কিতাব-রিসালাহ, সংশয় নিরসন

তাকফিরের ব্যাপারে সীমালংঘন : কারণ ও প্রতিকার -মাওলানা আবদুল্লাহ রাশেদ (হাফিযাহুল্লাহ)

তাকফিরের ব্যাপারে সীমালংঘন : কারণ ও প্রতিকার -মাওলানা আবদুল্লাহ রাশেদ (হাফিযাহুল্লাহ)

তাকফিরের ব্যাপারে সীমালংঘন : কারণ ও প্রতিকার

মাওলানা আবদুল্লাহ রাশেদ (হাফিযাহুল্লাহ)

সূচী

কাউকে তাকফির করার কী অর্থ?. 4

তাকফিরের উসূল-নীতিমালা.. 4

তাকফিরে মুতলাক ও তাকফিরে মুআইয়ান. 5

তাকফিরের শর্ত ও প্রতিবন্ধক. 6

তাকফিরের ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের সতর্ক-নীতি.. 7

খারেজি, মু’তাজিলা, মুরজিয়ারা ভ্রান্ত তবে কাফের নয়. 9

বাতিনি, ইসমাঈলি, নুসাইরি ও কাদিয়ানিরা নিঃসন্দেহে কাফের. 10

তাকফিরের ব্যাপারে সতর্কতার দুটি নজির. 10

ইমাম সুহনুন মালিকি রহ. (২৪০হি.) এর সতর্কতা.. 10

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. (৭২৮হি.) এর সতর্কতা.. 10

খারেজি সম্প্রদায় ও উগ্রপন্থা.. 11

যুলখুয়াইসিরা : খারেজিদের পূর্ব পুরুষ. 11

যুলখুয়াইসিরাকে হত্যা না করার কারণ. 13

মাসলাহাতের খাতিরে খারেজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিলম্বিত করা যাবে.. 14

যুলখুয়াইসিরা ছিল জাহেল আবেদ. 14

দ্বীনের নামে দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে.. 15

খারেজিদের উল্লেখযোগ্য কিছু বিভ্রান্তি.. 16

তাকফিরি ফিতনা থেকে সাবধান. 16

খারেজিদের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু হাদীস এবং তাদের মৌলিক কিছু বৈশিষ্ট. 16

খারেজিদের মৌলিক কিছু বৈশিষ্ট. 19

তাকফিরের ব্যাপারে সীমালংঘনের প্রতিকার. 20

ওলামায়ে কেরামের দায়িত্ব. 20

জিহাদি তানজিমের নেতৃবৃন্দের দায়িত্ব. 21


কাউকে তাকফির করার কী অর্থ?

তাকফির শব্দটি আরবি। এর অর্থ, কোনো মুসলিমের ব্যাপারে কাফের ও মুরতাদ হয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত দেয়া। কোনো মুসলিমকে তাকফির করার অর্থ, তার ব্যাপারে এ সিদ্ধান্ত দেয়া যে, সে ইসলাম থেকে বের হয়ে গেছে। এখন দুনিয়াতে ও আখেরাতে তার ওপর কাফের ও মুরতাদের বিধান প্রয়োগ হবে। যেমন, তার বিয়ে ভেঙে যাবে, পূর্বের সকল নেক আমল নষ্ট হয়ে যাবে, তাওবা করে পুনরায় ইসলামে ফিরে না এলে হত্যা করে ফেলা হবে, সে শাসক হলে তাকে অবশ্যই অপসারণ করতে হবে, সংঘবদ্ধ দল হলে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে হবে। এ অবস্থায় মারা গেলে তাদের জানাযা পড়া যাবে না, মুসলমানদের কবরস্থানে দাফন করা যাবে না, পরকালে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে ইত্যাদি ইত্যাদি। অতএব কাউকে তাকফির করা সাধারণ কোনো বিষয় নয় যে, কারো ইচ্ছে হল আর কাউকে কাফের বলে দিল। না, বরং এর সাথে অনেক হুকুম-আহকাম ও মাসআলা-মাসায়েল জড়িত। দুনিয়াতে তার জান-মালের নিরাপত্তা, জানাযা, কাফন-দাফন ইত্যাদি এবং আখেরাতে তার চিরস্থায়ী সফলতা কিংবা ব্যর্থতা, জান্নাতি বা জাহান্নামি হওয়াসহ অনেক কিছু এর সাথে জড়িত।

কাউকে তাকফির করার বিষয়টি যেহেতু খুবই স্পর্শকাতর তাই শরিয়ত এ ব্যাপারে আমাদেরকে খুব সাবধানতা অবলম্বন করার নির্দেশ দিয়েছে। সুস্পষ্ট ও অকাট্য দলিল প্রমাণ ছাড়া কাউকেই তাকফির করা যাবে না।

তাকফিরের বিষয়টি এতই স্পর্শকাতর যে, যেন তেন কোন অজুহাতে কাউকে তাকফির করে বসলে, নিজের ঈমান হারানোর আশঙ্কা আছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ব্যাপারে আমাদেরকে সতর্ক করে গেছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন,

إذا كفر الرجل أخاه فقد باء بها أحدهما – صحيح مسلم، رقم: 224؛ ط. دار الجيل بيروت + دار الأفاق الجديدة ـ بيروت

“কোনো ব্যক্তি তার কোনো (মুসলিম) ভাইকে তাকফির করলে দু’জনের একজন তা অবশ্যই বহন করবে।”–সহীহ মুসলিম ২২৪

অন্য হাদিসে ইরশাদ করেছেন,

أيما امرئ قال لأخيه يا كافر فقد باء بها أحدهما إن كان كما قال وإلا رجعت عليه – صحيح مسلم، رقم: 225؛ ط. دار الجيل بيروت + دار الأفاق الجديدة ـ بيروت

“যেকোনো ব্যক্তি তার (মুসলিম) ভাইকে বলবে, ‘হে কাফের’ তাহলে তাদের দু’জনের একজন তা অবশ্যই বহন করবে। যেমন বলেছে বাস্তবে তেমন হয়ে থাকলে (অর্থাৎ যাকে কাফের বলেছে সে বাস্তবেই কাফের হয়ে থাকলে) তো হলোই, অন্যথায় তার নিজের ওপর এসে পড়বে।”–সহীহ মুসলিম ২২৫

তাকফিরের উসূল-নীতিমালা

যেহেতু তাকফির একটি শরয়ী বিষয় তাই শরীয়তের অন্যান্য বিধি বিধানের মতো এরও সুনির্দিষ্ট কিছু নীতিমালা রয়েছে। সেসব নীতিমালার আলোকে যে ব্যক্তি বাস্তবেই কাফের কেবল তাকেই কাফের বলে সিদ্ধান্ত দেয়া হবে। শরীয়তের অন্যান্য বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেয়া বা ফতোয়া দেয়া যেমন যে কারো কাজ নয়, তাকফিরের বিষয়টি এমনই। বরং এ বিষয়টি আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইমাম গাযালি রহ. বলেন,

التكفير حكم شرعي، يرجع إلى إباحة المال، وسفك الدم، والحكم بالخلود في النار، فمأخذه كمأخذ سائر الأحكام الشرعية  -فيصل التفرقة بين الإسلام والزندقة، ص: 66، ت: محمود بيجو

“তাকফির একটি শরয়ী হুকুম, যার ফলাফল দাঁড়াবে, জান মাল বৈধ গণ্য করা এবং চিরস্থায়ী জাহান্নামী বলে ফায়সালা দেয়। অতএব শরীয়তের অন্যান্য বিধান যেসব নিয়ম নীতির আলোকে বের করতে হয় এটিও সেভাবেই করতে হবে।”–ফায়সালুত তাফরিকা বাইনাল ইসলাম ওয়াযযানদাকা : ৬৬

শরীয়তের অন্য যেকোনো বিধানের তুলনায় তাকফিরের বিষয়টি খুবই নাজুক ও স্পর্শকাতর। তাই উসূলে তাকফির সম্পর্কে জ্ঞান রাখেন এমন বিজ্ঞ ওলামায়ে কেরাম ছাড়া অন্য কেউ এ ব্যাপারে মুখই খুলবে না।

তাকফিরে মুতলাক ও তাকফিরে মুআইয়ান

তাকফিরের ব্যাপারে এ বিষয়টি খুব ভালোভাবে বুঝা জরুরি। এ বিষয়টি না বুঝার কারণে অনেকেই বিভ্রান্তির শিকার হন।

শরয়ী দলিল প্রমাণের আলোকে আইম্মায়ে কেরাম অনেক কথা, কাজ ও আকিদা-বিশ্বাসকে কুফর সাব্যস্ত করেছেন। যেমন বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি অমুক কাজ করবে, অমুক কথা বলবে বা অমুক বিশ্বাস রাখবে সে কাফের’। এ থেকে অনেকে মনে করেন, এসব কথা, কাজ বা আকিদার কোনোটাতে কেউ লিপ্ত হলেই কাফের হয়ে যাবে। বাস্তবে কিন্তু বিষয়টি এমন নয়। একটি কাজ কুফর হলেই যে তাতে লিপ্ত ব্যক্তি কাফের হয়ে যাবে এবং তার ওপর মুরতাদের বিধান প্রয়োগ করা হবে, ব্যাপারটি এমন নয়। বরং এক্ষেত্রে কিছু শর্ত ও মাওয়ানে বা প্রতিবন্ধক রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কাফের হওয়ার জন্য তার মাঝে শর্তগুলো পরিপূর্ণ ভাবে পাওয়া যেতে হবে এবং প্রতিবন্ধকগুলোর কোনোটা না থাকতে হবে। যদি শর্তগুলো পরিপূর্ণ ভাবে পাওয়া যায়, পাশাপাশি প্রতিবন্ধকগুলোর কোনোটা না থাকে তখনই সে কাফের বলে গণ্য হবে। পক্ষান্তরে যদি শর্তগুলোর কোনো একটা না পাওয়া যায় কিংবা কোনো একটা প্রতিবন্ধকও থাকে তাহলে কুফরে লিপ্ত হওয়া সত্ত্বেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কাফের হবে না।

যেমন ধরুন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অস্বীকার করা বা তার শানে কটুক্তি করা কুফর। যে ব্যক্তি এমন করবে সে কাফের। এটি সর্বসম্মত মাসআলা। কিন্তু হাদিসে এসেছে, মুশরিকরা হযরত আম্মার বিন ইয়াসির রাদিয়াল্লাহু আনহুকে আটক করে শাস্তি দিতে শুরু করে এবং রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অস্বীকার করতে বাধ্য করে। তখন তিনি নিরুপায় হয়ে মুখে এক-দুটি কুফরি কথা বলে ফেলেন। এতে তারা তাকে ছেড়ে দেয়। তিনি কাঁদতে কাঁদতে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এসে সব ঘটনা শুনান। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর কথা শুনে বললেন, ওরা যদি আবারও কখনও আটক করে তাহলে এভাবেই জীবন বাঁচিয়ে নিয়ো। এ ব্যাপারে একটি আয়াতও নাযিল হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন,

مَنْ كَفَرَ بِاللَّهِ مِنْ بَعْدِ إِيمَانِهِ إِلَّا مَنْ أُكْرِهَ وَقَلْبُهُ مُطْمَئِنٌّ بِالْإِيمَانِ وَلَكِنْ مَنْ شَرَحَ بِالْكُفْرِ صَدْرًا فَعَلَيْهِمْ غَضَبٌ مِنَ اللَّهِ وَلَهُمْ عَذَابٌ عَظِيمٌ (106) النحل

