উলামা-মাশায়েখ, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুফতি আবু আসেম নাবিল হাফিযাহুল্লাহ

শবে বরাত : সুন্নাত নাকি বিদআত – মুফতি আবু আসেম নাবিল হাফিযাহুল্লাহ

শবে বরাত : সুন্নাত নাকি বিদআত

মুফতি আবু আসেম নাবিল হাফিযাহুল্লাহ

 

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহীম

الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على خاتم النبيين، وعلى آله وصحبه أجمعين، و من تبعهم بإحسان إلى يوم الدين

মুসলিম সমাজে বিতর্কবহুল বিষয়সমূহের মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় হল, শবে বরাত। এটি কি সুন্নত? না বিদআত? কেউ বলেন সুন্নত, কেউ বলেন বিদআত। এখানে বিতর্কটা কয়েকটা বিষয়কে ঘিরে আবর্তিত হতে দেখা যায়।
ক) শবে বরাত কি ভাগ্য রজনী নাকি মুক্তির রজনী? অথবা এ রাতকে কী নামে নামকরণ করা উচিত?
খ) শবে বরাতের অস্তিত্বের ব্যাপারে কোনো সহীহ হাদীস আছে কি না?
গ) এ রাতে ঘুমিয়ে থাকলেও কি মাগফিরাত পাওয়া যাবে?
ঘ) শবে বরাতের বিষয়ে ইমামগণের মতামত।
ঙ) শবে বরাতকে কেন্দ্র করে বিশেষ নামাজের প্রথা।
আমরা সবগুলো বিষয়কে দালিলিক বিশ্লেষণ করে সঠিক মতটা পাঠকের সামনে তুলে ধরার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

ক) শবে বরাত কি ভাগ্য রজনী নাকি মুক্তির রজনী। অথবা এ রাতকে কী নামে নামকরণ করা উচিত?
ভারত উপমহাদেশে সাধারণ মানুষের মাঝে এ রাত ভাগ্য রজনী হিসেবেই অধিক প্রচলিত। ভারতে এক সময় ফারসি ভাষারই আধিপত্য ছিল। তাই ইসলামের অনেক শব্দই এ অঞ্চলে ফার্সি ভাষায় ব্যবহার হয়। যেমন; নামায, রোযা, শবে কদর ইত্যাদি। সে হিসেবে এ রজনীকে ফার্সিতে বলা হয় শবে বরাত। শব অর্থ রাত আর বরাত অর্থ অংশ, ফরমান, নির্দেশনামা ইত্যাদি। দুটোই ফার্সি শব্দ। যেহেতু এ অঞ্চলের মুসলমানদের ধারণামতে এই রাতে প্রত্যেক ব্যক্তির জীবনের হিসাব ও জীবিকার বণ্টন হয়, তাই তারা একে শবে বরাত নামে আখ্যায়িত করে থাকে। -ফিরুযুল লুগাত পৃ.১৬৫, ৬৩৯

তবে ভারত উপমহাদেশ বা পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের মুহাক্কিক আলেমগণ অর্ধ-শাবানের রাতকে লায়লাতুল বারাআত (ليلة البراءة) বা মুক্তির রজনী বলেন। যেহেতু কোনো কোনো হাদীসে এ রাতে ব্যাপক মাগফিরাত ও পাপের অশুভ পরিণাম থেকে রেহাই পাওয়ার ঘোষণা এসেছে, তাই তাঁরা অনেক আগে থেকে এ রাতকে ‘শবে বারাআত বা মুক্তির রজনী’ শব্দে ব্যক্ত করেন। এটা এ নামে প্রসিদ্ধ হয়ে যায়।

অনেকে ‘শবে বরাতে’র অর্থ ‘ভাগ্য রজনী’ না নিয়ে শব্দটিকে ‘মুক্তির রজনী’ অর্থে ব্যবহার করাকে নবোদ্ভাবিত ব্যবহার বলে নিন্দা করতে চান। তাই এটা যে এদেশে নতুন নয় বরং প্রাচীনকাল থেকে এর যে ব্যবহার ছিলো, তার কিছু উদাহরণ দেয়া হলো-
যাদের কিতাবে ‘শবে বারাআত’ বা মুক্তির রজনী শব্দের ব্যবহার ব্যবহার পাওয়া যায়-

১. আল্লামা তাহের পাটনী ( ৯৮৬ হি.) বলেন,

وقال ابن دحية : أحاديث صلاة البراءة موضوعة.

ইবনে দিহয়া বলেন, শবে বরাতের (নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে) নামাজ-সংক্রান্ত সবগুলো হাদীস মাউযু (জাল)। -তাযকিরাতুল মাউযুআত পৃ. ৪৫-৪৬

২. মোল্লা আলী ক্বারী (১০১৪হি.)। আব্দুল হাই লাখনভী (রহ.) বলেন,

وقال علي القاري في رسالة له ألفها في ليلة القدر وليلة البراءة

মোল্লা আলী ক্বারী (রহ.) তার ‘লাইলাতুল ক্বদর ও লাইলাতুল বারাআত’ নামক রিসালায় বলেন। -আলআসারুল মারফুআ, পৃ.১৫৫

৩. আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. (১৩৫২ হি.) বলেন,

وصح الروايات في فضل ليلة البراءة

লায়লাতুল বারাআতের ফযিলত সম্পর্কে বিভিন্ন সহীহ হাদীস রয়েছে। -আলআরফুশ শাযী (সুনানে তিরমিযির টীকা) ১/১৫২

সম্ভবত ইবনে দিহয়ার কথাকে আল্লামা তাহের পাটনী নিজের দেশের প্রচলিত শব্দে প্রকাশ করেছেন। তবে মুসলিম বিশ্বের অন্যান্য এলাকার আলেমগণ এ রাতকে ‘লায়লাতুন নিসফি মিন শাবান’ (শাবানের মধ্যরজনী) শব্দে উল্লেখ করেন। আর এটাই হাদীসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ সম্মত।
এ রাতকে ভাগ্য রজনী বলা যাবে কিনা?
এ রাতকে ভাগ্য রজনী বলা কোনো ভাবেই সঠিক নয়। যারা ভাগ্য রজনী বলেন, তারা দলিল হিসেবে সূরা দুখানের তৃতীয় আয়াত পেশ করেন। কিন্তু সেটা সঠিক নয়। কারণ, সেখানে আল্লাহ তাআলা বলেন,

 حم (1) وَالْكِتَابِ الْمُبِينِ (2) إِنَّا أَنزلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرِينَ (3) فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ (4) أَمْرًا مِنْ عِنْدِنَا إِنَّا كُنَّا مُرْسِلِينَ
আল্লাহ তাআলা বলেন: ‘হা-মীম। শপথ কিতাবের, যা (সত্যের) সুস্পষ্টকারী। আমি এটা নাযিল করেছি এক বরকতপূর্ণ রাতে। (কেননা) আমি মানুষকে সকর্ত করার ছিলাম। এ রাতেই প্রতিটি প্রজ্ঞাজনোচিত বিষয় আমার নির্দেশে স্থির করা হয়। (তাছাড়া) আমি (এক) রাসূল পাঠাবার ছিলাম।’ -সূরা দুখান (৪৪) : ১-৫)

ইবনে কাসীর (রহ.) সূরা দুখানের শুরুতে নিম্নলিখিত আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন,
মহান আল্লাহ তাআলা নিজেই কুরআনুল কারীম সম্পর্কে বলেছেন যে, তিনি তা বরকতময় রাতে অবতীর্ণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,

  إِنَّا أَنزلْنَاهُ فِي لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ
‘আমি তা বরকতময় রজনীতে অবতীর্ণ করেছি।’ -সূরা দুখান (৪৪) : ৩

আর সেটা হলো কদরের রাত। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,

  إِنَّا أَنزلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ
নিশ্চয়ই আমি তা (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি কদরের রাতে।’ -সূরা কদর (৯৭) : ১

কদরের রাতটি ছিল রমযান মাসে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

 شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزلَ فِيهِ الْقُرْآن
‘রমযান মাসই হলো সেই মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে।’ -সূরা বাক্বারা (২) : ১৮৫

পবিত্র কুরআন দুনিয়ার আকাশে বায়তুল ইয্যাত নামক স্থানে একবারে অবতীর্ণ হয়। আর এটা ছিল রমযান মাসের কদরের রাতে। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর উপরে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে পৃথক পৃথকভাবে (কুরআন) নাযিল করা হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,

 وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَوْلا نزلَ عَلَيْهِ الْقُرْآنُ جُمْلَةً وَاحِدَةً كَذَلِكَ لِنُثَبِّتَ بِهِ فُؤَادَكَ وَرَتَّلْنَاهُ تَرْتِيلا * وَلا يَأْتُونَكَ بِمَثَلٍ إِلا جِئْنَاكَ بِالْحَقِّ وَأَحْسَنَ تَفْسِيرًا
‘কাফিররা বলে, তাঁর প্রতি সমগ্র কুরআন একদফায় অবতীর্ণ হল না কেন? আমি এমনিভাবে অবতীর্ণ করেছি এবং ক্রমে ক্রমে আবৃত্তি করেছি আপনার অন্তকরণকে মজবুত করার জন্যে। তারা আপনার কাছে কোনো সমস্যা উপস্থাপিত করলেই আমি আপনাকে তার সঠিক ও সুন্দর ব্যাখ্যা দান করি।’ -সূরা ফুরকান (২৫) : ৩২-৩৩

এরপর ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন, যে বলে, ‘সেই (বরকতময়) রাত হলো, শা’বান মাসের মধ্য রজনী (যেমনটি ইকরিমা (রাযি.) থেকে বর্ণিত হয়েছে), তাহলে সেটা তো অনেক দূরবর্তী আশা। অথচ সরাসরি কুরআনের শব্দ দ্বারা প্রমাণিত যে, সেটা ছিল রমযান মাস।

 فِيهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍ حَكِيمٍ
(এ রাতেই প্রতিটি প্রজ্ঞাজনোচিত বিষয় আমার নির্দেশে স্থির করা হয়। -সূরা দুখান (৪৪) : ৪)

উক্ত আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে কাসীর (রহ.) বলেন,

في ليلة القدر يفصل من اللوح المحفوظ إلى الكتبة أمر السنة، وما يكون فيها من الآجال والأرزاق، وما يكون فيها إلى آخرها. وهكذا روي عن ابن عمر، وأبي مالك، ومجاهد، والضحاك، وغير واحد من السلف.

কদরের রাতে সৃষ্টি সম্পর্কিত এক বছরের সকল গুরুত্বপূর্ণ ফায়সালা লওহে মাহফুয থেকে সংশ্লিষ্ট ফেরেশতাগণের কাছে অর্পণ করা হয়। যাতে লেখা থাকে, এ বছর কারা জন্ম গ্রহণ করবে, কে কে মারা যাবে এবং এ বছর কি পরিমাণ রিযিক দেয়া হবে। যা পরবর্তী শবে কদর পর্যন্ত এক বছরে সংঘটিত হবে। অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে ইবনে ওমর (রাযি.), আবু মালেক, মুজাহিদ, যহ্হাক এবং আরো অন্যান্য সালাফে সালিহীনদের থেকে। -তাফসীরে ইবনে কাসীর ১/৪৬০-৪৬১; ৭/২৪৫-২৪৬
ইবনে রজব হাম্বলী (৭৯৫ হি.) বলেন,

و قد روي عن عكرمة و غيره من المفسرين في قوله تعالى : ﴿ فيها يفرق كل أمر حكيم ﴾ أنها ليلة النصف من شعبان و الجمهور على أنها ليلة القدر و هو الصحيح.

