ফাতওয়া  নং  ১২

সরকারী বেতন হালাল কি?

সরকারী বেতন হালাল কি?

সরকারী বেতন হালাল কি?

প্রশ্ন:

আসসালামু আলাইকুম। সরকারি ডাক্তাররা যে বেতন গ্রহণ করেন, সেটা কি হালাল হয়? কারণ যতটুকু জানি সেক্যুলার সরকারের ইনকামের মেইন সোর্স হলো ট্যাক্স। ইসলামের দৃষ্টিতে ট্যাক্সের বিধান কি? এবং ট্যাক্স থেকে দেওয়া সরকারি বেতনের বিধান কি? যদি কাজটা (যেমন ডাক্তারি) হালাল হয়? ফতোয়া জানালে উপকৃত হতাম।

প্রশ্নকারীর নাম ও ঠিকানা অজ্ঞাত

 

উত্তর:

ইসলামের দৃষ্টিতে ট্যাক্স একটি জঘন্য হারাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

لا يدخُل الجنةَ صاحبُ مَكْسٍ”. رواه أبو داود (2937) وابن خزيمة (2333) وابن الجارود (339) في صحيحيهما، الطحاوي (3062) وقال العلامة العيني في “نخب الأفكار” (8/112) : “إسناد صحيح

“ট্যাক্স ‍গ্রহণকারী জান্নাতে প্রবেশ করবে না।” -সুনানে আবু দাউদ, ২৯৩৭; সহিহ ইবনে খুযাইমা, ২৩৩৩; আল্লামা আইনী রহ হাদিসটির সনদকে সহিহ বলেছেন। -নুখাবুল আফকার, ৮/১১২

হাদীসের ব্যাখ্যায় আল্লামা আইনী রহ বলেন,

المكس في هذا الزمان: ما يأخذه الظلمة والأعوان من التجار الواردين في البلاد ومن الباعة والشراة في الأسواق بأشياء مقررة عليهم على طريق الظلم والعدوان، وكان هذا قبل الإِسلام في الجاهلية، ثم لما جاء الشرع أبطل هذا وأمرهم أن يؤدوا الزكوات والعشور والخراج على الأوضاع الشرعية، ثم لما استولت الظلمة من الملوك والخونة من الحكام أعادوا هذا الظلم، ثم لم يزل الوزراء الظلمة الفسقة يحددون ذلك ويزيدون عليه ويفرعون تفريعات حتى وضعوه في كل شيء جليل وحقير، ودخلوا تحت قوله – عليه السلام -: “من أحدث في أمرنا هذا ما ليس منه فليس منا”. نخب الأفكار 8/ 113

“বর্তমান যমানায় ট্যাক্স হল, জালেমরা যা নগর-বন্দরে আগমনকারী ব্যবসায়ী এবং বাজারে ক্রয়-বিক্রয়কারীদের থেকে উত্তোলন করে। ইসলামপূর্ব সময়ে এই ট্যাক্সের প্রচলন ছিল। ইসলাম তা বাতিল করে দেয় এবং শরয়ী বিধান অনুযায়ী যাকাত, উশর ও খারাজ আদায়ের নির্দেশ দেয়। কিন্তু পরবর্তীতে যখন জালেম শাসকরা ক্ষমতা দখল করে, তারা পুনরায় এ জুলুম শুরু করে। তারপর থেকেই জালেম ও ফাসেক মন্ত্রীরা এ ট্যাক্সের পরিমাণ নির্ধারণ করতে থাকে, তা বাড়াতে থাকে এবং তার অনেক শাখা প্রশাখা বের করতে থাকে। এমনকি পরিশেষে তারা ছোট-বড় সব কিছুতেই ট্যাক্স আরোপ করে। আর এর মাধ্যমে তারা নবীজির এ বাণীর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যায়, ‘যে আমাদের দ্বীনের মাঝে নতুন কোনো বিষয় উদ্ভাবন করে, সে আমাদের দলভুক্ত নয়।” -নুখাবুল আফকার, ৮/১১৩

