উলামা-মাশায়েখ, কিতাব-রিসালাহ, প্রবন্ধ-নিবন্ধ, মুফতি আবু আসেম নাবিল হাফিযাহুল্লাহ

গাযওয়ায়ে হিন্দ বিষয়ক হাদীসসমূহ: সনদ বিশ্লেষণমূলক পর্যালোচনা -মুফতি আবু আসেম নাবিল হাফিযাহুল্লাহ

গাযওয়ায়ে হিন্দ বিষয়ক হাদীসসমূহ: সনদ বিশ্লেষণমূলক পর্যালোচনা -মুফতি আবু আসেম নাবিল হাফিযাহুল্লাহ

পিডিএফ ডাউনলোড করুন

ওয়ার্ড ডাউনলোড করুন

 

গাযওয়ায়ে হিন্দ বিষয়ক হাদীসসমূহ:

সনদ বিশ্লেষণমূলক পর্যালোচনা

 

মুফতি আবু আসেম নাবিল হাফিযাহুল্লাহ

 

 

সূচিপত্র

ভূমিকা    5

আবু হুরায়রাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসসমূহ. 9

প্রথম হাদীস.. 10

একটি আপত্তি ও তার জবাব. 12

মুহাদ্দিসগণের নিকট ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য একটা মূলনীতির ব্যাখ্যা… 13

দ্বিতীয় হাদীস.. 16

তৃতীয় হাদীস.. 20

চতুর্থ হাদীস.. 23

একটি পর্যালোচনা.. 28

পঞ্চম হাদীস.. 30

হাদীসটির সনদ বিশ্লেষণের সার সংক্ষেপ.. 41

গাযওয়ায়ে হিন্দ কি সংঘটিত হয়ে গেছে, না, শেষ জামানায় হবে?. 42

নুআইম ইবনে হাম্মাদ ও তাঁর রচিত ‘কিতাবুল ফিতান’ গ্রন্থ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু কথা    55

সহীহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমসহ প্রসিদ্ধ ছয়টি হাদীস গ্রন্থে তাঁর বর্ণিত হাদীসের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা –  57

নুআইম ইবনে হাম্মাদ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার জন্য নিম্নোক্ত কিতাবগুলো দেখা যেতে পারে-  57

কিতাবুল ফিতান. 58

উপরিউক্ত হাদীসগুলো একজন মুমিনকে যে সকল বার্তা দেয়-. 61

গ্রন্থপঞ্জি    63

 

الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على خاتم النبيين، وعلى آله وصحبه أجمعين، و من تبعهم بإحسان إلى يوم الدين.

ভূমিকা

গাযওয়ায়ে হিন্দ সম্পর্কিত হাদীসগুলো সহীহ কি-না, এ-বিষয়ে গত কয়েক বছর থেকে সমাজের বিভিন্ন স্তরের লোকজনের পক্ষ থেকে, পক্ষে-বিপক্ষে বিভিন্ন প্রশ্ন ও মতামত আসছিল। তাই উসূলে হাদীস ও জারহ-তা‘দীলের মূলনীতির আলোকে এ-সম্পর্কিত হাদীসগুলোর মান যাচাই করা এবং সেগুলোর যথাযথ প্রয়োগক্ষেত্র জানার জন্য কাজ করছিলাম। যাতে গাযওয়ায়ে হিন্দ সম্পর্কিত প্রতিটি হাদীসের বিস্তারিত সনদ-পর্যালোচনা ও প্রকৃত চিত্র সামনে এসে যায়। এই পুস্তিকাটি সে প্রচেষ্টারই প্রাথমিক ফল। সনদ বিশ্লেষণ ও জারহ-তা‘দীল বিষয়ক পর্যালোচনা বোঝা সাধারণ মুসলমান ভাই বোনদের জন্য বেশ কঠিন। তবুও সাধারণের বোধগম্য করে আলোচনাটি পেশ করার চেষ্টা করেছি।