ইকরিমাসহ অন্যান্য মুফাস্সির থেকে বর্ণিত, আল্লাহ তাআলার বাণী:  فيها يفرق كل أمر حكيم
(এ রাতে প্রত্যেক প্রজ্ঞাপূর্ণ বিষয় স্থিরকৃত হয়। -সূরা দুখান (৪৪) : ৪) তাদের মতে এ রাত দ্বারা শাবান মাসের মধ্য রজনী উদ্দেশ্য। তবে অধিকাংশ ইমামগণ এর দ্বারা লাইলাতুল ক্বদর উদ্দেশ্য নিয়েছেন। ইবনে রজব বলেন, ‘আর এটাই সহীহ মত।’ -লাতাইফুল মাআরিফ পৃ. ১৯৪

উপরিউক্ত নাতিদীর্ঘ আলোচনার আলোকে প্রতীয়মান হলো, শাবান মাসের মধ্য রজনীকে ভাগ্য রজনী বলা দলিলসম্মত নয়।

খ) শবে বরাতের ব্যাপারে কোনো সহীহ হাদীস আছে কি না?
এখানে শবে বরাত বা লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান (পনের শাবানের রাত) বিষয়ক কিছু হাদীস হুকুমসহ সবিস্তারে উল্লেখ করা হল।
১ম হাদীস-

عَنِ الْأَوْزَاعِيِّ، وَابْنِ ثَوْبَانَ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ مَكْحُولٍ، عَنْ مَالِكِ بْنِ يُخَامِرَ عَنْ مُعَاذِ بْنِ جَبَلٍ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: يَطْلُعُ اللَّهُ إِلَى خَلْقِهِ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِجَمِيعِ خَلْقِهِ إِلَّا لِمُشْرِكٍ أَوْ مُشَاحِنٍ

মুআয ইবনে জাবাল বলেন, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন, আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে (শাবানের চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাতে) সৃষ্টির দিকে (রহমতের) দৃষ্টি দেন এবং মুশরিক ও বিদ্বেষ পোষণকারী ব্যতীত সবাইকে ক্ষমা করে দেন। -সহীহ ইবনে হিব্বান ১৩/৪৮১, হাদীস ৫৬৬৫; শুআবুল ঈমান, ইমাম বাইহাকী ৩/৩৮২, হাদীস ৩৮৩৩

মুআয (রাযি.) থেকে বর্ণিত হাদীসটির সনদ বা সূত্র বিষয়ক একটি পর্যালোচনা
এই সনদে রাবি মাকহুল (মৃত্যু: ১১২ হিজরী) হাদীসটি বর্ণনা করেছেন মালিক বিন য়ুখামির (মৃত্যু: ৭০ হিজরী) থেকে। হাফেয যাহাবী তাঁর “সিয়ারে আ’লামিন নুবালা” কিতাবে মাকহুলের জীবনীতে বলেন,

مكحول …. وروى أيضا عن طائفة من قدماء التابعين، ما أحسبه لقيهم، كأبي مسلم الخولاني، ومسروق، ومالك بن يخامر.

“মাকহুল মালিক বিন য়ুখামির সহ বেশ কয়েকজন তাবেঈ থেকেও হাদীস বর্ণনা করেছেন। তবে আমার ধারণা, তিনি হয়ত তাঁদের সাক্ষাত পাননি।” -সিয়ারে আ’লামিন নুবালা ৫/১৫৬
প্রসঙ্গত, এই কথাটি যাহাবী শুধু “সিয়ারে আ’লামিন নুবালা” কিতাবেই বলেছেন। এ ছাড়া অন্য কোনো কিতাবে বলেননি। এ ধরনের কথা তাঁর পূর্ববর্তীদের কেউ বলেননি। ইবনে তুরকুমানি ও ইবনে হাজারও তাঁদের কিতাবে এ বিষয় কোনো মন্তব্য করেননি। -দ্রষ্টব্য : তাযকিরাতুল হুফফায ১/৮২, রাবি ৯৬; মিযানুল ই’দিতাল ৪/১৭৭, রাবি ৮৭৪৯; কাশেফ ৪/৩৩৯, রাবি ৫৬২০; এবং তাহযীবুত তাহযীব ১০/৪০৩, রাবি ৮১০৫; ইকমাল ৬/৩৫৬, রাবি ৪৯০০
হাফেয মিযযী “তাহযীবুল কামাল” কিতাবে মাকহুলের জীবনীতে মাকহুলের উস্তাযের তালিকায় মালিক বিন য়ুখামির এর নাম এনেছেন। তবে তাদের মাঝে সাক্ষাত প্রমাণিত আছে কি না, এ ব্যাপারে কিছুই বলেননি। -তাহযীবুল কামাল ৭/২১৬, রাবি ৬৭৬৩

কিন্তু পরবর্তীদের মধ্যে শায়েখ আলবানী ও শায়েখ শুআঈব আরনাউত তাদের কিতাবে যাহাবির উদ্ধৃতি দিয়ে বলেছেন, মাকহুল ও মালিক বিন য়ুখামির এর মাঝে সাক্ষাৎ প্রমাণিত নেই। কাজেই এখানে ইনকিতা বা বিচ্ছিন্নতা আছে। তবে তারা হাদীসটিকে যঈফ বলেন না; বরং মুতাবি ও শাওয়াহেদ (সমার্থক বর্ণনা) এর ভিত্তিতে হাদীসটিকে সহীহ বলেন। -সিলসিলা সহীহাহ ৪/১৩৫, হাদীস ১১৪৪; শুআইব আরনাউত তাহকীককৃত সহীহ ইবনে হিব্বানের টিকা দ্রষ্টব্য ১২/৪৮১, হাদীস ৫৬৬৫
সালাফী আলেমগণের কেউ কেউ উপরিউক্ত একই কারণে সনদটিকে মুনকাতি বিবেচনা করে হাদীসটিকে দুর্বল আখ্যায়িত করে থাকেন। অথচ হাফেয যাহাবী রহ. মালিক বিন য়ুখামির এর সাথে মাকহুল এর সাক্ষাত হওয়া বা না হওয়ার বিষয়টি দৃঢ়তার সাথে বলেননি; বরং ধারণাভিত্তিক বলেছেন। তবে বাস্তবতা হলো; উভয়ের বয়স, মৃত্যুসন এবং উস্তায-শাগরেদের তালিকা বিবেচনা করলে বোঝা যায়, তাদের মাঝে সাক্ষাৎ সংঘটিত হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

ইমাম মুসলিমের দৃষ্টিতে, ‘মুআনআন’ হাদীসের ক্ষেত্রে সনদ ইত্তিসাল হওয়ার জন্য রাবি এবং মারবি আনহু (যার থেকে হাদীস বর্ণনা করা হয়) এর মাঝে সাক্ষাৎ প্রমাণিত হওয়া শর্ত নয়। বরং সাক্ষাতের সম্ভাবনা বিদ্যমান থাকাই যথেষ্ট। উল্লেখ্য, এটা শুধু ইমাম মুসলিমের মাযহাব নয়, বরং জুমহুর মুহাদ্দিসেরও মাযহাব। -সহীহ মুসলিমের মুকাদ্দিমা, পৃষ্ঠা ২১-২৩

সুতরাং হাফেয যাহাবির অনুমাননির্ভর কথার উপর ভিত্তি করে এই সনদকে মুনকাতি ধরে হাদীসটিকে যঈফ আখ্যায়িত করা ঠিক হবে না। বরং জুমহুর মুহাদ্দিসের মাযহাব অনুযায়ী সনদটি মুত্তাসিল হিসেবে বিবেচিত হবে। এবং মুত্তাসিল হওয়ার পাশাপাশি সনদের সকল রাবিগণ নির্ভরযোগ্য হওয়ার কারণে বর্ণনাটি সহীহ সাব্যস্ত হবে। এজন্যই ইমাম ইবনে হিব্বান হাদীসটি “কিতাবুস সহীহ” এ বর্ণনা করেছেন। কেউ কেউ হাদীসটিকে পারিভাষিক দৃষ্টিকোণ থেকে হাসান বলেছেন; কিন্তু হাসান হাদীস সহীহ তথা নির্ভরযোগ্য হাদীসেরই একটি প্রকার।

উক্ত হাদীস সম্পর্কে বিভিন্ন হাদীস বিশারদগণের মন্তব্য

ইমাম মুনযিরী বলেন,

رواه الطبراني في الأوسط وابن حبان في صحيحه والبيهقي ورواه ابن ماجه بلفظه من حديث أبي موسى الأشعري والبزار والبيهقي من حديث أبي بكر الصديق رضي الله عنه بنحوه بإسناد لا بأس به

ইমাম তাবরানী “আলমুজামুল আওসাতে”, ইমাম ইবনে হিব্বান তার “কিতাবুস সহীহ’ গ্রন্থে, ইমাম বাইহাকী “শুআবুল ঈমান’ গ্রন্থে এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে মাজাহ উক্ত শব্দে আবু মুসা আশআরী (রাযি.) এর সূত্রে এবং ইমাম বাযযার ও ইমাম বাইহাকী আবু বকর সিদ্দীক (রাযি.) এর সূত্রে এ ধরনের শব্দে বর্ণনা করেন। সনদে কোনো সমস্যা নেই। -আততারগীব ওয়াততারহীব ২/৭৩, হাদীস ১৫৪৬; ৩/৩০৭, হাদীস ৪১৯০

নূরুদ্দীন হাইসামী বলেন,

رَوَاهُ الطَّبَرَانِيُّ فِي الْكَبِيرِ وَالْأَوْسَطِ وَرِجَالُهُمَا ثِقَاتٌ.

ইমাম তাবরানী আলমুজামুল কাবীর ও আলমুজামুল আওসাত এ বর্ণনা করেছেন। সনদের সকল বর্ণনাকারী সিক্বাহ বা নির্ভরযোগ্য। -মাজমাউয যাওয়ায়েদ ৮/৬৫, হাদীস ১২৯৬০
শায়েখ আলবানী (রহ.) উক্ত হাদীস উল্লেখ করে বলেন,

حديث صحيح، روي عن جماعة من الصحابة من طرق مختلفة يشد بعضها بعضا وهم معاذ ابن جبل وأبو ثعلبة الخشني و عبد الله بن عمرو وأبي موسى الأشعري وأبي هريرة وأبي بكر الصديق وعوف ابن مالك وعائشة .

