উলামা-মাশায়েখ, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, শাইখুল হাদীস মুফতী আবু ইমরান হাফিযাহুল্লাহ

মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ক- শাইখুল হাদিস মুফতি আবু ইমরান হাফিযাহুল্লাহ

মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ক- শাইখুল হাদিস মুফতি আবু ইমরান হাফিযাহুল্লাহ

 

نحمده ونصلي على رسوله الكريم

أما بعد فأعوذ بالله من الشيطان الرجيم بِسْمِ اللَهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيْمِ

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا

صدق الله العظيم

আজকে যে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করার ইচ্ছা, তা হলো, মুমিনদের পারস্পরিক সম্পর্ক। প্রথমে আমরা জানবো, মুমিনদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক থাকা জরুরি কিনা?

মুমিনদের মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক কেমন হবে এ বিষয়ে পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَاعْتَصِمُوا بِحَبْلِ اللَّهِ جَمِيعًا وَلَا تَفَرَّقُوا 

তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রুজ্জুকে আঁকড়ে ধরো, পরস্পর বিচ্ছিন্ন হয়ো না। সূরা আলে ইমরান (৩) : ১০৩

এখানে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা নির্দেশ দিচ্ছেন, তোমরা সবাই মিলে আল্লাহর রশিকে আঁকড়ে ধরো। পরস্পর বিচ্ছিন্ন হইও না।

পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতার কুফল

মুমিনদের পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা ও সম্পর্কচ্ছেদের কুফলের বিষয়টি উল্লেখ করে অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَلَا تَنَازَعُوا فَتَفْشَلُوا وَتَذْهَبَ رِيحُكُمْ وَاصْبِرُوا إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ

তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের আনুগত্য করো, পরস্পর বিবাদে লিপ্ত হইও না। তাহলে সাহস হারিয়ে ফেলবে এবং তোমাদের প্রভাব চলে যাবে। তোমরা ধৈর্যধারণ করো। নিঃসন্দেহ আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে রয়েছেন। সূরা আনফাল (৮) : ৪৬

দেখুন, এখানে আল্লাহ তাআলা বিচ্ছিন্নতা ও পরস্পরে বিবাদে লিপ্ত হওয়ার দুটি কুফল উল্লেখ করছেন। আল্লাহ তাআলা বলছেন, তোমরা যদি নিজেদের মধ্যে ঝাগড়া বিবাদে লিপ্ত হও فتفشلوا  তাহলে সাহস হারিয়ে ফেলবে। ভীরু হয়ে যাবে, وتذهب ريحكم  শত্রুর ওপর তোমাদের যে প্রভাব রয়েছে তা আর থাকবে না, চলে যাবে, নিঃশেষ হয়ে যাবে। তখন শত্রুরা আর তোমাদের কোনো পরোয়া করবে না। তাদের হিম্মত বেড়ে যাবে।

পারস্পরিক ঝগড়া বিবাদ থেকে বাঁচার উপায় কী, আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ তাআলা তাও বলে দিচ্ছেন। আল্লাহ তাআলা বলছেন, وَاصْبِرُوا তোমরা সবর করো, ধৈর্যধারণ করো। সংযমি হও। নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখো। উত্তেজিত হয়ে গেলে, অসহিষ্ণু হয়ে গেলে, তোমরা হেরে যাবে। এজন্য আমাদেরকে অনিয়ন্ত্রিত রাগ ছাড়তে হবে। ধৈর্য ধরতে হবে। তাছাড়া ধৈর্য ধরাটাই যুক্তিযুক্ত কাজ। আপনি অধৈর্য হবেন কীভাবে? আপনার কি নিজস্ব কোনো ক্ষমতা আছে? সব ক্ষমতা তো আল্লাহর। আর আল্লাহর কাছ থেকে কোন কিছু পেতে হলে আপনাকে আল্লাহর নিয়ম অনুযায়ী চলতে হবে। আল্লাহর নিয়ম কী? অন্য আয়াতে তিনি নিজের নিয়ম বলে দিয়েছেন,

فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَصْلِحُوا ذَاتَ بَيْنِكُمْ

তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক ঠিক রাখো। সূরা আনফাল (৮) : ১

নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক ঠিক রাখলেই আল্লাহর রহমত পাওয়া যাবে। আল্লাহ তাআলার একটি নাম হল ‘রহমান’। তাঁর রহমত মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক ভালো থাকার সাথে সম্পর্কিত। তারা যদি একে অপরের সাথে রহমতের সম্পর্ক বজায় রাখে, একে অপরের প্রতি তাদের রহমত ও দয়া থাকে, তাহলেই তারা আল্লাহ তাআলার রহমতের ভাগী হয়। পক্ষান্তরে তারা যদি ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হয়, একে অপরের প্রতি রহমত ও দয়া না থাকে, তাহলে তারা আল্লাহর রহমত থেকেও বঞ্চিত হবে।

হযরত আবু দারদা রাযি. থেকে বর্ণিত একটি হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

أَلا أُنَبِّئُكُمْ بِدَرجةٍ أفضلَ مِنَ الصَّلاةِ والصِّيامِ والصَّدَقَةِ؟ قالوا: بلى، قال صَلاحُ ذاتِ البَيْنِ، فَسادُ ذاتِ البَيْنِ هيَ الحالِقَةُ

আমি কি তোমাদেরকে এমন একটি মর্যাদার কথা বলবো, যা নামাজ, রোযা ও সাদাকা অপেক্ষাও শ্রেষ্ঠ? সাহাবায়ে কেরাম বললেন, জী! অবশ্যই বলুন। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম জবাব দিলেন, তোমরা পারস্পরিক সম্পর্ক ঠিক রাখ। পারস্পরিক সম্পর্ক নষ্ট করা হল, মুন্ডনকারী। (আল আদাবুল মুফরাদ : ৩০৩; জামে তিরমিযী : ২৫০৯; হাদিসটি সহী)

সুনানে আবু দাউদের বর্ণনায় এসেছে, এরপর তিনি বললেন,

لا أقولُ : إنها تَحْلِقُ الشَّعْرَ ولكن تَحْلِقُ الدِّينَ

আমি চুল মুন্ডন করে দেয়, এ কথা বলছি না বরং এটি ব্যক্তির দ্বীনদারি মুন্ডন করে দেয়। অর্থাৎ এর ফলে তার দ্বীনদারি একদম নিঃশেষ হয়ে যায় (সুনানে আবু দাউদ : ৪৯১৯; হাদিসটি সহী)

যখন কারো মাঝে সম্পর্ক নষ্ট হয়ে যায় তখন দেখা যায়, উভয় পক্ষই নানান ধরণের মিথ্যা, প্রবঞ্চনা ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়। এভাবে উভয়ের দ্বীনদারিই নষ্ট হতে থাকে। তাদের মানসিক পেরেশানিও বেড়ে যায়। দুনিয়া তাদের কাছে বিষাদ হয়ে উঠে। তাই তো আমাদেরকে নির্দেশ দেয়া হয়েছে, আমরা যেন পারষ্পরিক সম্পর্ক ঠিক রেখে এক উম্মাহ, এক জামাত হয়ে থাকি। তাহলেই আমরা আল্লাহ তাআলার সাহায্য লাভ করব ইনশাআল্লাহ হাদিসে এসেছে,

يد الله على الجماعة

আল্লাহর হাত (তাঁর শক্তি ও সাহায্য) জামাতের সঙ্গে রয়েছে। (সুনানে নাসায়ী : ৪০৩২; হাদিসটি সহী)