“যারা ঈমান আনার পর আল্লাহর সাথে কুফরি করে এবং কুফরির জন্য মন উম্মুক্ত করে দেয়, তাদের ওপর আপতিত হবে আল্লাহর গযব এবং তাদের জন্যে রয়েছে মহা শাস্তি। তবে ওই ব্যক্তি ছাড়া যাকে কুফরি করতে বাধ্য করা হয় অথচ তার অন্তর ঈমানের ওপর অবিচল থাকে।”–সূরা নাহল (১৬:১০৬)

এখানে ‘ইকরাহ’ (বাধ্য করা, জবরদস্তি করা) প্রতিবন্ধকটি বিদ্যমান থাকায় কুফর করার পরও ওই সাহাবী কাফের হননি।

কা’ব বিন আশরাফের ঘটনা আমরা সকলেই জানি। তাকে হত্যার কৌশল হিসেবে মুহাম্মাদ বিন মাসলামা রাদিয়াল্লাহু আনহু রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে রাসূলের শানে অবমাননামূলক কিছু কথা বলার অনুমতি চান। তিনি তাকে অনুমতি দেন। এরই প্রেক্ষিতে তিনি কিছু কুফরি কথা বলে কা’ব বিন আশরাফকে আশ্বস্ত করেন এরপর সুযোগ বুঝে হত্যা করেন। জিহাদের প্রয়োজনে এটি বৈধ। জিহাদের ব্যাপারটি ইকরাহের (জবরদস্তি করার) মতোই। এজন্যই কুফরি কথা বলার পরও কুফরের হুকুম বর্তায়নি। সারকথা হল, সব ধরনের কুফরের বেলায়ই –তা কথা হোক কিংবা কাজ- শর্ত ও মাওয়ানে-প্রতিবন্ধক বিবেচনা করে কুফরের সিদ্ধান্ত দিতে হয়।

এ বিষয়টির একটি নজিরও রয়েছে। তা হল, কুরআন সুন্নাহয় অনেক পাপাচারীর ব্যাপারে ধমকি এসেছে যে, তারা জাহান্নামী। যেমন কোনো মুসলমানকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করা, ইয়াতিমের মাল আত্মসাৎ করা, যুদ্ধের ময়দান ছেড়ে পলায়ন করা, যাকাত আদায় না করা ইত্যাদি। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, কেউ কোনো মুসলমানকে হত্যা করলেই সোজা জাহান্নামে চলে যাবে বা ইয়াতিমের মাল আত্মসাৎ করলেই নিশ্চিত জাহান্নামি হবে। কোনো ভাবেই সে আর জাহান্নাম থেকে রক্ষা পাবে না। না, ব্যাপারটি এমন নয়। বরং এমনও হতে পারে, হত্যাকারী বা আত্মসাৎকারী পরবর্তীতে তাওবা করে ফেলবে, ফলে আল্লাহ তাআলা তাকে মাফ করে দিবেন কিংবা দুনিয়াতে নানান বিপদাপদ দিয়ে, মৃত্যুর সময় কষ্ট দিয়ে কিংবা কবরের আযাব দিয়ে তার সেই অপরাধের শাস্তি ক্ষমা করে দিবেন। পুনরুত্থানের পর তাকে কোনো শাস্তিই ভোগ করতে হবে না। সোজা জান্নাতে চলে যাবে।

তাকফিরের বিষয়টিও এমনই। কেউ কুফর করলেই কাফের হয়ে যাবে, তার ওপর মুরতাদের বিধান প্রয়োগ করতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। বরং তার ব্যাপারে শুরুতুত তাকফির-তাকফিরের সকল শর্ত এবং মাওয়ানিউত তাকফির-তাকফিরের প্রতিবন্ধক বিষয়গুলো বিবেচনা করার পরই সিদ্ধান্ত দিতে হবে, সে কাফের হবে, কি হবে না? এ প্রসঙ্গে ইমাম ইবনে তাইমিয়াহ রহ. (৭২৮হি.) বলেন,

قد ينقل عن أحدهم أنه كفّر من قال بعض الأقوال، ويكون مقصوده أن هذا القول كفر ليحذر، ولا يلزم إذا كان القول كفرا أن يكفر كل من قاله مع الجهل والتأويل، فإن ثبوت الكفر في حق الشخص المعين كثبوت الوعيد في الآخرة في حقه، ذلك له شروط وموانع. –منهاج السنة النبوية، ج: 5، ص: 240، ط. جامعة الإمام محمد بن سعود الإسلامية

“কখনো কোনো ইমাম থেকে বর্ণিত হয়ে থাকে যে, তিনি কোনো কথার কারণে কাউকে তাকফির করেছেন। আসলে তার উদ্দেশ্য ছিল এ কথা বুঝানো যে, উক্ত কথাটি কুফর, যেন এ ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা হয়। কুফরি কথা বললেই যে কেউ কাফের হয়ে যাবে, ব্যাপারটি এমন নয়। হতে পারে সে এ ব্যাপারে অজ্ঞ কিংবা তাবিলের (ব্যাখ্যার) আশ্রয় নিয়ে কথাটা বলেছে। নির্দিষ্ট ব্যক্তি কাফের সাব্যস্ত হওয়ার ব্যাপারটি আখেরাতে তার ওপর শাস্তি সাব্যস্ত হওয়ার মতোই। উভয়টির ক্ষেত্রেই কিছু শর্ত ও প্রতিবন্ধক রয়েছে।”-মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাবিয়াহ ৫/২৪০

তিনি আরও বলেন,

التكفير له شروط وموانع قد تنتفي في حق المعين وأن تكفير المطلق لا يستلزم تكفير المعين إلا إذا وجدت الشروط وانتفت الموانع –مجموع الفتاوى، ج: 12، ص: 487-488، ط. مجمع الملك فهد

“তাকফিরের কিছু শর্ত ও কিছু প্রতিবন্ধক রয়েছে, নির্দিষ্ট কোনো ব্যক্তির মাঝে সেগুলো নাও পাওয়া যেতে পারে। তাকফিরে মুতলাক (মূলনীতির আলোকে তাকফির করার) দ্বারা তাকফিরে মুআইয়ান (নির্দিষ্টভাবে কোন ব্যক্তির তাকফির করা) সাব্যস্ত হয় না। তাকফিরে মুআইয়ান (নির্দিষ্টভাবে কোন ব্যক্তির তাকফির) তখনই করা যাবে যখন সকল শর্ত পাওয়া যাবে এবং কোনও প্রতিবন্ধক না থাকবে।”–মাজমুউল ফাতাওয়া ১২/৪৮৭-৪৮৮

তাকফিরের শর্ত ও প্রতিবন্ধক

কারো কথা বা কাজে কুফর পাওয়া গেলে তাকে তাকফির করার জন্য তার মাঝে কিছু বিষয় থাকা জরুরি, আর কিছু বিষয় না থাকা জরুরি। যে বিষয়গুলো থাকা জরুরি ওগুলোকে বলা হয় ‘শুরুতুত তাকফির’ বা তাকফিরের শর্ত। তার মাঝে এই বিষয়গুলো পাওয়া গেলে তাকফির করা যাবে, না পাওয়া গেলে তাকফির করা যাবে না। আর যে বিষয়গুলো না থাকা জরুরি ওগুলোকে বলা হয় ‘মাওয়ানিউত তাকফির’ বা তাকফিরের প্রতিবন্ধক। এগুলোর কোনোটা পাওয়া গেলে, তাকফিরের সকল শর্ত পাওয়া গেলেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে তাকফির করা যাবে না। তাকফিরের উল্লেখযোগ্য শর্তগুলো নিম্নরূপ,

البلوغ বালেগ-প্রাপ্তবয়স্ক হওয়া : অতএব অপ্রাপ্তবয়স্ক কোন শিশুর কথা বা কাজে কুফর পাওয়া গেলে তার ওপর মুরতাদের শাস্তি আসবে না। হ্যাঁ, তাকে যথাযথ শাসন করা হবে, সেটি ভিন্ন কথা।

العقل সুস্থমস্তিস্ক সম্পন্ন হওয়া : অতএব কোন পাগল কুফরি কথা বললে বা কুফরি কাজ করলে তার ওপর মুরতাদের শাস্তি আসবে না।

الصحة – হুঁশ থাকা : অতএব বেহুঁশ বা মাতাল অবস্থায় কেউ কুফর করলে কাফের হবে না।

 الطوع স্বেচ্ছায় করা : অতএব যদি ইকরাহ তথা জবরদস্তির মাধ্যমে কুফর করানো হয় তাহলে কুফর সাব্যস্ত হবে না।

الاختيارভুলক্রমে না হওয়া : অতএব যদি অন্য কোন কথা বলতে গিয়ে ভুলে মুখ থেকে কুফরি কথা বেরিয়ে যায় তাহলেও কাফের হবে না।

তাকফিরের উল্লেখযোগ্য মাওয়ানে’ বা প্রতিবন্ধকগুলো নিম্নরূপ,

الإكراهজবরদস্তি করা, বাধ্য করা : অতএব কাউকে পিস্তল ঠেকিয়ে কুফরি কথা বলানো হলে ওই ব্যক্তি কাফের হবে না।

التأويل তাবিল বা কোন ব্যাখ্যার আশ্রয় নেওয়া : যেমন খারেজিরা ব্যাপকভাবে মুসলমানদেরকে মুরতাদ মনে করে এবং তাদের জান-মাল বৈধ মনে করে। কোন মুমিনকে কাফের মনে করা এবং তার জান-মাল বৈধ মনে করা যদিও কুফর, কিন্তু তারা যেহেতু শরীয়তেরই কিছু দলিলের তাবিল বা ব্যাখ্যার ভিত্তিতে এ আকিদা পোষণ করেছে -যদিও তাদের সেই ব্যাখ্যাটি ভুল- তাই তাদেরকে তাকফির করা হয় না।

الجهل অজ্ঞতা : যেমন দারুল হরবে (কাফের রাষ্ট্রে) বসবাসকারী কোনো ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করল। দারুল হরবে যেহেতু ইসলামের সকল বিধি বিধান সম্পর্কে জানার সুযোগ সাধারণত হয় না। তাই সেই নওমুসলিম যদি অজ্ঞতার কারণে কোন কুফরি কথা বলে ফেলে বা কুফরি কাজ করে ফেলে তাহলে এ কারণে সে কাফের হবে না।

উপরোক্ত শর্ত ও প্রতিবন্ধকগুলো ছাড়া তাকফিরের আরও বিভিন্ন শর্ত ও প্রতিবন্ধক আছে। প্রত্যেকটাতে আবার বিশদ ব্যাখ্যাও আছে। তাকফির করার সময় সবগুলোকে সামনে রাখা জরুরি।

তাকফিরের ব্যাপারে ওলামায়ে কেরামের সতর্ক-নীতি

কাউকে তাকফির করা তাকে হত্যা করার চেয়েও মারাত্মক। আর হত্যা করা যে শরীয়তে কত ভয়াবহ ব্যাপার তা তো সকলের জানা। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَالِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللَّهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّ لَهُ عَذَابًا عَظِيمًا

“যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে কোনো মুসলমানকে হত্যা করে, তার শাস্তি জাহান্নাম। সেখানে সে দীর্ঘকাল থাকবে। আল্লাহ তার প্রতি ক্রুদ্ধ হয়েছেন, তার ওপর লানত বর্ষণ করেছেন এবং তার জন্যে মহা শাস্তি প্রস্তুত রেখেছেন।”–সূরা নিসা (৪) : ৯৩

রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

لَزَوَالُ الدُّنْيَا أَهْوَنُ عَلَى اللَّهِ مِنْ قَتْلِ رَجُلٍ مُسْلِمٍ – سنن الترمذي، رقم: 1395؛ ط. شركة مكتبة ومطبعة مصطفى البابي الحلبي – مصر، [حكم الألباني] : صحيح.