হাদীসটি সহীহ। বিভিন্ন সনদে সাহাবীদের একটি জামাত থেকে হাদীসটি বর্ণিত হয়েছে, যা পরস্পর পরস্পরকে সুদৃঢ় করে। (হাদীসটির বর্ণনাকারী সাহাবীগণ হলেন) মুআয ইবনে জাবাল, আবু সা’লাবা আল-খুশানী, আব্দুল্লাহ ইবনে আমর, আবু মুসা আল-আশআরী, আবু হুরায়রা, আবু বকর সিদ্দীক, আউফ ইবনে মালেক এবং আয়েশা (রাযি.)।
এরপর শায়খ আলবানী (রহ.) এই হাদীসের সমর্থনে আরো আটটি হাদীস উল্লেখ করার পর লেখেন,

وجملة القول أن الحديث بمجموع هذه الطرق صحيح بلا ريب والصحة تثبت بأقل منها عددا ما دامت سالمة من الضعف الشديد كما هو الشأن في هذا الحديث

এসব রেওয়ায়েতের মাধ্যমে সমষ্টিগতভাবে এই হাদীসটি নিঃসন্দেহে সহীহ প্রমাণিত হয়। আর এরচেয়ে কম সংখ্যক (দুর্বল) সনদ বা সূত্র দ্বারা একটা হাদীস সহীহ সাব্যস্ত হয়, যদি সনদটি বেশি দুর্বল (الضعف الشديد ) হওয়া থেকে মুক্ত থাকে। যেমন, এই হাদীসের অবস্থা।
তারপর আলবানী (রহ.) ওই সব লোকের বক্তব্য খণ্ডন করেন, যারা কোনো ধরণের খোঁজখবর ছাড়াই বলে দেন যে, শবে বরাতের ব্যাপারে কোনো সহীহ হাদীস নেই। তিনি বলেন,

فما نقله الشيخ القاسمي رحمه الله تعالى في “إصلاح المساجد” (ص 107) عن أهل التعديل والتجريح أنه ليس في فضل ليلة النصف من شعبان حديث صحيح، فليس مما ينبغي الاعتماد عليه ، ولئن كان أحد منهم أطلق مثل هذا القول فإنما أوتي من قبل التسرع وعدم وسع الجهد لتتبع الطرق على هذا النحو الذي بين يديك . والله تعالى هو الموفق .

শায়েখ আলক্বাসেমী (রহ.) ‘ইসলাহুল মাসাজিদ’ এর মধ্যে জারহ-তাদীলের ইমামদের থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ‘শাবান মাসের মধ্য রজনীর ফযীলত সম্পর্কে কোনো সহীহ হাদীস নেই।’ তার এ কথার উপর নির্ভর করা উচিত হবে না। তবে যদি কেউ অনুরূপ কথা বলে, তাহলে তাড়াহুড়া করার কারণে এবং এ বিষয়ের সকল হাদীস ও সনদ যথাযথভাবে যাচাই বাছাই না করার কারণে এমন বলেছে। আল্লাহ তাআলাই তাওফিকদাতা। -সিলসিলাতুল আহাদীসিস সাহীহা ৩/১৩৫-১৩৯
উক্ত হাদীসটি ইমাম ইবনে আবি শায়বাহ ‘কাসীর ইবনে মুররাহ’ এর সূত্রে মুরসাল সনদে বর্ণনা করেন। শায়েখ মুহাম্মাদ আওয়ামাহ (হাফিযাহুল্লাহ) মুসান্নাফের টীকায় এ হাদীসের বেশ কিছু সনদ বিশ্লেষণ করে বলেন,

هذه الأحاديث-وغيرها كثير- وإن كان في كل منها مقال إلا أنها تتقوى ببعضها ولا ريب، بل حديث معاذ بمفرده حسنه العراقي كما في “شرح المواهب” للزرقاني 412:7. ونقل الشيخ جمال الدين القاسمي في “إصلاح المساجد” (ص107) عن بعضهم أنه لا يصح في فضل ليلة النصف من شعبان حديث: فهو –على غموضه- غير سديد، وما هو إلا منافرة منه رحمه الله لما عليه جمهرة المسلمين من تكريم هذه الليلة.

এই হাদীসসমূহ (এর বাহিরে এ হাদীসের আরো অনেকগুলো সনদ রয়েছে) যদিও এর প্রত্যেকটি নিয়েই কিছু কিছু সমালোচনা রয়েছে। তবে নিঃসন্দেহে এর (সনদগুলো এ পর্যায়ের যে) একটা অপরটার মাধ্যমে শক্তিশালী হয়। আর মুআয (রাযি.)-এর হাদীসকে হাফেয ইরাকী (রহ.) এককভাবে হাসান বলেছেন। যেমনটি যুরকানী রহ. ‘শরহে মাওয়াহেবে’ উল্লেখ করেছেন। শায়েখ জামাল উদ্দীন আলক্বাসেমী ‘ইসলাহুল মাসাজিদ’ গ্রন্থে কারো কারো থেকে বর্ণনা করেছেন যে, ‘শাবান মাসের মধ্য রজনীর ফযীলত সম্পর্কে কোনো হাদীস সহীহ নয়।’

শায়েখ মুহাম্মাদ আওয়ামাহ আরো বলেন, তার কথা (অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য হওয়ার পাশাপাশি) সঠিক নয়। অধিকাংশ মুসলিম এই রাতকে সম্মান ও মর্যাদা দেয়া সত্ত্বেও বিষয়টা তিনি অপছন্দ করার কারণে এমন করেছেন। আল্লাহ তাকে রহম করুন। -মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বাহ, তাহকীক- শায়েখ মুহাম্মাদ আওয়ামাহ ১৫/৪০৪-৪০৫

২য় হাদীস
সুনানে ইবনে মাজায় বর্ণিত হয়েছে-

حَدَّثَنَا الْحَسَنُ بْنُ عَلِيٍّ الْخَلَّالُ قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ الرَّزَّاقِ قَالَ: أَنْبَأَنَا ابْنُ أَبِي سَبْرَةَ، عَنْ إِبْرَاهِيمَ بْنِ مُحَمَّدٍ، عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ جَعْفَرٍ، عَنْ أَبِيهِ، عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” إِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَقُومُوا لَيْلَهَا وَصُومُوا نَهَارَهَا، فَإِنَّ اللَّهَ يَنْزِلُ فِيهَا لِغُرُوبِ الشَّمْسِ إِلَى سَمَاءِ الدُّنْيَا، فَيَقُولُ: أَلَا مِنْ مُسْتَغْفِرٍ لِي فَأَغْفِرَ لَهُ أَلَا مُسْتَرْزِقٌ فَأَرْزُقَهُ أَلَا مُبْتَلًى فَأُعَافِيَهُ أَلَا كَذَا أَلَا كَذَا، حَتَّى يَطْلُعَ الْفَجْرُ “

হাসান ইবনে আলী আলখাল্লাল থেকে, তিনি আব্দুর রাজ্জাক থেকে, তিনি ইবনে আবী সাবুরাহ থেকে, তিনি ইব্রাহীম ইবনে মুহাম্মাদ থেকে, তিনি মুআবিআ ইবনে আব্দুল্লাহ থেকে, তিনি তার পিতা থেকে, তিনি আলী ইবনে আবু তালেব (রাযি.) থেকে বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, পনের শাবানের রাত (চৌদ্দ তারিখ দিবাগত রাত) যখন আসে তখন তোমরা এ রাতটি ইবাদত-বন্দেগীতে কাটাও এবং দিনের বেলা রোযা রাখো। কেননা, এ রাতে সূর্যাস্তের পর আল্লাহ তাআলা দুনিয়ার আসমানে অবতরণ করেন এবং বলেন, কোনো ক্ষমাপ্রার্থী আছে কি? আমি তাকে ক্ষমা করব। আছে কি কোনো রিযিক প্রার্থী? আমি তাকে রিযিক দেব। এভাবে সুবহে সাদিক পর্যন্ত আল্লাহ তাআলা মানুষের প্রয়োজনের কথা বলে তাদের ডাকতে থাকেন। -সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৩৮৪, হাদীস ১৩৮৮

এই বর্ণনাটির সনদ যয়ীফ। সুনানে ইবনে মাজার বর্ণনায় ‘ইবনে আবী ছাবুরা’ নামক একজন রাবী রয়েছেন। তার সম্পর্কে কেউ কেউ হাদীস জাল করার অভিযোগ করেছেন। কিন্তু তাদের এই অভিযোগটি সঠিক নয়। বরং তার স্মৃতিশক্তির দর্বলতা জনিত কারণে তিনি বেশ ভুল করেছেন। রিজাল শাস্ত্রের ইমাম আল্লামা যাহাবি রাহ. ‘সিয়ারু আ’লামিন নুবালা’য় তার ক্ষেত্রে পরিষ্কারভাবে যথোপযুক্ত হুকুম দিয়েছেন। তিনি বলেন,
وهو ضعيف الحديث من قبل حفظه. ( স্মৃতিশক্তির দুর্বলতার কারণে তার থেকে বর্ণিত হাদীস যয়ীফ সাব্যস্ত হবে।) -সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ইমাম যাহাবী, ৭/৩৩০

অনুরুপভাবে ইমাম বুসীরী রহ. ‘যাওয়ায়েদে ইবনে মাজাহ’য় উক্ত হাদীস সম্পর্কে বলেন,
إسناده ضعيف، لضعف ابن أبي سبرة (ইবনে আবী ছাবুরা দুর্বল রাবি হওয়ার কারণে সনদটি যয়ীফ)। তিনি হাদীসটি মাওযু বলেননি। -যাওয়াইদে ইবনু মাজাহ, পৃ. ২০৩, হাদীস ৪৫৩

শায়েখ আলবানী তার ‘সিলসিলাতুয যয়ীফা’ (৫/১৫৪) তে ইবনে আবী সাবুরার হাদীস নিয়ে এসেছেন এবং হাদীসটিকে موضوع السند বলেছেন; অর্থাৎ এর ‘সনদ’ মওযু। যেহেতু অন্যান্য ‘সহীহ’ বর্ণনা উক্ত হাদীসের বক্তব্যকে সমর্থন করে, সম্ভবত এজন্যই শায়খ আলবানী রহ. সরাসরি ‘মওজূ’ না বলে ‘মওযুউস সনদ’ বলেছেন। তবুও শায়খ আলবানীর এই ধারণা ঠিক নয়। সঠিক হলো, এ বর্ণনা মওযু নয়, বরং ‘যয়ীফ’। যা তিনি নিজেই ‘লাতাইফুল মাআরিফ’ থেকে ইবনে রজব রহ.র মত বর্ণনা করেছেন। আর তা হলো (إسناده ضعيف) তার হাদীস (মাওযু নয় বরং) যয়ীফ। যেমনটি পূর্বে ইমাম যাহাবি থেকে নকল করা হয়েছে। রিজাল শাস্ত্রের বিভিন্ন কিতাবে ইবনে আবি সাবুরার জীবনী সার্বিক অনুসন্ধান করলে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, তার ক্ষেত্রে হাফেয যাহাবির কথাই সঠিক ও যথার্থ। এতএব, ইবনে আবি সাবুরার হাদীস যয়ীফ হতে পারে; মওযু নয়। -তাহযীবুল কামাল, মিযযী রহ.,৮/২৫০, আলকামেল, ইবনে আদী, ৯/১৯৬; -সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, ইমাম যাহাবী, ৭/৩৩০

আল্লামা শাওকানী রহ. الفوائد المجموعة في الأحاديث الموضوعة কিতাবে উক্ত হাদীস সম্পর্কে বলেন, হাদীসটি ضعيف তথা দুর্বল। -আল ফাওয়াইদুল মাজমুআ, পৃ. ৫৫

আর মুহাদ্দিসীন কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হল, ফাযায়েলের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্তসাপেক্ষে যয়ীফ হাদীস গ্রহণযোগ্য। তাছাড়া হাদীসের বক্তব্য যেহেতু অন্যান্য সহীহ হাদীস দ্বারা সমর্থিত, তাই এটি কোনোভাবেই পরিত্যাজ্য নয়। তবে হাদীসের শেষাংশে যে রোজার কথা বর্ণিত হয়েছে, তা অন্যান্য সহীহ হাদীস দ্বারা সমর্থিত নয়। আর যয়ীফ হাদীস ফাযায়েলের ক্ষেত্রে নির্ধারিত শর্তসাপেক্ষে গ্রহণযোগ্য হলেও এর দ্বারা কখনোই কোনো আকীদা বা আমল সাব্যস্ত হয় না। তাই এ হাদীসের আলোকে শবে বরাতের রোজা প্রমাণিত হয় না।

