উলামা-মাশায়েখ, কিতাব-রিসালাহ, মুফতি আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদী হাফিযাহুল্লাহ

ইমাম মাহদির আগমন : সংশয় ও বাস্তবতা -মুফতি আবু ‍মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি (হাফিযাহুল্লাহ)

test

ইমাম মাহদির আগমন : সংশয় ও বাস্তবতা

ইমাম মাহদির আগমন, পরিচিতি, স্থান-কাল, মিথ্যা দাবিদার ও আমাদের করণীয় ইত্যাদির বিশ্লেষণ নিয়ে সংক্ষিপ্ত একটি প্রামাণ্য ফতোয়া।

মুফতি আবু মুহাম্মাদ আবদুল্লাহ আলমাহদি (হাফিযাহুল্লাহ)

পিডিএফ ডাউনলোড করুন

সূচিপত্র

প্রশ্ন:

সংক্ষিপ্ত উত্তর

প্রশ্ন-এক: ইমাম মাহদির আগমন সম্পর্কে কুরআন ‍সুন্নাহর নির্দেশনা কী?

ইমাম মাহদি সম্পর্কে কুরআন সুন্নাহর নির্দেশনা ও আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র আকিদা

একটি দুর্বল বর্ণনা

ইমাম মাহদি সম্পর্কে গ্রহণযোগ্য কিছু হাদীস

হাদীসগুলো থেকে আমরা যে তথ্যগুলো পেলাম

প্রশ্ন-দুই: ইমাম মাহদির আলামাত এবং তাঁকে চেনার উপায় কী?

ইমাম মাহদির সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আলামত.

প্রশ্ন-তিন: ইমাম মাহদি কি এসে গেছেন? না শীঘ্রই আসবেন?

প্রশ্ন-চার: ইমাম মাহদি কোথায় এবং কত সালে আসবেন? যারা সুনির্দিষ্টভাবে দিন-ক্ষণ ঠিক করে বলছেন, তাদের কথা ঠিক আছে কি?

মাহদি আ.-এর আগমনকাল ও স্থান

প্রশ্ন-পাঁচ: শুনেছি অতীতে কেউ মিথ্যা মাহদি দাবি করেছে, এটাও কি সম্ভব এবং বাস্তব?

মিথ্যা মাহদি দাবিদার

সর্বশেষ দাবিদার

প্রশ্ন-ছয়: ইমাম মাহদি যদি চলেই আসেন, তাহলে তাঁর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য আমরা কী করতে পারি? বা এই মুহূর্তে আমাদের করণীয় কী?

আমাদের করণীয়

বাড়াবাড়ি ও অতি উৎসাহ কাম্য নয়

কারা ইমাম মাহদির সঙ্গ দিবেন?

জরুরি সতর্কবার্তা!

 

প্রশ্ন: বর্তমানে আমরা অনেককে বলতে দেখছি, ইমাম মাহদি চলে এসেছেন, বা অতি শীঘ্রই চলে আসবেন। অনেকে বলছেন, ইমাম মাহদি ২০২০ সালেই আসবেন। কেউ বলছেন, ২০২১ এ আসবেন। কেউ বলছেন ২০২৪/২৫ এর মধ্যে আসবেন। এবার অনেকে এমনও বলছেন, ইমাম মাহদি ভারতীয় উপমহাদেশ কিংবা বাংলাদেশ থেকে হবেন। আর তাবলীগ জামাতের মাওলানা সাদ হবেন ইমাম মানসুর। এই প্রেক্ষাপটে আমার জানার বিষয় হল,

এক. ইমাম মাহদির আগমন সম্পর্কে কুরআন ‍সুন্নাহর নির্দেশনা কী?

দুই. ইমাম মাহদির আলামত এবং তাঁকে চেনার উপায় কী?

তিন. তিনি কি এসে গেছেন? না শীঘ্রই আসবেন?

চার. তিনি কোথায় এবং কত সালে আসবেন? যারা সুনির্দিষ্টভাবে দিন-ক্ষণ ঠিক করে বলছেন, তাদের কথা ঠিক আছে কি?

পাঁচ. শুনেছি অতীতে কেউ কেউ মিথ্যা মাহদি দাবি করেছে। এটাও কি সম্ভব এবং বাস্তব?

ছয়. ইমাম মাহদি যদি চলেই আসেন, তাহলে তাঁর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য আমরা কী করতে পারি? বা এই প্রেক্ষাপটে আমাদের করণীয় কী?

মেহেরবানি করে বিষয়গুলো কুরআন-সুন্নাহর আলোকে জানালে উপকৃত হব। এবিষয়ক নানান প্রচারণা দেখে বেশ পেরেশানিতে আছি।

নিবেদক,

আব্দুল কাদির,

বরগুনা সদর।

 

উত্তর:

بسم الله الرحمن الرحيم

প্রথম কথা

প্রথম কথা হচ্ছে, ইমাম মাহদি, ‘মাহদি’ হিসেবে প্রসিদ্ধ হলেও এটি মূলত তাঁর নাম নয়। হাদীসের বিবরণ অনুযায়ী তাঁর নাম হবে, ‘মুহাম্মাদ’ এবং পিতার নাম হবে, ‘আব্দুল্লাহ’; আমাদের প্রিয় রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও তাঁর পিতার নামের অনুরূপ। ‘মাহদি’ অর্থ হেদায়াতপ্রাপ্ত, সঠিক পথপ্রাপ্ত। তিনি যেহেতু আল্লাহর পক্ষ থেকে হেদায়াতপ্রাপ্ত হবেন এবং মানুষকে হেদায়াতের পথে আহ্বান করবেন, হেদায়াতের পথে পরিচালিত করবেন, তাই তিনি মাহদি নামে বিখ্যাত। একটি হাদীসেও তাঁকে ‘মাহদি’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

 

সংক্ষিপ্ত উত্তর

আমরা প্রতিটি প্রশ্নের দলিলভিত্তিক উত্তর পেশ করব ইনশাআল্লাহ। কিন্তু তাতে যথেষ্ট পরিমাণে, কুরআন সুন্নাহ ও বিভিন্ন কিতাবের আরবী পাঠ থাকায়, সাধারণ পাঠকের জন্য তা একটু ভারী ও কঠিন পাঠ্য মনে হতে পারে। তাই সাধারণ পাঠকের কাছে সহজবোধ্য করার জন্য, প্রথমে আমরা উত্তরের মূল কথাগুলোর সারসংক্ষেপ তুলে ধরছি।

এক. আহলুস সুন্নাহ ওয়ালা জামাআ’র আকিদা হল, শেষ যমানায় মুসলিমদের একজন ন্যায়পরায়ণ শাসকের আবির্ভাব হবে। তিনি মাহদি নামে বিখ্যাত হবেন, কিন্তু তাঁর মূল নাম হবে, ‘মুহাম্মাদ’। পিতার নাম হবে, ‘আব্দুল্লাহ’। তিনি হবেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশধর। তাঁর আবির্ভাব হলে, তাঁকে বাইয়াহ দেয়া এবং শাসক হিসেবে অনুসরণ করা মুসলিমদের কর্তব্য।

কেউ ইমাম মাহদির আগমনকে অস্বীকার করলে সে এবিষয়ে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ থেকে বিচ্যুত।

 

দুই. ইমাম মাহদির কিছু আলামত হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, যেগুলো আমরা সামনে আলোচনা করব ইনশাআল্লাহ। তবে সেগুলোর সঙ্গে তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলামত হল, তিনি পরিপূর্ণরূপে শরীয়তের অনুসারী হবেন। কুরআন সুন্নাহ’র খেলাফ কিছুই তিনি গ্রহণ করবেন না। অলীক স্বপ্ন ও মিথ্যা ইলহামের দাবি করে, ইলমের উসূল ও নীতি উপেক্ষা করে কুরআন সুন্নাহ’র অপব্যাখ্যা করবেন না। সুতরাং, ইমাম মাহদিকে চেনার ও পাওয়ার উপায় হল, শরীয়তের সহীহ ইলম অর্জন করে পূর্ণ শরীয়ত যথাযথভাবে বুঝা এবং সে অনুযায়ী আমলে সচেষ্ট হওয়া। তবেই তিনি পূর্ণ শরীয়তের পাবন্দ কি না, তা পরিমাপ করা সম্ভব হবে। অন্যথায় এ বিষয়ে বিজ্ঞ ও মুত্তাকী আলেমদের শরণাপন্ন হতে হবে। এদু’য়ের ব্যতিক্রম হলে, মিথ্যা দাবিদারদের চক্রান্তে বিভ্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা আছে।

তিন. তিনি এসেছেন বলে কোনো তথ্য প্রমাণ নেই এবং আমাদের জানামতে বর্তমানে কেউ এমন দাবিও করেননি। অতীতে যারা মিথ্যা দাবি করেছিল, তারা তার পরিণাম ভোগ করে দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। তবে তাঁর আগমনের সময় অত্যাসন্ন। শুধু তাঁর আগমনই নয়; বরং তাঁর পরে প্রকাশিতব্য কেয়ামতের অন্যান্য বড় বড় আলামতগুলো এবং কেয়ামতও খুবই সন্নিকটে। যা আরো দেড় হাজার বছর আগেই কুরআন সুন্নাহ’য় অসংখ্যবার পরিষ্কার ভাষায় বলা হয়েছে।

একটি বর্ণনায় পাওয়া যায়, ইমাম মাহদি পূর্ব দিক থেকে আসবেন, তবে এই বর্ণনাটির বিশুদ্ধতা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। এছাড়া তিনি কখন আসবেন, কোথা থেকে আসবেন, তার সুনির্দিষ্ট জায়গা বা দিন-ক্ষণ সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য কোনো তথ্য নেই। এগুলো জানার কোনো প্রয়োজনও মুসলিমদের নেই। এগুলো সম্পূর্ণই গায়েবের বিষয়, যা একমাত্র আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না, জানা সম্ভব নয়।

চার. সুতরাং, যারা এভাবে ইমাম মাহদির আগমনের সুনির্দিষ্ট জায়গা ও দিন-ক্ষণ ঠিক করে বলছেন, তা সবই ভিত্তিহীন। কোনো গ্রহণযোগ্য সূত্র ছাড়া শুধু ধারণার ভিত্তিতে এমন কথা-বার্তা বলে বেড়ানো শরীয়ত একদমই পছন্দ করে না; হাদীসের ভাষায় তা মিথ্যার অন্তর্ভুক্ত।

বাংলাদেশের জনৈক ব্যক্তি (প্রশ্নে সম্ভবত আপনি তার প্রতিই ইঙ্গিত করেছেন), বিভিন্ন অনির্ভরযোগ্য বর্ণনা, সংখ্যাতাত্ত্বিক আজগুবি বিশ্লেষণ, বিভিন্ন মিথ্যা স্বপ্ন, শয়তানি ইলহাম এবং কুরআন সুন্নাহর অপব্যাখ্যার মাধ্যমে, নিজেকে প্রতিশ্রুত ইমাম মাহদি হিসেবে দাবি করার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে গেছে বলে মনে হচ্ছে। একইভাবে সে তাবলীগ জামাআতের মাওলানা সাআদকে ইমাম মাহদির সহকারী ‘মানসুর’ও দাবি করছে।

স্বপ্ন ও সংখ্যাতত্ত্বের ভিত্তিতে সে কুরআন সুন্নাহর যে বিশ্লেষণ ও অপব্যাখ্যা করছে, তা সম্পূর্ণই তাফসীর ‘বির-রায়’, ইলহাদ ও যান্দাকা এবং সুস্পষ্ট গোমরাহি, যার সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। একজন মুমিনের জন্য তাতে প্রতারিত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

পাঁচ. অতীতে অনেক মিথ্যুক যেমন নবী দাবি করেছে, তেমনি অনেক ‍মিথ্যুক নিজেকে মাহদিও দাবি করেছে। মিথ্যা নবীর দাবিদার থাকতে পারলে মিথ্যা মাহদির দাবিদার থাকা জটিল কিছু নয়।

ছয়. আমাদের করণীয় হল, ইমাম মাহদি সম্পর্কে যতটুকু তথ্য নির্ভরযোগ্য সূত্রে বিদ্যমান, ততটুকু জেনে বিশ্বাস করা, তারপর শরীয়ত কোন পরিস্থিতিতে আমাদের উপর কী বিধান আরোপ করেছে, সেগুলোর ইলম অর্জন করে বেশি বেশি আমল করার চেষ্টা করা এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যত পরিস্থিতি ও পরকালের জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করা। বিশুদ্ধ ইলমের বাইরে ইমাম মাহদি ও কেয়ামতের অন্যান্য আলামতগুলো নিয়ে অতি মাত্রায় উৎসাহী না হওয়া এবং বেশি ঘাটাঘাটি না করা। এটা শরীয়তে পছন্দনীয় নয়। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের কর্তব্য হল, ইমাম মাহদির দাবিদার বা এমন কোনো বিষয় সামনে এলে তাড়াহুড়া করে নিজ থেকে সিদ্ধান্ত না নেয়া। বিজ্ঞ ও মুত্তাকী আলেমদের শরণাপন্ন হয়ে ধীরেসুস্থে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। অন্যথায় তাদের মিথ্যুকদের প্রতারণায় জড়িয়ে যাওয়ার সমূহ আশঙ্কা আছে, অতীত ইতিহাসে এমন অনেক ঘটনা ঘটেছে।

এবার আমরা প্রশ্নের পুনরাবৃত্তিসহ একটি একটি করে আপনার প্রশ্নগুলোর উত্তর পেশ করছি।

প্রশ্নএক: ইমাম মাহদির আগমন সম্পর্কে কুরআনসুন্নাহর নির্দেশনা কী?

উত্তর:

ইমাম  মাহদি  সম্পর্কে  কুরআন  সুন্নাহর নির্দেশনা ও আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর আকিদা

শেষ যমানায় ইমাম মাহদির আবির্ভাব ঘটবে এটি আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র আকিদা। বিষয়টি শরীয়তের সর্বসম্মত দলীল দ্বারা প্রমাণিত। তাতে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র উলামায়ে কেরামের কারও দ্বিমত নেই। সুতরাং, যারা তা বিশ্বাস করবে না, তারা এবিষয়ে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ থেকে বিচ্যুত।

কিন্তু একদিকে যেমন কুরআনে কারীমে এবিষয়ে কোনো তথ্য নেই, অপর দিকে সর্বাধিক সমাদৃত ও বিখ্যাত হাদীসের কিতাব; সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমের কোনো হাদীসেও সুস্পষ্ট করে তাঁর নাম উল্লেখ নেই। একারণে অনেকেই এবিষয়ে বিভ্রান্তির শিকার হয়েছেন বা বিভ্রান্তি সৃষ্টির অপচেষ্টা করেছে।

বাস্তবতা হল, ইমাম মাহদির আগমনের বিষয়টি এতো অধিক সংখ্যক হাদীসে বর্ণিত যে, এ ব্যাপারে উলামায়ে কেরাম বলেছেন, বিষয়টি মুতাওয়াতির সূত্রে প্রমাণিত। অর্থাৎ সমষ্টিগতভাবে মূল বিষয়টি এত অধিক সংখ্যক মানুষের বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত, যাদের মিথ্যার উপর ঐক্যবদ্ধ হওয়া সম্ভব নয়। সুতরাং, বলা যায়, ইমাম মাহদির আবির্ভাবের বিষয়টি অকাট্যভাবেই প্রমাণিত। বিষয়টি যেহেতু একটু স্পর্শকাতর এবং আকিদার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট, এজন্য আমরা এখানে উলামায়ে কেরামের বেশ কিছু উদ্ধৃতি এবং পরবর্তী শিরোনামে কিছু হাদীস পেশ করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। যাতে কারও সংশয়ের অবকাশ না থাকে এবং শয়তানের কুমন্ত্রণায় প্রভাবিত হওয়ার পথ বন্ধ হয়।

 

শায়খ আব্দুল মুহসিন আব্বাদ আলবাদর বলেন,

أن الاحاديث الواردة في المهدي لم ترد في الصحيحين على وجه التفصيل، بل جاءت مجملة، وقد وردت في غيرهما مفسرة لما فيهما، فقد يظن ظان أن ذلك يقلل من شأنها، وذلك خطا واضح، فالصحيح بل الحسن في غير الصحيحين مقبول معتمد عند اهل الحديث. -عقيدة أهل السنة والأثر في المهدي المنتظر، ص: 3، الناشر: الجامعة الإسلامية بالمدينة المنورة، السنة الأولى ، العدد الثالث ، ذو القعدة 1388هـ/شباط 1969م

“মাহদি বিষয়ক হাদীসগুলো সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে বিস্তারিত আসেনি। বরং সংক্ষিপ্তরূপে এসেছে। তবে হাদীসের অন্যান্য কিতাবে বুখারী ও মুসলিমের হাদীসগুলোর ব্যাখ্যা ও বিশদ বিবরণ রয়েছে। কেউ মনে করতে পারে, এ কারণে মাহদির সাথে সম্পৃক্ত হাদীসগুলোর মান কমে গেল। কিন্তু এটা সুস্পষ্ট ভ্রান্তি। কেননা সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে নেই, এমন সহীহ এমনকি হাসান হাদিসও মুহাদ্দিসগণের নিকট গ্রহণযোগ্য।” –আকিদাতু আহলিস সুন্নাতি ওয়াল আসার ফিল মাহদিয়্যিল মুনতাযার, পৃষ্ঠা: ৩

 

শায়খ সুলায়মান বিন নাসের আলআলওয়ান বলেন,

وعلامات المهدي الثابتة في الأحاديث الصحيحة واضحة المعالم فحذار حذار، من خرافات الرافضة في مهديهم، وحذار حذار، من ردّ الأحاديث الصحيحة…

وذهب أعداد من الناس في المهدي إلى مذاهب شتى

(1) – فقسم خرج عن الاعتدال الذي أمر الله به ورسوله، وترك الاتزان والوسطية في هذه القضية الكبيرة، والمسألة المهمة، وارتكب شططاً في إنكار المهدوية، وأنه خرافة لا حقيقة، وكذب جملة من الأحاديث المتواترة….