আল্লাহ তা’য়ালা ইরশাদ করেন,

هُوَ الَّذِي أَيَّدَكَ بِنَصْرِهِ وَبِالْمُؤْمِنِينَ [٨:٦٢] وَأَلَّفَ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ ۚ لَوْ أَنفَقْتَ مَا فِي الْأَرْضِ جَمِيعًا مَّا أَلَّفْتَ بَيْنَ قُلُوبِهِمْ وَلَٰكِنَّ اللَّهَ أَلَّفَ بَيْنَهُمْ ۚ إِنَّهُ عَزِيزٌ حَكِيمٌ

আল্লাহ তা’য়ালা নিজ সাহায্য দ্বারা এবং মুমিনদের সাহায্য দ্বারা আপনাকে শক্তিশালী করেছেন এবং তাদের অন্তরে প্রীতি ও ঐক্য স্থাপন করে দিয়েছেন। আপনি যদি পৃথিবীর সমুদয় সম্পদও ব্যয় করতেন, তবুও তাদের অন্তরে প্রীতি ও ঐক্য স্থাপন করতে পারতেন না। কিন্তু আল্লাহই তাদের মধ্যে প্রীতি ও ঐক্য স্থাপন করে দিয়েছেন। নিঃসন্দেহে তিনি মহাশক্তিশালী, প্রজ্ঞাবান। (সূরা আনফাল (৮) : ৬২, ৬৩)

পৃথিবীর সমুদয় সম্পদের চেয়েও মূল্যবান

মুমিনদের মধ্যকার পারস্পরিক সুসম্পর্ক পৃথিবীর সমুদয় সম্পদের চেয়েও বেশি মুল্যবান। আমাদের প্রত্যেকেই যদি আমাদের পারষ্পরিক সুসম্পর্ককে পৃথিবীর সমুদয় সম্পদ থেকে মুল্যবান মনে করতাম তাহলে দুনিয়াবি কোন স্বার্থ নিয়ে, দুনিয়াবি কোন সুবিধা নিয়ে কখনোই আমাদের মধ্যে ঝগড়াঝাটি হত না। আমরা এখন সামান্য কয়েকটা টাকার জন্য, সামান্য একটু জমির জন্য, সামান্য একটু সুবিধা বেশি নেয়ার জন্য অন্য ভাইদের সাথে সম্পর্ক নষ্ট করছি অথচ যা আমরা নষ্ট করছি তা ওই টাকা, জমি ইত্যাদি অপেক্ষা বহুগুণ মূল্যবান। এটাই হল কুরআনের শিক্ষা, এটাই হল ইসলামের শিক্ষা।

আমাদের পারস্পরিক এ সম্পর্ককে টিকিয়ে রাখার জন্য আমাদের করণীয় কী? আল্লাহ তাআলা এ ব্যাপারে আমাদেরকে কী হেদায়েত দিয়েছেন? দেখুন, আমাদের করণীয় সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেছেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَن يَرْتَدَّ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لَائِمٍ  

হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কেউ তার দ্বীন থেকে বিমুখ হয়ে গেলে আল্লাহ তায়ালা এমন এক জাতি নিয়ে আসবেন, যাদেরকে আল্লাহ ভালোবাসবে। তারাও আল্লাহকে ভালোবাসবে। তারা মুমিনদের প্রতি কোমল এবং কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে, তার কোনো নিন্দুকের নিন্দার পারোয়া করবে না। (সূরা মায়েদা (৫) : ৫৪)

দেখুন, এখানে আল্লাহ তায়ালা প্রথমে বলেছেন, আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসবেন। তারাও আল্লাহকে ভালোবাসবে। এরপর আল্লাহর প্রতি তাদের ভালোবাসার প্রকাশ কীভাবে হবে, তা বলেছেন। তা হলো, তারা আল্লাহর মুমিন বান্দাদের প্রতি কোমল হবে, বিনয়ী হবে। أذلة علي المؤمنين এবং যারা আল্লাহর দুশমন কাফির, মুশরিক, মুনাফিক, মুরতাদ তাদের প্রতি তাঁরা হবে অত্যন্ত কঠোর। أعزة علي الكافرين

নিজেদের পারস্পরিক সম্পর্ক অটুট রাখার মূল ভিত্তি হলো, প্রত্যেকে অন্যের প্রতি কোমল হওয়া, বিনয়ী হওয়া।  কোমলতা ও বিনয়ের এ গুণ যখন মুমিনদের মাঝে এসে যাবে তখন তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক সুদৃঢ় হবে। সাহাবায়ে কেরামের মাঝে একে অন্যের প্রতি কোমল হওয়া, বিনয়ী হওয়ার এ গুণটি পরিপূর্ণ ভাবে ছিল তাই তাদের পারষ্পরিক সম্পর্কও সুদৃঢ় ছিল, তাদের মাঝে মজবুত ঐক্যও ছিলো। আর এ কারণেই তাঁদের মাধ্যমে গোটা পৃথিবীতে দ্বীন প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। সাহাবায়ে কেরামের সেই গুণগুলোর কথা কুরআনে কারীমে এসেছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

أَشِدَّاءُ عَلَى الْكُفَّارِ رُحَمَاءُ بَيْنَهُمْ

(তারা ছিল) কাফেরদের প্রতি কঠোর এবং নিজেদের প্রতি সদয় ও সহানুভূতিশীল। সূরা ফাতাহ (৪৮) : ২৯

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার কাছে কতবেশি সম্মানিত ছিলেন! তবুও আল্লাহ তাআলা তাঁকে মুমিনদের ব্যাপারে নির্দেশ দিচ্ছেন,

وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِلْمُؤْمِنِينَ 

মুমিনদের জন্য আপনার (কোমলতা ও নম্রতার) ডানা ঝুঁকিয়ে দিন। সূরা হিজর (১৫) : ৮৮

অথচ আমরা সাধারণ মুসলমানরা এখন নিজেদের মাঝে মর্যাদার ব্যবধান বানিয়ে রেখেছি। যে-ই কোনো দিক দিয়ে একটু বড় হয়ে যায়, সে আর ছোটদের জন্য নমনীয় হতে পারে না! দেখুন, এখানে আল্লাহ তাআলা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বলছেন, আপনি আপনার ডানা মুমিনদের জন্য ঝুঁকিয়ে দেন। মুমিনদের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে এ নির্দেশ দেয়া হলে অন্যান্য মুমিনদের ব্যাপারে আমাদের প্রতি নির্দেশটি কেমন হবে?

আয়াতে উল্লিখিত ডানা ঝুঁকিয়ে দেয়ার অর্থ হলো, নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সমর্পণ করে দেয়া। নিজেকে অপারগ হিসেবে প্রকাশ করা। মুমিনদের সামনে আপনি অপারগ হয়ে যান। যেন আপনার কোন শক্তিই নেই! আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَعِبَادُ الرَّحْمَٰنِ الَّذِينَ يَمْشُونَ عَلَى الْأَرْضِ هَوْنًا

রহমানের (বিশেষ) বান্দা হলো তারা, যারা পৃথিবীতে নম্রভাবে চলাফেরা করে। (সূরা ফুরকান (২৫) : ৬৩)

هونا – নম্রভাবে। নিজেকে ছোট করে। বিনয়ের সাথে। অন্য আয়াতে ইরশাদ করেন,

تِلْكَ الدَّارُ الْآخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ

আখেরাতের ওই আবাস আমি তাদের জন্য নির্ধারণ করি, যারা পৃথিবীতে ঔদ্ধত্য দেখাতে চায় না। অনাচারও সৃষ্টি করে না। আর শুভ পরিণাম খোদাভীরুদের জন্য। সূরা কাসাস (২৮) : ৮৩

অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ  

ভালো আর মন্দ সমান নয়। তুমি (মন্দকে) অতি উত্তম পদ্ধতিতে প্রতিহত করো। দেখবে, যার সাথে তোমার শত্রুতা ছিল সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে গেছে। (সূরা ফুসসিলাত (৪১) : ৩৪)

