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদ হওয়ার ব্যাপারে হাদীসে স্পষ্ট বক্তব্য থাকার পর মতানৈক্য হয় কীভাবে?…

অর্থাৎ প্রত্যেক যুগে সত্যের উপর অবিচল ‘ত্বাইফা’ বিদ্যমান থাকবে। এর অর্থ এই নয় যে, তাদের সংখ্যা যুগে যুগে বৃদ্ধি পাবে এবং পৃথিবীর অন্যান্য সকলের উপর তারা বিজয়ী হয়ে থাকবে; যেমনটি কেউ কেউ ধারণা করেন। এমনকি ঈসা আলাইহিস সালামের যুগেও দ্বীন বিজয়ী হওয়ার যে চিত্র মানুষের মুখে মুখে প্রসিদ্ধ আমার দৃষ্টিতে তা নয়।

বরং তাঁর আত্মপ্রকাশ স্থল ও পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের উপর বিজয়ী হওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়া হয়েছে। এর বাইরে অন্যান্য অঞ্চলের ব্যাপারে হাদীসে কিছু বলা হয়নি। ব্যাপক সকল কথাই ওই অঞ্চলগুলোর জন্য যাতে তিনি আত্মপ্রকাশ করবেন, এর বাইরের জন্য তা প্রযোজ্য নয়। পুরো বিশ্বের উপর বিজয়ী হওয়ার বিষয় মানুষের মাঝে প্রসিদ্ধির কারণে প্রাথমিক ধারণা সেদিকেই প্রভাবিত হয়’। (ফায়যুল বারী, ১/২৫৩-২৫৪)

وقد مر في العلم: أن الطائفة التي تبقى ظاهرة على الحق إلى يوم القيامة هي طائفة المجاهدين، حتى ينزل المسيح ابن مريم فيجاهد في سبيل الله. (فيض الباري، كتاب الجهاد، باب الجهاد ماض مع البر والفاجر، 4/176)

‘কিতাবুল ইলমে বলা হয়েছে যে, সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে বিজয়ী হয়ে যে কাফেলা কিয়ামত পর্যন্ত বিদ্যমান থাকবে তা মুজাহিদদের কাফেলা। শেষ পর্যায়ে ঈসা ইবন মারইয়াম (আ) অবতরণ করে আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করবেন’। (ফায়যুল বারী, ৪/১৭৬)

 

‘ত্বাইফা’ দ্বারা জিহাদি কাফেলা উদ্দেশ্য হওয়ার সাধারণ কিছু ‘কারিনা’ লক্ষণ

হাদীসের সকল বর্ণনা ও উলামায়ে কিরাম(রহ) কর্তৃক হাদীসের ব্যাখ্যার আলোকে স্পষ্ট, যে সকল বর্ণনায় ‘ক্বিতাল’-এর প্রসঙ্গ উল্লেখ হয়নি, সে সকল বর্ণনাতেও ‘ত্বাইফা’ বা ‘ত্বাইফা মানসুরা’ দ্বারা উদ্দেশ্য জিহাদি কাফেলা। এটি প্রমাণের জন্য ভিন্ন কিছুর প্রয়োজন নেই। তবুও ‘ক্বিতাল’-এর প্রসঙ্গ ছাড়াই হাদীসের অন্যান্য শব্দের আলোকে সমর্থন হিসেবে কিছু ‘কারিনা’ উল্লেখ করছি;

ক. হাদীসে আলোচ্য ‘ত্বাইফা’র যে বৈশিষ্ট্য বলা হয়েছে যে, বিরোধীদের বিরোধিতা ও নিরাশকারীদের ব্যর্থ করার প্রচেষ্টা তাদের ক্ষতি করতে পারবে না; এ ধরনের বৈশিষ্ট্য আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে মুজাহিদদের জন্য ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন- ” يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لَائِمٍ “ (“আল্লাহর রাস্তায় তারা জিহাদ করবে এবং কোনো ভর্ৎসনাকারীর তিরস্কারকে ভয় করবে না,” -সূরা মায়েদা, আয়াত ৫৪-)।

