উলামা-মাশায়েখ, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, শায়খ ফজলুর রহমান কাসিমি হাফিযাহুল্লাহ

মুহাররম ও আশুরা : করণীয় ও বর্জনীয় -শায়খ ফজলুর রহমান কাসিমি হাফিযাহুল্লাহ

মুহাররম ও আশুরা : করণীয় ও বর্জনীয় -শায়খ ফজলুর রহমান কাসিমি হাফিযাহুল্লাহ

بِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيم

মুহাররম ও আশুরা : করণীয় ও বর্জনীয়

শায়খ ফজলুর রহমান কাসিমি হাফিযাহুল্লাহ

 

মুহাররম মাস হিজরী সনের প্রথম মাস। আর এ মাসের দশম দিনটি হচ্ছে আশুরা। এটি আরবী ‘আশরুন’ শব্দ থেকে এসেছে, যার অর্থ দশ।

গোটা মুহাররম মাস বিশেষ করে এর দশম দিনটি বেশ ফজিলত ও তাৎপর্যপূর্ণ। কুরআনে কারীমে যে চারটি মাসকে ‘আশহুরে হুরুম বা সম্মানিত মাস’ বলা হয়েছে, মুহাররম তার একটি। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

إنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِنْدَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنْفُسَكُمْ وَقَاتِلُوا الْمُشْرِكِينَ كَافَّةً كَمَا يُقَاتِلُونَكُمْ كَافَّةً وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتّقِينَ  

আসমান-জমিন সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহ তায়ালার ঠিক করা নিয়মে মাসের সংখ্যা বারোটি, এর মধ্যে চারটি হল সম্মানিত মাস। এটাই সুপ্রতিষ্ঠিত দ্বীন। অতএব এ মাসগুলোতে তোমরা (পাপাচারে লিপ্ত হয়ে) নিজেদের ওপর জুলুম করো না।-সূরা তাওবা (০৯) : ৩৬

হাদীসে এসেছে,

عَنْ أَبِي بَكْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ :  الزَّمَانُ قَدِ اسْتَدَارَ كَهَيْئَتِهِ يَوْمَ خَلَقَ اللَّهُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ، السَّنَةُ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا، مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ، ثَلَاثَةٌ مُتَوَالِيَاتٌ : ذُو الْقَعْدَةِ، وَذُو الْحِجَّةِ، وَالْمُحَرَّمُ، وَرَجَبُ مُضَرَ الَّذِي بَيْنَ جُمَادَى وَشَعْبَانَ .

হযরত আবু বাকরা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, (বিদায় হজের দিন) রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা যেদিন আকাশ-জমিন সৃষ্টি করেছেন সেদিন সময়ের হিসাব যেমন ছিল সেভাবেই তা ফিরে এসেছে। বছর বার মাসে। এর মধ্যে চারটি হল মাস সম্মানিত। এর তিনটি ধারাবাহিক। যিলকদ, যিলহজ ও মুহাররম। আরেকটি হল মুযার গোত্রের হিসেবে যেটি রজব মাস, যা জুমাদাল উখরা ও শাবানের মাঝামাঝি।-সহীহ বুখারী : ৩১৯৭

মুহাররম মাসে করণীয় আমল

হাদীসে মুহাররমে মাসে বেশি বেশি নফল রোযা রাখার প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে।

হযরত আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

أَفْضَلُ الصِّيَامِ، بَعْدَ رَمَضَانَ، شَهْرُ اللهِ الْمُحَرّمُ، وَأَفْضَلُ الصَلَاةِ، بَعْدَ الْفَرِيضَةِ، صَلَاةُ اللَّيْلِ.

রমযানের পর সবচে উত্তম রোযা হল আল্লাহর মাস তথা মুহাররম মাসের রোযা। আর ফরয নামাযের পর সবচে উত্তম নামায হল রাতের নামায।-সহীহ মুসলিম : ১১৬৩

আশুরার দিনে করণীয় আমল

আশুরার দিনে রোযা রাখার ব্যাপারে বেশ কিছু হাদীস এসেছে। কোনো কোনো হাদীসে এ দিনের রোযার বিশেষ ফজিলতের কথাও উল্লেখ রয়েছে।