এখানে অপর মু’মিনের সাথে তার মন্দ আচরণের পরিবর্তে ভালো আচরণের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তার ফল কী হবে তাও বলা হয়েছে যে, পরিণতিতে সে তোমার অন্তরঙ্গ বন্ধু হয়ে যাবে। মুমিনকে বন্ধু বানানোই কাম্য। এ হুকুমটি মুমিনদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য, কাফের মুশরিকদের ক্ষেত্রে নয়।

একজন মু’মিন থেকে যেমন ব্যবহারই পাও ভালো ব্যবহারের মাধ্যমে তার মোকাবেলা করো। এটাই শরিয়তে কাম্য। তবে হ্যাঁ, সমান সমান বদলা নেওয়া যায়। সে যে পরিমাণ মন্দ আচরণ করলো তুমিও তার সাথে ঠিক সে পরিমাণ মন্দ আচরণ করবে। এরও অবকাশ আছে। কিন্তু আল্লাহ তাআলা বলছেন, তুমি তার সাথে ভালো আচরণ করো। মন্দের বিনিময়ে ভালো আচরণ করো। তাহলে সে তোমার বন্ধু হয়ে যাবে। কারণ সে মু’মিন।

কথাটি আমাদের বোধশক্তি দিয়ে সহজেই বুঝে ফেলা এরপর তা গ্রহণ করা একটু কঠিন। তাই আল্লাহ তাআলা সামনে বলছেন,

وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا

এই বিষয়টি শুধু তারাই লাভ করে যারা ধৈর্যশীল। (সূরা ফুসসিলাত (৪১) : ৩৫)

এরপর বলছেন,

وَمَا يُلَقَّاهَا إِلَّا ذُو حَظٍّ عَظِيمٍ

এটি শুধু তারাই লাভ করে যারা বড়ই ভাগ্যবান। (সূরা ফুসসিলাত (৪১) : ৩৫) যাদের কপাল বিশাল। একমাত্র তারাই এ তাওফিক পায়। তারাই অন্যদের মন্দ আচরণের পরিবর্তে ভালো আচরণ করে।

আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার অর্থ

এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

صِلْ مَن قَطَعَك، وأَعْطِ مَن حَرَمَك، واعْفُ عمَّن ظَلَمَك.

যে তোমার থেকে সম্পর্ক ছিন্ন করে তুমি তার সাথে সম্পর্ক বজায় রাখো। যে তোমাকে বঞ্চিত করে তুমি তাকে দাও। যে তোমার ওপর জুলুম করে তুমি তাকে ক্ষমা করো। (মুসনাদে আহমদ ১৭৪৫২; হাদীসটি হাসান)

কেউ তোমার সাথে ভালো ব্যবহার করলে তুমিও তার সাথে ভালো ব্যবহার করো, এমন হলে তুমি বদলা দিলে মাত্র। আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রেখেছো, এ কথা বলা যাবে না। কেউ সম্পর্ক নষ্ট করলে তুমি ঠিক রাখো, সম্পর্ক ছিন্ন করলে তুমি সম্পর্ক জুড়ে রাখো, তবেই বলা যাবে, তুমি আত্মীয়তার সম্পর্ক ঠিক রেখেছো। এটিই হল আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখার অর্থ।

যারা আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখে তারা তাদের জীবনে বরকত পায়। ধন সম্পদে বরকত পায়।

রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন,

مَنْ أَحَبَّ أَنْ يُبْسَطَ لَهُ فِي رِزْقِهِ، وَيُنْسَأَ لَهُ فِي أَثَرِهِ، فَلْيَصِلْ رَحِمَهُ

যে ব্যক্তি চায়, তার রিয্‌ক প্রশস্ত হোক এবং আয়ু বর্ধিত হোক, যে যেন তার আত্মীয়তার বন্ধন অক্ষুণ্ন রাখে। (সহীহ বুখারী ৫৯৮৬)

এই বরকত পেতে হলে কী করতে হবে? সম্পর্ক ছিন্ন হলে সেই সম্পর্ক জোড়া লাগাতে হবে। নিজের অহংকার, নিজের ক্ষমতা, আমিত্বকে মিটালেই সে সম্পর্ক ঠিক রাখতে পারবে।

কারো থেকে মন্দ ব্যবহার পাওয়ার পরও আপনি যদি তার সাথে ভালো ব্যবহার করেন তবেই আপনি তার সাথে সম্পর্ক ঠিক রাখলেন। এ কারণে আপনি আল্লাহ তা’য়ালা থেকে বড় নেয়ামত লাভ করবেন। যদিও বাহ্যত দেখা যাচ্ছে, দুনিয়ার মানুষ আপনাকে ঠকিয়ে ফেলেছে। কিন্তু প্রকৃত পক্ষে আপনিই জিতলেন। আল্লাহর কাছে আপনিই জিতলেন।

তো বলছিলাম, মু’মিনদের পারস্পরিক সম্পর্কটা হবে মায়া-মমতার সম্পর্ক, মহব্বত ও ভালোবাসার সম্পর্ক। أذلة علي المؤمنين  মুমিনরা অন্য মু’মিনদের প্রতি কোমল হবে, সদয় হবে।

أذلة শব্দটি এসেছে ذلول থেকে। যার আভিধানিক অর্থ হলো, নিজেকে ছোট ও তুচ্ছ বানিয়ে রাখা। নিজের আমিত্বকে খতম করে দেওয়া।

হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, أذلة علي المؤمنين এর অর্থ হল, তারা সবধরণের মুমিনদের সাথে কোমল স্বভাবের হবে।

হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, এর অর্থ হল, رحماء তারা হবে দয়াবান।

হযরত ইবনে জুরাইজ রহ. বলেছেন, তারা পরস্পরের প্রতি হবে অত্যন্ত সহানুভূতিশীল।

হযরত আ’মাশ রহ. বলেন, তারা মু’মিনদের সামনে নিজেদেরকে দুর্বল বানিয়ে রাখবে। তারা আসলে দুর্বল হবে না কিন্তু মু’মিনদের সামনে নিজেদেরকে দুর্বল বানিয়ে রাখবে।

শক্তির সাথে বিনয় প্রশংসনীয়

এই যে তাদের কোমলতা, তাদের দয়া, তাদের দুর্বলতা, এটি আসলে তাদের শক্তিহীনতার কারণে নয়। কারণ শক্তিহীনতার কারণে যে দুর্বলতা সেটি প্রশংসনীয় নয়।

إن الله يلوم علي العجز

আল্লাহ তাআলা অক্ষমতা ও দুর্বলতার প্রতি তিরষ্কার করেন। (সুনানে কুবরা, ইমাম নাসায়ী, হাদিস; ১০৩৮৭)

কারো শক্তি নেই। দুর্বল। অক্ষম। কোনো কিছুই করতে পারে না। এ ধরনের অক্ষমতা ও দুর্বলতা আল্লাহ তাআলা অপছন্দ করেন।

শক্তি থাকার পরও বিনয় অবলম্বন করা আল্লাহর কাছে অনেক মূল্যবান একটি আমল। হাদিসে এসেছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

المُؤْمِنُ القَوِيُّ خَيرٌوَأَحَبُّ إِلَى اللهِ مِنَ المُؤْمِنِ الضَّعيفِ

শক্তিশালী মু’মিন আল্লাহ তা’য়ালার কাছে দুর্বল মু’মিনের চেয়ে উত্তম ও প্রিয়। (সহী মুসলিম ২৬৬৪)

শক্তিশালী হওয়া আর বিনয়ী হওয়া, একটি অপরটির বিপরীত নয়। বরং আল্লাহ তাআলার কাছে প্রিয় হতে হলে একটির পাশাপাশি অপরটিও অপরিহার্য।