গ) এ রাতে ঘুমিয়ে থাকলেও কি মাগফিরাত পাওয়া যাবে?
যারা হাদীস কেন্দ্রিক উক্ত বিষয়গুলো না বুঝার কারণে অথবা বুঝতে না চাওয়ার কারণে ‘লাইলাতুন নিসফি মিন শাবান’ বিষয়ক কোনো হাদীসকে সহীহ হিসেবে মানতে চান না। অথবা এ রাতের আমল বিষয়ে কোনো হাদীসকে আমলযোগ্য স্বীকার করেন না; তারা বলেন, এ রাতের কোনো আমল নেই। এবং এ রাতকে গুরুত্ব দেয়া বা এ রাতে বিশেষভাবে আমল করা সম্পূর্ণ বিদআত। অথবা তারা প্রথম হাদীসকে কিছুটা আমলযোগ্য মেনে নিয়ে বলেন, এ রাতে ‘ছাড়ার আমল’ আছে কিন্তু ‘করার আমল’ নেই। অর্থাৎ হিংসা-বিদ্বেষ ও শিরক ছাড়ার আমল আছে। সুতরাং কেউ হিংসা-বিদ্বেষ ও শিরক থেকে মুক্ত থেকে সারা রাত যদি ঘুমায় তাহলে সে সালাত বা কোনো ইবাদত ছাড়াই এ রাতে ক্ষমা পেয়ে যাবে।

আর যারা উক্ত হাদীসগুলোকে আমলযোগ্য মনে করেন এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে ঘোষিত ক্ষমার মুহূর্তগুলোতে ক্ষমা পাওয়ার উপযুক্ত-আমল করার চেষ্টা করেন, তাদের কথাগুলো কুরআন-সুন্নাহ ও সালাফদের বক্তব্যের আলোকে সঠিক কি না, তা নিম্নে সবিস্তারে তুলে ধরা হলো-

এই রাতের আমল
উপরের দু’টি হাদীস ও তৃতীয় হাদীস (যা সামনে আসছে) থেকে শবে বরাতে নিচের আমলগুলো সাব্যস্ত হয়-
১. শিরক ত্যাগ করা।
২. কারো প্রতি বিদ্বেষ না রাখা। (যা উপরের হাদীসে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে।)
৩. দীর্ঘ নফল সালাত আদায় করা, যাতে সেজদা দীর্ঘ হবে। (যা পরবর্তী হাদীসে আসছে)

দীর্ঘ নফল সালাত আদায় করা, যাতে সেজদা দীর্ঘ হবে। নিম্নে এ বিষয়ে হাদীস পেশ করা হল,

عَن مُعَاوِيَة بْن صَالِحٍ، عَنِ الْعَلَاءِ بْنِ الْحَارِثِ، أَنَّ عَائِشَةَ، قَالَتْ: قَامَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنَ اللَّيْلِ يُصَلِّي فَأَطَالَ السُّجُودَ حَتَّى ظَنَنْتُ أَنَّهُ قَدْ قُبِضَ، فَلَمَّا رَأَيْتُ ذَلِكَ قُمْتُ حَتَّى حَرَّكْتُ إِبْهَامَهُ فَتَحَرَّكَ، فَرَجَعْتُ، فَلَمَّا رَفَعَ رَأْسَهُ مِنَ السُّجُودِ، وَفَرَغَ مِنْ صَلَاتِهِ، قَالَ: ” يَا عَائِشَةُ أَوْ يَا حُمَيْرَاءُ ظَنَنْتِ أَنَّ النَّبِيَّ خَاسَ بِكِ؟ “، قُلْتُ: لَا وَاللهِ يَا رَسُولَ اللهِ وَلَكِنِّي ظَنَنْتُ أَنَّكَ قُبِضْتَ لِطُولِ سُجُودِكَ، فَقَالَ: ” أَتَدْرِينَ أَيَّ لَيْلَةٍ هَذِهِ؟ “، قُلْتُ: اللهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ، قَالَ: ” هَذِهِ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ يَطْلُعُ عَلَى عِبَادِهِ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِلْمُسْتَغْفِرِينَ، وَيَرْحَمُ الْمُسْتَرْحِمِينَ، وَيُؤَخِّرُ أَهْلَ الْحِقْدِ كَمَا هُمْ.

মুআবিয়া ইবনে সালেহ থেকে, তিনি আলা ইবনুল হারিস (রহ.) থেকে বর্ণনা করেন, হযরত আয়েশা (রাযি.) বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম রাতে নামাযে দাঁড়ান এবং এত দীর্ঘ সেজদা করেন যে, আমার ধারণা হল, তিনি হয়তো মৃত্যুবরণ করেছেন। আমি তখন উঠে তার বৃদ্ধাঙুল নাড়া দিলাম। তাঁর বৃদ্ধাঙুল নড়ল। যখন তিনি সেজদা থেকে উঠলেন এবং নামায শেষ করলেন তখন আমাকে লক্ষ্য করে বললেন, হে আয়েশা! অথবা বলেছেন, হে হুমাইরা! তোমার কি এই আশংকা হয়েছে যে, আল্লাহর রাসূল তোমার হক নষ্ট করবেন? আমি উত্তরে বললাম, না, ইয়া রাসূলুল্লাহ! আপনার দীর্ঘ সেজদা থেকে আমার এই আশংকা হয়েছিল, আপনার প্রাণ হরণ করা হলো কি না। নবীজী জিজ্ঞেস করলেন, তুমি কি জান এটা কোন রাত? আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভাল জানেন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তখন ইরশাদ করলেন,

هَذِهِ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ يَطْلُعُ عَلَى عِبَادِهِ فِي لَيْلَةِ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ فَيَغْفِرُ لِلْمُسْتَغْفِرِينَ، وَيَرْحَمُ الْمُسْتَرْحِمِينَ، وَيُؤَخِّرُ أَهْلَ الْحِقْدِ كَمَا هُمْ.

‘এটা হল অর্ধ শাবানের রাত (শাবানের চৌদ্দ তারিখের দিবাগত রাত)। আল্লাহ তাআলা অর্ধ-শাবানের রাতে তাঁর বান্দাদের প্রতি মনোযোগ দেন এবং ক্ষমাপ্রার্থনাকারীদের ক্ষমা করেন এবং অনুগ্রহ প্রার্থীদের অনুগ্রহ করেন আর বিদ্বেষ পোষণকারীদের ছেড়ে দেন তাদের অবস্থাতেই। -শুআবুল ঈমান, বাইহাকী ৩/৩৮২-৩৮৩

ইমাম বাইহাকী (রহ.) এই হাদীসটি বর্ণনার পর এর সনদের ব্যাপারে বলেছেন,

هَذَا مُرْسَلٌ جَيِّدٌ وَيُحْتَمَلُ أَنْ يَكُونَ الْعَلَاء بْنُ الْحَارِثِ أَخَذَهُ مِنْ مَكْحُولٍ وَاللهُ أَعْلَمُ، وَقَدْ رُوِيَ فِي هَذَا الْبَابِ أَحَادِيثُ مَنَاكِيرُ، رُوَاتُها قَوْمٌ مَجْهُولُونَ

ইমাম বাইহাকী রহ. বলেন, হাদীসটি ভালো মানের মুরসাল সনদে বর্ণিত। সম্ভবত, আলা ইবনুল হারেস হাদীসটি মাকহুল থেকে গ্রহণ করেছেন, এ ব্যাপারে আল্লাহই ভাল জানেন। তবে এ বিষয়ে অনেক মুনকার বর্ণনা পাওয়া যায়। যার বর্ণনাকারীরা মাজহুল।
এই হাদীস দ্বারা প্রমাণিত হয়, এ রাতে এমন দীর্ঘ নফল সালাত আদায় করা, যাতে সেজদা দীর্ঘ হবে। এটা কাম্য।

উক্ত দু’হাদীস থেকে আরো বুঝে আসে যে, এ রাতের গুরুত্বপূর্ণ আমল হলো অন্তরকে শিরক ও হিংসা-বিদ্বেষ মুক্ত রাখা। কারণ, আল্লাহ তাআলার কাছে সবচে বড় কবীরা হলো শিরক, (অন্যায়ভাবে) হত্যা এবং যিনা-ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

قَالَ رَجُلٌ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَىُّ الذَّنْبِ أَكْبَرُ عِنْدَ اللَّهِ قَالَ « أَنْ تَدْعُوَ لِلَّهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ ». قَالَ ثُمَّ أَىٌّ قَالَ « أَنْ تَقْتُلَ وَلَدَكَ مَخَافَةَ أَنْ يَطْعَمَ مَعَكَ ». قَالَ ثُمَّ أَىٌّ قَالَ « أَنْ تُزَانِىَ حَلِيلَةَ جَارِكَ » فَأَنْزَلَ اللَّهُ عَزَّ وَجَلَّ تَصْدِيقَهَا ﴿وَالَّذِينَ لاَ يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ وَلاَ يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِى حَرَّمَ اللَّهُ إِلاَّ بِالْحَقِّ وَلاَ يَزْنُونَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا﴾ الآية

ইবনে মাসউদ (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করলেন, সবচে বড় অপরাধ কোনটি? তিনি বলেন: ‘কাউকে আল্লাহর সমকক্ষ সাব্যস্ত করা অথচ তিনিই তোমাকে সৃষ্টি করেছেন।’ ইবনে মাসউদ (রাযি.) বললেন: তারপর কোনটা? তিনি বলেন: ‘নিজ সন্তানকে জীবিকার ভয়ে হত্যা করা।’ ইবনে মাসউদ (রাযি.) বললেন: তারপর কোনটা? তিনি বলেন: ‘প্রতিবেশীর স্ত্রীর সাথে ব্যভিচারে লিপ্ত হওয়া।’

এ কথার সত্যতা বর্ণনা করে আল্লাহ তাআলা কুরআনে আয়াত নাযিল করেছেন:

  وَالَّذِينَ لاَ يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ وَلاَ يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِى حَرَّمَ اللَّهُ إِلاَّ بِالْحَقِّ وَلاَ يَزْنُونَ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ يَلْقَ أَثَامًا

অর্থ: আর যারা আল্লাহর সাথে অন্য কোনো মাবুদের ইবাদত করে না এবং আল্লাহ যে প্রাণকে মর্যাদা দান করেছেন, তাকে অন্যায়ভাবে বধ করে না এবং তারা ব্যভিচার করে না। যে ব্যক্তিই এরূপ করবে তাকে তার গোনাহের (শাস্তির) সম্মুখীন হতে হবে। (-সূরা ফুরকান (২৫) : ৬৮) -সহীহ মুসলিম ১/৬৩, হাদীস ১৪২

ইবনে রজব হাম্বলী রহ. বলেন,

و من الذنوب المانعة من المغفرة أيضا الشحناء و هي حقد المسلم على أخيه بغضا له لهوى نفسه و ذلك يمنع أيضا من المغفرة في أكثر أوقات المغفرة و الرحمة