“আল্লাহর কাছে কোনো মুসলিমকে হত্যা করার চেয়ে সমগ্র দুনিয়া নিঃশেষ হয়ে যাওয়াও তুচ্ছ ব্যাপারে।”–সুনানে তিরমিযি : ১৩৯৫

এ কারণেই ওলামায়ে কেরাম তাকফিরের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্কতা অবলম্বন করেছেন। তাকফিরের শর্ত ও  প্রতিবন্ধকগুলো পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবেচনার পর যখন কারো কুফরের বিষয়টি অকাট্য ভাবে প্রমাণিত হয়, কোনো ভাবেই যখন তাকে ইসলামের গণ্ডিতে রাখা যায় না, তখনই কেবল তাকফিরের হুকুম দেন।

এ প্রসঙ্গে ইবনে আব্দুল বার রহ. (৪৬৩হি.) বলেন,

فالقرآن والسنة ينهيان عن تفسيق المسلم وتكفيره ببيان لا إشكال فيه … وقد اتفق أهل السنة والجماعة وهم أهل الفقه والأثر على أن أحدا لا يخرجه ذنبه وإن عظم من الإسلام وخالفهم أهل البدع فالواجب في النظر أن لا يكفر إلا ن اتفق الجميع على تكفيره أوقام على تكفيره دليل لا مدفع له من كتاب أوسنة – التمهيد لما في الموطأ من المعاني والأسانيد، ج: 17، ص: 21-22، ط. وزارة عموم الأوقاف والشؤون الإسلامية – المغرب

“কুরআন-সুন্নাহ এমন পরিষ্কারভাবে কোনো মুসলিমকে ফাসেক বা কাফের আখ্যা দিতে নিষেধ করেছে, যে ব্যাপারে কোনোই অস্পষ্টতা নেই।

… হাদিস ও ফিকহের ধারকবাহক আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআর সকলে একমত যে, যত বড় গুনাহই করুক, তা ব্যক্তিকে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের করে দেবে না। পক্ষান্তরে বিদআতিরা এর বিপরীত কথা বলে। কাজেই যুক্তির দাবি এটাই যে, কোনো ব্যক্তিকে কেবল তখনই কাফের বলা হবে যখন সকলে তাকে তাকফির করতে একমত কিংবা যখন তার তাকফিরের ব্যাপারে কুরআন সুন্নাহর এমন (অকাট্য) দলিল বিদ্যমান থাকবে, যা প্রত্যাখ্যান করার কোনোই ‍সুযোগ নেই।”–আত তামহিদ : ১৭/২১-২২

ইমাম গাযালি রহ. (৫০৫হি.) বলেন,

والذي ينبغي … الاحتراز من التكفير ما وجد إليه سبيلاً. فإن استباحة الدماء والأموال من المصلين إلى القبلة المصرحين بقول لا إله إلا الله محمد رسول الله خطأ، والخطأ في ترك ألف كافر في الحياة أهون من الخطأ في سفك محجمة من دم مسلم. – الاقتصاد فى الاعتقاد، ص: 135، ط. دار الكتب العلمية، بيروت – لبنان

“যতক্ষণ তাকফির না করে পারা যায়, উচিৎ হলো তাকফির থেকে বেঁচে থাকা। কেননা, যারা লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ- এর সুস্পষ্ট ঘোষণা দেয়, আমাদের কিবলার দিকে ফিরে নামাযও পড়ে তাদের জান মাল বৈধ মনে করা ভুল। আর কোনো মুসলিমের দু’ফোটা রক্ত ঝরানোর চেয়ে ভুলক্রমে (হত্যাপোযোগী) হাজারও কাফেরকে জীবিত ছেড়ে দেয়াও নগন্য ব্যাপার।”–আল ইকতিসাদ ফিল ই’তিকাদ : ১৩৫

কুফরি কথাবার্তা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করার পর ইবনে নুজাইম রহ. (৯৭০হি.) বলেন,

والذي تحرر أنه لا يفتى بتكفير مسلم أمكن حمل كلامه على محمل حسن أو كان في كفره اختلاف ولو رواية ضعيفة فعلى هذا فأكثر ألفاظ التكفير المذكورة لا يفتى بالتكفير بها ولقد ألزمت نفسي أن لا أفتي بشيء منها – البحر الرائق، ج: 5، ص: 135، ط. دار الكتاب الإسلامي

“সর্বশেষ ফায়সালা হলো, যতক্ষণ কোনো মুসলিমের কথাকে ভালোর ওপর প্রয়োগ করা যায় কিংবা তার কাফের হওয়ার ব্যাপারে কোনো দ্বিমত থাকে –তা কোনো দুর্বল বর্ণনাই হোক না কেন– ততক্ষণ তাকে কাফের ফতোয়া দেওয়া হবে না। এ হিসেবে উপরোক্ত কুফরি শব্দ বা কথাবার্তার অধিকাংশই এমন হবে যে, ওগুলোর কারণে তাকফিরের ফতোয়া দেয়া যাবে না। আর আমি তো নিজের ওপর আবশ্যকই করে নিয়েছি যে, এগুলোর কোনোটার কারণে (কাউকে) কাফের ফতোয়া দেব না।” –আল বাহরুর রায়িক : ৫/১৩৫

হাফেয যাহাবি রহ. (৭৪৮হি.) বলেন,

رأيت للأشعري كلمة أعجبتني وهي ثابتة رواها البيهقي، سمعت أبا حازم العبدوي، سمعت زاهر بن أحمد السرخسي يقول: لما قرب حضور أجل أبي الحسن الأشعري في داري ببغداد، دعاني فأتيته، فقال: اشهد علي أني لا أكفر أحدا من أهل القبلة، لأن الكل يشيرون إلى معبود واحد، وإنما هذا كله اختلاف العبارات.

قلت: وبنحو هذا أدين، وكذا كان شيخنا ابن تيمية في أواخر أيامه يقول: أنا لا أكفر أحدا (2) من الأمة، ويقول: قال النبي – صلى الله عليه وسلم -: (لا يحافظ على الوضوء إلا مؤمن (3)) فمن لازم الصلوات بوضوء فهو مسلم. – سير أعلام النبلاء، ج: 15، ص: 88، ط. الرسالة

“আবুল হাসান আশআরি রহ. এর একটি বক্তব্য দেখতে পেলাম। আমার কাছে এটি খুবই পছন্দ হয়েছে। … যাহির বিন আহমাদ সারাখসি বলেন, যখন আবুল হাসান আশআরি রহ. এর মৃত্যু-কাল ঘনিয়ে আসে তখন তিনি বাগদাদে আমার বাড়িতে ছিলেন। তিনি আমাকে ডাকলেন। আমি তার কাছে যাই। তখন তিনি (আমাকে লক্ষ্য করে) বললেন, আমার ব্যাপারে সাক্ষী থাক, আমি আহলে কিবলার কাউকে তাকফির করি না। কারণ, সকলে এক মাবুদেরই ইবাদত করে। আর এসব মতভেদ তো শুধু শব্দের ভিন্নতা।

(যাহাবি রহ. বলেন) আমি বলি, আমারও একই আকিদা। আমাদের শায়খ ইবনে তাইমিয়া রহ.ও শেষ জীবনে এমনই বলতেন যে, ‘উম্মাহর কাউকে আমি তাকফির করবো না’। তিনি বলতেন, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলে গেছেন, ‘ওজুর প্রতি যত্নশীল তো কেবল মুমিনই হতে পারে’। অতএব, যে ব্যক্তি ওজুর সাথে নিয়মিত নামাযও পড়বে সে মুসলিম।”–সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ১৫/৮৮

খারেজি, মু’তাজিলা, মুরজিয়ারা ভ্রান্ত তবে কাফের নয়

খারেজি, মু’তাজিলা, মুরজিয়া, জাহমিয়াসহ আহলুস সুন্নাহর বহির্ভূত সকল ভ্রান্ত ফিরকার ব্যাপারেই একই কথা। তাদের সকলের উদ্দেশ্য (আল্লাহু আলাম) আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জন করা। তবে তারা কুরআন-সুন্নাহর সঠিক মর্ম বুঝতে ভুল করেছে। এ কারণেই তারা এমন সব কথাবার্তা বলে যা বাহ্যত কুফর। তারা যতক্ষণ পর্যন্ত নিয়মিত নামায পড়ে যাবে, আল্লাহর সন্তুষ্টি তালাশ করে যাবে, ততক্ষণ তাদেরকে শুধু এসব ভ্রান্ত কথাবার্তা আর ভ্রান্ত আকিদার কারণে তাকফির করা হবে না। এ কারণেই হযরত আলী রাযি. খারেজিদের তাকফির করেননি, অথচ তারা মুসলিম উম্মাহকে কাফের মনে করতো, তাদের জান মাল বৈধ মনে করতো। হ্যাঁ! তাদের কারো মাঝে সুস্পষ্ট কুফর পাওয়া গেলে ভিন্ন কথা।

বাতিনি, ইসমাঈলি, নুসাইরি ও কাদিয়ানিরা নিঃসন্দেহে কাফের

বাতিনি, যিন্দিক, মুলহিদ, ইসমাঈলি ও নুসাইরিরা এর ব্যতিক্রম। তারা সবাই নিঃসন্দেহে কাফের। তাদের আকিদার ভিত্তিই হল কুফর ও শিরক। কাদিয়ানিরাও একই শ্রেণীভুক্ত। খতমে নবুওয়াত অস্বীকার করাই তাদের মূল আকীদা। তাদের কালিমা পড়া, নামায পড়া, রোযা রাখা কোনোই কাজে আসবে না। তাদের ব্যাপারে ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেছেন,

لا شك في كفره، بل لا شك في كفر من توقف في تكفيره  – الصارم المسلول، ص: 586، ط. الحرس الوطني السعودي

“এসব লোক কাফের হওয়ার ব্যাপারে কোনও সন্দেহ নেই। বরং এদেরকে যে কাফের বলবে না, সেও কাফের। এতে কোনও সন্দেহ নেই।”–আস সারিমুল মাসলুল : ৫৮৬

ইসমাঈলি, নুসাইরি ও কাদিয়ানিদের মতো মুসলিম দেশগুলোতে চেপে বসা বর্তমান তাগুত শাসকগোষ্ঠী, যারা আল্লাহর শরীয়ত প্রত্যাখ্যান করে কুফরি শাসনব্যবস্থা জারি করেছে এবং তা দিয়েই শাসনকার্য পরিচালনা করছে তারাও নিঃসন্দেহে কাফের। আবুল হাসান আশআরি, ইবনে তাইমিয়া ও হাফেজ যাহাবি রহ. এসব লোকের ব্যাপারে বলেনিনি যে, আমি কাউকে তাকফির করবো না’। বরং তাদের বক্তব্য সেসব ভ্রান্ত ফিরকার ব্যাপারে, যারা আল্লাহর সন্তুষ্টির অর্জনের চেষ্টা করেছিল, তবে দলিল দিতে গিয়ে ভুল করে ফেলেছিল। এ যুগের হকপন্থী সকল ওলামায়ে কেরামের দৃষ্টিতে ইসমাঈলি, নুসাইরি, কাদিয়ানিদের মতো আল্লাহর শরীয়ত প্রত্যাখ্যানকারী বর্তমান তাগুত শাসকগোষ্ঠী নিঃসন্দেহে কাফের।

