উলামা-মাশায়েখ, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, শায়খ ফজলুর রহমান কাসিমি হাফিযাহুল্লাহ

যিলহজ : মুমিনের বিরাট প্রাপ্তির মাস -শায়খ ফজলুর রহমান কাসিমি হাফিযাহুল্লাহ

بسم الله الرحمن الرحيم

যিলহজ : মুমিনের বিরাট প্রাপ্তির মাস

শায়খ ফজলুর রহমান কাসিমি হাফিযাহুল্লাহ

আল্লাহ রাব্বুল আলীমন কর্তৃক ঘোষিত একটি পবিত্র মাসে একজন মুমিনের অনেক প্রাপ্তি থাকে। শুধু মাস নয়; দিন, রাত, ঘণ্টা এমনকি একটি বিশেষ মুহূর্তকেও যদি আল্লাহ রাব্বুল আলামীন ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম পবিত্র ও ফযিলতপূর্ণ বলে ঘোষণা করে দেন, তাহলে তাতে আল্লাহপ্রেমী একজন মুমিনের জন্য অনেক কিছু পাওয়ার থাকে, যাকে সে কোনোভাবেই অবহেলা ও অবজ্ঞার দৃষ্টিতে দেখতে পারে না এবং অবমূল্যায়ন করে সে সময়গুলোকে হেলায় ফেলায় কাটিয়ে দিতে পারে না। বরং ওই সময়গুলোর সর্বোচ্চ মূল্যায়নই তার কাছে কাম্য।

এক্ষেত্রে একজন মুমিনকে প্রথমে যে কাজটি করতে হবে তা হল, আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পক্ষ থেকে ওই দিনগুলোর কী ফযিলত ঘোষণা করা হয়েছে তা জানা। দ্বিতীয়ত ওই দিনগুলোতে কী কী করতে বলা হয়েছে এবং কী কী করতে নিষেধ করা হয়েছে তা জানা। তৃতীয়ত প্রথাগত কিছু কাজ, যা  কোনো কোনো এলাকার লোকজন যুগের পর যুগ ধরে পালন করে আসছে, শরিয়তে যার কোনো ভিত্তি নেই, সেসব কাজ থেকে নিজেকে দূরে রাখা এবং অন্যদেরকেও দূরে রাখতে চেষ্টা করা।

এ নিবন্ধে যিলহজ মাসের এ ধরনের মৌলিক কয়েকটি বিষয় নিয়ে কিছু আলোচনা করার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা সঠিক ও উপকারী কথাগুলো পেশ করার তাওফীক দান করুন। আমীন।

যিলহজ মাসেরযিলতপূর্ণ কিছু আমল

যিলহজ মাসের সর্বাধিক ফযিলতপূর্ণ আমল হল, হজ পালন করা। দ্বিতীয় পর্যায়ে ফযিলতপূর্ণ আমল হল, কুরবানি করা। তৃতীয় পর্যায়ে, যিলহজের প্রথম দশটি দিন হাদীসে বর্ণিত বিভিন্ন আমলের মধ্যে কাটানো।

১ম আমল : হজ করা

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন-

وَلِلّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلاً وَمَن كَفَرَ فَإِنَّ الله غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ

আল্লাহর (সন্তুষ্টির) জন্য বাইতুল্লাহর হজ করা সেসব মানুষের ওপর কর্তব্য, যারা বাইতুল্লাহ পর্যন্ত পৌঁছার সামর্থ রাখে। কেউ কুফরি করলে (তার জানা উচিত,) আল্লাহ সৃষ্টিকুল থেকে সম্পূর্ণ অমুখাপেক্ষী। -সূরা আল ইমরান (০৩) : ৯৭

আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

مَنْ حَجَّ لِلَّهِ فَلَمْ يَرْفُثْ، وَلَمْ يَفْسُقْ، رَجَعَ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أُمُّه

যে ব্যক্তি আল্লাহর জন্য হজ করবে এবং হজ করতে গিয়ে কোনো প্রকার অশ্লীলতা ও গুনাহে লিপ্ত হবে না, সে হজ থেকে সে দিনের মতো নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসবে, যে দিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছেন। সহিহ বুখারি : ১৫২১