পুস্তিকাটি যেহেতু বেশ লম্বা। তাই মূল বিষয়ে প্রবেশের পূর্বে সমগ্র আলোচনার সংক্ষিপ্ত বিন্যাস ও বিষয়বস্তুর সারসংক্ষেপ প্রথমে তুলে ধরা হল, যাতে পাঠকের জন্য পুরো বিষয়টির অধ্যয়ন সহজবোধ্য হয়।

সংক্ষিপ্ত বিন্যাস: প্রতিটি হাদীস উল্লেখ করার পর মূল মতনের সাথে হাদীসটির হুকুম ও ক্ষেত্র-বিশেষ সনদ কেন্দ্রিক সংক্ষিপ্ত-আলোচনা আরবীতে পেশ করা হয়েছে, যেন ওলামায়ে কেরাম হাদীসটির সামগ্রিক বিষয় প্রথমেই জেনে নিতে পারেন। এরপর সর্বসাধারণের জন্য হাদীসটির সরল তরজমা, সংক্ষিপ্ত হুকুম এবং শেষে বিস্তারিত সনদ-বিশ্লেষণ তুলে ধরা হয়েছে। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে গাযওয়ায়ে হিন্দ সম্পর্কিত হাদীসগুলোর সনদ-তাত্ত্বিক পুরো পর্যালোচনাটিকে তিনটি অংশ ও একটি পরিশিষ্টে ভাগ করা হয়েছে।

প্রথম অংশে গাযওয়ায়ে হিন্দ সম্পর্কে হযরত আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে বর্ণিত হাদীসসমূহ এবং সেগুলোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন আপত্তি ও তার জবাব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

প্রথম অংশের শাখা শিরোনামগুলো যথাক্রমে:

১. প্রথম হাদীস ও সনদ বিশ্লেষণ।

২. একটি আপত্তি ও তার জবাব।

৩. মুহাদ্দিসগণের নিকট ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য একটি মূলনীতির ব্যাখ্যা।

৪. দ্বিতীয় হাদীস ও সনদ বিশ্লেষণ।

৫. একটি আপত্তি ও পর্যালোচনা।

৬. তৃতীয় হাদীস ও সনদ বিশ্লেষণ।

৭. চতুর্থ হাদীসটির সনদ বিশ্লেষণ সম্পর্কে প্রারম্ভিক কথা।

৮. রাবি বাকিয়্যাহ ইবনে ওয়ালীদ সম্পর্কে কিছু তথ্য।

৯. চতুর্থ হাদীস কেন্দ্রিক একটি পর্যালোচনা।

 

দ্বিতীয় অংশে গাযওয়ায়ে হিন্দ সম্পর্কে হযরত সাওবান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে বর্ণিত হাদীসটির সনদদ্বয় এবং সেগুলোর ক্ষেত্রে বিভিন্ন আপত্তি ও তার জবাব সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। দ্বিতীয় অংশের শাখা শিরোনামগুলো যথাক্রমে:

১. পঞ্চম হাদীস ও সনদ বিশ্লেষণ। (ক) সনদটির প্রথম শাখা বা طَرِيْق

২. একটি আপত্তি ও তার জবাব (টীকা)

৩. (খ)  সনদটির দ্বিতীয় শাখা বা طَرِيْق

৪. একটি ভুল সংশোধনী (টীকা)।

৫. হাদীসটির সনদ বিশ্লেষণের সার সংক্ষেপ।

 

তৃতীয় অংশে দু‘জন তাবিঈ থেকে গাযওয়ায়ে হিন্দ সম্পর্কিত কিছু বর্ণনা এবং তৎসংশ্লিষ্ট কিছু বিষয় উল্লেখ করা হয়েছে। তৃতীয় অংশের শাখা শিরোনামগুলো যথাক্রমে:

১. গাযওয়ায়ে হিন্দ কি সংঘটিত হয়ে গেছে, না-কি শেষ জামানায় হবে?