(2) – وقسم من البشرية، لم تصح الأحاديث لديهم، ولم يفهموا ما نقل عن النبي صلى الله عليه وسلم من الأحاديث في هذا الباب، وأدى إليهم اجتهادهم بعد البحث الشديد، وتحري الحق إلى إنكاره وعدم الإيمان به…

(3) – وقسم من الناس قبلوا كل ما هب ودب، ولم يكن لديهم فرقان بين الشحم والورم، فقبلوا الأخبار الموضوعة، والحكايات المكذوبة، والحجج الواهية وكانوا كحاطب ليل، وصارت أسانيدهم عن هيان بن بيان وطبقته وصنف من هؤلاء، يعيشون على الرؤى والمنامات، ويخلطون بين الحق والباطل والصدق والكذب، ويأتون إلى الأحاديث الصحيحة في المهدي فيربطونها بالأحاديث الضعيفة، ويخرجون بنتائج مضحكة، وأراء شاذة، وقد جزم أحدهم بتحديد وقت خروج المهدي بموت فلان أحد ملوك هذا العصر، وهذا من الجهل والتعويل على الظن الذي هو أكذب الحديث

(4) – وقسم صاروا في حيرة مظلمة، وتذبذب مَقيتْ، وفوضوية عريضة، فما بين مصدق ومكذب، ومنكر ومثبت، وقديماً قيل (لو سكت من لا يعلم لسقط الخلاف) ومع غياب العلماء والمصلحين تسود الفوضى، ويكثر اللغط، ويفتقد الانضباط والاعتدال، ويقول كل من المهوسين ومن في قلوبهم مرض أنا لها أنا لها، ويدلي كل بدلوه، ويتصدر للخوض في هذه المسائل من ليس للكلام أهلاً، وحين تختفي الأسود تظهر الثعالب….

(5) – وقسم عرفوا الحق فاتبعوه، فآمنوا في المهدي وصدقوا به، ويقولون بأنه من سلالة محمد بن عبد الله صلى الله عليه وسلم، وأنه من أهل بيت النبوة ومعدن الرسالة وأنه ليس بنبي ولا معصوم ولا يدعي النبوة، وأنه بشر كآحاد البشرية إلا أن الله اصطفاه وفضله على كثير ممن خلق تفضيلاً (وَاللَّهُ يَخْتَصُّ بِرَحْمَتِهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ) (ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ) وهؤلاء أئمة الحديث والمنتخبون من العلماء في كل عصر، فلا يبالغون في الإثبات، ويحددون خروجه بالرؤى والتكهنات، ولا ينكرون الروايات الثابتة، لقيام طوائف منحرفة، وجماعات ضالة تدعي في مهديها الظلوم، أنه الإمام المعصوم، فالحق هدى بين ضلالتين، ورحمة بين عذابين، ووسط بين باطلين. -النزعات في المهدي، ص: 2-5

“সহীহ হাদীসে বর্ণিত মাহদির আলামতসমূহ সুস্পষ্ট। সুতরাং, তোমাকে শিয়াদের মাহদি বিষয়ক অলীক কল্পকাহিনী হতে যেমন সতর্ক থাকতে হবে, তেমনি এবিষয়ের সহীহ হাদীসসমূহকে প্রত্যাখ্যান করা থেকেও বেঁচে থাকতে হবে।…

মানুষ মাহদির ব্যাপারে বিভিন্ন মত গ্রহণ করেছে।

১. একদল আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের নির্দেশিত মধ্যমপন্থা ত্যাগ করেছে এবং অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এই বিষয়টিতে মু’তাদিল ও ভারসাম্যপূর্ণ পথ ছেড়ে দিয়েছে। তারা মাহদির আকিদাকে অস্বীকার করতে গিয়ে প্রান্তিকতার শিকার হয়েছে। তারা দাবি করেছে, এটা সম্পূর্ণ বানোয়াট কাহিনী, এর কোনো বাস্তবতা নেই। তারা ‘মুতাওয়াতির’ সূত্রে বর্ণিত হাদীস সমষ্টিকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করেছে।….

২. আরেক দলের নিকট এ হাদীসগুলো সহীহ মনে হয়নি এবং তারা মাহদির বিষয়ে বর্ণিত হাদীসগুলো উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই গভীর গবেষণা ও অন্বেষার পরও তারা সত্যকে অস্বীকার করেছে এবং তার প্রতি ঈমান আনেনি।….

৩. এমন একদল লোক, যারা সব ধরনের বর্ণনা গ্রহণ করেছে। সহীহ-যয়ীফ নির্ণয় করতে পারেনি। চর্বি ও ফোস্কার মাঝে পার্থক্য করতে ব্যর্থ হয়েছে। তাই তারা মাহদির বিষয়ে জাল ও মিথ্যা বর্ণনাও গ্রহণ করেছে। তারা রাতের আঁধারে লাকড়ি সংগ্রহকারীর ন্যায় (যারা সাপের দংশন হতে নিরাপদ নয়)। তারা (অমুকের ছেলে তমুক, যার পৃথিবীতে কোনো অস্তিত্ব নেই, এমন) যয়ীফ, দুর্বল এবং মাজহুল ও অজ্ঞাত সব রাবীর হাদীসও গ্রহণ করেছে। কিছু লোক তো স্বপ্নেই বাঁচে, স্বপ্নেই মরে। তারা হক-বাতিল ও সত্য-মিথ্যা গুলিয়ে ফেলে। মাহদি সম্পর্কে বর্ণিত সহীহ হাদীসগুলোর সাথে জাল ও দুর্বল হাদীস জুড়ে দিয়ে তারা হাস্যকর ফলাফল ও বিচ্ছিন্ন মত বের করে। তাদের একজন তো সমসাময়িক শাসকদের একজনের মৃত্যুকে; মাহদির আগমনের সময় হিসেবে নির্ধারণও করে দিয়েছে। এটা হল মূর্খতা ও ধারণার উপর নির্ভর করা, যা (হাদীসের ভাষায়) বড় মিথ্যা।

৪. অপর আরেক দল সংশয়ে পতিত হয়েছে, দোটানা ও বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। তারা কখনো সত্যায়ন করে, কখনো মিথ্যারোপ করে, কখনো স্বীকার করে, কখনো অস্বীকার করে। প্রাচীন কাল থেকেই প্রবাদ আছে, ‘যে জানে না, সে যদি চুপ থাকত, তবে এত মতভেদ থাকত না’। বস্তুত আলেম ও সংস্কারকদের অবর্তমানে নৈরাজ্য ও ভুলভ্রান্তি ব্যাপক হয়ে যায়, শৃঙ্খলা ও মধ্যমপন্থা হারিয়ে যায়। নির্বোধ ও অন্তরের ব্যাধিগ্রস্ত লোকেরাও এ কাজের জন্য দাঁড়িয়ে যায়, তাতে অংশ নেয়। যারা এ বিষয়ে কথা বলার যোগ্য না, তারাও এ নিয়ে আলোচনায় লিপ্ত হয়। আসলে সিংহগুলো যখন অদৃশ্য হয়ে যায়, শিয়ালগুলো এমনিতেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠে।…

৫. আরেক দল সত্য অনুধাবন করেছেন এবং সত্যের অনুসরণ করেছেন। তারা মাহদির আগমনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছেন, তাকে সত্যায়ন করেছেন। তাঁরা বলেন, তিনি মুহাম্মদ বিন আব্দুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশধর, আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত। তবে তিনি নবী নন, মাসূম তথা ভুলক্রটির ঊর্ধ্বে নন এবং তিনি নবুওয়তের দাবীও করবেন না। তিনি একজন সাধারণ মানুষ। তাঁকে আল্লাহ তায়ালা নির্বাচন করেছেন এবং অনেক সৃষ্টির উপর মর্যাদা ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছেন।

وَاللَّهُ يَخْتَصُّ بِرَحْمَتِهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ

‘আল্লাহ তায়ালা যাকে ইচ্ছা নিজের রহমত দ্বারা বিশেষিত করেন, তিনি মহান অনুগ্রহের অধিকারী।’

ذَلِكَ فَضْلُ اللَّهِ يُؤْتِيهِ مَنْ يَشَاءُ وَاللَّهُ وَاسِعٌ عَلِيمٌ

‘এটা আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহ, আল্লাহ যাকে ইচ্ছা তা দান করেন, আল্লাহ তায়ালা প্রাচুর্যবান ও সর্বজ্ঞ।’

এ দলটিই হল প্রত্যেক যুগের নির্বাচিত আলেম ও মুহাদ্দিসগণ। তাঁরা স্বপ্ন ও গণনার মাধ্যমে মাহদির আগমনের সময় নির্ধারণ করেন না। কিছু ভ্রান্ত দল তাদের জালেম মাহদিকে মা’সূম ইমাম দাবী করার কারণে, তাঁরা মাহদির ব্যাপারে বর্ণিত সহীহ হাদীসগুলোকে অস্বীকারও করেন না। সুতরাং, হক ও সত্য হল, এই দুই ভ্রষ্টতার মাঝে অবস্থিত সঠিক পথ, দুই আযাবের মধ্যবর্তী রহমত এবং দুই বাতিলের মধ্যবর্তী মধ্যমপন্থা।” -আননাযাআত ফিল মাহদি, পৃ: ২-৫

 

আবুল হাসান আবুরি রহ. (৩৬৩ হি.) বলেন,

قد تواترت الأخبار واستفاضت [بكثرة رواتها عن المصطفى صلى الله عليه وسلم -يعني] في المهدي- وأنه من أهل بيت النبي صلى الله عليه وسلم، وأنه يملك سبع سنين، ويملأ الأرض عدلاً وأنه يخرج مع عيسى بن مريم، ويساعده في قتل الدجال بباب لد بأرض فلسطين، وأنه يؤم هذه الأمة، وعيسى -صلى الله عليه- يصلي خلفه. -مناقب الشافعي: 95

“মাহদির বিষয়ে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে অসংখ্য রাবীর বর্ণনার ভিত্তিতে ‘মুতাওয়াতির’ সনদে অনেক হাদীস বর্ণিত হয়েছে। (যে হাদীসগুলোতে এসেছে) তিনি হবেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশধর। তিনি সাত বছর রাজত্ব করবেন। যমিনকে ইনসাফ দ্বারা পরিপূর্ণ করে দিবেন। তিনি ঈসা আলাইহিস সালামের যমানা পাবেন এবং ফিলিস্তিনের বাবে লুদ নামক স্থানে দাজ্জালকে হত্যা করার ক্ষেত্রে ঈসা আলাইহিস সালামকে সাহায্য করবেন। তিনি এই উম্মতের ইমামত করবেন এবং ঈসা আলাইহিস সালাম তাঁর পেছনে সালাত আদায় করবেন।” -মানাকিবুশ শাফেয়ী, পৃ: ৯৫

 

মুহাম্মাদ আলবারযানজি রহ. (১১০৩ হি.) বলেন,

البَابُ الثّالث في الأَشْرَاطِ العِظَامِ وَالأَمَارَاتِ القَريبَةِ الّتي تَعْقُبُهَا السَّاعَةُ. وهي أيضًا كثيرة.

فمنها: المهدي (1): وهو أولها. واعلم؛ أن الأحاديث الواردة فيه على اختلاف رواياتها لا تكاد تنحصر. -الإشاعة لأشراط الساعة، طبع دار النشر جدة، ص: 175

“তৃতীয় অধ্যায়: কিয়ামতের বড় বড় আলামতসমূহের বর্ণনায়, যা কিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে ঘটবে এবং তার পরেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। এ ধরনের আলামতও অনেক।

একটি হল, মাহদি। (বড় আলামতগুলোর মধ্যে) এটি প্রথম। তাঁর আগমনের ব্যাপারে বিভিন্ন প্রকারের অসংখ্য হাদীস বর্ণিত হয়েছে।” -আলইশাআহ লি-আশরাতিস সাআহ, পৃ: ১৭৫

 

ইমাম শামসুদ্দীন সাফফারিনি রহ. (১১৮৮ হি.) বলেন,

وَالصَّوَابُ الَّذِي عَلَيْهِ أَهْلُ الْحَقِّ أَنَّ الْمَهْدِيَّ غَيْرُ عِيسَى وَأَنَّهُ يَخْرُجُ قَبْلَ نُزُولِ عِيسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ، وَقَدْ كَثُرَتْ بِخُرُوجِهِ الرِّوَايَاتُ حَتَّى بَلَغَتْ حَدَّ التَّوَاتُرِ الْمَعْنَوِيِّ وَشَاعَ ذَلِكَ بَيْنَ عُلَمَاءِ السُّنَّةِ حَتَّى عُدَّ مِنْ مُعْتَقَدَاتِهِمْ…….

وقد روي عمن ذكر من الصحابة وغير من ذكر منهم رضي الله عنهم بروايات متعددة ، وعن التابعين من بعدهم ما يفيد مجموعه العلم القطعي ، فالإيمان بخروج المهدي واجب كما هو مقرر عند أهل العلم ومُدوَّن في عقائد أهل السنة والجماعة

– لوامع الأنوار البهية وسواطع الأسرار الأثرية لشرح الدرة المضية في عقد الفرقة المرضية، ج:2، ص: 84

“উম্মাহর হকপন্থীদের গৃহীত সঠিক মত হল, একই ব্যক্তি ঈসা ও ‘মাহদি’ নন; বরং ‘মাহদি’ ভিন্ন ব্যক্তি। ঈসা আলাইহিস সালামের পূর্বেই তিনি আগমন করবেন। তাঁর আগমনের ব্যাপারে প্রচুর হাদীস বর্ণিত হয়েছে, এমনকি তা তাওয়াতুরে মা’নবী’র স্তরে পৌঁছে গেছে (যার মূল বিষয়টি এত অসংখ্য মানুষের বর্ণনা দ্বারা প্রমাণিত, যাদের মিথ্যার উপর ঐক্যবদ্ধ হওয়া সম্ভব নয়)। এ বিষয়টি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের উলামায়ে কেরামের কাছে এত ব্যাপকতা লাভ করেছে, যা তাদের আকিদায় পরিণত হয়েছে।….

(মাহদির বিষয়টি) পূর্বে আলোচিত ও অনালোচিত অনেক সাহাবি থেকে বিভিন্ন সূত্রে এবং তাঁদের পরবর্তী তাবেঈদের থেকে এমনভাবে বর্ণিত হয়েছে, যার কারণে সামগ্রিকভাবে বিষয়টি অকাট্য ও সন্দেহাতীত হয়ে গেছে। সুতরাং মাহদির আগমনের উপর ঈমান রাখা আবশ্যক। এবিষয়টি উলামায়ে কেরামের কাছে সুবিদিত এবং আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র আকিদার কিতাবপত্রে সংকলিত।” –লাওয়ামিউল আনওয়ারিল বাহিয়্যাহ…:২/৮৪

 

হাফেজ ইবনুল কাইয়িম রহ.কে (মৃত্যু: ৭৫১ হি.) এবিষয়ক একটি প্রশ্ন করা হলে, তিনি প্রথমে আবুল হাসান আবুরি রহ.-র উপরোক্ত উদ্ধৃতিটি উল্লেখ করেন। তারপর ইমাম মাহদি সম্পর্কে পনেরটির অধিক হাদীস এবং উলামায়ে কেরামের কিছু মতামত উল্লেখ করে বলেন,

وهذه بعض الأحاديث وإن كان في إسنادها بعض الضعف والغرابة، فهي مما يقوي بعضها بعضاً ويشد بعضها ببعض، فهذه أقوال أهل السنة. -المنار المنيف، فصل: 50، ص: 152

“এই হল (ইমাম মাহদি সম্পর্কিত) কিছু হাদীস, যেগুলোর সনদে (প্রত্যেকটিকে আলাদ বিচার করলে) কিছুটা দুর্বলতা থাকলেও, বর্ণনাগুলো পরস্পর পরস্পরকে শক্তিশালী করে। এগুলোই হল আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহ’র বক্তব্য।” -আলমানারুল মুনিফ, অধ্যায়: ৫০, পৃ. ১৫২

 

ইমাম শাওকানী রহ. (১২৫০ হি.) বলেন

الأحاديث في تواتر ما جاء في المهدي المنتظر التي أمكن الوقوف عليها منها خمسون حديثاً فيها الصحيح والحسن والضعيف المنجبر وهي متواترة بلا شك ولا شبهة، بل يَصْدُق وصف التواتر على ما هو دونها في جميع الاصطلاحات المحررة في الأصول، وأما الآثار عن الصحابة المصرحة بالمهدي فهي كثيرة أيضاً لها حكم الرفع إذ لا مجال للاجتهاد في مثل ذلك. التوضيح في تواتر ما جاء في المهدي المنتظر والدجال والمسيح. ورقة: (4، 5). -أشراط الساعة لعبد الله بن سليمان الغفيلي، طبع وزارة الشؤون الإسلامية والأوقاف والدعوة والإرشاد، المملكة العربية السعودية، 1422هـ.

