ফাতওয়া  নং  ১৩২

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইলম শিখব? না জিহাদের কাজ করব? -মুফতি আবু ‍মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি (হাফিযাহুল্লাহ)

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইলম শিখব? না জিহাদের কাজ করব? -মুফতি আবু ‍মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি (হাফিযাহুল্লাহ)

বর্তমান পরিস্থিতিতে ইলম শিখব? না জিহাদের কাজ করব?

 

প্রশ্ন:

আমরা যারা তালিবুল ইলম, পড়ালেখা মাত্র শুরুর দিকে। এখন তো আমাদের উপর ইলমে দ্বীন শিক্ষা করা ফরয। আবার জিহাদ করাও ফরয। তো আমরা এখন কী করতে পারি?

প্রশ্নকারী-আবূ সালেহ্

 

উত্তর:

بسم الله الرحمن الرحيم

الحمد لله والصلاة والسلام على رسول الله، اما بعد

জিহাদের মূল উদ্দেশ্যে হলো, দ্বীন কায়েম করা। আর দ্বীন কায়েমের জন্য ইলম চর্চা আবশ্যক। ইলম চর্চা ব্যতীত দ্বীনের বিধানাবলীর ব্যাপারে অবগতি লাভ করা সম্ভব নয়। ইলম হল দ্বীনের সকল বিষয়ের ভিত্তিমূল। সুতরাং আমরা যদি দ্বীনের বিধানাবলীর ইলমই অর্জন না করি, তাহলে আমরা নিজেরা কীভাবে তা পালন করবো আর মানুষের মাঝেই বা কীভাবে বাস্তবায়ন করবো?

তাছাড়া বর্তমান ফিতনা ও তাহরীফের যুগে জিহাদের দাওয়াত, উলামায়ে সু কর্তৃক সৃষ্ট বিভিন্ন সংশয় নিরসন ইত্যাদির জন্যও ইলম চর্চা অত্যন্ত জরুরি। নতুবা দাওয়াত ও জিহাদের ময়দানে সফল হওয়া তো দূরের কথা, নিজেরাই সংশয়ের শিকার হওয়ার আশংকা রয়েছে। সুতরাং আমাদেরকে ফরজ ইলম অর্জনের মেহনত অবশ্যই করে যেতে হবে, তা ছাড়ার সুযোগ নেই। একই সঙ্গে ইলম অর্জন ও জিহাদের কাজ উভয়টিই করে যেতে হবে। কারণ দুটিই ফরজ।

আসলে এই প্রশ্নটি সৃষ্টি হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে আমরা ইলম অর্জন ও জিহাদকে সংঘর্ষিক মনে করি। অন্যথায় এপ্রশ্নটি আমাদের মনে জাগতই না। যেমন নামায পড়ব, না রোযা রাখব, এই প্রশ্ন কারো মনে জাগে না। কারণ সবাই জানে নামায ও রোযা সংঘর্ষিক নয়; বরং দুটি একই সঙ্গে করা যায়। বস্তুত ইলম অর্জন এবং জিহাদও সাংঘর্ষিক নয়। বিশেষ করে বাংলাদেশের মতো জায়গায় যেখানে ই’দাদ ও দাওয়াতের মারহালায় কাজ চলছে, সেখানে তো মোটেই সাংঘর্ষিক নয়। হ্যাঁ, জিহাদের চুড়ান্ত স্তর কিতালের কিছু মুহূর্ত আছে, যেখানে ইলম অর্জন বা অন্য আমল করা যায় না। সেটা হল যখন একজন মুজাহিদ সরাসরি কিতালরত থাকে। এই অবস্থাটা দীর্ঘস্থায়ী কিছু নয়; বরং সাময়িক বিষয়। এমনকি যেসব জিহাদি কাফেলা সম্পর্কে আমরা জানি, তারা বছরের পর বছর কিতাল করে যাচ্ছে, তাদেরও প্রতিটি সদস্য প্রতি মুহূর্তে কিতালরত থাকে না। দেখা যায় যারা প্রতিরক্ষার জন্য রিবাতের কাজ করেন, তারা হয়তো পালা বদল করে কাজ করছেন এবং নিজ নিজ বিরতিতে অন্যান্য কাজের সঙ্গে ইলম চর্চাও করছেন। এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে প্রহরারত অবস্থায়ও ইলম অর্জনসহ অন্যান্য কাজ করছেন। আরেক কাফেলা হয়তো শত্রুর উপর অভিযান পরিচালনা করছেন। কিন্তু প্রতিদিন প্রতি মুহূর্তে তা করছেন না। বরং কয়েক ঘণ্টা বা কয়েক দিনের একটি অভিযান পরিচালনা করলেন, আবার বেশ কিছু সময় বিরতি দিয়ে আরেকটি অভিযানে গেলেন। খোদ রাসূলে কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের জীবনে দেখেন। তাঁর পুরো জীবনে ২৯টি কিতাল হয়েছে। সেটা ছিল খুবই সীমিত সময়ের জন্য। বাকি পুরো সময়ই তিনি কিতালের প্রস্তুতিসহ জিহাদের প্রাথমিক কাজ এবং শরীয়তের অন্যান্য কাজগুলো করেছেন। তা’লীম তাআল্লুমের কাজও তখন করেছেন।

