কিতাব-রিসালাহ, প্রবন্ধ-নিবন্ধ

উলামায়ে হক্কানি ও উলামায়ে সু : পরিচিতি ও প্রকৃতি -মাওলানা আবদুল্লাহ রাশেদ (হাফিযাহুল্লাহ)

উলামায়ে হক্কানি ও উলামায়ে সূ : পরিচিতি ও  প্রকৃতি -মাওলানা আবদুল্লাহ রাশেদ (হাফিযাহুল্লাহ)

উলামায়ে হক্কানি ও উলামায়ে সু : পরিচিতি ও  প্রকৃতি

 মাওলানা আবদুল্লাহ রাশেদ (হাফিযাহুল্লাহ)

 

সূচী

আলেম দুই শ্রেণীতে বিভক্ত : উলামায়ে হক্বানি–রব্বানি ও উলামায়ে সূ. 6

উলামায়ে সূ : পরিচিতি ও প্রকৃতি.. 13

বে–আমল আলেম. 13

বে–আমল মুফতি, বে–আমল ওয়ায়েজ. 14

দুনিয়ার তুচ্ছ স্বার্থে সত্য গোপন করা এবং হক-বাতিল গুলিয়ে ফেলা.. 15

তাহরিফ-অপব্যাখ্যা এবং দ্বীনের নামে মিথ্যাচার. 18

যে বিষয়ে ইলম নেই সে বিষয়েও ফতোয়া দেয়া.. 19

মুহকাম-স্পষ্ট আয়াত, হাদিস ও বক্তব্য বাদ দিয়ে মুতাশাবিহ-অস্পষ্ট আয়াত, হাদিস ও বক্তব্য নিয়ে টানাটানি করা.. 20

নাহি আনিল মুনকার তথা অন্যায় প্রতিহত না করা.. 21

শক্তের ভক্ত নরমের যম: আল্লাহর বিধান প্রয়োগে স্বজনপ্রীতি.. 23

আল্লাহর বিধান পরিবর্তন করে কুফরি বিধান প্রবর্তন. 24

দুনিয়ার স্বার্থে জালিম ও তাগুত শাসকের পক্ষ নেয়া.. 25

বালআম বিন বাউরা: মুজাহিদ বিরোধী কূট-কৌশলের পথিকৃৎ. 27

শাসকের দরবার ফিতনার চারণভূমি.. 29

বড়ত্ব জাহিরের জন্য ইলম শেখা.. 32

সারকথাঃ… 33

    উলামায়ে হক্বানি-রব্বানি : পরিচিতি ও প্রকৃতি.. 35

    ইলম ছাড়া কথা বলেন না.. 38

    নির্ভীক ও আপোষহীন দাঈ, হকের পথে অটল. 39

শাসকের দরবার থেকে দূরে.. 41

    রিবাত ও জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ. 47

    সারকথা: 49

 

                     

 

 

 

উলামায়ে হক্কানি ও উলামায়ে সু : পরিচিতি ও  প্রকৃতি

পর্ব ১

মাওলানা আবদুল্লাহ রাশেদ (হাফিযাহুল্লাহ)

 

بسم الله الرحمن  الرحيم

الحمدلله وحده، والصلاة والسلام على من لا نبي بعده، وعلى من تبعه، أما بعد

উলামায়ে কেরাম দ্বীনের মুহাফিজ। উম্মাহর রাহবার। শরীয়তের ধারক বাহক। আম্বিয়ায়ে কেরামের ওয়ারিস। আল্লাহ তাআলা তাঁদের মাধ্যেমেই তাঁর দ্বীনের হিফাজত করছেন। মানব জাতিকে হিদায়াতের পথ দেখাচ্ছেন। যতদিন উলামায়ে কেরাম থাকবেন ততদিন দ্বীন থাকবে। যখন উলামায়ে কেরামকে তুলে নেয়া হবে তখন দ্বীনও উঠে যাবে। জাহালাত ও অজ্ঞতার অন্ধকারে পৃথিবী ছেয়ে যাবে। ফিতনা ফাসাদে ভরে যাবে। কেয়ামত ঘনিয়ে আসবে। এজন্যই ইলম উঠে যাওয়া, অজ্ঞতা ব্যাপক হওয়া এবং উলামায়ে কেরামের সংখ্যাস্বল্পতা দেখা দেওয়া কেয়ামতের আলামত বলা হয়েছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

إن من أشراط الساعة أن يرفع العلم ويثبت الجهل ويشرب الخمر ويظهر الزنا -صحيح البخاري، رقم: 80؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا

“কেয়ামতের আলামতসমূহের মধ্যে রয়েছে ইলম উঠে যাওয়া, জাহালাত ও অজ্ঞতা ছেয়ে যাওয়া, মদ্যপান (ব্যাপক) হওয়া এবং যিনার প্রসার হওয়া।” –সহীহ বুখারি : ৮০

অন্য বর্ণনায় এসেছে,

أن يقل العلم ويظهر الجهل -صحيح البخاري، رقم: 81؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا

“ইলম কমে যাওয়া এবং ব্যাপকভাবে জাহালাত-অজ্ঞতা ছেয়ে যাওয়া।” –সহীহ বুখারি : ৮১

অন্য হাদিসে এসেছে,

إن الله لا يقبض العلم انتزاعا ينتزعه من العباد ولكن يقبض العلم بقبض العلماء حتى إذا لم يبق عالما اتخذ الناس رؤوسا جهالا فسئلوا فأفتوا بغير علم فضلوا وأضلوا -صحيح البخاري، رقم: 100؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا

“আল্লাহ তাআলা ইলম এভাবে উঠিয়ে নেবেন না যে বান্দাদের অন্তর থেকে তা মুছে দেবেন। বরং ইলম উঠিয়ে নেবেন উলামাদের উঠিয়ে নেয়ার মাধ্যমে। অবশেষে যখন একজন আলেমও বাকি রাখবেন না, লোকজন কতক জাহেলকে নিজেদের নেতা বানিয়ে নেবে। তারা ইলম ছাড়াই ফতোয়া দেবে। এভাবে নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে অন্যদেরও পথভ্রষ্ট করবে।” – সহীহ বুখারি: ১০০

অন্য বর্ণনায় এসেছে,

ينتزعه منهم مع قبض العلماء بعلمهم فيبقى ناس جهال يستفتون فيفتون برأيهم فيضلون ويضلون –صحيح البخاري، رقم: 6877؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا

“উলামাদেরকে তাদের ইলমসহ উঠিয়ে নেয়ার মাধ্যমে ইলম উঠিয়ে নেবেন। অবশেষে থেকে যাবে কতক জাহেল লোক। তাদের কাছে ফতোয়া জিজ্ঞেস করা হবে। তারা নিজেদের মনমতো ফতোয়া দেবে। এভাবে নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করবে।” –সহীহ বুখারি: ৬৮৭৭

যেহেতু ইলম ও ইলমের ধারক বাহক উলামারাই দ্বীন ও দুনিয়া টিকে থাকার মাধ্যম, তাই ইলম ও উলামার অশেষ ফজিলত কুরআন হাদিসে এসেছে। ইলম তলবের প্রতি সীমাহীন উৎসাহ দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ

“আপনি বলুন, যে ব্যক্তি জানে আর যে জানে না উভয়ে কি সমান?” –সূরা যুমার (৩৯) : ৯

আরো ইরশাদ করেন,

يَرْفَعِ اللَّهُ الَّذِينَ آمَنُوا مِنْكُمْ وَالَّذِينَ أُوتُوا الْعِلْمَ دَرَجَاتٍ –

“তোমাদের মধ্যে যারা ঈমান এনেছে এবং যাদেরকে ইলম দেয়া হয়েছে আল্লাহ তাদেরকে বহুগুণ মর্যাদায় উন্নীত করবেন।” –সূরা মুজাদালা (৫৮): ১১

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

من سلك طريقا يلتمس فيه علما سهل الله له به طريقا إلى الجنة -صحيح مسلم، رقم: 7028؛ ط. دار الجيل بيروت + دار الأفاق الجديدة ـ بيروت

“যে ব্যক্তি ইলমের তলবে কোনো রাস্তা অবলম্বন করবে, আল্লাহ তাআলা এর দ্বারা তার জন্য জান্নাতের রাস্তা সহজ করে দেবেন।” –সহীহ মুসলিম: ৭০২৮

অন্য হাদিসে ইরশাদ করেন,

خيركم من تعلم القرآن وعلمه –صحيح البخاري، رقم: 4739؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا

“তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ওই ব্যক্তি যে কুরআন মাজিদ (নিজে) শিক্ষা করে এবং (অন্যদেরকে) শিক্ষা দেয়।”–সহীহ বুখারি: ৪৭৩৯

আরও ইরশাদ করেন,

طلب العلم فريضة على كل مسلم -سنن ابن ماجه، رقم: 224؛ ط. دار الرسالة العالمية، قال الأرنؤوط رحمه الله تعالى فى التحقيق: حديث حسن بطرقه وشواهده. اهـ

“ইলমে দ্বীন শিক্ষা করা প্রত্যেক মুসলমানের উপর ফরয।” –সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৪

এছাড়াও অসংখ্য আয়াত ও হাদিসে ইলম ও আহলে ইলমের ফজিলতের কথা এসেছে, যার মাধ্যমে বিভিন্নভাবে ইলমের প্রতি উৎসাহ দেয়া হয়েছে।

সত্যিকারের আলেমদের জন্য আসমানের ফেরেশতা, যমিনের জীব-জন্তু, কীট-পতঙ্গ এমনকি সমূদ্রের মাছ পর্যন্ত দোয়া করে। পক্ষান্তরে যারা ইলমে দ্বীনকে দুনিয়া উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, পার্থিব স্বার্থে ইলমে দ্বীন গোপন করে, তাদের উপর লা’নত করা হয়েছে। কিয়ামতের দিন তাদের মুখে আগুনের লাগাম পরিয়ে দেয়া হবে। তারা জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

 

إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَى مِنْ بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ أُولَئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ

“আমি যেসকল সুস্পষ্ট বিধান ও (সঠিক) পথের দিশা দানকারী প্রমাণাদি অবতীর্ণ করেছি, আমি মানুষের জন্য কিতাবে স্পষ্টভাবে তা বর্ণনা করে দেয়ার পরও যারা তা গোপন করে, এরাই হচ্ছে সেসব লোক যাদের ওপর আল্লাহ তাআলা অভিসম্পাত করেন, অভিশাপ বর্ষণ করে অন্যান্য অভিশাপকারীরাও” –সূরা বাকারা (২) : ১৫৯

 

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

من سئل عن علم، فكتمه ألجمه الله بلجام من نار يوم القيامة -سنن ابي داود، رقم: 3658؛ ط. دار الرسالة العالمية، ت: شعَيب الأرنؤوط – محَمَّد كامِل قره بللي، الناشر: دار الرسالة العالمية، قال الشيخ شعيب الأرنؤوط رحمه الله تعالى فى التحقيق: إسناده صحيح. اهـ

“ইলমের কিছু জিজ্ঞাসা করার পর যে তা গোপন করে, কেয়ামতের দিন আল্লাহ তাআলা তাকে আগুনের লাগাম পরিয়ে দেবেন।” –সুনানে আবু দাউদ : ৩৬৫৮

আরও ইরশাদ করেন,

“من تعلم علما مما يبتغى به وجه الله عز وجل لا يتعلمه إلا ليصيب به عرضا من الدنيا لم يجد عرف الجنة يوم القيامة” يعني ريحها -سنن ابي داود، رقم: 3664؛ ط. دار الرسالة العالمية، ت: شعَيب الأرنؤوط – محَمَّد كامِل قره بللي، الناشر: دار الرسالة العالمية، قال الشيخ الأرنؤوط رحمه الله تعالى فى تحقيقه: حديث صحيح لغيره. اهـ

“যে ইলম আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির জন্য শেখা হয়, তাকে যে ব্যক্তি স্রেফ দুনিয়ার সামান্য স্বার্থ হাসিলের জন্য শিখবে, কিয়ামতের দিন সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না।” –সুনানে আবু দাউদ : ৩৬৬৪

 

আলেম দুই শ্রেণীতে বিভক্ত : উলামায়ে হক্বানিরব্বানি উলামায়ে সু

আল্লাহ তাআলা মাখলুকের হিদায়াতের জন্য দ্বীন দিয়েছেন; যেন তারা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির পথে চলতে পারে। শয়তানের রাস্তা পরিহার করে চিরস্থায়ী সুখের ঠিকানা জান্নাতের পথে চলতে পারে। সে দ্বীনের বিধিবিধান জানিয়ে দেয়ার জন্য নবী-রসূল প্রেরণ করেছেন। কিতাব নাযিল করেছেন। নবী-রসূলগণ সুস্পষ্টরূপে আল্লাহ তাআলার দ্বীনের বিধানাবলী ব্যাখ্যা করে গেছেন। রিসালাতের দায়িত্ব শতভাগ আদায় করেছেন। তাঁদের পর এ মহান দায়িত্ব উলামায়ে কেরামের উপর অর্পণ করেছেন। তিনি তাঁদের কাছে থেকে এ মর্মে অঙ্গীকার নিয়েছেন যে, তাঁরা নবী-রসূলগণের স্থলাভিষিক্ত হয়ে আল্লাহর দ্বীনের সকল বিধান সুস্পষ্টরূপে প্রকাশ করবেন। দ্বীনকে দুনিয়া উপার্জনের হাতিয়ার বানাবেন না। দুনিয়ার তুচ্ছ মোহে আল্লাহর কোন বিধান গোপন করবেন না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُونَه

“স্মরণ করুন, যাদেরকে কিতাব (-এর ইলম) দেয়া হয়েছে, আল্লাহ যখন তাদের থেকে এ অঙ্গীকার নিলেন যে, তোমরা অবশ্যই তা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করবে এবং তা গোপন করবে না।” –সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৮৭

অন্যত্র ইরশাদ করেন,

وَلَا تَشْتَرُوا بِآيَاتِي ثَمَنًا قَلِيلًا –

“আর তোমরা আমার আয়াতগুলোর বিনিময়ে তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করো না।” –সূরা মায়িদা (৫) : ৪৪

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, উলামায়ে হক্কানি-রাব্বানি এ দায়িত্ব শতভাগ আদায় করলেও আলেম নামধারী অনেকেই আল্লাহ তাআলার এ অঙ্গীকার রক্ষা করেনি। দুনিয়াবি স্বার্থে তারা আল্লাহর বিধান গোপন করেছে। দ্বীনকে দুনিয়া উপার্জনের হাতিয়ার হিসেবে গ্রহণ করেছে। আল্লাহর বিধানে পরিবর্তন, পরিবর্ধন ও সংযোজন-বিয়োজন করে এবং আল্লাহর কিতাবের অপব্যাখ্যা করে তারা দুনিয়ার তুচ্ছ মূল্য গ্রহণ করেছে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

فَنَبَذُوهُ وَرَاءَ ظُهُورِهِمْ وَاشْتَرَوْا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَبِئْسَ مَا يَشْتَرُونَ

“এরপর তারা সে অঙ্গীকার পিঠের পশ্চাতে ছুঁড়ে ফেলে দিলো এবং এর বিনিময়ে খরিদ করল সামান্য ‍মূল্য। কত নিকৃষ্ট মূল্যই না তারা খরিদ করছে।” –সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৮৭

 

অন্যত্র ইরশাদ করেন,

فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ وَرِثُوا الْكِتَابَ يَأْخُذُونَ عَرَضَ هَذَا الْأَدْنَى وَيَقُولُونَ سَيُغْفَرُ لَنَا وَإِنْ يَأْتِهِمْ عَرَضٌ مِثْلُهُ يَأْخُذُوهُ أَلَمْ يُؤْخَذْ عَلَيْهِمْ مِيثَاقُ الْكِتَابِ أَنْ لَا يَقُولُوا عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقَّ وَدَرَسُوا مَا فِيهِ وَالدَّارُ الْآخِرَةُ خَيْرٌ لِلَّذِينَ يَتَّقُونَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ (169) وَالَّذِينَ يُمَسِّكُونَ بِالْكِتَابِ وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ إِنَّا لَا نُضِيعُ أَجْرَ الْمُصْلِحِينَ

“অনন্তর তাদের পর এমন কতক অযোগ্য উত্তরসূরি তাদের স্থলাভিষিক্ত হলো, যারা কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়েছে। তারা এই তুচ্ছ দুনিয়ার সামগ্রী গ্রহণ করে এবং বলে, “আমাদেরকে অবশ্যই ক্ষমা করে দেয়া হবে”। যদি অনুরূপ সামগ্রী তাদের সামনে পুনরায় আসে তাহলে তাও গ্রহণ করে। ওদের থেকে কি কিতাবে এ অঙ্গীকার নেয়া হয়নি যে, আল্লাহর উপর সত্য বৈ (মিথ্যা) কিছু আরোপ করবে না? আর তাতে (অর্থাৎ কিতাবে) যা কিছু লেখা ছিল তারা যথারীতি তা পড়েছেও। বস্তুত, যারা তাকওয়া অবলম্বন করে তাদের জন্য আখেরাতের নিবাসই অধিক উত্তম। তারপরও কি তোমরা বুঝবে না? পক্ষান্তরে, যারা দৃঢ়ভাবে কিতাবকে আঁকড়ে ধরে এবং নামায কায়েম করে, আমি এরূপ সংশোধনকারীদের সওয়াব বিনষ্ট করি না।” –সূরা আ’রাফ (৭) : ১৬৯-১৭০

পূর্ব যুগে ইহুদি আলেমরা এ বিচ্যুতির শিকার হয়েছিল। এ উম্মতেও এমন লোক জন্মাবে, যারা ইহুদি-খ্রিস্টানদের পদাঙ্ক অনুসরণ করবে। হযরত আবু সাঈদ খুদরি রাদিয়াল্লাহু আনহু বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

لتتبعن سنن من كان قبلكم شبرا بشبر وذراعا بذراع حتى لو دخلوا جحر ضب تبعتموهم. قلنا: يا رسول الله اليهود والنصارى ؟ قال: فمن ! -صحيح البخاري، رقم: 6889؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا

“নিঃসন্দেহে তোমরা তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের লোকদের রীতি-নীতির অনুকরণ করবে। বিঘতে বিঘতে, হাতে হাতে। এমনকি তারা যদি ‘দবে’র (সাপের মতো এক ধরণের প্রাণী) গর্তে প্রবেশ করে থাকে তাহলে তোমরাও তাদের অনুসরণ করবে”। আমরা জিজ্ঞাসা করলাম, “ইয়া রাসূলাল্লাহ! ইহুদি-খ্রিস্টানদের কথা বলছেন”? তিনি উত্তর দেন, “তাহলে আর কারা?” –সহীহ বুখারি : ৬৮৮৯

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. (৭২৮হি.) বলেন,

وكان السلف يرون أن من انحرف من العلماء عن الصراط المستقيم: ففيه شبه من اليهود ومن انحرف من العباد: ففيه شبه من النصارى –مجموع الفتاوى، ج: 1، ص: 65، ط. مجمع الملك فهد

“সালাফগণ মনে করতেন, যেসব আলেম-উলামা সিরাতে মুস্তাকিম থেকে বিচ্যুত হবে তাদের মধ্যে ইহুদিদের সাদৃশ্য রয়েছে আর যেসব আবেদ-জাহেল ইবাদতগুযার সিরাতে মুস্তাকিম থেকে বিচ্যুত হবে তাদের মধ্যে খ্রিস্টানদের সাদৃশ্য রয়েছে।” –মাজমুউল ফাতাওয়া : ১/৬৫

শাহ ওয়ালিউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলবি রহ. (১১৭৬হি.) বলেন,

فإنك إذا أردت أن ترى نماذج اليهود في هذه الأمة فانظر إلى علماء السوء، طلاب الدنيا –الفوز الكبير في أصول التفسير(معرَّبُ: سلمان الحسيني النَّدوي)، ص: 53، ط. دار الصحوة – القاهرة

“এ উম্মতের মাঝে ইহুদিদের নজির দেখতে চাইলে দুনিয়ালোভী উলামায়ে সূ-দের দিকে তাকাও।” –আলফাওযুল কাবির : ৫৩

শুরুতে উল্লেখিত হাদিসে বিবৃত হয়েছে,

اتخذ الناس رؤوسا جهالا فسئلوا فأفتوا بغير علم فضلوا وأضلوا -صحيح البخاري، رقم: 100؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا

“লোকজন কতক জাহেলকে নিজেদের নেতা বানিয়ে নেবে। তারা ইলম ছাড়াই ফতোয়া দেবে। এভাবে নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করবে।” –সহীহ বুখারি : ১০০

অন্য বর্ণনায় এসেছে,

فيبقى ناس جهال يستفتون فيفتون برأيهم فيضلون ويضلون –صحيح البخاري، رقم: 6877؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا

“অবশেষে থেকে যাবে কতক জাহেল লোক। তাদের কাছে ফতোয়া জিজ্ঞেস করা হবে। তারা নিজেদের মনমতো ফতোয়া দিয়ে দেবে। এভাবে নিজেরাও পথভ্রষ্ট হবে অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট করবে।” –সহীহ বুখারি : ৬৮৭৭

কিয়ামতের দিন সর্ব প্রথম যে তিন শ্রেণীর ব্যক্তিকে অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে তাদের একজনের ব্যাপারে এসেছে,

ورجل تعلم العلم وعلمه وقرأ القرآن فأتى به فعرفه نعمه فعرفها قال فما عملت فيها قال تعلمت العلم وعلمته وقرأت فيك القرآن. قال كذبت ولكنك تعلمت العلم ليقال عالم. وقرأت القرآن ليقال هو قارئ. فقد قيل ثم أمر به فسحب على وجهه حتى ألقى فى النار. -صحيح مسلم، رقم: 5032؛ ط. دار الجيل بيروت + دار الأفاق الجديدة ـ بيروت

“আরেক ব্যক্তি যে ইলম শিখেছে, শিখিয়েছে এবং কুরআন পড়েছে (ক্বারী হয়েছে), তাকে আনা হবে। আল্লাহ তাআলা তাকে যে নিয়ামতরাজি দিয়েছিলেন সেগুলো তাকে স্মরণ করিয়ে দেবেন। সে সব স্বীকার করবে। এরপর জিজ্ঞেস করবেন, ‘এগুলো পেয়ে তুমি কী আমল করেছো?’ সে বলবে, ‘ইলম শিখেছি, শিখিয়েছি এবং আপনার সন্তুষ্টির জন্য কুরআন পড়েছি’। আল্লাহ তাআলা বলবেন, ‘তুমি মিথ্যা বলেছ। বরং তুমি ইলম শিখেছো যেন তোমাকে আলেম বলা হয়। কুরআন পড়েছো যেন তোমাকে ক্বারী বলা হয়। তা তো বলা হয়েই গেছে’। এরপর তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপের নির্দেশ দেয়া হবে। অধোমুখে হেঁচড়িয়ে তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করা হবে।” –সহীহ মুসলিম : ৫০৩২

বোঝা গেল, এমন কিছু আলেম ও ক্বারী জন্মাবে যারা দুনিয়ার জন্য ইলম শিখবে ও শেখাবে এবং দুনিয়ার জন্য কুরআন পড়বে।

আরেক হাদিসে এসেছে,

القضاة ثلاثة: واحد في الجنة، واثنان في النار، فأما الذي في الجنة فرجل عرف الحق فقضى به، ورجل عرف الحق فجار في الحكم، فهو في النار، ورجل قضى للناس على جهل، فهو في النار -سنن ابي داود، رقم: 3573؛ ط. دار الرسالة العالمية، ت: شعَيب الأرنؤوط – محَمَّد كامِل قره بللي، الناشر: دار الرسالة العالمية

“বিচারক তিন শ্রেণীর; এক শ্রেণী জান্নাতী আর দুই শ্রেণী জাহান্নামী। জান্নাতী হলো সে, যে হক (অর্থাৎ সত্য ও ন্যয়) জেনেছে এবং সে অনুযায়ী ফায়সালা দিয়েছে। আর যে ব্যক্তি হক জেনেছে কিন্তু না-হক-অন্যায় ফায়সালা দিয়েছে সে জাহান্নামী। আরেক ব্যক্তি যে অজ্ঞতা নিয়েই ফায়সালা দিয়ে দিয়েছে সেও জাহান্নামী।” –সুনানে আবু দাউদ : ৩৫৭৩

ইবনুল কায়্যিম রহ. (৭৫১হি.) বলেন,

قال غير أبي عمر: كما أن القضاة ثلاثة: قاضيان في النار وواحد في الجنة فالمفتون ثلاثة، ولا فرق بينهما إلا في كون القاضي يلزم بما أفتى به، والمفتي لا يلزم به. –إعلام الموقعين، ج: 2، ص: 134، ط. دار الكتب العلمية – ييروت

“বিচারক যেমন তিন শ্রেণীর: দুই শ্রেণী জাহান্নামী এক শ্রেণী জান্নাতী, মুফতিও তিন শ্রেণীর। উভয়ের মাঝে ব্যবধান শুধু এটুকু যে, বিচারক তার ফতোয়া মানতে বাধ্য করতে পারে আর মুফতি পারে না।” –ই’লামুল মুআক্কিয়িন : ২/১৩৪