২. বিশিষ্ট তাবিঈ আরতাত রহিমাহুল্লাহ এর বর্ণনা।

৩. কুসতুনতুনিয়া বা কনস্টান্টিনোপল বিজয়: একটি জিজ্ঞাসার জবাব (টীকা)।

৪. তাবিঈ কা’আব আহবার রহিমাহুল্লাহ এর বর্ণনা।

৫. ইসলামের প্রাচীন কোনো কোনো ইতিহাস-গ্রন্থে হিন্দুস্তানের যে সকল অভিযানকে ‘গাযওয়ায়ে হিন্দ’ নামে অভিহিত করা হয়েছে, তার আলোকে ‘একটি পর্যালোচনা।’

 

পরিশিষ্টে নুআইম ইবনে হাম্মাদ ও তাঁর রচিত ‘কিতাবুল ফিতান’ গ্রন্থ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু কথা বলা হয়েছে এবং পাদটীকায় একটি ভুল ধারণার অপনোদন করা হয়।

শেষে একটি উপসংহার যুক্ত করা হয়েছে। অত্র পুস্তিকার হাদীসগুলো একজন মুমিনকে যে সকল বার্তা দেয়, সংক্ষেপে সে বার্তাগুলো ধারাবাহিকভাবে উপসংহারে তুলে ধরা হয়েছে।

সর্বশেষে, এই পুস্তিকা রচনায় যে সকল কিতাব থেকে সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে, তার সন ভিত্তিক একটা গ্রন্থপঞ্জি প্রবন্ধের শেষে দেওয়া হয়েছে। যাতে পাঠক প্রয়োজনে মূল কিতাব থেকেও দেখে নিতে পারেন।

 

বিষয়বস্তুর সার সংক্ষেপ: গাযওয়ায়ে হিন্দ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে আমরা দু’জন সাহাবীর বর্ণনা পেয়েছি। তাঁরা হলেন যথাক্রমে ১. আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) ২. সাওবান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু)। এছাড়া সংশ্লিষ্ট বিষয়ে দু‘জন তাবিঈ থেকেও কিছু বর্ণনা পাওয়া যায়। যেগুলো উক্ত দুই সাহাবীর বর্ণনার ব্যাখ্যাস্বরূপ এবং তাঁদের বর্ণিত বিষয়বস্তুকে একটি পূর্ণাঙ্গ কাঠামো দান করে। সে দু‘জন তাবিঈ হলেন, যথাক্রমে ১. আরতাত ইবনুল মুনযির রহিমাহুল্লাহ ২. কা’ব আল আহবার রহিমাহুল্লাহ।

গাযওয়ায়ে হিন্দ সম্পর্কে আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে বর্ণিত হাদীস মূলত একটি। উক্ত হাদীসটি তাঁর থেকে পৃথক তিনটি সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটির সনদ সহীহ, অপর দু’টির সনদ দুর্বল। তবে প্রথম হাদীসের কারণে অর্থগত দিক থেকে পরের দুটিও সহীহ। উপরোক্ত তিনটি সূত্রে বর্ণিত হাদীসগুলোর শব্দ প্রায় একই রকম। তাছাড়া আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে অন্য আরেকটি সূত্রে উক্ত বিষয়ে-ই আরো একটি হাদীস বর্ণিত হয়েছে। যাতে আগের হাদীসগুলোর পুরো বিষয়সহ অতিরিক্ত কিছু তথ্য রয়েছে, যা পূর্বের হাদীসগুলোতে নেই। সে বিষয়গুলো গাযওয়ায়ে হিন্দেরই একটি অংশ; তাতে যুদ্ধ-পরবর্তী অবস্থা এবং সেই যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার ফযিলত বর্ণিত হয়েছে। যা উল্লেখ করা হয়েছে চতুর্থ হাদীস হিসেবে ।