২য় আমল : কুরবানি করা

আয়েশা রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন,

 مَا عَمِلَ آدَمِيٌّ مِنْ عَمَلٍ يَوْمَ النَّحْرِ أَحَبَّ إِلَى اللهِ مِنْ إِهْرَاقِ الدَّمِ، إِنَّهُ لَيَأْتِي يَوْمَ القِيَامَةِ بِقُرُونِهَا وَأَشْعَارِهَا وَأَظْلاَفِهَا، وَأَنَّ الدَّمَ لَيَقَعُ مِنَ اللهِ بِمَكَانٍ قَبْلَ أَنْ يَقَعَ مِنَ الأَرْضِ، فَطِيبُوا بِهَا نَفْسًا.

কুরবানির দিন আল্লাহর কাছে (কুরবানির পশুর) রক্ত প্রবাহিত করার চেয়ে অধিক প্রিয় কোনো আমল আদম সন্তান করতে পারে না। কুরবানির পশু তার শিং, পশম, খুর নিয়ে কেয়ামতের দিন হাজির হবে। আর কুরবানির পশুর রক্ত যমিনে পড়ার আগে আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যায়। অতএব তোমরা আনন্দচিত্তে কুরবানি করো। -সুনানে তিরমিজি : ১৪৯৩

৩য় আমল : প্রথম নয় দিন, বিশেষভাবে আরাফার দিন রোযা রাখা

যিলহজের প্রথম দশ দিনের ফযিলত ও তাতে করণীয় বিভিন্ন আমলের কথা বেশ কিছু হাদীসে এসেছে। নিম্নে তার কয়েকটি উল্লেখ করা হল,

আবদুল্লাহ বিন আব্বাস রাযি. থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,

مَا مِنْ أَيَّامٍ العَمَلُ الصَّالِحُ فِيهِنَّ أَحَبُّ إِلَى اللهِ مِنْ هَذِهِ الأَيَّامِ العَشْرِ، فَقَالُوا: يَا رَسُولَ اللهِ، وَلاَ الجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللهِ؟ فَقَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: وَلاَ الجِهَادُ فِي سَبِيلِ اللهِ، إِلاَّ رَجُلٌ خَرَجَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَلَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذَلِكَ بِشَيْءٍ.

এমন কোনো দিন নেই, যে দিনের নেক আমল আল্লাহ তাআলার নিকট যিলহজ মাসের এই দশ দিনের নেক আমল অপেক্ষা অধিক প্রিয়। সাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল, আল্লাহ তাআলার পথে জিহাদ করাও কি (এত প্রিয়) নয়? রাসূলুল্লাহ ﷺ বললেন, আল্লাহ তাআলার পথে জিহাদও তার চেয়ে বেশি প্রিয় নয়। তবে জান-মাল নিয়ে যদি কোনো লোক আল্লাহ তাআলার পথে জিহাদে বের হয় এবং যদি সে এ দুটির কোনোটিই নিয়ে আর ফিরে না আসতে পারে, তার কথা (অর্থাৎ সেই শহীদের মর্যাদা) আলাদা। -সুনানে তিরমিজি : ৭৫৭

অপর এক বর্ণনায় এ হাদীসের শেষাংশে আরও বর্ণিত হয়েছে,

فَأَكْثِرُوا فِيهِنَّ مِنَ التَّسْبِيحِ وَالتَّهْلِيلِ وَالتَّكْبِيرِ وَالتَّحْمِيدِ

সুতরাং তোমরা এ দিনগুলোতে অধিক পরিমাণ সুবহানাল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার ও আলহামদুলিল্লাহ পাঠ করো। -মুসনাদে আব্দ ইবনি হুমায়দ : ৮০৭