অতএব, এ উম্মতের মাঝে এমন কতক বিচারক ও মুফতি জন্ম নেবে যারা হক জেনেও দুনিয়ার লোভে হকের উল্টো বিচারাচার করবে এবং ফতোয়া দিয়ে জুলুম করবে। আর এমন অনেক কাযি মুফতিও জন্ম নেবে যারা অযোগ্য হওয়া সত্বেও ক্ষমতার জোরে কিংবা ঘুষ দিয়ে পদ দখল করে নেবে।

আরেক হাদিসে এসেছে,

يحمل هذا العلم من كل خلف عدوله ينفون عنه تحريف الغالين وانتحال المبطلين وتأويل الجاهلين –شرح مشكل الآثار للطحاوى، رقم: 3884، تحقيق: شعيب الأرنؤوط، الناشر: مؤسسة الرسالة

“প্রত্যেক পরবর্তী প্রজন্মের আদেল ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিবর্গই এই ইলমের ধারক-বাহক হবেন; যারা সীমা লঙ্গনকারীদের বিকৃতি, বাতিল লোকদের মিথ্যারোপ এবং মূর্খদের অপব্যাখ্যা থেকে এই ইলমকে রক্ষা করবেন।” -শরহু মুশকিলিল আসার লিত-ত্বহাবি : ৩২৬৯

অতএব, এ উম্মতে এমন কতক সীমা লঙ্গনকারী, বাতিলপন্থী ও মূর্খ আলেম জন্মাবে যারা দ্বীনের অপব্যাখ্যা করবে, দ্বীনের নামে মিথ্যাচার করবে এবং অসংগত ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে নিজেরাও বিভ্রান্তির শিকার হবে অন্যদেরকেও বিভ্রান্ত করবে।

হাদিসে কেয়ামতের একটি আলামত বলা হয়েছে,

وتعلم لغير الدين -سنن الترمذي، رقم: 2211؛ ط. شركة مكتبة ومطبعة مصطفى البابي الحلبي – مصر

“(দ্বীনের) ইলম দ্বীনের জন্য শেখা হবে না।” –সুনানে তিরমিযি : ২২১১

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

والتمست الدنيا بعمل الآخرة، وتفقه لغير الدين -جامع بيان العلم وفضله لابن عبد البر، ج: 1، ص: 654، رقم: 1135، ط. دار ابن الجوزي، المملكة العربية السعودية

“আখেরাতের আমল দ্বারা দুনিয়া তালাশ করা হবে। (দ্বীনের) ইলম দ্বীনের জন্য শেখা হবে না।”–জামিউ বয়ানিল ইলম : ১/৬৫৪, হাদিস নং ১১৩৫

ইবনে আব্দুল বার রহ. (৪৬৩হি.) উল্লেখ করেছেন, হযরত আলী রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

يا حملة العلم، اعملوا به؛ فإنما العالم من علم ثم عمل ووافق عمله علمه، وسيكون أقوام يحملون العلم لا يجاوز تراقيهم تخالف سريرتهم علانيتهم ويخالف عملهم علمهم، يقعدون حلقا فيباهي بعضهم بعضا حتى إن الرجل ليغضب على جليسه أن يجلس إلى غيره ويدعه، أولئك لا تصعد أعمالهم في مجالسهم تلك إلى الله عز وجل -جامع بيان العلم وفضله لابن عبد البر، ج: 1، ص: 696، رقم: 1237، ط. دار ابن الجوزي، المملكة العربية السعودية

“হে ইলমের ধারক-বাহকেরা, তোমরা ইলম অনুযায়ী আমল করো। কেননা, আলেম তো সে-ই যে ইলম শিখেছে এরপর আমল করেছে এবং তার ইলমের সাথে আমলের মিল আছে। অচিরেই এমন সব লোক আসবে যারা ইলম ধারণ করবে কিন্তু তা তাদের গলদেশ অতিক্রম করবে না। তাদের জাহের বাতেন মিল থাকবে না। আমল ইলমের বিপরীত হবে। অনেক মজলিস নিয়ে তারা বসবে। একে অপরের সাথে গর্ব করবে। অবস্থা এমন হবে যে, তাকে ছেড়ে অন্যের মজলিসে বসার কারণে রাগান্বিত হবে। ওসব লোকের ওই সব মজলিসের আমল আল্লাহ আযযা ওয়া জাল্লার কাছে উঠবে না।” –জামিউ বয়ানিল ইলম : ১/৬৯৪, হাদিস নং ১২৩৭

এছাড়াও কুরআন সুন্নাহয় আরও অসংখ্য দলীল প্রমাণ দিয়ে প্রমাণিত যে, দুনিয়ালোভী স্বার্থান্বেষী একদল উলামা ছিল এবং থাকবে, যাদের ইলম তাদের কোনও উপকারে আসেনি, আসবে না। ইবনে রজব হাম্বলি রহ. (৭৯৫হি.) বলেন,

قد ذكر الله -تعالى- في كتابه العِلْم تارة في مقام المدح، وهو العِلْم النافع، وذكر العِلْم تارة في مقام الذم، وهو العِلْم الَّذِي لا ينفع.

فأما الأول فمثل قوله تعالى: {قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ} [الزمر: 9]، وقوله: {شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ} [آل عمران: 18]، وقوله: {وَقُلْ رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا} [طه: 114] وقوله: {إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ} [فاطر: 28]، وما قص الله سبحانه من قصة آدم وتعليمه الأسماء وعرضهم عَلَى الملائكة وقولهم: {سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا إِنَّكَ أَنْتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ} [البقرة: 32]، وما قص الله سبحانه من قصة موسى -عليه السلام- وقوله للخضر: {هَلْ أَتَّبِعُكَ عَلَى أَنْ تُعَلِّمَنِ مِمَّا عُلِّمْتَ رُشْدًا} [الكهف: 66] فهذا هو العِلْم النافع.

وقد أخبر عن قوم أنهم أوتوا علماً ولم ينفعهم علمهم، فهذا علم نافع في نفسه لكن صاحبه لم ينتفع به، قال تعالى:

{مَثَلُ الَّذِينَ حُمِّلُوا التَّوْرَاةَ ثُمَّ لَمْ يَحْمِلُوهَا كَمَثَلِ الْحِمَارِ يَحْمِلُ أَسْفَارًا} [الجمعة: 5]، وقال تعالى: {وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ الَّذِي آتَيْنَاهُ آيَاتِنَا فَانْسَلَخَ مِنْهَا فَأَتْبَعَهُ الشَّيْطَانُ فَكَانَ مِنَ الْغَاوِينَ * وَلَوْ شِئْنَا لَرَفَعْنَاهُ بِهَا وَلَكِنَّهُ أَخْلَدَ إِلَى الْأَرْضِ وَاتَّبَعَ هَوَاهُ} [الأعراف: 175 – 176]، وقال تعالى: {فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ وَرِثُوا الْكِتَابَ يَأْخُذُونَ عَرَضَ هَذَا الْأَدْنَى وَيَقُولُونَ سَيُغْفَرُ لَنَا وَإِنْ يَأْتِهِمْ عَرَضٌ مِثْلُهُ يَأْخُذُوهُ … } الآية [الأعراف: 169] وقال: {وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ} [الجاثية: 23]. –مجموع رسائل ابن رجب الحنبلي، ج: 3، ص: 7-8، ط. الفاروق الحديثة للطباعة والنشر

“আল্লাহ তাআলা কুরআনে কারীমে ইলমকে কখনও প্রশংসার স্থলে উল্লেখ করেছেন। এটিই হলো ইলমে নাফে তথা উপকারী ইলম। আবার কখনও নিন্দার স্থলে উল্লেখ করেছেন। এটিই হলো ওই ইলম যা কোনও উপকারে আসে না। (যেমন তর্কশাস্ত্র।)

প্রথমটির দৃষ্টান্ত:

قُلْ هَلْ يَسْتَوِي الَّذِينَ يَعْلَمُونَ وَالَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ

‘আপনি বলুন, যে ব্যক্তি জানে আর যে জানে না উভয়ে কি সমান?’ –সূরা যুমার (৩৯) : ৯

شَهِدَ اللَّهُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ وَالْمَلَائِكَةُ وَأُولُو الْعِلْمِ قَائِمًا بِالْقِسْطِ

‘আল্লাহ স্বয়ং এ বিষয়ে সাক্ষ্য দেন এবং ফেরেশতাগণ এবং ইলমের অধিকারীরাও যে, তিনি ছাড়া কোন মা’বুদ নাই, যিনি ইনসাফের সাথে (বিশ্ব জগতের) নিয়ম-শৃঙ্খলা বিধান করছেন।’ –সূরা আলে ইমরান (৩) : ১৮

وَقُلْ رَبِّ زِدْنِي عِلْمًا

‘এবং আপনি বলুন, হে আমার রব, আপনি আমার ইলম বাড়িয়ে দিন।’ –সূরা ত্ব হা (২০) : ১১৪

إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ

‘আল্লাহকে তো তার বান্দাদের মধ্যে (প্রকৃত অর্থে) তারাই ভয় করে যারা ইলমের অধিকারী।’ –সূরা ফাতির (৩৫) : ২৮

হযরত আদম আলাইহিস সালামকে সকল বস্তুর নাম শিক্ষা দেয়া, সেগুলোকে ফেরেশতাদের সামনে পেশ করা এবং এ সংক্রান্ত যে ঘটনা আল্লাহ তাআলা বর্ণনা করেছেন সেটিও এর দৃষ্টান্ত। ফেরেশতারা বলেছিল,

سُبْحَانَكَ لَا عِلْمَ لَنَا إِلَّا مَا عَلَّمْتَنَا إِنَّكَ أَنْتَ الْعَلِيمُ الْحَكِيمُ

‘আপনি মহা পবিত্র। আপনি যা শিখিয়েছেন তা ছাড়া আমাদের কোনোই ইলম নেই। নিঃসন্দেহে আপনিই প্রকৃত জ্ঞানী এবং মহা প্রজ্ঞাময়।’ –সূরা বাকারা (২) : ৩২

হযরত মূসা আলাইহিস সালাম ও খাযিরের যে ঘটনা আল্লাহ তাআলা বর্ণনা করেছেন সেটিও এর দৃষ্টান্ত। মূসা আলাইহিস সালাম খাযিরকে বলেছিলেন,

هَلْ أَتَّبِعُكَ عَلَى أَنْ تُعَلِّمَنِ مِمَّا عُلِّمْتَ رُشْدًا

‘আমি কি এ উদ্দেশ্যে আপনার সাথে থাকতে পারি যে, সত্য পথের যে ইলম আপনাকে শিক্ষা দেয়া হয়েছে তার কিছু আমাকে শিক্ষা দেবেন?’ –সূরা কাহফ (১৮) : ৬৬

এটিই হচ্ছে ইলমে নাফে-উপকারী ইলম।

পাশাপাশি আল্লাহ তাআলা এমন কওমের কথাও জানিয়েছেন, যাদেরকে (উপকারী) ইলম দেয়া হয়েছিল, কিন্তু তাদের ইলম তাদের কোনও উপকারে আসেনি। এ ইলম উপকারী কিন্তু ইলমধারী তা থেকে উপকৃত হয়নি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

مَثَلُ الَّذِينَ حُمِّلُوا التَّوْرَاةَ ثُمَّ لَمْ يَحْمِلُوهَا كَمَثَلِ الْحِمَارِ يَحْمِلُ أَسْفَارًا

‘যাদেরকে তাওরাতের দায়িত্বভার দেয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা তা বহন করেনি (তার অনুসরণ করেনি), তাদের দৃষ্টান্ত সেই গাধার ন্যায়, যে অনেক পুস্তক বহন করে চলেছে।’ –সূরা জুমুআ (৬২) : ৫

وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ الَّذِي آتَيْنَاهُ آيَاتِنَا فَانْسَلَخَ مِنْهَا فَأَتْبَعَهُ الشَّيْطَانُ فَكَانَ مِنَ الْغَاوِينَ * وَلَوْ شِئْنَا لَرَفَعْنَاهُ بِهَا وَلَكِنَّهُ أَخْلَدَ إِلَى الْأَرْضِ وَاتَّبَعَ هَوَاهُ

‘আপনি তাদের কাছে সেই ব্যক্তিটির বৃত্তান্ত পড়ে শোনান, যাকে আমি আমার নিদর্শনসমূহ দান করেছিলাম। কিন্তু সে তা পরিত্যাগ করে বেরিয়ে গিয়েছিল। পরে শয়তান তার পেছনে লাগল। এরপর সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল। আমি চাইলে ওই আয়াতগুলোর বদৌলতে তাকে উচ্চ মর্যাদায় আসীন করতে পারতাম। কিন্তু সে দুনিয়ার প্রতি ঝুঁকে পড়ল এবং নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করল।’ –সূরা আ’রাফ (৭) : ১৭৫-১৭৬

فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ وَرِثُوا الْكِتَابَ يَأْخُذُونَ عَرَضَ هَذَا الْأَدْنَى وَيَقُولُونَ سَيُغْفَرُ لَنَا وَإِنْ يَأْتِهِمْ عَرَضٌ مِثْلُهُ يَأْخُذُوهُ

‘অনন্তর তাদের পর এমন কতক অযোগ্য উত্তরসূরি তাদের স্থলাভিষিক্ত হলো, যারা কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়েছে। তারা এই তুচ্ছ দুনিয়ার সামগ্রী গ্রহণ করে এবং বলে, ‘আমাদেরকে অবশ্যই ক্ষমা করে দেয়া হবে’। যদি অনুরূপ সামগ্রী তাদের সামনে পুনরায় আসে তাহলে তাও গ্রহণ করে।’ –সূরা আ’রাফ (৭) : ১৬৯

وَأَضَلَّهُ اللَّهُ عَلَى عِلْمٍ

‘ইলমের অধিকারী হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাকে গোমরাহ করেছেন।’ –সূরা জাসিয়া (৪৫) : ২৩” –মাজমুউ রাসায়িলি ইবনি রজব আলহাম্বলি : ৩/৭-৮

উলামায়ে সু : পরিচিতি ও প্রকৃতি

উলামায়ে সূ-য়ের প্রকৃষ্ট নজির উলামায়ে ইয়াহুদ—যেমনটা ওপরে উল্লেখিত হয়েছে। আমরা যদি এতদ্‌সংক্রান্ত আয়াতগুলো দেখি তাহলেই আমাদের সামনে উলামায়ে সূ-য়ের পরিচিতি ‍ও প্রকৃতি স্পষ্ট হয়ে উঠবে। কুরআনে কারীমের অংসখ্য আয়াতে এদের গোমর ফাঁস করা হয়েছে। সেখান থেকে মৌলিক কিছু পয়েন্ট আলোচনা করছি। সাথে সাথে সংশ্লিষ্ট কিছু আয়াত ও হাদিসও উল্লেখ করবো ইনশাআল্লাহ।

বেআমল আলেম

নাম মাত্রই তারা আলেম ছিল। ইলম অনুযায়ী আমলের কোন ধার ধারতো না। আল্লাহ তাআলা এদেরকে গাধার সাথে তুলনা করে বলেন,

مَثَلُ الَّذِينَ حُمِّلُوا التَّوْرَاةَ ثُمَّ لَمْ يَحْمِلُوهَا كَمَثَلِ الْحِمَارِ يَحْمِلُ أَسْفَارًا –

“যাদেরকে তাওরাতের দায়িত্বভার দেয়া হয়েছিল, কিন্তু তারা তা বহন করেনি (তার অনুসরণ করেনি), তাদের দৃষ্টান্ত সেই গাধার ন্যায়, যে অনেক পুস্তক বহন করে চলেছে।” –সূরা জুমুআ (৬২) : ৫

অন্য আয়াতে আল্লাহ্‌ তা’আলা বলেন,

فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلَاةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوَاتِ –

“অনন্তর তাদের পর এমন কতক অযোগ্য উত্তরসূরি তাদের স্থলাভিষিক্ত হলো যারা নামায নষ্ট করল এবং নফসের কামনা-বাসনার পেছনে পড়ে গেল।” –সূরা মারইয়াম (১৯) : ৫৯

অন্য আয়াতে বলেন,

فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ وَرِثُوا الْكِتَابَ يَأْخُذُونَ عَرَضَ هَذَا الْأَدْنَى وَيَقُولُونَ سَيُغْفَرُ لَنَا وَإِنْ يَأْتِهِمْ عَرَضٌ مِثْلُهُ يَأْخُذُوهُ أَلَمْ يُؤْخَذْ عَلَيْهِمْ مِيثَاقُ الْكِتَابِ أَنْ لَا يَقُولُوا عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقَّ وَدَرَسُوا مَا فِيهِ

“অনন্তর তাদের পর এমন কতক অযোগ্য উত্তরসূরি তাদের স্থলাভিষিক্ত হলো যারা কিতাবের উত্তরাধিকারী হয়েছে। তারা এই তুচ্ছ দুনিয়ার সামগ্রী গ্রহণ করে এবং বলে, ‘আমাদেরকে অবশ্যই ক্ষমা করে দেয়া হবে’। যদি অনুরূপ সামগ্রী তাদের সামনে পুনরায় আসে তাহলে তাও গ্রহণ করে। ওদের থেকে কি কিতাবে এ অঙ্গীকার নেয়া হয়নি যে, আল্লাহর উপর সত্য বৈ (মিথ্যা) কিছু আরোপ করবে না? আর তাতে (অর্থাৎ কিতাবে) যা কিছু লেখা ছিল তারা যথারীতি তা পড়েছেও।” –সূরা আ’রাফ (৭) : ১৬৯

অর্থাৎ তারা গোনাহ করতো আর বলতো, অচিরেই তাওবা করে নেবো। কিন্তু আবার যখন গুনাহর সুযোগ আসতো, আগের কথা ভুলে গিয়ে আবারও হারামে লিপ্ত হতো। এভাবে যতবারই সুযোগ আসতো, হারাম করতে থাকতো।

বেআমল মুফতি, বেআমল ওয়ায়েজ

বনি ইসরাঈল অন্যকে গুনাহ পরিহার করে সৎ পথে চলার এবং আল্লাহ তাআলার আদেশ-নিষেধ মেনে চলার আদেশ দিতো।

কেউ আলেমদের কাছে কিছু জিজ্ঞাসা করলে, যেখানে সত্য বললে দুনিয়ার কোনো স্বার্থ ছুটে যেতো না, সেখানে তারা হক ও সত্য কথাটি বলে দিতো এবং সে অনুযায়ী আমল করার উপদেশ দিতো, কিন্তু নিজেরা আমল করতো না। এ ধরনের বে-আমল মুফতি ও ওয়ায়েজদের তিরস্কার করে আল্লাহ তাআলা বলেন,

أَتَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبِرِّ وَتَنْسَوْنَ أَنْفُسَكُمْ وَأَنْتُمْ تَتْلُونَ الْكِتَابَ أَفَلَا تَعْقِلُونَ

“তোমরা কি লোকদের ভালো কাজের আদেশ দাও আর নিজেরা ভুলে থাকো? অথচ তোমরা তো কিতাব পাঠ করো। তাহলে (কি অন্যায় যে তোমরা করছো তা) কি তোমরা বুঝো না?” –সূরা বাকারা (২) : ৪৪

ইবনে কাসির রহ. (৭৭৪হি.) বলেন,

يقول تعالى: كيف يليق بكم -يا معشر أهل الكتاب، وأنتم تأمرون الناس بالبر، وهو جماع الخير-أن تنسوا أنفسكم، فلا تأتمروا بما تأمرون الناس به، وأنتم مع ذلك تتلون الكتاب، وتعلمون ما فيه على من قصر في أوامر الله؟ أفلا تعقلون ما أنتم صانعون بأنفسكم؛ فتنتبهوا من رقدتكم، وتتبصروا من عمايتكم. وهذا كما قال عبد الرزاق عن معمر، عن قتادة في قوله تعالى: {أتأمرون الناس بالبر وتنسون أنفسكم} قال: كان بنو إسرائيل يأمرون الناس بطاعة الله وبتقواه، وبالبر، ويخالفون، فعيرهم الله، عز وجل. وكذلك قال السدي. –تفسير ابن كثير، ج: 1، ص: 246، ط. دار طيبة للنشر والتوزيع

“আল্লাহ তাআলা বলছেন, হে কিতাবধারীরা, তোমাদের জন্য কীভাবে শোভা পায় যে, তোমরা লোকজনকে ভালো কাজের আদেশ দাও আর নিজেদের ভুলে থাকো? লোকজনকে যার আদেশ দাও নিজেদের সে আদেশ দাও না, অথচ তোমরা কিতাব পড়, আল্লাহর আদেশ মানায় অবহেলাকারীদের কী পরিণাম তাতে লেখা আছে তোমরা তা জানও। তোমরা নিজেদের সাথে যে প্রবঞ্চনা করছো তা কি তোমরা বুঝতে পারছো না যে, এই অমোঘ নিদ্রা ছেড়ে জেগে উঠবে? এ অন্ধত্ব ছেড়ে আলোতে ফিরে আসবে?

আব্দুর রাযযাক রহ. মা’মারের সূত্রে এ আয়াতের ব্যাখ্যায় কাতাদা রহ. থেকে বর্ণনা করেছেন, বনি ইসরাঈল অন্যদেরকে আল্লাহ তাআলার ফরমাবরদারি ও তাকওয়া অবলম্বনের এবং সৎ কাজের আদেশ দিতো, কিন্তু নিজেরা উল্টো করত। আল্লাহ তাআলা তাদের এহেন ঘৃণ্য কর্মের কারণে তিরস্কার করেছেন। সুদ্দি রহ.ও এমনই বলেছেন।” –তাফসিরে ইবনে কাসির : ১/২৪৬

আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন আয়াতে এ ধরনের লোকের তিরস্কার করেছেন। যেমন এক আয়াতে বলেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لِمَ تَقُولُونَ مَا لَا تَفْعَلُونَ (2) كَبُرَ مَقْتًا عِنْدَ اللَّهِ أَنْ تَقُولُوا مَا لَا تَفْعَلُونَ (3) –الصف

“হে ঈমানদারগণ! তোমরা এমন কথা কেন বল যা তোমরা কর না? এটা আল্লাহর কাছে বড় অপছন্দনীয় যে, তোমরা এমন কথা বল যা তোমরা কর না।” –সূরা সফ (৬১) : ২-৩

উল্লেখ্য, ভাল কাজের আদেশ দেয়ার কারণে তিরস্কার করা হয়নি, করা হয়েছে নিজে আমল না করার কারণে। কারণ, নিজে আমল না করলেও ভাল কাজের আদেশ দেয়া জরুরি। কারণ উভয়টি স্বতন্ত্র ফরয।

এ ধরনের লোকেদের শাস্তির ব্যাপারে হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

رأيت ليلة أسري بي رجالا تقرض شفاههم بمقاريض من نار، فقلت: يا جبريل من هؤلاء؟ قال: هؤلاء خطباء من أمتك، يأمرون الناس بالبر، وينسون أنفسهم، وهم يتلون الكتاب أفلا يعقلون؟ -مسند الإمام أحمد، رقم: 13515؛ ط. الرسالة، ت: شعيب الأرنؤوط، عادل مرشد، وآخرون، قال الشيخ شعيب الأرنؤوط رحمه الله تعالى: حديث صحيح، وهذا إسناد ضعيف لضعف علي بن زيد بن جدعان. اهـ

“মেরাজের রাত্রে কিছু লোককে দেখতে পেলাম আগুনের কেঁচি দিয়ে তাদের ঠোঁট কাটা হচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম, জিব্রাঈল! এরা কারা? তিনি উত্তর দেন, এরা আপনার উম্মতের বক্তারা, যারা লোকদের ভালোর আদেশ দিতো আর নিজেরা ভুলে থাকতো, অথচ তারা কিতাবও পড়তো। তারা কি বুঝতো না?” –মুসনাদে আহমাদ : ১৩৫১৫

এ হল উলামায়ে সূ-র হালত। পক্ষান্তরে আম্বিয়ায়ে কেরাম ও উলামায়ে হক্কানির তরিকা হল সেটাই যা হযরত শুয়াইব আলাইহিস সালাম বলেছেন,

وَمَا أُرِيدُ أَنْ أُخَالِفَكُمْ إِلَى مَا أَنْهَاكُمْ عَنْهُ إِنْ أُرِيدُ إِلَّا الْإِصْلَاحَ مَا اسْتَطَعْتُ –هود 88

“আর আমি এটা চাই না যে, আমি তোমাদের যে কাজ করতে নিষেধ করি তোমাদের পশ্চাতে আমি নিজে সে কাজে লিপ্ত হই। আমি তো আমার সাধ্যমতো কেবল ইসলাহ করতে চাই।” –সূরা হুদ (১১) : ৮৮

বুঝা গেল, ওয়াজ-নসীহত ও ফতোয়ার সাথে যদি আমল না থাকে, তাহলে ইসলাহ হবে না। ইবনুল কায়্যিম রহ. (৭৫১হি.) বড়ই সুন্দর কথা বলেছেন,

عُلَمَاء السوء جَلَسُوا على بَاب الْجنَّة يدعونَ إِلَيْهَا النَّاس بأقوالهم ويدعونهم إِلَى النَّار بأفعالهم فَكلما قَالَت أَقْوَالهم للنَّاس هلمّوا قَالَت أفعالهم لَا تسمعوا مِنْهُم فَلَو كَانَ مَا دعوا إِلَيْهِ حَقًا كَانُوا أول المستجيبين لَهُ فهم فِي الصُّورَة أدلاء وَفِي الْحَقِيقَة قطّاع الطّرق –الفوائد، ص: 61، دار الكتب العلمية – بيروت