পঞ্চম হাদীসটি সাওবান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে বর্ণিত। হাদীসটিতে সাওবান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে বর্ণনাকারীদের চতুর্থ স্তর পর্যন্ত সনদের ধারা একটিই। এরপর চতুর্থ স্তর তথা মুহাম্মদ বিন ওয়ালিদ আয-যুবাইদী থেকে তাঁর তিনজন ছাত্র বর্ণনা করেছেন। যথাক্রমে- ১. আব্দুল্লাহ বিন সালেম, ২. আবু বকর বিন ওয়ালিদ, ৩. জাররাহ বিন মালিহ।

আব্দুল্লাহ বিন সালেম ও আবু বকর বিন ওয়ালিদ থেকে বর্ণনা করেছেন বাকিয়্যা বিন ওয়ালিদ এবং জাররাহ বিন মালিহ থেকে বর্ণনা করেছেন, হিশাম বিন আম্মার ও সুলাইমান বিন আব্দুর রহমান। এভাবে একটি সনদ উপর থেকে চতুর্থ স্তরে এসে দুইটি শাখায় রূপান্তরিত হয়েছে। সনদ বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার সুবিধার্থে সনদের দুইটি শাখা (طَرِيْق) পৃথকভাবে ‘ক’ ও ‘খ’ শিরোনামে আলোচনা করা হয়েছে। সর্বোপরি, উভয় সনদ মিলে হাদীসটি সহীহ লি-গাইরিহী।

সাওবান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে বর্ণিত উল্লিখিত হাদীস; যেখানে বলা হয়েছে, ‘দুটি দলকে আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। একটি দল, যারা হিন্দুস্তানের যুদ্ধে শরিক হবে। আর দ্বিতীয় দল, যারা ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গী হয়ে যুদ্ধ করবে।’ কোনো কোনো গবেষকের ধারণা, ‘এই হাদীসে আলোচিত দুটি দলের মাঝে পারস্পারিক কোনো সম্পর্ক নেই।’ তাদের দৃষ্টিতে ‘গাযওয়ায়ে হিন্দ উমাইয়া যুগে সংঘটিত হয়ে গেছে। আর দাজ্জালের সাথে ঈসা (আলাইহিস সালাম) এর বাহিনীর যুদ্ধ শেষ জামানায় ঘটবে।’ এভাবে তারা একই হাদীসে উল্লিখিত দুটি যুদ্ধের সময়কালের মাঝে ব্যাপক পার্থক্য আছে বলে মনে করেন।

ইতিহাস ও তারিখের আলোকে তাদের এ দাবি কতোটুকু যথার্থ বা হাদীসে উল্লিখিত ‘গাযওয়ায়ে হিন্দ’ এখনো সংঘটিত হয়নি বরং শেষ জামানায় সংঘটিত হবে, এবিষয়ে পৃথক একটি সংক্ষিপ্ত পর্যালোচনা পুস্তিকার শেষে (পরিশিষ্টের পূর্বে) যুক্ত করা হয়েছে। তবে বিশিষ্ট তাবিঈ আরতাত রহিমাহুল্লাহ এর বর্ণনা থেকে সুস্পষ্ট বোঝা যায়, সাওবান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) এর বর্ণিত হাদীসে আলোচিত দুটি যুদ্ধের ঘটনা একই যুগে অর্থাৎ শেষ জামানায় সংঘটিত হবে।