“প্রতীক্ষিত মাহদি সংক্রান্ত হাদীসগুলো মুতাওয়াতির হওয়ার ক্ষেত্রে কথা হল, এ ব্যাপারে যতগুলো হাদীস সম্পর্কে অবগতি লাভ করা সম্ভব হয়েছে, সেগুলোর সংখ্যা পঞ্চাশ। যার মধ্যে কিছু হাদীস সহীহ, কিছু হাসান আর কিছু এমন যয়ীফ, যা অন্য বর্ণনার সমর্থনে গ্রহণযোগ্য। হাদীসগুলো নি:সন্দেহে মুতাওয়াতির। বরং উসূলে হাদীসের পরিভাষায় এর চেয়ে কম মানের হাদীসকেও ‘মুতাওয়াতির’ গুণে গুণান্বিত করা হয়। সাহাবায়ে কেরাম রাদিয়াল্লাহু আনহুম আজমাইন থেকে মাহদির ব্যাপারে সুস্পষ্টভাবে যে বর্ণনাগুলো এসেছে, সেগুলোর সংখ্যাও অনেক। তাদের এই বর্ণনাগুলোকেও হাদীসে ‘মারফূ’ ধরতে হবে। কারণ এই ধরনের বিষয়ে ইজতিহাদ চলে না।” –আততাওযীহ ফি মা তাওয়াতারা ফি নুযুলিল মাসিহ, পৃষ্ঠা ৪-৫

এছাড়াও আরও অসংখ্য উলামায়ে কেরাম বিষয়টি তাঁদের কিতাবে উল্লেখ করেছেন। যেমন হাফেজ আবু জাফর উকাইলি রহ. (মৃত্যু: ৩২২ হি.), ইমাম ইবনে হিব্বান রহ. (মৃত্যু: ৩৫৪ হি.), ইমাম খাত্তাবি রহ. (মৃত্যু: ৩৮৮ হি.), ইমাম বায়হাকি রহ. (মৃত্যু: ৪৫৮ হি.), কাজি ইয়ায রহ. (মৃত্যু: ৫৪৪ হি.), ইমাম কুরতুবি রহ. (মৃত্যু: ৬৭১ হি.), শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. (মৃত্যু ৭২৮ হি.) প্রমুখ।

 

একটি দুর্বল বর্ণনা

সুনানে ইবনে মাজাহর একটি বর্ণনার শেষাংশে এসেছে,

وَلَا الْمَهْدِيُّ إِلَّا عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ

“ঈসা ইবনে মারিয়ম ব্যতীত কোনো মাহদি নেই।”

এখান থেকে কেউ কেউ মাহদি আ.’র আগমনের বিষয়টিতে বিভ্রান্ত হয়েছে। আমরা এখানে আলোচনা সংক্ষিপ্তকরণের উদ্দেশ্যে, জামিয়া ইসলামিয়া মদীনা মুনাওয়ারার উস্তায; শায়খ আব্দুল ‍মুহসিন আব্বাদ আলবাদরের আকিদা বিষয়ক একটি গবেষণা প্রবন্ধ থেকে সংশ্লিষ্ট হাদীসটির পর্যালোচনা তুলে ধরছি। সচেতন পাঠকের জন্য এতটুকুই যথেষ্ট ইনশাআল্লাহ। তাঁর এই লেখাটি জামিয়ার মাজাল্লায় প্রকাশিত হয়েছিল ১৩৮৮ হি. যুলকা’দায় প্রথম বর্ষের প্রথম সংখ্যায়। সেখানে তিনি বলেন,

وقال الإمام محمد بن أحمد بن أبي بكر القرطبي صاحب التفسير المشهور المتوفى سنة 671هـ في كتابه التذكرة في أمور الآخرة بعد ذكر حديث “ولا مهدي إلا عيسى ابن مريم” “قال إسناده ضعيف والأحاديث عن النبي صلى الله عليه وسلم في التنصيص على خروج المهدي من عترته …. ثابتة أصح من هذا الحديث فالحكم بها دونه. ……

“…فأما حديث لا مهدي إلا عيسى ابن مريم فرواه ابن ماجه في سننه عن يوسف ابن عبد الأعلى عن الشافعي عن محمد بن خالد الجندي عن أبان بن صالح عن الحسن عن أنس بن مالك عن النبي صلى الله عليه وسلم وهو مما تفرد به محمد بن خالد

قال أبو الحسين محمد بن الحسين الآبري في كتاب مناقب الشافعي: محمد بن خالد هذا غير معروف عند أهل الصناعة من أهل العلم والنقل وقد تواترت الأخبار واستفاضت عن رسول الله صلى الله عليه وسلم بذكر المهدي وأنه من أهل بيته وأنه يملك سبع سنين وأنه يملأ الأرض عدلا وأن عيسى يخرج فيساعده على قتل الدجال وأنه يؤم هذه الأمة ويصلي عيسى خلفه.

وقال البيهقي تفرد به محمد بن خالد هذا وقد قال الحاكم أبو عبد الله هو مجهول ….-عن إبان بن أبي عياش-وهو متروك-عن الحسين عن النبي صلى الله عليه وسلم-وهو منقطع-والأحاديث على خروج المهدي أصح إسنادا،-عقيدة أهل السنة والأثر في المهدي المنتظر، ص: 140-142، الناشر: مجلة الجامعة الإسلامية بالمدينة المنورة، العدد: السنة الأولى، العدد الثالث، ذو القعدة 1388هـ/شباط 1969م

ملاحظة: يقول الراقم أبو محمد عبد الله المهدي عفي عنه: نحن في هذه العجالة لم نتمكن من مراجعة بعض النصوص إلى مصادرها الأصلية، فاعتمدنا فيها على المتأخرين الذين نقلوها في كتابتهم وهم ممن يُعتمد عليهم، وهذا قليل جدا وفي مستوى لا تؤثر استناد الفتوى بإذن الله، ودُفِعنا إلى هذا التسرع لإصدار الفتوى مع أنه خلاف الأصول، لأننا رأينا دجالا من الدجاجلة على وشك الظهور بدعوى المهدي المنتظر الكذبة المنتنة، وبعض الجهلة من أتباعه في بهجة وسرور من عُدَّته للظهور، وسمي في زمرتهم رجل ضال مطاع في العالم دينا، وإمام من الأئمة المضلين، فخشينا افتتان المسلمين الجهلاء من دجلهم وكذبهم، يجب علينا تنبيههم قبل تورطهم فريسة لشبكة دجاجلة العصر، ولا قدره الله، وأعاذنا الله من جميع الشرور والفتن ما ظهر منها وما بطن.

 “বিখ্যাত তাফসীর গ্রন্থকার, ইমাম মুহাম্মাদ বিন আহমাদ বিন আবু বকর কুরতুবি; মৃত্যু: ৬৭১ হি., তাঁর গ্রন্থ ‘আততাযকিরাহ ফি উমূরিল আখিরাহ’য় উক্ত হাদীসটি উল্লেখ করে বলেন, এই হাদীসের সনদ দুর্বল। পক্ষান্তরে মাহদির আবির্ভাবের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে সুস্পষ্ট অনেক হাদীস প্রমাণিত এবং উক্ত হাদীস থেকে বিশুদ্ধ। সুতরাং, হাদীস সেগুলোই গ্রহণযোগ্য, এটা নয়।…..

ঈসা ইবনে মারিয়াম ব্যতীত কোনো মাহদি নেই, উক্ত হাদীসটি ইবনে মাজাহ রহ. তাঁর সুনানে নিন্মোক্ত সূত্রে বর্ণনা করেছেন। ইবনে মাজাহ ইউসুফ বিন আব্দুল আ’লা থেকে, তিনি শাফেই থেকে, তিনি মুহাম্মাদ বিন খালিদ জানাদি থেকে, তিনি আবান ইবনে সালিহ থেকে, তিনি হাসান থেকে, তিনি আনাস ইবনে মালিক থেকে, তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে। এখানে মুহাম্মাদ ইবনে খালেদ নামে যে বর্ণনাকারী আছেন, হাদীসটি তার একক সূত্র ব্যতীত অন্য কোনো সূত্রে বর্ণিত হয়নি।

আবুল হোসাইন মুহাম্মাদ বিন আবুরি রহ. তাঁর কিতাব ‘মানাকিবুশ শাফেয়ী’তে বলেন, এই মুহাম্মাদ ইবনে খালিদ বিশেষজ্ঞ মুহাদ্দিসদের নিকট অজ্ঞাত। আর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে মুতাওয়াতির সূত্রে মাহদির কথা বর্ণিত হয়েছে, যেখানে বলা হয়েছে, তিনি আহলে বাইতের অন্তর্ভুক্ত হবেন এবং সাত বছর রাজত্ব করবেন। তিনি ন্যায়পরায়ণতা দ্বারা যমিন পূর্ণ করে দিবেন। যখন ঈসা আ. আসবেন, দাজ্জালকে হত্যায় তিনি তাঁকে সাহায্য করবেন। তিনি এই উম্মতের ইমামতি করবেন এবং ঈসা আ. তাঁর পেছনে সালাত আদায় করবেন।

বায়হাকি রহ. বলেছেন, উক্ত বর্ণনাটি মুহাম্মাদ বিন খালেদ এককভাবে বর্ণনা করেছেন। হাকেম আবু আব্দুল্লাহ বলেছেন, তিনি অজ্ঞাত। তিনি বর্ণনা করেন আবান ইবনে আবি আইয়াশ থেকে, ইনি মাতরূক-প্রত্যাখ্যাত। তিনি বর্ণনা করেন হোসাইন থেকে এবং তিনি নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে। এটি ‘মুনকাতি’ ও বিচ্ছিন্ন। আর ইমাম মাহদির আবির্ভাবের ব্যাপারে হাদীসগুলো সনদের দিক থেকে বিশুদ্ধতম।” -আকিদাতু আহলিস সুন্নাতি ওয়াল আসার ফিল মাহদিয়্যিল মুনতাযার, পৃ. ১৪২

 

ইমাম মাহদি সম্পর্কে গ্রহণযোগ্য কিছু হাদীস

এখানে আমরা ইমাম মাহদি সম্পর্কে নমুনা হিসেবে নির্ভরযোগ্য সনদে বর্ণিত কিছু হাদীস উল্লেখ করব। একই সঙ্গে সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিম ব্যতীত অন্য হাদীসগুলোর নির্ভরযোগ্যতা সম্পর্কে হাদীস বিশারদদের সংক্ষিপ্ত মতামতও উল্লেখ করব ইনশাআল্লাহ।

 

এক.

عن أبي هريرة رضي الله عنه قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَيْفَ أَنْتُمْ إِذَا نَزَلَ ابْنُ مَرْيَمَ فِيكُمْ وَإِمَامُكُمْ مِنْكُمْ. -صحيح البخاري، رقم: 3449

“আবু হোরায়রা রা. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, কেমন হবে তোমাদের অবস্থা, যখন ঈসা ইবনে মারিয়াম তোমাদের মধ্যে অবরতণ করবেন এবং তোমাদের ইমাম হবে, তোমাদের মধ্য হতে!” -সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৩৪৪৯

 

দুই.

عن جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللهِ، يَقُولُ: سَمِعْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: «لَا تَزَالُ طَائِفَةٌ مِنْ أُمَّتِي يُقَاتِلُونَ عَلَى الْحَقِّ ظَاهِرِينَ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ»، قَالَ: ” فَيَنْزِلُ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، فَيَقُولُ أَمِيرُهُمْ: تَعَالَ صَلِّ لَنَا، فَيَقُولُ: لَا، إِنَّ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ أُمَرَاءُ تَكْرِمَةَ اللهِ هَذِهِ الْأُمَّةَ ” -صحيح مسلم، رقم: 247

وفي رواية: “فيقول أميرهم المهدي”  قال ابن القيم : إسناده جيد. -المنار المنيف، ص: 147، ط. مكتبة المطبوعات الإسلامية، المحقق: عبد الفتاح ابو غدة

“জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, ‘আমার উম্মতের একটি দল সর্বদা হকের উপর প্রতিষ্ঠিত থেকে কিতাল করতে থাকবে। কেয়ামত পর্যন্ত তারা বিজয়ী থাকবে।’ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘এরপর ঈসা ইবনে মারিয়াম আলাইহিস সালাম অবতরণ করবেন। সে দলটির আমীর তাঁকে বলবেন, আসুন! নামাযে আমাদের ইমাম হোন। তিনি বলবেন, না, (আমি ইমাম হব না) তোমাদের একজনই অন্যদের আমীর। (তাঁর নামায না পড়ানো, আর এই উম্মতের একজন তাঁর ও সকলের ইমাম হওয়া) আল্লাহ তায়ালার পক্ষ হতে এই উম্মতের জন্য সম্মাননা।” –সহীহ মুসলিম ২৪৭

অন্য একটি বর্ণনায় (সুস্পষ্টভাবে মাহদির উল্লেখ করে) বলা হয়েছে, ‘তাদের আমীর মাহদি বলবেন’। ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেছেন, ‘উক্ত বর্ণনাটির সনদ জায়্যিদ।’ –আলমানারুল মুনিফ: ৩৩৮

 

শায়খ আব্দুল মুহসিন আব্বাদ বলেন,

وقد أورد الشيخ صديق حسن في كتابه الإذاعة جملة كبيرة من أحاديث المهدي جعل آخرها حديث جابر المذكور عند مسلم ، ثم قال عقبة : وليس فيه ذكر المهدي ولكن لا محمل له ولأمثاله من الأحاديث إلا المهدي المنتظر كما دلت على ذلك الأخبار المتقدمة والآثار الكثيرة. -شرح سنن ابي داوود لعبد المحسن عباد، ج: 3، ص: 482

নবাব সিদ্দীক হাসান খান রহ. স্বীয় কিতাব ‘আলইযাআহ’য় মাহদির ব্যাপারে বর্ণিত হাদীসগুলোর মধ্য থেকে বেশ কিছু হাদীস উল্লেখ করেছেন। সবশেষে তিনি ইমাম মুসলিম রহ. কর্তৃক বর্ণিত জাবির রাদিয়াল্লাহু আনহুর উপরোক্ত হাদীসটি এনেছেন। এরপর বলেছেন, এই হাদীসটিতে মাহদির কথা সুস্পষ্টভাবে না থাকলেও, এই হাদীসটি এবং এজাতীয় অন্যান্য হাদীসগুলো, প্রতীক্ষিত মাহদির ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা ছাড়া অন্য কোনো অবকাশ নেই, যেমন পূর্বোক্ত হাদীস এবং (এমন) আরও অনেক হাদীস তা প্রমাণ করে। ” –আব্দুল মুহসিন আব্বাদ কৃত শরহু সুনানি আবি দাউদ: ৩/৪৮২

 

তিন.

أَنَّ عَائِشَةَ قَالَتْ عَبِثَ رَسُولُ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- فِى مَنَامِهِ فَقُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ صَنَعْتَ شَيْئًا فِى مَنَامِكَ لَمْ تَكُنْ تَفْعَلُهُ. فَقَالَ « الْعَجَبُ إِنَّ نَاسًا مِنْ أُمَّتِى يَؤُمُّونَ بِالْبَيْتِ بِرَجُلٍ مِنْ قُرَيْشٍ قَدْ لَجَأَ بِالْبَيْتِ حَتَّى إِذَا كَانُوا بِالْبَيْدَاءِ خُسِفَ بِهِمْ ». فَقُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّ الطَّرِيقَ قَدْ يَجْمَعُ النَّاسَ. قَالَ « نَعَمْ فِيهِمُ الْمُسْتَبْصِرُ وَالْمَجْبُورُ وَابْنُ السَّبِيلِ يَهْلِكُونَ مَهْلَكًا وَاحِدًا وَيَصْدُرُونَ مَصَادِرَ شَتَّى يَبْعَثُهُمُ اللَّهُ عَلَى نِيَّاتِهِمْ ». -صحيح مسلم، رقم: 7426

“আয়েশা রা. বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদিন ঘুমে অস্বাভাবিক নড়াচড়া করলেন। বললাম, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ, আজ আপনি ঘুমে এমন কিছু করলেন, যা আগে কখনো করেননি’। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘আশ্চর্য! আমার উম্মতের একদল বাইতুল্লায় আশ্রয় নেয়া কুরাইশের এক ব্যক্তিকে আক্রমণের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেবে। তারা যখন বাইদায় পৌঁছবে, তাদেরকে যমিনে ধসিয়ে দেয়া হবে’। বললাম, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! রাস্তায় তো অনেক মানুষ থাকে?!’ তিনি বললেন, ‘হ্যাঁ, তাদের মধ্যে কেউ বুঝেশুনে আসবে, কেউ বাধ্য হয়ে আসবে, কেউ পথিক হবে। সকলকে একসঙ্গে ধসিয়ে দেয়া হবে। তবে তাদের পুনরুত্থানের সময় যার যার নিয়ত অনুসারে আলাদা করা হবে’।” -সহীহ মুসলিম: ৭৪২৬

 

চার.