খ. কোনো কোনো বর্ণনায় শামের উল্লেখ বা শামের দিকে ইঙ্গিত বা সাহাবী (রাযি) কর্তৃক শামের কথা বলা; ‘ত্বাইফা’ দ্বারা জিহাদি কাফেলা উদ্দেশ্য হওয়ার দিককে শক্তিশালী করে। কেননা জিহাদের বিষয়ে শামের বৈশিষ্ট্য সর্বযুগেই স্বীকৃত। জিহাদি কাফেলা সর্বদা তাতে বিদ্যমান এবং দাজ্জালের সঙ্গে সেখানেই এই কাফেলার সর্বশেষ যুদ্ধ হবে। হাদীসে শেষ যুগের যুদ্ধগুলোর ক্ষেত্রে শামকে মূলকেন্দ্র হিসেবে পেশ করা হয়েছে এবং অবস্থানের জন্য সে ভূমিকে নির্বাচন করতে বলা হয়েছে।

এছাড়াও শাম, জিহাদ, ফিতান ও মালহামা বিষয়ক হাদীসগুলো অধ্যয়ন করলে দেখা যাবে, শামের সঙ্গে জিহাদের ও মুজাহিদদের অনেক কিছু জড়িত। কিন্তু আহলে ইলম, আহলে হাদীস ও দ্বীনের অন্যান্য শাখার কাফেলা সর্বদা বিদ্যমানের বিবেচনায় শাম, ইরাক ও হিজাজ; ইত্যাদির বড় ধরনের কোনো বৈশিষ্ট্যের পার্থক্য নেই।

গ. স্বয়ং ‘মানসুর’ শব্দও একটি ‘কারিনা’ লক্ষণ। যদিও যুদ্ধের ময়দানে, যালেমের বিপরীতে ও ফিরাকে বাতিলার মোকাবেলায় দলীলের ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে যে সাহায্য আসে; সকল ক্ষেত্রে ‘নুসরাত’-এই পরিভাষার ব্যবহার ভুলের কিছু নয়।

কিন্তু কুরআন-হাদীসে এ শব্দের ব্যবহার দেখলে দেখা যাবে, তা সাধারণত ব্যবহার হয়েছে জিহাদ ও মুজাহিদের জন্য, কাফিরদের বিপরীতে মুসলমানদের জন্য, যালেমের মোকাবেলায় মাযলুমের জন্য, বিপদ সংকুল মুহূর্তে সাহায্যের জন্য বা আল্লাহর আযাব আসলে সাহায্যকারী পাওয়া যাবে না; এ জাতীয় ক্ষেত্রে। কিন্তু ইলমি বিষয় বা সমালোচকদের মুখ বন্ধ; এ জাতীয় ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে যে সাহায্য-সমর্থন আসে, সেটির জন্য সাধারণত ‘নুসরাত’-এর ব্যবহার দেখা যায় না।

হাঁ! সেক্ষেত্রে “تأييد”, “مؤيد” জাতীয় শব্দ ব্যবহার হয়েছে। যেমন আল্লাহ তাআলা বলছেন,”إِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ اذْكُرْ نِعْمَتِي عَلَيْكَ وَعَلَى وَالِدَتِكَ إِذْ أَيَّدْتُكَ بِرُوحِ الْقُدُسِ تُكَلِّمُ النَّاسَ فِي الْمَهْدِ وَكَهْلًا    (“যখন আল্লাহ বলবেন, হে ঈসা ইবন মারইয়াম! তোমার উপর ও তোমার মায়ের উপর আমার নিয়ামতের কথা স্মরণ করো, যখন আমি তোমাকে সাহায্য করেছিলাম পবিত্র আত্মার (জিবরাইল) মাধ্যমে, তুমি মানুষের সঙ্গে কথা বলতে দোলনায় ও পরিণত বয়সে”, -সূরা মায়েদা, আয়াত ১১০-)।

তেমনিভাবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাসসান ইবন সাবিতকে উদ্দেশ্য করে বলেছিলেন, “إن روح القدس لا يزال يؤيدك ما نافحت عن الله ورسوله” (“পবিত্র আত্মা তথা জিবরাইল তোমাকে সাহায্য করবে যতোক্ষণ তুমি আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের পক্ষ থেকে মোকাবেলা করবে”, -সহীহ মুসলিম, পৃ: ১০৪২, হাদীস নং: ৬৩৯৫-)। এর আলোকেও বলা যায় যে, এটি আহলে ইলম বা আহলে হাদীসের জন্য নয়, বরং জিহাদি কাফেলার জন্য প্রযোজ্য।

এ ‘কারিনা’ লক্ষণগুলোর কথা একান্ত আমার বুঝ ও অধ্যয়নের পরিধির আলোকে বলেছি। এর কোনোটি বাস্তবতা পরিপন্থি হলে তা অবশ্যই গ্রহণযোগ্য নয়। তবে এগুলো ঠিক না হওয়া মূল আলোচনায় বিন্দুমাত্র প্রভাব ফেলবে না।

 

একাধিক ইমাম (রহ) কর্তৃক ‘ত্বাইফা’ থেকে অন্য কাফেলা উদ্দেশ্য নেয়ার পর্যালোচনা

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে আমাদের সামনে স্পষ্ট যে, কিয়ামত পর্যন্ত সত্যের উপর অবিচল থাকা ‘ত্বাইফা’ বা ‘ত্বাইফা মানসুরা’ দ্বারা জিহাদি কাফেলাই উদ্দেশ্য। কিন্তু একাধিক ইমাম (রহ) থেকে এই ‘ত্বাইফা’র ব্যাখ্যায় ভিন্ন কিছু বর্ণিত হয়েছে। আমরা তাঁদের বক্তব্য উল্লেখ করে তা সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা পেশ করবো, ইনশাআল্লাহ।

ইমাম আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রহ) (মৃ: ১৮১ হি.)

ذكر ابن المبارك حديث النبي صلى الله عليه وسلم “لا تزال طائفة من أمتي ظاهرين على الحق، لا يضرهم من ناوأهم حتى تقوم الساعة”، قال ابن المبارك: هم عندي أصحاب الحديث. (شرف أصحاب الحديث للخطيب البغدادي، ص 61، مكتبة ابن تيمية

‘ইবনুল মুবারক (রহ) ‘কিয়ামত পর্যন্ত আমার উম্মতের একদল সর্বদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিজয়ী থাকবে। শত্রুরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না’ হাদীস উল্লেখ করে বলেন, আমার দৃষ্টিতে তারা ‘আসহাবুল হাদীস’। (শারাফু আসহাবিল হাদীস, পৃ: ৬১)

ইমাম ইয়াযিদ ইবন হারুন (রহ) (মৃ: ২০৬ হি.)

عن عمران بن حصين قال قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: لا تزال طائفة من أمتي ظاهرين على الحق حتى تقوم الساعة، قال يزيد بن هارون: إن لم يكونوا أصحاب الحديث فلا أدري من هم. (المحدث الفاصل للرامهرمزي، ص 177-178، دار الفكر، شرف أصحاب الحديث، ص 59، الحجة في بيان المحجة لأبي القاسم الأصبهاني، 1/247، دار الراية

‘ইমরান ইবন হুসাইন (রাযি) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘কিয়ামত পর্যন্ত আমার উম্মতের একদল সর্বদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিজয়ী থাকবে’। ইয়াযিদ ইবন হারুন (রহ) বলেন, যদি তারা ‘আসহাবুল হাদীস’ না হয় তাহলে আমি জানি না তারা কারা’। (আলমুহাদ্দিসুল ফাসেল, পৃ: ১৭৭-১৭৮, শারাফু আসাহাবিল হাদীস, পৃ: ৫৯, আলহুজ্জাহ ফি বায়ানিল মাহাজ্জাহ, ১/২৪৭)

ইমাম আলী ইবনুল মাদিনি (রহ) (মৃ: ২৩৪ হি.)