গাযওয়ায়ে হিন্দের বেশ কিছু হাদীস সহীহ সনদ দ্বারা প্রমাণিত। সেগুলো হাদীসের বিভিন্ন ইমামগণ তাঁদের সুপ্রসিদ্ধ হাদীসগ্রন্থসমূহে বর্ণনা করেছেন, যা বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে। তবে গাযওয়ায়ে হিন্দ সংশ্লিষ্ট কিছু হাদীস এককভাবে শুধু নুআইম ইবনে হাম্মাদ রচিত ‘কিতাবুল ফিতান’ গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে। যদিও সে হাদীসগুলোর কোনো কোনোটির সনদ সহীহ। এবং সেগুলো অন্য কোনো সহীহ হাদীসের বিপরীতও নয়। কিন্তু উক্ত কিতাব সম্পর্কে হাফেয যাহাবি রহিমাহুল্লাহ এর কোনো একটি মন্তব্যের ভিত্তিতে কেউ কেউ সে কিতাবে উল্লিখিত গাযওয়ায়ে হিন্দের সকল হাদীসের উপর আপত্তি উত্থাপনের চেষ্টা করেন। তাই পরিশিষ্টে হাদীস ও জারহ-তা‘দীলের ইমামগণের মতামতের আলোকে নুআইম ইবনে হাম্মাদ ও তাঁর রচিত ‘কিতাবুল ফিতান’ গ্রন্থ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু তথ্য তুলে ধরা হয়েছে।

পরিশেষে আল্লাহ তায়ালার নিকট দুআ করি, তিনি যেন আমাদেরকে সঠিক বিষয় বোঝার এবং সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করেন। আমিন

 

 

গাযওয়ায়ে হিন্দ বিষয়ক হাদীসসমূহ: সনদ বিশ্লেষণমূলক পর্যালোচনা

প্রথম অংশ

আবু হুরায়রাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হাদীসসমূহ

আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে গাযওয়ায়ে হিন্দ বিষয়ক একটি হাদীস রয়েছে। উক্ত হাদীসটি তাঁর থেকে পৃথক তিনটি সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। নিম্নে আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে বর্ণিত হাদীসসমূহ ধারাবাহিকভাবে সবিস্তারে বর্ণনা করা হচ্ছে,

প্রথম হাদীস

হাদীসটি হিজরী তৃতীয় শতকের অন্যতম মুহাদ্দিস সাঈদ ইবনে মানসুর রহিমাহুল্লাহ (২২৭ হি) তাঁর ‘সুনান’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,

حَدَّثَنَا هُشَيْمٌ، قَالَ: أنا سَيَّارٌ، عن جَبْرِ بْنِ عَبِيْدَةَ، عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ قَالَ: وَعَدَنَا رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ غَزْوَةَ الْهِنْدِ فَإِنْ اُدْرِكْهَا اُنْفِقْ فِيهَا نَفْسِي وَمَالِي، فَإِنْ اُقْتَلْ كُنْتُ مِنْ أَفْضَلِ الشُّهَدَاءِ، وَإِنْ أرْجِعْ فَأنَا أبُو هُرَيْرَةَ الْمُحَرَّرُ.

قَالَ الشَّيْخُ أحْمَد شَاكِر فِيْ “تَعْلِيْقِه عَلى الْمُسْنَدْ” 532:6 (7128): إِسْنَادُهُ صَحِيْحٌ.

قُلْتُ: إسْنَادُهُ مُتَّصِلٌ وَرِجَالُهُ كُلّهُمْ ثِقَاتٌ، سَيَأتِي تَفْصِيْلُه.

অর্থ:“সাঈদ ইবনে মানসুর রহিমাহুল্লাহ হুশাইম থেকে, তিনি সাইয়ার থেকে, তিনি জাবর ইবনে আবীদাহ থেকে, তিনি আবু হুরায়রাহ রাযিআল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন; আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদেরকে হিন্দুস্তানের জিহাদ সম্পর্কে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। যদি আমি সে জিহাদ পেয়ে যাই তাহলে আমি আমার জান-মাল সব কিছু তাতে ব্যয় করব। এতে যদি আমি শাহাদাত বরণ করি, তাহলে আমি হব সর্বশ্রেষ্ঠ শহীদ। আর যদি (জীবিত) ফিরে আসি, তাহলে হব (জাহান্নামের আগুন থেকে) মুক্তিপ্রাপ্ত।”