“উলামায়ে সূ-রা জান্নাতের দরজায় বসে মুখে মুখে লোকদেরকে জান্নাতের দিকে ডাকছে কিন্তু কর্মের দ্বারা ডাকছে জাহান্নামের দিকে। তাদের মুখ যখন বলছে, ‘এসো জান্নাতের দিকে’ তখন তাদের কর্ম বলছে, ‘তাদের কথা শুনবে না। তারা যে দিকে ডাকছে তা যদি সত্যই হতো তাহলে তারাই তো সর্ব প্রথম সাড়া দিত’। বেশ-ভূষায় এরা পথ প্রদর্শক আর বাস্তবে রাজ পথের ডাকাত।” –আল ফাওয়ায়িদ

 

 

    উলামায়ে হক্কানি ও উলামায়ে সু : পরিচিতি ও  প্রকৃতি

পর্ব ২

মাওলানা আবদুল্লাহ রাশেদ (হাফিযাহুল্লাহ)

 

দুনিয়ার তুচ্ছ স্বার্থে সত্য গোপন করা এবং হক-বাতিল গুলিয়ে ফেলা

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَإِذْ أَخَذَ اللَّهُ مِيثَاقَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ لَتُبَيِّنُنَّهُ لِلنَّاسِ وَلَا تَكْتُمُونَهُ فَنَبَذُوهُ وَرَاءَ ظُهُورِهِمْ وَاشْتَرَوْا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَبِئْسَ مَا يَشْتَرُونَ

“স্মরণ করুন, যাদের কিতাব দেয়া হয়েছে, আল্লাহ যখন তাদের থেকে এ অঙ্গীকার নিয়েছিলেন যে, তোমরা অবশ্যই তা সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করে দেবে এবং তা গোপন করবে না। এরপর তারা সে অঙ্গীকার পিঠের পশ্চাতে ছুঁড়ে ফেলে দিল এবং এর বিনিময়ে খরিদ করল সামান্য মূল্য। কত নিকৃষ্ট মূল্যই না তারা খরিদ করছে।” –সূরা আলে ইমরান (৩): ১৮৭

 

অন্যত্র ইরশাদ করেন,

إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنْزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَى مِنْ بَعْدِ مَا بَيَّنَّاهُ لِلنَّاسِ فِي الْكِتَابِ أُولَئِكَ يَلْعَنُهُمُ اللَّهُ وَيَلْعَنُهُمُ اللَّاعِنُونَ

“আমি যেসকল সুস্পষ্ট বিধান ও (সঠিক) পথের দিশা দানকারী প্রমাণাদি নাযিল করেছি, আমি মানুষের জন্য কিতাবে স্পষ্টভাবে তা বর্ণনা করে দেয়ার পরও যারা তা গোপন করে, তাদের উপর আল্লাহ তাআলা লা’নত করেন এবং লা’নত করে অন্য সকল লা’নতকারীও।” –সূরা বাকারা (২): ১৫৯

 

আরেক আয়াতে বলেন,

يَا أَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تَلْبِسُونَ الْحَقَّ بِالْبَاطِلِ وَتَكْتُمُونَ الْحَقَّ وَأَنْتُمْ تَعْلَمُونَ (71) آل عمران

“হে কিতাবিরা! তোমরা কেনো সত্যকে মিথ্যার সাথে মিশ্রিত করছো এবং জেনেশুনে সত্য গোপন করছো?” –সূরা আলে ইমরান (৩):৭১

 

দুনিয়ার ধন-সম্পদ, মান-মর্যাদা এবং নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের লোভে এরা সত্য কথা বলতো না। গোপন করে রাখতো। হক বাতিল গুলিয়ে ফেলতো। অনেক আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাদের এ ঘৃণ্য কর্মের সমালোচনা করেছেন। এক আয়াতে বলেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّ كَثِيرًا مِنَ الْأَحْبَارِ وَالرُّهْبَانِ لَيَأْكُلُونَ أَمْوَالَ النَّاسِ بِالْبَاطِلِ وَيَصُدُّونَ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ (34) التوبة

“হে ঈমানদারগণ! (আহলে কিতাবের) বহু আলেম ও আবেদ অন্যায়ভাবে মানুষের ধন-সম্পদ গ্রাস করে এবং (তাদের) আল্লাহর পথ থেকে ফিরিয়ে রাখে।” –সূরা তাওবা (৯):৩৪

 

ইবনে কাসির রহ. (৭৭৪হি.) বলেন,

والمقصود: التحذير من علماء السوء وعباد الضلال كما قال سفيان بن عيينة: من فسد من علمائنا كان فيه شبه من اليهود، ومن فسد من عبادنا كان فيه شبه من النصارى… والحاصل التحذير من التشبه بهم في أحوالهم وأقوالهم؛ ولهذا قال تعالى: {ليأكلون أموال الناس بالباطل} وذلك أنهم يأكلون الدنيا بالدين ومناصبهم ورياستهم في الناس، يأكلون أموالهم بذلك، كما كان لأحبار اليهود على أهل الجاهلية شرف، ولهم عندهم خرج وهدايا وضرائب تجيء إليهم، فلما بعث الله رسوله، صلوات الله وسلامه عليه استمروا على ضلالهم وكفرهم وعنادهم، طمعا منهم أن تبقى لهم تلك الرياسات، فأطفأها الله بنور النبوة، وسلبهم إياها، وعوضهم بالذلة والمسكنة، وباءوا بغضب من الله. وقوله تعالى: {ويصدون عن سبيل الله} أي: وهم مع أكلهم الحرام يصدون الناس عن اتباع الحق، ويلبسون الحق بالباطل، ويظهرون لمن اتبعهم من الجهلة أنهم يدعون إلى الخير، وليسوا كما يزعمون، بل هم دعاة إلى النار –تفسير ابن كثير، ج: 4، ص: 138؛ ط. دار طيبة للنشر والتوزيع

“উদ্দেশ্য হল, উলামায়ে সু এবং গোমরা আবেদদের ব্যাপারে সতর্ক করা। যেমনটা সুফিয়ান ইবনে উয়াইনা রহ. বলেন, ‘আমাদের যেসব আলেম বিচ্যুতির শিকার হবে তাদের মধ্যে ইহুদিদের সাদৃশ্য রয়েছে আর যেসব আবেদ বিচ্যুত হবে তাদের মধ্যে খ্রিস্টানদের সাদৃশ্য রয়েছে’।

এক কথায় বলা যায়, কথায়, কাজে এবং চালচলনে তাদের সাদৃশ্য অবলম্বন থেকে সতর্ক করা উদ্দেশ্য। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘তারা অন্যায়ভাবে মানুষের ধন-সম্পদ গ্রাস করে’। কেননা, তারা দ্বীন বিক্রি করে দুনিয়া ভক্ষণ করে। পদমর্যাদা এবং নেতৃত্ব-কর্তৃত্বের বলে জনগণের সম্পদ আত্মসাৎ করে। তা এভাবে যে, জাহিলি যামানার লোকদের কাছে ইহুদি আলেমরা ছিল সম্মানের পাত্র। লোকেদেরপক্ষ থেকে তাদের কাছে নিয়মিত হাদিয়া তোহফা আসতো। তাদের জন্য নির্ধারিত অর্থ ধার্য থাকত যা তারা নিয়মিত পেত। আল্লাহ তাআলা যখন রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে নবী বানিয়ে পাঠালেন, তখনও তারা তাদের নেতৃত্ব বহাল রাখার লোভে গোমরাহি, কুফর ও একগুঁয়েমিতে অটল রইল। অবশেষে আল্লাহ তাআলা নূরে নবুওয়াতের কিরণ দ্বারা তা নিষ্প্রভ করে দিলেন। তাদের থেকে সব ছিনিয়ে নিলেন। তারা পেল লাঞ্চনা আর গঞ্জনা। বয়ে ফিরলো আল্লাহর ক্রোধ। (এই বাক্য একটু অন্যভাবে বলা দরকার।

আল্লাহ তাআলার বাণী, ‘তারা আল্লাহর পথ থেকে লোকদের ফিরিয়ে রাখে’ অর্থাৎ তারা হারাম ভক্ষণের পাশাপাশি লোকদেরকে হকের অনুসরণ থেকে ফিরিয়ে রাখে। হক-বাতিল গুলিয়ে ফেলে। তাদের জাহেল অনুসারিদের তারা দেখাতে চায় যে, তারা তাদেরকে ভালোর দিকে ডাকছে, অথচ বাস্তবে এমন নয়, বরং তারা জাহান্নামের দাঈ।” –তাফসিরে ইবনে কাসির : ৪/১৩৮

 

তিনি আরও বলেন,

يقول تعالى: {إن الذين يكتمون} [مما يشهد له بالرسالة] {ما أنزل الله من الكتاب} يعني اليهود الذين كتموا صفة محمد صلى الله عليه وسلم في كتبهم التي بأيديهم، مما تشهد له بالرسالة والنبوة، فكتموا ذلك لئلا تذهب رياستهم وما كانوا يأخذونه من العرب من الهدايا والتحف على تعظيمهم إياهم، فخشوا -لعنهم الله -إن أظهروا ذلك أن يتبعه الناس ويتركوهم، فكتموا ذلك إبقاء على ما كان يحصل لهم من ذلك، وهو نزر يسير، فباعوا أنفسهم بذلك، واعتاضوا عن الهدى واتباع الحق وتصديق الرسول والإيمان بما جاء عن الله بذلك النزر اليسير –تفسير ابن كثير، ج: 1، ص: 483؛ ط. دار طيبة للنشر والتوزيع

“আল্লাহ তাআলা বলছেন, ইহুদিদের কিতাবে মুহাম্মাদ ﷺ এর যেসব সিফাত বিবৃত ছিল, যেগুলো তাঁর নবুওয়াত ও রিসালাতের সাক্ষী- ইহুদিরা সেগুলো গোপন করেছে। গোপন করেছে যেন তাদের নেতৃত্ব ছুটে না যায়। আরবদের থেকে যেসব হাদিয়া তোহফা আর সম্মান পেতো সেগুলো যেন বন্ধ না হয়ে যায়। তাদের ভয় হলো –আল্লাহ তাদের উপর লা’নত বর্ষণ করুন- যদি তারা তা প্রকাশ করে দেয় তাহলে লোকজন রাসূলুল্লাহ ﷺ এর অনুসারী হয়ে যাবে এবং তাদের পরিত্যাগ করবে। যে তুচ্ছ স্বার্থ তারা লাভ করতো তা বহাল রাখতে তারা সত্য গোপন করলো। এ সামান্য মোহে নিজেদের বিক্রি করে দিল। হকের অনুসরণ, রাসূলুল্লাহ ﷺ -একে সত্যায়ন এবং আল্লাহর তরফ থেকে তিনি যা নিয়ে এসেছেন তাতে ঈমান আনার বিপরীতে তারা এ নগণ্য বস্তুকে গ্রহণ করল।” –তাফসিরে ইবনে কাসির : ১/৪৮৩

আজ যারা হাদিয়া-তোহফা, বেতন-ভাতা আর চাকরি-বাকরির লোভে সঠিক মাসআলা বলছে না, এদের সাথে তাদের কতই না মিল!

 

তাহরিফ-অপব্যাখ্যা এবং দ্বীনের নামে মিথ্যাচার

অপব্যাখ্যা তো ইহুদিদের শিয়ার (প্রতীক)। বহু আয়াতে আল্লাহ তাআলা তাদের এ বিষয়টির কথা উল্লেখ করেছেন। নিম্নে মাত্র কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করছি,

أَفَتَطْمَعُونَ أَنْ يُؤْمِنُوا لَكُمْ وَقَدْ كَانَ فَرِيقٌ مِنْهُمْ يَسْمَعُونَ كَلَامَ اللَّهِ ثُمَّ يُحَرِّفُونَهُ مِنْ بَعْدِ مَا عَقَلُوهُ وَهُمْ يَعْلَمُونَ

“তবুও কি তোমরা (হে মুসলমানরা) আশা করছো যে, ওরা তোমাদের কথায় ঈমান আনবে? অথচ ওদের একটা দল তো এমন ছিল যে, আল্লাহর বাণী শুনত এরপর বুঝে শুনে তা বিকৃত করতো। অথচ ওরা জানতো (যে, তারা অন্যায় করছে)।” –সূরা বাকারা (২):৭৫

অর্থাৎ তুর পাহাড়ে একদল ইহুদি সরাসরি আল্লাহর কালাম শুনে এসেছে। এসে বিকৃত করে উল্টো বলেছে। তাওরাতে আল্লাহর স্পষ্ট বাণী ও নির্দেশ তারা দেখেছে। দেখার এবং বুঝার পরও শুধু মনমতো না হওয়ায় জেনেশুনে বিকৃত করেছে।

فَوَيْلٌ لِلَّذِينَ يَكْتُبُونَ الْكِتَابَ بِأَيْدِيهِمْ ثُمَّ يَقُولُونَ هَذَا مِنْ عِنْدِ اللَّهِ لِيَشْتَرُوا بِهِ ثَمَنًا قَلِيلًا فَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا كَتَبَتْ أَيْدِيهِمْ وَوَيْلٌ لَهُمْ مِمَّا يَكْسِبُونَ (79) البقرة

“অতএব, ধ্বংস ওদের কপালে যারা নিজ হাতে কিতাব লেখে, অতঃপর বলে, ‘এ (কিতাব) আল্লাহর পক্ষ থেকে (নাযিলকৃত)’- যাতে এর বিনিময়ে সামান্য মূল্য লাভ করতে পারে। অতএব, ওদের কপালে ধ্বংস- স্বীয় হাতের এ লেখার কারণে এবং ধ্বংস নিজেদের এ উপার্জনের কারণে।” –সূরা বাকারা (২):৭৯

وَإِنَّ مِنْهُمْ لَفَرِيقًا يَلْوُونَ أَلْسِنَتَهُمْ بِالْكِتَابِ لِتَحْسَبُوهُ مِنَ الْكِتَابِ وَمَا هُوَ مِنَ الْكِتَابِ وَيَقُولُونَ هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَمَا هُوَ مِنْ عِنْدِ اللَّهِ وَيَقُولُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ وَهُمْ يَعْلَمُونَ (78) آل عمران

“নিঃসন্দেহে তাদের একটা দল এমন রয়েছে যারা নিজেদের জিহ্বা মোচড়িয়ে কিতাব পড়ে, যাতে তোমরা তাকে কিতাবের অংশ মনে কর, অথচ তা কিতাবের অংশ নয়। ওরা বলে, ‘এ আল্লাহর নিকট থেকে (নাযিলকৃত)’- অথচ তা আল্লাহর নিকট থেকে (নাযিলকৃত) নয়। আর এরা জেনেশুনে আল্লাহর উপর মিথ্যা আরোপ করে।” –সূরা আলে ইমরান (৩):৭৮

 

আল্লাহ তাআলা তাদের কয়েক ধরনের অপব্যাখ্যার বিবরণ দিয়েছেন:

– কিতাবের শব্দ আপন জায়গায় রেখে উদ্দেশ্য ও মর্ম বিকৃত করা।

– নিজে থেকে কিতাব লিখে আল্লাহর নাযিলকৃত বলে চালিয়ে দেয়া।

– কিতাব পড়ার সময় বাড়িয়ে কমিয়ে নিজেদের মতলবমতো পড়া যাতে শ্রোতারা এ বাড়ানো কমোনো অংশটাকেও মূল কিতাবের অংশ মনে করে।

– এছাড়াও আরও বিভিন্ন ধরনের মিথ্যা দ্বীনের নামে চালিয়ে দেয়া।

এসব কিছুর উদ্দেশ্য দুনিয়া উপার্জন করা, যেমনটা আল্লাহ তাআলা জানিয়েছেন।

আজ যারা কুরআন হাদিস ও পূর্ববর্তী আলেমদের কিতাবাদির মনমতো ব্যাখ্যা করছে, এদের সাথে তাদের কতই না মিল! যারা কিতালের অর্থ দাওয়াত করছেন, জিহাদের অর্থ তাবলিগ করছেন, গণতন্ত্রকে জিহাদ বলছেন, নফসের জিহাদকেই আসল জিহাদ বলে কিতাল পরিত্যাগ করছেন, যিকিরকে জিহাদের চেয়ে শ্রেষ্ট বলে জিহাদ পরিত্যাগ করছেন, সালাফের বক্তব্যে ‘আহলে হাদিস’ ইত্যাদি পরিভাষা দ্বারা নিজেদের দলকে উদ্দেশ্য নিচ্ছেন- তাদের সাথে এদের কতই না মিল!

তদ্রূপ, যারা ইমামুল মুসলিমিন, দারুল ইসলাম, দারুল হারব, উলুল আমর ইত্যাদি পরিভাষার আজগুবি মতলব বের করছেন, জিহাদের জন্য কুরআন-সুন্নাহ বহির্ভূত হাজারো শর্ত জুড়ে দিচ্ছেন; মুজাহিদদেরকে খাওয়ারেজ, তাকফিরি, উগ্রপন্থী ইত্যাদি বিশেষণ দিচ্ছেন, গাজওয়ায়ে হিন্দের কিংবা কাশ্মির জিহাদের প্রস্তুতি নিলে হারাম হবে বলছেন তাদের সাথে এদের কতই না মিল!

 

যে বিষয়ে ইলম নেই সে বিষয়েও ফতোয়া দেয়া

এ বালা বর্তমানে মহামারি আকার ধারণ করেছে। যে কেউ যেকোনো বিষয়ে ফতোয়া দিয়ে দিচ্ছে। বিশেষত জিহাদ কিতালের ব্যাপারে। যারা জীবনে একটি বারের জন্যও জিহাদের অধ্যায় পড়ে দেখেননি, তারাই আজ জিহাদ নিয়ে উল্টো-সিধে ফতোয়া দিয়ে জাতিকে বিভ্রান্ত করছেন। এ সিফাত ছিল ইহুদিদের- যে বিষয়ে ইলম নেই সে বিষয়েও কথা বলা।

ইহুদিরা দাবি করতো হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম ইহুদি ছিলেন আর তারা তাঁরই উত্তরসূরি। খ্রিস্টানরাও অনুরূপ দাবি করতো। অথচ ইহুদি জাতির সূচনা হয় হযরত ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের অনেক পরে তার বংশধরদের থেকে। তাহলে তিনি কীভাবে ইহুদি হবেন? আর খ্রিস্টান জাতির সূচনা তো হযরত মূসা আলাইহিস সালামেরও অনেক পরে। তাহলে ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম কীভাবে খ্রিস্টান হবেন? আল্লাহ তাআলা তাদের এহেন স্বভাবের সমালোচনা করে ইরশাদ করেন,

يَاأَهْلَ الْكِتَابِ لِمَ تُحَاجُّونَ فِي إِبْرَاهِيمَ وَمَا أُنْزِلَتِ التَّوْرَاةُ وَالْإِنْجِيلُ إِلَّا مِنْ بَعْدِهِ أَفَلَا تَعْقِلُونَ (65) هَاأَنْتُمْ هَؤُلَاءِ حَاجَجْتُمْ فِيمَا لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ فَلِمَ تُحَاجُّونَ فِيمَا لَيْسَ لَكُمْ بِهِ عِلْمٌ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ (66) مَا كَانَ إِبْرَاهِيمُ يَهُودِيًّا وَلَا نَصْرَانِيًّا وَلَكِنْ كَانَ حَنِيفًا مُسْلِمًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ (67) -آل عمران

“হে কিতাবিরা! তোমরা ইব্রাহিম সম্বন্ধে কেন বিতর্ক করছো, অথচ তাওরাত-ইনজিল তো নাযিল হয়েছিল তার পরে? তোমাদের কি বুদ্ধিশুদ্ধি নেই? দেখ, তোমরাই ওই সব লোক যে, (ইতিপূর্বে) তোমরা এমন বিষয়ে বিতর্ক করেছ যে বিষয়ে তোমাদের কিঞ্চিত জ্ঞান ছিল। এখন কেন তোমরা এমন বিষয়ে বিতর্ক করছ যে বিষয়ে তোমাদের মোটেই জ্ঞান নেই? প্রকৃতপক্ষে আল্লাহই জানেন আর তোমরা জানো না। ইব্রাহিম ইহুদিও ছিলেন না খ্রিস্টানও ছিলেন না, বরং তিনি ছিলেন হানিফ (সকল মিথ্যা ধর্ম-বিমুখ) ও মুসলিম (আল্লাহর অনুগত)। তিনি মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন না।” –সূরা আলে ইমরান (৩):৬৫-৬৭

ইমাম তাবারি রহ. হযরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন,

اجتمعت نصارى نجران وأحبارُ يهود عند رسول الله صلى الله عليه وسلم فتنازعوا عنده، فقالت الأحبار: ما كان إبراهيمُ إلا يهوديًّا، وقالت النصارى: ما كان إبراهيم إلا نصرانيًّا! فأنزل الله عز وجل فيهم:”يا أهل الكتاب الخ – جامع البيان في تأويل القرآن، ج: 6، ص: 490، ط. مؤسسة الرسالة، ت: أحمد شاكر

“নাজরানের খ্রিস্টানরা এবং ইহুদি আলেমরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর কাছে একত্র হয়ে বিবাদ শুরু করল। ইহুদি আলেমরা বলল, ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম ইহুদি বৈ কিছু ছিলেন না। খ্রিস্টানরা বলল, ইব্রাহিম আলাইহিস সালাম খ্রিস্টান বৈ কিছু ছিলেন না। তখন আল্লাহ তাআলা এদের ব্যাপারে এ আয়াত নাযিল করেন, ‘হে কিতাবিরা…’।” –তাফসিরে তাবারি:৬/৪৯০

 

মুহকাম-স্পষ্ট আয়াত, হাদিস ও বক্তব্য বাদ দিয়ে মুতাশাবিহ-অস্পষ্ট আয়াত, হাদিস ও বক্তব্য নিয়ে টানাটানি করা

এ ধরনের বক্র প্রকৃতির লোকদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা নিম্নোক্ত আয়াতে সতর্ক করেছেন,

هُوَ الَّذِي أَنْزَلَ عَلَيْكَ الْكِتَابَ مِنْهُ آيَاتٌ مُحْكَمَاتٌ هُنَّ أُمُّ الْكِتَابِ وَأُخَرُ مُتَشَابِهَاتٌ فَأَمَّا الَّذِينَ فِي قُلُوبِهِمْ زَيْغٌ فَيَتَّبِعُونَ مَا تَشَابَهَ مِنْهُ ابْتِغَاءَ الْفِتْنَةِ وَابْتِغَاءَ تَأْوِيلِهِ –

“তিনিই সেই মহান সত্তা যিনি আপনার উপর এই কিতাব নাযিল করেছেন, (যেখানে রয়েছে দু’ধরণের আয়াত) এর কিছু আয়াত হচ্ছে মুহকাম (সুস্পষ্ট দ্বর্থ্যহীন) এবং এগুলোই হচ্ছে কিতাবের মূল অংশ; আর কিছু আয়াত আছে মুতাশাবিহ (রূপক)। যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে, তারা (সমাজে) ফিতনা বিস্তারের এবং আল্লাহর কিতাবের অপব্যাখ্যার উদ্দেশ্যে কিতাবের মুতাশাবিহ আয়াতগুলোর পেছনে পড়ে।”–সূরা আলে ইমরান (৩) : ৭

 

হাফেয ইবনে কাসির রহ. (৭৭৪ হি.) বলেন,

}فأما الذين في قلوبهم زيغ} أي: ضلال وخروج عن الحق إلى الباطل {فيتبعون ما تشابه منه} أي: إنما يأخذون منه بالمتشابه الذي يمكنهم أن يحرفوه إلى مقاصدهم الفاسدة، وينزلوه عليها، لاحتمال لفظه لما يصرفونه فأما المحكم فلا نصيب لهم فيه؛ لأنه دامغ لهم وحجة عليهم، ولهذا قال: {ابتغاء الفتنة} أي: الإضلال لأتباعهم، إيهاما لهم أنهم يحتجون على بدعتهم بالقرآن. –تفسير ابن كثير، ج: 2، ص: 8؛ ط. دار طيبة للنشر والتوزيع

“‘যাদের অন্তরে বক্রতা রয়েছে’ অর্থাৎ গোমরাহি রয়েছে এবং হক ছেড়ে বাতিলের দিকে চলে যাওয়ার প্রবণতা রয়েছে ‘তারা কিতাবের মুতাশাবিহ আয়াতগুলোর পেছনে পড়ে’- অর্থাৎ তারা কেবল মুতাশাবিহ আয়াতগুলোকে ধরে, যেগুলোর অপব্যাখ্যা করে নিজের বদ মতলবের জন্য কাজে লাগানো সম্ভবপর হয়। কারণ, সেগুলোর (বাহ্যিক) শব্দ এমন হয়ে থাকে যে, তাতে (অপব্যাখ্যা করলে) তাদের বদ মতলবের (উপর ফিট করার) সুযোগও থাকে। পক্ষান্তরে, মুহকাম আয়াতে এ ধরণের কোন সুযোগ থাকে না। কেননা, সেগুলো তাদের মাথা ভেঙে দেয়ার মতো এবং তাদের বিপক্ষে দলীল। এ কারণেই আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘ফিতনা বিস্তারের উদ্দেশ্যে’ অর্থাৎ তাদের অনুসারীদের এভাবে দেখিয়ে গোমরাহ করার উদ্দেশ্যে যে, তারা দেখাচ্ছে তাদের বিদআতের পক্ষে তারা কুরআন দিয়ে দলীল দিচ্ছে।”-তাফসিরে ইবনে কাসির : ২/৮