عن ثوبان رضي الله عنه قال : قال رسول الله صلى الله عليه و سلم: يقتتل عند كنزكم ثلاثة كلهم ابن خليفة ثم لا يصير إلى واحد منهم ثم تطلع الرايات السود قبل المشرق فيقاتلونكم قتالا لم يقاتله قوم ثم ذكر شيئا فقال: إذا رأيتموه فبايعوه و لو حبوا على الثلج فإنه خليفة الله المهدي. هذا حديث صحيح على شرط الشيخين. تعليق الذهبي في التلخيص: على شرط البخاري ومسلم. -المستدرك على الصحيحين، مع تحقيق : مصطفى عبد القادر عطا، مع الكتاب : تعليقات الذهبي في التلخيص، دار الكتب العلمية، رقم الحديث: 8432

وقال ابن كثير في النهاية في الفتن والملاحم: إسناده قوي صحيح، ص: 55، وقال البوصيري في مصباح الزجاجة: هذا إسناد صحيح رجاله ثقات، ج: 2، ص: 298

قال الألباني: لكن الحديث صحيح المعنى، دون قوله: فإن فيها خليفة الله المهدي. -سلسلة الأحاديث الضعيفة: ج 1، ص: 162

“সাওবান রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, তোমাদের এই গুপ্তধনের নিকট খলিফার তিন ছেলে যুদ্ধ করবে, কিন্তু তারা কেউই তা পাবে না। অতঃপর পূর্বদিক হতে কালো পতাকার আবির্ভাব হবে, তারা তোমাদের সঙ্গে এমন কিতাল করবে, যা (ইতিপূর্বে) কোনো জাতি করেনি। এরপর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো কিছু বললেন, (যা আমার স্মরণ নেই)। তোমরা যখন তাকে দেখবে, তার হাতে বাইয়াত হবে, যদি বরফের উপর হামাগুড়ি দিয়ে যেতে হয়, তবুও…।” –মুস্তাদরাকে হাকেম, হাদীস: ৮৪৩২

“ইবনে কাসীর রহ. স্বীয় কিতাব ‘আননিহায়াহ ফিলফিতানি ওয়াল মালাহিম’-এ বলেছেন, এই হাদীসটির সনদ শক্তিশালী ও সহীহ। পৃষ্ঠা: ৫৫।

বূসিরি রহ. ‘মিসবাহুয যুজাজায়’ বলেছেন এই সনদটি সহীহ এবং রাবীরা সবাই নির্ভরযোগ্য। খণ্ড:২, পৃষ্ঠা: ১৯৮।

আলবানি রহ. সিলসিলাতুল আহাদিসিদ দাঈফায় বলেছেন, ‘তিনি আল্লাহর খলিফা’ এ অংশটি ব্যতীত হাদীসটি অর্থগত দিক থেকে বিশুদ্ধ। খণ্ড: ২, পৃষ্ঠা; ১৬২”

উল্লেখ্য, হাদীসটির শেষাংশে মাহদি সম্পর্কে বলা হয়েছে, ‘তিনি আল্লাহর খলিফা।’ কিন্তু মুহাদ্দিসগণ বলেছেন, বর্ণনার এ অংশটি নির্ভরযোগ্য সূত্রে নেই এবং এটি বিশুদ্ধও নয়।

তাছাড়া খলিফা হলেন এমন কেউ যিনি কারো অনুপস্থিতি কিংবা অক্ষমতার সময় তার প্রতিনিধিত্ব করেন। এটা আল্লাহর শানে প্রযোজ্য নয়। একারণে জুমহুর উলামায়ে কেরামের মতে, কাউকে আল্লাহর খলিফা বলা যায় না। বরং রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সফরের দোয়ায় বলেছেন, ‘হে আল্লাহ! আমার সম্পদ ও পরিবারে তুমি আমার খলিফা।’

 

ইমাম নববী রহ. বলেন,

ينبغي أن لا يُقال للقائم بأمر المسلمين خليفة اللّه، بل يُقال الخليفة، وخليفةُ رسولِ اللّه صلى اللّه عليه وسلم وأميرُ المؤمنين…..

وعن ابن أبي مُليكة أن رجلاً قال لأبي بكر الصديق رضي اللّه عنه : يا خليفة اللّه ! فقال : أنا خليفة محمد صلى اللّه عليه وسلم، وأنا راضٍ بذلك . -الأذكار، دار الفكر للطباعة والنشر والتوزيع، طبعة جديدة منقحة، 1414 هـ.، ج: 2، ص: 265-266

“মুসলিমদের শাসককে আল্লাহর খলিফা বলা ঠিক নয়; বরং খলিফা বা খলিফাতু রাসূলিল্লাহ কিংবা আমিরুল মুমিনিন বলা যায়।…

ইবনে আবি মুলাইকা থেকে বর্নিত, এক ব্যক্তি আবু বকর রা.কে ‘হে আল্লাহর খলিফা!’ বলে সম্বোধন করলে; তিনি বলেন, আমি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের খলিফা এবং আমি এতেই সন্তুষ্ট।” -আলআযকার: ২/২৬৫-২৬৬

বিষয়টি আরো বিস্তারিত দেখতে পারেন ফাতাওয়াল লাজনাতিদ দাইমাহ: ১/৩৩; সিলসিলাতুল আহাদিসিদ দাঈফাহ, আলবানি: ১/১৬২

 

পাঁচ.

عن أبي سعيد الخدري قال قال رسول الله صلى الله عليه و سلم “المهدي مني أجلى الجبهة أقنى الأنف يملأ الأرض قسطا وعدلا كما ملئت جورا وظلما ويملك سبع سنين” -رواه أبو داود في سننه برقم: 4285، وسكت عليه، طبع دار الفكر، وقال ابن القيم في المنار المنيف: “رَوَاهُ أَبُو دَاوُدَ بِإِسْنَادٍ جَيِّدٍ” رقم: 331

“আবু সাঈদ খুদরী রাযি. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘মাহদি আমার বংশোদ্ভূত হবেন, তার কপাল প্রশস্ত এবং নাক উঁচু ও সরু হবে। তিনি জুলুম-অত্যাচারে ভরা পৃথিবীকে ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতা দ্বারা পূর্ণ করে দিবেন। তিনি সাত বছর রাজত্ব করবেন।” –সুনানে আবু দাউদ : ৪২৮৫

 

ছয়.

عن عاصم عن زر عن عبد الله عن النبي صلى الله عليه وسلم قال يلي رجل من أهل بيتي يواطىء اسمه اسمي قال عاصم وأنا أبو صالح عن أبي هريرة قال لو لم يبق من الدنيا إلا يوم لطول الله ذلك اليوم حتى يلي. قال أبو عيسى هذا حديث حسن صحيح. -سنن الترمذي، رقم: 2231

“আসেম রহ. যির ইবনে হুবাইশ রহ.-এর সূত্রে আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমার বংশের এক ব্যক্তি (এই উম্মাহর) নেতৃত্ব গ্রহণ করবে, যার নাম হবে আমার নামের অনুরূপ, তার পিতার নাম হবে আমার পিতার নামের অনুরূপ।’

আসেম বলেন, আবু সালেহ রহ. আবু হোরায়রা রাযি. থেকে বর্ণনা করেন, ‘যদি দুনিয়ার মাত্র একটি দিনও বাকি থাকে, আল্লাহ তায়ালা সে দিনটিকেই দীর্ঘায়িত করবেন, যতক্ষণ না সে নেতৃত্ব গ্রহণ করে। আবু ঈসা (ইমাম তিরমিযি) বলেন, হাদীসটি হাসান সহীহ।” –সুনানে তিরমিযী, ২২৩১

 

সাত.

عن أبي سعيد الخدري رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: (أبشركم بالمهدي يبعث على اختلاف من الناس وزلازل، فيملأ الأرض قسطاً كما ملئت ظلماً وجوراً، فيرضى عنه ساكن السماء وساكن الأرض، يقسم المال صححاً، قال له رجل: ما صححاً؟ قال: بالسوية، ويملأ الله قلوب أمة محمد صلى الله عليه وسلم غناء، ويسعهم عدله)، إلى آخر الحديث.

قال الهيثمي في مجمع الزوائد: رواه الترمذي وغيره باختصار كثير رواه أحمد بأسانيد وأبو يعلى باختصار كثير ورجالهما ثقات. -مجمع الزوائد، ج: 7، ص: 610، رقم: 12393

“আবু সাঈদ খুদরী রাযি. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমি তোমাদেরকে মাহদির সুসংবাদ দিচ্ছি। মুসলমানদের মাঝে অনৈক্য ও অস্থিরতার সময় আল্লাহ তায়ালা তার আবির্ভাব ঘটাবেন। তিনি জুলুম-অত্যাচারে ভরা দুনিয়াকে ইনসাফ দ্বারা পূর্ণ করে দিবেন। আসমান ও যমিনের অধিবাসী সকলেই তার প্রতি সন্তুষ্ট থাকবে। তিনি সমভাবে সম্পদ বিলি করবেন। (তার সময়কালে) আল্লাহ তায়ালা উম্মতে মুহাম্মদীর অন্তর প্রাচুর্যে পূর্ণ করে দিবেন। তার ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতা সকলকে শামিল করবে।”

হাইসামি রহ. বলেন, ইমাম তিরমিযি ও অন্যান্যরা হাদীসটি অনেক সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। ইমাম আহমাদ কয়েকটি সনদে বর্ণনা করেছেন। আবু ইয়া’লাও অনেক সংক্ষেপে বর্ণনা করেছেন। উভয় সনদের রাবীগণই নির্ভরযোগ্য।-মাজমাউয যাওয়াইদ: ১২৩৯৩,

 

আট.

عن أبي هريرة رضي الله عنه عن النبي صلى الله عليه وسلم أنه قال: (يكون في أمتي المهدي إن قصر فسبع، وإلا فثمان، وإلا فتسع، تنعم أمتي فيها نعمة لم ينعموا مثلها، يرسل السماء عليهم مدراراً، ولا تدخر الأرض شيئاً من النبات والمال، يقوم الرجل فيقول: يا مهدي ! أعطني؟ فيقول: خذ).

قال الهيثمي: رواه الطبراني في الأوسط ورجاله ثقات. اهـ –مجمع الزوائد، رقم: 12411، ط. مكتبة القدسي، القاهرة.

“আবু হুরায়রা রাযি. হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমার উম্মাহর মাঝে মাহদির আগমন ঘটবে। তিনি কমপক্ষে সাত বছর, অন্যথায় আট বা নয় বছর রাজত্ব করবেন। তখন আমার উম্মত এমন সুখ-স্বাচ্ছন্দে বসবাস করবে, যে সুখ তারা ইতিপূর্বে কখনো ভোগ করেনি। আকাশ হতে প্রচুর বৃষ্টি হবে। যমিন তার ভেতর ফসল ও সম্পদ কিছুই মজুদ রাখবে না (সব প্রকাশ করে দিবে)। লোকে দাঁড়িয়ে বলবে, ‘হে মাহদি! আমাকে দিন’। মাহদি বলবেন, ‘(যত ইচ্ছা) নিয়ে যাও’।”

হাইসামী রহ. বলেন, ইমাম তাবারানী ‘আলআওসাতে’ হাদিসটি বর্ণনা করেছেন এবং এর বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য। –মাজমাউয যাওয়ায়িদ, হাদিস নং ১২৪১১,

 

নয়.

عن عبد الله بن مسعود رضي الله عنه عن رسول الله صلى الله عليه وآله وسلم أنه قال: (لو لم يبق من الدنيا إلا يوم لطول الله ذلك اليوم حتى يبعث فيه رجلاً مني أو من أهل بيتي يواطئ اسمه اسمي، واسم أبيه اسم أبي، يملأ الأرض قسطاً وعدلاً كما ملئت ظلماً وجوراً). -سنن ابي داود، رقم: 4282؛ ط. دار الرسالة العالمية، ت: شعَيب الأرنؤوط – محَمَّد كامِل قره بللي، قال الشيخ الأرنؤوط رحمه الله تعالى: صحيح لغيره. اهـ

قال الشيخ عبدالمحسن بن حمد العباد البدر في “عقيدة أهل السنة والاثر في المهدي المنتظر”، ص: 11: وهذا الحديث سكت عليه أبو داود و المنذري وكذا ابن القيم في تهذيب السنن، وقد أشار إلى صحته في المنار المنيف، وصححه ابن تيمية في منهاج السنة النبوية، وقد أورده البغوي في مصابيح السنة، وقال عنه الألباني في تخريج أحاديث المشكاة: وإسناده حسن. اهـ

“আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যদি দুনিয়ার মাত্র একটি দিনও বাকি থাকে, আল্লাহ তায়ালা সেই দিনটিকেই দীর্ঘায়িত করবেন, যতক্ষণ না তিনি আমার পরিবার হতে একজনকে বাদশাহ বানান, যার নাম হবে আমার নামের অনুরূপ এবং যার পিতার নাম হবে আমার পিতার নামের অনুরূপ। তিনি যমিনকে ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতা দ্বারা পূর্ণ করে দিবেন, যেমন তা অন্যায় অবিচারে পূর্ণ ছিল।” -সুনানে আবু দাউদ ৪২৮২

শায়খ আব্দুল মুহসিন আব্বাদ বলেন, “ইমাম আবু দাউদ, ইমাম মুনযিরী ও ইমাম ইবনুল কাইয়িম হাদিসটির ব্যাপারে চুপ থেকেছেন, (যা হাদিসটি গ্রহণযোগ্য হওয়ার ইঙ্গিত বহন করে)। ইমাম ইবনুল কাইয়িম ‘আলমানারুল মুনিফে’ হাদিসটি সহীহ হওয়ার ইঙ্গিত প্রদান করেছেন। ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ ‘মিনহাজুস সুন্নাহ’য় হাদিসটিকে সহীহ বলেছেন। আলবানী রহ. হাসান বলেছেন।” –আকিদাতু আহলিস সুন্নাতি ওয়াল আসার ফিল মাহদিয়্যিল মুনতাযার, পৃ. ১১

এছাড়াও আরো অনেক হাদীস এবিষয়ে বর্ণিত রয়েছে, শায়খ আব্দুল মুহসিন আব্বাদ মোট ২৬ জন সাহাবির নাম উল্লেখ করেছেন, যাঁদের থেকে মাহদি বিষয়ক হাদীস বর্ণিত হয়েছে।

৩৮ জন মুহাদ্দিসের নাম নিয়েছেন, যাঁরা এবিষয়ক হাদীস বর্ণনা করেছেন।

১০ জন বিশিষ্ট আলেমের নাম উল্লেখ করেছেন, যাঁরা এবিষয়ে স্বতন্ত্র রচনা করেছেন।

দেখুন ‘আকিদাতু আহলিস সুন্নাতি ওয়াল আসার ফিল মাহদিয়্যিল মুনতাযার’, মাজাল্লাতুল জামিয়াতিল ইসলামিয়্যাহ, মদীনা মুনাওয়ারা, সংখ্যা যুলকা’দাহ ১৩৮৮ হি. খণ্ড ১ পৃ. ১২৭।

আর যারা বিস্তারিত জানতে চান, তারা হাদীসের কিতাবগুলোর সংশ্লিষ্ট অধ্যায় কিংবা ইমাম মাহদি ও ‘আশরাতুস সাআ’হ তথা কেয়ামতের আলামতের উপর রচিত স্বতন্ত্র কিতাবগুলো দেখতে পারেন।

 

হাদীসগুলো থেকে আমরা যে তথ্যগুলো পেলাম

উপরোক্ত হাদীসগুলো থেকে ইমাম মাহদি সম্পর্কে যে তথ্যগুলো পেলাম, তা মোটামুটি নিম্নরূপ:

১. মাহদি আ. হবেন রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বংশধর। তাঁর নাম হবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের অনুরূপ, মুহাম্মাদ। তাঁর পিতার নাম হবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পিতার অনুরূপ, আব্দুল্লাহ।

২. মাহদি আ.-র কপাল প্রশস্ত হবে, নাক সরু হবে।

৩. মাহদির আত্মপ্রকাশের পর তাঁকে আক্রমণ করার জন্য একটি সৈন্য বাহিনী অগ্রসর হবে, যাদেরকে বাইদা নামক স্থানে ধসিয়ে দেয়া হবে।

৪. মাহদি, পূর্বদিক থেকে আগত কালো পতাকাবাহী মুজাহিদ দলে থাকবেন। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁকে বাইআহ দেয়ার নির্দেশ দিয়েছেন; যদি বরফের উপর হামাগুড়ি দিয়ে যেতে হয়, তবুও।

৫. মাহদি আ. যমিনে মুসলিমদের খলিফা হবেন।

৬. যমিন যখন জুলুম অত্যাচারে ভরে যাবে, তখন তিনি এসে তা ইনসাফ ও ন্যায়পরায়ণতা দিয়ে পরিপূর্ণ করে দিবেন।

৭. তিনি সাত থেকে নয় বছর রাজত্ব করবেন।

৮. মাহদি আ.র আগমন হবে, যখন মানুষের মাঝে চরম বিরোধ ও বিশৃঙ্খলা বিরাজ করবে। তিনি ইনসাফ ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা করবেন এবং মানুষকে হাত ভরে দান করবেন। তাঁর ইনসাফ ও বদান্যতার ফল পুরো মুসলিম উম্মাহ ভোগ করবে। আকাশ থেকে নেয়ামত বর্ষিত হবে। যমিন তার সকল সম্পদ বের করে দিবে। আসমান যমিনে সবাই তাঁর প্রতি খুশি থাকবেন।

৯. ইমাম মাহদি শেষ যামানায় আসবেন এবং শেষ যামানায় যখন নবী ঈসা আলাইহিস সালাম, আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের উম্মত হিসেবে আকাশ থেকে অবতরণ করবেন, তখন তাঁদের উভয়ের সাক্ষাত হবে।

১০. মাহদি, ঈসা আলাইহিস সালাম-কে ইমামতি করার প্রস্তাব করবেন, কিন্তু তিনি (ঈসা আলাইহিস সালাম) এ উম্মতের সম্মানার্থে তা গ্রহণ করবেন না।

 

প্রশ্ন দুই: ইমাম মাহদির আলামাত এবং তাঁকে চেনার উপায় কী?