মুমিনরা যে তাদের অন্যান্য মুমিন ভাইদের সামনে নিজেদেরকে তুচ্ছ বানিয়ে রাখে, এটি তারা কেন করে? দুনিয়াবী কোনো স্বার্থে? কিংবা দুনিয়াবী কোনো বিপদের ভয়ে? না। এসবের কোনোটাই এর কারণ নয়। বরং তারা নিজেদেরকে দুর্বল বানিয়ে রাখে একমাত্র আল্লাহর জন্য, আল্লাহর দ্বীনের জন্য। দ্বীনের দাওয়াতের স্বার্থে। দ্বীনের দাওয়াত পৌঁছে দেয়ার জন্যই তারা এ কষ্ট সহ্য করে। তাঁরা পরিণতির প্রতি নজর রাখে যে, পরবর্তিতে এর ফল কী হতে পারে? সে দিকে তাকিয়েই তারা নিজেদের নগদ তুচ্ছতাকে মেনে নেয়।

কিছু উদাহরণ

প্রসিদ্ধ ঘটনা। একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বাইতুল্লাহর পাশে নামায পড়ছিলেন। যখন সেজদায় গেলেন তখন কাফেররা তাঁর ঘাড়ের উপর উটের নাড়ি-ভুরি রেখে দিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তা সহ্য করে নিলেন। এই যে তিনি এখানে লাঞ্ছনা ও অপদস্থতা সহ্য করে নিলেন তা কি দুনিয়াবি কোনো স্বার্থে ছিলো? না। বরং আল্লাহ তা’য়ালার দ্বীনের জন্যই তা সহ্য করে নেন।

হুদাইবিয়া ঘটনার সময় কুরাইশরা সাহাবাদের সামনে একটি চুক্তি পেশ করে। যা বাহ্যত ছিল তাঁদের জন্য চরম লাঞ্ছনা ও অপমানের। কিন্তু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নির্দেশে সাহাবারা সেই চুক্তি মেনে নেন। তারা যে সেই চুক্তি মেনে নিয়েছিলেন, তা কি দুনিয়াবি কোনো স্বার্থে ছিলো? নিশ্চয়ই না। তাঁরা তো আল্লাহর দ্বীনের জন্য নিজেদের জীবন দিতেও প্রস্তুত ছিলেন। তারপরও তাঁরা সেই অবমাননাকর চুক্তি মেনে নেন। কেন মেনে নেন? মেনে নেন একমাত্র আল্লাহর জন্য। আল্লাহর দ্বীনের জন্য।

আসলে দ্বীনের জন্য লাঞ্চনা সহ্য করা প্রকৃতপক্ষে লাঞ্চনা না। অপদস্ততা না। বরং যারা শত্রুর ভয়ে, জেল জুলুমের ভয়ে হক কথা বলা থেকে বিরত থাকে, দীনের প্রকৃত ব্যাখ্যা না দিয়ে লুকোচুরি করে, শত্রুকে খুশি করার জন্য তাদের মনমতো কথা বলে প্রকৃতপক্ষে তারাই হলো অপদস্ত ও লাঞ্ছিত।

প্রকৃত মুমিন আর ফাসেক ও মুনাফিকদের মাঝে তফাতটা এখানেই। উভয় শ্রেণিই কোনো কোনো ক্ষেত্রে নিজেদেরকে লাঞ্ছিত, অপদস্ত করে তবে মুমিননা নিজেদেরকে অপদস্ত করে একমাত্র আল্লাহর জন্য, আল্লাহর দীনের জন্য। দুনিয়ার জন্য তাঁরা কখনো নিজেদেরকে অপদস্থ করে না, লাঞ্ছিত করে না। এর বিপরীতে ফাসেক ও মুনাফিকরা নিজেদেরকে লাঞ্ছিত, অপদস্ত করে দুনিয়ার জন্য, দুনিয়ার পদ পদবির জন্য। দুনিয়াদারদের থেকে একটু করুণা লাভের জন্য।

কোরআনে কারীমে প্রকৃত মুমিনদের ব্যাপারে বলা হয়েছে, তাঁরা মুমিনদের প্রতি কোমল, أذلة علي المؤمنين এ গুণটির পাশাপাশি তাঁদের আরও একটি গুণ উল্লেখ করা হয়েছে। তা হল, أعزة علي الكافرين তাঁরা কাফেরদের প্রতি কঠোর।

তাঁদের দ্বিতীয় গুণটিই বলে দেয় যে, প্রথম গুণটি তাঁদের দুর্বলতার কারণে নয়। কারণ, তাঁরা দুর্বল হলে কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে কীভাবে? বুঝা গেল, মুমিনদের প্রতি তাঁদের কোমলতা তাঁদের শক্তিমত্তার সাথেই হয়। দুর্বলতার সাথে হয় না।

আয়াতে পরের অংশে বলা হচ্ছে, তাঁরা তাঁদের সেই শক্তি নিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকে না। তাঁরা সেটা প্রকাশও করে। يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لَائِمٍ তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করে, আল্লাহর শত্রুদের বিরুদ্ধে দুর্ধর্ষ জঙ্গিতে পরিণত হয় এবং জিহাদ করতে গিয়ে তারা কখনো কারো তিরস্কারের ভয় করে না। কে কি বলবে-না বলবে তারা ওসবের কোনও পরোয়া করে না।

মুমিনদের প্রতি কোমলতা ফল

মুমিনদের প্রতি তাদের কোমলতার ফল হল, জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তারা বিনয়ী হয়, নমনীয় হয়। মুমিনদের সাথে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি কাজ তারা কোমলতা সহকারে সম্পাদন করে। উদাহরণত, আমীর যে কোন বিষয়ে তার মামুর ভাইদের থেকে মাশওয়ারা নেন। এটি আমীরের পক্ষ থেকে কোমলতার বহিঃপ্রকাশ। وأمرهم شوري بينهم – আর মামুররা তাদের আমীরের শরিয়তসম্মত প্রতিটি নির্দেশ আল্লাহর নির্দেশ ভেবে পালন করেন। যত কষ্টের কাজই হউক না কেন, তা পালনের ক্ষেত্রে তারা নিজেদের জীবন পর্যন্ত বাজি রাখে। এটি তাদের পক্ষ থেকে কোমলতার বহিঃপ্রকাশ। ছোটরা বড়দেরকে সম্মান করে। বড়রা ছোটদেরকে স্নেহ করেন। সাধারণ মুসলমানরা আলেমদেরকে সম্মান করে। তাঁদের কথা মান্য করে। আলেমরাও সাধারণ মুসলমানদের প্রতি খেয়াল রাখে। গুনাহগার মুসলমানদেরকে তাদের গুনাহের কারণে তাদের সত্ত্বাকে ঘৃণা না করে তাদের কৃতকর্মকে ঘৃণা করে এবং তাদের সংশোধন করার চেষ্টা করে।

গুনাহগার মুসলমানদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

فَإِنْ عَصَوْكَ فَقُلْ إِنِّي بَرِيءٌ مِّمَّا تَعْمَلُونَ

তারা (মু’মিনরা) যদি আপনার অবাধ্যতা করে তাহলে বলে দিন, তোমরা যা করেছো আমি তা থেকে মুক্ত। (তোমার কৃতকর্মের সাথে আমার কোনও সম্পর্ক নেই) (সূরা শুআরা (২৬) : ২১৬)

এর বিপরীত কাফেরদের ব্যাপারে হযরত ইব্রাহিম আ.এর ভাষায় ইরশাদ করেন,

إِنَّا بُرَآءُ مِنكُمْ

আমরা তোমাদের থেকে মুক্ত। (তোমাদের সাথে আমাদের কোনও সম্পর্ক নেই)  (সূরা মুমতাহিনাহ (৬০) : ৪)

