ফাতওয়া  নং  ১৫১

আত্মহত্যাকারীর কাফন-দাফনের হুকুম কী? -মুফতি আবু ‍মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি (হাফিযাহুল্লাহ)

আত্মহত্যাকারীর কাফন-দাফনের হুকুম কী?

আত্মহত্যাকারীর কাফন-দাফনের হুকুম কী?

 

প্রশ্ন:

আত্মহত্যাকারীর কাফন-দাফনের হুকুম কী? তার কি কাফন-দাফন করতে হবে, নাকি তার এ অপরাধটি তাকে কুফর পর্যন্ত পৌঁছে দিয়েছে?

প্রশ্নকারী-আবু আব্দুল্লাহ

 

উত্তর:

আত্মহত্যা হারাম এবং কবীরা গুনাহ। কুরআন-সুন্নাহয় আত্মহত্যার ব্যাপারে কঠিন শাস্তির ধমকি এসেছে।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন:

وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ عُدْوَانًا وَظُلْمًا فَسَوْفَ نُصْلِيهِ نَارًا. –النساء 29

“তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চিত জেনে রেখো, আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন করে এরূপ করবে, অচিরেই আমি তাকে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবো।” -সূরা নিসা (৪): ২৯

হাদীসে এসেছে,

       عن أنس بن مالك عن النبي صلى الله عليه وسلم قال أكبر الكبائر الإشراك بالله وقتل النفس وعقوق الوالدين وقول الزور أو قال وشهادة الزور (صحيح البخاري 6871)

“হযরত আনাস রাদিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, সবচেয়ে বড় কবীরা গুনাহ: আল্লাহর সঙ্গে শিরক করা, মানুষ হত্যা করা, মাতা-পিতার অবাধ্য হওয়া, মিথ্যা বলা বা মিথ্যা সাক্ষ্য দেয়া।” -সহীহ বুখারী: ৬৮৭১

অন্য হাদিসে ইরশাদ করেন,

ومن قتل نفسه بشيء في الدنيا عذب به يوم القيامة. -أخرجه البخاري برقم 6047 طـ دار طوق النجاة ، ومسلم برقم 176. طـ دار إحياء التراث العربي

“যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোনো বস্তু দ্বারা আত্মহত্যা করবে, কিয়ামতের দিন তাকে সে বস্তু দ্বারা আজাব দেওয়া হবে।” –সহীহ বুখারি : ৬০৪৭; সহীহ মুসলিম : ১৭৬

তবে আত্মহত্যা হারাম হলেও কুফর নয়। আত্মহত্যার কারণে কেউ কাফের হয় না; যতক্ষণ না সে এ কাজটি হালাল মনে করে।

যেহেতু আত্মহত্যাকারী কাফের নয় এবং ‘মুফসিদ ফিল আরদ’ (বাগি বা রাহজান) নয়, তাই তার জানাযা পড়তে হবে এবং কাফন দাফনও করতে হবে। অন্যদের মতো তার জানাযা ও কাফন দাফনও ফরজে কেফায়া। তবে সমাজের নেতৃস্থানীয় দ্বীনদার এবং মুকতাদা ও অনুসৃত আলেমদের জন্য এমন ব্যক্তির জানাযা থেকে বিরত থাকা চাই, যাতে অন্যরা এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এবং ভবিষ্যতে কেউ এমন অন্যায় কাজ না করে।

এক হাদিসে এসেছে,

عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ أُتِىَ النَّبِىُّ -صلى الله عليه وسلم- بِرَجُلٍ قَتَلَ نَفْسَهُ بِمَشَاقِصَ فَلَمْ يُصَلِّ عَلَيْهِ. صحيح مسلم : 2309

“জাবির বিন সামুরাহ রাদি. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, (জানাযার জন্য) রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এক ব্যক্তিকে আনা হলো, যে ধারালো তীর দিয়ে আত্মহত্যা করেছিল। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার জানাযা পড়েননি।” -সহীহ মুসলিম: ২৩০৯

উক্ত হাদীসের ব্যাখ্যায় ইমাম নববি রহ. (৬৭৬ হি.) বলেন,

وَقَالَ الْحَسَنُ وَالنَّخَعِيُّ وَقَتَادَةُ وَمَالِكٌ وَأَبُو حَنِيفَةَ وَالشَّافِعِيُّ وَجَمَاهِيرُ الْعُلَمَاءِ يُصَلَّى عَلَيْهِ وَأَجَابُوا عَنْ هَذَا الْحَدِيثِ بِأَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَمْ يُصَلِّ عَلَيْهِ بِنَفْسِهِ زَجْرًا لِلنَّاسِ عَنْ مِثْلِ فِعْلِهِ وَصَلَّتْ عَلَيْهِ الصَّحَابَةُ وَهَذَا كَمَا تَرَكَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الصَّلَاةَ فِي أَوَّلِ الْأَمْرِ عَلَى مَنْ عَلَيْهِ دَيْنٌ زَجْرًا لَهُمْ عَنِ التَّسَاهُلِ فِي الِاسْتِدَانَةِ وَعَنْ إِهْمَالِ وَفَائِهِ وَأَمَرَ أَصْحَابَهُ بِالصَّلَاةِ عَلَيْهِ فَقَالَ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلُّوا عَلَى صَاحِبِكُمْ. شرح النووي على مسلم (7/ 47)

হাসান বসরি, (ইব্রাহিম) নাখায়ি, কাতাদা, মালেক, আবু হানিফা ও শাফিয়িসহ জুমহুর উলামার মত হল, এমন ব্যক্তির জানাযা পড়া হবে। তারা এ হাদিসের ব্যাখ্যায় বলেন, তাঁর জানাযা রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে পড়েননি, যাতে লোকজন এ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে এ ধরনের (জঘন্য) কাজ থেকে বিরত থাকে। সাহাবায়ে কেরাম তার জানাযা পড়েছেন। যেমনিভাবে ইসলামের শুরুর দিকে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঋণগ্রস্ত মৃতের জানাযা পড়েননি, যাতে মানুষ ঋণ করা ও ঋণ পরিশোধ করার বিষয়ে আরো সতর্ক হয়। তখন তিনি সাহাবিদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তোমরা তোমাদের সাথীর জানাযা পড়ে দাও। -শরহে মুসলিম: ৭/৪৭

আরো দেখুন রদ্দুল মুহতার: ২/২১১, আলবাহরুর রায়িক: ২/২১৫

 

আত্মহত্যা সম্পর্কে নিচের ফতোয়াগুলোও দেখতে পারেন,

ফাতোয়া নং- ১২৬. নিজের ইজ্জত রক্ষার্থে আত্মহত্যা করা কি বৈধ হবে? https://fatwaa.org/2020/12/03/1955/

ফাতোয়া নং- ১২৮. কেউ নিজের ইজ্জত রক্ষার্থে আত্মহত্যা করে ফেললে তার হুকুম কী? https://fatwaa.org/2020/12/05/1964/

ফাতোয়া নং- ১৫. ইসলামে আত্মহত্যা করার কোনো উপায় আছে কি? https://fatwaa.org/2020/05/06/932/

فقط، والله تعالى أعلم بالصواب

আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি (উফিয়া আনহু)

২৯-০৬-১৪৪২ হি.

১২-০২-২০২১ ইং