উত্তর:

ইমাম মাহদির আলামত এবং তাঁকে চেনার উপায়

গ্রহনযোগ্য সূত্রে বর্ণিত উপরোক্ত কয়েকটি হাদীস (যেগুলো আমরা নমুনা হিসেবে উল্লেখ করলাম) থেকে ইমাম মাহদির পরিচয় ও আলামত সংক্রান্ত যে তথ্যগুলো আমরা পেলাম এবং এরকম আরো গ্রহণযোগ্য যে হাদীসগুলো আমরা উল্লেখ করিনি, তাতে যে আলামতগুলো এসেছে, স্বভাবতই সে আলামতগুলোই তাঁকে চেনার উপায়। তবে এখানে যে কথাটি মনে রাখতে হবে, তা হল সমষ্টিগতভাবে ইমাম মাহদির বিষয়টি সুপ্রমাণিত ও অকাট্য হলেও, প্রতিটি তথ্য এককভাবে এই স্তরের নয়। সুতরাং, উসূল ও মূলনীতির আলোকে একটি তথ্য গ্রহণযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত হওয়ার পরও, সামান্য হলেও এই আশঙ্কা থাকে যে, হয়তো বাস্তবে এই তথ্যটি সহীহ নাও হতে পারে। সমষ্টিগতভাবে গ্রহণযোগ্য ও অকাট্য আলামতের অর্থ হল, সবগুলো আলামতের আলোকে বিচার করলে একজন মুসলিম ইমাম মাহদিকে অবশ্যই চিহ্নিত করতে সক্ষম হবেন ইনশাআল্লাহ, যদিও সুনির্দিষ্ট কোনো এক বা একাধিক আলামতের ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমও ঘটতে পারে; যেহেতু প্রতিটি তথ্য স্বতন্ত্রভাবে অকাট্য নয়।

 

ইমাম মাহদির সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ আলামত

নিজের ঈমান হেফাজতের জন্য এবং বিভ্রান্তি থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য ইমাম মাহদির উপরোক্ত আলমাতগুলোর পাশাপাশি সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ ও সর্বসম্মত যে আলামতটি আমাকে মনে রাখতে হবে তা হল, তিনি হবেন শরীয়তের মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ এবং পরিপূর্ণ কুরআন সুন্নাহর অনুসারী একজন নেককার ব্যক্তি। যার ব্যাপারে বলা হবে ইনি মাহদি, তিনি মাহদি হতে হলে, শরীয়তের মাপকাঠিতে পরিপূর্ণ উত্তীর্ণ হতে হবে। তাঁর ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে শাসনকার্য পর্যন্ত, আকিদা আমল; সব কিছুই কুরআন সুন্নাহর আলোকে উত্তীর্ণ হতে হবে। পক্ষান্তরে, তিনি যদি পরিপূর্ণ কুরআন সুন্নাহর অনুসারী না হন, নিজের খাহেশ, স্বপ্ন, ইলহাম ইত্যাদিকে কুরআন সুন্নাহর উপর অগ্রাধিকার দেন, শরীয়তের ইলম উপেক্ষা করে কুরআন সুন্নাহর অপব্যাখ্যা করেন, কুরআন সুন্নাহ বাদ দিয়ে মানব রচিত আইনে শাসন ও বিচারকার্য সম্পাদন করেন, তাহলে তিনি মাহদি নন।

এমনিভাবে কোনো মুসলিম যদি তার চলমান জীবনে সাধ্য অনুযায়ী শরীয়তের উপর পরিপূর্ণভাবে অবিচল থাকে এবং ইলম আকিদা ও আমলের ক্ষেত্রে সকল ফরিযা ও দায়িত্ব আদায়ে সচেষ্ট থাকে, তাহলে তার যাপিত জীবন, ইমাম মাহদির প্রতিটি কার্যক্রমের সঙ্গে মিলে যাবে। মাহদিকে খুঁজে পেতে তার কোনো ভুল হবে না ইনশাআল্লাহ।

কোনো মুসলিম যখন পূর্ণাঙ্গ শরীয়তের উপর চলবে এবং শরীয়তের মাপকাঠিতেই কোন ইমামুল মুসলিমীনের হাতে বাইআত দিবে, তখন তার হাত কোনো সঠিক খলিফাতুল মুসলিমীনের হাতেই পড়বে। সে মাহদি হলে ভালো। মাহদি না হলেও শরীয়তের মাপকাঠিতে উত্তীর্ণ হওয়ায় তার এ বাইআত ভুল হবে না ইনশাআল্লাহ। সুতরাং সর্বাবস্থায় আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে শরীয়তের মাপকাঠিকে ঠিক রাখা এবং সে মাপকাঠির আলোকেই কাউকে গ্রহণ করা ও বর্জন করা।

 

প্রশ্ন-তিন: ইমাম মাহদি কি এসে গেছেন? না শীঘ্রই আসবেন?

উত্তর: ইমাম মাহদির এসে যাওয়ার দুটি অর্থ। একটি অর্থ হচ্ছে তাঁর পৃথিবীতে জন্ম গ্রহণ করা। আরেকটি হচ্ছে ইমাম ও খলিফা হিসেবে আবির্ভূত হওয়া।

তিনি জন্ম গ্রহণ করেছেন কি না, এমন কোনো তথ্য আমাদের জানা নেই। সম্ভবত তাঁর আবির্ভাবের পূর্বে নিশ্চিতভাবে তা জানার সুযোগও নেই। একটি বর্ণনায় আছে, আল্লাহ তাঁকে এক রাতে যোগ্য করে দিবেন; যদিও বর্ণনাটির বিশুদ্ধতা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। যারা বর্ণনাটি গ্রহণযোগ্য মনে করেন, তাঁদের কেউ কেউ বলেছেন, তিনি মাহদি হয়ে আবির্ভূত হবার আগে নিজেও জানবেন না, তিনিই প্রতিশ্রুত মাহদি। সুতরাং, অন্যদের জানার প্রশ্নই আসে না। তাছাড়া আমাদের নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযাসাল্লামও নবুওয়তপ্রাপ্তির পূর্বে নিজেও জানতেন না, তিনি প্রতিশ্রুত নবী। সুতরাং ইমাম মাহদিও না জানা খুবই স্বাভাবিক।

ইমাম মাহদির আগমনের দ্বিতীয় অর্থ হচ্ছে, তিনি কি আবির্ভূত হয়েছেন? উত্তর হল, না, তিনি আবির্ভূত হননি। আমাদের জানামতে এমন কোনো তথ্য প্রমাণ বা দাবিও কারো কাছে নেই এই মুহূর্তে। হলে আমরা জানব ইনশাআল্লাহ। তবে তাঁর আবির্ভাব খুব শীঘ্রই ঘটবে ইনশাআল্লাহ। শুধু তাই নয়; ইমাম মাহদিরও পরে প্রকাশিতব্য কেয়ামতের বড় বড় অন্যান্য নিদর্শনগুলোর প্রকাশ এবং কেয়ামতও খুব শীঘ্রই ঘটবে। এক্ষেত্রে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাজ্জালের মতো যেসব ভয়ঙ্কর ফিতনা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চেয়েছেন, আমরাও সেসব থেকে আল্লাহর আশ্রয় চাই। বিষয়গুলো যে খুব শীঘ্রই ঘটবে, সে কথা আজ থেকে দেড় হাজার বছর আগে খোদ কুরআনেই বলা হয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে,

اقْتَرَبَتِ السَّاعَةُ وَانْشَقَّ الْقَمَرُ. -القمر: 1

“কেয়ামত নিকটবর্তী হয়ে গেছে এবং চন্দ্র বিদীর্ণ হয়ে গেছে।” -সূরা কামার (৫৪) : ১

 

 

اقْتَرَبَ لِلنَّاسِ حِسَابُهُمْ وَهُمْ فِي غَفْلَةٍ مُعْرِضُونَ. -الانبياء: 1

“মানুষের হিসাব নিকাশের সময় আসন্ন। অথচ তারা গাফলতের মধ্যে বিমুখ হয়ে আছে।” -সূরা আম্বিয়া (২১): ১

 

রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তর্জনি ও মধ্যমা আঙ্গুল ‍দুটির দিকে ইঙ্গিত করে ইরশাদ করেন,

بُعِثْتُ أَنَا وَالسَّاعَةَ كَهَاتَيْنِ. -صحيح البخاري، رقم: 6504

“আমি ও কেয়ামত এই দুটি আঙ্গুলের মতো কাছাকাছি প্রেরিত হয়েছি।” -সহীহ বুখারী, হাদীস নং ৬৫০৪

কুরআন সুন্নাহয় এরকম আরো অসংখ্য নির্দেশনা আছে, যাতে সুস্পষ্ট বলা হয়েছে, কেয়ামত আসন্ন, খুবই নিকটবর্তী। খোদ রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আগমনই পৃথিবীর সময় শেষ হওয়ার এবং কেয়ামত নিকটবর্তী হওয়ার অন্যতম নিদর্শন। একারণে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দাজ্জালের ফিতনা থেকে আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। সাহাবায়ে কেরাম আশঙ্কা করতেন, কখন জানি দাজ্জাল চলে আসে। তাঁরাও এই ফিতনা থেকে আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করতেন।

কাজেই, যে বিষয়টিকে দেড় হাজার বছর আগেই কুরআন সুন্নাহ নিকটবর্তী বলেছে এবং সে জন্য আমলে অগ্রসর হওয়ার এবং পরকালের প্রস্তুতি গ্রহণের তাগিদ করা হয়েছে, সে বিষয়টিকে এখন দেড় হাজার বছর পরে এসে আদৌ অন্য কিছু বলার সুযোগ নেই। এটাই বলতে হবে এবং বিশ্বাস করতে হবে যে, কেয়ামত এবং কেয়ামতের অবশিষ্ট নিদর্শনগুলো খুবই নিকটবর্তী। তাছাড়া রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কেয়ামতের যতগুলো নিদর্শনের কথা বলে গেছেন, তার ছোট নিদর্শনগুলো প্রায় সবই বাস্তবায়িত হয়ে গেছে। উলামায়ে কেরাম বলেছেন, বড় আলামতগুলোর প্রথমটি হল ইমাম মাহদির আবির্ভাব। সুতরাং, মাহদির আবির্ভাব আসন্ন না হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

তবে ‘কাছে’-‘অনেক কাছে’, ‘দূরে’-‘অনেক দূরে’, এই কথাগুলো সব সময়ই আপেক্ষিক। সব ‘কাছে’ এবং সব ‘দূরে’র দূরত্ব কখনো এক হয় না। আমি যখন বলি সৌদি আরব থেকে পাকিস্তান অনেক কাছে, এবং বড় বাজার থেকে আড়ং বাজার অনেক কাছে, তখন দুই ‘কাছে’র অর্থ এক হয় না। সুতরাং, কুরআন সুন্নাহর কথাগুলো বুঝার জন্য আমাকে এটা মাথায় রেখেই বুঝতে হবে। তাহলে কেয়ামত অনেক কাছে বলার পরও; দেড় হাজার বছর পার হয়ে গেলেও কেয়ামত হল না? এমন কোনো প্রশ্ন হবে না। পৃথিবী তার জন্ম থেকে যে বিশাল সময় অতিবাহিত করেছে, সে হিসেবে দেড় হাজার বছর সময়টা অতি সামান্য নয় কি?

 

প্রশ্নচার: ইমাম মাহদি কোথায় এবং কত সালে আসবেন? যারা সুনির্দিষ্টভাবে দিন-ক্ষণ ঠিক করে বলছেন, তাদের কথা ঠিক আছে কি?

উত্তর:

মাহদি .-এর আগমনকাল ও স্থান

ইমাম মাহদির আগমন হবে শেষ যুগে। তবে তিনি কখন আসবেন, তার দিন-ক্ষণ আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুনির্দিষ্ট করে জানাননি। সুতরাং, এটি সম্পূর্ণ গায়েবের বিষয়।

قُلْ لَا يَعْلَمُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ الْغَيْبَ إِلَّا اللَّهُ. -النمل: 65

“আপনি বলে দিন, আকাশে যমিনে যারা আছে, তারা কেউ গায়েব জানে না, এক আল্লাহ ব্যতীত।” -সূরা নামল: ৬৫

একইভাবে তিনি কোথা থেকে আসবেন, এমন সুনির্দিষ্ট জায়গার কথাও কোনো বর্ণনায় নেই। একটি বর্ণনায় শুধু আছে, তিনি পূর্বদিক থেকে আসবেন। সেই বর্ণনাটির বিশুদ্ধতা নিয়েও মুহাদ্দিসদের মধ্যে মতভেদ রয়েছে।

সুতরাং, যারা সুনির্দিষ্ট করে দিনক্ষণ ও দেশের নামসহ বলছেন, তাদের এসব কথার নির্ভরযোগ্য কোনো ভিত্তি নেই। আর মুমিনের জন্য তা এভাবে জানার প্রয়োজনও নেই। প্রয়োজন থাকলে শরীয়ত অবশ্যই তা সুনির্দিষ্ট করেই জানিয়ে দিত। নির্ভরযোগ্য সূত্র ছাড়া এমন বিষয়ের পেছনে ছুটোছুটি করা, শরীয়তের দৃষ্টিতে বাড়াবাড়ির অন্তর্ভুক্ত, যা ইসলামে পছন্দনীয় নয়। সামনে এবিষয়ে আমরা উলামায়ে কেরামের কিছু উদ্ধৃতি পেশ করব ইনশাআল্লাহ।

 

প্রশ্ন-পাঁচ: শুনেছি অতীতে কেউ মিথ্যা মাহদি দাবি করেছে, এটাও কি সম্ভব এবং বাস্তব?

উত্তর: হ্যাঁ, খুবই সম্ভব এবং বাস্তব। মিথ্যাবাদী ও মূর্খরা যেখানে নবী দাবি করতে পর্যন্ত ন্যূনতম বিবেক বুদ্ধি খরচ করেনি, সেখানে তাদের জন্য মাহদি দাবি করা তো কোনো বিষয়ই নয়।

 

মিথ্যা মাহদি দাবিদার

এ পর্যন্ত যুগে যুগে পৃথিবীর বুকে অনেক মানুষই নিজেকে ইমাম মাহদি বলে মিথ্যা দাবি করেছে। অনেক মানুষ অজ্ঞতাবশত তাদের অনুসরণ করে বিভ্রান্ত হয়েছে। তারা সাধারণত ইলহামের নামে নিজেদের নফসের ধোঁকা ও শয়তানের কুমন্ত্রণা এবং মিথ্যা স্বপ্নকে ভিত্তি বানিয়ে এভাবে বিভ্রান্ত হয়েছে এবং করেছে। বস্তুত সত্য প্রমাণে শরীয়তে এগুলোর কোনো স্থান নেই। তারা যদি বিশুদ্ধ সূত্রে বর্ণিত গ্রহণযোগ্য হাদীসগুলোর আলোকেও বিচার করত, বুঝতে পারত, তারা প্রতিশ্রুত ইমাম মাহদি হওয়া সম্ভব নয়। এবিষয়ে যারা রচনা করেছেন, তারা অনেকেই এমন অনেক তথাকথিত মাহদির নাম ও পরিচয় নিজ নিজ রচনায় উল্লেখ করেছেন।

আবু কাতাদাহ আহমাদ বিন হাসান আলমুআল্লিম বলেন,

وإليك أسماء بعض من ادعى أنه المهدي نقلاً من رسالة: “الأحاديث الواردة في المهدي في ميزان الجرح والتعديل” لعبد العليم بن عبد العظيم:

1 – الحارث بن سريج، سنة 116 هـ.