لَكُمْ دِينُكُمْ وَلِيَ دِينِ- لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ

এ জাতীয় আয়াত দিয়ে যারা জিহাদ হারাম ফতোয়া দিয়ে দিচ্ছেন আর কুরআনে কারীম অসংখ্য সুস্পষ্ট আয়াত, হাদিসের বিশাল ভাণ্ডার, রাসূলুল্লাহ ﷺ ও সাহাবায়ে কেরামের সিরাত, হাজারো ফিকহের কিতাবের দ্ব্যর্থহীন সিদ্ধান্ত সব কিছু বাদ দিয়ে দিচ্ছেন তাদের অন্তরে বক্রতা নেই কীভাবে বলা যায়? আল্লাহ তাআলা যেন আয়াতে এসব লোকের কথাই বলছেন।

 

নাহি আনিল মুনকার তথা অন্যায় প্রতিহত না করা

অন্যায় দেখলে সামর্থ্যানুযায়ী প্রতিবাদ করা ও প্রতিহত করা ফরয। বিশেষত উলামাদের দায়িত্ব এ ব্যাপারে বেশি। আর যাদের রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা রয়েছে এবং এ কাজের জন্যই তারা নিয়োজিত তাদের দায়িত্ব আরও বেশি। যারা অন্যায় থেকে বিরত না হবে তাদের শাস্তি দিতে হবে। প্রয়োজনে বয়কট করতে হবে। সঙ্গ ত্যাগ করতে হবে। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَإِذَا رَأَيْتَ الَّذِينَ يَخُوضُونَ فِي آيَاتِنَا فَأَعْرِضْ عَنْهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ وَإِمَّا يُنْسِيَنَّكَ الشَّيْطَانُ فَلَا تَقْعُدْ بَعْدَ الذِّكْرَى مَعَ الْقَوْمِ الظَّالِمِينَ –

“যারা আমার আয়াতসমূহের সমালোচনায় রত থাকে তাদেরকে যখন দেখবে তাদের থেকে দূরে সরে যাবে, যতক্ষণ না তারা অন্য বিষয়ে প্রবৃত্ত হয়। যদি শয়তান কখনও তোমাকে এটা ভুলিয়ে দেয় তাহলে স্মরণ হওয়ার পর আর জালিম লোকদের সাথে বসবে না।” –সূরা আনআম (৬):৬৮

অন্যত্র ইরশাদ করেন,

وَقَدْ نَزَّلَ عَلَيْكُمْ فِي الْكِتَابِ أَنْ إِذَا سَمِعْتُمْ آيَاتِ اللَّهِ يُكْفَرُ بِهَا وَيُسْتَهْزَأُ بِهَا فَلَا تَقْعُدُوا مَعَهُمْ حَتَّى يَخُوضُوا فِي حَدِيثٍ غَيْرِهِ إِنَّكُمْ إِذًا مِثْلُهُمْ إِنَّ اللَّهَ جَامِعُ الْمُنَافِقِينَ وَالْكَافِرِينَ فِي جَهَنَّمَ جَمِيعًا –

“তিনি ইতিপূর্বেও কিতাবে তোমাদের প্রতি এই নির্দেশ নাযিল করেছেন যে, যখন তোমরা শুনবে আল্লাহর আয়াতসমূহ অস্বীকার করা হচ্ছে ও তার সাথে বিদ্রূপ করা হচ্ছে তখন তোমরা তাদের সাথে বসবে না, যে পর্যন্ত না তারা অন্য কোনো প্রসঙ্গে লিপ্ত হবে। অন্যথায় তোমরাও তাদের মতো হয়ে যাবে। নিশ্চিত জেনো, আল্লাহ সকল মুনাফিক ও কাফিরকে জাহান্নামে একত্র করবেন।” –সূরা নিসা (৪):১৪০

বনি ইসরাঈল ছিল এর ব্যতিক্রম। মুখে মুখে কিছু প্রতিবাদ করলেও পাপাচারির সাথে মাখামাখি আর দহরম মহরম সম্পর্ক আগের মতোই থাকত। এভাবে পাপাচারে গোটা সমাজ ভরে গেল, কিছুই প্রতিহত করা হলো না। আল্লাহ তাআলা এদের প্রতি অসন্তুষ্ট হলেন। এদের উপর আল্লাহর লা’নত পতিত হল। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

}لُعِنَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَلَى لِسَانِ دَاوُودَ وَعِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ ذَلِكَ بِمَا عَصَوْا وَكَانُوا يَعْتَدُونَ ◌ كَانُوا لَا يَتَنَاهَوْنَ عَنْ مُنْكَرٍ فَعَلُوهُ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَفْعَلُونَ} المائدة

“বনি ইসরাঈলের মধ্যে যারা কুফরি করেছে, তাদের উপর দাঊদ ও ঈসা ইবনে মারয়ামের যবানিতে লা’নত বর্ষিত হয়েছে। এটা এ জন্য যে, তারা নাফরমানি করেছিল এবং তারা সীমালঙ্ঘন করতো। তারা যেসব গর্হিত কাজ করতো, তা থেকে একে অপরকে বারণ করতে না। (বারণ না করে) কত নিকৃষ্ট কাজই না তারা করতো।” –সূরা মায়েদা (৫):৭৮-৭৯

বারণ না করাকে আল্লাহ তাআলা বড়ই নিকৃষ্ট আখ্যা দিয়েছেন।

মুসনাদে আহমাদে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন,

لما وقعت بنو إسرائيل في المعاصي، نهتهم علماؤهم، فلم ينتهوا، فجالسوهم في مجالسهم – قال يزيد: أحسبه قال: وأسواقهم – وواكلوهم وشاربوهم، فضرب الله قلوب بعضهم ببعض، ولعنهم على لسان داود، وعيسى ابن مريم -مسند الإمام أحمد، رقم: 3713؛ ط. الرسالة، ت: شعيب الأرنؤوط، عادل مرشد، وآخرون، قالوا فى التحقيق: إسناده ضعيف لانقطاعه، أبو عبيدة -وهو ابن عبد الله بن مسعود- لم يسمع من أبيه، وشريك بن عبد الله -وهو النخعي القاضي- سيىء الحفظ، وبقية رجاله ثقات. يزيد: هو ابن هارون. اهـ

“বনি ইসরাঈল যখন নাফরমানিতে লিপ্ত হল, তাদের উলামারা তাদের বারণ করল, কিন্তু তারা বিরত হল না। এরপরও মজলিসে, বাজারে তারা তাদের সাথে একসাথে উঠা-বসা করত, একসাথে খাওয়া-পরা করত। তখন আল্লাহ তাআলা একের অন্তর অন্যের মতো করে দিলেন এবং দাউদ ও ঈসা ইবনে মারইয়াম – আলাইহিমুস সালাম- এর যবানিতে তাদের উপর লা’নত বর্ষণ করলেন।” –মুসনাদে আহমাদ:৩৭১৩

অর্থাৎ পাপাচারীদের দমন ও বয়কট না করার কারণে অবশেষে উলামাদের অন্তরও বিকৃত হয়ে গেল।

হাসান বসরি রহ. যথার্থই বলেছেন,

عقوبة العالم موت قلبه -جامع بيان العلم وفضله- ابن عبد البر ، ج: ، ص: ، رقم: ، ط. دار ابن الجوزي

“আলেমের শাস্তি হল অন্তর মরে যাওয়া।” –জামিউ বায়ানিল ইলম (ইবনে আব্দুল বার) : ১/৬৬৬

 

অন্যায় প্রতিহত না করার কারণে আল্লাহ তাআলা তাদের উলামাদেরকে কঠিন ধমকি দিয়ে বলেন,

لَوْلَا يَنْهَاهُمُ الرَّبَّانِيُّونَ وَالْأَحْبَارُ عَنْ قَوْلِهِمُ الْإِثْمَ وَأَكْلِهِمُ السُّحْتَ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَصْنَعُونَ (63) المائدة

“রাব্বানি ও আহবাররা কেন তাদের নিষেধ করত না পাপের কথা বলা এবং হারাম খাওয়া থেকে? (নিষেধ না করে) কত নিকৃষ্ট কাজই না তারা করত।” –সূরা মায়েদা (৫) : ৬৩

 

ইবনে কাসির রহ. বলেন,

والربانيون وهم: العلماء العمال أرباب الولايات عليهم، والأحبار: وهم العلماء فقط. –تفسير القرآن العظيم ، ج: 3، ص: 144؛ ط. دار طيبة للنشر والتوزيع

“রাব্বানি হল পদধারী নেতৃত্বশীল উলামা আর আহবার হল সাধারণ উলামা (যাদের রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্ব নেই)।” –তাফসিরে ইবনে কাসির : ৩/১৪৪

অর্থাৎ সাধারণ উলামারা তো করতোই না, রাষ্ট্রীয়ভাবে যাদের অন্যায় প্রতিহত করার ক্ষমতা ছিল তারাও করতো না।

 

ইমাম ইবনে জারির রহ. বলেন,

وكان العلماء يقولون: ما في القرآن آية أشدَّ توبيخًا للعلماء من هذه الآية، ولا أخوفَ عليهم منها. … عن الضحاك بن مزاحم في قوله:”لولا

ينهاهم الربانيون والأحبار عن قولهم الإثم” قال: ما في القرآن آية، أخوف عندي منها: أَنَّا لا ننهى. … عن ابن عباس قال: ما في القرآن آية أشدَّ توبيخًا من هذه الآية: (لولا ينهاهم الربانيون والأحبار عن قولهم الإثم وأكلهم السحت لبئس ما كانوا يعملون) –جامع البيان في تأويل القرآن، ج: 10، ص: 449؛ ط. مؤسسة الرسالة، ت: أحمد شاكر

“উলামায়ে কেরাম বলতেন, ‘কুরআনের অন্য কোনো আয়াতে এত শক্ত ধমকি উলামাদের দেয়া হয়নি, এর চেয়ে ভীতিও অন্য কোনো আয়াতে প্রদর্শন করা হয়নি’।

যাহহাক রহ. বলেন, ‘আমার মতে কুরআনে কারীমে এ আয়াতের চেয়ে অধিক ভীতি প্রদর্শনকারী কোনো আয়াত নেই; যদি আমরা অন্যায়ে বাধা না দিই’।

হযরত ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ‘এ আয়াতের চেয়ে শক্ত ধমকি অন্য কোনো আয়াতে দেয়া হয়নি।” -তাফসিরে তাবারি : ১০/৪৪৯

আজ যখন গোটা সমাজ শিরক-কুফর, অন্যায়-অবিচার ও জুলুম-অত্যাচারের গহীন অন্ধকারে নিমজ্জিত তখন যারা শুধু দরস-তাদরিস আর মসজিদ-খানকাহ নিয়ে পড়ে আছেন আর বলছেন ‘ওসব রাষ্ট্রের দায়িত্ব’- আল্লাহ তাআলার এ ধমকিটা তাদের উপর পড়ে কি না একটু ফিকির করা উচিৎ। আমাদের অন্তরও বিকৃত হয়ে যাচ্ছে কি না, আমাদের উপরও লা’নত পতিত হচ্ছে কি না, আমরাও আল্লাহর রহমত থেকে দূরে সরে যাচ্ছি কি না- একটু ফিকির করা উচিৎ। আর যারা ফাসেক-ফুজ্জার, তাগুত-মুরতাদদের সাথে সখ্য গড়ে তুলেছেন তাদের কথা তো বলাই বাহুল্য।

 

শক্তের ভক্ত নরমের যম: আল্লাহর বিধান প্রয়োগে স্বজনপ্রীতি

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,

إنما أهلك الذين قبلكم أنهم كانوا إذا سرق فيهم الشريف تركوه وإذا سرق فيهم الضعيف أقاموا عليه الحد -صحيح البخاري، رقم: 3288؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا

“তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতদের তো এ কর্মই ধ্বংস করেছে যে, সম্ভ্রান্ত লোক চুরি করলে ছেড়ে দিত, আর দুর্বল লোক চুরি করলে হদ কায়েম করত”-সহীহ বুখারি:৩২৮৮

 

অন্য হাদিসে এসেছে,

إن بني إسرائيل كان إذا سرق فيهم الشريف تركوه وإذا سرق فيهم الضعيف قطعوه -صحيح البخاري، رقم: 3526؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا

“বনি ইসরাঈলের অভ্যাস ছিল, সম্ভ্রান্ত কেউ চুরি করলে তাকে ছেড়ে দিত আর দুর্বল কেউ চুরি করলে তার হাত কেটে দিত।” –সহীহ বুখারি:৩৫২৬

অন্য হাদিসে ইহুদি আলেমের স্বীকারোক্তি এসেছে,

كثر في أشرافنا، فكنا إذا أخذنا الشريف تركناه، وإذا أخذنا الضعيف أقمنا عليه الحد -صحيح مسلم، رقم: 4536؛ ط. دار الجيل بيروت + دار الأفاق الجديدة ـ بيروت

“আমাদের সম্ভ্রান্তদের মাঝে যিনা খুব বেড়ে গেল। আমরা কোনো সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে ধরে ফেললে ছেড়ে দিতাম। আর কোনো দুর্বল লোককে ধরে ফেললে হদ কায়েম করতাম।” -সহীহ মুসলিম : ৪৫৩৬

এভাবে একদিকে তারা নাহি আনিল মুনকার ছেড়ে দিল, অন্যদিকে অপরাধীর উপর আল্লাহর বিধান প্রয়োগও বন্ধ করে দিতে লাগল। অবশেষে সুবিধামাফিক আল্লাহর বিধান পরিবর্তন করে কুফরি বিধান জারি করে দিল। সামনের পয়েন্টে ইনশাআল্লাহ সে আলোচনা আসছে।

আজ যারা মুজাহিদদের সামান্য দোষত্রুটি পেলেই সমালোচনার বাজার গরম করেন, অথচ তাগুত মুরতাদরা প্রতিনিয়ত হাজারো লাখো ফিসক-কুফর করে যাচ্ছে সেগুলোতে মুখে কুলুপ এটে রাখেন, তাদের একটু ভাবা উচিৎ- আমরা ইহুদি স্বভাবের হয়ে যাচ্ছি না তো? অন্যায়ের প্রতিবাদই যদি উদ্দেশ্য তাহলে এখানে আমরা চুপ কেন?

মুজাহিদরা বেসামরিক কুফফারদের উপর কোনো হামলা করলে আমাদের কেউ কেউ তীব্র নিন্দা জানান, পত্রিকায় বিবৃতি দেন অথচ কাফের মুশরেকদের বিমানগুলো যখন নারী-শিশু-বৃদ্ধের কোনো পার্থক্য না করে মুসলিম জনসাধারণের উপর টনকে টন বোমা ফেলে তখন তারা কোনও কথা বলেন না।

কাফের-মুশরিক এবং মুরতাদদের বন্দীশালাগুলোতে আমাদের হাজারো লাখো ভাই-বোন ধুকে ধুকে মরছেন অথচ এ সব ব্যাপারে তারা কোনও কথা বলেন না। তাদের একটু ভাবা উচিত, আমরা ইহুদি স্বভাবের হয়ে যাচ্ছি না তো?

 

আল্লাহর বিধান পরিবর্তন করে কুফরি বিধান প্রবর্তন

ইহুদি আলেমরা যখন সমাজের সম্ভ্রান্ত লোকদের সাথে স্বজনপ্রীতি করে জনসাধারণের সমালোচনার সম্মুখীন হল, তখন তারা ব্যভিচারের শাস্তিই পাল্টে ফেলল। রজম তথা পাথর নিক্ষেপ করে হত্যা করার পরিবর্তে ভিন্ন শাস্তি প্রবর্তন করল। যেন ধনী-গরিব সবার উপরই প্রয়োগ করা যায়। সমালোচনার সম্মুখীন না হতে হয়। এভাবে তারা আল্লাহর আইন বাদ দিয়ে কুফরি আইন প্রবর্তন করল। সহীহ মুসলিমে এসেছে,

عن البراء بن عازب، قال: مر على النبي صلى الله عليه وسلم بيهودي محمما مجلودا، فدعاهم صلى الله عليه وسلم، فقال: «هكذا تجدون حد الزاني في كتابكم؟»، قالوا: نعم، فدعا رجلا من علمائهم، فقال: «أنشدك بالله الذي أنزل التوراة على موسى، أهكذا تجدون حد الزاني في كتابكم» قال: لا، ولولا أنك نشدتني بهذا لم أخبرك، نجده الرجم، ولكنه كثر في أشرافنا، فكنا إذا أخذنا الشريف تركناه، وإذا أخذنا الضعيف أقمنا عليه الحد، قلنا: تعالوا فلنجتمع على شيء نقيمه على الشريف والوضيع، فجعلنا التحميم، والجلد مكان الرجم -صحيح مسلم، رقم: 4536؛ ط. دار الجيل بيروت + دار الأفاق الجديدة ـ بيروت

“হযরত বারা ইবনে আযিব রাদি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ইহুদির মুখে চুনকালী মেখে কালো করে বেত্রাঘাত করতে করতে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর সামনে দিয়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল। তা দেখে রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদের জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমরা কি তোমাদের কিতাবে যিনার শাস্তি এমনই দেখতে পাও’? তারা উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ’। তখন তিনি তাদের আলেমদের একজনকে ডেকে কসম দিলেন, ‘ওই আল্লাহর কসম দিয়ে তোমাকে জিজ্ঞেস করছি যিনি মূসা আলাইহিস সালামের উপর তাওরাত নাযিল করেছেন, তোমরা কি তোমাদের কিতাবে যিনার শাস্তি এমনি দেখতে পাও’? সে উত্তর দিল, ‘না’। আপনি যদি আমাকে কসম না দিতেন তাহলে এই সত্য সংবাদটা আমি দিতাম না। আমাদের কিতাবে যিনার শাস্তি হল রজম (প্রস্তারাঘাতে হত্যা)। কিন্তু আমাদের সম্ভ্রান্তদের মাঝে যিনা খুব বেড়ে গেল। আমরা কোন সম্ভ্রান্ত ব্যক্তিকে ধরে ফেললে ছেড়ে দিতাম। আর কোন দুর্বল লোককে ধরে ফেললে হদ কায়েম করতাম। এরপর আমরা প্রস্তাব দিলাম, চল আমরা সকলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে যিনার এমন কোনো শাস্তি নির্ধারণ করি যা সম্ভ্রান্ত-নিম্নশ্রেণী সকলের উপরই প্রয়োগ করতে পারবো। অতঃপর আমরা রজমের বদলে চুনকালী মেখে বেত্রাঘাত করাকে শাস্তিরূপে নির্ধারণ করলাম।” -সহীহ মুসলিম : ৪৫৩৬

সহীহ মুসলিমের উক্ত হাদিসের শেষে বর্ণনাকারি সাহাবি বলেন, এদের ব্যাপারেই এ আয়াত নাযিল হয়,

وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ

“আল্লাহ তাআলা যে বিধান নাযিল করেছেন যারা সে অনুযায়ী বিচার ফায়সালা করে না তারাই (প্রকৃত) কাফের।” –সূরা মায়েদা (৫) : ৪৪

আজ আমরা যারা কুফরি শাসনের প্রবর্তক তাগুতদের উলুল আমর ফতোয়া দিচ্ছি, তাদের আনুগত্য করাকে ফরয বলছি, তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করাকে হারাম বলছি, রাষ্ট্রীয় আইন মান্য করাকে আবশ্যক বলছি, তাদের উচিৎ নিজেদের অবস্থা নিয়ে একটু গভীরভাবে চিন্তা করা, আমরাও ওই সব সুবিধাবাদি ইহুদিদের মতো হয়ে যাচ্ছি না তো, যারা কুফরি বিধানগুলোকে পরিবর্তন করার চেষ্টা না করে ওগুলোরই আনুগত্য করে যেত কিংবা অন্তত চুপ থাকত।

 

দুনিয়ার স্বার্থে জালিম ও তাগুত শাসকের পক্ষ নেয়া

বদর যুদ্ধের পর কা’ব বিন আশরাফ মক্কায় গিয়ে আবু সুফিয়ানকে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বিরুদ্ধে যুদ্ধে উৎসাহ দেয় এবং বলে, তারা যে শিরকি ধর্মে আছে তা নাকি রাসূলুল্লাহ ﷺ এর আনীত ধর্মের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। এতে মক্কাবাসী উদ্বুদ্ধ হয় এবং খন্দকের যুদ্ধের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়। আল্লাহ তাআলা এদের এ দুষ্কৃতির কথা তুলে ধরে বলেন,

أَلَمْ تَرَ إِلَى الَّذِينَ أُوتُوا نَصِيبًا مِنَ الْكِتَابِ يُؤْمِنُونَ بِالْجِبْتِ وَالطَّاغُوتِ وَيَقُولُونَ لِلَّذِينَ كَفَرُوا هَؤُلَاءِ أَهْدَى مِنَ الَّذِينَ آمَنُوا سَبِيلًا

“আপনি কি ওদের দেখেন না যাদের কিতাবের একটা অংশ (অর্থাৎ তাওরাতের কিছু জ্ঞান) দেয়া হয়েছে? ওরা মূর্তি ও তাগুতকে সমর্থন করে এবং (মূর্তিপূজারি) কাফেরদের সম্বন্ধে বলে, মুমিনদের অপেক্ষা ওরাই না’কি অধিক সরল পথে আছে।” –সূরা নিসা (৪):৫১

ইমাম তাবারি রহ. ইকরিমা রহ. এর সূত্রে ইবনে আব্বাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন,

لما قدم كعب بن الأشرف مكة، قالت له قريش: أنت حَبْر أهل المدينة وسيدهم؟ قال: نعم. قالوا: ألا ترى إلى هذا الصُّنبور المنبتر من قومه، يزعم أنه خير منا، ونحن أهل الحجيج وأهل السِّدانة وأهل السِّقاية؟ قال: أنتم خير منه. قال: فأنزلت: (إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الأَبْتَرُ) [سورة الكوثر: 3] ، وأنزلت:”ألم تر إلى الذين أوتوا نصيبًا من الكتاب يؤمنون بالجبت والطاغوت” إلى قوله:”فلن تجد له نصيرًا”. –جامع البيان في تأويل القرآن، ج: 8، ص: 466-467؛ ط. مؤسسة الرسالة، ت: أحمد شاكر

“কা’ব বিন আশরাফ মক্কায় আসলে কুরাইশরা জিজ্ঞেস করলো, ‘তুমি কি মদীনার বড় আলেম এবং তাদের সর্দার’? সে উত্তর দিল, ‘হ্যাঁ’। তারা বলল, ‘এই নির্বংশ পরগাছাটাকে দেখ না (নাউজুবিল্লাহ! রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে উদ্দেশ্য নিচ্ছে) সে দাবি করছে, সে নাকি আমাদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ? অথচ হাজিদের দেখাশুনার মহান দায়িত্ব আমরা পালন করি, পবিত্র কা’বার রক্ষণাবেক্ষণ এবং হাজিদের পানি পান করানোর সুমহান কর্মও আমরাই আঞ্জাম দিই’! কা’ব বিন আশরাফ উত্তরে বলল, ‘বরং তোমরাই তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ’। তখন নাযিল হয়, إِنَّ شَانِئَكَ هُوَ الأَبْترএবং ألم تر إلى الذين …।” –তাফসিরে তাবারি : ৮/৪৬৬-৪৬৭

হাফেয ইবনে কাসির রহ. বলেন,

وإنما قالوا لهم ذلك ليستميلوهم إلى نصرتهم –تفسير القرآن العظيم ، ج: 2، ص: 334؛ ط. دار طيبة للنشر والتوزيع

“এ কথা বলেছে শুধু তাদের থেকে সাহায্য লাভের জন্য।” –তাফসিরে ইবনে কাসির : ২/৩৩৪

জাহিলি যামানায় মদীনায় ইহুদিদের নিজস্ব কোনো ক্ষমতা ছিল না। তারা মদিনার স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে মিলে মিশে থাকত, যাদের অধিকাংশই পরবর্তীতে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর উপর ঈমান নিয়ে আনসার হয়ে যান। এরপর ইহুদিরা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বিরুদ্ধে মক্কাবাসীর সাথে লেজুর করতে চেষ্টা করল। এ উদ্দেশ্যে জেনেশুনে সত্য গোপন করল। জালেম ও কাফের মক্কাবাসীর পক্ষ নিল। তাদের বাতিল দ্বীন ধর্মকে রাসূল ﷺ এর ধর্মের চেয়ে এবং তাদেরকে মুসলমানদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ বলে দিল। বলে দিল, মুহাম্মাদ ﷺ বাতিলের উপর আছে, তারাই হকের উপর আছে। এভাবে গোমরাহ মক্কাবাসীর গোমরাহি আরও বৃদ্ধি করল। আর এ কাজটি করেছে তাদের সবচেয়ে বড় আলেম লোকটি।

আজ যেসব আলেম তাগুতদের সাথে লেজুরবৃত্তি করছেন, নিজেদের দল কিংবা প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখার জন্য এবং শাসকদের সুদৃষ্টি লাভের জন্য তাদের শাসনের বৈধতা দিচ্ছেন; বিপরীতে মুজাহিদদের খারিজি, তাকফিরি, উগ্রপন্থী, জযবাতি, চরিত্রহীন ইত্যাদি বলে গালিগালাজ করছেন, অপবাদ দিচ্ছেন- কা’ব বিন আশরাফের সাথে তাদের কতই না মিল! এসব আলেমের এসব ফতোয়ার কারণেই তাগুত শাসকরা এখনও ক্ষমতায় টিকে আছে। এদের ফতোয়ার কারণেই তাগুতরা নিজেদের হক মনে করছে আর মুজাহিদদের মনে করছে জঙ্গি। ইয়া আল্লাহ! তুমি হিফাজত কর। এরা যদি সঠিক ফতোয়া দিত তাহলে জাতি আজ বিভ্রান্ত হতো না।