-শায়খ আহমাদ শাকের তাঁর তাহকীককৃত ‘মুসনাদে আহমাদ’ এর টীকায় বলেন, হাদীসটির সনদ সহীহ। ইমাম হাকেম রহিমাহুল্লাহ তার ‘মুসতাদরাকে’ ৩/৫৮৮ (৬১৭৭) হাদীসটি এনেছেন। কিন্তু তিনি এবং হাফেয যাহাবী রহিমাহুল্লাহ হাদীসটির বিষয়ে কোনো মন্তব্য করেননি।

-মুসনাদে আহমাদ ৬/৫৩২, হাদীস ৭১২৮; সুনানে সাঈদ ইবনে মানসুর ২/১৭৮ (বাবু মান কলা আল জিহাদু মা-দিন) হাদীস ২৩৭৪, তাহকীক- হাবীবুর রহমান আযমী; সুনানে নাসাঈ ২/৫২, হাদীস ৩১৭৩, ৩১৭৪; আত-তারীখুল কাবীর, ইমাম বুখারী ২/২৪৩, রাবি ২৩৩৩; আস-সুনানুল কুবরা, ইমাম নাসাঈ ৯/২৯৭, হাদীস ১৮৫৯৯; দালাইলুন নুবুওয়াহ, ইমাম বায়হাকী ৬/২৯০, হাদীস ২৬৩০; হিলয়াতুল আওলিয়া, আবু নুআইম আসফাহানী ৭/৫৯; মুসনাদে বাযযার ২/৪৬৬, হাদীস ৮৮১৯; আলফিতান, নুআইম ইবনে হাম্মাদ ১/৪০৯, (বাবু গযওয়াতিল হিন্দ) হাদীস ১২৩৭

উল্লিখিত ইমামগণ এ হাদীসটি নিজ নিজ সূত্রে হুশাইম থেকে, তিনি সাইয়ার থেকে, তিনি জাবর ইবনে আবীদাহ থেকে, তিনি আবু হুরায়রাহ থেকে বর্ণনা করেছেন।

হাদীসটির মান: হাদীসটির সনদ মুত্তাসিল এবং উল্লিখিত সকল বর্ণনাকারী নির্ভরযোগ্য।

নিম্নে রাবি বা বর্ণনাকারীগণের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি পেশ করা হলো-

এক. হুশাইম বিন বশীর বিন কাসেম (জন্ম ১০৪ হি., মৃত্যু ১৮৩ হি.)। ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম হুশাইম থেকে ‘সহীহ বুখারী’ ও ‘সহীহ মুসলিমে’ হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইমাম আবু যুরআ, মুহাম্মাদ ইবনে সাদ ও ইজলী প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ তাকে ছিকাহ বা নির্ভরযোগ্য বলেছেন। মুহাম্মদ বিন সা’দ বলেন,

كَانَ ثِقَةً، كَثِيْرَ الْحَدِيْثِ، ثَبْتًا، يُدَلِّسُ كَثِيْرًا، فَمَا قَالَ فِيْ حَدِيْثِهِ أَخْبَرَنَا فَهُوَ حُجَّةٌ، وَمَا لَمْ يَقُلْ فِيْهِ أَخْبَرَنَا فَلَيْسَ بِشَيْءٍ.