عن قرة المزني قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: ….، لا تزال طائفة من أمتي منصورين، لا يضرهم من خذلهم حتى تقوم الساعة، قال محمد بن إسماعيل: قال علي بن المديني: هم أصحاب الحديث. (جامع الترمذي، كتاب الفتن، باب ماجاء في الشام، ص 821، رقم الحديث: 2337، شرف أصحاب الحديث، ص 62

‘কুররা আলমুযানি (রাযি) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘… কিয়ামত পর্যন্ত আমার উম্মতের একদল সর্বদা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। ব্যর্থকারীরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না’। মুহাম্মাদ ইবন ইসমাইল বুখারী (রহ) বলেন, আলী ইবনুল মাদিনি (রহ) বলেছেন, তারা ‘আসহাবুল হাদীস’। (জামে তিরমিযি, পৃ: ৮২১, হাদীস নং: ২৩৩৭, শারাফু আসহাবিল হাদীস, পৃ: ৬২)

ইমাম আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ) (মৃ: ২৪১ হি.)

عن موسى بن هارون قال: سمعت أحمد بن حنبل يقول وسئل عن معنى هذا الحديث (لا يزال ناس من أمتي منصورين، لا يضرهم من خذلهم حتى تقوم الساعة)، فقال: إن لم تكن هذه الطائفة المنصورة أصحاب الحديث فلا أدري من هم. (معرفة علوم الحديث للحاكم، ص 2، دار الكتب العلمية

‘মুসা ইবন হারুন (রহ) বলেন, আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ) কে এই (কিয়ামত পর্যন্ত আমার উম্মতের একদল সর্বদা সাহায্যপ্রাপ্ত হবে। ব্যর্থকারীরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না) হাদীসের উদ্দেশ্য সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি বলেন, এই ‘ত্বাইফা মানসুরা’ যদি ‘আসহাবুল হাদীস’ না হয় তাহলে আমি জানি না তারা কারা। (মা‘রিফাতু উলুমিল হাদীস, পৃ: ২)

وعن الفضل بن زياد قال: سمعت أحمد ابن حنبل وذكر حديث “لا تزال طائفة من أمتي ظاهرين على الحق”، فقال: إن لم يكونوا أصحاب الحديث فلا أدري من هم. (شرف أصحاب الحديث، ص 61)

‘ফযল ইবন যিয়াদ (রহ) বলেন, আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ) ‘আমার উম্মতের একদল সর্বদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিজয়ী থাকবে’ হাদীস উল্লেখ করে বলেন, যদি তারা ‘আসহাবুল হাদীস’ না হয় তাহলে আমি জানি না তারা কারা’। (শারাফু আসহাবিল হাদীস, পৃ: ৬১)

ইমাম আহমাদ ইবন সিনান (রহ)(মৃ: ২৫৮ হি.)

عن أبي حاتم قال: سمعت أحمد ابن سنان وذكر حديث “لا تزال طائفة من أمتي على الحق”، فقال: هم أهل العلم وأصحاب الآثار. (شرف أصحاب الحديث، ص 62، الحجة في بيان المحجة، 1/246)

‘আবু হাতিম (রহ) বলেন, আহমাদ ইবন সিনান (রহ) ‘আমার উম্মতের একদল সর্বদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে’ হাদীস উল্লেখ করে বলেন, তারা আহলে ইলম ও ‘আসহাবুল আসার’ তথা ‘আসহাবুল হাদীস’। (শারাফু আসহাবিল হাদীস, পৃ: ৬২, আলহুজ্জাহ, ১/২৪৬)

ইমাম বুখারী (রহ) (মৃ: ২৫৬ হি.)