সহীহ বুখারী ও সহীহ মুসলিমে এসেছে,

عن ابن عباس رضي الله عنهما قال: قدم النبي صلى الله عليه و سلم المدينة فرأى اليهود تصوم يوم عاشوراء فقال: ما هذا؟ قالوا: هذا يوم صالح هذا يوم نجى الله بني إسرائيل من عدوهم فصامه موسى. قال: فأنا أحق بموسى منكم. فصامه وأمر بصيامه. صحيح البخاري، كتاب الصوم، باب صيام يوم عاشوراء

হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাযি. বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মদীনায় এসে দেখতে পান, ইহুদিরা আশুরার দিন রোযা রাখে। তিনি জিজ্ঞেস করলেন, এটা কি? তারা বলল, এটি একটি পবিত্র দিন। এ দিনে আল্লাহ তাআলা বনি ইসরাঈলকে শত্রুদের কবল থেকে মুক্তি দিয়েছেন। তাই মূসা আলাইহিস সালাম এ দিন রোযা রাখতেন। তখন রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, মূসার অনুসরণ করার ব্যাপারে আমি তোমাদের চেয়ে বেশি উপযুক্ত। এরপর তিনি সেদিন রোযা রাখেন এবং অন্যদেরকেও রোযা রাখতে বলেন।-সহীহ বুখারী : ২০০৪ (কিতাবুস সিয়াম, বাবু সিয়ামি ইয়াওমি আশূরা); সহীহ মুসলিম : ১১৩০ (কিতাবুস সিয়াম, বাবু সাওমি ইয়াওমি আশূরা)

হযরত আবু মুসা আশআরী রাযি. থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, তিনি বলেন,

كَانَ يَوْمُ عَاشُورَاءَ تَعُدُّهُ الْيَهُودُ عِيدًا قَالَ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَصُومُوهُ أَنْتُمْ

আশুরার দিনটিকে ইহুদিরা ঈদ (উৎসবের দিন) মনে করত। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (সাহাবীদেরকে) বললেন, তোমরাও এ দিনে রোযা রাখো।-সহীহ বুখারী : ২০০৫; সহীহ মুসলিম : ১১৩১

হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাযি. বলেন,

  مَا رَأَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم يَتَحَرَّى صِيَامَ يَوْمٍ فَضَّلَهُ عَلَى غَيْرِهِ إِلاَّ هَذَا الْيَوْمَ يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَهَذَا الشَّهْرَ يَعْنِي شَهْرَ رَمَضَانَ

আমি রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আশুরার দিনের রোযা এবং রমযান মাসের রোযার উপর অন্য কোন রোযাকে প্রাধান্য দিতে দেখিনি। সহীহ বুখারী : ২০০৬

জামে তিরমিযীতে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে,

عن أبي قتادة أن النبي صلى الله عليه و سلم قال: صيام يوم عاشوراء إني أحتسب على الله أن يكفر السنة التي قبله.

হযরত আবু কাতাদা রাযি. থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আশুরার দিনের রোযার বিষয়ে আমি আল্লাহর কাছে আশা রাখি, তিনি এর বিনিময়ে পূর্বের এক বছরের গুনাহ মাফ করে দেবেন।–জামে তিরমিযী ৭৫২ (হাদীসটি সহীহ)

কমপক্ষে দুটি রোযা রাখা

عن عَبْد اللَّهِ، بْنَ عَبَّاسٍ – رضى الله عنهما – يَقُولُ حِينَ صَامَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّهُ يَوْمٌ تُعَظِّمُهُ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى . فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم فَإِذَا كَانَ الْعَامُ الْمُقْبِلُ – إِنْ شَاءَ اللَّهُ – صُمْنَا الْيَوْمَ التَّاسِعَ . قَالَ فَلَمْ يَأْتِ الْعَامُ الْمُقْبِلُ حَتَّى تُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم

হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাযি. বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম যখন আশুরার দিন নিজেও রোযা রাখেন এবং অন্যদেরকেও রোযা রাখার নির্দেশ দেন, তখন সাহাবীগণ বললেন, ইয়া রসূলাল্লাহ! ইহুদি ও খ্রষ্টানরা এই দিনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকে। এ কথা শুনে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, ইনশাআল্লাহ আগামী বছর আমরা নবম তারিখেও রোযা রাখব। বর্ণনাকারী বললেন, আগামী বছর আসার আগেই রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু ‘আলাইহি ওয়া সাল্লামের ইন্তেকাল হয়ে যায়। সহীহ মুসলিম ২৫৫৬

عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ رضي الله عنه قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : صُومُوا يَوْمَ عَاشُورَاءَ ، وَخَالِفُوا فِيهِ الْيَهُودَ، صُومُوا قَبْلَهُ يَوْمًا أَوْ بَعْدَهُ يَوْمًا .

হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাযি. বলেন, রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, তোমরা আশুরার দিন রোযা রাখো এবং এ ক্ষেত্রে ইহুদিদের সাথে মিল করো না। আশুরার আগে কিংবা পরে আরও একদিন রোযা রাখো।-সহীহ ইবনে খুযাইমা ২০৯৫; মুসনাদে আহমদ ২১৫৫ (আহমদ শাকের হাদিসটিকে হাসান বলেছেন)

এসব হাদীসের আলোকে ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন, কমপক্ষে দুটি রোযা রাখা মুস্তাহাব। নয় এবং দশ তারিখ কিংবা দশ এবং এগার তারিখ।

তাওবা-ইস্তিগফার করা

عَنْ عَلِيٍّ، قَالَ سَأَلَهُ رَجُلٌ فَقَالَ أَىُّ شَهْرٍ تَأْمُرُنِي أَنْ أَصُومَ بَعْدَ شَهْرِ رَمَضَانَ قَالَ لَهُ مَا سَمِعْتُ أَحَدًا يَسْأَلُ عَنْ هَذَا إِلاَّ رَجُلاً سَمِعْتُهُ يَسْأَلُ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَنَا قَاعِدٌ فَقَالَ يَا رَسُولَ اللَّهِ أَىُّ شَهْرٍ تَأْمُرُنِي أَنْ أَصُومَ بَعْدَ شَهْرِ رَمَضَانَ قَالَ  إِنْ كُنْتَ صَائِمًا بَعْدَ شَهْرِ رَمَضَانَ فَصُمِ الْمُحَرَّمَ فَإِنَّهُ شَهْرُ اللَّهِ فِيهِ يَوْمٌ تَابَ اللَّهُ فِيهِ عَلَى قَوْمٍ وَيَتُوبُ فِيهِ عَلَى قَوْمٍ آخَرِينَ  . قَالَ أَبُو عِيسَى هَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ غَرِيبٌ .

হযরত আলী রাযি. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, এক ব্যক্তি তাকে প্রশ্ন করল, রমাযান মাসের পর কোন মাসের রোযা রাখতে আপনি আমাকে আদেশ করেন? তিনি বললেন, এই বিষয়ে আমি কাউকে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকট প্রশ্ন করতে শুনিনি। তবে হ্যাঁ, এক সময় আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের নিকটে বসা ছিলাম। তখন এক ব্যক্তি এসে তাঁকে বলল, হে আল্লাহর রাসূল, রমাযান মাসের পর আর কোন মাসের রোযা রাখতে আপনি আমাকে আদেশ করেন? রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন, রমাযান মাসের পর তুমি যদি আরও রোযা রাখতে চাও তাহলে মুহাররামের রোযা রাখো। কারণ, এটি আল্লাহ তাআলার মাস। এ মাসে এমন একটি দিন আছে যেদিন আল্লাহ তাআলা একটি জাতির তাওবা কবুল করেছিলেন এবং (সামনেও) তিনি এ দিনে আরও অনেক জাতির তাওবা কবুল করবেন। জামে তিরমিযী ৭৪১ (ইমাম তিরমিযী হাদীসটিকে হাসান গরীব বলেছেন)

মুহাররম মাসে জিহাদ করার বিধান

সম্মানিত মাসগুলো সম্পর্কে কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেছেন,

فَإِذَا انْسَلَخَ الْأَشْهُرُ الْحُرُمُ فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدْتُمُوهُمْ وَخُذُوهُمْ وَاحْصُرُوهُمْ وَاقْعُدُوا لَهُمْ كُلَّ مَرْصَدٍ فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلَاةَ وَآتَوُا الزَّكَاةَ فَخَلُّوا سَبِيلَهُمْ إِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَحِيمٌ 