 

 

 

উলামায়ে হক্কানি ও উলামায়ে সু : পরিচিতি ও  প্রকৃতি

পর্ব- ৩

মাওলানা আবদুল্লাহ রাশেদ (হাফিযাহুল্লাহ)

 

বালআম বিন বাউরা: মুজাহিদ বিরোধী কূট-কৌশলের পথিকৃৎ

বালআম বিন বাউরার কথা আমরা সকলে জানি। উলামায়ে সূ-র আলোচনা আসলেই তার কথা সবার আগে আসে। উলামায়ে সূ-দেরকে তার মানস সন্তান মনে করা হয়। তার ব্যাপারেই এ আয়াতে কারীম নাযিল হয়,

وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ الَّذِي آتَيْنَاهُ آيَاتِنَا فَانْسَلَخَ مِنْهَا فَأَتْبَعَهُ الشَّيْطَانُ فَكَانَ مِنَ الْغَاوِينَ (175) وَلَوْ شِئْنَا لَرَفَعْنَاهُ بِهَا وَلَكِنَّهُ أَخْلَدَ إِلَى الْأَرْضِ وَاتَّبَعَ هَوَاهُ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ الْكَلْبِ إِنْ تَحْمِلْ عَلَيْهِ يَلْهَثْ أَوْ تَتْرُكْهُ يَلْهَثْ ذَلِكَ مَثَلُ الْقَوْمِ الَّذِينَ كَذَّبُوا بِآيَاتِنَا فَاقْصُصِ الْقَصَصَ لَعَلَّهُمْ يَتَفَكَّرُونَ

“আপনি তাদের কাছে সেই ব্যক্তির বৃত্তান্ত পড়ে শোনান যাকে আমি আমার নিদর্শনসমূহ দান করেছিলাম, কিন্তু সে তা পরিহার করে বেরিয়ে গেল। পরে শয়তান তার পেছনে লাগল। এরপর সে পথভ্রষ্টদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।

আমি চাইলে ওই আয়াতগুলোর বদৌলতে তাকে উচ্চ মর্যাদায় আসীন করতে পারতাম। কিন্তু সে ঝুঁকে পড়ল দুনিয়ার দিকে এবং নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করল। তার অবস্থা হল কুকুরের মতো; যদি তাকে তাড়া কর তবুও হাঁপাবে, যদি ছেড়ে দাও তবুও হাঁপাবে। এ হল সেসব লোকের উদাহরণ যারা আমার নিদর্শনসমূহকে প্রত্যাখ্যান করে। আপনি তাদেরকে এসব ঘটনা শোনান যেন তারা কিছু চিন্তা-ফিকির করে।” –সূরা আ’রাফ (৭) : ১৭৫-১৭৬

অর্থাৎ কুকুর যেমন তাড়া করলেও হাঁপায়, না করলেও হাঁপায়, এসব দুনিয়াদারের অবস্থাও তেমনি। হকের দিকে ডাকুন, না ডাকুন সমান; হক তারা গ্রহণ করবে না।

বালআম বিন বাউরার ঘটনা ইমাম তাবারি রহ. তাবিয়ি সাইয়ার শামি রহ. থেকে মুরসাল সনদে বর্ণনা করেছেন। হাফেয ইবনে হাজার রহ. ‘বাযলুল মাউন’ কিতাবে (পৃষ্ঠা ৮৬) সনদটিকে জায়্যিদ বলেছেন। তাবারি রহ. বর্ণনা করেন,

عن سيار أنه كان رجلا يقال له بلعام، … وكان مجاب الدعوة قال: وإن موسى أقبل في بني إسرائيل يريد الأرض التي فيها بلعام =أو قال الشأم= قال: فرُعب الناس منه رعْبًا شديدًا. قال: فأتوا بلعام، فقالوا: ادع الله على هذا الرجل وجيشه! قال: حتى أُوَامر ربّي =أو حتى أؤامر قال: فوامر في الدعاء عليهم، فقيل له: لا تدع عليهم، فإنهم عبادي، وفيهم نبيهم!

قال: فقال لقومه: إني قد وَامَرْتُ ربي في الدعاء عليهم، وإني قد نهيت. قال: فأهدوا إليه هدية فقبلها. ثم راجعوه، فقالوا: ادع عليهم! فقال: حتى أوامر! فوامر، فلم يَحُر إليه شيء. قال: فقال: قد وامرت فلم يَحُرْ إليَّ شيء! فقالوا: لو كره ربك أن تدعو عليهم، لنهاك كما نهاك المرةَ الأولى. قال: فأخذ يدعو عليهم، فإذا دعا عليهم جَرَى على لسانه الدُّعاء على قومه; وإذا أراد أن يدعو أن يُفْتَح لقومه، دعا أن يفتَح لموسى وجيشه =أو نحوا من ذلك إن شاء الله. فقال: فقالوا ما نراك تدعو إلا علينا! قال: ما يجري على لساني إلا هكذا، ولو دعوت عليه ما استجيب لي، ولكن سأدلّكم على أمرٍ عَسَى أن يكون فيه هلاكهم: إن الله يُبْغِض الزنا، وإنهم إن وقعوا بالزنا هلكوا، ورجوت أن يهلكهم الله، فأخرجوا النساء فليستقبلنهم، وإنهم قوم مسافرون، فعسى أن يزنُوا فيهلكوا. قال: ففعلوا، وأخرجوا النساء يستقبلنهم. قال: وكان للملك ابنة، فذكر من عِظَمها ما الله أعلم به! قال: فقال أبوها، أو بلعام: لا تُمْكِني نفسك إلا من موسى! قال: ووقعوا في الزنا.

قال: وأتاها رأس سبط من أسباط بني إسرائيل، فأرادها على نفسه قال: فقالت: ما أنا بممكنةِ نفسِي إلا من موسى! قال: فقال: إنّ من منزلتي كذا وكذا، وإن من حالي كذا وكذا! قال: فأرسلت إلى أبيها تستأمره، قال: فقال لها: فأمكنيه. قال: ويأتيهما رجل من بني هارون ومعه الرمح فيطعنهما قال: وأيَّده الله بقوة فانتظمهما جميعًا، ورفعهما على رمحه. قال: فرآهما الناس =أو كما حدَّث. قال: وسلط الله عليهم الطاعون. قال: فمات منهم سبعون ألفا. –جامع البيان في تأويل القرآن، ج: 13، ص: 261-262؛ ط. مؤسسة الرسالة، ت: أحمد شاكر. قال الحافظ ابن حجر رحمه الله تعالى: هذا حديث مرسل جيد الإسناد. اهـ بذل الماعون في فضل الطاعون، ص: 86، ط. دار العاصمة، الرياض

“সাইয়ার রহ. থেকে বর্ণিত যে, ঘটনার লোকটি ছিল বালআম। সে ছিল মুস্তাজাবুদ দাওয়াহ (অর্থাৎ তার দোয়া বৃথা যেতো না)। হযরত মূসা আলাইহিস সালাম বনি ইসরাঈলকে নিয়ে বালআম যে দেশে থাকত অর্থাৎ শামে জিহাদের জন্য এলেন। সে দেশের লোকজন অত্যন্ত ভয় পেয়ে গেল। তারা বালআমের কাছে এসে আরজ করল, ‘এ লোক আর তার বাহিনীর বিরুদ্ধে বদদোয়া করুন’। সে উত্তর দিল, ‘ঠিক আছে, আমার রবের সাথে পরামর্শ করে নিই’।

তাদের বিরুদ্ধে বদদোয়ার ব্যাপারে সে আল্লাহ তাআলার সাথে পরামর্শ করল। তাকে বলা হল, ‘তুই তাঁদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করিস না। তাঁরা আমার মুমিন বান্দা। তাঁদের সাথে আমার নবীও আছেন’।

বালআম কওমের লোকদের বলল, ‘আমি রবের সাথে বদদোয়ার ব্যাপারে পরামর্শ করেছি। আমাকে নিষেধ করা হয়েছে’।

তখন কওমের লোকেরা তাকে কিছু হাদিয়া-উপঢৌকন দিল। সেও তা গ্রহণ করে নিল। এরপর আবার তারা

বদদোয়ার আবদার জানাল, ‘আপনি তাঁদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করুন’। সে উত্তর দিল, ‘ঠিক আছে, রবের সাথে পরামর্শ করে নিই’।

সে পরামর্শ চাইল কিন্তু কোনো উত্তর এল না। কওমের কাছে গিয়ে বলল, ‘পরামর্শ চেয়েছি কিন্তু কোনো উত্তর আসেনি’। তারা বলল, ‘আপনার রব বদদোয়া অপছন্দ করলে প্রথমবার যেমন নিষেধ করেছিলেন এবারও নিষেধ করতেন’। তখন সে বদদোয়া শুরু করল।

তাঁদের বিরুদ্ধে যখন বালআম বদদোয়া করে তখন বদদোয়া হয়ে যায় কওমের বিরুদ্ধে। যখন তার কওমের বিজয়ের দোয়া করতে যায়, দোয়া চলে আসে মূসা আলাইহিস সালাম এবং তাঁর বাহিনীর বিজয়ের। তারা বলতে লাগল, ‘কী ব্যাপার আপনাকে দেখছি আমাদের বিরুদ্ধে বদদোয়া করছেন’? সে উত্তর দিল, ‘আমার যবানে এছাড়া আর কিছু আসছে না। আর সে বদদোয়া করতে পারলেও কবুল হতো না।

তবে আমি তোমাদের একটা ফন্দি শিখাচ্ছি। হয়তো এতেই তাঁরা ধ্বংস হবে। আল্লাহ তাআলা যিনা বড়ই অপছন্দ করেন। যদি তাঁরা যিনায় লিপ্ত হয় তাহলেই ধ্বংস অনিবার্য, আশা করি আল্লাহ এতেই তাদের ধ্বংস করবেন। তোমরা (সাজিয়ে গুছিয়ে কিছু পণ্য দিয়ে বিক্রির বাহানায়) মেয়েদের বাইরে পাঠিয়ে দাও। তারা তাঁদের কাছে যাক। এরা মুসাফির লোক (বিবি থেকে দূরে)। হয়তো যিনায় লিপ্ত হবে। আর তাতেই তাঁদের ধ্বংস’।

তারা তাই করল। মেয়েদের পাঠিয়ে দিল। (বলে দিল, কেউ হাত বাড়ালে কোনো মেয়ে যেন অসম্মতি না জানায়।)

বাদশার এক অনিন্দ্যসুন্দর মেয়ে ছিল। বালআম কিংবা তার পিতা তাকে বলে দিল, ‘মূসা –আলাইহিস সালাম- ছাড়া অন্য কাউকে সুযোগ দিয়ো না’।

বনি ইসরাইল যিনায় লিপ্ত হল।

বনি ইসরাঈলের এক গোত্রপ্রধান ঐ মেয়ের কাছে এসে আবদার জানাল। সে অসম্মতি জানিয়ে বলল, মূসা ছাড়া আমি কাউকেই সুযোগ দেবো না।

তখন সে নিজের অবস্থান তুলে ধরে বলল, আমার এই এই মর্যাদা রয়েছে। আমার অবস্থা হল এই এই।

মেয়েটি তার পিতার কাছে পরামর্শ চেয়ে লোক পাঠাল। পিতা খবর পাঠাল, রাজি হয়ে যাও।

(উভয়ে যিনায় লিপ্ত হল। ফলে, আযাবরূপে তাউন (মহামারি) নাযিল হল। হযরত হারুন আলাইহিস সালামের বংশের এক লোক (শুনতে পেয়ে তাদের কাছে) এসে উভয়ের উপর বর্শা চালাল। আল্লাহ তাআলা তাঁকে সাহায্য করলেন। তিনি উভয়কে এফোঁড়-ওফোঁড় করে বিদ্ধ করে ফেললেন। বর্শায় টানিয়ে উপরে তুলে ধরলেন এবং লোকজন উভয়কে (এ বিদ্ধ অবস্থায়) প্রত্যক্ষ করল।

(যিনার দরুন নারাজ হয়ে) আল্লাহ তাআলা তাদের উপর তাউন (মহামারি) চাপিয়ে দিলেন। (হত্যা করে তুলে ধরা পর্যন্ত সময়ের মধ্যে) সত্তর হাজার বনি ইসরাঈল মারা গেল।” –তাফসিরে তাবারি : ১৩/২৬১-২৬২

চিন্তা করুন! এ খবিস জেনে বুঝে করেছে কি! আল্লাহ তাআলা তার উপর ইহসান করে তাকে মুস্তাজাবুদ দাওয়ার মনযিলে উন্নীত করলেন। কিন্তু সে দুনিয়ার সামান্য মোহে পড়ে সব বরবাদ করল। নবীর বিরুদ্ধে বদদোয়া করতে গেছে, অথচ সে জানে নবীর বিরুদ্ধে বদদোয়া কবুল হবে না। প্রথমে সে রাজি হয়নি। কিন্তু কওমের লোকেরা যখন দুনিয়ার সামান্য সম্পদ হাদিয়া পেশ করল, তখন ফাঁদে পড়ে গেল। অবশেষে যখন কাজ হল না, তখন সে এমন এক ফন্দি শিখিয়ে দিল যা ওই কাফেরদের অন্তরেও আসেনি।

আমাদের এ দেশীয় ‘বালআম বিন বাউরা’রা কি এমন ফন্দিই শেখাছে না তাগুত হাসিনাদের? নয়তো যে কি না আরবি এক দুটি হরফও ভালোভাবে উচ্চারণ করতে পারবে না সে আবার কুরআনের আয়াত দিয়ে দলীল দেয় কীভাবে?

 

শাসকের দরবার ফিতনার চারণভূমি

শাসকের দরবার ফিতনার চারণভূমি। সেখানে যাতায়াতের পর একজন মানুষের দ্বীনদারিতা আর তেমন বাকি থাকে না। ফিতনার শিকার না হয়ে পারে না। এজন্যই বহু হাদিসে এব্যাপারে সতর্কবাণী এসেছে। এক হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

ومن أتى السلطان افتتن

–سنن ابي داود، رقم: 2859؛ ط. دار الرسالة العالمية، ت: شعَيب الأرنؤوط – محَمَّد كامِل قره بللي، قال الشيخ الأرنؤوط رحمه الله تعالى: حسن لغيره. اهـ

“যে ব্যক্তি শাসকের দরবারে গমন করবে সে ফিতনার শিকার হবে।” –সুনানে আবু দাউদ : ২৮৫৯

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

إن على أبواب السلطان فتنا كمبارك الإبل، والذي نفسي بيده لا تصيبوا من دنياهم شيئا إلا أصابوا من دينكم مثله أو قال مثليه -جامع بيان العلم وفضله- ابن عبد البر، ج: 1، ص: 639، رقم: 1104؛ ط. دار ابن الجوزي

“শাসকের দরবার হরেক রকম ফিতনার রঙ্গমঞ্চ; যেমন উটের বসতস্থল। ওই সত্তার কসম যার হাতে আমার জান! তুমি তাদের দুনিয়া থেকে সামান্য কিছুও লাভ করতে পারবে না, যতক্ষণ না এর বিপরীতে তারা এর সমপরিমাণ বা দ্বিগুণ তোমাদের দ্বীন নষ্ট করে।”-জামিউ বয়ানিল ইলম ১/৬৩৯, আসার নং : ১১০৪

উটের পাল একসাথে থাকলে বিশৃংখলা করে। একটা এদিকে চলে যায়, একটা অন্যদিকে। গুঁতোগুঁতি শুরু করে। পাশের লোকের উপরও অনেক সময় হামলে পড়ে। এজন্য এমন জায়গায় নামায পড়তে নিষেধ এসেছে হাদিসে। শাসকের দরবারও এমন ফিতনার আখড়া।

অন্য হাদিসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

إنها ستكون أمراء يكذبون ويظلمون، فمن صدقهم بكذبهم، وأعانهم على ظلمهم، فليس مني، ولست منه، ولا يرد علي الحوض، ومن لم يصدقهم بكذبهم، ولم يعنهم على ظلمهم فهو مني، وأنا منه، وسيرد علي الحوض -مسند الإمام أحمد، رقم: 23260؛ ط. الرسالة، ت: شعيب الأرنؤوط، عادل مرشد، وآخرون. قال المحققون: إسناده صحيح على شرط الشيخين. اهـ

“অচিরেই এমনসব উমারা আসবে যারা মিথ্যা বলবে এবং জুলুম করবে। যে ব্যক্তি তাদের মিথ্যায় সমর্থন দেবে এবং তাদের জুলুমে সহায়ক হবে, সে আমার নয়, আমিও তার নই। সে হাউজে কাউসারে আমার কাছে উপনীত হবে না। আর যে ব্যক্তি তাদের মিথ্যায় সমর্থন দেবে না এবং তাদের জুলুমে সহায়তা করবে না, সে আমার, আমি তার। অচিরেই সে হাউজে কাউসারে আমার কাছে উপনীত হবে।” –মুসনাদে আহমাদ : ২৩২৬০

যে ব্যক্তি শাসকের দরবারে গমন করবে, তাদের সাথে সম্পর্ক রাখবে সে তাদের মিথ্যায় সমর্থন না দিয়ে পারবে না। তাদের জুলুমে সহায়ক না হয়ে পারবে না। হযরত হুযাইফা রাদিয়াল্লাহু আনহু –যিনি ফিতানের হাদিস সবচেয়ে বেশি জানতেন- তিনি এ ব্যাপারে সতর্ক করে গেছেন। তিনি বলেন,

إياكم ومواقف الفتن» قيل: وما مواقف الفتن يا أبا عبد الله؟ قال: أبواب الأمراء. يدخل أحدكم على الأمير فيصدقه بالكذب ويقول له ما ليس فيه -جامع بيان العلم وفضله- ابن عبد البر، ج: 1، ص: 639، رقم: 1103؛ ط. دار ابن الجوزي

“সাবধান! ফিতনার চারণভূমি থেকে দূরে থাকবে। জিজ্ঞেস করা হল, ‘হে আবু আবদুল্লাহ! ফিতনার চারণভূমি কোনটি’? তিনি উত্তর দেন, ‘উমারাদের দরবার। তোমাদের কেউ আমীরের দরবারে যাবে। গিয়ে তার মিথ্যায় সমর্থন দেবে কিংবা তার (প্রশংসায়) এমন কথা বলবে যা বাস্তবে তার মাঝে নেই।” –জামিউ বায়ানিল ইলম : ১/৬৩৯, আসার নং : ১১০৩

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

إن الرجل ليدخل على السلطان ومعه دينه فيخرج وما معه دينه فقال رجل كيف ذاك يا أبا عبد الرحمن قال يرضيه بما يسخط الله فيه –الطبقات لابن سعد، ج: 5، ص: 108؛ التاريخ الكبير للبخاري، ج: 1، ص: 443، ط. دائرة المعارف العثمانية، حيدر آباد – الدكن

“কোনো লোক দ্বীনদার অবস্থায় শাসকের দরবারে যায়, এরপর যখন বেরিয়ে আসে দ্বীনের কিছুই তার থাকে না। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, ‘আবু আব্দুর রহমান! এটা কীভাবে’? তিনি উত্তর দেন, ‘এমন কিছুর মাধ্যমে তাকে সন্তুষ্ট করে আসে যার দ্বারা আল্লাহ তাআলা নারাজ হয়ে যান।” –তাবাকাতে ইবনে সা’দ : ৫/১০৮, তারিখে কাবীর (ইমাম বুখারি) : ১/৪৪৩

ইবনুল কায়্যিম রহ. বলেন,

كل من آثر الدنيا من أهل العلم واستحبها فلا بد أن يقول على الله غير الحق في فتواه وحكمه في خبره وإلزامه لأن أحكام الرب سبحانه كثيرا ما تأتي على خلاف أغراض الناس ولا سيما أهل الرياسة والذين يتبعون الشبهات فإنهم لا تتم لهم أغراضهم إلا بمخالفة الحق ودفعه كثيرا فإذا كان العالم والحاكم محبين للرياسة متبعين للشهوات لم يتم لما ذلك إلا بدفع ما يضاده من الحق ولا سيما إذا قامت له شبهة فتتفق الشبهة والشهوة ويثور الهوى فيخفى الصواب وينطمس وجه الحق وإن كان الحق ظاهرا لا خفاء به ولا شبة فيه أقدم على مخالفته وقال لي مخرج بالتوبة –الفوائد لابن القيم، ص: 100، ط. دار الكتب العلمية – بيروت

“আলেমদের মধ্যে যারাই দুনিয়ার যিন্দেগিকে প্রাধান্য দেয় এবং দুনিয়ার প্রেমে পড়ে যায়, তারা তাদের ফতোয়া, বিচারাচার ও বর্ণনায় আল্লাহর উপর কিছু না-হক কথা বলা বলবেই। এছাড়া গত্যন্তর নেই। কেননা, রব্বে কারীমের বিধান অনেক সময়ই মানুষের খাহেশের বিরুদ্ধে গিয়ে থাকে; বিশেষত ক্ষমতাশীলদের, যারা খাহেশাতের পেছনেই পড়ে থাকে। অনেক সময়ই হকের বিরুদ্ধে যাওয়া এবং হক প্রত্যাখ্যান করা ছাড়া তাদের গরজ পূর্ণ হয় না। আলেম ও বিচারক যখন ক্ষমতালোভী হয়, খাহেশাতের অনুসারী হয়: তখন ক্ষমতার লোভ ও খাহেশাতের পথে প্রতিবন্ধকরূপে দাঁড়ানো হককে প্রত্যাখ্যান করা ছাড়া তাদের উদ্দেশ্য হাসিল করা সম্ভব হয় না …।” –আলফাওয়ায়িদ : ১০০

এজন্যই যেসব আলেম শাসকের দরবারে গমন করত সালাফগণ তাদেরকে অভিযুক্ত মনে করতেন। হেয় চোখে দেখতেন। দুনিয়াদার মনে করতেন। আবু হাযিম রহ. বলেন,

إن العلماء كانوا يفرون من السلطان ويطلبهم وإنهم اليوم يأتون أبواب السلطان، والسلطان يفر منهم -جامع بيان العلم وفضله- ابن عبد البر، ج: 1، ص: 635، رقم: 1093؛ ط. دار ابن الجوزي

“আগের যামানায় উলামারা শাসকদের থেকে পলায়ন করতেন আর শাসকরা তাদের খুঁজে বেড়াত। আর আজকাল উলামারা শাসকদের দরবারে গমন করছে আর শাসক তাদের থেকে পালাচ্ছে।” –জামিউ বায়ানিল ইলম : ১/৬৩৫, আসার নং : ১০৯৩

আমীর ইবনে হুবায়রার দরজার সামনে কতক আলেমকে বসে থাকতে দেখে হাসান বসরি রহ. তিরস্কার করে বলেছিলেন,

أما وَالله لَو زهدتم فِيمَا عِنْد الْمُلُوك لرغبوا فِيمَا عنْدكُمْ ولكنّكم رغبتم فِيمَا عِنْدهم فزهدوا فِيمَا عنْدكُمْ فضحتم الْقُرَّاء فضحكم اللَّه. –الأمالي لابى القاسم الزجاجي (ت: 337هـ)، ج: 1، ص: 13، ط. دار الجيل – بيروت

“ওহে! আল্লাহর কসম! শাসকদের দুনিয়ার প্রতি যদি তোমরা অনীহা দেখাতে তাহলে তারা তোমাদের ইলমের প্রতি আগ্রহ দেখাত। কিন্তু তোমরা তাদের দুনিয়ার প্রতি আসক্ত হয়ে পড়েছ ফলে তারা তোমাদের ইলমের প্রতি অনাসক্ত হয়ে পড়েছে। আলেমদের তোমরা বেইজ্জত করেছ, আল্লাহ তোমাদের বেইজ্জত করুন।” –আলআমালি লিআবিল কাসিম আযযুজাজি : ১/১৩

ইবনে আব্দুল বার রহ. (৪৬৩হি.) বলেন,

قالوا: «شر الأمراء أبعدهم من العلماء، وشر العلماء أقربهم من الأمراء» -جامع بيان العلم وفضله- ابن عبد البر، ج: 1، ص: 641، رقم: 1116؛ ط. دار ابن الجوزي

“পূর্ববর্তী উলামাগণ বলেছেন, সবচেয়ে নিকৃষ্ট উমারা তারা যারা আলেমদের থেকে অনেক দূরে; আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট উলামা তারা যারা উমারাদের খুব ঘনিষ্ঠ।” –জামিউ বায়ানিল ইলম : ১/৬৪১, আসার নং : ১১১৬

সুবহানাল্লাহ! এ ছিল খলিফা আব্দুল মালিক বিন মারওয়ান, ওয়ালিদ, হিশাম ও মানসুরের ব্যাপারে কথা; যারা তামাম দুনিয়ার কাফেরের গলায় দড়ি পরিয়ে ইসলামে টেনে এনেছেন, নয়তো দাস-দাসীতে পরিণত করেছেন। আজকালকার তাগুতের দরবারের আলেমদের দেখলে সালাফগণ কী বলতেন আল্লাহই ভালো জানেন।

উপরে দু’টি আয়াতের ব্যাখ্যায় আমরা দুই ধরনের দরবারি আলেম দেখতে পেলাম:

এক. কা’ব বিন আশরাফ, যে নিজ স্বার্থ উদ্ধারে স্বেচ্ছায় শাসকের পক্ষে যোগ দিয়েছে।

দুই. বালআম বিন বাউরা, শাসক যাকে দুনিয়ার লোভ দেখিয়ে হাত করে নিয়েছে।

এভাবেই শাসকদের দরবারে দরবারি আলেমদের সমাগম হয়। কেউ নিজ স্বার্থ উদ্ধারের জন্য স্বেচ্ছায় যোগ দেয়। আর কাউকে শাসকরা নিজেরাই দুনিয়ার লোভ লালসা দেখিয়ে হাত করে নেয়। যাকে এভাবে কাজ না হয় হুমকি ধমকি দিয়ে দলে ভেড়ায়। এ উভয় শ্রেণী মিলে জনসাধারণের দ্বীন দুনিয়া বরবাদ করে। শাসক দ্বারা আলেম নষ্ট হয়, আলেম দ্বারা শাসক নষ্ট হয়। এরপর এদের দ্বারা জাতি নষ্ট হয়।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

صنفان من أمتي إذا صلحا صلحت الأمة وإذا فسدا فسدت الأمة: السلطان والعلماء -جامع بيان العلم وفضله- ابن عبد البر، ج: 1، ص: 641، رقم: 1109؛ ط. دار ابن الجوزي

“আমার উম্মতের দু’টি শ্রেণী যদি ভাল হয়ে যায় তাহলে গোটা উম্মত ভাল হয়ে যাবে, আর এরা নষ্ট হয়ে গেলে গোটা উম্মত নষ্ট হয়ে যাবে: শাসক শ্রেণী আর উলামা শ্রেণী।” –জামিউ বয়ানিল ইলম ওয়া ফাদলিহি : ১/৬৪১, হাদিস নং : ১১০৯

ইবনুল মুবারক রহ. কত বাস্তব কথাই না বলেছেন,

وهل أفسد الدين إلا الملوك … وأحبار سوء ورهبانها

“শাসকরা আর মন্দ আলেম দরবেশরা ছাড়া দ্বীন আর নষ্ট কে করেছে!” –সিয়ারু আ’লামিন নুবালা : ১২/২১৩, মূদ্রণ: আররিসালা

 

বড়ত্ব জাহিরের জন্য ইলম শেখা

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

من طلب العلم ليجاري به العلماء أو ليماري به السفهاء أو يصرف به وجوه الناس إليه أدخله الله النار -سنن الترمذي، رقم: 2654؛ ط. شركة مكتبة ومطبعة مصطفى البابي الحلبي – مصر، قال الترمذي رحمه الله تعالى: هذا حديث غريب، لا نعرفه إلا من هذا الوجه، وإسحاق بن يحيى بن طلحة ليس بذاك القوي عندهم، تكلم فيه من قبل حفظه. اهـ إلا أن الألباني حسنه.