2 – المهدي العباسي، ولد سنة 127 هـ.

3 – محمد بن عبد الله بن تومرت، ولد فيما بين 471 إلى 491 هـ.

4 – المهدي السوداني، محمد أحمد بن عبد الله، 1260 هـ.

5 – محمد الخونفري، ولد سنة 848 هـ.

– الفتن والأحداث التي تكون بين يدي المهدي، ص: 4 – المؤلف: أبو قتادة أحمد بن حسن المعلم.

يقول الراقم أبو محمد: لم أجد ضبط كلمة “الخونفري” فتركتها في الترجمة

“আমি আব্দুল আলীম বিন আব্দুল আজিম রচিত ‘আলআহাদীসুল ওয়ারিদাহ ফিল মাহদি ফি মিযানিল জারহি ওয়াততা’দিল’ কিতাব থেকে কিছু নাম তুলে ধরছি, যারা নিজেরদেরকে মাহদি দাবি করেছিল।

১. আলহারিস বিন সুরাইজ, ১১৬ হি.,

২. আলমাহদি আলআব্বাসি, জন্ম: ১২৭ হি.,

৩. মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ বিন তূমারত, ৪৭১ থেকে ৪৯১ হিজরির মধ্যে জন্ম,

৪. আলমাহদি আসসুদানি মুহাম্মাদ বিন আহমাদ বিন আব্দুল্লাহ, ১২৬০ হি.,

৫. মুহাম্মাদ আল খানফুরি, জন্ম: ৮৪৮ হি.।

 

শায়খুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন,

“وأعرف في زماننا غير واحد من المشايخ الذين فيهم زهد وعبادة، يظن كل واحد منهم أنه المهدي، وربما يخاطب أحدهم بذلك، ويكون المخاطب له بذلك الشيطان، وهو يظن أنه خطاب من الله، ويكون أحدهم اسمه أحمد بن إبراهيم، فيقال: محمد وأحمد سواء، وإبراهيم الخليل جد رسول الله صلى الله عليه وسلم، وأبوك إبراهيم، فقد واطأ اسمك اسمه، واسم أبيك اسم أبيه”. – منهاج السنة النبوية في نقض كلام الشيعة القدرية، ج: 8، ص: 259، مع تحقيق: محمد رشاد سالم، طبع جامعة الإمام محمد بن سعود الإسلامية، 1406 هـ – 1986 م

“আমি এ যুগের একাধিক শায়েখকে চিনি, যারা আবেদ ও যাহেদ। তাদের প্রত্যেকেই নিজেকে মাহদি মনে করে। অনেক সময় তাদের কাউকে এই নামে সম্বোধন করা হয়। আর সে নামে সম্বোধনকারী হল শয়তান। কিন্তু সে (সম্বোধিত ব্যক্তি) মনে করে, এটা আল্লাহর পক্ষ থেকে সম্বোধন। তাদের একজনের নাম আহমদ বিন ইবরাহীম। তাকে বলা হয়, ‘আহমাদ আর মুহাম্মাদ তো একই, আর ইবরাহীম খলিল হচ্ছেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের পরদাদা। তোমার বাবার নামও ইবরাহীম। অতএব তোমার নাম রাসূলের নামের সাথে মিলে গেল এবং তোমার বাবার নামও তাঁর বাবার নামের সাথে মিলে গেল’।” -মিনহাজুস সুন্নাহ ৮/২৫৯

 

শায়খ সুলায়মান বিন নাসের আলআলওয়ান বলেন,

وليس معنى ذلك أن يُتبع كل من يدعي المهدوية ويتزعمها، ويقول أنا لها، وأنا الحائز على شرفها، فالدجالون كثر، والمخرفون أكثر، ومن في قلوبهم مرض زاد شرهم وطغى، وفي كل يوم نسمع بمهوس يدعي المهدوية ويقول أنا المهدي المبشر به، وقد أوحت إليه الشياطين بهذا، فغرته وأردته الهاوية، والله تعالى يقول (وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَائِهِمْ) وقال تعالى (وَمَنْ يَعْشُ عَنْ ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَاناً فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ. وَإِنَّهُمْ لَيَصُدُّونَهُمْ عَنْ السَّبِيلِ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ مُهْتَدُونَ. حَتَّى إِذَا جَاءَنَا قَالَ يَا لَيْتَ بَيْنِي وَبَيْنَكَ بُعْدَ الْمَشْرِقَيْنِ فَبِئْسَ الْقَرِينُ) ولذلك صار هؤلاء فريسة رهطهم من الشياطين، وضُحكة المجتمع، وطُرفة الزمن، والبعض من هؤلاء يتورط فيها بسبب أحلام يظنها يقضه، وخيال يحسبه حقيقة (وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِقَوْمٍ سُوءاً فَلا مَرَدَّ لَهُ) وقدجروا بهذا الفعل القبيح، والعمل الفظيع على الأمة الإسلامية محناً، وأثمرت دعاويهم فتناً وحَكّمُوا عقولهم الفاسدة وآرائهم الكاسدة على الشريعة بدلاً من أن يحكموها (بِئْسَ لِلظَّالِمِينَ بَدَلاً). -النزعات في المهدي، ص: 12

“এর অর্থ এই না যে, যে কেউ মাহদি হওয়ার দাবি করবে, বলবে, ‘আমিই সেই মর্যাদার অধিকারী’, আর তারই অনুসরণ করা যাবে। কারণ মিথ্যাবাদী দাজ্জালের সংখ্যা অনেক। বিকারগ্রস্তের সংখ্যা আরো বেশি। যাদের অন্তরে ব্যাধি আছে, তারা এদের এই অনিষ্ট ও আত্মম্ভরিতাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। নিত্যদিনই শুনি, বুদ্ধি প্রতিবন্ধীরা মাহদি হওয়ার দাবি করছে। বলছে, ‘আমিই প্রতিশ্রুত মাহদি’। মূলত শয়তান এবিষয়ে তাদের নিকট অহি প্রেরণ করে তাকে ধোঁকাগ্রস্ত করে এবং ধ্বংস করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَائِهِمْ. -الأنعام: 6

‘নিশ্চয় শয়তান তার বন্ধুদের নিকট অহি প্রেরণ করে।’ -সূরা আনআম (৬) : ১২১

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَمَنْ يَعْشُ عَنْ ذِكْرِ الرَّحْمَنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَاناً فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ. وَإِنَّهُمْ لَيَصُدُّونَهُمْ عَنْ السَّبِيلِ وَيَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ مُهْتَدُونَ. حَتَّى إِذَا جَاءَنَا قَالَ يَا لَيْتَ بَيْنِي وَبَيْنَكَ بُعْدَ الْمَشْرِقَيْنِ فَبِئْسَ الْقَرِينُ. -الزخرف: 36

“এবং যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ হতে বিমুখ হয়, আমি তার জন্য নিয়োজিত করি এক শয়তান। অত:পর সে হয় তার সহচর। শয়তানরাই মানুষকে সৎ পথ হতে বিরত রাখে, অথচ তারা মনে করে সৎ পথে পরিচালিত হচ্ছে। অবশেষে যখন সে আমার নিকট উপস্থিত হবে, তখন সে শয়তানকে বলবে, ‘হায়! আমার ও তোমার মধ্যে যদি পূর্ব ও পশ্চিমের দূরত্ব থাকত! কতই না নিকৃষ্ট সহচর সে!” -সূরা যুখরুফ (৪৩) : ৩৬

 

এজন্য ওরা শয়তানের দলবলের শিকার হয় এবং সমাজ ও সময়ের হাসির পাত্রে পরিণত হয়। তাদের অনেকে তাতে জড়িত হয়, কিছু দু:স্বপ্নের কারণে, যেগুলোকে সে জাগ্রত অবস্থার ঘটনা মনে করে এবং এমন অলীক কল্পনার কারণে, যাকে সে হাকিকত ও বাস্তবতা মনে করে।

وَإِذَا أَرَادَ اللَّهُ بِقَوْمٍ سُوءاً فَلا مَرَدَّ لَهُ. -الرعد: 11

‘আল্লাহ যখন কোনো সম্প্রদায়ের অকল্যাণ ইচ্ছা করেন, তা রদ হবার নয়!’ -সূরা রাআদ (১৩): ১১

তারা এই খারাপ কাজ ও দুষ্কর্ম এবং এই দাবির মাধ্যমে উম্মাহর উপর বহু ফিতনা টেনে এনেছে, এবং তাতে তারা শরীয়তের পরিবর্তে নিজের বিকৃত বুদ্ধি ও বিকারগ্রস্ত চিন্তাকে মাপকাঠি হিসেবে গ্রহণ করেছে।

بِئْسَ لِلظَّالِمِينَ بَدَلاً

‘জালিমদের প্রতিদান কতই না মন্দ!’” -আননাযাআত ফিল মাহদি, পৃ. ১২

 

সর্বশেষ দাবিদার

সবশেষে হিজরি ১৪০০ সালের প্রথম দিন মোতাবেক ২০ শে নভেম্বর ১৯৭৯ ইং, মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ আলকাহতানি নিজেকে ইমাম মাহদি দাবি করে। মূলত তার ভগ্নীপতি জুহাইমান আলউতাইবি তার ২০০ সশস্ত্র অনুসারী নিয়ে এদিন কাবা চত্বর দখল করে মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ আলকাহতানিকে সামনে এনে ইমাম মাহদির আবির্ভাবের ঘোষণা দেয়। পরে সৌদি সৈন্যদের সঙ্গে তাদের ১৪ দিনের লড়াইয়ের পর পরিস্থিতির অবসান ঘটে। অনেকে নিহত হয়। জুহাইমানকে এই পদক্ষেপ থেকে বিরত রাখার জন্য, তারই কাফেলার এক আলেম সদস্য; আবু কাতাদাহ আহমাদ বিন হাসান আলমুয়াল্লিম, কুয়েত থেকে একটি কিতাব লিখে পাঠান। জুহাইমানের হারামে প্রবেশের পূর্বেই কিতাবটি তার হাতে পৌঁছানোর জন্য তিনি কিতাবটি পূর্ণ না করেই দূত মারফত পাঠিয়ে দেন। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ততক্ষণে জুহাইমান হারামে ভেতরে চলে যান। বাহক হারামের ফটকেই কিতাবসহ গ্রেফতার হন। একইভাবে পরে এই লেখককেও কুয়েত সরকার সৌদির হাতে হস্তান্তর করে। তিনি উক্ত কিতাবে প্রমাণ করেছেন, যে মুহাম্মাদ বিন আব্দুল্লাহ আলকাহতানি’র মাহদি হওয়ার দাবি নিয়ে তারা এগিয়ে যাচ্ছিলো, তার প্রতিশ্রুত মাহদি হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। উক্ত কিতাবে তিনি মিথ্যা মাহদি দাবিদারদের সম্পর্কে, সিদ্দীক হাসান খানের ‘আলইযাআহ’ থেকে একটি উদ্ধৃতি উল্লেখ করেন এভাবে,

“قلت: وادّعى حماعة من المشايخ والصوفية أنهم المهديون، ثم تابوا عن هذه الدعوى المنتنة، فهؤلاء الذين ادعوا المهدوية بالباطل واتبعهم بعض السفهاء، وحصلت منهم فتن ومفاسد كثيرة في الدين”.-الفتن والأحداث التي تكون بين يدي المهدي: ص:5

“মাশায়েখ এবং সূফীদের একদল নিজেদেরকে মাহদি বলে দাবি করেছে। অতঃপর তারা এই দুর্গন্ধযুক্ত দাবি থেকে তওবা করে ফিরে এসেছে। ঐসব মিথ্যা মাহদি দাবিদার এবং কতক নির্বোধ লোক, যারা তাদের অনুসরণ করেছে, তাদের দ্বারা দ্বীনের অনেক ক্ষতি হয়েছে, বিভিন্ন ফিতনা ফাসাদ সংঘটিত হয়েছে।” -আল ফিতান ওয়াল আহদাস: পৃ: ৫

 

প্রশ্নছয়: ইমাম মাহদি যদি চলেই আসেন, তাহলে তাঁর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার জন্য আমরা কী করতে পারি? বা এই মুহূর্তে আমাদের করণীয় কী?

উত্তর:

আমাদের করণীয়

ইমাম মাহদি সম্পর্কে বর্ণিত হাদীস ও উলামায়ে কেরামের বক্তব্য থেকে আরো যে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি সামনে আসে তা হল, তাঁর আগমন নিয়ে অতি মাত্রায় উৎসাহী হওয়া ও মাতামাতি করা কাম্য নয়। আমাদের করণীয় হল, ইমাম মাহদি সম্পর্কে যতটুকু তথ্য নির্ভরযোগ্য সুত্রে বিদ্যমান, ততটুকু বিশ্বাস করা, তারপর শরীয়ত কোন পরিস্থিতিতে আমাদের উপর কী বিধান আরোপ করেছে, সেগুলো জেনে আমল করা এবং সম্ভাব্য ভবিষ্যত পরিস্থিতি ও পরকালের জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করা।

আবু হোরায়রা রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে,

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ -صلى الله عليه وسلم- قَالَ « بَادِرُوا بِالأَعْمَالِ سِتًّا طُلُوعَ الشَّمْسِ مِنْ مَغْرِبِهَا أَوِ الدُّخَانَ أَوِ الدَّجَّالَ أَوِ الدَّابَّةَ أَوْ خَاصَّةَ أَحَدِكُمْ أَوْ أَمْرَ الْعَامَّةِ ».  -صحيح مسلم، رقم: 7584

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, ছয়টি বিষয় আসার পূর্বেই আমলে অগ্রসর হও। পশ্চিম দিক থেকে সূর্যোদয়, ধোঁয়া প্রকাশিত হওয়া, দাজ্জালের আবির্ভাব, যমিন থেকে প্রাণী বের হওয়া, নিজের মৃত্যু আসা কিংবা ব্যাপকভাবে সকলের উপর কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্বে।” -সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ৭৫৮৪

 

আনাস রা. থেকে একটি হাদীসে বর্ণিত হয়েছে,

عن النبي صلى الله عليه و سلم قال: ان قامت الساعة وفي يد أحدكم فسيلة فان استطاع أن لا تقوم حتى يغرسها فليغرسها. -الادب المفرد للبخاري، رقم: 479

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি কেয়ামত কায়েম হয়ে যায়, আর তোমাদের কারো হাতে একটি গাছের চারা থাকে, তাহলে কেয়ামত কায়েম হওয়ার আগে যদি সে চারাটি রোপণ করতে সক্ষম হয়, তবে সে যেন তা রোপণ করে দেয়।” -আলআদাবুল মুফরাদ, ইমাম বুখারী, হাদীস নং ৪৭৯

হাদীসটিতে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বুঝাতে চেয়েছেন, নেক আমলের সুযোগ যখন যতটুকু পাও, ততোটুকুই করে ফেল। সামনে কী হবে, সে চিন্তায় সময় নষ্ট করো না।

আবু কাতাদাহ আহমাদ বিন হাসান আলমুয়াল্লিম বলেন,

والذي يجب على كل مسلم هو اليقين التام بوقوع ما أخبر به النبي صلى الله عليه وسلم، وتحين وقوعه، والاستبشار به إن كان نافعاً، والخوف منه إن كان غير ذلك، مع مواصلة العمل في جوانب الجهاد والدعوة، وتعلم كتاب الله وسنة رسوله صلى الله عليه وسلم، والإعداد لذلك ما استطعنا من قوة، من غير إفراط ولا تفريط، فلا نعتمد على الأسباب، ونبذل المهج في تحصيلها، ولو من غير الطريق المشروع، ونقلل التوكل على الله، ولا نأخذ بجانب التوكل الذي ننبذ معه تعاطي الأسباب المشروعة، فإن من تمام التوكل على الله أن نتعاطى ما شرع الله لنا من أسباب، ورسولنا صلى الله عليه وسلم يقول: “اعقل وتوكل” كما في الترمذي وغيره.