এক হাদীসে এসেছে,

كَانَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُومُ تِسْعَ ذِي الْحِجَّةِ، وَيَوْمَ عَاشُورَاءَ، وَثَلَاثَةَ أَيَّامٍ مِنْ كُلِّ شَهْرٍ، أَوَّلَ اثْنَيْنِ مِنَ الشَّهْرِ وَالْخَمِيسَ

রাসুলুল্লাহ ﷺ যিলহজ মাসের নয়দিন রোজা রাখতেন…। –সুনানে আবি দাউদ : ২৪৩৭

 

যিলহজের এ দিনগুলোর এত ফযিলতের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে হাফেয ইবনে হাজার রহ. বলেন-

والذي يظهر أن السبب في امتياز عشر ذي الحجة لمكان اجتماع أمهات العبادة فيه وهي الصلاة والصيام والصدقة والحج ولا يتأتى ذلك في غيره . فتح الباري لابن حجر رحمه الله

“যিলহজের দশ দিনের এ বৈশিষ্টের যে কারণ প্রতিভাত হয়, তা হচ্ছে, এ দিনগুলোতে মৌলিক ইবাদতগুলোর মিলন ঘটে। যথা নামাজ, রোজা, সাদাকা, হজ। আর এতগুলো মৌলিক ইবাদত এ দিনগুলো ব্যতীত অন্য কোনো দিনে একসাথে হয় না।” -ফাতহুল বারী, হাফেয ইবনে হাজার

আরাফার দিনের রোযা

আবু কাতাদা আনসারি রাযি. বর্ণনা করেন,

وَسُئِلَ عَنْ صَوْمِ يَوْمِ عَرَفَةَ؟ فَقَالَ: «يُكَفِّرُ السَّنَةَ الْمَاضِيَةَ وَالْبَاقِيَةَ»

রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে আরাফার দিনের রোজা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো। তখন তিনি বললেন, তা অতীত এক বছরের এবং পরবর্তী এক বছরের গুনাহ মোচন করে দেবে। -সহিহ মুসলিম : ১১৬২

তবে হাজীদের জন্য এ দিন রোজা রাখার অনুমতি নেই। কারণ, হজের সকল আমলের মধ্যে আরাফার ময়দানে অবস্থান করা তুলনামূলক একটু কঠিন আমল। তাই এ দিন রোজা রাখলে শারীরিক দুর্বলতার কারণে এ দিনের অন্যান্য আমলে ঘাটতি দেখা দিতে পারে বা তা অনেক কষ্টকর হয়ে যেতে পারে।

হযরত আবু হুরাইরা রা. বর্ণনা করেন,

أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ نَهَى عَنْ صَوْمِ يَوْمِ عَرَفَةَ بِعَرَفَةَ

রাসূলুল্লাহ ﷺ আরাফার ময়দানে আরাফার দিনের রোজা রাখতে নিষেধ করেছেন। সুনানে আবি দাউদ : ২৪৪০

অর্থাৎ, আরাফার দিনের মহান ফযিলতপূর্ণ রোজাটি সেসব ব্যক্তিদের জন্য, যারা সে দিন আরাফার ময়দানে অবস্থান করছেন না। আর যারা হজ পালনের উদ্দেশ্যে আরাফার ময়দানে অবস্থান করছেন, তাদের জন্য এ রোজা নয়।

৪র্থ আমল : তাশাব্বুহ বিল ইহরাম বা নখ, চুল ও শরীরের কোনো পশম না কাটা

যারা হজে যাননি, হাজীদের ইহরামের অনুকরণে তাদের কিছু আমল করার কথা হাদীসে এসেছে। বিশেষত যারা কুরবানি করবেন, তাদের জন্য এ আমল। হাজীদের এহরাম অবস্থায় যেসব কাজ নিষেধ, সে ধরনের কিছু কাজ কুরবানি করতে ইচ্ছুক এমন ব্যক্তিদের জন্যও নিষেধ করা হয়েছে। তবে এ নিষেধাজ্ঞা মেনে চলা একটি মুস্তাহাব আমল। মেনে না চললে কোনো গুনাহ নেই। হাদীসে এমনই ইঙ্গিত পাওয়া যায়। তবে এ আমল অবশ্যই ফযিলতপূর্ণ একটি আমল।