“যে ব্যক্তি আলেমদের সাথে পাল্লা দেয়ার জন্য, নির্বোধদের সাথে বিতর্ক করার জন্য কিংবা লোকজনকে নিজের দিকে আকৃষ্ট করার জন্য ইলম শিখবে আল্লাহ তাআলা তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবেন।” –জামে তিরমিযি : ২৬৫৪

ইবনে রজব হাম্বলি রহ. (৭৯৫হি.) বলেন,

وعلامة هذا العِلْم الَّذِي لا ينفع أن يكسب صاحبه الزهو والفخر والخيلاء، وطلب العلو والرفعة في الدُّنْيَا والمنافسة فيها، وطلب مباهاة العُلَمَاء ومماراة السفهاء وصرف وجوه الناس إِلَيْهِ …

وربما ادعى بعض أصحاب هذه العلوم معرفة الله وطلبه والإعراض عما سواه، وليس غرضهم بذلك إلا طلب التقدم في قلوب الناس من الملوك وغيرهم، وإحسان ظنهم بهم، وكثرة أتباعهم، والتعظم بذلك عَلَى الناس، وعلامة ذلك إظهار دعوى الولاية كما كان يدعيه أهل الكتاب، وكما ادعاه القرامطة والباطنية ونحوهم، وهذا بخلاف ما كان عليه السَّلف من احتقار نفوسهم وازدرائها باطنًا وظاهرًا …

ومن علامات ذلك: عدم قبول الحق والانقياد إِلَيْهِ والتكبر عَلَى من يقول الحق، خصوصًا إن كان دونهم في أعين الناس، والإصرار عَلَى الباطل خشية تفرق قلوب الناس عنهم بإظهار الرجوع إِلَى الحق.

وربما أظهروا بألسنتهم ذم أنفسهم واحتقارها عَلَى رءوس الأشهاد؛ ليعتقد الناس فيهم أنهم عند أنفسهم متواضعون فَيُمدَحُون بذلك، وهو من دقائق أبواب الرياء، كما نبه عليه التابعون فمن بعدهم من العُلَمَاء.

ويظهر منهم من قبول المدح واستجلابه (مما) ينافي الصدق والإخلاص؛ فإن الصادق يخاف النفاق عَلَى نفسه ويخشى عَلَى نفسه من سوء الخاتمة، فهو في شغل شاغل عن قبول المدح واستحسانه. –مجموع رسائل ابن رجب الحنبلي، ج: 3، ص: 30-31، ط. الفاروق الحديثة للطباعة والنشر

“এই অনুপকারী ইলমের আলামত হলো, ইলমধারী ব্যক্তি এর দ্বারা দুনিয়ার চাকচিক্য ও গর্ব-অহংকার কামাই করে। দুনিয়াতে বড় হতে চায় এবং এজন্য প্রতিযোগিতা করে। আলেমদের সাথে পাল্লা দিতে চায়। নির্বোধদের সাথে বিতর্কে জড়ায়। জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করে।

এধরণের ইলমধারী ব্যক্তি অনেক সময় দাবি করে, সে আরেফ বিল্লাহ। সে আল্লাহকেই চায়, আর কিছু চায় না। বাস্তবে এর দ্বারা উদ্দেশ্য শাসকসহ অন্যান্য লোকের অন্তরে জায়গা করে নেয়া, তার প্রতি ভাল ধারণা পোষণ করানো, অনুসারীর আধিক্য বাড়ানো এবং অন্যের উপর নিজেকে বড় প্রমাণ করা। …

অথচ সালাফগণ ছিলেন এর উল্টো। সবসময় নিজেকে ছোট মনে করতেন। ছোট বলেই প্রকাশ করতেন…

এর আলামাত: এরা হক কবুল করতে চায় না। হকের সামনে মাথা নত করে না। বরং হক যে বলে তার সাথে দাম্ভিক আচরণ করে- বিশেষত যদি জনগণের দৃষ্টিতে সে ব্যক্তি তার চেয়ে ছোট কেউ হয়। প্রকাশ্যে হক গ্রহণ করে নিলে জনগণের ভক্তি কমে যায় কিনা এ ভয়ে বাতিলের উপরই জিদ ধরে পড়ে থাকে।

এ ধরণের ইলমধারী ব্যক্তি অনেক সময় নিজেকে ছোট বলেও প্রকাশ করে। জনসম্মুখে নিজের সমালোচনা ও নিন্দাও করে। উদ্দেশ্য: জনগণ যেন মনে করে, তারা নিজেদেরকে বাস্তবেই ছোট মনে করে। কিন্তু আসল উদ্দেশ্য যাতে এর দ্বারাও প্রশংসা কুড়াতে পারে। এটা রিয়ার এক সূক্ষ্ম দরজা। তাবিয়িনে কেরাম এবং পরবর্তী উলামাগণ এ ব্যাপারে সতর্ক করে গেছেন। এদেরকে প্রশংসা গ্রহণ করতে ও কুড়াতেও দেখা যায়, যা সিদক ও ইখলাসের পরিপন্থী।” –রাসায়িলু ইবনি রজব আলহাম্বলি : ৩/৩০-৩১

সারকথাঃ

কুরআন সুন্নাহ এবং সালাফে সালিহিন ও আইম্মায়ে দ্বীনের উক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে উলামায়ে সূ-য়ের কিছু মৌলিক সিফাত আমরা আলোচনা করেছি। সিফাতগুলোর সারমর্ম যা দাঁড়াল:

  • এদের ইলম হয়ে থাকে বড়ত্ব জাহিরের জন্য। অনুসারী বাড়ানো ও দল ভারী করার জন্য। জনগণের দৃষ্টি আকর্ষণ ও প্রশংসা কুড়ানোর জন্য। এরা ভুল করে কিন্তু ভুল স্বীকার করতে চায় না। হক কবুল করতে চায় না, পাছে আবার মান-সম্মান কমে যায় কিনা।
  • ইলম অনুযায়ী আমল করে না।
  • অন্যকে নসীহত করে ও ফতোয়া দেয় কিন্তু নিজে মেনে চলে না।
  • দুনিয়ার তুচ্ছ স্বার্থে হক গোপন করে এবং হক-বাতিল গুলিয়ে ফেলে।
  • স্বার্থ উদ্ধারের জন্য দ্বীনের তাহরিফ-অপব্যাখ্যা করে এবং দ্বীনের নামে মিথ্যাচার করে।
  • কিছু বিষয়ে ইলম শিখে সব বিষয়ে কথা বলে। যে বিষয়ে ইলম নেই সে বিষয়ে যবান বন্ধ রাখে না, পাছে লোকে ছোট ভাবে কিনা।
  • কুরআন সুন্নাহর সুস্পষ্ট নস এবং আইম্মায়ে কেরামের সুস্পষ্ট বক্তব্য ও উক্তি বাদ দিয়ে কিছু অস্পষ্ট নস ও উক্তি নিয়ে টানাটানি করে, যেগুলোকে সহজে নিজেদের মতলবমত ঘুরানো যায়।
  • আমর বিল মা’রূফ ও নাহি আনিল মুনকার থেকে দূরে থাকে, পাছে বিপদাপদ এসে পড়ে কিনা কিংবা স্বার্থ ছুটে যায় কিনা।
  • এরা শক্তের ভক্ত নরমের যম। আল্লাহর বিধান প্রয়োগে স্বজনপ্রীতির আশ্রয় নেয়। সঠিক বিধান প্রয়োগ করতে গেলে যেখানে সম্পর্ক নষ্ট হওয়ার কিংবা স্বার্থ ছুটে যাওয়ার আশঙ্কা সেখানে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে ভিন্ন একটা কিছু করে নেয় বা এমন ফতোয়া দেয় যেখানে তারা ‘শয়তানও খুশি থাকুক আল্লাহও নারাজ না হোক’- নীতি গ্রহণ করে।
  • দুনিয়ার স্বার্থ, পদ-মর্যাদা ও মান-সম্মান কামানো বা বহাল রাখার স্বার্থে শাসকের দরবারে যাতায়াত করে। তাদের সাথে সুস্পর্ক গড়ে তোলার চেষ্টা করে। শাসকদের মিথ্যাকে সত্য প্রমাণের চেষ্টা করে। তাদের জুলুমে সহায়তা করে। তাদের জুলুমকে শরীয়তের আঙ্গিকে বৈধ প্রমাণ করার পায়তারা করে।
  • জিহাদ ও মুজাহিদদের বিরুদ্ধে জালিম ও তাগুতের পক্ষ নেয়। অনেক সময় তারা মুজাহিদদের বিরুদ্ধে এমনসব কূট-কৌশল আবিষ্কার করে যা তাগুতরাও চিন্তা করতে পারে না। বিনিময়ে তারা ক্ষণস্থায়ী দুনিয়ার সুখ-শান্তি ও ভোগ-বিলাস লাভ করে। এ কারণেই হাল যামানায় তাগুতের দরবার উলামায়ে সূ-দের সমাগমস্থলে পরিণত হয়েছে। এমন কোন তাগুত নেই যার দরবারে অসংখ্য উলামায়ে সূ-য়ের ভিড় নেই।

 

বি.দ্র.

এ ধরনের সব সিফাত সকলের মাঝে থাকা আবশ্যক নয়। কারো মাঝে কম, কারো মাঝে বেশি থাকতে পারে। কারো মাঝে দুয়েকটাও থাকতে পারে।

 

 

 

 

 

 

 

উলামায়ে হক্কানি ও উলামায়ে সু : পরিচিতি ও  প্রকৃতি

পর্ব- ৪

মাওলানা আবদুল্লাহ রাশেদ (হাফিযাহুল্লাহ)

 

  • উলামায়ে হক্বানি-রব্বানি : পরিচিতি ও প্রকৃতি

আলহামদুলিল্লাহ, এতক্ষণ আমরা উলামায়ে সু-র পরিচিতি ও প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করেছি। উলামায়ে হক্কানি এর বিপরীত, যাঁদের মধ্যে উলামায়ে সূ-য়ের মন্দ সিফাতগুলো নেই। আরো একটু স্পষ্ট করার জন্য এখন আমরা ইনশাআল্লাহ উলামায়ে হক্কানি রাব্বানির মৌলিক কিছু সিফাত তুলে ধরব।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

إن العلماء هم ورثة الأنبياء، إن الأنبياء لم يورثوا دينارا ولا درهما، إنما ورثوا العلم -سنن ابن ماجه، رقم: 223؛ ط. الرسالة، ت: شعيب الأرنؤوط، -سنن ابي داود، رقم: 3641؛ ط. دار الرسالة العالمية، ت: شعَيب الأرنؤوط – محَمَّد كامِل قره بللي، قال الشيخ الأرنؤوط رحمه الله تعالى: حسن بشواهد. اهـ

“উলামারা ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া (তথা আম্বিয়ায়ে কেরামের উত্তরাধিকারী)। আর আম্বিয়ায়ে কেরাম কোনো দিরহাম-দিনার রেখে যাননি। রেখে গেছেন ইলম।” –সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৩, সুনানে আবু দাউদ : ৩৬৪১

অতএব, উলামাগণ আম্বিয়ায়ে কেরামের ইলমে অহির ওয়ারিস। হাফেয ইবনে হাজার রহ. (৮৫২হি.) বলেন,

الوارث قائم مقام الموروث فله حكمه فيما قام مقامه فيه -فتح الباري ج: 1، ص: 160؛ ط. دار المعرفة – بيروت

“যিনি মিরাস রেখে গেছেন উত্তরাধিকারী ব্যক্তি তার স্থলাভিষিক্ত হয়ে থাকেন। তিনি যে বিষয়ে তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন সে বিষয়ে তার হুকুম তা-ই যে হুকুম মূল ব্যক্তির ছিল।” –ফাতহুল বারি : ১/১৬০

অতএব, অহিয়ে ইলাহির মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া কেরামের কাছে যে দ্বীন ও দ্বীনের ইলম নাযিল করেছেন, সে দ্বীন ও ইলমে আম্বিয়া কেরামের যে দায়িত্ব ছিল, উলামায়ে কেরামের সে একই দায়িত্ব। এক কথায় বলতে গেলে সে দায়িত্ব হলো, তাবলিগে দ্বীন তথা মাখলুকের কাছে দ্বীন পৌঁছে দেয়া। আল্লাহ তাআলা এ উদ্দেশ্যেই নবী রসূল প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা তার রসূলকে আদেশ দিচ্ছেন,

يَاأَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ –المائدة 67

“হে রসূল! আপনার রবের পক্ষ থেকে আপনার কাছে যা নাযিল করা হয়েছে, আপনি তা (মানুষের কাছে) পৌঁছে দিন।” –সূরা মায়েদা (৫) : ৬৭

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. (৭২৮হি.) বলেন,

وجعل فيهم علماءهم ورثة الأنبياء يقومون مقامهم في تبليغ ما أنزل من الكتاب –مجموع الفتاوى، ج: 1، ص: 3، ط. مجمع الملك فهد

“আল্লাহ তাআলা উম্মাহর উলামাগণকে আম্বিয়ায়ে কেরামের উত্তরাধিকারী বানিয়েছেন। যে কিতাব তিনি নাযিল করেছেন তা পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা আম্বিয়ায়ে কেরামের স্থলাভিষিক্ত।” –মাজমুউল ফাতাওয়া : ১/৩

অন্যত্র আরেকটু ব্যাখ্যা করে বলেন,

ومن المستقر في أذهان المسلمين: أن ورثة الرسل وخلفاء الأنبياء هم الذين قاموا بالدين علما وعملا ودعوة إلى الله والرسول فهؤلاء أتباع الرسول حقا وهم بمنزلة الطائفة الطيبة من الأرض التي زكت فقبلت الماء فأنبتت الكلأ والعشب الكثير فزكت في نفسها وزكى الناس بها. وهؤلاء هم الذين جمعوا بين البصيرة في الدين والقوة على الدعوة ولذلك كانوا ورثة الأنبياء لذين قال الله تعالى فيهم: وَاذْكُرْ عِبَادَنَا إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ أُولِي الْأَيْدِي وَالْأَبْصَارِ (ص 45) فالأيدي القوة في أمر الله والأبصار البصائر في دين الله فبالبصائر يدرك الحق ويعرف وبالقوة يتمكن من تبليغه وتنفيذه والدعوة إليه. –مجموع الفتاوى، ج: 4، ص: 92، ط. مجمع الملك فهد

“সকল মুসলমানের ভাল করেই জানা যে, রসূলগণের উত্তরাধিকারী এবং আম্বিয়ায়ে কেরামের খলিফা তাঁরাই যারা ইলম, আমল এবং দাওয়াহ ইলাল্লাহর মাধ্যমে দ্বীন সংরক্ষণর দায়িত্ব পালন করেছেন। এরাই রসূলগণের প্রকৃত অনুসারী। তাঁরা ওই পবিত্র উর্বর ভূমির মতো যা (বৃষ্টির) পানি ধারণ করে প্রচুর ঘাস-লতা জন্মিয়েছে। নিজেও উপকৃত হয়েছে অন্যকেও উপকৃত করেছে। এরাই তাঁরা, যাদের মধ্যে ‘দ্বীনের বাসিরাত এবং জোরদারভাবে দ্বীনের দাওয়াত’: উভয়ের সমন্বয় ঘটেছে। এ কারণেই তাঁরা ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া, যে আম্বিয়াদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘স্মরণ করুন আমার বান্দা ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবকে। যারা ছিলেন শক্তি এবং বাসিরাতের অধিকারী’। (সূরা সোয়াদ (৩৮) : ৪৫) শক্তি দ্বারা আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়নের শক্তি এবং বাসিরাত দ্বারা আল্লাহর দ্বীনের বিষয়ে সমঝ ও অন্তর্দৃষ্টি উদ্দেশ্য। বাসিরাতের দ্বারা হক জানা ও বুঝা যায় আর শক্তির দ্বারা হকের তাবলিগ, বাস্তবায়ন ও হকের দাওয়াত দেয়া সম্ভব হয়।” –মাজমুউল ফাতাওয়া : ৪/৯২

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এখানে উলামায়ে হক্কানির তিনটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন,

১. দ্বীনের বাসিরাত।

২. ইলম অনুযায়ী আমল।

৩. নির্ভীক এবং আপোষহীনতার সাথে দ্বীন বাস্তবায়ন ও দ্বীনের দাওয়াত।

 

উপরোক্ত ভূমিকার পর আমরা উলামায়ে হক্বানি-রাব্বানির মৌলিক কিছু গুণ উল্লেখ করতে পারি:

  • ইখলাস

ইখলাস এ পথের প্রথম শর্ত। সকল নবী-রাসূলের ঘোষণা একটাই ছিল,

وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ –الشعراء 109

“এর বদৌলতে আমি তোমাদের নিকট কোনো বিনিময় চাই না। আমার প্রতিদান তো কেবল রাব্বুল আলামিনের কাছে।” –সূরা শুআরা (২৬) : ১০৯

উলামায়ে রাব্বানির পরিচয় দিতে গিয়ে হাফেয ইবনে হাজার রহ. (৮৫২হি.) বলেন,

وقال الأصمعي والإسماعيلي الرباني نسبة إلى الرب أي الذي يقصد ما أمره الرب بقصده من العلم والعمل -فتح الباري ج: 1، ص: 161؛ ط. دار المعرفة – بيروت

“আসমায়ি রহ. এবং ইসমাঈলি রহ. বলেন, রাব্বানি শব্দটি রবের দিকে সম্বন্ধিত। অর্থাৎ ইলম ও আমলের দ্বারা যার উদ্দেশ্য, রবের আদেশ পালন করা।” –ফাতহুল বারি : ১/১৬১

পক্ষান্তরে, দুনিয়াবি স্বার্থ যার উদ্দেশ্য থাকবে, আল্লাহ তাআলা তাকে অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন- যেমনটা সহীহ মুসলিমের হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। জান্নাতের ঘ্রাণও সে পাবে না- যেমনটা আবু দাউদের হাদিসে বর্ণিত  হয়েছে।

  • বাসিরাত ফিদ্দ্বীন

আল্লাহ তাআলা আম্বিয়ায়ে কেরামের একটি গুণ উল্লেখ করেছেন, أُولِي الْأَبْصَار অর্থাৎ তারা দ্বীনের ব্যাপারে শরহে সদরের অধিকারী। দ্বীনের ব্যাপারে তাঁদের কোনো সন্দেহ সংশয় নেই। পরিপূর্ণ বুঝে-শুনে তাঁরা দ্বীন মানেন। মনে-প্রাণে দিল দেমাগে দ্বীনের সঞ্জীবনী শক্তি। কোনো ধোঁকাবাজ তাদের ধোঁকায় ফেলতে পারে না। জাহিরি চোখ দিয়ে যেমন বাহ্যিক বস্তু দেখা যায়, তাঁরা তেমনি রূহানি দৃষ্টিশক্তির অধিকারী, যার দ্বারা হক-বাতিল পরিষ্কার বুঝতে পারেন। ওরাসাতুল আম্বিয়ারও একই সিফাত। আল্লাহ তাআলা তাঁর রসূলকে বলেন,

قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي –

“হে রসূল! আপনি বলে দিন, এ-ই আমার পথ। আমিও পরিপূর্ণ উপলব্ধির সাথে আল্লাহর দিকে ডাকি এবং যারা আমার অনুসরণ করে তারাও।” –সূরা ইউসুফ (১২) : ১০৮

  • আলেমেবা-আমল

ইলম অনুযায়ী আমল করেন। আহলে কিতাবের গাধাদের মতো না, যারা শুধু জানেই, আমল করে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,

{إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ} [فاطر: 28]

‘আল্লাহকে তো তাঁর বান্দাদের মধ্যে (যথাযথ) ভয় তারাই করে, যাঁরা ইলমের অধিকারী।’ –সূরা ফাতির (৩৫) : ২৮

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

أما والله إني لأخشاكم لله وأتقاكم له -صحيح البخاري، رقم: 4776؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا

“শোনো, তোমাদের মধ্যে আমিই সবচেয়ে বেশি আল্লাহভীরু এবং সবচেয়ে বড় মুত্তাকি।” –সহীহ বুখারি : ৪৭৭৬

ওয়ারাসাতুল আম্বিয়াগণও এমনই। তাঁদের ইলম যত বেশি হয় আমলও তত বেশি হয়। হাসান বসরি রহ. বলেন,

الذي يفوق الناس في العلم جدير أن يفوقهم في العمل -جامع بيان العلم وفضله- ابن عبد البر، ج: 1، ص: 705، رقم: 1270؛ ط. دار ابن الجوزي

“ইলমে যে এগিয়ে আমলেও তার এগিয়ে থাকা উচিৎ।” –জামিউ বয়ানিল ইলম : ১/৭০৫, আসার নং : ১২৭০

আরো বলেন,

العالم الذي وافق علمه عمله ومن خالف علمه عمله فذلك راوية أحاديث سمع شيئا فقاله -جامع بيان العلم وفضله- ابن عبد البر، ج: 1، ص: 698، رقم: 1241؛ ط. دار ابن الجوزي

“আলেম তো সে, যার ইলমের সাথে আমল আছে। ইলমের সাথে যার আমল নেই সে তো কিছু হাদিসের বর্ণনাকারী মাত্র। কিছু একটা শুনেছে, শুনে শুনে বলেছে।” -জামিউ বয়ানিল ইলম : ১/৬৯৮, আসার নং : ১২৪১

 

তাঁরা এমন নন যে, অন্যকে আমলের কথা বলেন আর নিজে এর উল্টো করেন। বরং তাঁদের আদর্শ তা-ই যা হযরত শুআইব আলাইহিস সালামের ছিল,

وَمَا أُرِيدُ أَنْ أُخَالِفَكُمْ إِلَى مَا أَنْهَاكُمْ عَنْهُ إِنْ أُرِيدُ إِلَّا الْإِصْلَاحَ مَا اسْتَطَعْتُ –

“আর আমি এটা চাই না যে, আমি তোমাদের যে কাজ করতে নিষেধ করি তোমাদের পশ্চাতে আমি নিজে সে কাজে লিপ্ত হই। আমি তো আমার সাধ্যমতো কেবল ইসলাহ করতে চাই।” –সূরা হুদ (১১) : ৮৮

 

  • ইলম ছাড়া কথা বলেন না

যা বলেন বুঝে শুনে বলেন। যে বিষয়ে ইলম নেই সে বিষয়ে কথা বলেন না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ –

“আর যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তার পিছে তুমি পড়ো না।” –সূরা ইসরা (১৭) : ৩৬

আরও ইরশাদ করেন,

أَلَمْ يُؤْخَذْ عَلَيْهِمْ مِيثَاقُ الْكِتَابِ أَنْ لَا يَقُولُوا عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقَّ (169) الأعراف