তাকফিরের ব্যাপারে সতর্কতার দুটি নজির

ইমাম সুহনুন মালিকি রহ. (২৪০হি.) এর সতর্কতা

একবার দেনা-পাওনা নিয়ে এক পাওনাদার ও দেনাদারের মাঝে বিবাদ লেগে যায়। এক পর্যায়ে দেনাদার পাওনাদারকে বলল, صلّ عَلَى مُحَمَّد صَلَّى اللَّه عَلَيْه وَسَلَّم – মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দুরুদ পড়ো। রাগান্বিত অবস্থায় পাওনাদার বলে বসলো, لَا صَلَّى اللَّه عَلَى من صَلَّى عَلَيْه – যে তাঁর ওপর দুরুদ পড়বে আল্লাহ তার ওপর রহমত না করুক।

বাহ্যত এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালি দেয়ার শামিল কিংবা ওইসব ফেরেশতাকে গালি দেয়ার শামিল, যারা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর দুরুদ পড়ে। আর এতো স্পষ্ট যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালি দেয়া, ফেরেশতাদেরকে গালি দেয়া কুফর।

ইমাম সুহনুন রহ.কে জিজ্ঞেস করা হলো, এ ব্যক্তি কি মুরতাদ হয়ে গেছে? তিনি উত্তর দেন, না। কারণ, কথাটি সে রাগের মাথায় বলেছে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিংবা ফেরেশতাদের গালি দেয়া তার উদ্দেশ্য নয়। যে তাকে দুরুদ পড়তে বলেছে তাকে গালি দেয়াই তার উদ্দেশ্য।

অর্থাৎ বাহ্যিক শব্দ যদিও কুফর, কিন্তু তার অবস্থা থেকে বুঝা যায়, তার উদ্দেশ্য এমনটি নয়। (দেখুন : আশশিফা-কাযি ইয়ায : ২/২৩৫)

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. (৭২৮হি.) এর সতর্কতা

এক লোক আহলে বাইতের এক সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে গালি দিয়ে বলল, এই কুত্তা! এই কুত্তার বাচ্চা! তখন লোকজন তাকে এ বলে শাসালো যে, তুমি কি জানো, কাকে কুত্তার বাচ্চা কুত্তা বলছো? ইনি শরীফ-সম্ভ্রান্ত (নবী-বংশের লোক)। সে রেগেমেগে বলে বসলো, لَعَنَهُ اللَّهُ وَلَعَنَ مَنْ شَرَّفَهُ –আল্লাহ একেও লানত করুন, একে যে শরীফ বানিয়েছে তাকেও লানত করুন।

লোকজন আবারও শাসালো, মিঁয়া তোমার মাথা ঠিক আছে? ইনি শরীফ (নবী-বংশের লোক)। সে উত্তর দিল, কিসের শরীফ? ‘এ তো কুত্তার বাচ্চা কুত্তা’।

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এর কাছে ফতোয়া চাওয়া হল, এ ব্যক্তি কি মুরতাদ হয়ে গেছে? তিনি উত্তর দেন, যদি সে আগ থেকে যিন্দিক ছিল বলে জানা না যায়, তাহলে শুধু এ গালির কারণে তাকে মুরতাদ বলা যাবে না। দেখতে হবে, তার উদ্দেশ্য কী? কারণ, যিন্দিক না হলে একজন মুসলমান রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে গালি দিতে পারে না। مَنْ شَرَّفَهُ – ‘একে যে শরীফ বানিয়েছে’ দ্বারা যদি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উদ্দেশ্য হয় যে, এমন লোককেও রাসূল শরীফ বানিয়েছেন, তাকে সম্মান দিতে বলে গেছেন, তাই রাসূলের ওপর আল্লাহর লানত পড়ুক, এমন উদ্দেশ্য হয়ে থাকলে সে মুরতাদ।

পক্ষান্তরে যদি এটি তার উদ্দেশ্য না হয়, বরং উদ্দেশ্য হয়, বর্তমানে যারা এই লোককে সম্মান করছে তাদের ওপর লানত পড়ুক, তাহলে সে মুরতাদ হবে না। তার আগের ও বর্তমান অবস্থা বিবেচনা করে দেখতে হবে, তার উদ্দেশ্য কী? সে হিসেবে ফায়সালা হবে। ওসব বিবেচনা না করেই তাকে মুরতাদ সাব্যস্ত করা যাবে না এবং তার ওপর মুরতাদের বিধান প্রয়োগ করা যাবে না। তবে সে কোন সাধারণ মুসলিমকে নয়, বরং নবী বংশের লোককে গালি দিয়েছে, তাই –মুরতাদ হোক না হোক- তাকে তা’যির করতে হবে। উপযুক্ত শাস্তি দিতে হবে। যেন আর কখনও এমন কাজ করার সাহস না পায়। (দেখুন:  মাজমুউল ফাতাওয়া ৩৫/১৯৭-১৯৯)

খারেজি সম্প্রদায় ও উগ্রপন্থা

তাকফিরের ক্ষেত্রে উগ্রপন্থা অবলম্বন করা খারেজি সম্প্রদায়ের বৈশিষ্ট। ছোটখাট কারণে মুসলিমদেরকে তাকফির করে তাদের জান মাল বৈধ করে নেয়া এবং নির্দয়ভাবে হত্যা করা খারেজি শ্রেণীর কাজ। মুসলিম উম্মাহ দীর্ঘদিন এ শ্রেণীর ফিতনা থেকে নিরাপদ ছিল। এ যুগে আবার এদের উদ্ভব ঘটেছে। এদের উগ্রতা আর বাড়বাড়ির কারণে কাফের, মুরতাদ এবং তাদের পোষ্য দরবারি আলেমরা সুযোগ পেয়ে গেছে। তারা ইসলামকে সন্ত্রাসের ধর্ম এবং জিহাদ মানেই নৃশংস হত্যাযজ্ঞ ও রক্তপাত প্রমাণের অপচেষ্টার নতুন পথ পেয়েছে। এদের চরমপন্থার কারণে একদিকে যেমন দীর্ঘদিন ধরে চলমান জিহাদের সুফল বহুলাংশে বিনষ্ট হচ্ছে, অপরদিকে সাধারণ মুসলমানদের কাছে জিহাদের চেহারা বিকৃত হয়ে এক ভয়ংকর রূপ ধারণ করছে। জিহাদপ্রিয় অতি জযবাতি কিছু যুবক যাদের ইলমের পরিধি সীমিত, ধৈর্যও কম এবং দীনের বুঝও হালকা, এরাই এ শ্রেণীর ফাঁদে সবচেয়ে বেশি পড়েছে। বর্তমানে হক-বাতিল অস্পষ্ট হয়ে পরিবেশ বেশ ঘোলাটে হয়ে গেছে। অনেকের মনেই এখন জিহাদ ও মুজাহিদদের ব্যাপারে বিরূপ ধারণা তৈরি হয়েছে। এ সবের জন্য নব্য খারেজিরাই অনেকাংশে দায়ী।

যুলখুয়াইসিরা : খারেজিদের পূর্ব পুরুষ

খারেজিদের উৎপত্তি যদিও বেশ পরে হয়েছে কিন্তু তাদের পূর্ব পুরুষ ও আদর্শিক পিতা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যুগেই জন্ম নিয়েছিল। ইমাম বুখারি রহ. আবু সাঈদ খুদরি রাযি. থেকে বর্ণনা করেন,

بينما نحن عند رسول الله صلى الله عليه و سلم وهو يقسم قسما أتاه ذو الخويصرة وهو رجل من بني تميم فقال يا رسول الله اعدل فقال ( ويلك ومن يعدل إذا لم أعدل قد خبت وخسرت إن لم أكن أعدل ) . فقال عمر يا رسول الله ائذن لي فيه فأضرب عنقه ؟ فقال ( دعه فإن له أصحابا يحقر أحدكم صلاته مع صلاتهم وصيامه مع صيامهم يقرؤون القرآن لا يجاوز تراقيهم يمرقون من الدين كما يمرق السهم من الرمية ينظر إلى نصله فلا يوجد فيه شيء ثم ينظر إلى رصافه فما يوجد فيه شيء ثم ينظر إلى نضيه – وهو قدحه – فلا يوجد فيه شيء ثم ينظر إلى قذذه فلا يوجد فيه شيء قد سبق الفرث والدم آيتهم رجل أسود إحدى عضديه مثل ثدي المرأة أو مثل البضعة تدردر ويخرجون على حين فرقة من الناس )

 قال أبو سعيد فأشهد أني سمعت هذا الحديث من رسول الله صلى الله عليه و سلم وأشهد أن علي بن أبي طالب قاتلهم وأنا معه فأمر بذلك الرجل فالتمس فأتي به حتى نظرت إليه على نعت النبي صلى الله عليه و سلم الذي نعته – صحيح البخاري، رقم: 3414؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا

“আমরা একবার রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে উপস্থিত ছিলাম। তখন তিনি কিছু গনিমতের মাল বণ্টন করছিলেন। এ সময় বনু তামিম গোত্রের যুলখুয়াইসিরা নামক এক লোক রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে এল। এসে বললে, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইনসাফের সাথে বণ্টন করুন’। (তার কথা শুনে) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম (রাগত স্বরে) বললেন, ‘তোমার ধ্বংস হোক! আমি ইনসাফ না করলে কে ইনসাফ করবে? আমি ক্ষতিগ্রস্ত হবো, যদি ইনসাফ না করি’। তখন উমর রাযি. আরজ করলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! অনুমতি দিন, আমি ওর গর্দান উড়িয়ে দিই’। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন ‘ওকে ছেড়ে দাও। কারণ, তার এমন কিছু সাথী হবে, যাদের নামাযের সামনে তোমরা নিজেদের নামাযকে এবং তাদের রোযার সামনে নিজের রোযাকে নগণ্য মনে করবে। তারা কুরআন পড়বে কিন্তু তা তাদের কণ্ঠনালী অতিক্রম করে নিচে নামবেনা। তীর যেমন শিকারের দেহ ভেদ করে সজোরে বেরিয়ে যায়, এরাও তেমন দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে। তীরের অগ্রভাগের লোহার ফলা দেখা হবে, কিন্তু কিছুই পাওয়া যাবে না। তীরের গোড়া দেখা হবে সেখানেও কিছুই পাওয়া যাবে না। মাঝের অংশ দেখা হবে কিন্তু কিছুই পাওয়া যাবে না। এরপর গোড়ার পালকে দেখা হবে সেখানেও কিছু পাওয়া যাবে না। শিকারের নাড়িভুঁড়ি এবং রক্তমাংশ ভেদ করে তীর সজোরে বের হয়ে গেছে। (এরা যখন বের হবে) এদের নিদর্শন হবে, (তাদের দলে) একজন কালো লোক থাকবে, যার একটি বাহু হবে নারীদের স্তনের মতো; কিংবা বলেছেন, গোশতের টুকরার মতো যা (ওপর-নীচে, ডানে-বামে) নড়াচড়া করবে। মুসলমানদের মধ্যে বিরোধ চলাকালে তাদের আবির্ভাব হবে।

আবু সাঈদ রাযি. বলেন, আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি, এ হাদিসটি আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে শুনেছি। আমি এও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আলী বিন আবি তালিব রাযি. তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করেছেন এবং আমি তখন তাঁর সঙ্গে ছিলাম। তিনি ওই লোকটিকে খোঁজে বের করতে বলেন। লোকটিকে খুঁজে বের করে তার সামনে আনা হয়। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার যে বিবরণ দিয়েছিলেন আমি তাকে ঠিক ওরকমই দেখেছি।”–সহীহ বুখারি : ৩৪১৪

যুলখুয়াইসিরা এবং তার সমশ্রেণির জাহেল আবেদরাই খারেজিদের পূর্বপুরুষ। যেমনটা অন্য হাদিসে এসেছে,