উম্মে সালামা রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

إِذَا دَخَلَتِ الْعَشْرُ، وَأَرَادَ أَحَدُكُمْ أَنْ يُضَحِّيَ، فَلَا يَمَسَّ مِنْ شَعَرِهِ وَبَشَرِهِ شَيْئًا

যিলহজের দশ দিন শুরু হলে তোমাদের যারা কুরবানি করার ইচ্ছা করেছে, তারা যেন তাদের চুল বা শরীরের কোনো পশম না ফেলে। সহিহ মুসলিম : ১৯৭৭

একই বর্ণনাকারী থেকে বর্ণিত আরেকটি হাদিসে নখ না কাটার কথাও এসেছে,

وَلَا يَقْلِمَنَّ ظُفُرًا

… তারা যেন তার নখও না কাটে। সহিহ মুসলিম : ১৯৭৮

এ দিনগুলোতে বর্জনীয় কিছু কাজ

১. আরাফা উদযাপন

আরাফার দিনে উকূফে আরাফার সময়ে আরাফার ময়দানের বাইরে আরাফার আদলে সময় কাটানো। অর্থাৎ যারা হজ করছেন না, তারা হজ পালনকারীদের মতো সময় কাটানো। আরবী পরিভাষায় এ আমলকে التعريف (তা’রীফ) বলা হয়।

এর একটি সুরত হচ্ছে, উকূফে আরাফার সময় অনুযায়ী যেকোনো জায়গায় একাকী বা কয়েকজন একত্রিত হয়ে দুয়া ও কান্নাকাটি করা। এ আমলটিকে কেউ কেউ উত্তম বলেছেন, আবার কেউ কেউ বিদআত ও মাকরূহ বলেছেন।

উপরিউক্ত সুরত ব্যতীত এর আরও কিছু সুরত রয়েছে, যেগুলো বিদআত হওয়ার বিষয়ে কারও কোনো দ্বিমত নেই। সেসব সুরতের মধ্যে রয়েছে যথাক্রমে :

১. এ আমলের জন্য কোনো একটি জায়গাকে নির্দিষ্ট করে নেওয়া এবং সেখানে উপস্থিত হয়ে আরাফা উদযাপন করা।

২. শহরের সবচাইতে বড় মসজিদটিকে এ আমলের জন্য নির্দিষ্ট করে নেওয়া।

৩. শহরের সবচাইতে বড় ময়দানটিকে এ আমলের জন্য নির্দিষ্ট করে নেওয়া।

৪. পৃথিবীর বিশেষ কোনো মসজিদকে এ আমলের জন্য নির্দিষ্ট করে সেখানে সফর করে যাওয়া।

৫. মানুষকে ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ করে সেখানে বড় ধরনের জামাআতের আয়োজন করা।

৬. এ আমলের জন্য বাইতুল মাকদিসকে নির্বাচন করা এবং এ উদ্দেশ্যে সেখানে সফর করা।

৭. আরাফা উদযাপনের জন্য বিশেষ কোনো পদ্ধতি নির্দিষ্ট করে নেওয়া এবং তা পালনের প্রতি যত্নবান হওয়া।

৮. নির্দিষ্ট পরিমাণে আমলটি করতে পারলে হজ আদায় হবে বলে মনে করা।

এ বিষয়গুলো বিদআত ও হারাম হওয়ার বিষয়ে কারও কোনো দ্বিমত নেই। ইমাম তুরতূশী (মৃত্যু : ৫২০ হি:) রহ. তাঁর ‘আল-হাওয়াদিস ওয়াল-বিদা’ কিতাবে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করেছেন। তিনি লেখেন,

فاعلموا- رحمكم الله – أن هؤلاء الأئمة علموا فضل الدعاء يوم عرفة، ولكن علموا أن ذلك بموطن عرفة، لا في غيرها ولا منعوا من خلا بنفسه فحضرته نية صادقة أن يدعو الله تعالى ، وإنما كرهوا الحوادث في الدين ، وأن يظن العوام أن من سنَّة يوم عرفة بسائر الآفاق الاجتماع والدعاء ، فيتداعى الأمر إلى أن يدخل في الدين ما ليس منه.