“ওদের থেকে কি কিতাবে এ অঙ্গীকার নেয়া হয়নি যে, আল্লাহর উপর সত্য ছাড়া মিথ্যা কিছু আরোপ করবে না?”–সূরা আ’রাফ (৭) : ১৬৯

আরও ইরশাদ করেন,

قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ (33) الأعراف

“আপনি বলুন, আমার রব তো হারাম করেছেন শুধু অশ্লীল বিষয়াদি: তার মধ্যে যা প্রকাশ্য তাও, যা গোপন তাও। আর হারাম করেছেন পাপ, অন্যায় বাড়াবাড়ি এবং এবিষয় যে, তোমরা আল্লাহর সাথে এমন জিনিস শরীক করবে যার কোনো প্রমাণ আল্লাহ তাআলা নাযিল করেননি এবং এবিষয় যে, তোমরা আল্লাহর উপর এমন কথা আরোপ করবে যা তোমরা জাননা ।” –সূরা আ’রাফ (৭) : ৩৩

আরও ইরশাদ করেন,

وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَذَا حَلَالٌ وَهَذَا حَرَامٌ لِتَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ لَا يُفْلِحُونَ –النحل 116

“তোমরা আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করে তোমাদের যবান দ্বারা বানানো মিথ্যার উপর নির্ভর করে বলো না যে, এটা হালাল এবং এটা হারাম। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রটায়, তারা সফল হবে না।” –সূরা নাহল (১৬) : ১১৬

হাদিসে এসেছে,

القضاة ثلاثة: واحد في الجنة، واثنان في النار، فأما الذي في الجنة فرجل عرف الحق فقضى به، ورجل عرف الحق فجار في الحكم، فهو في النار، ورجل قضى للناس على جهل، فهو في النار -سنن ابي داود، رقم: 3573؛ ط. دار الرسالة العالمية، ت: شعَيب الأرنؤوط – محَمَّد كامِل قره بللي، الناشر: دار الرسالة العالمية

“কাযি তিন শ্রেণীর; এক শ্রেণী জান্নাতী, দুই শ্রেণী জাহান্নামী। জান্নাতী হলো সে, যে হক (সত্য ও ন্যয়) জেনেছে এবং সে অনুযায়ী ফয়াসালা দিয়েছে। আর যে ব্যক্তি হক জেনেছে কিন্তু না-হক (অন্যায়) ফায়সালা দিয়েছে সে জাহান্নামী। আরেক ব্যক্তি যে অজ্ঞতা নিয়েই ফয়াসালা দিয়ে দিয়েছে সেও জাহান্নামী।” –সুনানে আবু দাউদ : ৩৫৭৩

হযরত আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

أيها الناس من علم منكم شيئا فليقل، ومن لم يعلم فليقل لما لا يعلم: الله أعلم؛ فإن من علم المرء أن يقول لما لا يعلم: الله أعلم -جامع بيان العلم وفضله- ابن عبد البر، ج: 2، ص: 831، رقم: 1556؛ ط. دار ابن الجوزي

“হে লোকসকল! যার কিছু জানা আছে সে তা বলবে। আর যার জানা নেই, সে যেন তার অজানা বিষয়ে বলে, ‘আল্লাহু আ’লাম’ তথা ‘আল্লাহই ভাল জানেন’। কেননা, কোনো ব্যক্তি ইলমওয়ালা হওয়ার এটিও একটি প্রমাণ যে, সে তার অজানা বিষয়ে বলবে, আল্লাহু আ’লাম।” –জামিউ বয়ানিল ইলম : ২/৮৩১, আসার নং : ১৫৫৬

 

  • নির্ভীক ও আপোষহীন দাঈ, হকের পথে অটল

আল্লাহর দ্বীন বাস্তবায়ন এবং দ্বীনের তাবলিগ সকল নবীর মিশন এবং একমাত্র মিশন। নবী রসূলদের পর ওরাসাতালু আম্বিয়ার এ দায়িত্ব। তাঁরা শুধু ব্যক্তিগত আমল নিয়েই ক্ষান্ত থাকেন না, নবী রসূলদের রেখে যাওয়া এ আমানত আদায় করেন। এ দায়িত্ব পালনে তাঁরা কোনরূপ শিথিলতা করেন না। আল্লাহ তাআলা আম্বিয়ায়ে কেরামের একটি সিফাত বলেছেন, أُولِي الْأَيْدِي অর্থাৎ দ্বীনের বিষয়ে কঠোর, হিম্মতের অধিকারী এবং আপোষহীন। কোনো কিছুই তাঁদেরকে রুখতে পারে না। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, “আমার এক হাতে চন্দ্র আরেক হাতে সূর্য এনে দিলেও এ পথ থেকে বিরত হব না”।

  • দ্বীনের কোনো কিছু গোপন করেন না বা অপব্যাখ্যা করেন না

মাখলুখের কাছে ঠিক ঠিকভাবে দ্বীন পৌঁছে দেয়ার যে অঙ্গীকার আল্লাহ তাআলা আহলে ইলম থেকে নিয়েছেন তাঁরা তা শতভাগ পালন করেন। আহলে কিতাব ও উলামায়ে সু-দের মতো দুনিয়াবি স্বার্থে দ্বীনের কোনও কিছু গোপন করেন না বা দ্বীনের অপব্যাখ্যা করেন না।

  • সত্য উচ্চারণে নির্ভীক

আল্লাহ তাআলা আদেশ দিচ্ছেন,

فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ

“তোমাকে যে বিষয়ে আদেশ দেয়া হয় তুমি তা প্রকাশ্যে শুনিয়ে দাও।” –সূরা হিজর (১৫) : ৯৪

এ দায়িত্ব পালনে তাঁরা কোনও পরোয়া করেন না। যেমন পরোয়া করতেন না আম্বিয়ায়ে কেরাম। আল্লাহ তাআলা নবী রসূলদের এ গুণ প্রসঙ্গে বলেন,

الَّذِينَ يُبَلِّغُونَ رِسَالَاتِ اللَّهِ وَيَخْشَوْنَهُ وَلَا يَخْشَوْنَ أَحَدًا إِلَّا اللَّهَ –الأحزاب 39

“যাঁরা আল্লাহর পয়গামসমূহ মানুষদের কাছে পৌঁছে দেন এবং তাঁকেই ভয় করেন; আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করেন না।” সূরা আহযাব (৩৩) : ৩৯

  • ফিতনা ও বাতিলের মোকাবেলায় সোচ্চার

যখনই কোনো নতুন ফিতনা মাথাচাড়া দেয়, উলামায়ে হক্কানি কোমর বেঁধে নামেন। উলামায়ে হক্কানির এটি চিরন্তন বৈশিষ্ট্য। রাওয়াফেজ, খাওয়ারেজ, মু’তাজিলা, বাতিনি- যত ফিতনা যখনই উঠেছে উলামায়ে হক তা প্রতিহত করেছেন। অকাট্য দলীল প্রমাণ দ্বারা খণ্ডন করেছেন। হক বাতিল পরিষ্কার করে দিয়েছেন। যেমনটি হাদিসে এসেছে,

يحمل هذا العلم من كل خلف عدوله ينفون عنه تحريف الغالين وانتحال المبطلين وتأويل الجاهلين –شرح مشكل الآثار للطحاوى، رقم: 3884، تحقيق: شعيب الأرنؤوط، الناشر: مؤسسة الرسالة

“প্রত্যেক পরবর্তী প্রজন্মের আদেল ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিবর্গই এই ইলমের ধারক-বাহক হবেন; যারা সীমালঙ্ঘনকারীদের বিকৃতি, বাতিল লোকদের মিথ্যারোপ এবং মূর্খদের অপব্যাখ্যা থেকে এই ইলমকে রক্ষা করবেন।”

-শরহু মুশকিলিল আসার লিত-ত্বহাবি : ৩২৬৯

এই শ্রেণীর উলামায়ে হক কেয়মাত পর্যন্তই থেকে যাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে সুসংবাদ দিয়ে গেছেন,

لا تزال طائفة من أمتى قائمة بأمر الله لا يضرهم من خذلهم أو خالفهم حتى يأتى أمر الله وهم ظاهرون على الناس-صحيح مسلم، رقم: 5064؛ ط. دار الجيل بيروت + دار الأفاق الجديدة ـ بيروت

“আমার উম্মতের একটি দল সব সময় আল্লাহর দ্বীনের দায়িত্ব পালন করেই যাবে। যারা তাদের সাহায্য না করবে বা বিরোধিতা করবে তারা তাঁদের কোনও ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলার ফায়সালা উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত (তথা কেয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত) তাঁরা লোকদের উপর বিজয়ীই থেকে যাবে।” –সহীহ মুসলিম : ৫০৬৪

রাওয়াফেজ ও খাওরেজদের উৎপত্তির সাথে সাথে সাহাবায়ে কেরামসহ আইম্মায়ে দ্বীন তাদের বিভ্রান্তি উম্মাহর সামনে স্পষ্ট করে দেন। মু’তাজিলা ফিরকা যখন ক্ষমতা পেয়ে যায় এবং খালকে কুরআনের ফিতনা দেখা দেয় তখন ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. এর মতো উলামায়ে হক অটল অবিচলতার সাথে সেই ফিতনার মোকাবেলা করেন। বাতিনিদের খণ্ডনে উলামায়ে মাগরিবের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। এ জন্য তাঁরা যে কী পরিমাণ জুলুম নির্যাতনের শিকার হন তার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। শিরক ও বিদআত খণ্ডনে ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. ও মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব নজদি রহ. এর ভূমিকা সকলেরই জানা। হিন্দুস্তানে খৃস্টান মিশনারি তৎপরতা শুরু হলে আমাদের আকাবিরগণ জীবন বাজি রেখে সেই ফিতনার মোকাবেলা করেন। এ কারণে তাঁদেরকে সীমাহীন কষ্ট সহ্য করতে হয়, জেল-জুলুমের শিকার হতে হয়। পক্ষান্তরে, বেরেলবি ও নামধারী আহলে হাদিসরা তখন ইংরেজদের ছত্রছায়ায় আয়েশি জীবন যাপন করেছে। বর্তমানে যখন সারা বিশ্বে উম্মুল ফিতান তথা কুফরি গণতন্ত্রের চর্চা শুরু হয়েছে তখন হক্কানি উলামায়ে কেরাম উম্মাহর সামনে এর মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছেন। পরিণামে তাদের অনেকের উপর দিয়ে জেল-জুলুম আর নির্যাতনের স্টিম রোলায় বয়ে গেছে, এ ধারা এখনো চলছে। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তাগুতের যিন্দানখানায় শাহাদাত বরণ করেছেন কতশত আলেম উলামা তার কোন হিসেব নেই। এরাই হলেন প্রকৃত অর্থে ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া।

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. উলামায়ে হকের পরিচয় তুলে ধরেন,

الحمد لله الذي جعل في كل زمان فترة من الرسل، بقايا من أهل العلم يدعون من ضل إلى الهدى، ويصبرون منهم على الأذى، يحيون بكتاب الله الموتى، ويبصرون بنور الله أهل العمى، فكم من قتيل لإبليس قد أحيوه، وكم من ضالٍ تائه قد هدوه، فما أحسن أثرهم على الناس، وأقبح أثر الناس عليهم. ينفون عن كتاب الله تحريف الغالين، وانتحال المبطلين، وتأويل لجاهلين –الرد على الجهمية والزنادقة، ص: 55-56، ط. دار الثبات للنشر والتوزيع

“আলহামদুলিল্লাহ, যিনি রসূলদের অনুপস্থিতির প্রত্যেক যামানায় কিছু আহলে ইলম অবশিষ্ট রেখেছেন, যাঁরা পথহারাদের হিদায়াতের দিকে ডাকেন। পরিণামে যে কষ্ট-ক্লেশ আসে তাতে সবর করেন। কিতাবুল্লাহ দ্বারা মৃতদের মাঝে হায়াত সঞ্চার করেন। আল্লাহর নূর দ্বারা অন্ধকে করে তোলেন চক্ষুষ্মান। ইবলিসের হাতে নিহত কতশত মুর্দাকে তাঁরা জীবিত করেছেন। কতশত উদভ্রান্ত পথহারাকে পথ দেখিয়েছেন। জনমানুষের প্রতি তাঁদের অবদান কতোই মহান। পরিণামে তাঁদের সাথে মানুষের আচরণ কতই না মন্দ। সীমালঙ্ঘনকারীদের বিকৃতি, বাতিল লোকদের মিথ্যারোপ এবং মূর্খদের অপব্যাখ্যা থেকে কিতাবুল্লাহকে তাঁরা সুরক্ষিত রাখেন।” –আররদ্দু আলাল জাহমিয়াহ ওয়াযযানাদিকা : ৫৫-৫৬

 

  • শাসকের দরবার থেকে দূরে

শাসক থেকে দূরে থাকা সব যুগের হক্কানির উলামায়ে কেরামের বৈশিষ্ট্য। একান্ত বাধ্য না করা হলে তাঁরা শাসকের দরবারে একদমই যেতেন না। আমরা আলোচনা করেছি, শাসকের দরবার ফিতনার চারণভূমি। এ দরবারে আলেমের দ্বীনদারিতা ঠিক থাকে না। পক্ষান্তরে, শাসকের দরবার উলামায়ে সূ-দের সমাগমস্থল। বিভিন্ন বাহানায় তারা শাসকের সাথে এবং ক্ষমতাশীলদের সাথে সম্পর্ক গড়তে প্রয়াস চালায়। উলামায়ে হক্কানি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। যদি কখনও যেতেন, হয়তো আমর বিল মা’রূফ ও নাহি আনিল মুনকারের উদ্দেশ্যে যেতেন, নয়তো জবরদস্তি ধরে নেয়া হতো। (বক্তব্য আরেকটু পরিষ্কার করা দরকার) আবদুল্লাহ ইবনে আউন রহ. (১৫১হি.) বলেন,

كان الرجل يفر بما عنده من الأمراء جهده فإذا أخذ لم يجد بدا -جامع بيان العلم وفضله – ابن عبد البر، ج: 1، ص: 636، رقم: 1095؛ ط. دار ابن الجوزي

“এক সময় ছিল যখন আলেম তাঁর দ্বীন ও ঈমান নিয়ে উমারাদের থেকে পালাতেন। তবে যদি জবরদস্তি করে ধরে আনা হতো তখন তো আর গত্যন্তর ছিল না।” –জামিউ বায়ানিল ইলম : ১/৬৩৬, আসার নং : ১০৯৫

 

সুফিয়ান সাওরি রহ. বলেন,

كان خيار الناس وأشرافهم والمنظور إليهم في الدين الذين يقومون إلى هؤلاء فيأمرونهم يعني الأمراء -جامع بيان العلم وفضله – ابن عبد البر، ج: 1، ص: 640، رقم: 1107؛ ط. دار ابن الجوزي

“সবচে’ ভাল, সবচে’ সম্মানী এবং দ্বীনে অনুসরণীয় ওইসব লোক ছিলেন, যাঁরা উমারাদের কাছে গিয়ে আমর বিল মা’রূফ করতেন।” –জামিউ বায়ানিল ইলম : ১/৬৪০, আসার নং : ১১০৭

 

  • আমর বিল মা’রূফ নাহি আনিল মুনকার

আমর বিল মা’রূফ নাহি আনিল মুনকার এ উম্মাহর শিয়ার-প্রতীক। উম্মাহর শ্রেষ্ঠত্বের কারণ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ…

“তোমরাই (দুনিয়ায়) সর্বোত্তম জাতি। মানুষের কল্যাণের জন্যই তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। (শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে তোমাদের কাজ হচ্ছে) তোমরা দুনিয়ার মানুষদের সৎকাজে আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজে বাধা দেবে।” –সূরা আলে ইমরান (৩) : ১১০

আরও ইরশাদ করেন,

وَلْتَكُنْ مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلى الخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ اْلمُنكَرِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ المُفْلِحُونَ

“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা চাই- যারা (মানুষকে) কল্যাণের দিকে ডাকবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজে বাধা দেবে। আর এরূপ লোকই সফলকাম।” –সূরা আলে ইমরান (৩) : ১০৪

আল্লাহ তাআলা লুকমান আলাইহিস সালামের উপদেশ বিবৃত করেন,

يَابُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ

“ওহে আমার পুত্র! নামায কায়েম কর, সৎকাজে আদেশ দাও, মন্দ কাজে বাধা দাও এবং (এ কারণে) তোমার যে কষ্ট দেখা দেয় তাতে সবর কর। নিশ্চয়ই এটা বড় হিম্মতের কাজ।” –সূরা লুকমান (৩১) : ১৭

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

من رأى منكم منكرا فليغيره بيده فان لم يستطع فبلسانه فان لم يستطع فبقلبه وذلك اضعف الايمان -صحيح مسلم، رقم: 186؛ ط. دار الجيل بيروت + دار الأفاق الجديدة ـ بيروت

“তোমাদের যে কেউ কোনো মন্দ কাজ দেখবে, সে যেন স্বহস্তে (শক্তিবলে) তা প্রতিহত করে। যদি তাতে সক্ষম না হয়, তাহলে যেন তার যবান দিয়ে প্রতিহত করে। যদি তাতেও সক্ষম না হয়, তাহলে অন্তর দিয়ে। আর এটা১ দুর্বলতম ঈমান।” -সহীহ মুসলিম : ১৮৬

অন্য হাদিসে ইরশাদ করেন,

إن الناس إذا رأوا الظالم فلم يأخذوا على يديه أوشك أن يعمهم الله بعقاب -سنن ابي داود، رقم: 4338؛ ط. دار الرسالة العالمية، ت: شعَيب الأرنؤوط – محَمَّد كامِل قره بللي. قال الأرنؤوط رحمه الله تعالى: إسناده صحيح. اهـ

“যখন লোকজন জালেমকে (জুলুম করতে) দেখেও তার হাত না আটকাবে, তখন অচিরেই আল্লাহ তাআলা ব্যাপকভাবে তাদের উপর আযাব নাযিল করবেন।” –সুনানে আবু দাউদ : ৪৩৩৮

অন্য হাদিসে এসেছে,

ما من قوم يعمل فيهم بالمعاصى ثم يقدرون على أن يغيروا ثم لا يغيروا إلا يوشك أن يعمهم الله منه بعقاب -سنن ابي داود، رقم: 4338؛ ط. دار الرسالة العالمية، ت: شعَيب الأرنؤوط – محَمَّد كامِل قره بللي. قال الأرنؤوط رحمه الله تعالى: إسناده صحيح. اهـ

“যখন কোনো সম্প্রদায়ে গুনাহের কাজ হয়, আর জাতির অন্য লোকসকল তা প্রতিহত করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও প্রতিহত করেনা, তখন অতিশীঘ্রই আল্লাহ তাআলা ব্যাপকভাবে তাদের উপর তাঁর আযাব নাযিল করেন।” –সুনানে আবু দাউদ : ৪৩৩৮

অন্যায় প্রতিহত করার এ দায়িত্ব সামর্থ্যানুযায়ী উম্মাহর সকলের উপর ফরয। এ দায়িত্ব ব্যাপকভাবে পরিত্যাগ করায় বনি ইসরাঈলের উপর লা’নত বর্ষিত হয়েছিল। আজ মুসিলম উম্মাহর অধঃপতন এ ফরয ত্যাগ করার কারণেই। জালেমকে যদি সময়মতো আটকানো হতো তাহলে এ অধঃপতন হতো না।

এ দায়িত্ব উলামায়ে কেরামের উপর আরও বেশি। বনি ইসরাঈলের উলামা ও দরবেশদের ধমক দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,

لَوْلَا يَنْهَاهُمُ الرَّبَّانِيُّونَ وَالْأَحْبَارُ عَنْ قَوْلِهِمُ الْإِثْمَ وَأَكْلِهِمُ السُّحْتَ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَصْنَعُونَ (63) المائدة

“উলামা ও দরবেশরা কেন তাদের নিষেধ করতনা পাপের কথা বলা এবং হারাম খাওয়া থেকে? কত নিকৃষ্ট কাজই না তারা করত।” –সূরা মায়েদা (৫) : ৬৩

হক্কানি উলামায়ে কেরাম আল্লাহ তাআলার এ অকাট্য নির্দেশের উপর আমল করেন।

হাদিসে এসেছে,

أفضلُ الجهاد كلمةُ عدلٍ عند سُلطانٍ جائرٍ -سنن ابي داود، رقم: 4344؛ ط. دار الرسالة العالمية، ت: شعَيب الأرنؤوط – محَمَّد كامِل قره بللي. قال الأرنؤوط رحمه الله تعالى: صحح لغيره. اهـ

“সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক কথা বলা।” –সুনানে আবু দাউদ : ৪৩৪৪

অন্য হাদিসে এসেছে,

عن أبي عُبيدة بن الجراح ، قال : قلتُ : يا رسول الله ، أيُّ الشُّهداءِ أكرم على الله ؟ قال : رجلٌ قام إلى إمامٍ جائرٍ، فأمره بمعروفٍ ، ونهاه عن المنكر فقتله –مسند البزاز، رقم: 1285، ط. مكتبة العلوم والحكم – المدينة المنورة

“হযরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, ‘আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তাআলার কাছে সর্বাপেক্ষা সম্মানিত শহীদ কোন ব্যক্তি’? তিনি উত্তর দিলেন, ‘ওই ব্যক্তি যে, কোনো জালিম শাসকের সামনে গিয়ে তাকে সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজে বাধা দেয়, ফলে তারা তাঁকে হত্যা করে ফেলে।” -মুসনাদে বাযযার : ১২৮৫

এ ফজিলত লাভের জন্য উলামায়ে হক্কানি যুগে যুগে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অসৎ কাজে বাধা দিতেন। এতে কেউ শহীদ হয়েছেন কেউবা নির্যাতন ভোগ করেছেন। তবুও পিছপা হননি। হযরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু, ইমাম আবু হানিফা রহ., ইব্রাহিম সায়িগ রহ.- প্রমুখ বরেণ্যদের শাহাদাতের রক্তে এ ইতিহাস লিখা। হযরত সায়িদ বিন মুসায়্যিব, ইবনুল মুনকাদির, ইবনে আবি যি’ব ও ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ.র মতো বরেণ্যরা এ ক্ষেত্রে আমাদের অনুসরণীয়।

পক্ষান্তরে, যারা মিষ্টি মিষ্টি সুন্নত পালনে আগ্রহী আর কঠিনগুলো থেকে দূরে, তারা আসলে ওরাসালাতুল আম্বিয়া নয়। এ প্রসঙ্গে ইবনুল কায়্যিম রহ. এর খুবই মূল্যবান একটি কথা আছে, যা স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো। তাঁর কথাটি উল্লেখ না করে পারছি না। তিনি বলেন,

وقد غر إبليس أكثر الخلق بأن حسن لهم القيام بنوع من الذكر والقراءة والصلاة والصيام والزهد في الدنيا والانقطاع، وعطلوا هذه العبوديات، فلم يحدثوا قلوبهم بالقيام بها، وهؤلاء عند ورثة الأنبياء من أقل الناس دينا؛ فإن الدين هو القيام لله بما أمر به، فتارك حقوق الله التي تجب عليه أسوأ حالا عند الله ورسوله من مرتكب المعاصي؛ فإن ترك الأمر أعظم من ارتكاب النهي من أكثر من ثلاثين وجها ذكرها شيخنا – رحمه الله – في بعض تصانيفه؛ ومن له خبرة بما بعث الله به رسوله – صلى الله عليه وسلم – وبما كان عليه هو وأصحابه رأي أن أكثر من يشار إليهم بالدين هم أقل الناس دينا، والله المستعان، وأي دين وأي خير فيمن يرى محارم الله تنتهك وحدوده تضاع ودينه يترك وسنة رسول الله – صلى الله عليه وسلم – يرغب عنها وهو بارد القلب ساكت اللسان؟ شيطان أخرس، كما أن المتكلم بالباطل شيطان ناطق، وهل بلية الدين إلا من هؤلاء الذين إذا سلمت لهم مآكلهم ورياساتهم فلا مبالاة بما جرى على الدين؟ ، وخيارهم المتحزن المتلمظ، ولو نوزع في بعض ما فيه غضاضة عليه في جاهه أو ماله بذل وتبذل وجد واجتهد، واستعمل مراتب الإنكار الثلاثة بحسب وسعه. وهؤلاء – مع سقوطهم من عين الله ومقت الله لهم – قد بلوا في الدنيا بأعظم بلية تكون وهم لا يشعرون، وهو موت القلوب؛ فإنه القلب كلما كانت حياته أتم كان غضبه لله ورسوله أقوى، وانتصاره للدين أكمل.

وقد ذكر الإمام أحمد وغيره أثرا «أن الله سبحانه أوحى إلى ملك من الملائكة أن اخسف بقرية كذا وكذا، فقال: يا رب كيف وفيهم فلان العابد؟ فقال: به فابدأ؛ فإنه لم يتمعر وجهه في يوما قط» .