এমনকি ইমাম জাসসাস রহ. আহকামুল কুরআনে বলেছেন, কেউ যদি জেনে শুনে এসব ট্যাক্স উত্তোলন করে, তাদেরকে হত্যা করা মুসলিমদের উপর ওয়াজিব। আর কেউ যদি এককভাবে তাদের হত্যা করতে সামর্থ্য হয়, তার জন্যও কোনো সতর্কবাণী ছাড়াই তাদের হত্যা করা বৈধ। তিনি বলেন,

وكذلك قلنا في أصحاب الضرائب والمكوس التي يأخذونها من أمتعة الناس إن دماءهم مباحة وواجب على المسلمين قتلهم ولكل واحد من الناس أن يقتل من قدر عليه منهم من غير إنذار منه له ولا التقدم إليهم بالقول لأنه معلوم من حالهم أنهم غير قابلين إذا كانوا مقدمين على ذلك مع العلم بحظره ومتى أنذرهم من يريد الإنكار عليهم امتنعوا منه حتى لا يمكن تغيير ما هم عليه من المنكر فجائز قتل من كان منهم مقيما على ذلك وجائز مع ذلك تركهم لمن خاف إن أقدم عليهم بالقتل أن يقتل إلا أن عليه اجتنابهم والغلظة عليهم بما أمكن وهجرانهم -أحكام القرآن للجصاص ت قمحاوي 2/ 318

“যারা মানুষের পণ্য হতে ট্যাক্স আদায় করে, তাদের ক্ষেত্রেও আমরা বলি, তাদের রক্ত বৈধ এবং তাদের হত্যা করা মুসলমানদের উপর ওয়াজিব। যে কেউ তাদের কাউকে হত্যা করতে সক্ষম হলে, কোনো ধরনের মৌখিক সতর্কবাণী ব্যতীতই তাদের হত্যা করতে পারবে। কেননা ইসলামে ট্যাক্স নেয়া নিষিদ্ধ- এটা জানা থাকা সত্ত্বেও তারা তা করছে। তাই তাদের নিষেধ করা হলেও যে তারা তা মানবে না, তা জানা কথা। এখন যে ব্যক্তি তাদের এ অন্যায় কাজে বাধা প্রদান করতে চায়, সে যদি তাদের প্রথমে মুখে নিষেধ করতে যায়, তখন তারা নিজেদের প্রতিরক্ষা গ্রহণ করবে, ফলে তাদেরকে আর এঅন্যায় থেকে ফেরানো সম্ভব হবে না। সুতরাং যারা ট্যাক্স উত্তোলনে নিয়োজিত থাকবে, তাদের হত্যা করা বৈধ হবে। তবে যে ব্যক্তি আশংকা করবে যে, তাদের হত্যা করতে গেলে নিজেরই নিহত হতে হবে, তার জন্য হত্যা না করাও জায়েয। কিন্তু তার উপরও ওয়াজিব হলো, তাদের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা এবং যথাসম্ভব তাদের সাথে কঠোরতা করা।” –আহকামুল কুরআন, ২/৩১৮

তবে কাফেররা অন্যায়ভাবে মুসলমানের সম্পদ কবজা করে নিলে, তারা তার মালিক হয়ে যায়। সহিহ বুখারী ও মুসলিমের হাদিসে এসেছে, বিদায় হজের সময় সাহাবায়ে কেরাম রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে জিজ্ঞেস করেন, আপনি কি মক্কায় আপনার বাড়িতে অবস্থান করবেন? উত্তরে নবীজি বলেন,

وهل ترك لنا عقيل من رباع، أو دور

“আকীল (রাসূলের চাচাতো ভাই) কি আমাদের জন্য কোন ঘরবাড়ি অবশিষ্ট রেখেছে? (সে তো সবই দখল করে নিয়েছে)।” –সহিহ বুখারী, ৩০৫৮ সহিহ মুসলিম, ১৩৫১

ইমাম ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন,

وصح عنه: أن المهاجرين طلبوا منه دورهم يوم الفتح بمكة، فلم يرد على أحد داره. -زاد المعاد 5/70  مؤسسة الرسالة، بيروت الطبعة: السابعة والعشرون , 1415هـ

“সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে, মক্কা বিজয়ের দিন মুহাজিরগণ, তাঁদের ছেড়ে যাওয়া যে বাড়ি ঘরগুলো কাফেররা দখল করে নিয়েছিল, তা ফেরত চান। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওযাসাল্লাম কারো বাড়িই ফেরত দেননি।” -যাদুল মাআদ, ৫/৭০ আরো দেখুন শরহু মাআনিল আছার, হাদীস : ৫২৮২

বর্তমান সরকার যেহেতু কাফের-মুরতাদ, তাই তারা মুসলমানদের থেকে যে ট্যাক্স গ্রহণ করে, তারা তার মালিক হয়ে যাবে এবং জায়েয কাজের পারিশ্রমিক হিসেবে তাদের থেকে তা গ্রহণ করা বৈধ হবে। আল্লামা যফর আহমদ উসমানী রহ. বলেন,

اہل حرب جس طرح بھي  روپيه كمائيں خواه رباء سے خواه غصب سے خواه بيوع باطله وفاسده سے بہر صورت وه روپيه وغيره ان كي ملك ميں داخل ہو جاۓ گا  اور مسلمان كو تنخواه ميں لينا اس كا جائز ہے -امداد الأحكام4/390 مكتبہ دار العلوم كراجي : 1430 ه

“হারবী (কাফেররা) যেভাবেই টাকা উপার্জন করুক, চাই তা সুদের মাধ্যমেই হোক বা ডাকাতি করে কিংবা (শরীয়তের দৃষ্টিতে অবৈধ) বাতিল ও ফাসিদ ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে হোক, সর্বাবস্থায় তারা তার মালিক হয়ে যাবে এবং মুসলমানের জন্য বেতন হিসেবে তা গ্রহণ করা বৈধ হবে।”- ইমদাদুল আহকাম, ৪/৩৯০

উল্লেখ্য, বর্তমান সরকার যেহেতু মানবরচিত বিধান দ্বারা দেশ পরিচালনা করে, তাই তারা তাগুত। আর তাগুতের অধীনে জায়েয কাজেও চাকরী না করা উত্তম, যদি তাতে তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসার কোনো সম্পর্ক না থাকে। তাতে তাগুত বর্জন ও তাগুতেরর সাথে সম্পর্কচ্ছেদ পূর্ণাঙ্গ হয়। আর যদি তা তাদের সঙ্গে বন্ধুত্ব ও ভালোবাসাসহ হয়, বা অনিবার্যভাবে তা তাদের বন্ধুত্বের দিকে নিয়ে যায়, তাহলে তা সম্পূর্ণই নাজায়েয। আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَلَقَدْ بَعَثْنَا فِي كُلِّ أُمَّةٍ رَسُولًا أَنِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاجْتَنِبُوا الطَّاغُوتَ

আমি প্রত্যেক জাতির মাঝে রাসূল পাঠিয়েছি, এই নির্দেশ দিয়ে যে, তোমরা আল্লাহর ইবাদত কর এবং তাগুতকে পরিহার কর। -সূরা নাহল (১৬): ৩৬

আর সুদি কারবারের মতো নাজায়েয কাজে চাকরি করা সর্বাবস্থায়ই হারাম। এছাড়া তাগূতের আইন প্রণয়ন, কার্যকর ও তাদের প্রতিরক্ষার কাজে চাকরি করা কুফুর। বিস্তারিত দেখুন সহীহ বোখারী, ৬/৪৫; মু’জামে কাবীর, তাবারানী: ১২০৪৫; তাফসীর ইবনে আবী হাতিম: ৫৫৪৭; আসইলাতু মিম্বারিত তাওহীদ: ১/২৩; আলইখতিয়ার লিতা’লিলিল মুখতার: ৪/১২২; শরহু মাআনিল আছার: ৫২৮২; রদ্দুল মুহতার: ৪/২৮৪, ৪/২৫৪; ইমদাদুল আহকাম: ৭/১৮০; হেদায়া: ২/৩৯২, ফাতহুল কাদীর: ৫/৪৫৯, ৪৭৩, মাবসূতে সারাখসি: ১০/১২৩; ইমদাদুল ফাতাওয়া: সওয়াল নং ৬৫০

والله سبحانه وتعالى أعلم

আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি

৬ রমজান, ১৪৪১ হি.

৩০ এপ্রিল, ২০২০ ঈ.