وقد كنت ببيت المقدس ، فإذا كان يوم عرفة حشر أهل السواد وكثير من أهل البلد ، فيقفون في المسجد ، مستقبلين القبلة مرتفعة أصواتهم بالدعاء، كأنه موطن عرفة ، وكنت أسمع سماعاً فاشياً منهم أن من وقف ببيت المقدس أربع وقفات ، فإنها تعدل حجَّة ، ثم يجعلونه ذريعة إلى إسقاط فريضة الحج إلى بيت الله الحرام.هـ. الحوادث والبدع للطرطوشي ص: 116، 117

“জেনে রাখো, (আল্লাহ তোমাদের প্রতি রহম করুন) নিশ্চয়ই এ সকল ইমাম আরাফার দিনে দুয়ার ফজিলত ও মর্যাদা সম্পর্কে অবগত। কিন্তু তাঁরা জানেন যে, এ ফজিলত হচ্ছে আরাফার ময়দানে; অন্য জায়গায় নয়। কেউ যদি একাকী কোথাও অবস্থান করে এবং সে যদি খাঁটি দিলে আল্লাহ তাআলার কাছে দুয়া করে, তাহলে ওলামায়ে কেরাম তাকে নিষেধ করেন না। তারা শুধু দ্বীনের মধ্যে কোনো বিদআতের প্রচলনকে অপছন্দ করেন। মানুষ যে মনে করে, আরাফার দিনের সুন্নত আমল হচ্ছে, দিকদিগন্তের সবাই একত্রিত হয়ে দুয়া করা—এটাকে তারা অপছন্দ করেন। এভাবে করলে বিষয়টি এমন হয়ে যায় যে, দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু ঢুকে পড়েছে, যা দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত নয়।

আমি একবার বাইতুল মাকদিসে ছিলাম। আরাফার দিন আসলে সেখানে বিশাল জনসমাগম হয় এবং শহরের অধিকাংশ মানুষ জড়ো হয়ে যায়। তারা মসজিদে অবস্থান করে। কেবলামুখী হয়ে উচ্চস্বরে দুয়া করতে থাকে। পরিস্থিতি এমন হয়ে যায়, যেন তারা আরাফার ময়দানেই আছে। আমি তাদের মুখে ব্যাপকভাবে শুনতে পেতাম, তারা বলত, যে ব্যক্তি বাইতুল মাকদিসে এভাবে চারবার অবস্থান করবে, তার এ অবস্থান হজের বরাবর হয়ে যাবে। তারা তাদের এ আমলটিকে বাইতুল্লাহিল হারামে হজ করার ফরজ দায়িত্ব আদায়ের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করে।” -আলহাওয়াদিস ওয়ালবিদা, পৃ. ১১৬-১১৭

ইমাম বায়হাকী রহ. বর্ণনা করেন-

وروى البيهقي عن شعبة قال : سألت الحكم وحماداً عن اجتماع الناس يوم عرف في المساجد فقالا: هو محدث.رواه البيهقي في سننه كتاب الحج ، باب التعريف بغير عرفات 5/117، 118

“শু‘বা রহ. বলেন, আরাফার দিনে যে মানুষ বিভিন্ন মসজিদে একত্রিত হয়, সে সম্পর্কে আমি হাকাম ও হাম্মাদকে জিজ্ঞেস করেছি। তাঁরা দুজনই বলেছেন, এটা মুহদাস-বিদআত।” -সুনানে বায়হাকী, কিতাবুল হাজ্জ, বাবুত তারীফ বিগাইরি আরাফাত ৫/১১৭-১১৮

وروى كذلك عن إبراهيم – النخعي – قال: هو محدث. رواه البيهقي في سننه 5/118كتاب الحج ، باب التعريف بغير عرفات