আল্লাহর মাগফিরাত থেকে বঞ্চিতকারী গুনাহের মধ্যে রয়েছে (الشحناء) তথা ‘প্রবৃত্তির বশবর্তী হয়ে কোনো মুসলিম তার ভাইয়ের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা’। রহমত এবং মাগফিরাতের অধিকাংশ সময়ই এ গুনাহটি তাকে আল্লাহর ক্ষমা থেকে বঞ্চিত রাখে। -লাতাইফুল মাআরিফ পৃ. ১৯৩

আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

” تُفْتَحُ أَبْوَابُ الْجَنَّةِ يَوْمَ الْإِثْنَيْنِ، وَيَوْمَ الْخَمِيسِ، فَيُغْفَرُ لِكُلِّ عَبْدٍ لَا يُشْرِكُ بِاللهِ شَيْئًا، إِلَّا رَجُلًا كَانَتْ بَيْنَهُ وَبَيْنَ أَخِيهِ شَحْنَاءُ، فَيُقَالُ: أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا، أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا، أَنْظِرُوا هَذَيْنِ حَتَّى يَصْطَلِحَا

‘প্রতি সোম এবং বৃহষ্পতিবার জান্নাতের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয়। ফলে যারা আল্লাহর সাথে কোনও কিছুকে শরীক করে না, এমন প্রত্যেক বান্দাকে আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দেন। তবে ঐ ব্যক্তিকে ক্ষমা করা হয় না; যার মাঝে এবং তার কোনো মুসলিম ভাইয়ের মাঝে বিদ্বেষ রয়েছে। তখন বলা হয়, এই দুই জনের ক্ষেত্রে (ক্ষমার ঘোষণা কার্যকর করা থেকে) বিরত থাক, যতক্ষণ না তারা নিজেদের মাঝে সংশোধন করে নেয়। অনুরূপ কথা তিন বার বলা হয়।’ -সহীহ মুসলিম ২/৩১৭, হাদীস ২৫৬৫

আনাস ইবনে মালেক (রাযি.) বলেন,

كُنَّا جُلُوسًا مَعَ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: «يَطْلُعُ عَلَيْكُمُ الْآنَ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ» فَطَلَعَ رَجُلٌ مِنَ الْأَنْصَارِ، تَنْطِفُ لِحْيَتُهُ مِنْ وُضُوئِهِ، قَدْ تَعَلَّقَ نَعْلَيْهِ فِي يَدِهِ الشِّمَالِ، فَلَمَّا كَانَ الْغَدُ، قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، مِثْلَ ذَلِكَ، فَطَلَعَ ذَلِكَ الرَّجُلُ مِثْلَ الْمَرَّةِ الْأُولَى. فَلَمَّا كَانَ الْيَوْمُ الثَّالِثُ، قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، مِثْلَ مَقَالَتِهِ أَيْضًا، فَطَلَعَ ذَلِكَ الرَّجُلُ عَلَى مِثْلِ حَالِهِ الْأُولَى، فَلَمَّا قَامَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ تَبِعَهُ عَبْدُ اللَّهِ بْنُ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ فَقَالَ: إِنِّي لَاحَيْتُ أَبِي فَأَقْسَمْتُ أَنْ لَا أَدْخُلَ عَلَيْهِ ثَلَاثًا، فَإِنْ رَأَيْتَ أَنْ تُؤْوِيَنِي إِلَيْكَ حَتَّى تَمْضِيَ فَعَلْتَ؟ قَالَ: نَعَمْ. قَالَ أَنَسٌ: وَكَانَ عَبْدُ اللَّهِ يُحَدِّثُ أَنَّهُ بَاتَ مَعَهُ تِلْكَ اللَّيَالِي الثَّلَاثَ، فَلَمْ يَرَهُ يَقُومُ مِنَ اللَّيْلِ شَيْئًا، غَيْرَ أَنَّهُ إِذَا تَعَارَّ وَتَقَلَّبَ عَلَى فِرَاشِهِ ذَكَرَ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ وَكَبَّرَ، حَتَّى يَقُومَ لِصَلَاةِ الْفَجْرِ. قَالَ عَبْدُ اللَّهِ: غَيْرَ أَنِّي لَمْ أَسْمَعْهُ يَقُولُ إِلَّا خَيْرًا، فَلَمَّا مَضَتِ الثَّلَاثُ لَيَالٍ وَكِدْتُ أَنْ أَحْقِرَ عَمَلَهُ، قُلْتُ: يَا عَبْدَ اللَّهِ إِنِّي لَمْ يَكُنْ بَيْنِي وَبَيْنَ أَبِي غَضَبٌ وَلَا هَجْرٌ ثَمَّ، وَلَكِنْ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ لَكَ ثَلَاثَ مِرَارٍ: «يَطْلُعُ عَلَيْكُمُ الْآنَ رَجُلٌ مِنْ أَهْلِ الْجَنَّةِ» فَطَلَعْتَ أَنْتَ الثَّلَاثَ مِرَارٍ، فَأَرَدْتُ أَنْ آوِيَ إِلَيْكَ لِأَنْظُرَ مَا عَمَلُكَ، فَأَقْتَدِيَ بِهِ، فَلَمْ أَرَكَ تَعْمَلُ كَثِيرَ عَمَلٍ، فَمَا الَّذِي بَلَغَ بِكَ مَا قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَقَالَ: مَا هُوَ إِلَّا مَا رَأَيْتَ. قَالَ: فَلَمَّا وَلَّيْتُ دَعَانِي، فَقَالَ: مَا هُوَ إِلَّا مَا رَأَيْتَ، غَيْرَ أَنِّي لَا أَجِدُ فِي نَفْسِي لِأَحَدٍ مِنَ الْمُسْلِمِينَ غِشًّا، وَلَا أَحْسُدُ أَحَدًا عَلَى خَيْرٍ أَعْطَاهُ اللَّهُ إِيَّاهُ. فَقَالَ عَبْدُ اللَّهِ هَذِهِ الَّتِي بَلَغَتْ بِكَ، وَهِيَ الَّتِي لَا نُطِيقُ

আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের কাছে বসা ছিলাম, তিনি বললেন: ‘এখন তোমাদের নিকট একজন জান্নাতী মানুষ আগমন করবে।’ তখন আনসারী এক লোক আগমন করল। তার দাঁড়ি থেকে ফোঁটা ফোঁটা ওযুর পানি পড়ছিল এবং তার বাম হাতে জুতা ছিল। যখন পরের দিন হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবার অনুরুপ কথা বললেন। ফলে ঐ একই ব্যক্তি প্রথমবারের মতো আগমন করলেন। যখন তৃতীয় দিন আসল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবারো তাই বললেন, তখন ঐ একই ব্যক্তি প্রথম দিনের অবস্থায়ই আগমন করলেন।

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন মজলিস থেকে উঠে গেলেন তখন আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনুল আস (রাযি.) তাকে অনুসরণ করলেন। অতঃপর বললেন, …আমি কসম করেছি তিন দিন আমার পিতার কাছে যাব না। যদি আপনি চান (তিন দিন) অতিবাহিত হওয়া পর্যন্ত আমাকে আপনার নিকট আশ্রয় দিবেন, আমি আপনার নিকট অবস্থান করতে চাই। তিনি আমাকে অনুমতি দিলেন।

আনাস (রাযি.) বলেন: আব্দুল্লাহ ইবনে আমর বর্ণনা করেন, তিনি তার সাথে তিনটি রাত্রিযাপন করেন কিন্তু তাকে রাতের কোনো অংশে সালাত আদায়রত অবস্থায় পাননি। তবে ঘুম না আসায় তিনি যখন বিছানায় এপাশ ওপাশ করেন এবং বিছানায় তার পাশ পরিবর্তন করেন তখন আল্লাহর যিকির পাঠ করেন ও তাকবীর উচ্চারণ করেন। এক সময় ফজরের সালাতের জন্য ওঠেন।

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রা. বলেন: তবে ভালো কথা ছাড়া আমি তার থেকে আর কিছুই শুনিনি। যখন তিনরাত্রি অতিক্রান্ত হলো এবং তার আমল আমার কাছে ছোট মনে হল। তখন আমি বললাম: হে আল্লাহর বান্দা, নিশ্চয়ই আমার মাঝে এবং আমার পিতার মাঝে কোনো রাগ ছিল না এবং সেখানে কোনো বিচ্ছেদও ছিল না। কিন্তু আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আপনার সম্পর্কে তিনবার এ কথা বলতে শুনেছি: ‘এখন তোমাদের নিকট একজন জান্নাতী মানুষ আগমন করবে।’ আর তিনবারই আপনি আগমন করেছেন। তাই আমি ইচ্ছা করেছি আপনার নিকট থাকার, যাতে করে আমি লক্ষ্য করতে পারি আপনি (বিশেষ) কোন আমল করেন, আমিও তার অনুসরণ করব। কিন্তু আমি আপনাকে বেশি আমল করা অবস্থায় পাইনি। তাহলে সেটা কোন আমল, যেটা আপনাকে বিশেষ মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছে? যেমনটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন। তখন তিনি বললেন: ‘তুমি যতটুকু দেখেছ ততটুকুই।’ আব্দুল্লাহ ইবনে আমর বলেন: ‘যখন আমি ফিরে আসছিলাম, তিনি আমাকে ডাকলেন। অতঃপর বললেন: ‘তুমি যতটুকু দেখেছ ততটুকুই।’ এছাড়া আমি আমার অন্তরে কোনো মুসলমানের প্রতি বিদ্বেষভাব রাখি না এবং এমন কাউকে হিংসাও করি না, সেই কল্যাণের বিষয়ে, যা আল্লাহ তাআলা তাকে দান করেছেন। আব্দুল্লাহ রা. বলেন: এই গুণই আপনাকে এই মর্যাদায় পৌঁছে দিয়েছে। এটা এমন একটি গুণ যার উপর আমল করতে সবাই সক্ষম হয় না। -শায়েখ শুআইব আরনাউত বলেন: হাদীসটি ইমাম বুখারী ও মুসলিম রহ.র শর্ত অনুযায়ী সহীহ। মুসনাদে আহমাদ, তাহক্বীক শুআইব আরনাউত ২০/১২৪-১২৫, হাদীস ১২৬৯৭

ইবনে রজব হাম্বলী বলেন,

فأفضل الأعمال سلامة الصدر من أنواع الشحناء كلها ….. سلامة القلب من الشحناء لعموم المسلمين و إرادة الخير لهم و نصيحتهم و أن يحب لهم ما يحب لنفسه و قد وصف الله تعالى المؤمنين عموما بأنهم يقولون :   ربنا اغفر لنا و لإخواننا الذين سبقونا بالإيمان و لا تجعل في قلوبنا غلا للذين آمنوا ربنا إنك رؤوف رحيم

কাজেই শ্রেষ্ঠ আমল হলো, সকল প্রকার বিদ্বেষভাব থেকে অন্তরকে পরিচ্ছন্ন রাখা। ……(একজন মুমিন এমন হবে যে,) সে সমগ্র মুসলমানদের জন্য অন্তরকে বিদ্বেষ থেকে পরিচ্ছন্ন রাখবে, মুসলমানদের জন্য কল্যাণ ও সদুপদেশ চাইবে এবং সে নিজের জন্য যা পছন্দ করে মুসলমানদের জন্য তাই পছন্দ করবে। আল্লাহ তাআলা মুমিনের সাধারণ-বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করেছেন যে, মুমিনরা (দুআতে) বলেন,