কাফেরদের কৃতকর্মের পাশাপাশি তাদের সত্ত্বাও ঘৃণিত। পক্ষান্তরে মুমিনদের থেকে কোনো গুনাহ হয়ে গেলে তাদের সেই কাজটা ঘৃণিত হলেও তাদের সত্ত্বা ঘৃণিত হয় না। কাফেররা হল ক্যান্সারে আক্রান্ত হাতের মতো। কেটে ফেলা ছাড়া আর কোন উপায় নেই। আর গুনাহগার মুমিনরা হল, ময়লাযুক্ত হাতের মতো। কেটে ফেলতে হবে না। ধুয়ে ফেললেই হবে।

কয়েকটি উদাহরণ

একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খালেদ বিন ওয়ালীদ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে তাঁর একটি কাজের জন্য তিরস্কার করেছেন। দেখুন, তখন তিনি কী বলছেন,

اللهم إني أبرأ إليك مما صنع خالد

হে আল্লাহ! খালেদ যে কাজ করেছে তাঁর সেই কাজের সাথে আমার কোনও সম্পর্ক নেই। দেখুন, এখানে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ কথা বলেননি যে, হে আল্লাহ! খালেদের সাথে আমার কোনও সম্পর্ক নেই। বরং বলেছেন, সে যা করেছে তাঁর কাজের সাথে আমার কোনও সম্পর্ক নেই।

মুমিন আর কাফেরের মধ্যে তফাতটা এখানেই। মুমিন কোন অন্যায় করে ফেললেও মু’মিন হিসেবে তাকে মহব্বত করতে হবে, তার সাথে সম্পর্ক রাখতে হবে। তার প্রতি ভালোবাসা রাখতে হবে। এ সবের পাশাপাশি তার সংশোধনের চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। মোটকথা হল, মুমিনদের সাথে আমাদের আচরণ হবে নমনীয়তা ও কোমলতার। তাদের সাথে রুঢ়তা ও কঠোরতার আচরণ হবে না।

ইমাম ইবনে কাসির রাহিমাহুল্লাহ আল্লাহ তাআলার নিম্নোক্ত বাণী-

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا مَن يَرْتَدَّ مِنكُمْ عَن دِينِهِ فَسَوْفَ يَأْتِي اللَّهُ بِقَوْمٍ يُحِبُّهُمْ وَيُحِبُّونَهُ أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ يُجَاهِدُونَ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَلَا يَخَافُونَ لَوْمَةَ لَائِمٍ  

হে ঈমানদারগণ! তোমাদের কেউ তার দ্বীন থেকে বিমুখ হয়ে গেলে আল্লাহ তায়ালা এমন এক জামাত নিয়ে আসবেন, যাদেরকে আল্লাহ ভালোবাসবে। তারাও আল্লাহকে ভালোবাসবে। তারা মুমিনদের প্রতি কোমল এবং কাফেরদের প্রতি কঠোর হবে। তারা আল্লাহর পথে জিহাদ করবে, তার কোনো নিন্দুকের নিন্দার পারোয়া করবে না। (সূরা মায়েদা (৫) : ৫৪)

এর ব্যাখা প্রসঙ্গে বলেন, এখানে আল্লাহ তাআলা বলছেন, তোমাদের কেউ দ্বীন থেকে বিমুখ হলে আল্লাহ এমন একটি জামাত নিয়ে আসবেন, যে জামাতের মধ্যে বেশ কিছু গুণ থাকবে। এ থেকে বুঝা যাচ্ছে, দ্বীন বিমুখতার সময় আল্লাহ তা’য়ালা দ্বীনকে বিজয়ী করবেন জামাতের মাধ্যমে। আল্লাহর সাহায্যটা আসবে জামাতের ওপর।

সেই জামাতের সদস্যদের মধ্যে কী কী গুণ থাকবে তা এখানে বলা হয়েছে। এই গুণগুলো যে জামাতের মধ্যে থাকবে তাদের সদস্য সংখ্যা অনেক হলেও তারা সবাই হবে এক ব্যক্তির মতো। কারণ সেই জামাত হবে ঐক্যবদ্ধ জামাত। হাদিসের ভাষায় গোটা জামাতটি হবে একটি দেহের মতো। হাদিসে এসেছে,

عَنِ النُّعمَانِ بنِ بَشِيرٍ رَضِيَ الله عَنهُمَا، قَالَ : قَالَ رَسُولُ الله صلى الله عليه وسلم: «مَثَلُ المُؤْمِنينَ في تَوَادِّهِمْ وتَرَاحُمِهمْ وَتَعَاطُفِهمْ، مَثَلُ الجَسَدِ إِذَا اشْتَكَى مِنْهُ عُضْوٌ تَدَاعَى لَهُ سَائِرُ الجَسَدِ بِالسَّهَرِ والحُمَّى». مُتَّفَقٌ عَلَيهِ

হযরত নুমান বিন বশীর রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, একে অপরের প্রতি ভালোবাসা, দয়া-মায়া এবং স্নেহ-মমতার দিক দিয়ে মুমিনদের উদাহরণ হল একটি দেহের মতো। দেহের কোন একটি অঙ্গ ব্যাথাপ্রাপ্ত হলে সারাটা দেহ তার জন্য অনিদ্রা ও জ্বরে আক্রান্ত হয়ে যায়। (সহী বুখারী ৬০১১; সহী মুসলিম ২৫৮৬)

বুঝা গেল, পুরো মুসলিম জামাত যেন একটি দেহ। এ জামাতের প্রতিটি সদস্য আয়াতে উল্লিখিত গুণাবলী সম্পন্ন হবে। কেউ এই গুণাবলী সম্পন্ন হলেই এ জামাতের অংশ হবে। তা না হলে হবে না। এ জামাতটিই হবে কেয়ামত পর্যন্ত সাহায্যপ্রাপ্ত জামাত। বিজয়ী জামাত। এরাই হল সত্যিকার অর্থে সাহাবায়ে কেরামের অনুসারী। এরাই হল ইমাম মাহদীর জামাত। এ জামাতের ব্যাপারেই হাদিসে সুসংবাদ দেয়া হয়েছে যে, তারা সর্বদা হকের উপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে। এটি বিশেষ কোন স্থান কিংবা বিশেষ কোন কালের সাথে সীমাবদ্ধ নয়। বরং তারা যে-ই হোক এবং দুনিয়ার যেখানেই থাকুক তারা এ জামাতের অন্তর্ভূক্ত। এ গুণগুলো থাকলেই তারা ওই জামাতের সদস্য হয়ে যাবে। তারা হবে মুমিনদের প্রতি কোমল এবং কাফেরদের প্রতি হবে কঠোর।

أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ

তারা কখনো আরব-আজম, বাঙ্গালি-হিন্দি, ইরাকি-আফগানি এসব নামে পঞ্চান্নটি জাতিতে বিভক্ত হবে না। তারা সবাই এক জাতি। এক জামাত। সবার আনন্দ-ফুর্তি এক, দুঃখ-কষ্ট এক। সবাই অন্যের আনন্দে আনন্দিত হবে, অন্যের দুঃখ-কষ্টে ব্যথিত হবে। অন্যের বিপদকে সবাই নিজের বিপদ মনে করবে। অন্যের আনন্দকে নিজের আনন্দ মনে করবে।

সবাই একটি দেহের মতো হয়ে যাওয়ার অর্থ এটাই। এজন্যই বিশ্বের যেকোন প্রান্তে কোন মুসলমান দুশমন কর্তৃক আক্রান্ত হলে সবার উপর তাকে রক্ষা করা ফরজ হয়ে যায়। যতক্ষণ না তাকে রক্ষার ব্যবস্থা হয়েছে ততক্ষণ পর্যন্ত এ ফরজ থেকে কেউই মুক্ত হতে পারে না। সবাই এই ফরজের অন্তর্ভুক্ত থাকে। এ জন্য যদি দুনিয়ার সবকিছু ছাড়তে হয় তাহলে তা-ই করতে হবে। সব ছেড়ে হলেও একজন মুমিনকে রক্ষা করতে হবে।