وذكر أبو عمر في كتاب التمهيد «أن الله سبحانه أوحى إلى نبي من أنبيائه أن قل لفلان الزاهد: أما زهدك في الدنيا فقد تعجلت به الراحة، وأما انقطاعك إلي فقد اكتسبت به العز، ولكن ماذا عملت فيما لي عليك؟ فقال: يا رب وأي شيء لك علي؟ قال: هل واليت في وليا أو عاديت في عدوا» ؟ -إعلام الموقعين ، ج: 2، ص: 120-121، دار الكتب العلمية – ييروت

“ইবলিস অধিকাংশ মানুষকে এভাবে ধোঁকায় ফেলে দিয়েছে যে, নির্দিষ্ট কিছু যিকির, তিলাওয়াত, নামায, রোযা, যুহদ ও দুনিয়াত্যাগের মতো আমলসমূকে তাদের সামনে সুসজ্জিত করে দেখিয়েছে। আর তারা (আমর বিল মা’রূফ, নাহি আনিল মুনকার, জিহাদ ও দ্বীনের পথের কষ্টসাধ্য) এসব আমল পরিত্যাগ করেছে। বাস্তবে নবীগণের প্রকৃত উত্তরসূরিদের দৃষ্টিতে এরাই সবচেয়ে কম দ্বীনদার শ্রেণীর লোক। কেননা, দ্বীন তো হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহর আদেশ পালন করা। যে ব্যক্তি তার উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত আবশ্যকীয় হকগুলো আদায় করে না, সে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দৃষ্টিতে গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির চেয়েও নিকৃষ্ট। কেননা, আদেশ পালন না করা ত্রিশ দিক দিয়ে নাফরমানী করার চেয়েও গুরুতর অপরাধ। আমাদের শায়েখ (ইবনে তাইমিয়া) রহ. তাঁর এক কিতাবে সেগুলো উল্লেখ করেছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তায়ালা যে দ্বীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন এবং তিনি ও তাঁর সাহাবিগণ যে দ্বীন পালন করে গেছেন, সে সম্পর্কে যাঁরা জ্ঞান রাখেন, তাঁরা দেখতে পান, দ্বীনদ্বার বলে প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের অধিকাংশই (এখন) সবচেয়ে কম দ্বীনদ্বার শ্রেণীর লোক। আল্লাহর পানাহ! আল্লাহ তায়ালার নিষিদ্ধ বস্তুগুলো পদদলিত হতে দেখেও, আল্লাহর বেঁধে দেয়া সীমা লঙ্ঘিত হতে দেখেও, আল্লাহর দ্বীন পরিত্যক্ত হতে দেখেও এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর প্রতি বিমুখতা দেখেও যার অন্তর প্রশান্ত, যবান নিশ্চুপ- তার মধ্যে আবার কিসের দ্বীনদারী? কিসের কল্যাণ? সে তো বোবা শায়তান, যেমন বাতিল বলনেওয়ালা সবাক শয়তান। দ্বীনের ধ্বংস তো এদের কারণেই হচ্ছে; উদরপূর্তির ব্যবস্থা আর গদি ঠিক থাকলে দ্বীনের কি হল না হল সে নিয়ে যাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। তাদের মধ্যে যাদের দ্বীনদারি সবচেয়ে ভালো, তাদের অবস্থা হল: একটু চিন্তিত হয় আর হালকা সমালোচনা করেই ক্ষান্ত হয়। পক্ষান্তরে, যদি এদের সম্মান ও সম্পদে কোন আঘাত লাগে, তাহলে রেগে আগুন হয়ে যায়। সর্বসামর্থ্য দিয়ে নাহি আনিল মুনকারের তিনটি স্তর (হাত, যবান ও অন্তর) প্রয়োগ করে।

এরা যে শুধু আল্লাহর (রহমতের) দৃষ্টি থেকে সরে গেছে এবং আল্লাহ তাআলা তাদের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন তা-ই নয়, বরং এরা নিজেদের অজান্তেই দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মুসিবতের শিকার হয়েছে। আর তা হলো- অন্তরের মৃত্যু। কেননা অন্তর যতটা প্রাণবন্ত হয় আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পথে তার ক্রোধ তত বেশি হয়; দ্বীনের জন্য তত বেশি প্রতিশোধ পরায়ণ হয়।

ইমাম আহমদ রহ.সহ আরও অনেকে একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন। হাদিসটি হল, আল্লাহ তায়ালা এক ফেরেশতাকে আদেশ দিলেন, অমুক অমুক জনপদ ধ্বসিয়ে দাও। ফেরেশতা আরজ করল, ‘হে রব! সেখানে তো অমুক ইবাদতগুজার বান্দা আছে, তাহলে কীভাবে ধ্বংস করবো’? আল্লাহ তায়ালা উত্তর দেন, ‘তাকে দিয়েই শুরু করো। (অন্যায় কাজ দেখেও) আমার জন্য কোনো এক দিনও তার চেহারায় অসন্তুষ্টি দেখা দেয়নি’।

আবু উমার (ইবনে আব্দুল বার) রহ. ‘তামহিদ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, আল্লাহ তায়ালা এক নবীর নিকট ওহী পাঠান, তুমি অমুক যাহেদকে বলো, ‘দুনিয়াবিমুখতার দ্বারা তুমি দুনিয়াতে অগ্রিম প্রশান্তি বেছে নিয়েছ। আমার ইবাদতে নিমগ্ন হওয়ার দ্বারা তুমি সম্মান লাভ করেছ। কিন্তু তোমার উপর আমার যে হক রয়েছে, তার জন্য তুমি কী করেছ’? যাহেদ আরজ করল, ‘হে রব! আমার উপর আপনার কোন্ হক পাওনা আছে’? আল্লাহ তায়ালা উত্তর দিলেন, ‘তুমি কি আমার সন্তুষ্টির জন্য কাউকে মহব্বত করেছ? কিংবা আমার সন্তুষ্টির জন্য কারো সাথে শত্রুতা পোষণ করেছ?” -ই’লামুল মুয়াককিয়িন : ২/১২০-১২১

  • বিপদাপদে সবর করা

দ্বীনের পথে কষ্ট-নির্যাতন বরদাশত করা আম্বিয়ায়ে কেরামের সুন্নত। মিরাস সূত্রে উলামায়ে হক্কানি এ সুন্নতের উত্তরাধিকারী। ইমাম আহমদ ও ইমাম ইবনে মাজা রহ.সহ আরও অনেকে হযরত সা’দ বিন আবি ওয়াককাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেন। হযরত সা’দ বিন আবি ওয়াককাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

قلت: يا رسول الله أي الناس أشد بلاء؟ قال: ” الأنبياء، ثم الصالحون، ثم الأمثل، فالأمثل من الناس، يبتلى الرجل على حسب دينه، فإن كان في دينه صلابة زيد في بلائه، وإن كان في دينه رقة خفف عنه، وما يزال البلاء بالعبد حتى يمشي على ظهر الأرض ليس عليه خطيئة ” -مسند الإمام أحمد، رقم: 1481؛ ط. الرسالة، ت: شعيب الأرنؤوط، عادل مرشد، وآخرون. قال المحققون: إسناده حسن. اهـ

“আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! সবচে’ বেশি বিপদাপদ কাদের উপর আসে’? তিনি উত্তর দেন, ‘আম্বিয়াদের উপর, তারপর সালিহিনদের উপর, তারপর ক্রমানুসারে যে যত ভাল। ব্যক্তি তার দ্বীনদারির মাত্রা অনুযায়ী বিপদের সম্মুখীন হয়। দ্বীনদারিতে পাকা হলে মুসিবত বেশি আসে। দ্বীনদারি কাঁচা হলে বিপদও কম আসে। বান্দার উপর বিপদাপদ আসতেই থাকে আসতেই থাকে, শেষে এ পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, যমিনের উপর দিয়ে সে এ অবস্থায় চলাফেরা করে যে, তার কোনোই গোনাহ নেই।” –মুসনাদে আহমাদ : ১৪৮১

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমর বিল মা’রূফ এবং নাহি আনিল মুনকারের কথা বলেই বিপদাপদে সবর করার তালকিন করেছেন,

وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ -لقمان 17

“সৎকাজে আদেশ দাও, মন্দ মন্দ কাজে বাধা দাও এবং (এ কারণে) তোমার যে কষ্ট দেখা দেয় তাতে সবর কর। নিশ্চয়ই এটা বড় হিম্মতের কাজ।” –সূরা লুকমান (৩১) : ১৭

ইমাম তাবারি রহ. বলেন,

(وأمُرْ بالمعْرُوفِ) يقول: وأمر الناس بطاعة الله، واتباع أمره (وَانْهَ عَنِ المُنْكَرِ) يقول: وانه الناس عن معاصي الله ومواقعة محارمه (وَاصْبِرْ عَلى ما أصَابَكَ) يقول: واصبر على ما أصابك من الناس في ذات الله، إذا أنت أمرتهم بالمعروف، ونهيتهم عن المنكر، ولا يصدّنك عن ذلك ما نالك منهم (إنَّ ذلكَ مِنْ عَزْمِ الأمُورِ) يقول: إن ذلك مما أمر الله به من الأمور عزما منه. –جامع البيان في تأويل القرآن، ج: 20، ص: 142؛ ط. مؤسسة الرسالة، ت: أحمد شاكر

“আল্লাহ তাআলা বলছেন, লোকদেরকে আল্লাহর আনুগত্য করতে এবং তাঁর আদেশ মেনে চলতে আদেশ দাও এবং তাদেরকে আল্লাহর নাফরমানি এবং তাঁর হারামসমূহে লিপ্ত হওয়া থেকে বাধা দাও। যখন নেক কাজে আদেশ দেবে, অসৎ কাজে বাধা দেবে তখন আল্লাহর পথে যে বিপদাপদ আসবে তাতে সবর করবে। তাদের থেকে যে কষ্ট তুমি পাচ্ছো তা যেন তোমাকে এ কাজ থেকে বিরত না রাখে। এটি আল্লাহ তাআলার অবশ্যপালনীয় নির্দেশ।” –তাফসিরে তাবারি : ২০/১৪২

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন,

والله تعالى قد جعل أكمل المؤمنين إيمانا أعظمهم بلاء -قاعدة فى المحبة 150، ط. مكتبة التراث الإسلامي، القاهرة، مصر

“যাঁরা সবচে বেশি বিপদাপদের শিকার, আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকেই কামেল মুমিন বানান।” –কায়িদাতুন ফিল মাহাব্বাহ : ১৫০

আরো বলেন,

ثم إذا أمر ونهى فلا بد أن يؤذى في العادة، فعليه أن يصبر ويحلم. كما قال تعالى: {وأمر بالمعروف وانه عن المنكر واصبر على ما أصابك إن ذلك من عزم الأمور} (سورة: لقمان 17 )

وقد أمر الله نبيه بالصبر على أذى المشركين في غير موضع، وهو إمام الآمرين بالمعروف الناهين عن المنكر. -منهاج السنة النبوية، ج: 5، ص: 254، ط. جامعة الإمام محمد بن سعود الإسلامية

“সৎ কাজে আদেশ দেয়া ও মন্দ কাজে বাধা দেয়ার পর স্বাভাবিক কিছু কষ্ট পোহাতেই হয়। তাই সবর করতে হবে এবং সহনশীল হতে হবে। … আল্লাহ তাআলা অনেক আয়াতে তাঁর নবীকে মুশরিকদের দেয়া কষ্ট-ক্লেশ বরদাশত করতে বলেছেন। আর তিনিই তো আমর বিল মা’রূফ ওয়া নাহি আনিল মুনকারের ইমাম।”

–মিনহাজুস সুন্নাহ : ৫/২৫৪

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবী হওয়ার পর যখন ওয়ারাকা বিন নাওফেলের কাছে যান, তখন তিনি বলেছিলেন, অচিরেই তোমার কওম তোমাকে এ ভূমি থেকে বের করে দেবে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশ্চর্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘তারা আমাকে বের করে দেবে’? ওয়ারাকা বিন নাওফেল জওয়াব দিয়েছিলেন,

نعم، لم يأت رجل قط بمثل ما جئت به إلا عودي -صحيح البخاري، رقم: 3؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا

“হ্যাঁ! তুমি যে দাওয়াত নিয়ে এসেছ, ইতিপূর্বে যারাই এ দাওয়াত নিয়ে এসেছে তাঁদের সবার সাথেই দুশমনি করা হয়েছে।” –সহীহ বুখারি : ৩

কিন্তু আজকের দুনিয়ায় সমীকরণ পাল্টে গেছে। আজকাল যাদেরকে নবীদের ওয়ারিস গণ্য করা হচ্ছে তারা ফুলেল বিছানায় শুয়ে-বসে সরকারি নিরাপত্তায় জীবন কাটাচ্ছে, অথচ একই সময় সরকারের যিন্দানখানায় হাজারো যুবক-তরুণ, আলেম-দাঈ অমানবিক নির্যাতনে কাতরাচ্ছেন।

অনেকে আবার গর্ব করে বলেও বেড়ান, ‘আলহামদুলিল্লাহ! কারও সাথেই আমার দুশমনি নাই। আমার কোনও শত্রু নাই’।

কেউ কেউ তো আরও অগ্রসর হয়ে বলেন, ‘কাদিয়ানিরা পর্যন্ত আমার কথায় সন্তুষ্ট’।

ইন্নালিল্লাহ! ইন্নালিল্লাহ! এমন ভালো (?) মানুষগুলো সত্যিকারের ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া হবেন কীভাবে?

ইমাম ইবনুল কায়্যিম রহ. এর কথাটা আবারও স্বরণ করিয়ে দিই,

وهؤلاء عند ورثة الأنبياء من أقل الناس دينا

“(সত্যিকার) ওয়ারাসাতুল আম্বিয়াদের দৃষ্টিতে এরাই সবচেয়ে দুর্বল দ্বীনদার”।

 

  • রিবাত ও জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ

জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ আম্বিয়ায়ে কেরাম ও তাঁদের সত্যিকারের অনুসারীদের বৈশিষ্ট্য। পক্ষান্তরে, জিহাদ থেকে দূরে থাকা মুনাফিক ও দুর্বল ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَكَأَيِّنْ مِنْ نَبِيٍّ قَاتَلَ مَعَهُ رِبِّيُّونَ كَثِيرٌ فَمَا وَهَنُوا لِمَا أَصَابَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَا ضَعُفُوا وَمَا اسْتَكَانُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ –آل عمران 146

“এমন কত নবী ছিলেন যাদের সঙ্গে মিলে বহু আল্লাহওয়ালা যুদ্ধ করেছেন। আল্লাহর পথে তাঁদের যে কষ্ট-বিপদ এসেছে তার কারণে তাঁরা সাহস হারাননি, দুর্বলও হননি এবং (শত্রুর সামনে) মাথা নতও করেননি। আর আল্লাহ অটল অবিচল লোকদের ভালবাসেন।” –আলে ইমরান (৩) : ১৪৬

رِبِّيُّونَ দ্বারা কারা উদ্দেশ্য, এ প্রসঙ্গে ইবনে কাসির রহ. বলেন,

وقال عبد الرزاق، عن معمر عن الحسن: {ربيون كثير} أي: علماء كثير، وعنه أيضا: علماء صبر أبرار أتقياء. –تفسير القرآن العظيم ، ج: 2، ص: 131؛ ط. دار طيبة للنشر والتوزيع

“আব্দুর রাযযাক রহ. মা’মার রহ. এর সূত্রে হাসান বসরি রহ. থেকে বর্ণনা করেন, رِبِّيُّونَ كَثِيرٌ মানে অনেক অনেক উলামা। হাসান বসরি রহ. থেকে এও বর্ণিত আছে যে, তাঁরা হলেন নেককার, মুত্তাকি ও অটল অবিচল উলামা।”

–তাফসিরে ইবনে কাসির : ২/১৩১

আয়াতে দুই রকম কেরাত আছে:

قاتَلَ- যুদ্ধ করেছে;

قُتِلَ- নিহত হয়েছে।

ইবনে কাসির রহ. তাবারি রহ. এর সূত্রে বলেন,

معناه: كم من نبي قتل وقتل معه ربيون من أصحابه كثير. –تفسير القرآن العظيم ، ج: 2، ص: 130؛ ط. دار طيبة للنشر والتوزيع

“অর্থ: অনেক নবী শহীদ হয়েছেন এবং তাঁদের সাথে তাঁদের অসংখ্য আল্লাহওয়ালা সাথীরাও শহীদ হয়েছেন।” –তাফসিরে ইবনে কাসির : ২/১৩০

নবী এবং নবীর সাথে তাঁর বড় বড় মুত্তাকি আলেম ও আল্লাহওয়ালা সাথীরা শহীদ হয়ে যাওয়ার পরও বাকিরা ভেঙে পড়েননি। তাঁরা নবীর আনীত দ্বীনের জন্য শহীদদের পথ ধরেই অটল অবিচল থাকেন এবং কিতাল চালিয়ে যান।

এ হল ওয়ারাসাতুল আম্বিয়াদের বৈশিষ্ট্য। যখন থেকে জিহাদ শুরু তখন থেকেই এ বৈশিষ্ট্য) তাঁদের ছিল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন একজন সাহাবিও পাওয়া যাবে না, যিনি জিহাদ করেননি। সবাই জিহাদ করেছেন।

সাহাবায়ে কেরাম চলে যাওয়ার পর উলামায়ে সালাফের একই নীতি ছিল। জিহাদ ও রিবাতের ময়দান ছিল তাদের পদচারণায় মুখর। বরং রিবাতের অশেষ সওয়াব ও ফজিলত লাভের জন্য উলামায়ে কেরাম বসবাসের জন্য সীমান্তে চলে যেতেন। এ কারণেই সীমান্ত এলাকা ছিল বড় বড় মুহাদ্দিস ও ফুকাহায়ে কেরামের সমাগমস্থল। ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন,

وما زال خيار المسلمين من الصحابة والتابعين وتابعيهم من بعدهم من الأمراء والمشايخ يتناوبون الثغور لأجل الرباط وكان هذا على عهد أبي بكر وعثمان أكثر، حتى كان عبد الله بن2 وغيره مرابطين.

وكان عمر من يسأله عن أفضل الأعمال إنما يدله على الرباط والجهاد، كما سأله عن ذلك من سأله، كالحارث بن هشام وعكرمة بن أبي جهل وصفوان بن أمية وسهيل بن عمرو وأمثالهم ثم كان بعد هؤلاء إلى خلافة بني أمية وبني العباس ولهذا يذكر من فضائلهم وأخبارهم في الرباط أمور كثيرة. – المرابطة بالثغور، ص: 48، ط. أضواء السلف

“সাহাবা, তাবিয়িন এবং তাবে তাবিয়িনদের উমারা মাশায়েখগণ, যারা মুসলিম সমাজের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব তাঁরা সবসময় পালাক্রমে রিবাতের কাজ করে আসছেন। হযরত আবু বকর রা. ও উসমান রা. এর যামানায় এটি ছিল বেশি পরিমাণে।…কেউ হযরত উমার রা.কে সর্বশ্রেষ্ঠ আমল কোনটি জিজ্ঞেস করলে তিনি রিবাত ও জিহাদের কথা বলতেন। যেমন হারিস বিন হিশাম, ইকরিমা বিন আবু জাহল, সাফওয়ান বিন উমাইয়া ও সুহাইল বিন আমরসহ অনেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তাঁদের পর উমাইয়া ও আব্বাসি খেলাফতের সময়ও এটি চলে এসেছে। এ কারণেই তাঁদের মর্যাদা সম্পর্কে এবং তাঁদের রিবাতের ঘটনাবলী নিয়ে এত কিছু বর্ণিত হয়ে আসছে।” –আলমুরাবাতা বিসসুগুর : ৪৮

তিনি আরও বলেন,

كان أصحاب مالك كابن القاسم نحوه يرابط بالثغور المصرية … فكان عبد الله بن المبارك يقدم من خرسان فيرابط بثغور الشام، وكذلك ابراهيم ابن أدهم ونحوهما، كما كان يرابط بها ومشايخ الشام كالأوزاعي وحذيفة المرعشي ويوسف بن أسباط وأبي اسحاق الفزاري ومخلد بن الحسين وأمثالهم. -المرابطة بالثغور، ص: 49، ط. أضواء السلف

“ইমাম মালেকের শাগরেদরা- যেমন ইবনুল কাসিম ও অন্যান্যরা- মিশরের সীমান্ত এলাকাগুলোতে রিবাতের দায়িত্ব পালন করতেন। … আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. খুরাসান থেকে এসে শামের সীমান্ত এলাকায় রিবাতের দায়িত্ব পালন করতেন। ইবরাহীম বিন আদহামও এমনটি করতেন। তাঁদের মতো অন্যরাও এমন করতেন। যেমনটা করতেন শামের মাশায়িখগণ। যেমন আওযায়ি, হুযায়ফা আলমারআশি, ইউসুফ বিন আসবাত, আবু ইসহাক আলফাজারি এবং মাখলাদ বিন হুসাইনসহ আরও অনেকে।” –আলমুরাবাতা বিসসুগুর : ৪৮

وكان ابن المبارك وأحمد بن حنبل وغيرهم يقولون: “إذا اختلف الناس في شيء فانظروا ما عليه أهل الثغر، فإن الحق معهم؛ لأن الله تعالى يقول: {وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا} (العنكبوت: من الآية69) ” –المرابطة بالثغور، ص: 50، ط. أضواء السلف

“আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. ও আহমদ বিন হাম্বল রহ.সহ আরও অনেকে বলতেন, ‘কোনো বিষয়ে উলামাদের মতভেদ দেখা দিলে দেখবে সীমান্তে অবস্থানকারী উলামায়ে কেরামের মত কী। কারণ, হক সর্বদা তাঁদের সাথেই থাকে। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যারা আমার রাস্তায় জিহাদ করে আমি তাঁদের সামনে হিদায়াতের অসংখ্য রাস্তা উন্মোচন করে দিই। (আনকাবুত ৬৯)” –আলমুরাবাতা বিসসুগুর : ৪৮

বর্তমানে কিছু কিছু আলেম-উলামা ও পীর-মাশায়েখ ইলম ও জিহাদের একটিকে অপরটির বিপরীত মনে করছেন। তারা, তাদের কথায় ও কাজে সাধারণ মুসলমানদেরকে এটিই বুঝাচ্ছেন। তারা না নিজেরা জিহাদের কথা বলেন আর না কেউ বললে তা পছন্দ করেন। নিজে জিহাদে যাওয়া কিংবা কাউকে জিহাদে যেতে উৎসাহিত করা তো দূরেরই কথা। নিঃসন্দেহে এটা দ্বীনের নামে মিথ্যাচার। সালাফে সালিহিন এবং কোনো যুগের হক্কানি উলামায়ে কেরামের মানসিকতা ও ত্বরিকা এমন ছিল না। তাঁরা হাদিসের মসনদে যেমন ছিলেন বিজ্ঞ শাইখ, জিহাদ ও রিবাতের ময়দানেও ছিলেন অভিজ্ঞ শাহ সওয়ার। হযরত হাসান বসরি, আবদুল্লাহ ইবনুল মুবারক, আওযায়ি, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, ইমাম শাফিয়ি, ইমাম বুখারি, ইব্রাহিম নাখায়ি, ইব্রাহিম বিন আদহাম, শাকিক বলখি, আবু ইসহাক ফাজারি, ইবনে কুদামা, ইবনে তাইমিয়া (আল্লাহ তাআলা তাঁদের সবার উপর রহম করুন)- কত জনের নাম নেব? সালাফে সালিহীন এবং আইম্মায়ে দ্বীনের সবাই এমন ছিলেন। নিকট অতীতের হিন্দুস্তানি আকাবিরগণেরও একই ত্বরিকা ছিল। সায়্যিদ আহমাদ শহীদ, শাহ ইসমাইল শহীদ, মাওলানা আব্দুল হাই রহ., হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী, মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহি, কাসিম নানুতুবি তাঁরা সকলেই ছিলেন এ পথের পথিক।

 

সারকথা:

উপরে উলামায়ে হক্বানির যেসব বৈশিষ্ট্য আলোচিত হয়েছে এক নজরে তা হল,

  • ইখলাস
  • বাসিরাত ফিদ্ দ্বীন
  • ইলম বা-আমল
  • ইলম ছাড়া কথা বলেন না
  • নির্ভীক ও আপোষহীন দাঈ, হকের পথে অটল
  • দ্বীনের কোনো কিছু গোপন করেন না বা অপব্যাখ্যা করেন না
  • সত্য উচ্চারণে নির্ভীক
  • ফিতনা ও বাতিলের মোকাবিলায় সোচ্চার
  • শাসকের দরবার থেকে দূরে থাকেন
  • আমর বিল মা’রূফ নাহি আনিল মুনকার
  • সবর আলা বালা
  • রিবাত ও জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ।

উলামায়ে হক্কানি-রব্বানির বৈশিষ্ট্য ও কার্যক্রমের ফিরিস্তি অনেক দীর্ঘ। আম্বিয়ায়ে কেরামের মতো তাঁদের জীবনও পুরোটাই সংগ্রাম আর সাধনার জীবন। এখানে সংক্ষেপে তাঁদের মৌলিক কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হলো মাত্র। তাঁদের বৈশিষ্ট্যগুলোর সাথে উলামায়ে সূ-দের অবস্থাগুলো মিলালে যে কারোর পক্ষে বোঝা সহজ হয়ে যাবে যে, বর্তমানে বিশেষ করে আমাদের এ দেশে কারা উলামায়ে হক্কানি আর কারা উলামায়ে সূ?

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উলামায়ে সূ-দের থেকে দূরে থাকার এবং উলামায়ে হক্কানি-রব্বানিদের পথে চলার এবং তাঁদের সঙ্গে থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন।

الحمد لله الذي بنعمته تتم الصالحات، وصلى الله تعالى على خير خلقه محمد وعلى آله وآصحابه أجمعين