এ বিষয়টি পরিষ্কার না থাকায়, আমাদের অনেকেই জিহাদ ও ইলম চর্চাকে বিপরীত মেরুতে দাঁড় করিয়ে বিভ্রান্তির শিকার হচ্ছেন। কেউ ইলম চর্চার অজুহাতে জিহাদ ছেড়ে দিচ্ছেন, আবার কেউ জিহাদের অজুহাতে ইলম চর্চা ছেড়ে দিচ্ছেন। উভয় দলই প্রান্তিকতার শিকার। আমরা এই প্রান্তিকতা পরিহার করব এবং ইলম অর্জনের পাশাপাশি কিতালের প্রস্তুতিমূলক জিহাদি কাজগুলোও করে যাব ইনশাআল্লাহ। শুধু তাই নয়; বরং ইলম অর্জনের জন্য প্রচলিত প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি জরুরি না হলেও তা যেহেতু ইলম অর্জনে অনেক বড় সহায়ক, এজন্য যতক্ষণ সম্ভব আমরা প্রাতিষ্ঠানিকভাবেই ইলম অর্জন করতে থাকব। কারণ আমাদের দেশে বর্তমানে কিতালের সামর্থ্য ও ক্ষেত্র কোনোটিই নেই। এখন মৌলিকভাবে জিহাদের দাওয়াত ও ই’দাদের মারহালার কাজ চলছে। এই স্তরের অধিকাংশ কাজই আপন আপন জায়গায় থেকে করা সম্ভব। বরং অনেক ক্ষেত্রে আপন জায়গায় থেকে করা জরুরি এবং নিরাপদ। হ্যাঁ, যখন এ অঞ্চলে কিতালের সামর্থ্য ও ক্ষেত্র তৈরি হবে কিংবা এমন কোনো পরিস্থিতি তৈরি হবে, যখন জিহাদের ফরজ আদায়ের ক্ষেত্রে ইলম অর্জনের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক পদ্ধতি প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়াবে, তখন অবশ্যই প্রত্যেকের অবস্থা অনুযায়ী শরীয়ত যার জন্য যেটাকে অগ্রাধিকারের নির্দেশ দিবে সেটাই করতে হবে। শরীয়ত যদি তখন সাময়িকভাবে ইলম অর্জন বন্ধ রেখে কিতালে যেতে বলে, তখন সেটাই করতে হবে। আসলে আমাদের তো জিহাদ বা ইলম কোনোটিই মূল উদ্দেশ্য নয়; আমাদের মূল উদ্দেশ্য হল, আল্লাহর নির্দেশ পালন করা। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তো খন্দকের যুদ্ধে সালাত কাযা করেও কিতাল করেছেন। কারণ তখন সেটাই আল্লাহর হুকুম ছিল।