একজন মুমিনের জন্য চৌদ্দশত মুমিন প্রস্তুত

আমাদের ইতিহাস দেখুন, মক্কার মুশরিকরা যখন হযরত উসমান রাযিয়াল্লাহু আনহুকে আটক করে। এরপর তাঁকে শহীদ করে দেয়া হয়েছে বলে খবর ছড়িয়ে পড়ে তখন তাঁর প্রতিশোধ নেয়ার জন্য খোদ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সহ চৌদ্দশত সাহাবী এ কথার উপর প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হন যে, প্রয়োজনে আমরা সবাই শহীদ হয়ে যাবো তবুও একজন মুমিনের রক্তের প্রতিশোধ নিয়ে ছাড়ব। কোনও ভাবেই আমরা আমাদের ভাইয়ের রক্ত বৃথা যেতে দেব না।

লক্ষ্য করুন, একদিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম সহ চৌদ্দশত সাহাবী। অপর দিকে মাত্র একজন মুমিন। কিন্তু তবুও এই একজন মুমিনের রক্তের বদলা নেওয়ার জন্য সবাই প্রস্তুত। একজন মুমিনের মূল্য এমনই। তাই তো একজন মুমিনকে রক্ষা করার গুরুত্ব অন্য মুমিনদের কাছে এত বেশি।

মুসলমানরা যদি সব সময় এভাবে একে অপরের চিন্তা করতো, অন্যের বিপদকে নিজের বিপদ মনে করত তাহলে পৃথিবীর কোন শক্তির সাহস হতো না তাদের গায়ে সামান্য টোকা দেয়ার। আমাদের পূর্বপুরষদের মধ্যে এ গুণটি ষোল আনায় ষোল আনাই ছিল। তাঁরা অন্যের সুখ-দুঃখকে নিজের সুখ-দুঃখ মনে করতেন। তাই তো তাঁরা সারা জীবন যেমন নিজের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দিয়েছেন মৃত্যুর আগ মুহূর্তেও তা করতে ভুলেন নি। তাঁরা নিজেরা কষ্ট করেছেন তবুও চেয়েছেন আমার ভাইটি যেন একটু শান্তিতে থাকে। তাঁর যেন কোনও কষ্ট না হয়। অন্যের কথা ভাবতে ভাবতে নিজের কথা ভুলেই যেতেন।

এবার আমরা আমাদের পূর্বপুরুষদের কিছু অবস্থা দেখব তারপর নিজেদের দিকে তাকাব। তাঁরা কেমন ছিলেন আর আমরা কেমন? তাহলেই বুঝতে পারব, কী কারণে তারা আল্লাহর দীনকে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে দিতে পেরেছেন? আর আমরা নিজ দেশেই যেন প্রবাসী হয়ে যাচ্ছি। নিজের দেশেও সম্পূর্ণ দীনের ওপর চলতে পারছি না। কী কারণে তাঁরা গোটা বিশ্বে সম্মান ও মর্যাদার আসনে বসতে পেরেছিলেন আর আমরা বিশ্বের সব দেশেই লাঞ্ছনা ও অপদস্থতার শিকার হচ্ছি।

মৃত্যুর আগ মুহুর্তেও অন্য ভাইকে ভুলেননি

হযরত হুযাইফা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ইয়ারমুকের যুদ্ধ শেষে আহত নিহতের মধ্যে আমি আমার চাচাতো ভাইকে খুঁজতে থাকি। খুঁজতে খুঁজতে হঠাত পেয়ে যাই। দেখি, তাঁর একদম যায় যায় অবস্থা। তাঁকে পানি পান করানোর জন্য সংগে পানি নিয়ে গিয়েছিলাম। আমি তাঁর মুখের কাছে পানি তুলে ধরতেই তাঁর পাশে পড়ে থাকা হিশাম ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু পানি পানি বলে চিৎকার করে উঠেন। তখন আমার চাচাতো ভাই আগে তাঁকে পানি দেয়ার জন্য ইশারা দেন। সঙ্গে সঙ্গে আমি হিশাম ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু এর কাছে পানি নিয়ে যাই। কিন্তু ঠিক ওই মুহুর্তে তাঁর পাশে থাকা আরেক ভাই পানি পানি বলে উঠেন। তখন তিনি ইশারা দেন, আগে তাঁকে পানি দাও। আমি তৃতীয় ব্যক্তির কাছে পানি নিয়ে যাই। গিয়ে দেখি তিনি ততক্ষণে শহীদ হয়ে গেছেন। এরপর হিশাম ইবনে আস রাযিয়াল্লাহু আনহু এর কাছে ফিরে এসে দেখি, তিনিও শহীদ হয়ে গেছেন। এরপর চাচাতো ভাইয়ের কাছে এলাম। দেখি, তিনিও শহীদ হয়ে গেছেন।

মৃত্যুর আগ মুহূর্তে তীব্র তৃষ্ণা থাকা সত্ত্বেও নিজে পানি পান না করে অন্য ভাইকে দিয়ে দেয়া যে কত কঠিন তা আমরা কল্পনাও করতে পারব না। কোন মানসিকতায় উপনীত হওয়ার পর তাঁদের এ অবস্থাটা হয়েছে। তাঁদের ব্যাপারেই আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,

وَيُؤْثِرُونَ عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ وَلَوْ كَانَ بِهِمْ خَصَاصَةٌ

তাঁরা নিজেরা অভাবগ্রস্থ হলেও অন্যদেরকে নিজেদের ওপর প্রাধান্য দেয়। সূরা হাশর (৫৯) : ৯

নিজের জন্য একটা দিরহামও রাখেননি

বর্ণিত আছে, একবার হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার কাছে এক লাখ দিরহাম হাদিয়া আসে। তিনি পুরো এক লাখ দিরহাম আসার কিছুক্ষণের মধ্যেই দান করে দেন। সব দিরহাম দান করা হয়ে গেলে তাঁর খাদেমা তাঁকে বললেন, আপনি তো রোযা রেখেছেন। একটা দিরহাম যদি নিজের জন্য রেখে দিতেন। তাহলে ইফতারের ব্যবস্থাটা হয়ে যেত। তাঁর কথা শুনে তিনি বললেন, আগে স্মরণ করাতে।

একটু চিন্তা করে দেখুন, এক লাখ দিরহাম দান করে দিচ্ছেন অথচ নিজের ঘরে ইফতার করার মতো কিছু নেই। তাঁর সে কথা মনেও নেই। একটা দিরহাম যে রাখবেন তাও তাঁর মনে আসেনি। এ হল আমাদের সালাফদের অবস্থা। তারা অন্যদের নিয়ে এত বেশি চিন্তা করতেন যে নিজের কথা ভুলেই যেতেন। আর আমাদের অবস্থা হল এর সম্পূর্ণ বিপরীত।

ফসলের স্তুপ কমছেই না 

সহী বুখারীতে একটি ঘটনা এসেছে। ঘটনাটি বনি ইসরাঈলের দুই ব্যক্তির। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, বনী ইসরাঈলে দুজন লোক ছিল। একজন যুবক আর অপর জন বৃদ্ধ। একবার দু’জনে মিলে একটি জমি চাষ করে। ফসল হবার পর ফসল কেটে ভাগ করে প্রত্যেকেই নিজ নিজ ফসল স্তুপ করে রাখে। এরপর যুবক তার স্তুপ থেকে কিছু শস্য বস্তায় ভরে তা নিয়ে বাড়ির উদ্দেশে রওনা করে। বৃদ্ধও তার স্তুপ থেকে বস্তা ভরছে। যুবক ফিরে এসে তার বস্তা মাথায় উঠিয়ে দিবে।