إن من ضئضئ هذا أو في عقب هذا قوما يقرءون القرآن لا يجاوز حناجرهم يمرقون من الدين مروق السهم من الرمية يقتلون أهل الإسلام ويدعون أهل الأوثان، لئن أنا أدركتهم لأقتلنهم قتل عاد. – صحيح البخاري، رقم: 3166؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا

“এ লোকের বংশ থেকে এমন এক সম্প্রদায় বের হবে, যারা কুরআন তো পড়বে কিন্তু তা তাদের গলদেশ পেরিয়ে নিচে নামবে না (অর্থাৎ কুরআন পড়বে কিন্তু বুঝবে না)। শিকারের দেহ ভেদ করে নিক্ষিপ্ত তীর যেমন বেরিয়ে যায়, তেমনি তারা দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে। তারা মুসলমানদের হত্যা করবে, মূর্তি পূজারিদের ছেড়ে দেবে। যদি আমি তাদের পেয়ে যাই, তাহলে আদ জাতির মতো (সমূলে) হত্যা করবো।”-সহীহ বুখারি: ৩১৬৬

ইবনে কাসির রহ. (৭৭৪হি.) বলেন,

وليس المراد به أنه يخرج من صلبه ونسله؛ لأن الخوارج الذين ذكرنا لم يكونوا من سلالة هذا، بل ولا أعلم أحدا منهم من نسله، وإنما المراد: ” من ضئضئ هذا “. أي من شكله وعلى صفته فعلا وقولا، والله أعلم. –البداية والنهاية، ج: 10، ص: 618، ط. دار هجر للطباعة والنشر والتوزيع والإعلان

“এখানে উদ্দেশ্য এটা নয় যে, তারা যুলখুয়াইসিরার ঔরস থেকে জন্ম নেবে। কারণ, যেসব খারেজিদের আলোচনা করেছি, তারা তার বংশের ছিল না। বরং সেসব খারেজিদের কেউ তার বংশের ছিল বলে আমার জানা নেই। হাদিসে ‘এ লোকের বংশ থেকে’ বলে উদ্দেশ্য- আল্লাহ আ’লাম- এ লোকের মতো, কথায় ও কাজে এ লোকের বৈশিষ্ট্যধারী লোকদের থেকে।”–আল বিদায়া ওয়াননিহায়া : ১০/৬১৮

যুলখুয়াইসিরা কী ধরনের শব্দ বলে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর আপত্তি তুলেছিল, হাফেয ইবনে হাজার রহ. (৮৫২হি.) সেগুলোর কয়েকটি একত্রিত করছেন,

قوله فقال اعدل يا رسول الله في رواية عبد الرحمن بن أبي نعم فقال اتق الله يا محمد وفي حديث عبد الله بن عمرو فقال اعدل يا محمد وفي لفظ له عند البزار والحاكم فقال يا محمد والله لئن كان الله أمرك أن تعدل ما أراك تعدل وفي رواية مقسم التي أشرت إليها فقال يا محمد قد رأيت الذي صنعت قال وكيف رأيت قال لم أرك عدلت -فتح الباري ج: 12، ص: 292؛ ط. دار المعرفة – بيروت

“اتق الله يا محمد- হে মুহাম্মাদ! আল্লাহকে ভয় করুন।

اعدل يا محمد- হে মুহাম্মাদ! ইনসাফের সাথে বণ্টন করুন।

يا محمد والله لئن كان الله أمرك أن تعدل ما أراك تعدل- হে মুহাম্মাদ! আল্লাহর কসম, আল্লাহ যদি আপনাকে ইনসাফ করার আদেশ দিয়ে থাকেন, তাহলে আপনাকে তো ইনসাফ করতে দেখছি না।

يا محمد قد رأيت الذي صنعت قال وكيف رأيت قال لم أرك عدلت- ‘হে মুহাম্মাদ! আপনি কি করলেন, তা তো দেখলাম। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, কী দেখলে? সে উত্তর দিল, ‘আপনাকে তো ইনসাফ করতে দেখলাম না’।”–ফাতহুল বারি: ১২/২৯২

যুলখুয়াইসিরাকে হত্যা না করার কারণ

যুলখুয়াইসিরা এক দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে নাম ধরে সম্বোধন করে বেয়াদবি করেছে, অন্য দিকে তাঁর ইনসাফের ওপর প্রশ্ন তোলার মতো দুঃসাহস দেখিয়েছে। এরপরও তাকে হত্যা করা হয়নি। এর কারণ সম্পর্কে একটি বর্ণনায় এসেছে,

فَقَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رضى الله عنه دَعْنِى يَا رَسُولَ اللَّهِ فَأَقْتُلَ هَذَا الْمُنَافِقَ. فَقَالَ « مَعَاذَ اللَّهِ أَنْ يَتَحَدَّثَ النَّاسُ أَنِّى أَقْتُلُ أَصْحَابِى …» -صحيح مسلم، رقم: 2496؛ ط. دار الجيل بيروت + دار الأفاق الجديدة ـ بيروت

“তখন উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু আরজ করলেন, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! অনুমতি দিন, এ মুনাফিককে হত্যা করে ফেলি’। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আল্লাহর পানাহ! লোকজন বলাবলি করবে, আমি আমার সাথীদেরকে হত্যা করি’’।–সহীহ মুসলিম : ২৪৯৬

অর্থাৎ তাকে হত্যা করলে অন্যান্য লোকজন ভাববে, যারা আমার দ্বীন গ্রহণ করেছে আমি তাদেরকেও হত্যা করি। এতে তাদের মনে ইসলাম সম্পর্কে বিরূপ ধারণা জন্ম নেবে। ফলে তখন তারা আর ইসলাম গ্রহণ করতে চাইবে না।

সারকথা হল, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর আপত্তি তোলার কারণে যদিও সে হত্যার উপযুক্ত ছিল। কিন্তু যেহেতু তখনও ইসলাম ততোটা শক্তিশালী হয়ে উঠেনি, তাই মাসলাহাতের (জাগতিক কল্যাণের) বিবেচনায় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে হত্যা করেননি।

মাসলাহাতের খাতিরে খারেজিদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ বিলম্বিত করা যাবে

হত্যার উপযুক্ত হওয়ার সত্ত্বেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাসলাহাতের খাতিরে যুলখুয়াইসিরাকে হত্যা করেননি। এ থেকে বুঝা যায়, মাসলাহাতের খাতিরে এ ধরনের লোককে হত্যা করা থেকে বিরত থাকা যাবে। খারেজিরা সংঘবদ্ধ কোন দল হলে ইমামুল মুসলিমিন যদি মনে করেন, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে না জড়ালেই ভালো হবে, তাহলে তিনি যুদ্ধ এড়িয়ে যেতে পারেন বা বিলম্বিত করতে পারেন। একান্ত যদি তারা আক্রমণ করে বসে তাহলে প্রতিহত করবেন। অন্যথায় বিলম্বিত করতে পারেন। আবার তিনি ভালো মনে করলে আগে বাগেই যুদ্ধ করতে পারেন। তবে দলিল প্রমাণের মাধ্যমে গোমরাহি থেকে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হলে তাই করবেন। এরপরও যারা গোমরাহি এবং বিরোধিতায় অটল থাকবে, তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধই করবেন। আলী রাযি. খারেজিদের সাথে এমনই করেছেন। খারেজিদের ব্যাপারে তিনিই আমাদের অনুসরণীয়। হাফেয ইবনে হাজার রহ. (৮৫২হি.) বলেন,

لو اتفقت حالة مثل حالة المذكور فاعتقدت فرقة مذهب الخوارج مثلا ولم ينصبوا حربا أنه يجوز للإمام الإعراض عنهم إذا رأى المصلحة في ذلك كأن يخشى أنه لو تعرض للفرقة المذكورة لأظهر من يخفي مثل اعتقادهم أمره وناضل عنهم فيكون ذلك سببا لخروجهم ونصبهم القتال للمسلمين مع ما عرف من شدة الخوارج في القتال وثباتهم وإقدامهم على الموت ومن تأمل ما ذكر أهل الأخبار من أمورهم تحقق ذلك –فتح الباري ج: 12، ص: 291؛ ط. دار المعرفة – بيروت

“যদি যুলখুয়াইসিরার মতো ঘটনা ঘটে; যেমন কিছু লোক খারেজিদের আকিদায় বিশ্বাসী হয়ে গেল, তবে এখনও তারা যুদ্ধে জড়ায়নি, তাহলে মাসলাহাত মনে করলে ইমামুল মুসলিমিন তাদের এড়িয়ে যেতে পারবেন। যেমন তিনি আশংকা করলেন, যদি এই ফেরকার বিরুদ্ধে যুদ্ধে জড়ান তাহলে তাদের সমমনা অন্যান্য লোক, যারা গোপনে গোপনে এ ধরনের আকিদা পোষণ করে আসছে তারা প্রকাশ্যে চলে আসবে এবং এদের পক্ষ নেবে। ফলে তা তাদের বিদ্রোহের এবং মুসলিমদের বিরুদ্ধে কিতালের পথ করে দেবে। আর খারেজিরা যে যুদ্ধে কত তীব্র ও অবিচল এবং মৃত্যুর সম্মুখীন হতে কেমন দুঃসাহসী তা তো জানা কথাই। ঐতিহাসিকগণ খারেজিদের ইতিহাসে যা লিপিবদ্ধ করেছেন, সেগুলো দেখলে যে কারো কাছেই তা পরিষ্কার হয়ে যাবে।”–ফাতহুল বারি : ১২/২৯১

যুলখুয়াইসিরা ছিল জাহেল আবেদ

বিভিন্ন বর্ণনায় এসেছে, যুলখুয়াইসিরা ছিল একজন জাহেল আবেদ। পাশাপাশি সে ছিল বেদুইন। হাফেয ইবনে হাজার রহ. এ সম্পর্কে কয়েকটি হাদিস উল্লেখ করেছেন। যেমন তিনি বলেন,

وفي حديث أبي بكرة عند أحمد والطبري فأتاه رجل أسود طويل مشمر محلوق الرأس بين عينيه أثر السجود وفي رواية أبي الوضي عن أبي برزة عند أحمد والطبري والحاكم أتى رسول الله صلى الله عليه وسلم بدنانير فكان يقسمها ورجل أسود مطموم الشعر بين عينيه أثر السجود وفي حديث عبد الله بن عمرو عند البزار والطبري رجل من أهل البادية حديث عهد بأمر الله – فتح الباري ج: 12، ص: 292؛ ط. دار المعرفة – بيروت

“হযরত আবু বকর রাযি. থেকে বর্ণিত আহমাদ ও তাবারির একটি হাদিসে এসেছে, ‘কালো বর্ণের লম্বা এক লোক যার লুঙ্গি ওপরে উঠানো ছিল এবং মাথা ছিল মুণ্ডানো। তার দু’চোখের মাঝখানে (অর্থাৎ কপালে) সেজদার দাগ পড়া ছিল।

হযরত আবু বারযাহ রাযি. থেকে বর্ণিত আহমাদ, তাবারি ও হাকেমের একটি বর্ণনায় এসেছে, মাথা ভরা চুল বিশিষ্ট কালো এক লোক, যার দু’চোখের মাঝখানে সেজদার দাগ পড়া ছিল।

হযরত আব্দুল্লাহ বিন আমর রাযি. থেকে বর্ণিত বাযযার ও তাবারির বর্ণনায় এসেছে, বেদুইন এক লোক, আল্লাহ তাআলার আদেশ নিষেধের ব্যাপারে যে ছিল নতুন।”–ফাতহুল বারি : ১২/২৯২

