ফাতওয়া  নং  ৮৩

কারোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাকালে শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন দেয়া কি জরুরি? -মুফতি আবু ‍মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি (হাফিযাহুল্লাহ)

কারোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাকালে শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন দেয়া কি জরুরি? -মুফতি আবু ‍মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি (হাফিযাহুল্লাহ)

কারোনায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকাকালে শিক্ষক ও কর্মচারীদের বেতন দেয়া কি জরুরি?

 

প্রশ্ন:

বর্তমানে চলমান লকডাউনের সময় কি কওমি মাদ্রাসার উস্তাদের বেতন পরিশোধ করতে হবে? শরীয়তের আলোকে জানাবেন।

প্রশ্নকারী- আবু আব্দুল্লাহ

ঠিকানা- অজ্ঞাত

 

প্রশ্ন:

বাংলাদেশকে মহামারি কবলিত দেশ হিসেবে ঘোষণা করার পর সরকারি বাধ্যবাধকতার কারণে মাদরাসা বন্ধ রাখতে হয়েছে। টানা প্রায় তিন মাস প্রতিষ্ঠানের সকল কার্যক্রম বন্ধ। এ সময় দায়িত্বশীলগণ (শিক্ষক ও কর্মচারীগণ) আপন আপন বাড়িতে অবস্থান করেছেন। কোনো প্রকার দায়িত্ব পালন করেননি এবং দায়িত্ব পালন করার কোনো ‍সুযোগও ছিল না। দায়িত্বশীলগণকে কোনো প্রকার অব্যহতিও দেয়া হয়নি। তাদেরকে বৈতনিক বা অবৈতনিক ছুটি বিষয়ে কোনো কথাও বলা হয়নি। এদিকে প্রতিষ্ঠানের আয়-আমাদানীর পথগুলোও কোথাও আংশিক চালু ছিল, আর কোথাও একেবারে বন্ধ ছিল। এমতাবস্থায় দায়িত্বশীলগণ তাদের বিগত দিনগুলোর বেতন পাওয়ার হকদার কি না? প্রতিষ্ঠানের পরিচালকপক্ষ তাদেরকে বেতন দিতে বাধ্য কি না? এ ক্ষেত্রে কী কী সুরত হতে পারে? বিস্তারিত জানালে উপকৃত হতাম।

নিবেদক

মিয়াজি সদরুদ্দীন

ধোলাইপাড়, যাত্রাবাড়ি, ঢাকা

 

উত্তর:

بسم الله الرحمن الرحيم

الحمد لله وحده والصلاة والسلام على من لا نبي بعده. أما بعد

এক. এখানে মূল বিষয় হল, শিক্ষক কর্মচারীদের সঙ্গে মাদরাসার চুক্তি। মুসলিমদের পরস্পর কোনো চুক্তি হলে, উভয় পক্ষের জন্যই তা পূরণ করা জরুরি।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَوْفُوا بِالْعُقُودِ. (سورة المائدة: 1)

‘হে ঈমানদারেরা! তোমরা চুক্তিসমূহ পূর্ণ কর।’ –সুরা মায়েদা (৫) : ১

অন্য আয়াতে এসেছে-

وَأَوْفُوا بِالْعَهْدِ إِنَّ الْعَهْدَ كَانَ مَسْئُولًا. (سورة الاسراء: 34)

‘তোমরা অঙ্গীকার পূর্ণ কর। নিশ্চয় অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।’ -সুরা ইসরা (১৭): ৩৪

হাদিসে এসেছে,

المسلمون على شروطهم، إلا شرطا حرم حلالا، أو أحل حراما. رواه الترمذي: 1352 وقال: هذا حديث حسن صحيح.

‘হালালকে হারাম বা হারামকে হালাল সাব্যস্ত করে, এমন শর্ত ব্যতীত সকল শর্ত পূরণ করা মুসলিমদের কর্তব্য।’ –জামে তিরমিজি: ১৩৫২

দুই. বর্তমান পরিস্থিতিতে মাদরাসা কর্তৃপক্ষ যাদেরকে অব্যাহতি দেয়নি, তাঁদের সঙ্গে মাদরাসার চুক্তি বহাল রয়েছে। এসময় তাঁরা কাজের জন্য প্রস্তুতও ছিলেন, কিন্তু পরিস্থিতির কারণে মাদরাসা তাঁদেরকে কাজে লাগাতে পারেনি। সুতরাং এসময়ের বেতন তাঁদের প্রাপ্য। অবশ্য মাদরাসা কর্তৃপক্ষ যদি এই মুহূর্তে বেতন পরিশোধের সামর্থ্য না রাখেন, তাহলে সামর্থ্য হওয়া পর্যন্ত সুযোগ দিতে হবে। সামর্থ্য হওয়ার আগ পর্যন্ত চাপ প্রয়োগ করা যাবে না। আর যদি তাঁরা দাবী ছেড়ে দেন, তাহলে তা তাঁদের নিজেদের জন্যই অনেক বেশি কল্যাণকর।