عن إسحاق ابن أحمد قال: حدثنا محمد بن إسماعيل البخاري وذكر حديث موسى بن عقبة عن أبي الزبير عن جابر عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: “لا تزال طائفة من أمتي”، فقال البخاري: يعني أصحاب الحديث. (شرف أصحاب الحديث، ص 62، الحجة في بيان المحجة، 1/246)

‘ইসহাক ইবন আহমাদ (রহ) বলেন, মুহাম্মাদ ইবন ইসমাইল বুখারী (রহ) জাবির (রা)-এর সূত্রে বর্ণিত ‘আমার উম্মতের একদল’ হাদীস বর্ণনা করার পর বলেন, অর্থাৎ ‘আসহাবুল হাদীস’। (শারাফু আসহাবিল হাদীস, পৃ: ৬২, আলহুজ্জাহ, ১/২৪৬)

 

উল্লিখিত মতামতের পর্যালোচনা

সকল ইমাম (রহ)-এর বক্তব্যের মূলপাঠের আলোকে আমাদের সামনে স্পষ্ট; যেমনটি আমরা পূর্বেও বলেছি যে, ইমাম বুখারী (রহ) ব্যতীত কারো থেকে ‘ক্বিতাল’ সম্বলিত বর্ণনার ব্যাখ্যায় ‘আসহাবুল হাদীস’ উদ্দেশ্য হওয়ার কথা বর্ণিত হয়নি।

হাঁ! ইমাম ইয়াযিদ ইবন হারুন (রহ)-এর বক্তব্য ‘শারাফু আসহাবিল হাদীস’ কিতাবে যদিও ইমরান ইবন হুসাইনের (রাযি) ‘ক্বিতাল’ সম্বলিত বর্ণনার অধীনে উল্লেখ হয়েছে, কিন্তু আমরা যে ‘আলমুহাদ্দিসুল ফাসেল’ থেকে মূলপাঠ উল্লেখ করেছি, তাতে ‘ক্বিতাল’-এর প্রসঙ্গ নেই। আর ইমরান ইবন হুসাইন (রাযি) থেকে হাদীস দু’ভাবেই বর্ণিত হয়েছে।

যা হোক, এটি স্পষ্ট যে, একাধিক ইমাম (রহ) ‘ত্বাইফা মানসুরা’র ‘মিসদাক’ হিসেবে মুহাদ্দিসিনে কিরামকে নির্ণয় করেছেন। কিন্তু সকল ‘রিওয়ায়াত’ বর্ণনা ও উলামায়ে কিরাম (রহ)-এর বক্তব্যের আলোকে তাঁদের মতামতের বাহ্যতকে যথাযথ বলা মুশকিল।

কেননা, ‘আসহাবুল হাদীস’ থেকে যদি হাদীসের অনুসারী উদ্দেশ্য হয়; যদিও তাঁদের ভাষ্য এটিকে সমর্থন করে না, তাহলে সকল মুসলমান বা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআতের সকল অনুসারী এটির অন্তর্ভুক্ত হবে। কিন্তু হাদীসের মূল দাবিই তখন বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কেননা হাদীসের ভাষ্য ও বর্ণনাধারা থেকে স্পষ্ট যে, বিশেষ একটি দলের বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হচ্ছে।(৩)

আর যদি ‘আসহাবুল হাদীস’ বলে শাস্ত্রীয় বিবেচনায় মুহাদ্দিসিনে কিরামকে উদ্দেশ্য নিয়ে থাকেন; এবং এটিই তাদের ভাষ্যের দাবি, তাহলে এই দাবিকে যৌক্তিক বলা মুশকিল। অন্যথায় এক্ষেত্রে ‘আসহাবুল হাদীস’ ও ‘আসহাবুল ফিক্বহ’ এবং দ্বীনের অন্যান্য শাখার জামাআতের মাঝে কী পার্থক্য? শাস্ত্রীয় বিবেচনায় একেক কাফেলার একেক ‘মাশগালা’ থাকে।