“অনুরূপভাবে ইবরাহীম নাখায়ী থেকেও বর্ণিত আছে। তিনি বলেছেন, এটা বিদআত।” -সুনানে বায়হাকী, কিতাবুল হাজ্জ, বাবুত তারীফ বিগাইরি আরাফাত ৫/১১৮

তুরতূশী রহ.-এর বিশ্লেষণ এবং সালাফের অনেকে একে বিদআত বলার কারণে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, আরাফা উদযাপনের প্রাথমিক পর্যায়ের একটি সুরত বৈধ হলেও এর সঙ্গে এত পরিমাণ বিদআত যুক্ত হয়েছে, যার দারুন ওলামায়ে কেরাম একে বিদআত বলে দিয়েছেন। আর বর্তমানে যেহেতু আরও বেশি পরিমাণ বিদআত এর সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে, তাই এটা পরিহার করা জরুরি।

২. রসম পালন হিসেবে কুরবানির পশুকে গোসল করানো ও সাজানো

কুরবানির পশুকে সাবান দিয়ে গোসল করানো এবং তেল মেখে নানান জিনিস দিয়ে সাজানোর একটি বদ রসমের প্রচলনও মানুষের মাঝে দেখা যায়। কুরআন, সুন্নাহ বা ফিকহের কিতাবাদিতে এর কোনো ভিত্তি নেই। কুরবানির পশুকে যথাযথ যত্ন করা একটি কাম্য বিষয়। তবে সামাজিক রসম হিসেবে অতিরিক্ত এমন কোনও কিছুই করা যাবে না যার কোনো ভিত্তি কুরআন-সুন্নাহতে নেই এবং যা ধীরে ধীরে বিদআতে রূপ নিতে পারে। তাই এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকা চাই।

এক নজরে যিলহজের প্রথম দশকে করণীয় কিছু আমল

১. যাদের হজ করার সামর্থ্য রয়েছে, তারা হজ করবে। মাকবুল ও ত্রুটিমুক্ত হজ একজন হাজীকে জন্মের দিনের মতো নিষ্পাপ করে দেয়।

২. কুরবানি করার মতো সামর্থ্য যাদের রয়েছে, তারা কুরবানি করবে। কুরবানির দিন কুরবানির চাইতে ফজিলতপূর্ণ আর কোনো আমল নেই। কিয়ামতের দিন কুরবানির পশুর পশম, শিং, খুরসহ সব কিছু আমলের পাল্লায় মাপা হবে। কুরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই তা আল্লাহর দরবারে পৌঁছে যায়।

৩. যারা কুরবানি করার নিয়ত করেছে, তারা যিলহজের চাঁদ দেখার পর থেকে দশ তারিখে কুরবানি করার আগ পর্যন্ত নখ, চুল ও শরীরের কোন পশম কাটবে না।

৪. যারা আরাফার ময়দানের বাইরে রয়েছে, তারা আরাফার দিন রোজা রাখবে। এ রোজার ওসিলায় তাদের পূর্বাপর দুই বছরের গুনাহ মাফ হয়ে যাবে।

৫. যিলহজের প্রথম দশ দিনে বেশি পরিমাণে সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার পড়বে।

৬. হাদীস শরীফে এ দশটি দিনকে সর্বোচ্চ ফজিলতপূর্ণ দিন বলা হয়েছে। তাই এ দিনগুলোর আমল অবশ্যই অন্যান্য দিনের আমলের তুলনায় বেশি ফযিলতপূর্ণ হবে। অতএব এ ফজিলত অর্জনে সর্বাত্মক চেষ্টা করা চাই।

৭. বাইতুল্লাহর মুসাফিরদের কাছে অন্যরা খুব বেশি দুয়া চাইবে।

৮. নিজের কুরবানির পশু নিজে জবাই করবে।

৯. নিজের পছন্দের পশুটিকে আল্লাহর রাস্তায় কুরবান করে দেবে। যেটিকে জবাই করতে কষ্ট হবে ও বেশি ত্যাগ হবে, সেটিকেই কুরবানি করবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে এ আমলগুলো করার তাওফীক দান করুন। আমীন।