কোরআনে কারীমে ইরশাদ হচ্ছে,

وَإِنْ كَانَ ذُو عُسْرَةٍ فَنَظِرَةٌ إِلَى مَيْسَرَةٍ وَأَنْ تَصَدَّقُوا خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ. البقرة: 281

“আর (দেনাদার) যদি অভাবগ্রস্ত হয় তাহলে সচ্ছলতা পর্যন্ত তাকে অবকাশ দাও। যদি ক্ষমা করে দাও তাহলে তা তোমাদের জন্য অধিক কল্যাণকর; যদি তোমরা জান।” -সূরা বাকারা (১) : ২৮১

অভাবগ্রস্ত দেনাদারকে ক্ষমা করে দেয়ার বিভিন্ন ফযিলতের কথা অনেক হাদীসেও এসেছে। আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে বলা হয়েছে,

عَنْ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ كَانَ تَاجِرٌ يُدَايِنُ النَّاسَ فَإِذَا رَأَى مُعْسِرًا قَالَ لِفِتْيَانِهِ تَجَاوَزُوا عَنْهُ لَعَلَّ اللَّهَ أَنْ يَتَجَاوَزَ عَنَّا فَتَجَاوَزَ اللَّهُ عَنْهُ. صحيح البخاري، رقم: 2078

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, এক ব্যবসায়ী ছিল মানুষের সঙ্গে বাকি লেনদেন করত। কোনো অভাবগ্রস্তকে দেখলে তার চাকর বাকরদের বলত, তাকে ক্ষমা করে দাও। হয়তো আল্লাহ আমাদের ক্ষমা করে দিবেন। অতঃপর আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিলেন।” -সহীহ বুখারী: হাদীস নং ২০৭৮

অবশ্য যেসব প্রাইভেট মাদরাসার সকল ব্যয়ভার ও দায়দায়িত্ব ছাত্রদের বেতনের মাধ্যমে বা অন্য কোনোভাবে মুহতামিম সাহেব নিজে বহন করেন; কারো অনুদান গ্রহণ করেন না এবং মুনাফা হলে সেটাও মুহতামিম সাহেব নিজে ভোগ করেন, সেগুলোতে মুহতামিম সাহেবের ব্যক্তিগত সামর্থ্যের হিসেব ধর্তব্য হবে। সুতরাং এক্ষেত্রে মাদরাসার ফাণ্ডে যদি অর্থ নাও থাকে, মুহতামিম সাহেবের ব্যক্তিগত সামর্থ্য থাকলেও মাদরাসার শিক্ষক কর্মচারীদের বেতন যথাসময় আদায় করতে হবে।

তিন. মাদরাসা কর্তৃপক্ষ যদি কাউকে অব্যাহতি দিয়ে থাকেন, তাহলে যখন থেকে তাঁকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে, তারপর থেকে তিনি বেতন পাবেন না। বলা বাহল্য, অব্যাহতি দিলে তাঁকে অবশ্যই জানাতে হবে, না জানালে তা কার্যকর হবে না। আর অব্যাহতি দেয়ার ক্ষেত্রে মাদরাসার যদি কোনো নিয়ম থাকে বা কারো নিয়োগের সময় তাঁর সঙ্গে কোনো শর্ত থাকে, যেমন অনেক প্রতিষ্ঠানে এক/দুই মাস আগে জানানোর শর্ত থাকে, তাহলে সে শর্ত অনুযায়ী অব্যাহতি দিতে হবে।

চার. কোনো মাদরাসা যদি একেবারে বিলুপ্ত হয়ে গিয়ে থাকে, যেমন অনেক প্রাইভেট মাদরাসা স্থায়ীভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে, সেগুলো বন্ধ হওয়ার দ্বারাই শিক্ষক কর্মচারীদের সাথে চুক্তি বাতিল বলে গণ্য হবে। চুক্তিকৃত কাজের অস্তিত্বই যদি বিলুপ্ত হয়ে যায়, তখন চুক্তি স্বয়ংক্রিয়ভাবেই বাতিল বলে গণ্য হয়। সুতরাং সেগুলোর বিলুপ্তি সম্পর্কে যেদিন যাকে অবহিত করা হয়েছে, সেদিনের পর থেকে তিনি বেতন পাবেন না। তার আগ পর্যন্ত সময়ের বেতন দিতে হবে। আদ্দুররুল মুখতার, দারুল ফিকর: ৪/৮২, ফাতাওয়া হিন্দিয়া, দারুল ফিকর: ৪/৪৫৮-৪৫৯, ফাতাওয়া দারুল উলুম দেওবন্দ: ১৫/২৭১, দারুল ইফতা, দারুল উলূম দেওবন্দ, ফতোয়া নং ১৭৯৫৬৪, তাং ২০-৬-২০২০ ইং

আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি (উফিয়া আনহু)

৩০-১১-১৪৪১ হি.

২২-০৭-২০২০ ইং