 ربنا اغفر لنا و لإخواننا الذين سبقونا بالإيمان و لا تجعل في قلوبنا غلا للذين آمنوا ربنا إنك رؤوف رحيم

‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ক্ষমা কর এবং আমাদের সেই ভাইদেরকেও, যারা আমাদের আগে ঈমান এনেছে এবং আমাদের অন্তরে ঈমানদারদের প্রতি কোনো হিংসা-বিদ্বেষ রেখ না। হে আমাদের প্রতিপালক! তুমি অতি মমতাবান, পরম দয়ালু। -সূরা হাশর (৫৯) : ১০; লাতাইফুল মাআরিফ পৃ. ১৯৩

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাযি.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

قِيلَ لِرَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: أَيُّ النَّاسِ أَفْضَلُ؟ قَالَ: «كُلُّ مَخْمُومِ الْقَلْبِ، صَدُوقِ اللِّسَانِ» ، قَالُوا: صَدُوقُ اللِّسَانِ، نَعْرِفُهُ، فَمَا مَخْمُومُ الْقَلْبِ؟ قَالَ: «هُوَ التَّقِيُّ النَّقِيُّ، لَا إِثْمَ فِيهِ، وَلَا بَغْيَ، وَلَا غِلَّ، وَلَا حَسَدَ»

‘রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে জিজ্ঞাসা করা হলো: মানুষের মধ্যে কে সর্বোত্তম? তিনি বলেন: ‘(আল্লাহর ভয়ে) ভীতসন্ত্রস্ত অন্তর এবং সত্যবাদী জবান।’ সাহাবীগণ বললেন: ‘সদূকুল লিসান’ তো আমরা জানি। তবে ‘মাখমুমুল ক্বলব’ কোনটি? তিনি বলেন: ‘যে অন্তর পবিত্র ও আল্লাহর ভয়ে ভীত, যার কোনো গুনাহ নেই, যে জুলুম করে না এবং কারও প্রতি হিংসা-বিদ্বেষও রাখে না।’ -সুনানু ইবনে মাজাহ ২/৩১১, হাদীস ৪২১৬

আওযায়ী রহ. الشحناء শব্দের ব্যাখ্যা করে বলেন,

وقد فسر الأوزاعي هذه الشحناء المانعة بالذي في قلبه شحناء لأصحاب النبي صلى الله عليه وسلم ولا ريب أن هذه الشحناء أعظم جرما من مشاحنة الأقران بعضهم بعضا

কারো অন্তরে যে কোনো মুসলমানের প্রতি বিদ্বেষ থাকা একটি মন্দ প্রবণতা। তবে কোনো সন্দেহ নেই যে, সাহাবায়ে কেরাম (ও সালাফে সালেহীন) সম্পর্কে অন্তরে হিংসা ও বিদ্বেষ বিদ্যমান থাকা অত্যন্ত ভয়াবহ অপরাধ। -লাতাইফুল মাআরিফ পৃ. ১৯২

ঘ) শবে বরাতের বিষয় ইমামগণের মতামত
শবে বরাতের করণীয়-বর্জনীয় আমল সম্পর্কে বিভিন্ন মাযহাবের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী ইমামগণের কিছু মন্তব্য

১. শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া (৭২৮ হি.) বলেন,

ليلة النصف من شعبان فقد روى في فضلها من الأحاديث المرفوعة والآثار ما يقتضي أنها ليلة مفضلة وأن من السلف من كان يخصها بالصلاة فيها، وصوم شهر شعبان قد جاءت فيه أحاديث صحيحة، ومن العلماء من السلف من أهل المدينة وغيرهم من الخلف من أنكر فضلها وطعن في الأحاديث الواردة فيها، كحديث: “إن الله يغفر فيها لأكثر من عدد شعرغنم كلب”… لكن الذي عليه كثير من أهل العلم أو أكثرهم من أصحابنا وغيرهم على تفضيلها وعليه يدل نص أحمد لتعدد الأحاديث الواردة فيها وما يصدق ذلك من الآثار السلفية وقد روى بعض فضائلها في المسانيد والسنن، وإن كان قد وضع فيها أشياء أخر… فأما صوم يوم النصف مفردا فلا أصل له بل إفراده مكروه وكذلك اتخاذه موسما تصنع فيه الأطعمة وتظهر فيه الزينة هو من المواسم المحدثة المبتدعة التي لا أصل لها وكذلك ما قد أحدث في ليلة النصف من الاجتماع العام للصلاة الألفية في المساجد الجامعة ومساجد الأحياء والدروب والأسواق. فإن هذا الإجتماع لصلاة نافلة مقيدة بزمان وعدد، وقدر من القراءة لم يشرع مكروه. فإن الحديث الوارد في الصلاة الألفية موضوع بإتفاق أهل العلم بالحديث.

‘পনেরো শাবানের রাতের ফযীলত সম্পর্কে একাধিক ‘মারফু’ হাদীস ও ‘আসারে সাহাবা’ বর্ণিত হয়েছে। এগুলো দ্বারা ওই রাতের ফযীলত ও মর্যাদা প্রমাণিত হয়। সালাফে সালেহীনের কেউ কেউ এ রাতে নফল নামাযের ব্যাপারে যত্নবান হতেন। আর শাবানের রোযার ব্যাপারে তো সহীহ হাদীসসমূহই রয়েছে। সালাফগণের মধ্যে মদীনার কোনো কোনো আলেম এবং পরবর্তীদের মধ্যে কেউ কেউ যদিও এই রাতের ফযীলত অস্বীকার করেন এবং এ সংক্রান্ত হাদীসগুলোকে দুর্বল সাব্যস্ত করেন। যেমন একটি হাদীস: সেদিন আল্লাহ তাআলা কালব গোত্রের বকরির পশম পরিমাণের চেয়ে বেশি মানুষকে ক্ষমা করেন।

কিন্তু হাম্বলী ও গায়রে হাম্বলী অধিকাংশ আলেমই এই রাতের ফযীলতের কথা স্বীকার করে থাকেন। ইমাম আহমাদ রাহ.-এর মতও তাই। কেননা, এর ফযীলত সম্পর্কে একাধিক হাদীস বর্ণিত হয়েছে এবং এগুলোর সমর্থনে সালাফ (সাহাবী ও তাবেয়ী)-এর ‘আসার’ও বিদ্যমান আছে; যেগুলো ‘সুনান’ ও ‘মুসনাদ’ শিরোনামে সংকলিত হাদীসের কিতাবে (বরং কতক ‘সহীহ’ শিরোনামের কিতাবেও যেমন সহীহ ইবনে খুযাইমা (কিতাবুত তাওহীদ) সহীহ ইবনে হিব্বান প্রভৃতিতে) রয়েছে। যদিও এর কিছু কিছু বর্ণনা ভিত্তিহীনও রয়েছে।
অবশ্য শুধু পনেরো তারিখের দিনে রোযা রাখার ব্যাপারে যত্নবান হওয়া মাকরূহ। (বরং পনেরো তারিখের সাথে দু-একদিন মিলিয়ে নেওয়া উত্তম।) আর এই দিন বা রাতে বিশেষ খাবারের ব্যবস্থা করা এবং সাজ-সজ্জার ব্যাপারে যত্নবান হওয়া ইত্যাদি বিদআত ও ভিত্তিহীন। তেমনি এই রাতে ‘সালাতে আলফিয়া’ নামের মনগড়া নামাযের জন্য জামে মসজিদ, মহল্লার মসজিদ, পথের ধারের মসজিদ এমনকি বাজারের মসজিদে সমবেত হওয়াও বিদআত।’ আর নফল সালাতের জন্য শরিয়ত অনুমোদন করেনি এমন নির্দিষ্ট সময়, রাকাতের নির্দিষ্ট সংখ্যা ও নির্দিষ্ট পরিমাণ ক্বিরাতের জন্য সমবেত হওয়া মাকরুহ। আর ‘সালাতে আলফিয়া’ সম্পর্কে যে হাদীসগুলো বর্ণিত হয়েছে সকল আহলে ইলম একমত যে, তা মাওযু ও ভিত্তিহীন। -ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকীম ২/৬৩১-৬৩২

২. মালিকি মাযহাবের ইমাম ইবনুল হাজ্জ রাহ. (৭৩৭হি.) তাঁর রচিত ‘আল-মাদখাল’ গ্রন্থে’র ১ম খণ্ডের শেষাংশে শবে বরাতের গুরুত্ব ও শবে বরাত কেন্দ্রিক বিভিন্ন রসম রেওয়াজ সম্পর্কে সুন্দর আলোচনা করেছেন। -আল-মাদখাল ১/২৯৯-৩১৩

৩. ইবনে রজব হাম্বলী (৭৯৫ হি.)। সালাফগণ এ রাত কীভাবে কাটাতেন সে প্রসংগে ইমাম যাইনুদ্দীন ইবনে রজব হাম্বলী (৭৯৫ হি.) বলেন,

و اختلف علماء أهل الشام في صفة إحيائها على قولين : أحدهما : أنه يستحب إحياؤها جماعة في المساجد كان خالد بن معدان و لقمان بن عامر و غيرهما يلبسون فيها أحسن ثيابهم و يتبخرون و يكتحلون و يقومون في المسجد ليلتهم تلك و وافقهم إسحاق بن راهوية على ذلك و قال في قيامها في المساجد جماعة : ليس ببدعة نقله عنه حرب الكرماني في مسائله و الثاني : أنه يكره الإجتماع فيها في المساجد للصلاة و القصص و الدعاء و لا يكره أن يصلي الرجل فيها لخاصة نفسه و هذا قول الأوزاعي إمام أهل الشام و فقيههم و عالمهم و هذا هو الأقرب إن شاء الله تعالى. و يتعين على المسلم أن يجتنب الذنوب التي تمنع من المغفرة و قبول الدعاء في تلك الليلة.

এই রাতের ইবাদত-বন্দেগী কিভাবে করা হবে, এ বিষয়ে শামের আলেমগণ থেকে দুইটি মত পাওয়া যায়:

এক. ইবাদত বন্দেগীর জন্য মসজিদে সমবেত হওয়া মুস্তাহাব। খালিদ ইবনে মা’দান, লুকমান ইবনে আমের (রহ.) সহ অন্যান্যরা এই রাতে উত্তম পোষাক পরিধান করতেন, সুগন্ধি ও সুরমা ব্যবহার করতেন এবং ঐ রাত তারা মসজিদে ইবাদত বন্দেগীতে কাটিয়ে দিতেন। এ বিষয়ে ইসহাক ইবনে রাহ্ওয়াইহ (রহ.) তাদের সাথে একমত ছিলেন। তিনি দলবদ্ধভাবে মসজিদে ইবাদত বন্দেগী করা সম্পর্কে বলেন, এটা বিদআত নয়। হারব আলকিরমানী তার “মাসায়েল” গ্রন্থে ইসহাক ইবনে রাহওয়াহ থেকে কথাটি বর্ণনা করেন।

দুই. শামের বিশিষ্ট ফকীহ ও আলেম ইমাম আওযায়ী (রহ.) বলেন, দুআ, আলোচনা ও নফল সালাতের জন্য মসজিদে জামায়েত হওয়া মাকরুহ। কিন্তু কোনো ব্যক্তি একাকি মসজিদে এসে সালাত আদায় করা মাকরুহ নয়।
ইবনে রজব হাম্বালী রহ. বলেন, আল্লাহ চাহেন তো এটাই সত্যের অধিকতর নিকটবর্তী কথা। আর প্রত্যেক মুসলিমই এমন সকল গুনাহ (হিংসা-বিদ্বেষ) থেকে বেঁচে থাকার প্রতি যত্নবান হবে, যা আল্লাহর মাগফিরাত এবং ঐ সকল (ফযিলতপূর্ণ) রাতে (আল্লাহর কাছে বান্দার) দুআ কবুল হওয়া থেকে বঞ্চিত রাখে। -লাতাইফুল মাআরিফ পৃ. ১৯০

এ রাতের করণীয় সম্পর্কে ইবনে রজব (রহ.) বলেন,

إخواني اجتنبوا الذنوب التي تحرم العبد مغفرة مولاه الغفار في مواسم الرحمة و التوبة و الإستغفار أما الشرك :   إنه من يشرك بالله فقد حرم الله عليه الجنة و مأواه النار و ما للظالمين من أنصار   و أما القتل فلو اجتمع أهل السموات و أهل الأرض على قتل رجل مسلم بغير حق لأكبهم الله جميعا في النار و أما الزنا فحذار حذار من التعرض لسخط الجبار الخلق كلهم عبيد الله و إماؤه و الله يغار لا أحد أغير من الله أن يزني عبده أو تزني أمته فمن أجل ذلك حرم الفواحش و أمر بغض الأبصار و أما الشحناء فيا من أضمر لأخيه السوء و قصد له الإضرار :   لا تحسبن الله غافلا عما يعمل الظالمون إنما يؤخرهم ليوم تشخص فيه الأبصار
يكفيك حرمان المغفرة في أوقات مغفرة الأوزار.