অতঃপর যখন সম্মানিত মাসগুলো অতিবাহিত হয়ে যাবে, তখন মুশরিকদেরকে যেখানেই পাও সেখানেই হত্যা কর। তাদেরকে বন্দী কর, ঘেরাও কর এবং তাদের জন্য প্রতিটি ঘাঁটিতে ওঁত পেতে বসে থাক। তবে তারা যদি তাওবা করে, নামায কায়েম করে, যাকাত আদায় করে, তাহলে তাদের পথ ছেড়ে দাও। আল্লাহ তাআলা অবশ্যই ক্ষমাশীল ও দয়াবান।-সূরা তাওবা (০৯) : ৫

এ আয়াত থেকে বুঝা যায়, সম্মানিত মাসগুলোতে জিহাদ করা নিষেধ। তবে কুরআনে কারীমের অন্যান্য আয়াত ও সহীহ হাদীসের আলোকে ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন, এ আয়াতের বিধানটি মানসূখ বা রহিত হয়ে গেছে।

বিষয়টি আরেকটু খুলে বলি। এ মাসগুলোতে যুদ্ধ করার মৌলিক তিনটি সুরত হতে পারে। এক. কাফেরদের পক্ষ থেকে হামলা হলে তার জবাবে পাল্টা হামলা করা। দুই. আগ শুরু হওয়া যুদ্ধ এ মাসগুলোতেও চলমান রাখা। তিন. এ মাসগুলোতে নিজেদের পক্ষ থেকে যুদ্ধ শুরু করা।

আলোচ্য তিনটি সুরতের মধ্য থেকে প্রথম সুরতটি বৈধ ও জরুরি হওয়ার ব্যাপারে কারো কোনো দ্বিমত নেই। আর দ্বিতীয় সুরতেও ফুকাহায়ে কেরাম সবাই একমত যে, যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া হবে। কারণ, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এসব ক্ষেত্রে যুদ্ধ চালিয়ে গেছেন বলে একাধিক সহীহ হাদীসে বর্ণিত হয়েছে।

তৃতীয় সুরতটির বৈধতা নিয়ে ফুকাহায়ে কেরামের মাঝে মতপার্থক্য রয়েছে। হানাফী ওলামায়ে কেরামের অভিমত হচ্ছে, এ সুরতটিও বৈধ।

এ প্রসঙ্গে প্রসিদ্ধ হানাফী ফকীহ ইমাম সারাখসী রহ. বলেন,

وعن ابن عباس رضي الله عنهما قال: غزا رسول الله صلى الله عليه وسلم في المحرم لمستهل الشهر وأقام عليها أربعين يوما وفتحها يعني الطائف في صفر وفي هذا دليل على أنه لا بأس بالقتال في الشهر الحرام فإن المحاصرة من القتال. وقد روي أنه نصب المنجنيق على الطائف. ففعله بيان أن ما كان من حرمة القتال في الأشهر الحرم قد انتسخ، وكان الكلبي رحمه الله يقول: ذلك ليس بمنسوخ. ولسنا نأخذ بقوله في ذلك بل بما روي عن مجاهد رحمه الله قال: النهي عن القتال في الأشهر الحرم منسوخ، نسخه قوله تعالى: فاقتلوا المشركين حيث وجدتموهم. [التوبة: 5]. وقد بينا أن سورة براءة من آخر ما نزل، فانتسخ به ما كان من الحكم في قوله تعالى: يسألونك عن الشهر الحرام قتال فيه. [البقرة: 217] الآية.

فإن قيل: كيف يستقيم دعوى النسخ بهذه الآية؟ وقد قال الله تعالى: فإذا انسلخ الأشهر الحرم فاقتلوا المشركين حيث وجدتموهم. [التوبة: 5] الآية. قلنا: المراد به مضي مدة الأمان الذي كان لهم من رسول الله صلى الله عليه وسلم بأمر الله تعالى، كما قال: فسيحوا في الأرض أربعة أشهر. [التوبة: 2] ووافق مضي ذلك انسلاخ الأشهر الحرم. والدليل على نسخ حرمة القتال في الأشهر الحرم قوله تعالى: منها أربعة حرم. [التوبة: 36] إلى قوله: فلا تظلموا فيهن أنفسكم وقاتلوا المشركين كافةكما يقاتلونكم كافة. [التوبة: 36] قيل: معناه لا تظلموا فيهن أنفسكم بالامتناع من قتال المشركين ليجترئوا عليكم، بل قاتلوهم كافة لتنكسر شوكتهم وتكون النصرة لكم عليهم. المبسوط للسرخسي، كتاب السير