وقد كان السلف الصالح رضوان الله عليهم حاملين سيوف الجهاد، ورافعين ألوية التوحيد، وعاملين في دنياهم بما شرع الله، مع أنهم كانوا يظنون أن الدجال في طائفة النخل، كما رواه مسلم وغيره. -الفتن والأحداث التي تكون بين يدي المهدي، من نشر منبر التوحيد، ص:6

“প্রত্যেক মুসলিমের জন্য জরুরি হল, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী সংঘটিত হওয়ার ব্যাপারে পূর্ণ বিশ্বাস রাখা, এর প্রতীক্ষায় থাকা এবং এর মাধ্যমে সুসংবাদ গ্রহণ করা, যদি সেটা কল্যাণকর হয়। অন্যথায় তা ভয় করা। পাশাপাশি জিহাদ ও দাওয়াহ সংশ্লিষ্ট কার্যক্রম চালিয়ে যাওয়া। আল্লাহর কিতাব এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহ শিক্ষা করা এবং বাড়াবাড়ি ও ছাড়াছাড়ি পরিহার করে মধ্যম পন্থায় জিহাদের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী প্রস্তুতি গ্রহণ করা। সুতরাং, আমরা আল্লাহর উপর ভরসার মাত্রা কমাবো না। আসবাব বা বস্তুর উপর এতটা নির্ভরশীল হবো না যে, আসবাব অর্জনের জন্য জীবন দিয়ে দিবো, যদিও তা শরীয়ত পরিপন্থী হয়। আবার এমন তাওয়াক্কুলও করবো না, যার কারণে শরীয়ত নির্দেশিত আসবাব গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকব। কেননা আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুলের পূর্ণতা হচ্ছে, আল্লাহ আমাদের জন্য যেসব আসবাব বৈধ করেছেন, তা গ্রহণ করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন: (উট) বেঁধে (আল্লাহর উপর) ভরসা কর, যেমনটা তিরমিযী এবং অন্যান্য কিতাবে এসেছে। সালাফে সালেহিন রাদিয়াল্লাহু আনহুম জিহাদের তরবারি উত্তোলন করতেন, তাওহীদের পতাকা উড্ডীন করতেন এবং দুনিয়াতে আল্লাহ তায়ালা তাঁদেরকে যে নির্দেশ দিয়েছেন তা পালন করতেন। অথচ তাঁরা (দাজ্জালের ব্যাপারে নবীজির অধিক সতর্কবাণীর কারণে) মনে করতেন, দাজ্জাল তাঁদের খুব নিকটেই মদীনার কোনো খেজুরবাগানে অবস্থান করছে, যেমনটি ইমাম মুসলিম রহ. বর্ণনা করেন।” –আলফিতান ওয়াল আহদাস, পৃ:৬

 

বাড়াবাড়ি ও অতি উৎসাহ কাম্য নয়

পক্ষান্তরে, শরীয়ত প্রদত্ত নির্ভরযোগ্য তথ্য উপাত্ত ও করণীয়তে সীমাবদ্ধ না থেকে, অতি উৎসাহ প্রদর্শন, সার্বক্ষণিক এটার পেছনে লেগে থাকা, অতি মাত্রায় আলোচনা পর্যালোচনা ও ঘাটাঘাটি করতে থাকা, বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘনের অন্তর্ভুক্ত, যা শরীয়ত পছন্দ করে না। এজাতীয় লোকদের সম্পর্কে সালাফে সালেহীনের নির্দেশনাগুলো লক্ষ্য করুন।

উল্লেখ্য, সালাফের নিম্নোক্ত উক্তিগুলো যথাযথ বুঝার জন্য একথাটি মাথায় রাখা জরুরি যে, তাঁরা এ কথাগুলো মূলত তাদের জন্য বলেছেন, যারা মুর্খ ও দুর্বল প্রকৃতির লোক। একারণে তারা এমন আবেগতাড়িত বিষয়ে বাড়াবাড়ি ও সীমা লঙ্ঘনের শিকার হয়ে যায়, ই’তেদাল ও মধ্যপন্থায় অবস্থান করতে পারে না। এই প্রকৃতির লোকদের দায়িত্ব হল, এবিষয়ে বিজ্ঞ আলেমদের অনুসরণ করা। অন্যথায়, তাদের গোমরাহ হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। একথাটি মাথায় না রাখলে তাদের বক্তব্যগুলো ভুল বুঝার আশঙ্কা আছে।

আবু নুআইম ইস্পাহানি রহ. (মৃত্যু: ৪৩০ হি.) সুফিয়ান সাওরি রহ. (মৃত্যু: ১৬১ হি.)-এর একটি বক্তব্য উদ্ধৃত করতে গিয়ে বলেন,

عن حفص بن غياث، قال: قلت لسفيان الثوري: يا أبا عبد الله إن الناس قد أكثروا في المهدي فما تقول فيه. قال: إن مر على بابك فلا تكن منه في شيء حتى يجتمع الناس عليه.-حلية الأولياء وطبقات الأصفياء، أبو نعيم الأصبهاني، ج:7، ص: 31، دار الكتاب العربي – بيروت، الطبعة الرابعة ، 1405هـ.

“হাফস ইবনে গিয়াস রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, “আমি সুফিয়ান সাওরিকে বললাম, হে আবু আবদুল্লাহ! মানুষ মাহদির ব্যাপারে খুব বেশি আলোচনা করছে, এ বিষয়ে আপনি কী বলেন’? তিনি বললেন, ‘তিনি যদি তোমার দরজার সামনে দিয়ে অতিক্রম করে, তবুও তুমি এবিষয়ে কিছু করবে না, যতক্ষণ না সবাই তাঁর ব্যাপারে ঐক্যবদ্ধ হয়’।” –হিলয়াতুল আউলিয়া, ৭/৩১

 

ইসলাম ওয়েবের একটি ফতোয়ায় বলা হয়েছে,

فالانشغال العملي بموضوع المهدي ومبايعته كثيرا ما كان مدعاة إلى الزلل والخطأ، فأدعياء المهدية كثر في القديم والحديث، وقد ذكر الذهبي في سير أعلام النبلاء: عن حفص بن غياث أنه قال لسفيان الثوري : يا أبا عبدالله ! إن الناس قد أكثروا في المهدي، فما تقول فيه ؟ قال : إن مر على بابك . فلا تكن فيه في شيء حتى يجتمع الناس عليه. اهـ

فهذا هو المسلك الرشيد والفهم السديد في هذه المسألة، فإن من أعظم علامة المهدي: اجتماع الناس على مبايعته. -اسلام ويب، رقم الفتوى: 151949

“মাহদি ও তাঁর বাইয়াতের বিষয়ে প্রায়োগিক পদক্ষেপ অনেক পরিমাণে স্খলন ও ভ্রান্তির শিকার করেছে। কারণ অতীতে ও বর্তমানে অনেকেই নিজেকে মাহদি দাবি করেছে।”

এরপর তিনি সুফিয়ান সাওরি রহ.র উপরোক্ত বাণীটি উদ্ধৃত করে বলেন, “এটাই এই মাসআলায় সঠিক পথ এবং সঠিক বুঝ। কারণ মাহদির বৃহত্তম একটি নিদর্শন হল, তাঁর বাইয়াতের উপর মানুষে ঐক্যবদ্ধ হওয়া।” -ইসলাম ওয়েব, ফতোয়া নং ১৫১৯৪৯

 

আব্দুর রাযযাক বিন হাসান দিমাশকি রহ. (মৃত্যু: ১৩৩৫ হি.) বলেন,

ويؤخذ من قوله صلى الله عليه وسلم في المهدي أنه يصلحه الله في ليلته أن المهدي لا يعلم بنفسه أنه المهدي المنتظر قبل وقت إرادة الله إظهاره، ويؤيد ذلك أن النبي صلى الله عليه وسلم وهو أشرف المخلوقات لم يعلم برسالته إلا وقت ظهور جبريل له بغار حراء حين قال له: ” اقرأ باسم ربك الذي خلق ” ….، فإذا كان النبي صلى الله عليه وسلم لم يعلم بأنه رسول الله صلى الله عليه وسلم إلا بعد ظهور جبريل عليه السلام له، وقوله: ” اقرأ باسم ربك ” فبالأولى أن المهدي المنتظر لا يعلم بأنه المهدي المنتظر إلا بعد إرادة الله إظهاره…..، فكل من يدعي أنه هو المهدي المنتظر ويطلب البيعة لنفسه أو يقاتل الناس لتحصيلها فهو مخالف لما صرحت به أحاديث النبي صلى الله عليه وسلم. -حلية البشر في تاريخ القرن الثالث عشر، ص: 809، مع تحقيق وتعليق حفيده: محمد بهجة البيطار – من أعضاء مجمع اللغة العربية، الناشر: دار صادر، بيروت، الطبعة: الثانية، 1413 هـ – 1993 م

“মাহদি সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী ‘আল্লাহ তাঁকে এক রাতে উপযুক্ত করে দিবেন’, এ থেকে বুঝা যায়, মাহদি নিজেই জানবেন না, তিনি প্রতীক্ষিত মাহদি, যতক্ষণ না আল্লাহ তাকে প্রকাশ করার ইচ্ছা করবেন। এটার সমর্থন পাওয়া যায়, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ঘটনা থেকে। তিনি আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ মাখলুক হওয়া সত্ত্বেও, হেরা গুহায় জিবরাইল আ. এসে ‘ইকরা বিসমি রাব্বিকা’ বলার আগ পর্যন্ত তিনি যে রাসূল হবেন, তা তিনি নিজেই জানতেন না।… সুতরাং, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামই যখন জিবরাইল আ.র অহি নিয়ে আসার আগ পর্যন্ত জানতেন না তিনি রাসূল, তো মাহদি আ. তো স্বাভাবিকভাবেই জানবেন না তিনি প্রতিশ্রুত মাহদি; যতক্ষণ না আল্লাহ তাকে মাহদি হিসেবে প্রকাশ করার ইচ্ছা করেন। ….. সুতরাং, যে-ই দাবি করবে, সে প্রতিশ্রুত মাহদি এবং নিজের জন্য বাইয়াহ তলব করবে অথবা বাইয়াহ অর্জনের জন্য কিতাল করবে, সে-ই হাদীসের সুস্পষ্ট নির্দেশনার বিরোধী প্রমাণিত হবে।” -হিলয়াতুল বাশার: ৮০৯

 

মারকাযুদ দিরাসাত ওয়াল বুহুসিল ইসলামিয়া একটি গবেষণা প্রবন্ধ প্রকাশ করেছে। প্রবন্ধটির শিরোনাম হচ্ছে, لم يكلف الله بمعرفة شخص المهدي قبل خروجهব্যক্তি মাহদিকে তাঁর আত্মপ্রকাশের পূর্বে চেনার নির্দেশ আল্লাহ আমাদেরকে দেননি’। তাতে তাঁরা লিখেছেন,

واتفق العلماء على أنه إذا خرج لا يختلف عليه اثنان ولا يشتبه أمره على أحد من الأمة، بل هو واضح وضوح الشمس في رابعة النهار ولا يحتاج إثباته إلى دعاة ولا معرفين بل يعرفه كل أحد فمثله يعرفه الناس كما يعرفون عيسى ابن مريم عليه السلام إذا نزل في آخر الزمان، فأمره إذا خرج واضح والله مظهر دينه ولو كره الكافرون. … ثالثاً: إن الذي يثير هذه القضايا ويعيد تكلف البحث فيها بغير مستند شرعي هو أحد ثلاثة أشخاص لا رابع لهم. … إما أن يكون قليل الديانة ويعبد الله ومستنده الابتداع وليس الاتباع، إذ لو كان من أهل الديانة لوسعه ما وسع صحابة رسول الله صلى الله عليه وسلم وسلفنا الصالح، ولم يتكلف ما لم يحث رسول الله صلى الله عليه وسلم ولا صحابته ولا سلفنا الصالح من تكلف العلم به والبحث عنه، فهذا الذي يدندن حول هذه الأمور ومستنده قيل وقال ليس له من الاتباع حظ إلا كمدخل أصبعه في اليم فلينظر بما يرجع. … وإما أن يكون عنده شيء من الديانة ولكنه أصابه اليأس في إصلاح الواقع العالمي المر الشديد الضنك على المسلمين فلم يجد سبيلاً للخروج من هذا الواقع إلا الدعوة لخروج المهدي والتعجيل به لإنقاذ الأمة مما هي فيه، وسلك سبيل أهل الضلال من متصوفة ورافضة وغيرهم. … وإما أن يكون رجلاً مغرضاً يدس ضد الجهاد والمجاهدين مثل هذه الخرافات التي ليس له مستند لإثباته، ليعمل بذلك على تنفير المسلمين إما من أشخاص المجاهدين أو قضايا الجهاد ليثبت لهم بأنها قائمة على توهمات وخرافات. -لم يكلف الله بمعرفة شخص المهدي قبل خروجه، تأليف: مركز الدراسات والبحوث الإسلامية، ص: 3

“উলামাগণ একমত, যখন মাহদি বের হবেন, তাঁর বিষয়ে কেউ মতানৈক্য করবে না। উম্মাহর কারো কাছে তাঁর বিষয়টি অস্পষ্ট মনে হবে না। বরং দ্বিপ্রহরের সূর্যের ন্যায় সুস্পষ্ট হবে। তাঁকে প্রমাণ করার জন্য কোনো আহ্বায়ক বা পরিচয়দাতার প্রয়োজন হবে না। বরং সবাই তাকে চিনবে। যেমনিভাবে শেষ যমানায় ঈসা আলাইহি ওয়াসাল্লাম অবতরণ করলে সবাই তাকে চিনবে । অতএব মাহদি যখন আগমন করবেন, তখন তাঁর বিষয়টি সুস্পষ্ট থাকবে এবং আল্লাহ তাঁর দ্বীনকে প্রতিষ্ঠিত করবেন, যদিও কাফেররা তা অপছন্দ করে। ….

…তৃতীয়ত: যে ব্যক্তি এসব বিষয় বেশি উত্থাপন করে এবং এবিষয়ে শরয়ী ভিত্তি ছাড়াই বারবার গবেষণায় লিপ্ত হয়, সে তিন ব্যক্তির একজন হবে, চতুর্থ হওয়ার সুযোগ নেই।

(এক) হয় তার দ্বীনদারী কম এবং তার ভিত্তি হল বিদআত ও নব আবিষ্কার, (দ্বীনের) অনুসরণ নয়। তবে সে হয়তো আল্লাহর ইবাদত করে। যদি তার দ্বীনদারী থাকত, তাহলে তার জন্য ততটুকু জানাই যথেষ্ট ছিল, যতটুকু জানা সাহাবায়ে কেরাম এবং সালাফের জন্য যথেষ্ট হয়েছে। সে এমন বিষয় জানার জন্য অহেতুক কষ্ট করত না, যে বিষয়টি জানতে এবং তা নিয়ে গবেষণা ও অনুসন্ধান করতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, সাহাবায়ে কেরাম এবং সালাফে সালেহীন উদ্বুদ্ধ করেননি। সুতরাং, যে ব্যক্তি শুধু এসব বিষয়ের চক্করে ঘুরে বেড়ায়, অথচ তার ভিত্তি হল ‘বলা হয়’ বা ‘কথিত আছে’ জাতীয় অনির্ভরযোগ্য কিছু সূত্র, (কুরআন সুন্নাহর) অনুসরণে তার কোনো অংশ নেই। হ্যাঁ সাগরে আঙ্গুল প্রবেশ করিয়ে যে পরিমাণ পানি সংগ্রহ করা যায়, (কুরআন সুন্নাহর) ততটুকু অনুসরণ তার মধ্যে থাকলেও থাকতে পারে?

(দুই) অথবা তার কিছুটা দ্বীনদারী আছে, তবে সে মুসলিমদের বর্তমান কঠিনতম সংকটময় পরিস্থিতি সংশোধনের ব্যাপারে হতাশ হয়ে পড়েছে। অতএব, এখন সে মাহদির আত্মপ্রকাশের দাবি করা এবং উম্মাহর মুক্তির জন্য তাঁর ব্যাপারে তাড়াহুড়া করা ব্যতীত এই সংকট থেকে বের হওয়ার পথ খুঁজে পাচ্ছে না। ফলে সে রাফেজি এবং সূফীদের মত গোমরাহদের পথ এখতিয়ার করেছে।

(তিন) অথবা সে মতলববাজ-স্বার্থান্বেষী, এমন ভিত্তিহীন কল্পকাহিনী দিয়ে সে জিহাদ ও মুজাহিদদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। যেন এর দ্বারা মুসলিমদেরকে মুজাহিদ ও জিহাদি কার্যক্রমের প্রতি বীতশ্রদ্ধ করে তুলতে পারে। যেন সে প্রমাণ করতে পারে, এসব জিহাদি কার্যক্রম সম্পূর্ণ আজগুবি ও ভিত্তিহীন ধ্যান-ধারণার উপর দাঁড়িয়ে আছে।” – লাম ইউকাল্লিফিল্লাহু বিমা’রিফাতি শাখসিল মাহদি কাবলা খুরূজিহি, পৃ: ৩

 

জরুরি নোট

কথাটি আবারো বলছি, ইমাম মাহদি সম্পর্কে সালাফে সালেহীন উপরোক্ত কথাগুলো বলেছেন তাদের জন্য, যারা দুর্বল ও মুর্খ প্রকৃতির লোক, যারা বিষয়গুলো নিয়ে অতি মাত্রায় বাড়াবাড়ি করে এবং নির্ভরযোগ্য শরঈ দলীল দ্বারা প্রমাণিত হওয়া না হওয়ার বিষয়টিকে আমলে নেয় না। তাদের দায়িত্ব হল, এমন স্পর্শকাতর বিষয়ে তাড়াহুড়া করে নিজ থেকে কিছু না করে, বিজ্ঞ উলামায়ে কেরামের সঙ্গে বোঝাপড়া করে ধীরে সুস্থে সিদ্ধান্ত নেয়া। অন্যদিকে ইমাম মাহদি সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য যে তথ্যগুলো আছে, সেগুলো অবশ্যই মুমিনদেরকে জানতে হবে এবং এবিষয়ে যে আকিদা পোষণ করা জরুরি, তাও করতে হবে। এটি থেকে সালাফের কেউ বারণ করেননি।

তাছাড়া, ইমাম মাহদির আবির্ভাবের পর; সত্যের অনুসারী বিজ্ঞ আলেমরা যদিও তাতে দ্বিমত করবেন না, কিন্তু দাজ্জালের বাহিনী, তাগূত গোষ্ঠী এবং মুসলিম নামধারী মুনাফিকরা যে তাতে ধুম্রজাল সৃষ্টির চেষ্টা করবে না, তা বলার সুযোগ নেই।

 

কারা ইমাম মাহদির সঙ্গ দিবেন?