কাজেই তোমরা ঐ সকল গুনাহ থেকে বেঁচে থাক যা- রহমত, তাওবা ও ক্ষমা চাওয়ার বিশেষ মুহূর্তে ক্ষমাশীল রবের মাগফিরাত ও ক্ষমা থেকে বান্দাকে বঞ্চিত রাখে।
শিরক সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন:

 إنه من يشرك بالله فقد حرم الله عليه الجنة و مأواه النار و ما للظالمين من أنصار

‘যে আল্লাহর সাথে শিরকে লিপ্ত হয়, আল্লাহ তাআলা তার উপর জান্নাত হারাম করে দেন আর তার আবাসস্থল জাহান্নাম। জালিমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই।’ -সূরা মায়েদা (৫): ৭২

আর হত্যা এমন জঘন্য যে, যদি আসমান ও জমিনবাসী সকলেই কোনো মুসলিমকে অন্যায়ভাবে হত্যা করতে একত্র হয়, আল্লাহ তাআলা তাদের সকলকেই জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন।
আর ব্যভিচার! মহাশক্তিধর আল্লাহর ক্রোধের সামনে থেকে ব্যভিচারের ব্যাপারে সাবধান হও! সকল সৃষ্টি (মানুষ) আল্লাহর দাস কিংবা দাসী। আল্লাহ তাআলা আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন। আর কেউ আল্লাহর চাইতে অধিক আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন নেই যে, তার কোনো দাস-দাসী ব্যভিচারে লিপ্ত হবে। আর এ কারণেই আল্লাহ তাআলা অশ্লীলতাকে হারাম করেছেন এবং চক্ষু অবনত রাখার আদেশ করেছেন।
আর কারো প্রতি বিদ্বেষ ও ঘৃণাভাব পোষণ করা! হে ওই ব্যক্তি! যে তার মুসলিম ভাইয়ের প্রতি খারাপ ধারণা রাখে এবং তার ক্ষতিসাধনের ইচ্ছা করে! (তার সাবধান হওয়া উচিত। কারণ) আল্লাহ তাআলা বলেন,

 لا تحسبن الله غافلا عما يعمل الظالمون إنما يؤخرهم ليوم تشخص فيه الأبصار

‘জালেমরা যা করে, সে সম্পর্কে আল্লাহ তাআলাকে বেখবর মনে করো না। তাদেরকে তো ঐ দিন পর্যন্ত অবকাশ দিয়ে রেখেছেন, যেদিন চক্ষুসমূহ থাকবে বিস্ফরিত।’ -সূরা ইব্রাহীম (১৪) : ৪২
গুনাহ মাফের সময়গুলোতে মাগফিরাত থেকে বঞ্চিত হওয়া (ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার জন্য) যথেষ্ট। -লাতাইফুল মাআরিফ পৃ. ১৯৪

৪. আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. (১০৫২ হি.) চৌদ্দ শাবান দিবাগত রাতের বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বলেন,

قال العبد الضعيف: نزول الله تعالى إلى السماء الدنيا يكون في كل ليلة لكن يختصر ذلك بالثلث الأخير، وفي ليلة النصف من شعبان يكون من غروب الشمس إلى الفجر ولا ينحصر ذلك في الثلث الأخير، وهذا من فضل هذه الليلة. … فالظاهر ندبة للأحاديث السابقة ومثلها يعمل في الفضائل، وقال به الأوزعي..

আল্লাহ তাআলা প্রতি রাতেই নিকটবর্তী আসমানে অবতরণ করেন। তবে এটা রাতের শেষ এক-তৃতীয়াংশ সময়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে। কিন্তু শাবানের মধ্য রজনীতে এ সময়কাল রাতের এক-তৃতীয়াংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, বরং সূর্যাস্ত থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত এর ব্যাপ্তি থাকে। এটাই এই রজনীর বৈশিষ্ট্য। …আর এটা স্পষ্ট যে, পূর্বে উল্লিখিত হাদীসগুলো দ্বারা এই আমলটা মুস্তাহাব সাব্যস্ত হবে। প্রসঙ্গত, ফাযায়েলের ক্ষেত্রে এই পর্যায়ের হাদীসের উপর আমল করা যায়। এমনটিই বলেছেন ইমাম আওযাঈ রহ.।
আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. শবে বরাত কেন্দ্রিক বিভিন্ন বেদআত ও গর্হিত কাজ সম্পর্কে বলেন,

ومن البدع الشنيعة ما تعارف الناس في أكثر بلاد الهند من إيقاد السرج ووضعها على البيوت والجدران وتفاخرهم بذلك واجتماهم اللهو واللعب بالنار وإحراق الكبريت فإنه لا أصل له في الكتب الصحيحة المعتبرة بل ولا في غير المعتبرة، ولم يرو فيها حديث لا ضعيف لا موضوع.
ولا يعتاد ذلك في غير بلاد الهند من الديار العربية من الحرمين الشريفين زادهما الله تعظيما وتشريفا ولا في غيرهما ولا في البلاد العجمية ما عدا بلاد الهند بل عسى أن يكون ذلك، وهو ظن الغالب اتخاذا من رسوم الهنود في إيقاد السرج للديوالي، فإن عامة الرسوم البدعة الشنيعة بقيت من أيام الكفر في الهند وشاعت في المسلمين بسبب المجاورة والاختلاط. …قال بعض المتأخرين من العلماء إن استحداث السرج الكثيرة زيادة على الحاجة لم يرد باستحبابه أثر في الشرع في موضع….قال علي بن إبراهيم وأول حدوث الوقيد من البرامكة وكانوا عبدة النار فلما أسلموا أدخلوا في الإسلام ما يموهون أنه من سنن الدين. …

আর শবে বরাত কেন্দ্রিক কিছু গর্হিত বিদআত প্রচলিত আছে, হিন্দুস্তানের অনেক এলাকার মানুষ এগুলোর সাথে পরিচিত। যেমন- বাতি প্রজ্জলিত করা এবং তা ঘর ও দেয়ালে রাখা। এগুলো নিয়ে অহমিকা ও উৎসবে মেতে ওঠা। আগুন (আতশবাজি) নিয়ে আমোদ প্রমোদ ও ক্রীড়া-তামাশায় সমবেত হওয়া। গন্ধক প্রজ্জলিত করা। গ্রহনযোগ্য বিশুদ্ধ কোনো কিতাবে, এমনকি অগ্রহনযোগ্য কোনো কিতাবেও এগুলোর কোনো ভিত্তি নেই। এ বিষয়ে যয়ীফ বা জাল পর্যায়ের কোনো হাদীসও বর্ণিত হয়নি। …
সাধারণত হিন্দুস্তানের বাইরে কোনো আরব রাষ্ট্র বা অনারব রাষ্ট্রে এগুলোর প্রচলন দেখা যায় না। যতটুকু মনে হয়, হিন্দুদের দেওয়ালি (দীপাবলি) উৎসব থেকে মুসলিম সমাজে এগুলোর অনুপ্রবেশ ঘটেছে। শুধু এটা নয়, মুসলিম সমাজে প্রচলিত অধিকাংশ বিদআতি প্রথাগুলোই হিন্দু সমাজ থেকে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে হিন্দু-মুসলিম পাশাপাশি বসবাস করার কারণে হিন্দুদের কিছু প্রথা মুসলিমদের মাঝেও দেখা যায়। …
শবে বরাত বা এ ধরণের নির্দিষ্ট রজনীতে প্রদীপ সজ্জার বিষয়ে পরবর্তী ওলামায়ে কেরাম বলেন, এটা গর্হিত বিদআত। প্রয়োজনের অতিরিক্ত অগ্নি প্রজ্জলন শরীয়তের দৃষ্টিতে কখনোই উত্তম কাজ হতে পারে না। আলী বিন ইব্রাহীম বলেন, অগ্নি প্রজ্জলনের প্রথার সূচনা হয়েছে বারামিক গোত্রের মাধ্যমে। তারা প্রথমে অগ্নি উপাসক ছিল। পরবর্তীতে যখন তারা ইসলাম গ্রহন করে, তখন এই প্রথাকে ইসলামের রীতিনীতির সাথে মিশিয়ে ফেলে। -মা সাবাতা বিসসুন্নাহ পৃ. ২০০-২১৫

৫.আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মিরী রহ. (১৩৫২ হি.) বলেন:

هذه الليلة البرائة وصح الروايات في فضل ليلة البراءة وأما ما ذكر ارباب الكتب من الضعاف والمنكرات فلا أصل له ….

শবে বরাত সম্পর্কে বেশ কিছু সহীহ রেওয়ায়াত রয়েছে। কিন্তু বিভিন্ন কিতাব-পত্রে (বিশেষ পদ্ধতির নামায সম্পর্কে যে সকল) যয়ীফ ও মুনকার বর্ণনা রয়েছে, তার কোনো ভিত্তি নেই। -আলআরফুশ শাযী (সুনানে তিরমিযির টীকা) ১/১৫২

৬.আল্লামা মুবারকপুরী (১৩৫৩ হি.) বলেন,

اعلم أنه قد ورد في فضيلة ليلة النصف من شعبان عدة أحاديث مجموعها يدل على أن لها أصلا … فهذه الأحاديث بمجموعها حجة على من زعم أنه لم يثبت في فضيلة ليلة النصف من شعبان شيء والله تعالى أعلم .