লক্ষণীয় ব্যাপার হলো, এমন ইবাদাতগুজার লোকটি, সেজদা করতে করতে যার কপালে দাগ পড়ে গেছে, সে কিভাবে আল্লাহর রাসূলকে বে-ইনসাফ মনে করলো? মনে করাতেও ক্ষান্ত থাকেনি, সকলের সামনে আপত্তিও করে বসলো? উপরোক্ত বর্ণনাগুলোতে তার উত্তরও পাওয়া গেছে যে, এর কারণ ছিল দুটি,

এক. সে ছিল বেদুইন। আর বেদুইনদের মেজাজ হয় রুক্ষ। ভদ্র সমাজের সাথে তাদের উঠাবসা হয় না। ফলে তাদের মাঝে আদব কায়দা থাকে না বললেই চলে। এক হাদীসে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন,

منْ سكَنَ الباديةَ جَفا – سنن ابي داود، رقم: 2859؛ ط. دار الرسالة العالمية، ت: شعَيب الأرنؤوط – محَمَّد كامِل قره بللي، قال الأرنؤوط رحمه الله تعالى: حسن لغيره. اهـ

“যারা মরুভূমিতে বসবাস করে তাদের মেজাজ রুক্ষ্ম হয়ে যায়।” -সুনানে আবু দাউদ: ২৮৫৯

দুই. সে ছিল নতুন মানুষ। অর্থাৎ দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞ-জাহেল। বেদুইনরা এমনিতেই জাহেল হয়ে থাকে। তদুপরি সে ছিল নও মুসলিম। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

الْأَعْرَابُ أَشَدُّ كُفْرًا وَنِفَاقًا وَأَجْدَرُ أَلَّا يَعْلَمُوا حُدُودَ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ عَلَى رَسُولِهِ

“বেদুইনরা কুফর ও মুনাফেকিতে অত্যন্ত কঠোর হয়ে থাকে এবং এরা সেসব নীতি-কানুন না শেখারই যোগ্য যা আল্লাহ তাআলা তাঁর রসূলের ওপর নাযিল করেছেন।”–সূরা তাওবা (৯) : ৯৭

এক দিকে আদব কায়দা বিবর্জিত বদমেজাজি, অপরদিকে জাহেল। এ কারণেই সে আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ওপর আপত্তি করতে দ্বিধা করেনি।

দ্বীনের নামে দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে

বিভিন্ন হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খারেজিদের দ্বীনি হালত কেমন হবে, তা একটি উদাহরণ দিয়ে বুঝিয়েছেন। প্রচণ্ড শক্তিধর কোনো তীরন্দাজ কোনো শিকারের ওপর তীর মারল। তীরের গতি এতই তীব্র ছিল যে, শিকারের দেহ ভেদ করে চলে গেল। তীরের গায়ে শিকারের সামান্য রক্ত লেগে নেই। তীরন্দাজ বিশ্বাসই করতে পারছে না যে, তীরটা শিকারের গায়ে লেগেছিল। তার সন্দেহ হচ্ছে, তীর হয়তো লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়েছে। শিকারের গায়ে পড়লে তো কিছু না কিছু আলামত থাকতো।

খারেজিদের হালতও এমন। দ্বীনের ব্যাপারে এত বেশি উগ্রতা দেখাবে যে, শেষে তারা দ্বীন থেকে বেরিয়েই যাবে। প্রকৃত দ্বীনদারি বলতে তাদের মাঝে কিছুই থাকবে না। মুখে মুখে দ্বীনের বুলি আওড়ানো ছাড়া বাস্তবে দ্বীনদারি কিছুই থাকবে না। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের ইনসাফের ওপর আপত্তি তোলার পর যুলখুয়াইসিরার দ্বীনদারির যে হালত, খারেজিদেরও একই হালত। আলী রাযি. এর ভাষায় এদের দৃষ্টান্ত হলো যেমনটা আল্লাহ তাআলা বলেছেন,

قُلْ هَلْ نُنَبِّئُكُمْ بِالْأَخْسَرِينَ أَعْمَالًا (103) الَّذِينَ ضَلَّ سَعْيُهُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَهُمْ يَحْسَبُونَ أَنَّهُمْ يُحْسِنُونَ صُنْعًا

“বলুন, আমি কি তোমাদেরকে সেসব লোকের সংবাদ দেবো, যারা কর্মের দিক দিয়ে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত? তারাই সেসব লোক, পার্থিব জীবনে যাদের সকল দৌড়-ঝাপ সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে গেছে, অথচ তারা মনে করে যে, তারা খুব ভাল কাজ করছে।” –সূরা কাহফ (১৮:১০৩-১০৪) (দেখুন: আলফারকু বাইনাল ফিরাক, আব্দুল কাহির আলজুরজানি : ৩০)

খারেজিদের উল্লেখযোগ্য কিছু বিভ্রান্তি

এক. যারা তাদের আকিদায় বিশ্বাসী হবে না তারা কাফের।

দুই. খারেজিরা এমন কাজের প্রেক্ষিতে মুসলিমদের কাফের ঘোষণা করে যার ভিত্তিতে আহলুস সুন্নাহর মতে মুসলিমদের কাফের ঘোষণা করা যায় না। অধিকাংশ খারেজিদের বিশ্বাস, কোন মুসলিম কবিরা গুনাহয় লিপ্ত হলে কাফের হয়ে যায়। বর্তমান যুগের খারেজিরা আরও এগিয়ে আছে, তারা কবিরা গুনাহ ছাড়াও সামান্য সামান্য বিষয়েই মুসলিমদের তাকফির করে বসে।

তিন. বর্তমানের অনেক খারেজি মনে করে দারুল হরবে বসবাসকারী সকল মুসলিম কাফের। আর দারুল হরব বলতে তারা বুঝায়, তাদের আয়ত্বাধীন রাষ্ট্র ছাড়া সব রাষ্ট্র। এ যুগের খারেজিদের কেউ কেউ তো মুসলিম রাষ্ট্রগুলোতে আইডি কার্ড করলেও কাফের হয়ে যাবে বলে মনে করে।

চার. খারেজিরা নিজেদের জামাআতকে ইমান ও কুফরের মাপকাঠি বানায়। যারা তাদের জামাআতের অংশ নয় এমন সবাইকে তারা কাফের গণ্য করে। আবার অনেকে এমন সবার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা এবং হত্যা করা জায়েজ মনে করে। অথবা মনে করে তাদের জামাআতের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা কুফরে আকবর। বর্তমানের যে খারেজিরা আবু বকর বাগদাদীকে খলীফা ঘোষণা করেছিল তাদের মধ্যে এই বৈশিষ্ট্য দেখা যায়।

তাকফিরি ফিতনা থেকে সাবধান

উম্মতে মুসলিমার মাঝে সর্বপ্রথম যে ফিতনা দেখা দিয়েছে তা হলো এই খারেজি ফেতনা বা তাকফিরি ফিতনা। এ ফিতনার দ্বারাই উম্মতের মাঝে ফিতনার দ্বার উন্মুক্ত হয়েছে। খলিফায়ে রাশেদ হযরত উসমান রাযি.কে তাকফির ও হত্যার মাধ্যমে এ ফিতনার সূত্রপাত। সেই যে ফিতনা শুরু হল আর শেষ হয়নি। ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন,

يجب الاحتراز من تكفير المسلمين بالذنوب والخطايا فإنه أول بدعة ظهرت في الإسلام فكفر أهلها المسلمين واستحلوا دماءهم وأموالهم –مجموع الفتاوى، ج: 13، ص: 31، ط. مجمع الملك فهد

“গুনাহ ও নাফরমানির ভিত্তিতে মুসলিমদের তাকফির করা থেকে সাবধান থাকা জরুরি। কারণ, এটিই ইসলামের ইতিহাসে দেখা দেয়া সর্বপ্রথম বিদআত। ফলশ্রুতিতে তারা মুসলিমদের তাকফির করেছে এবং জান মাল বৈধ গণ্য করেছে।”–মাজমুউল ফাতাওয়া : ১৩/৩১

খারেজিদের সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু হাদীস এবং তাদের মৌলিক কিছু বৈশিষ্ট

দ্বীন-সচেতন, আল্লাহ ভীরু এবং আখেরাতে বিশ্বাসী একজন মুমিন অন্য মুসলিমদের কাফের আখ্যা দিয়ে তার জান মাল হালাল মনে করা তো বহু দূরের কথা, কথায় বা কাজে সামান্য কষ্টও সে কোনো মুমিনকে দিতে হিম্মত করতে পারে না। কিন্তু যখন কারো আকিদা নষ্ট হয়ে যায়, বিদআতের শিকার হয়, দ্বীনের নামে শয়তান তাকে ধোঁকায় ফেলে দেয় তখন সবকিছুই সম্ভব।

এটি শয়তানের অনেক বড় সফলতা। সে যখন কাউকে কোন অন্যায় কাজে লিপ্ত করাতে সক্ষম না হয়, তখন অন্যায়কে দ্বীনের লেবেল পরিয়ে তার সামনে পেশ করে। আর তখন অনেক সরলমনা মুসলমান তার ফাঁদে পড়ে যায়। বর্তমানে কোন কোন জিহাদি দলের মধ্যে খারেজি আকিদা ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে মুসলিম বিশ্বে জিহাদের বড় একটি ভিত্তি হল ‘তাকফিরুত তাওয়াগিত’ তথা তাগুত শাসকদের কাফের আখ্যায়িত করা। সামান্য অসাবধানতায় এ তাকফির শরীয়তের সীমানা অতিক্রম করে যেতে পারে এবং ইতিমধ্যে করেছেও। এজন্য একজন মুজাহিদকে এ বিষয়ে খুবই সতর্ক থাকতে হবে। খারেজিদের আকিদা ও মানহাজ যেন কোন ভাবে নিজের মধ্যে এসে না যায়, এ ব্যাপারে খুব সতর্ক থাকতে হবে। এজন্য খারেজিদের সাথে সংশ্লিষ্ট হাদিসগুলো এবং এ ফিতনা নিয়ে গ্রহণযোগ্য উলামা মাশায়িখদের লেখা প্রবন্ধ ও কিতাবাদি অধ্যয়ন করা চাই। খারেজিদের বৈশিষ্টগুলো খুব ভালোভাবে বুঝা চাই, যেন সেগুলো থেকে বেঁচে থাকা যায়। এখন আমরা এ সংক্রান্ত কিছু হাদিস উল্লেখ করব। এরপর সেগুলোর আলোকে খারেজিদের মৌলিক কিছু বৈশিষ্ট তুলে ধরব ইনশাআল্লাহ।

১ম হাদীসঃ

إن من ضئضئ هذا أو في عقب هذا قوما يقرءون القرآن لا يجاوز حناجرهم يمرقون من الدين مروق السهم من الرمية يقتلون أهل الإسلام ويدعون أهل الأوثان، لئن أنا أدركتهم لأقتلنهم قتل عاد. -صحيح البخاري، رقم: 3166؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا

“এ লোকের (যুলখুয়াইসিরার) বংশ থেকে এমন এক সম্প্রদায় বের হবে, যারা কুরআন তো পড়বে কিন্তু তা তাদের গলদেশ পেরিয়ে নিচে নামবে না (অর্থাৎ কুরআন পড়বে কিন্তু বুঝবে না)। শিকারের দেহ ভেদ করে নিক্ষিপ্ত তীর যেমন বেরিয়ে যায়, তেমনি তারা দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে। তারা মুসলমানদের হত্যা করবে কিন্তু মূর্তি পূজারিদের ছেড়ে দেবে। যদি আমি তাদের পেয়ে যাই, তাহলে আদ জাতির মতো এদেরকে (সমূলে) হত্যা করবো।” -সহীহ বুখারি : ৩১৬৬