কিন্তু দলীলের মাধ্যমে ফিরাকে বাতিলার মোকাবেলা করা, বিদআতকে কঠোরভাবে দমন করা, ‘আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার’-এর কাজ করা; ইত্যাদির বিবেচনায় শাস্ত্রীয় বিশেষ কাফেলার কোনো বৈশিষ্ট্য নেই। এমন তো নয় যে, এ কাজগুলো শুধু মুহাদ্দিসিনে কিরাম সবমসয় করেছেন, ফুকাহায়ে কিরাম বা দ্বীনের অন্যান্য জামাআতের লোকেরা তা করেননি। তাহলে ‘আসহাবুল হাদীস’কে নির্দিষ্ট করার কী যৌক্তিকতা আছে?

বাস্তবতা আমরা পূর্বেই স্পষ্ট করেছি যে, ওই ‘ত্বাইফা’র পরিচয়ে ‘ক্বিতাল’-এর প্রসঙ্গ থাকায় জিহাদি কাফেলা ব্যতীত অন্য কোনো জামাআত উদ্দেশ্য নেয়ার যৌক্তিকতা নেই। আবার এ সকল মহান ব্যক্তিত্বের ব্যাপারে এ ধারণা করা যায় না যে, তাদের সামনে ‘ক্বিতাল’ সম্বলিত বর্ণনা ছিল না।

তাই তাঁদের বক্তব্যের ব্যাখ্যা হয়তো সেভাবে করা হবে যেমনটি আমরা ইমাম বুখারী (রহ)-এর বক্তব্যের ব্যাখ্যায় বলেছি। অথবা কাযী ইয়ায (রহ)-এর ভাষ্যমতে ‘আসহাবুল হাদীস’ দ্বারা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত উদ্দেশ্য নিয়ে আল্লামা আনওয়ার শাহ কাশ্মিরি (রহ)-এর ন্যায় ব্যাখ্যা করতে হবে। কাযী ইয়ায (রহ) (মৃ: ৫৪৪ হি.) বলেন,

وقد قال أحمد بن حنبل فى هذه الطائفة: إن لم يكونوا أهل الحديث فلا أدرى من هم. وإنما أراد أهل السنة والجماعة ومن يعتقد مذهب أهل الحديث. (إكمال المعلم، كتاب الإمارة، باب قوله صلى الله عليه وسلم: لا تزال طائفة من أمتي… 6/350، دار الوفاء

‘আহমাদ ইবন হাম্বল (রহ) এই ‘ত্বাইফা’র ব্যাপারে বলেন, ‘যদি তারা আহলে হাদীস না হয়, তাহলে আমি জানি না তারা কারা’। তিনি আহলে হাদীস বলে মূলত আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত ও যারা মুহাদ্দিসগণের মাযহাবে বিশ্বাসী তাদেরকে উদ্দেশ্য নিয়েছেন’। (ইকমালুল মু‘লিম, ৬/৩৫০)

ইমাম আহমাদ (রহ)-এর শব্দ হচ্ছে, ‘আসহাবুল হাদীস’ বা ‘আহলে হাদীস’। কিন্তু আল্লামা কাশ্মিরি (রহ) ইমাম আহমাদ (রহ)-এর উদ্ধৃতিতে ‘আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত’ শব্দ উল্লেখ করে সে অনুযায়ী ব্যাখ্যা করেছেন। আমাদের উদ্দেশ্য আল্লামা কাশ্মিরি (রহ)-এর ব্যাখ্যাটি। তিনি বলেন,

واختلف في تعيين مصداقه، وكل ادعى بما بدا له. قلت: كيف مع أنه منصوص في الحديث وهم المجاهدون في سبيل الله؟ ثم رأيت عن أحمد رحمه الله أن تلك الطائفة إن لم تكن من أهل السنة والجماعة فلا أدري من هي؟ ولم أكن أفهم مراده، لأنك قد علمت أنها المجاهدون بنص الحديث،