“তিনি ‘ছিকাহ’ (নির্ভরযোগ্য), বহু হাদীস বর্ণনাকারী, তবে তিনি অনেক তাদলীস করতেন। সুতরাং যে হাদীসের ক্ষেত্রে তিনি ‘আখবারানা’ শব্দ ব্যবহার করেন, সে হাদীস হুজ্জত বা দলিল হিসেবে গ্রহণযোগ্য হবে। আর যে হাদীসের ক্ষেত্রে ‘আখবারানা’ শব্দ ব্যবহার করবেন না, সে হাদীস গ্রহণযোগ্য হবে না।” -তাহযীবুল কামাল ৭/৪২১, রাবি ৭১৯০

জ্ঞাতব্য, উল্লিখিত এ হাদীসটি তিনি ‘আখবারানা’ শব্দে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং এ হাদীসে তাদলীসের কোনো প্রভাব পড়েনি।

দুই. সাইয়ার আবুল হাকাম আলআনাযী আলওয়াসিতী (মৃত্যু ১২২ হি.)। ইমাম আহমাদ, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন, নাসাঈ প্রমুখ মুহাদ্দিসগণ তাকে ‘ছিকাহ ও ছাবত তথা হাদীস বর্ণনায় নির্ভরযোগ্য ও সুদৃঢ়’ বলেছেন। ইমাম বুখারী ও ইমাম মুসলিম সাইয়ার থেকে ‘সহীহ বুখারী’ ও ‘সহীহ মুসলিমে’ হাদীস বর্ণনা করেছেন। -তাহযীবুল কামাল, রাবি ২৬৫৫

তিন. জাবর ইবনে আবীদাহ। তাবেঈ, কবি; তিনি আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে উক্ত হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইবনে হিব্বান ‘কিতাবুছ ছিকাত’-এ তাঁর জীবনী আলোচনা করেছেন, অর্থাৎ তাঁকে নির্ভরযোগ্য রাবিদের মধ্যে গণ্য করেছেন। ইমাম বুখারী তাঁর সংকলিত ‘আততারীখুল কাবীরে’ এবং ইমাম ইবনে আবি হাতেম তাঁর সংকলিত ‘আলজারহু ওয়াততা’দীলে’ জাবর ইবনে আবীদাহ’-এর জীবনী এনেছেন এবং সেখানে এই হাদীসটিও উল্লেখ করেছেন। কিন্তু তাঁরা উভয়ে এ হাদীস বা জাবর ইবনে আবীদাহ সম্পর্কে কোনো মন্তব্য করেননি। ইমাম নাসাঈ তাঁর থেকে এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন; কোনো মন্তব্য করেননি। ইবনে হাজার তাঁকে ‘মাকবুল’ বা গ্রহণযোগ্য বলেছেন। আল্লামা মারযুবানী তাঁর সংকলিত কবিদের পরিচিতিমূলক “মুজামুশ শুআরা” নামক সুপ্রসিদ্ধ গ্রন্থে তার জীবনী সম্পর্কে আলোচনা করেছেন।

-আততারীখুল কাবীর ২/২৪৩, রাবি ২৩৩৩; আলজারহু ওয়াততা’দীল ২/৫৩৩; কিতাবুছ ছিকাত ৪/১১৭; তাহযীবুল কামাল ১/৪৩৭, রাবি ৮৭৭; ইকমালু তাহযীবিল কামাল ২/৭০, রাবি ৯৪১;  তাহযীবুত তাহযীব ২/৫৪, রাবি ৯৪৬; তাকরীবুত তাহযীব, রাবি ৮৯২

একটি আপত্তি ও তার জবাব

কেউ কেউ এ হাদীসের বিশুদ্ধতার ব্যাপারে আপত্তি করেছেন। তাদের আপত্তি মূলত জাবর ইবনে আবীদাহ-কে কেন্দ্র করে, যাকে ইমাম যাহাবী রহিমাহুল্লাহ মাজহুল বা অপরিচিত আখ্যায়িত করেছেন এবং আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে উক্ত হাদীস বর্ণনার কারণে এ তাবিঈর উপর ‘মুনকার হাদীস’ বা পরিত্যাজ্য হাদীস বর্ণনা করার অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। উল্লিখিত জাবর ইবনে আবীদাহ’-এর বিস্তারিত তথ্য থেকে প্রতিভাত হয় যে, ইমাম যাহাবী রহিমাহুল্লাহ এর এ আপত্তি সঠিক নয়। এ বিষয়ে ইমাম যাহাবি রহিমাহুল্লাহ এর এ আপত্তির শক্তিশালী জবাব দিয়েছেন শায়খ আহমাদ শাকের রহিমাহুল্লাহ ‘মুসনাদে আহমাদের’ টীকায়। তিনি বলেন,