হযরত আব্দুল্লাহ বিন আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মুহাররম মাসের শুরুতে যুদ্ধ করেছেন এবং চল্লিশ দিন যাবত তায়েফে যুদ্ধ জারি রেখে সফর মাসে তা জয় করেছেন। এ হাদীস এ কথা প্রমাণ করে যে, সম্মানিত মাসগুলোতে জিহাদ করতে কোন সমস্যা নেই। কারণ, অবরোধ করাও জিহাদের অন্তর্ভুক্ত। বর্ণিত আছে, তায়েফে তিনি মিনজানিক-কামান স্থাপন করেছিলেন। তাঁর এ আমল প্রমাণ করে যে, এ মাসগুলোতে জিহাদ নিষিদ্ধ হওয়ার বিধানটি মানসূখ হয়ে গেছে। কালবী রহ. বলতেন, এ আয়াত মানসূখ নয়। কিন্তু আমরা তাঁর মতটি গ্রহণ করি না। বরং মুজাহিদ রহ. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেছেন, সম্মানিত মাসসমূহে যুদ্ধ নিষিদ্ধ হওয়ার বিধান মানসূখ-রহিত। আল্লাহর বাণী فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدْتُمُوهُمْ এ বিধানকে রহিত করেছে। আমরা এ মতটিই গ্রহণ করি। আর আমরা এ কথাও বলে এসেছি যে, সূরা বারাআ (সূরা তাওবা) শেষের দিকে অবতীর্ণ সূরা। সে কারণে এর দ্বারা  يَسْأَلُونَكَ عَنِ الشَّهْرِ الْحَرَامِ قِتَالٍ فِيهِ

(তারা আপনাকে সম্মানিত মাসে যুদ্ধ করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে) আয়াতে উল্লিখিত বিধান মানসূখ হয়ে গেছে।

যদি প্রশ্ন করা হয়, মানসূখ হওয়ার দাবি কীভাবে সঠিক হতে পারে? অথচ আল্লাহ তাআলা বলেছেন فَإِذَا انسَلَخَ الْأَشْهُرُ الْحُرُمُ فَاقْتُلُوا الْمُشْرِكِينَ حَيْثُ وَجَدتُّمُوهُمْ ‘যখন সম্মানিত মাসগুলো অতিবাহিত হয়ে যায় তখন তোমরা মুশরিকদেরকে যেখানে পাও সেখানে হত্যা কর’।

তাহলে আমরা জবাবে বলব, এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, নিরাপত্তা চুক্তি শেষ হওয়ার পর, যে চুক্তি আল্লাহর আদেশে রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সঙ্গে করেছিলেন। যেমন, আল্লাহ তাআলা বলেন, فَسِيحُوا فِي الْأَرْضِ أَرْبَعَةَ أَشْهُر ‘তোমরা চার মাস জমিনে বিচরণ কর’। আর এ সময় শেষ হওয়া সম্মানিত মাসগুলো শেষ হওয়ার সাথে মিলে গিয়েছিল। এ মাসগুলোতে কিতাল হারাম হওয়ার বিধান মানসূখ হওয়ার পক্ষে দলিল হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার বাণী-

مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ذَلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنْفُسَكُمْ وَقَاتِلُوا الْمُشْرِكِينَ كَافَّةً كَمَا يُقَاتِلُونَكُمْ كَافَّةً

কেউ কেউ বলেছেন, এর অর্থ হচ্ছে, মুশরিকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা থেকে বিরত থেকে এ দিনগুলোতে তোমরা নিজেদের উপর জুলুম করো না। এতে তারা তোমাদের বিরুদ্ধে দুঃসাহসী হয়ে উঠবে; বরং তোমরা তাদের বিরুদ্ধে ব্যাপকভাবে যুদ্ধ চালিয়ে যাও, যাতে তাদের জৌলুস শেষ হয়ে যায় এবং তাদের বিরুদ্ধে তোমাদের পক্ষে সাহায্য আসে।”-আলমাবসূত, সারাখসী, কিতাবুস সিয়ার