ولا يمكن عنه الغفلة لمثل أحمد رحمه الله، فكيف قال إنها أهل السنة والجماعة؟ ثم بدا لي مراده، وهو أن المجاهدين ليسوا إلا من أهل السنة، فعلمت أنه عينهم من تلقاء جهادهم لا من جهة عقائدهم، ويشهد له التاريخ، فإنه لم يوفق للجهاد أحد غير تلك الطائفة. وأكثر تخريب السلطنة الإسلامية كان على أيدي الروافض خذلهم الله ولعنهم. فيض الباري، 1/253-254))

‘এই ‘ত্বাইফা’র ‘মিসদাক’ নির্ণয়ে মতানৈক্য হয়েছে। প্রত্যেকে তার কাছে যা স্পষ্ট হয়েছে সেটির দাবি করেছেন। আমার বক্তব্য হচ্ছে, তারা আল্লাহর রাস্তার মুজাহিদ হওয়ার ব্যাপারে হাদীসে স্পষ্ট বক্তব্য থাকার পর মতানৈক্য হয় কীভাবে? অতঃপর আমি ইমাম আহমাদ (রহ)-এর বক্তব্য দেখলাম যে, ‘এই ‘ত্বাইফা’ যদি আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত না হয় তাহলে আমি জানি না তারা কারা’।

আমি তাঁর কথার মর্মার্থ বুঝতে ছিলাম না। কেননা তারা মুজাহিদের কাফেলা হওয়া তো হাদীসেই স্পষ্ট আছে। আর ইমাম আহমাদ (রহ)-এর মতো ব্যক্তিত্বের তা অজানা থাকার কথা নয়। তাহলে কীভাবে তিনি বললেন যে, তারা আহলে সুন্নাহ ওয়াল জামাআত? অতঃপর তাঁর উদ্দেশ্য আমার সামনে স্পষ্ট হলো যে, মুজাহিদগণ আহলে সুন্নাতেরই। তাই আমি নিশ্চিত হলাম, তিনি আকিদার বিবেচনায় নয়, বরং জিহাদের বিবেচনায় আহলে সুন্নাহকে নির্দিষ্ট করেছেন।

আর ইতিহাসও এ বিষয়ের সাক্ষ্য দেয়। কেননা আহলে সুন্নাহ ব্যতীত অন্য কোনো দলের জিহাদের তাওফীক হয়নি। অধিকাংশ ইসলামী রাষ্ট্রের পতন রাফেযিদের দ্বারা সম্পন্ন হয়েছে। আল্লাহ তাআলা তাদের অপদস্থ ও অভিসম্পাত করুন’। (ফায়যুল বারী, ১/২৫৩-২৫৪)

মোটকথা, হাদীসে বর্ণিত ‘ত্বাইফা’ বা ‘ত্বাইফা মানসুরা’ দ্বারা জিহাদি কাফেলাই উদ্দেশ্য। সকল বর্ণনার আলোকে অন্য কোনো কাফেলা উদ্দেশ্য নেয়ার সুযোগও নেই এবং যৌক্তিকতাও নেই। আবার সকল কাফেলার মাঝে ব্যাপক করে দেয়াও হাদীসের বর্ণনাধারা ও স্বভাবজাত দাবির বিপরীত। তাই কিয়ামত পর্যন্ত সর্বকালে সহীহ মানহাজের জিহাদি কাফেলার অবিচ্ছিন্ন অস্তিত্ব প্রমাণিত এবং ‘ত্বাইফা মানসুরা’র ‘মিসদাক’ প্রতিপাদ্য জিহাদি কাফেলা হওয়াও স্পষ্ট।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে ঠিক কথা বলা ও বুঝা এবং সবধরনের প্রান্তিকতা থেকে বেঁচে থাকার তাওফীক দান করুন। আ-মীন।

 

 

আবু উমারা হাসসান আলহানাফি

২২-৭-১৪৪৩ হি.