২য় হাদীসঃ

إنه يخرج من ضئضئ هذا قوم يتلون كتاب الله رطبا لا يجاوز حناجرهم يمرقون من الدين كما يمرق السهم من الرمية وأظنه قال لئن أدركتهم لأقتلنهم قتل ثمود. -صحيح البخاري، رقم: 4094؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا

“এ লোকের বংশ থেকে এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে, যারা সতেজভাবে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করবে; কিন্তু তা তাদের গলদেশ পেরিয়ে নিচে নামবে না। শিকারের দেহ ভেদ করে নিক্ষিপ্ত তীর যেমন বেরিয়ে যায়, তেমনি তারা দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে। -বর্ণনাকারী বলেন- আমার ধারণা, তিনি এও বলেছেন, যদি আমি তাদের পেয়ে যাই, সামূদ জাতির মতো তাদেরকে (সমূলে) হত্যা করবো।”–সহীহ  বুখারি : ৪০৯৪

‘গলদেশ পেরিয়ে নিচে নামবে না’ প্রসঙ্গে ইমাম নববি রহ. (৬৭৬হি.) বলেন,

ليس حظهم من القرآن إلا مروره على اللسان فلا يجاوز تراقيهم ليصل قلوبهم وليس ذلك هو المطلوب بل المطلوب تعقله وتدبره بوقوعه في القلب -المنهاج شرح صحيح مسلم بن الحجاج، ج: 6، ص: 105، ط. دار إحياء التراث العربي – بيروت

“মুখে মুখে পড়া ছাড়া কুরআনের আর কোনো কিছুই তাদের মাঝে নেই। অন্তরে পৌঁছার জন্য কুরআন তাদের গলদেশ অতিক্রম করে না। অথচ শুধু এতটুকুই তো উদ্দেশ্য নয়। বরং উদ্দেশ্য তো হচ্ছে অন্তরে গিয়ে পৌঁছা। যার ফলে কুরআন বুঝবে এবং কুরআন নিয়ে গভীর ফিকির করবে।”–ইমাম নববি রহ. কৃত শরহে মুসলিম : ৬/১০৫ অর্থাৎ কুরআনের গভীর ফিকির তাদের নেই, সঠিক বুঝও নেই। মুখে মুখে পড়ে আর ভাসা ভাসা কিছু বুঝে।

৩য় হাদীসঃ

يأتي في آخر الزمان قوم حدثاء الأسنان سفهاء الأحلام يقولون من خير قول البرية يمرقون من الإسلام كما يمرق السهم من الرمية لا يجاوز إيمانهم حناجرهم فأينما لقيتموهم فاقتلوهم فإن قتلهم أجر لمن قتلهم يوم القيامة. -صحيح البخاري، رقم: 4770؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا

“শেষ যামানায় এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে, যাদের (অধিকাংশের) বয়স কম হবে এবং তারা নির্বোধ হবে। (বাহ্যত) সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ঠ বাণী তারা বলবে, (আর বাস্তবে) শিকারের দেহ ভেদ করে নিক্ষিপ্ত তীর যেমন বেরিয়ে যায়, ইসলাম থেকে তারা তেমনভাবে বেরিয়ে যাবে। তাদের ঈমান তাদের গলদেশ পেরিয়ে নিচে নামবে না। শোন, যেখানেই তোমরা তাদের পাবে, হত্যা করে দেবে। কারণ, তাদের হত্যা করাটা কিয়ামতের দিন হত্যাকারীর জন্য বিরাট প্রতিদানের কারণ হবে।”–সহীহ বুখারি : ৪৭৭০

‘সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ঠ বাণী তারা বলবে’এ কথাটি সম্পর্কে হাফেয ইবনে হাজার রহ. (৮৫২হি.) বলেন,

والمراد القول الحسن في الظاهر وباطنه على خلاف ذلك  -فتح الباري ج: 12، ص: 287؛ ط. دار المعرفة – بيروت

“সৃষ্টি জগতের শ্রেষ্ঠ বাণী তারা বলবে- বলে উদ্দেশ্য, বাহ্যত সুন্দর সুন্দর কথা বলবে, কিন্তু ভিতরে থাকবে এর বিপরীত।”–ফাতহুল বারি : ১২/২৮৭

৪র্থ হাদীসঃ

سيكونُ في أمَّتي اختلافٌ وفُرقة، قومٌ يُحسنون القِيلَ ويُسيئون الفعلَ، يقرؤون القرآنَ، لا يُجاوزُ تراقيَهُم، يَمرُقون من الدّينِ مُروقَ الَّسَّهْم من الرَّميَّة، لا يَرجِعونَ حتى يَرتدَّ على فُوقِه، هم شرُّ الخلْق والخليقة، طُوبى لمن قَتَلَهُمْ وقتلوه، يَدْعُون إلى كتاب الله وليسوا منه في شيء، مَن قاتَلَهم كانَ أولى بالله منهم -سنن ابي داود، رقم: 4765؛ ط. دار الرسالة العالمية، ت: شعَيب الأرنؤوط – محَمَّد كامِل قره بللي، قال الحققون: إسناده عن أنس صحيح. اهـ

“অচিরেই আমার উম্মতের মাঝে মতভেদ ও বিরোধ দেখা দেবে। একটি সম্প্রদায় বের হবে যারা কথা বলবে চমকপ্রদ, কাজ করবে মন্দ। কুরআন পড়বে কিন্তু তা তাদের গলদেশ বেয়ে নিচে নামবে না। শিকারের দেহ ভেদ করে নিক্ষিপ্ত তীর যেমন বেরিয়ে যায়, তেমনি তারা দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে। নিক্ষিপ্ত তীর পুনর্বার ধনুকের রশিতে ফিরে আসা পর্যন্ত তারা দ্বীনে ফিরে আসবে না। তারা সৃষ্টি জগতের মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট সৃষ্টি। সুসংবাদ তাদের জন্য যারা এদেরকে হত্যা করবে এবং তাদের জন্যও, যাদেরকে এরা হত্যা করবে। আল্লাহর কিতাবের দিকে তারা আহ্বান করবে অথচ নিজেরা কিতাবের কোনো কিছুর ‍ওপরই প্রতিষ্ঠিত থাকবে না। যারা তাদের বিরুদ্ধে কিতাল করবে, এদের তুলনায় তাঁরাই আল্লাহর অধিক নৈকট্যবান হবে।” –সুনানে আবু দাউদ : ৪৭৬৫ (সনদ সহীহ)

৫ম হাদীসঃ

يَخْرُجُ قَوْمٌ مِنْ أُمَّتِى يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ لَيْسَ قِرَاءَتُكُمْ إِلَى قِرَاءَتِهِمْ بِشَىْءٍ وَلاَ صَلاَتُكُمْ إِلَى صَلاَتِهِمْ بِشَىْءٍ وَلاَ صِيَامُكُمْ إِلَى صِيَامِهِمْ بِشَىْءٍ يَقْرَءُونَ الْقُرْآنَ يَحْسِبُونَ أَنَّهُ لَهُمْ وَهُوَ عَلَيْهِمْ لاَ تُجَاوِزُ صَلاَتُهُمْ تَرَاقِيَهُمْ يَمْرُقُونَ مِنَ الإِسْلاَمِ كَمَا يَمْرُقُ السَّهْمُ مِنَ الرَّمِيَّةِ -صحيح مسلم، رقم: 2516؛ ط. دار الجيل بيروت + دار الأفاق الجديدة ـ بيروت

“আমার উম্মতের মধ্য থেকে এমন এক সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ঘটবে, যারা কুরআন পড়বে। তাদের পড়ার সামনে তোমাদের পড়া অতি নগণ্য মনে হবে। তাদের নামাযের সামনে তোমাদের নামায অতি নগণ্য মনে হবে। তাদের রোযার সামনে তোমাদের রোযা অতি নগণ্য মনে হবে। তারা কুরআন পড়বে আর ভাববে তা তাদের পক্ষে, অথচ বাস্তবে তা তাদের বিপক্ষে। তাদের নামায তাদের গলদেশ পেরিয়ে নিচে নামবে না। শিকারের দেহ ভেদ করে নিক্ষিপ্ত তীর যেমন বেরিয়ে যায়, তারাও তেমন ইসলাম থেকে বেরিয়ে যাবে।”-সহীহ মুসলিম : ২৫১৬

ইমাম বুখারি রহ. তরজমাতুল বাবে বলেন,

وكان ابن عمر يراهم شرار خلق الله وقال إنهم انطلقوا إلى آيات نزلت في الكفار فجعلوها على المؤمنين -صحيح البخاري، باب: قتل الخوارج والملحدين بعد إقامة الحجة عليهم ؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا، قال الحافظ ابن حجر رحمه لله فى الفتح (12\286، ط. دار المعرفة): صله الطبري في مسند علي من تهذيب الآثار من طريق بكير بن عبد الله بن الأشج أنه سأل نافعا كيف كان رأي بن عمر في الحرورية قال كان يراهم شرار خلق الله انطلقوا إلى آيات الكفار فجعلوها في المؤمنين قلت وسنده صحيح. اهـ

“ইবনে উমর রাযি. খারেজিদেরকে আল্লাহর সৃষ্টির মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট মনে করতেন। তিনি বলেছেন, তারা কাফেরদের ব্যাপারে নাযিলকৃত আয়াতগুলোকে মুমিনদের ওপর প্রয়োগ করেছে’’।–সহীহ বুখারি, বাব: কতলুল খাওয়ারিজ ওয়াল মুলহিদিন।

৬ষ্ঠ হাদীসঃ

ألا إنه سيخرج من أمتي أقوام أشداء أحداء، ذلقة ألسنتهم بالقرآن، لا يجاوز تراقيهم، ألا فإذا رأيتموهم فأنيموهم، ثم إذا رأيتموهم فأنيموهم، فالمأجور قاتلهم -مسند الإمام أحمد، رقم: 20446؛ ط. الرسالة، ت: شعيب الأرنؤوط، عادل مرشد، وآخرون، قال المحققون: إسناده قوي على شرط مسلم. اهـ

“শোনে রাখো! অচিরেই আমার উম্মতে এমন কতক লোক বের হবে যাদের প্রকৃতি হবে কঠোর। যবান হবে ধারালো। যবানে কুরআনের অনল বর্ষাবে, কিন্তু কুরআন তাদের গলদেশ পেরিয়ে নিচে নামবে না। শোনো! যখন তাদের দেখবে একেবারে নিশ্চিহ্ন করে দেবে। আবার দেখলে আবারও নিশ্চিহ্ন করে দেবে। তাদের হত্যাকারীদের জন্য রয়েছে (মহা) প্রতিদান।”–মুসনাদে আহমাদ : ২০৪৪৬ (সনদ শক্তিশালী)

৭ম হাদীসঃ

عَنْ سُلَيْمَانَ التَّيْمِيِّ، عَنْ أَنَسٍ قَالَ: ذُكِرَ لَنَا أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «إِنَّ فِيكُمْ قَوْمًا يَتَعَبَّدُونَ حَتَّى يُعْجِبُوا النَّاسَ وَتُعْجِبَهُمْ أَنْفُسُهُمْ، يَمْرُقُونَ مِنَ الدِّينِ كَمَا يَمْرُقُ السَّهْمُ مِنَ الرَّمِيَّةِ» -مسند ابي يعلى، الرقم: 4066، ط. دار المأمون للتراث – دمشق، [حكم حسين سليم أسد] : إسناده صحيح

“সুলায়মান আততাইমি সূত্রে আনাস রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদের বলা হয়েছে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমাদের মাঝে এমন কিছু লোক আসবে যারা (খুব) ইবাদত করবে। অবস্থা এ পর্যায়ে পৌঁছবে যে, তারা অন্যদের মুগ্ধ করবে এবং নিজেরাও আত্মগৌরবের শিকার হবে। শিকারের দেহ ভেদ করে নিক্ষিপ্ত তীর যেমন বেরিয়ে যায়, তারাও তেমন দ্বীন থেকে বেরিয়ে যাবে।”–মুসনাদে আবু ইয়ালা: ৪০৬৬ (সনদ সহীহ)