যুবক তো বাড়ির দিকে যাচ্ছে। এদিকে বৃদ্ধ বোঝা ভরছে আর মনে মনে বলছে, আমি তো বৃদ্ধ মানুষ। আমার জীবন শেষ। ওতো যুবক। বিয়ে-শাদি করবে। জীবনে প্রতিষ্ঠিত হবে। তার অনেক টাকা পয়সার দরকার। এই চিন্তা করে নিজের ভাগের শস্য থেকে কিছু শস্য যুবকের স্তুপে রেখে দেয়।

কিছুক্ষণ পর যুবক ফিরে এল। এসে বৃদ্ধের মাথায় বোঝা উঠিয়ে দিল। বৃদ্ধ বোঝা নিয়ে বাড়ির দিকে রওনা দিল। যুবক জমিতে দাঁড়িয়ে মনে মনে বলছে, আমি তো যুবক। গায়ে শক্তি আছে। জীবনে কোনো একটা উপায় বের করে নিতে পারব। তিনি তো বৃদ্ধ। তাঁর তো টাকা পয়সার দরকার। সম্পদের দরকার। অভাবে পড়ে গেলে টাকা পয়সা কোথায় পাবেন? এসব ভেবে নিজের স্তুপ থেকে কিছু শস্য বৃদ্ধের স্তুপে রেখে দিল। তাদের এ কার্যকলাপ আল্লাহ ছাড়া কেউ দেখেনি। একমাত্র তিনিই দেখেছেন। আল্লাহ তা’য়ালার রহমতের দরিয়ায় জোশ এসে যায়। ফল এই হয়, তাঁরা দু’জন সারাদিন ধরে নিজ নিজ ফসল বাড়ি নিয়ে যায়। কিন্তু কারও স্তুপই কমছে না। সুবহানাল্লাহ

এ হল মু’মিনদের পারস্পরিক সুসম্পর্কের নগদ ফলাফল। যারা অন্যের প্রতি দয়া দেখায় আল্লাহ তাআলাও তাদের প্রতি দয়া দেখান। হাদীসে এসেছে,

الرَّاحِمُونَ يَرْحَمُهُمُ الرَّحْمَنُ ارْحَمُوا مَنْ فِي الأَرْضِ يَرْحَمْكُمْ مَنْ فِي السَّمَاءِ

আল্লাহ তাআলা দয়ালুদের উপর দয়া করেন। তোমরা জমিনবাসীর উপর দয়া দেখাও। আসমানবাসী অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের উপর দয়া দেখাবেন। (জামে তিরমিযী ১৯২৪, হাদীসটি সহীহ)

আপনি জমিনবাসীর প্রতি দয়া দেখাবেন আপনার সাধ্য অনুযায়ী আর এর বিনিময়ে আল্লাহ আপনার প্রতি দয়া দেখাবেন তাঁর ক্ষমতা অনুযায়ী।

আপনি যদি আপনার কোনো ভাইয়ের সাথে দয়াসূলভ আচরণ না করেন বরং তুচ্ছ দুনিয়া নিয়ে তার সাথে টানা-টানি করেন তাহলে আপনি সর্বোচ্চ কী-ইবা পাবেন? অথচ এ কারণে আপনি আল্লাহর পক্ষ থেকে পাওয়া বিরাট প্রতিদান থেকে বঞ্চিত হবেন। এতে লাভ হল, না ক্ষতি হল?

তাই বিশাল প্রতিদানের আশায় দুনিয়ার সামান্য জিনিসটা অন্যের জন্যই ছেড়ে দিন।

তারা কোথায় আর আমরা কোথায়?

সুলাইমান দারিমি নামে এক বুযুর্গ ছিলেন। তিনি বলতেন, আমি যখন কাউকে কোন কিছু খাওয়াই তখন সেই জিনিসটা সে খাওয়ার সময় আমি নিজে অন্য রকম একটি স্বাদ অনুভব করি। নিজে খেলে সেই স্বাদটা আমি পাই না।

আসলেই যারা উদার তারা নিজেরা কোন কিছু ভোগ করে যতটুকু তৃপ্তি পায়, অন্যকে ভোগ করিয়ে তার চেয়ে অনেক বেশি তৃপ্তি পায়।

কিন্তু আমাদের মন হয়ে গেছে সংকীর্ণ। আমরা নিজেকে ছাড়া আর কাউকেই চিনি না। নিজের সুখ ছাড়া আমরা কিছুই বুঝি না।

এ সব উন্নত গুণগুলো থেকে আমরা এখন একদমই বঞ্চিত হয়ে গেছি। বাস্তবতা হচ্ছে, যে কোন গুণ অর্জন করতে হলে প্রাথমিক পর্যায়ে একটু কষ্ট করতে হয়, কুরবানি দিতে হয়, নিজের মধ্যে ছাড় দেয়ার মানসিকতা থাকতে হয় তবেই আল্লাহ তাআলা মেহেরবানি করে সেই গুণটি বান্দাকে দান করেন। কেউ যখন নিজের ওপর অন্যকে প্রাধান্য দিতে থাকে, অন্যকে ছাড় দিতে থাকে তখন ধীরে ধীরে তা তার স্বভাবে পরিণত হয়ে যায়।

বর্তমানে আমরা যখন নিজেদের অবস্থার দিকে তাকাই তখন দেখতে পাই, একদিকে আমরা আমাদের পূর্বপুরুষের সেই উন্নত গুণাবলী থেকে বঞ্চিত হয়েছি অপর দিকে নিকৃষ্ট সব স্বভাব আমাদের মধ্যে স্থান করে নিয়েছে।

মুসলিম দেশগুলোর রাষ্ট্রপ্রধানদের দিকে লক্ষ্য করুন। একদিকে তারা নিজেদের গদি টিকিয়ে রাখার জন্য, ক্ষমতা ধরে রাখার জন্য নানা ভাবে মুসলমানদের ওপর জুলুম করছে অপরদিকে কাফেরদের সাথে মিলে মুসলিম উম্মাহর একটা দেহকে পঞ্চান্নটার মতো টুকরা করেছে। আহ! গোটা মুসলিম উম্মাহ একটা দেহ ছিল। ওরা একে টুকরা টুকরা করে পঞ্চান্নটা অংশে ভাগ করে ফেলেছ।

এই যে পাকিস্তান-বাংলাদেশ ভাগ হলো, কীজন্য হল এই ভাগ? ওরা চেয়েছে, রাজত্ব আমরা করবো। ক্ষমতা আমাদের হাতে থাকবে। আর এরা চেয়েছে, না, আমরা করবো। সবাই ক্ষমতা চেয়েছ। এক সাথে দু’জন তো আর ক্ষমতা নিতে পারবে না। তাই একটা দেশকে দুইটা বানিয়ে নিয়েছে। দেশ ভাগ হয়েছে তাতে কী হয়েছে? আমার তো লাভ হয়েছে! আমি এখন প্রধানমন্ত্রী হতে পেরেছি! আমার আমলারা এখন মন্ত্রী হতে পেরেছে! ভাগ না হলে তো আমি প্রধানমন্ত্রী হতে পারতাম না। আমার আমলারা মন্ত্রী হতে পারত না। ওরা নিজেদের স্বার্থে বিশাল একটা মুসলিম দেশকে দুই ভাগে ভাগ করেছে।

বর্তমানে চারদিকে শুধু জুলুম আর জুলুম চলছে। দেখুন, বর্তমানে একজন বাংলাদেশি মুসলমান সৌদি আরব, কাতার কিংবা ওমানে গিয়ে নিজের মতো করে যে কোন বৈধ কাজ করতে পারে না। করতে চাইলে ওদের গোলাম হয়ে করতে হয়! ওদের কাফালতের অধীনে করতে হয়। কেন এমন হল? আল্লাহর জমিনে বিচরণ করতে কেন ওদের অনুমতি লাগবে? ওদের অনুমতি ছাড়া ওদের দেশে কেউ গেলে সে হয়ে যাবে অবৈধ!