 

 

১. দ্বিতীয় মতের অসারতার কথা সামনে আসছে।

২. ফিতনার সময় মুসলমানের দুর্গ হওয়া ও ইলমে হাদিস ইত্যাদির ক্ষেত্রে শামের বৈশিষ্ট্যের বিষয়টি স্পষ্ট করতে গিয়ে হাফেয ইবনে কাসির (মৃ: ৭৭৪ হি.) বলেন,

لا تزال طائفة من أمتي ظاهرين على الحق لا يضرهم من خذلهم ولا من خالفهم، حتى يأتي أمر الله وهم كذلك”، وفي صحيح البخاري: “وهم بالشام”. وقد قال كثير من علماء السلف: إنهم أهل الحديث. وهذا أيضاً من دلائل النبوة، فإن أهل الحديث بالشام اليوم أكثر من سائر أقاليم الإسلام، ولله الحمد، ولا سيما بمدينة دمشق، حماها الله وصانها، كما ورد في الحديث الذي سنذكره أنها تكون معقل المسلمين عند وقوع الفتن. (البداية والنهاية، ৬/২৪৭، دار الحديث

‘আমার উম্মতের একদল সর্বদা সত্যের উপর প্রতিষ্ঠিত হয়ে বিজয়ী থাকবে। বিরোধীরা ও ব্যর্থকারীরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না এবং আল্লাহর নির্দেশ (কিয়ামত) আসা পর্যন্ত তারা এ অবস্থার উপরই থাকবে’। সহিহ বুখারিতে আছে, ‘তাদের অবস্থান শামে হবে’। সালাফের অনেক আলেম বলেছেন, তারা আহলে হাদিস। এটিও একটি নুবুওয়াতের দলিল। কেননা, আলহামদুলিল্লাহ ইসলামের সকল ভূখণ্ডের তুলনায় শামেই মুহাদ্দিসিনে কেরামের সংখ্যা বেশি। বিশেষকরে ‘দিমাশক’ অঞ্চল -আল্লাহ তাআলা সেটিকে নিরাপদে রাখুন-। তেমনিভাবে হাদিসে উল্লেখ হয়েছে যে, ফিতনার সময় তা মুসলমানের দুর্গ হবে’। (আলবিদায়া ওয়াননিহায়া, ৬/২৪৭)

৩. এর আলোকে ইমাম নববি (মৃ: ৬৭৬ হি.) যে আলোচ্য হাদিস মুমিনদের সকল জামাআতের জন্য ব্যাপক হওয়ার সম্ভাবনা দেখিয়েছেন, সেটি যথাযথ না হওয়া স্পষ্ট। ইমাম নববি বলেন,

قلت: ويحتمل أن هذه الطائفة مفرقة بين أنواع المؤمنين، منهم شجعان مقاتلون، ومنهم فقهاء، ومنهم محدثون، ومنهم زهاد وآمرون بالمعروف وناهون عن المنكر، ومنهم أهل أنواع أخرى من الخير. ولا يلزم أن يكونوا مجتمعين، بل قد يكونون متفرقين في أقطار الأرض. المنهاج -شرح النووي-، كتاب الإمارة، باب قوله صلى الله عليه وسلم: لا تزال طائفة من أمتي…، 6/397، مؤسسة الرسالة ناشرون

‘আমার বক্তব্য হচ্ছে, এই ‘তায়েফা’ মুমিনদের বিভিন্ন ভাগে বিভক্তও হতে পারে। তাদের মধ্যে রয়েছে বীর যোদ্ধা, ফকিহ, মুহাদ্দিস, দুনিয়াবিমুখ ও সৎ কাজের আদেশ দাতা ও অসৎ কাজ থেকে বারণকারী এবং ভালো কাজের অন্যান্য জামাআত। এবং তারা একস্থানে হওয়া আবশ্যক নয়, বরং কখনো তারা ভূপৃষ্ঠের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকবে’। (শরহে নববি, ৬/৩৯৭)

আরো পড়ুনঃ ভারত উপমহাদেশের শাসকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা মুসলমানদের উপর কেন ওয়াজিব?