জেনে রাখ, চৌদ্দ শাবানের দিবাগত রাতের ফযীলতের বিষয় বেশ কিছু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যা সমষ্টিগতভাবে সাব্যস্ত করে যে, শরীঅতে এর ভিত্তি আছে। আর এসকল হাদীস সামগ্রিকভাবে ওই সকল লোকদের বিপক্ষে দলিল, যারা দবি করে যে, চৌদ্দ শাবানের দিবাগত রাতের ফযিলত সম্পর্কে কোনো হাদীস নেই। আল্লাহ অধিক অবগত। -তুহফাতুল আহওয়াযি ৩/৩৬৫

অন্যান্য যেসকল ইমাম চৌদ্দ শাবান দিবাগত রাতে ইবাদত বন্দেগি করা উত্তম বা মুস্তাহাব বলেছেন, তাদের কয়েকজনের নাম;
১. ইমাম শাফিঈ (রহ.)। -কিতাবুল উম্ম ২/৪৮৫
২. ইবনে আবিদীন শামি। -রদ্দুল মুহতার ২/২৪-২৫
৩. ইবনে নুজাইম। -আলবাহরুর রাইক ২/৫৬

ঙ) শবে বরাতকে কেন্দ্র করে বিশেষ নামাজের প্রথা

১. আল্লামা তাহের পাটনী ( ৯৮৬ হি.) বলেন,

وأول حدوث هذه الصلاة ببيت المقدس سنة ثماني وأربعين وأربع مئة… وقال زيد بن أسلم : ما أدركنا أحدا من مشايخنا وفقهائنا يلتفتون إلى ليلة البراءة وفضلها على غيرها. وقال ابن دحية : أحاديث صلاة البراءة موضوعة .

এই নামাজের প্রচলন সর্ব প্রথম ৪৪৮ হিজরীতে শুরু হয়, বায়তুল মুকাদ্দাসে। যায়েদ বিন আসলাম বলেন, আমি কোনো মাশায়েখ এবং ফকীহদের মাঝে এমন কাউকে দেখিনি, যিনি শবে বরাতের রাত বা অন্য কোনো রাতের উপর এ রাতের ফযীলতের প্রতি ভ্রুক্ষেপ করেছেন। ইবনে দিহয়া বলেন, শবে বরাতের (নির্ধারিত) নামাজ সংক্রান্ত সবগুলো হাদীস মাউযু। -তাযকিরাতুল মাউযুআত পৃ. ৪৫-৪৬
উল্লেখ্য, শবে বরাতের দিন নামায আদায়ের বিশেষ পদ্ধতি বর্ণনা করে মাওযুআতের কিতাবে অনেকগুলো বর্ণনা এসেছে। যেমন, সালাতুর রাগাইব ইত্যাদি। সালাতুর রাগাইব নামে বিশেষ এক ধরনের নামাযের প্রচলন হিজরি চতুর্থ শতকেরও পরে হয়েছে। যা সম্পূর্ণ জাল হাদীস নির্ভর। অনেকে সালাতুর রাগাইবের সূচনাকে মনে করে শবে বরাতের সূচনা। আবার অনেকে চৌদ্দ শাবানের রাতে নির্দিষ্ট পদ্ধতির নামাযের ফযিলত সংক্রান্ত জাল এই মাওযু হাদীসগুলোর উপর ভিত্তি করে বলে দেয় যে, ‘শবে বরাত সম্পর্কে বর্ণিত সকল হাদীস মওযু ও ভিত্তিহীন। এবং এ বিষয়ে গ্রহনযোগ্য কোনো হাদীস পাওয়া যায় না।

২. ইবনুল কায়্যিম রহ. ‘আল-মানারুল মুনীফ’ কিতাবে চৌদ্দ শাবানের রাতে নির্দিষ্ট পদ্ধতির নামাযের ফযিলত সংক্রান্ত কিছু জাল হাদীস উল্লেখ করে বলেন,

والعجب ممن شم رائحة العلم بالسنن أن يغتر بمثل هذا الهذيان ويصليها . وهذه الصلاة وضعت في الإسلام بعد الأربع مئة ونشأت من بيت المقدس فوضع لها عدة أحاديث

আশ্চর্যের বিষয় হল, যারা সুন্নাহ’র ইলমের ঘ্রাণ পেয়েছে, তারা কিভাবে ঐ সকল ব্যক্তিদের প্রলাপে ধোঁকার শিকার হয়ে যায় এবং সেই (ভিত্তিহীন হাদীস নির্ভর বিশেষ পদ্ধতির) নামাযও তারা আদায় করে। অথচ এসকল সালাত তৈরী করা হয়েছে চারশত বছর পর এবং এর সূচনা হয় বায়তুল মুকাদ্দাস থেকে। এমনকি এবিষয়ে আরো কিছু ভিত্তিহীন হাদীস তৈরী করা হয়েছে। -আল মানারুল মুনীফ, ইবনুল কায়্যিম আল-জাওযিয়্যাহ, পৃ.৯৯

৩. হুবহু উক্ত কথাটিই বলেছেন মোল্লা আলী ক্বারী রহ. الأسرار المرفوعة কিতাবে। -আলআসরারুল মারফুআহ পৃ. ৪৪০।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে হককে হক হিসেবে গ্রহণ করার এবং বাতিলকে বর্জন করার তাওফিক নসিব করুন। আমিন

وصلى الله على سيدنا ومولانا محمد وعلى آله وصحبه وسلم

গ্রন্থপঞ্জি
১. মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, আবু বকর ইবনে আবি শাইবা (২৩৫ হি.), তাহকীক: শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামাহ, বৈরুত, লেবানন, ২০০৬ খ্রি.।
২. মুসনাদে আহমাদ, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (২৪১ হি.), তাহকীক: শায়খ শুআইব আলআরনাউত (১৪৩৮ হি.), মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০১৫ খ্রি.।
৩. সহীহ মুসলিম, ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ (২৬১ হি.), আল মাকতাবাতুল ইসলামিয়া, বাংলাবাজার, ঢাকা।
৪. সুনানে ইবনে মাজাহ, ইমাম মুহাম্মদ ইবনে ইয়াজিদ ইবনে মাজাহ (২৭৫ হি.), আল মাকতাবাতুল ইসলামিয়া, বাংলাবাজার, ঢাকা।
৫. সহীহ ইবনে হিব্বান, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে হিব্বান (৩৫৪ হি.), আর-রিসালাতুল আলামিয়্যাহ, দিমাশক, সিরিয়া।
৬. মাজমাউয যাওয়ায়েদ, নুরুদ্দীন হাইসামী (৮০৭ হি.), দারুল কিতাব আল আরাবী, বৈরুত, লেবানন।
৭. আল বাহরুর রায়েক, ইবনে নুজাইম (৯৭০ হি.), দারুল মা’আরেফা। (শামেলা)
৮. রদ্দুল মুহতার (ফাতাওয়া শামী), ইবনে আবেদীন শামী (১২৫২ হি.), দারুল ফিকর, বৈরুত।
৯. আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, মুনযিরী রহ. (৬৫৬ হি.), দারুল হাদীস, কায়রো, ১ম সংস্করণ, ১৯৯৪ খ্রি.।
১০. লাতাইফুল মাআরিফ, ইবনু রজব হাম্বলী (৬৯৫ হি.), দারুল হাদীস, কায়রো, মিশর।
১১. শুআবুল ঈমান, ইমাম বায়হাকী (৪৫৮হি.), দারুল কুতুবিল ‘ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, লেবানন, ১৯৯০ খ্রি.।
১২. ইকমালু তাহযিবিল কামাল, আলাউদ্দিন মুগলতায়ী (৭৬২ হি:), দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বয়রুত, লেবানন।
১৩. তাহযীবুত তাহযীব, ইবনে হাজার আলআসকালানী (৭৫২ হি.), দারুল কুতুব আলইলমিয়্যাহ, বয়রুত।
১৪. তাহযীবুল কামাল, আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ আলমিযযী (৭৪২ হি.), মুআস্সাসাতুর রিসালাহ, বয়রুত।
১৫. সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪২ হি.), মুআস্সাসাতুর রিসালাহ, বয়রুত।
১৬. মীযানুল ই’তিদাল, শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪২ হি.), দারুল ফিক্র।
১৭. আলকাশেফ, শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪২ হি.), দারুল কুরতুবা, বয়রুত।
১৮. তাযকিরাতুল হুফ্ফায, শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪২ হি.), দারুল কুতুব আলইলমিয়্যাহ, বয়রুত।
১৯. সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহা, শায়েখ মুহাম্মাদ আলবানী (১৪২০ হি.), মাকতাতুল মাআরিফ, রিয়াদ।
২০. তুহফাতুল আহওয়াযী শরহু জামিইত তিরমিযী, আব্দুর রহমান মুবারকপুরী (১৩৫৩ হি.), দারুল ফিক্র, লেবানন।
২১. আলমানারুল মুনীফ, ইবনুল কায়্যিম আল জাওযিয়্যাহ (৭৫১ হি.), মাকতাবাতুর রায়্যান, ঢাকা।
২২ আলআসারুল মারফুআ, আব্দুল হাই লাখনবী (১৩০৪ হি.), দারুল কুরআন ওয়াস সুন্নাহ।
২৩. আলফাওয়াইদুল মাজমুআ, ইমাম শাওকানী (১২৫০ হি.), আলমাকতাবাতুত তাওফীকিয়্যাহ।
২৪. আলআসরারুল মারফুআ ফীল আলখবারিল মাওযুআ, মুল্লা আলী আলক্বারী (১০১৪ হি.), আলমাকতাবাতুল ইসলামী।
২৫. তাফসীরে ইবনে কাসীর, হাফেয ইবনে কাসীর (৭৭৪ হি.), দারুল হাদীস আলক্বাহেরা।
২৬. কাশ্শাফুল কিনা’ আন মুতুনিল ইক্বনা, মানসুর ইবনে ইউনুস, দারুল ফিক্র, বয়রুত।
২৭. শরহুয যুরকানী আলা মাওয়াহিবিল লাদুন্নিয়া, মুহাম্মাদ যুরক্বানী (১১২২ হি.), দারুল কুতুব আলইলমিয়্যাহ। মাকতাবাতুশ শামেলা।
২৮. আলমাসনু ফী মা’রিফাতিল হাদীসিল মাউযু, মুহাদ্দিস আলী আলক্বারী আলহারাবী (১০১৪ হি.), মাকতাবাতুল মাতবুআত আলইসলামিয়াহ, হালাব, মাকতাবাতুশ শামেলা।
২৯. ফিরুযুল লুগাত, আলহাজ্ব মৌলুভী ফিরোজ উদ্দীন।
৩০. আলমাদখাল, ইমাম ইবনুল হাজ্জ রাহ. (৭৩৭হি.) (মাকতাবাতুল মুসাওয়ারাহ)।
৩১. তাযকিরাতুল মাউযুআত, মুহাম্মাদ তাহের বিন আলী আল হিন্দী (মাকতাবাতুল মুসাওয়ারাহ)।
৩২. ইকতিযাউস সিরাতিল মুস্তাকীম, শাইখুল ইসলাম আব্দুস সালাম ইবনে তাইমিয়া (৭৬৮ হি.), (মাকতাবাতুল মুসাওয়ারাহ)।
৩৩. মা সাবাতা বিসসুন্নাহ ফী আইয়ামিস সুন্নাহ, আব্দুল হক মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. (১০৫২ হি.), (মাকতাবাতুল মুসাওয়ারাহ)।
৩৪. যাওয়ায়েদে ইবনে মাজাহ, আব্দুর রহমান ইবনে ইসমাঈল আলবুসিরী (৮৪০ হি.), দারুল কুতুব আলইলমিয়্যাহ, লেবানন।
৩৫. আলমাসনু ফী মা’রিফাতিল হাদীসিল মাওযু, মুহাদ্দীস আলী আলক্বারী আলহারাবী (১০১৪ হি.), মাকতাবাতুর রাইয়্যান।