 

আমেরিকা যখন ইরাকে হামলা করেছিল, তখন ইরাকি এক তালিবুল ইলম প্রশ্ন করেছিলেন, আমি ও আমার ভাই তালেবুল ইলম। আমরা কি জিহাদ করবো, না ইলম শিখতে থাকব? তার উত্তরে সমকালীন একজন বরেণ্য মুজাহিদ শায়েখ আবু উসামা শামী বলেছিলেন,

لا شك أن الواجب عليك وعلى أخيك هو الجهاد  … وأما حديثك عن طلب العلم والجهاد فالجهاد لا يتعارض مع العلم البتة، بل عليك ان تجاهد وتطلب العلم في الوقت نفسه، واعلم أن الله سيفتح عليكما من الفهم والعلم والبركة في ميدان الجهاد ما لن تجداه في غير الجهاد لقوله تعالى ” والذين جاهدوا فينا لنهدينهم سبلنا “، وإذا كان طلاب العلم سيستنكفون عن الجهاد بحجة طلب العلم وقد حل العدو بدارهم فمن للجهاد إذن؟ فاتق الله أخي وعاجل وبادر إلى الالتحاق بصفوف إخوانك المجاهدين وناصرهم بقولك وعلمك ونفسك، وهم من يقدر لك الأمور ويختار لك في مرحلة معينة الأفضل للجهاد والأنفع للمجاهدين، من مواصلة طلب العلم لحاجتهم مثلا أو الانخراط بالجهاد أو غيره، وتذكر سير أبطال العلماء عندكم كأبي أنس الشامي رحمه الله وغيرهم ممن لم تعطلهم دعوى طلب العلم عن اللحاق بركب الجهاد … نسأل الله لك التوفيق. -اسئلة منبر التوحيد والجهاد: 496

‘নিঃসন্দেহে আপনাদের উপর জিহাদ ফরয। আর আপনি যে বলছেন, জিহাদ করব, না ইলম শিখতে থাকব? তো জিহাদ কখনোই ইলম অর্জন করার পরিপন্থী নয়। সুতরাং আপনাদের একই সময়ে জিহাদ ও ইলম অর্জন চালিয়ে যেতে হবে। আল্লাহ তায়ালা জিহাদের ময়দানে আপনাদের ইলম ও ফাহমে এমন বারাকাহ দান করবেন, যা আপনারা জিহাদের ময়দান ভিন্ন অন্য কোথাও পাবেন না। যদি শত্রু আক্রমণ করা সত্ত্বেও তালেবুল ইলমগণ ইলম শিখার অজুহাতে জিহাদ হতে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তাহলে কে জিহাদ করবে? অতএব আপনি আল্লাহকে ভয় করুন, যত দ্রুত সম্ভব মুজাহিদ ভাইদের কাতারে শামিল হয়ে যান এবং আপনার যবান, ইলম ও জানের মাধ্যমে তাদের সাহায্য করুন। আপনার ইলম চর্চা ও জিহাদের মধ্যে কোন্ স্তরে কোনটি জিহাদ ও মুজাহিদদের জন্য উত্তম ও কল্যাণকর তা তারাই নির্ধারণ করে দিবেন। আপনি আপনাদের ভূমির বীরসেনানী আলেমগণের জীবন চরিত স্মরণ করুন। যেমন শায়েখ আবু আনাস শামী ও অন্যান্য শায়েখগণ, যারা ইলম চর্চার অজুহাতে জিহাদের কাফেলায় শরীক হওয়া থেকে বিরত থাকেননি। আল্লাহ আপনাকে তাওফিক দান করুন।’ –আসইলাতু মিম্বারিত তাওহীদ ওয়াল জিহাদ, প্রশ্ন নং: ৪৯৬

আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি (উফিয়া আনহু)

২৪-০৪-১৪৪২ হি.

১০-১২-২০২০ ইং