মুখলিস মুসলিম যারা, তারা সবাই হৃদয়ে একটি স্বপ্ন লালন করেন। ইমাম মাহদি আবির্ভূত হলে, আমরা তাঁর দলভুক্ত হয়ে জিহাদ করব। অনেকে তো সুস্পষ্ট বলেই বেড়ান, ইমাম মাহদি আসলে, সবার আগে আমরাই তাঁর দলে থাকব। বিশেষত, যারা বর্তমানে জিহাদ ও কিতালের বিরোধিতা করেন, তাদেরকে এমনটি বলতে বেশি শোনা যায়। একজন মুমিনের দিলে এমন তামান্না খুবই স্বাভাবিক এবং প্রশংসনীয়। কিন্তু এখানে চিন্তা করার মতো গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয় আছে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়, সেটা আমরা অনেকেই মাথায়ই রাখি না।

তাই এ পর্যায়ে আমরা সকল মুসলিমের কল্যাণ কামনা থেকে; তাঁদের প্রতি একটি বিনীত আবেদন করতে চাই। আশা করি বিষয়টি হৃদয় দিয়ে পড়বেন একমাত্র আল্লাহর জন্য এবং আপনার আখেরাতের জন্য একটু হৃদয় দিয়ে চিন্তা করবেন। আল্লাহ আমাদের সকলকে এই ফিতনার যমানায় সহীভাবে দ্বীন বুঝার এবং তাঁর মানশা ও মরযি মোতাবেক আমল করার তাওফীক দান করুন।

এবিষয়ক হাদীসগুলো থেকে যে বিষয়টি পরিষ্কার হয়, তা হল ইমাম মাহদি আ. পৃথিবীতে আসবেন, যখন পৃথিবী জুলুম অত্যাচারে ভরে যাবে। তিনি এসে মানব জাতিকে জালেম ও কাফেরদের জুলুম থেকে মুক্ত করে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। স্বভাবতই জালেমরা তাঁর জন্য এমনিতেই নিজেদের রাজ্য-রাজত্ব সব ছেড়ে দেবে না। তিনি জিহাদের মাধ্যমেই জালেম কাফেরদের থেকে কর্তৃত্ব ছিনিয়ে নিবেন। যেমনটি আমাদের উদ্ধৃত সহীহ মুসলিমের হাদীসটি থেকেও পরিষ্কার বুঝা যায়। যেখানে বলা হয়েছে, এই উম্মত সর্বদা সত্যের উপরে থেকে কিতাল করতে থাকবে এবং সর্বশেষ ঈসা আ. দাজ্জালকে হত্যা করবেন।

ইমাম মাহদি আ.র আগমনের পর এক সময় ইসলামের বিজয় দেখে সব মুসলিমই তাঁর অনুসরণ করবে। কিন্তু শুরুতে যখন তাঁকে জিহাদ করে ইসলামের বিজয় ছিনিয়ে আনতে হবে, তখনকার কঠিন মুহূর্তে কারা তাঁর সঙ্গ দিবেন, কারা জিহাদে শরীক হবেন, তা বলার আগে একটু চিন্তা করা দরকার, আসলেই তা সম্ভব ও বাস্তবসম্মত কি না? বিষয়টি কি এমন যে, ইমাম মাহদি আ. আসলেই সিএনএন-বিবিসি-রয়টার্স-এপি আমাদেরকে সঠিক সংবাদ দিয়ে দিবে? তারপর পকেটে টাকা থাকলে, বিমানের টিকেট করে মক্কায় চলে যাব এবং একজন মুজাহিদের ভুমিকায় তাঁর সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাব?

বাস্তবতা ও হাদীসের ইঙ্গিত থেকে কিন্তু তা বুঝা যায় না; বরং ভিন্ন কিছুরই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। ইমাম মাহদি আসলে, অলৌকিকভাবে সব কিছু ঘটে যাবে, এমন কোনো কথা কুরআন সুন্নাহ’য় নেই। সুতরাং, দারুল আসবাব ও উপায় উপকরণের দুনিয়ায় সব কিছু স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ঘটবে, এটাই স্বাভাবিক। যদি সেসময়ও তাদের সক্ষমতা বর্তমানের মতো থাকে, তাহলে স্বভাবতই বর্তমান তাগুতি মিডিয়া ইমাম মাহদির আগমনের বিষয়টি ঘোলাটে করার চেষ্টা করার কথা। আর তখন যদি তারা আরো উন্নত ও ডিজিটাল হয়, তাহলে হয়তো আমাদের বর্তমান ধারণা থেকে আরেকটু বেশি এবং আরো সূক্ষ্ম কোনো ডিজিটাল পদ্ধতিতেই করবে। তাহলে আমাদের মধ্যে যাদের তথ্য সংগ্রহের উৎসই হল তাগুতি মিডিয়া, এর বাইরে সঠিক সংবাদ সংগ্রহের বিশ্বস্ত কোনো সূত্র বা সক্ষমতা যাদের নেই, তারা কীভাবে নিশ্চিত হব, ইমাম মাহদির আগমনের বিষয়টি?

একইভাবে ইমাম মাহদির দলভুক্ত হবার পথে আন্তর্জাতিক তাগুতি শক্তি ও দাজ্জালের বাহিনীর বাধা সৃষ্টি করা খুবই স্বাভাবিক! স্থানীয় শাসকদেরও সে পথেই হাঁটার কথা! সুতরাং, ইমাম মাহদির সঙ্গে যুক্ত হবার পথটা আমার জন্য মসৃণ হওয়ার কথা নয়! একটু চিন্তা করে দেখুন তো, আজ যদি আপনি জিহাদে অংশ গ্রহণ করার জন্য আফগান যেতে চান, তাহলে তা আপনার জন্য কত কঠিন? আল্লাহ সহজ করুন, কিন্তু বাহ্যত ইমাম মাহদি আ.র বাহিনীতে যুক্ত হওয়ার পথটা তার চেয়েও কঠিন হওয়ার কথা। সম্ভবত এদিকে ইঙ্গিত করার জন্যই এক হাদীসে রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

إذا رأيتموه فبايعوه و لو حبوا على الثلج

‘তাঁকে দেখলে, বরফের উপর হামাগুড়ি দিয়ে হলেও তাঁকে বাইয়াহ দিবে।’

জানা কথা, বরফের উপর হামাগুড়ি দিয়ে যাওয়া সহজ বিষয় নয়! মাহদি আ.র কাছে পৌঁছা যে কঠিন ও কষ্টসাধ্য হবে, রূপক অর্থে সে ইঙ্গিতই হয়তো দেয়া হয়েছে এই হাদীসে। ইমাম বায়হাকি রহ. ও হাফেজ যাহাবি রহ. বর্ণনাটিকে সহীহ বলেছেন। এবং বলেছেন ‘হাদীসটি ইমাম বুখারী রহ. ও ইমাম মুসলিম রহ.র শর্তে উত্তীর্ণ’। যদিও কেউ এই হাদীসের বিশুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্নও তুলেছেন।

তাছাড়া ইমাম মাহদির বাহিনী হবে একটি জিহাদি ও সামরিক বাহিনী। তো একটি সামরিক বাহিনীর প্রাথমিক সদস্য হওয়ার জন্য যেসব যোগ্যতা ও প্রস্তুতি থাকতে হয়, তার ন্যূনতম যোগ্যতা ও প্রস্তুতি কি আমার মধ্যে আছে? মোটামুটি সবাই-ই তো এখন মাহদির অপেক্ষায় আছেন! নির্জনে বসে একটু ‍দিলকে জিজ্ঞেস করে দেখুন তো, এই মুহুর্তে যদি বিশ্বস্ত সূত্রে সংবাদ পান, ইমাম মাহদির আবির্ভাব ঘটেছে, তাহলে কি পিতা মাতা, স্ত্রী সন্তান, আত্মীয় স্বজন, ব্যবসা বাণিজ্য ও বাড়ি ঘর ছেড়ে, মৃত্যুর পারোয়ানা হাতে নিয়ে হাতে নিয়ে বের হয়ে যেতে পারবেন? ভিসার তো প্রশ্নই আসে না; বরং সব তাগুতের সশস্ত্র নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এবং তাদের গোয়েন্দা ফাঁদ ফাঁকি দিয়ে, মাহদির কাফেলায় যুক্ত হতে হবে। সেই হিম্মত ও মনোবল কি আছে আমার হৃদয়ে? যদি নাই থাকে, তাহলে ইমাম মাহদি আসলে, সবার আগে আমরাই তাঁর দলে থাকব, এমন কথা আত্মপ্রবঞ্চনা ছাড়া আর কী?

ইমাম মাহদির জিহাদি কাফেলায় যুক্ত হতে হলে অবশ্যই আমাকে প্রস্তুতি নিতে হবে। প্রস্তুতি ছাড়া জিহাদে বের হওয়ার ইচ্ছা আছে বলে দাবি করা, আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়। ইরশাদ হচ্ছে,

وَلَوْ أَرَادُوا الْخُرُوجَ لَأَعَدُّوا لَهُ عُدَّةً وَلَكِنْ كَرِهَ اللَّهُ انْبِعَاثَهُمْ فَثَبَّطَهُمْ وَقِيلَ اقْعُدُوا مَعَ الْقَاعِدِينَ. -التوبة: 46

“তারা যদি (জিহাদে) বের হওয়ার ইচ্ছা রাখত, তবে নিশ্চয়ই তার জন্য তারা প্রস্তুতি গ্রহণ করত। বস্তুত তাদের বের হওয়া আল্লাহর মনঃপূত ছিল না, ফলে তাদেরকে পিছিয়ে দিয়েছেন এবং তাদেরকে বলা হল, তোমরা বসে থাকাদের সঙ্গে বসে থাক।” -সূরা তওবা (৯): ৪৬

 

জরুরি সতর্কবার্তা!

যুগে যুগে মিথ্যা মাহদির দাবিদার অনেকে প্রকাশিত হয়েছে, যেমনটি আমরা উপরে আলোচনা করেছি। বর্তমান যমানা সম্ভবত মুসলিম উম্মাহর জন্য অতীতের যে কোনো সময়ের চেয়ে অধিক ফিতনাপূর্ণ। সুতরাং এখন যে এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা নেই, তা বলা যায় না। বিশেষ করে এখন যখন ইমাম মাহদির আগমনের সময় আরো ঘনিয়ে এসেছে এবং উম্মাহর মধ্যে এমন একটা প্রতীক্ষার মনোভাব বিরাজ করছে, তখন চতুর দুশমনদের এমন সুযোগ হাতছাড়া করার কথা নয়! আল্লাহ হেফাজত করুন, অচিরেই উম্মাহ হয়তো এমন কোনো ফিতনার সম্মুখীন হতে যাচ্ছে।

বাংলাদেশের জনৈক ব্যক্তি বিভিন্ন অনির্ভরযোগ্য বর্ণনা, সংখ্যাতাত্ত্বিক আজগুবি বিশ্লেষণ, বিভিন্ন মিথ্যা স্বপ্ন ও শয়তানি ইলহাম এবং কুরআন সুন্নাহর তাহরীফ ও মনগড়া ব্যাখ্যা বিশ্লেষণের মাধ্যমে জোর দাবি করছে, ইমাম মাহদি ২০২০ সালেই আবির্ভূত হবেন। নিজের সাথে মিলিয়ে মিলিয়ে প্রতিশ্রুত মাহদির বিবরণ দিয়ে সে আকারে ইঙ্গিতে এবং তার সমর্থকরা একরকম খোলাখুলিভাবেই তাকে প্রতিশ্রুত ইমাম মাহদি বলে দাবি করছে। একইভাবে সে এবং তার অনুসারীরা তাবলীগ জামাআতের মাওলানা সাআদকে ইমাম মাহদির সহকারী ‘মানসুর’ও দাবি করছে।

এরা মূলত শয়তানের বন্ধু। কুরআনের ভাষায়,

وَإِنَّ الشَّيَاطِينَ لَيُوحُونَ إِلَى أَوْلِيَائِهِمْ لِيُجَادِلُوكُمْ. -الانعام: 121

“নিশ্চয় শয়তানগুলো তাদের বন্ধুদের কাছে অহি প্রেরণ করে, যাতে তারা তোমাদের সঙ্গে বিতর্ক করে।” -সূরা আনআম: ১২১

স্বপ্ন ও সংখ্যাতত্ত্বের ভিত্তিতে তারা কুরআন সুন্নাহর যে তাফসীর ও ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করছে, তা সম্পূর্ণই তাফসীর ‘বির-রায়’ এবং ইলহাদ ও যান্দাকা, যার সঙ্গে ইসলামের কোনো সম্পর্ক নেই। তাদের এই প্রতারণাগুলো বুঝার জন্য আলেম হওয়া জরুরি নয়; সুস্থ বিবেক বুদ্ধির অধিকারী যে কেউ সংখ্যাতত্ত্বের দু’একটি বিশ্লেষণ শুনলে, খুব সহজেই তাদের প্রতারণা ধরে ফেলতে পারবেন ইনশাআল্লাহ। তাদের সংখ্যাতত্ত্বের প্রতিটি ব্যাখ্যাতেই, দুইয়ে দুইয়ে ‘চার’ না হয়ে কিভাবে যেন ‘চার-রুটি’ হয়ে যায়! তবে সাধারণ অনেক মুসলিমের তাতে প্রতারিত হওয়া বিচিত্র নয়, যেমন অতীতে হয়েছে। এজন্য আমরা মুসলিম উম্মাহ, বিশেষত উলামায়ে কেরামের প্রতি আহ্বান জানাব, তাঁরা যেন বিষয়টির প্রতি দৃষ্টি দেন এবং মুসলিম উম্মাহকে আসন্ন ফিতনা থেকে সতর্ক করেন।

অবশেষে শায়েখ সুলাইমান বিন নাসের আলআলওয়ানের একটি সতর্কবাণী দিয়ে আমাদের সংক্ষিপ্ত আলোচনা শেষ করছি। তিনি স্বপ্নবাজ মিথ্যা মাহদি দাবিদারদের অনুসারীদের সম্পর্কে লিখেন,

ولو أن هؤلاء كان لهم بصر نافذ، واطلاع على التاريخ، لكفوا عن ذلك ولأحسنوا الخروج من التورط في هذه الضلالات والموبقات (والعاقل ينظر قبل أن يمشي والأحمق يمشي قبل أن ينظر) ولو قلبوا صفحات التاريخ لنكلوا عن ذلك، ولا يلدغ المؤمن من جحر مرتين، ولكن أنى لهم بتلك العبر (وَمَنْ يُرِدْ اللَّهُ فِتْنَتَهُ فَلَنْ تَمْلِكَ لَهُ مِنْ اللَّهِ شَيْئاً). النزعات، ص:12

“তাদের যদি দূরদর্শী অন্তর্দৃষ্টি থাকত, ইতিহাস জানা থাকত, তাহলেই যথেষ্ট হত। খুব সুন্দরভাবেই তারা এই ধ্বংসাত্মক পরিস্থিতি ও গোমরাহি থেকে বের হয়ে আসতে পারত। জ্ঞানীরা চলার আগে দেখে, আর অজ্ঞরা দেখার আগে চলে। তারা যদি ইতিহাসের পাতা খুলে দেখত, সেখান থেকে শিক্ষা নিতে পারত। মুমিন কখনো এক গর্তে দুইবার দংশিত হয় না। কিন্তু কোথায় তাদের সেই শিক্ষা!

وَمَنْ يُرِدْ اللَّهُ فِتْنَتَهُ فَلَنْ تَمْلِكَ لَهُ مِنْ اللَّهِ شَيْئاً. المائدة: 41

‘আল্লাহ যাকে ফিতনায় নিপতিত করতে চান, আল্লাহর মোকাবেলায় তুমি তার কিছুই করতে পারবে না।’ সূরা মায়েদা (৫): ৪১”। -আননাযাআত, পৃ. ১২

والله سبحانه وتعالى أعلم، وعلمه أتم وأحكم، وما توفيقي إلا بالله، وصلى الله تعالى عليه وسلم تسليما كثيرا كثيرا.

وكتبه

العبد أبو محمد عبد الله المهدي عفي عنه

2 رمضان المبارك، 1441 هـ.

26 ابريل، 2020 م.