আল্লামা আলূসী রহ. বলেন-

والجمهور على أن حرمة المقاتلة فيهن منسوخة وأن الظلم مؤول بارتكاب المعاصي، وتخصيصها بالنهي عن ارتكاب ذلك فيها مع أن الارتكاب منهي عنه مطلقاً لتعظيمها ولله سبحانه أن يميز بعض الأوقات على بعض فارتكاب المعصية فيهن أعظم وزراً كارتكابها في الحرم وحال الإحرام … …

ويؤيد القول بالنسخ أنه عليه الصلاة والسلام حاصر الطائف وغزا هوازن بحنين في شوال وذي القعدة سنة ثمان. تفسير روح المعاني للآلوسي

জুমহুরের অভিমত হচ্ছে, এ মাসগুলোতে যুদ্ধ করা হারাম হওয়ার বিধান মানসূখ হয়ে গেছে। আর (আয়াতে উল্লিখিত) ‘নিজেদের উপর জুলুম করো না’ এর ব্যাখ্যা করা হয়েছে গুনাহে লিপ্ত হয়ো না। গুনাহে লিপ্ত হওয়া সব সময়ই নিষেধ তারপরও বিশেষভাবে এসব মাসে নিষেধ করার কারণ, এ মাসগুলোর মর্যাদা প্রকাশ করা। আল্লাহ তাআলা কিছু সময়কে কিছু সময় থেকে আলাদা বৈশিষ্ট দিয়ে থাকেন। সে কারণে এসব মাসে গুনাহে লিপ্ত হওয়াটা বেশি আযাবের কারণ হয়। যেমন, মক্কার হরমের মধ্যে ইহরাম অবস্থায় গুনাহ করা বেশি অপরাধের কারণ। … …

মানসূখ হওয়ার বিষয়টি এভাবেও সমর্থিত হয় যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অষ্টম হিজরীর শাওয়াল ও যিলকদ মাসে তায়েফ ঘেরাও করেছেন এবং হুনাইনে হাওয়াযিন গোত্রের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছেন।”-তাফসীরে রূহুল মাআনী

মুহাররম ও আশুরার বর্জনীয় বিষয়াদি

মুহাররম মাসের দশ তারিখ পৃথিবীর বেশ কিছু ঐতিহাসিক ঘটনা সংঘটিত হয়েছে। যার মধ্যে একটি হল হযরত হুসাইন রাযি. এর শাহাদাতের ঘটনা। এ ঘটনা যদিও অত্যন্ত বেদানাদায়ক কিন্তু একে কেন্দ্র করে এমন কিছু করা আমাদের জন্য একদমই শোভনীয় নয় যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের শিক্ষা পরিপন্থী। যার অনুমতি শরীয়ত আমাদেরকে দেয়নি।

অতএব মুসলিম হিসেবে আমাদের কর্তব্য, এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে বর্তমানে যেসব জাহেলি রসম এবং অনৈসলামিক কর্মকান্ড ঘটতে দেখা যায় যেমন, তাজিয়া মিছিল বের করা, হায় হুসাইন! হায় হুসাইন! বলে চিৎকার করা, চাকু ইত্যাদি দিয়ে নিজেই নিজের শরীর রক্তাক্ত করা ইত্যাদি এসব কর্মকান্ড থেকে একদম দূরে থাকা। এ সবে শরিক হওয়া তো দূরের কথা কাছেও না যাওয়া। নিজেও দূরে থাকা, নিজের বন্ধু বান্ধব, আত্মীয়জনকেও দূরে রাখা।

অনেকে আবার মুহাররম মাসটিকে অশুভ মাস মনে করে থাকে। এজন্য তারা এ মাসে বিয়ে-শাদীসহ যে কোন ধরনের অনুষ্ঠান থেকে বিরত থাকে। এ সবই হল অনৈসলামিক ধারণা ও কুসংস্কার। শরীয়তে এ সবের কোন ভিত্তি নেই।

সারকথা

আমাদের সবার কর্তব্য, এ মাসে যে সব করণীয় কাজের কথা বিভিন্ন হাদীসে এসেছে যেমন, বেশি বেশি নফল রোযা রাখা, তাওবা-ইস্তিগফার করা এবং অন্যান্য নেক আমল যথাসম্ভব বেশি করে করা, আমাদের উচিত ওসবের প্রতি যত্নবান হওয়া এবং সব ধরনের রসম ও কুসংস্কার থেকে সম্পূর্ণ রূপে দূরে থাকা। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে তাওফিক দান করুন। আমীন।