খারেজিদের মৌলিক কিছু বৈশিষ্ট

উপরোক্ত হাদীস এবং খারেজিদের প্রথম দলের ইতিহাস থেকে তাদের মৌলিক যেসব বৈশিষ্ট বুঝা যায় তা নিম্নরূপ,

এক. তারা এমন এমন বিষয়ের কারণে মুসলিমদের তাকফির করে যে সব কারণে আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামাআহর মতে কোন মুসলিমকে তাকফির করা বৈধ নয়।

দুই. তারা নির্বোধ ও মোটাবুদ্ধির অধিকারী হয়। তারা কুরআন পড়ে কিন্তু তার সঠিক মর্ম বুঝে না। ফলে কাফেরদের ব্যাপারে নাযিলকৃত আয়াতগুলোকে মুমিনদের ওপর প্রয়োগ করে তাদের তাকফির করে এবং মুমিনদের জান মাল হালাল এবং তাদের নারীদের দাসী বানানো বৈধ মনে করে।

তিন. তারা মুসলিমদের হত্যা করে কিন্তু কাফের ও মূর্তি পূজারিদের ছেড়ে দেয়।

চার. তারা কঠোর প্রকৃতির হয়।

পাঁচ. তাদের কথাবার্তা বাহ্যত বেশ সুন্দর ও চমকপ্রদ হয়। যা শুনে যে কোন মুমিন খুব সহজেই আকৃষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু তাদের আমল হয় মন্দ।

ছয়. তাদের বাহ্যিক ইবাদত, নামায, রোযা, কুরআন তেলাওয়াত ইত্যাদি খুব সুন্দর হয়, যা দেখে যে কেউ মুগ্ধ হয়ে যায় এবং এর ফলে তারা নিজেরাও আত্মগরীমার শিকার হয়।

সাত. তারা সাধারণত অল্পবয়সী হয়। জ্ঞান-বুদ্ধি দিক দিয়েও হয় অপরিপক্ক।

আট. তাকফিরের ক্ষেত্রে তাড়াহুড়াপ্রবণ। যারাই তাদের আকীদা-বিশ্বাস গ্রহণ করে না তাদেরকেই তাকফির করে।

নয়. তারা একগুঁয়ে ও অনিয়ন্ত্রিত জযবার অধিকারী হয়। পরিণতির কথা চিন্তা না করে হুটহাট কিছু একটা করে ফেলার প্রবণতা তাদের মাঝে দেখা যায়।

এগুলো হল খারেজিদের মৌলিক কিছু বৈশিষ্ট। আল্লাহর পথের মুজাহিদদের উচিত, সব সময় সতর্ক থাকা, যেন তাদের মাঝে এ সবের কোনোটা না এসে যায়। তাদের একটি বৈশিষ্ট হল তারা সাধারণত অল্পবয়সী হয়ে থাকে। তাই যুবক ভাইদেরকে খুব বেশি সতর্ক থাকতে হবে। তাদের কর্তব্য, সব সময় প্রবীণ ও অভিজ্ঞ মুজাহিদীন এবং হক্কানী আলেম-ওলামাদের পরামর্শ ও দিক নির্দেশনা মোতাবেক চলা। যেন তারা অপরিপক্কতা এবং জযবার তাড়নায় বিচ্যুতির শিকার না হয়ে পড়েন।

তাকফিরের ব্যাপারে সীমালংঘনের প্রতিকার

তাকফিরের ব্যাপারে সীমালংঘনের প্রতিকার হিসেবে প্রথমত উম্মাহর হক্কানি ওলামায়ে কেরামকে দ্বিতীয়ত জিহাদি তানজিমগুলোকে কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে। প্রত্যেককে তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে হবে। তাহলেই এ ভয়াবহ ফিতনা থেকে মুসলিম উম্মাহ বিশেষ করে উম্মাহর মুজাহিদরা নিজেদেরকে রক্ষা করতে পারবে।

ওলামায়ে কেরামের দায়িত্ব

আল্লাহ তাআলা ওলামায়ে কেরামকে দ্বীনের প্রতিটি বিষয় উম্মাহর সামনে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরার দায়িত্ব দিয়েছেন। যেহেতু দ্বীন সম্পর্কে অজ্ঞতাই এ ফিতনা জন্ম নেয়ার অন্যতম কারণ। তাই ওলামায়ে কেরামের উচিত, দ্বীনের সকল বিষয়ে ইসলামের সঠিক অবস্থান উম্মাহর সামনে কোনো ধরনের লুকোচুরি না করে সুস্পষ্ট ভাবে তুলে ধরা। বিশেষত হাকিমিয়া, ওয়ালা বারা, কুফর বিততাগুত, জিহাদ ও কিতাল, সিয়াসত, ইমারাত ও খেলাফত এবং ঈমান কুফর ও তাকফিরের বিষয়াদি পাশাপাশি তাকফিরের শর্ত ও প্রতিবন্ধকগুলো সবিস্তারে উম্মাহর সামনে তুলে ধরা।

বর্তমানে অধিকাংশ ওলামায়ে কেরাম এ সব বিষয়ে কোনো কথাই বলেন না। হাতেগোনা অল্প কয়েক জন আলেম বলে যাচ্ছেন তবে তা পুরো উম্মাহর জন্য যথেষ্ট হচ্ছে না। এর ফল যা হওয়ার তাই হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ এ বিষয়গুলো সম্পর্কে ব্যাপকভাবে উম্মাহর মধ্যে চরম অজ্ঞতা বিরাজ করছে। তাকফিরের শর্ত ও প্রতিবন্ধক সম্পর্কে জ্ঞান না থাকার কারণে মুতলাক নুসুস এবং সালাফ ও আইম্মায়ে কেরামের মুতলাক বক্তব্য থেকে অনেকে লাগামহীন ভাবে তাকফির করতে শুরু করছে। এর জন্য ওলামায়ে কেরামের কিতমান, সুকুত ও তাহরিফই (সত্য গোপন করার প্রবণতা, নীরবতা ও হকের বিকৃতি সাধনই) সবচেয়ে বেশি দায়ী। চারদিকে মুসলিম উম্মাহর দুরবস্থা দেখে উম্মাহর যুবকরা ধীরে ধীরে জেগে উঠতে শুরু করেছে। কিন্তু ওলামায়ে কেরামের কাছ থেকে সঠিক দিক নির্দেশনা না পাওয়ার কারণে তারা কোন কোন ক্ষেত্রে বিভ্রান্ত হচ্ছে। এ প্রসঙ্গে উস্তাদ আহমাদ ফারুক রহ. যথার্থই বলেছেন, “ওলামায়ে কেরাম যদি এসব বিষয়ে সময় থাকতে হক কথা না বলেন তাহলে এমন একটি তাকফিরি ফেরকা গড়ে উঠবে যারা ওলামাদেরকে ব্যাপকভাবে হত্যা করবে। তখন আফসোস করে এবং অন্যকে দোষ দিয়ে কোনও লাভ হবে না। সব নিজেদেরই হাতের কামাই’’।

জিহাদি তানজিমের নেতৃবৃন্দের দায়িত্ব

সাধারণত দেখা যায়, জিহাদি তানজিমগুলোতে অনাকাঙ্ক্ষিত উগ্রতা ও বাড়াবাড়ি খুব সহজেই ছড়িয়ে পড়ে। তাই তানজিমের নেতৃবৃন্দের উচিত, শুরু থেকেই এ ব্যাপারে যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ করা। যেন এ জাতীয় ফিতনাগুলো জন্ম নেয়ার রাস্তাই বন্ধ হয়ে যায়। এ উদ্দেশ্যে যা যা করণীয়, তার কয়েকটি নিম্নে উল্লেখ করা হল,

এক. তানজিমের সকল পর্যায়ে কুরআন-হাদীসের বিশুদ্ধ ইলমের ব্যাপক প্রচার-প্রসার। একদম উপর থেকে নিচ পর্যন্ত। মাসউল, সাথী, সমর্থক কারো মাঝেই যেন দ্বীনের মৌলিক বিষয়াদির ব্যাপারে কোনও ধরনের অজ্ঞতা না থাকে। অজ্ঞতাই ফিতনার মূল কারণ। অজ্ঞতা থেকেই খারেজিদের জন্ম হয়েছিল।

দুই. ইসলাহে নফস ও ঈমানি তরবিয়াত। ই’জাব বিন নফস বা আত্মগৌরবই খারেজিদেরকে ভুল পথে নিয়ে গিয়েছিল। তানজিম তার প্রতিটি সদস্যকে এমন তাকওয়ার ছাঁচে গড়ে তুলবে, যেন মুসলমানদের এক এক ফোঁটা রক্ত তার কাছে সমগ্র দুনিয়ার চেয়েও বেশি মূল্যবান মনে হয়। আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ এবং আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দ্বীন ও শরীয়াহ কায়েম ও সকল মুসলমানের জান-মালের সুরক্ষা দেয়াই যেন তার জিহাদের একমাত্র উদ্দেশ্য হয়। দুনিয়াবি কোন লালসা কিংবা অন্যের ওপর প্রাধান্য লাভ করা যেন তার অন্তরে একদমই না থাকে।

তিন. আমীরের ইতাআত। তানজিম তার প্রতিটি সদস্যকে আমীরের যথাযথ ইতাআতের গুণ অর্জনের প্রতি গুরুত্বারোপ করবে। আমীর যতক্ষণ কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক তানজিম পরিচালিত করবেন ততক্ষণ কোন ভাবেই তাঁর আনুগত্যের বাইরে যাওয়া যাবে না। খারেজিদের প্রথম গ্রুপের জন্ম আমীরের ইতাআত না করার কারণেই হয়েছিল। এ যুগের খারেজিদের জন্মও ঠিক একই ভাবে হয়েছে। এ জন্য তানজিমের নেতৃবৃন্দের উচিত, কুরআন-সুন্নাহর আলোকে আমীরের ইতাআতের গুরুত্ব ও প্রয়োজনীয়তা এবং তাঁর নাফরমানীর ভয়াবহতা প্রতিটি সদস্যের সামনে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা। কোনো সদস্যের মাঝে ইতাআতের ক্ষেত্রে কোন ধরনের অবহেলা বা কমতি দেখা দিলে তৎক্ষণাৎ ব্যবস্থা নেয়া। তানজিম যদি এ ব্যাপারে যথাযথ গুরুত্বারোপ না করে তাহলে অসম্ভব নয় যে, তানজিম থেকে খুব শীঘ্রই নতুন কোন খারেজি ফিরকার আবির্ভাব ঘটবে।

সারকথা হল, মুসলমানদের মাঝে কুরআন-হাদীসের বিশুদ্ধ ইলমের ব্যাপক প্রচার-প্রসার বিশেষভাবে জিহাদি তানজিমগুলোর সদস্যদের মাঝে বিশুদ্ধ ইলমের ব্যাপক প্রচার-প্রসার এবং তাদের ইলমী-আমলী, ঈমানী ও আখলাকি তরবিয়াত ও তারাক্কির মাধ্যমেই এ ফিতনাসহ সব ধরনের ফিতনার পথ বন্ধ করা সম্ভব। ওয়াল্লাহু সুবহানাহু ওয়া তাআলা আ’লাম। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে সব ধরনের ফিতনা থেকে হেফাজত করুন আমীন।

وصلى الله تعالى على خير خلقه محمد وعلى آله وصحبه أجمعين