বর্তমানে কোন মুসলমান দেশের সরকারের অনুমতি ছাড়া নিজের বৈধ সম্পদ দিয়ে অন্য দেশ থেকে মালামাল কিনে নিজের দেশে এনে বিক্রি করতে চাইলে সে হয়ে যায় চোরা কারবারী! অথচ তার সম্পদ বৈধ, ব্যবসার পদ্ধতি বৈধ।

বর্তমানে এক মুসলমানের প্রতি আরেক মুসলমানের কোনও মায়া মমতা নেই। অন্য দেশের হলে তো কথাই নেই। দুশমনরা আমাদের আরাকানি মুসলমান ভাই বোনদেরকে পাখির মতো হত্যা করেছে, ঘর বাড়ি জ্বালিয়ে দিয়েছে, নিজেদের ভিটেমাটি থেকে তাড়িয়ে দিয়েছে আর আমরা তাদেরকে সামান্য চাল ডাল দিয়েই ভাবছি, মুসলমান হিসেবে আমরা আমাদের দায়িত্ব আদায় করে ফেলেছি। অথচ মুসলিম উম্মাহ হিসেবে আমাদের কাছে তাদের পাওনা কি শুধু এটুকুই ছিল?

আমাদের রাষ্ট্র প্রধানদের অবস্থা

দেখুন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম খারিজিদের ব্যাপারে বলেছেন :

يقتلون أهل الإسلام ويدعون أهل الأوثان لئن أدركتهم لأقتلنهم قتل عاد

তারা মুসলমানদেরকে হত্যা করবে এবং মুশরিকদেরকে ছেড়ে দেবে। আমি এদেরকে পেলে আ’দ জাতিকে ধ্বংস করার মতো ধ্বংস করতাম।  (সুনানে আবু দাউদ ৪৭৬৪; সুনানে নাসায়ী ৪১১২; হাদীসটি সহীহ)

বর্তমানে মুসলিম দেশগুলোর রাষ্ট্র প্রধান, সেনাবাহিনী, আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ইত্যাদি নামে যত বাহিনী আছে তাদের কর্মকান্ডগুলো দেখুন, তাদের পরিষ্কার ঘোষণা, আমরা ইসলামপন্থীদের ব্যাপারে, ইসলামি জঙ্গিদের ব্যাপারে ‘জিরো টলারেন্স নীতি’ গ্রহণ করেছি। তাদের ব্যাপারে কোনও কিছু সহ্য করা হবে না! তাদেরকে যেখানেই পাওয়া যাবে গ্রেফতার করা হবে, জেলে বন্দি করা হবে। প্রয়োজনে ক্রস ফায়ারে হত্যা করা হবে।

অথচ কোরআনে কারীমে এ নির্দেশ কাফের মুশরেকদের ব্যাপারে দেয়া হয়েছে,

فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدتُّمُوهُمْ

তোমরা মুশরেকদেরকে যেখানে পাও হত্যা করো। সূরা তাওবা (৯) : ৫

কাফের মুশরেকদের ব্যাপারে দেয়া নির্দেশটা ওরা কীভাবে বাস্তবায়ন করছে? তারা মুজাহিদদের গ্রেফতার করছে। গুম করছে। ক্রস ফায়ারের নামে নির্বিচারে হত্যা করছে। এ ব্যাপারে কারো কোন আপত্তি নেই। এখানে কোন মানবতাবাদীর চিৎকার শোনা যায় না। ইসলামপন্থীরা যেন জীব জন্তুর পর্যায়েরও না! পশু পাখির মতোও না।

এত হল মুসলমানদের সাথে তাদের আচরণ। অপরদিকে কাফের-মুশরিকদের সাথে তাদের সম্পর্ক খুব ভালো। কাফের মুশরেকরা তাদের বন্ধু। সারা পৃথিবীতে কাফেরদের মধ্যে কেউ তাদের শত্রু নেই। তারা গর্বের সাথে বলে বেড়ায়, সবাই আমাদের বন্ধু! আমরা অসাম্প্রদায়িক। আমরা কারো সাথে বিবাদে জড়াতে চাই না। তাদের এসব কথাগুলো কেবল কাফেরদের বেলাই হয়। মুসলমানদের বেলায় তাদের চেহারা সম্পূর্ণ ভিন্ন। তারা নিজেদের স্বার্থে কাফের প্রভুদের সাথে মিলে মুসলিম উম্মাহকে পঞ্চান্নটা টুকরা করে ফেলল, তারপরও বলছে, আমরা অসাম্প্রদায়িক, আমরা অসাম্প্রদায়িক নীতি বাস্তবায়ন করছি! অসাম্প্রদায়িক মানে, মুসলিম উম্মাহ পঞ্চান্ন ভাগে বিভক্ত হলে হোক, কাফেরদের সাথে তো আমরা মিলে আছি! কাফেরদেরকে আমরা ভিন্ন সম্প্রদায় মনে করি না- এই হিসেবেই আমরা অসাম্প্রদায়িক!! চিন্তা করে দেখুন, কী ভয়ংকর মানসিকতা তাদের!

অথচ কোরআনে কারীমে প্রকৃত মুমিনদের ব্যাপারে বলা হয়েছে,

 أَذِلَّةٍ عَلَى الْمُؤْمِنِينَ أَعِزَّةٍ عَلَى الْكَافِرِينَ

তারা মু’মিনদের ব্যাপারে হবে সহনশীল আর কাফেরদের ব্যাপারে হবে কঠোর। সূরা মায়িদা (৫) : ৫৪

মুমিনদের প্রতি সহনশীল হওয়ার গুণটি যাদের মধ্যে যতবেশি হবে, কাফেরদের প্রতি কঠোরতার পরিমাণও তাদের মধ্যে তত বেশি হবে। তারা মুমিনদের প্রতি এ কারণেই সহনশীল, যেহেতু তারা আল্লাহর অনুগত বান্দা। আল্লাহর সাথে তাদের ঈমান ও আনুগত্যের সম্পর্ক আছে।

মনে রাখবেন, যার অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসা যে পরিমাণ থাকবে আল্লাহর ভালোবাসার পাত্রদের প্রতিও তার অন্তরে সে পরিমাণ ভালোবাসাই থাকবে।

কারো অন্তরে আল্লাহর ভালোবাসা কী পরিমাণ আছে তা বুঝার উপায় হল, মুসলমানদের প্রতি তার অন্তরে কী পরিমাণ ভালোবাসা আছে আর কাফেরদের প্রতি তার অন্তরে কী পরিমাণ ঘৃণা আছে, কী পরিমাণ বিদ্বেষ আছে? এ সব দেখেই বুঝা যাবে, কে আল্লাহকে কতটুকু ভালোবাসে?

এ ক্ষেত্রে মূলনীতিটা মনে রাখবেন, এটি বলেই এখনকার মতো কথা শেষ করছি, আল্লাহর বন্ধুদের সাথে যার ঘনিষ্টতা যত বেশি আল্লাহর সাথেও তার ঘনিষ্টতা তত বেশি। এর বিপরীত, যে আল্লাহর শত্রুদের কাছে যে পরিমাণ প্রিয়পাত্র, আল্লাহর কাছে সে ঠিক সেই পরিমাণ ঘৃণার পাত্র। যে তাদের যত কাছের সে আল্লাহ থেকে ঠিক সেই পরিমাণ দূরের। আজ কথা এখানেই শেষ করছি। যে কথাগুলো বলা হল আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সবাইকে এর ওপর আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন

وصلى الله تعالى على خير خلقه محمد وآله واصحابه اجمعين

وآخردعوانا ان الحمد لله رب العالمين