إِسْنَادُهُ صَحِيْحٌ. جَبْرُ بْنُ عَبِيْدَةَ: هُوَ الشَّاعِرُ، وَهُوَ تَابِعِيٌّ ثِقَةٌ، تَرْجَمَهُ الْبُخَارِيُّ فِيْ “الْكَبِيْرِ” فَلَمْ يَذْكُرْ فِيْهِ جَرْحًا، وَابْنُ أَبِيْ حَاتِمٍ فَلَمْ يُجَرِّحْهُ أَيْضًا، وَذَكَرَهُ ابْنُ حِبَّان فِيْ “الثِّقَاتِ”. وَزَعَمَ الذَّهَبِيُّ فِيْ “الْمِيْزَانِ” أَنَّهُ أَتى “بِخَبَرٍ مُنْكَرٍ، لَا يُعْرَفُ مَنْ ذَا!، وَحَدِيْثُهُ: وَعَدَنَا بِغَزْوَةِ الْهِنْدِ!!، وَكَذَلِكَ نَقَلَ الْحَافِظُ في “التهذيب” عَمَّا قَرَأَ بِخَطِّ الذَّهَبِيِّ وَلَسْتُ أَدْرِيْ مِمَّ جَاءَ لِلذَّهَبِىِّ نُكْرُ الْخَبَرِ؟، وَلَمْ يُنْكِرْهُ الْبُخَارِيُّ وَلَا غَيْرُهُ مَنْ قَبْلَهُ، وَلَمْ يُجَرِّحُوْا هَذَا التَّابِعِيَّ بِشَيْءٍ!، مَا هُوَ إِلَّا التَّحَكُّمُ. انتهى.

অর্থ:“হাদীসটির সনদ সহীহ। জাবর ইবনে আবীদাহ তাবেঈ, ছিকাহ (নির্ভরযোগ্য)। ইমাম বুখারী ‘আততারীখুল কাবীরে’ তাঁর জীবনী এনেছেন, তাতে কোনো জারহ উল্লেখ করেননি। ইমাম ইবনে আবি হাতেম তাঁর সংকলিত ‘আলজারহু ওয়াততা’দীলে’ জাবর ইবনে আবীদাহ সম্পর্কে জারহমূলক কোনো মন্তব্যই করেননি। ইবনে হিব্বান ‘কিতাবুছ ছিকাত’-এ তাঁর জীবনী আলোচনা করেছেন। অথচ যাহাবী ‘মীযানুল ই’তিদালে’ উল্লিখিত হাদীস বর্ণনার কারণে তার বিরুদ্ধে ‘মুনকার বর্ণনার’ অভিযোগ করেছেন এবং তাকে মাজহুল আখ্যায়িত করেছেন!! হাফেয ইবনে হাজার ‘তাহযীবুত তাহযীবে’ অনুরূপ কথা যাহাবী থেকে বর্ণনা করেছেন।

আহমাদ শাকের রহিমাহুল্লাহ বলেন, আমার বুঝে আসে না, হাফেয যাহাবী কিসের ভিত্তিতে হাদীসটিকে মুনকার বলেছেন? যেখানে ইমাম বুখারী রহিমাহুল্লাহ বা তাঁর পূর্বের কোনো ইমাম এ হাদীসটিকে মুনকার বলেননি এবং এই তাবেঈকে কোনো ধরনের জারহ করেননি, সেখানে (যাহাবী কিংবা) পরবর্তী কারোর এমন অভিযোগ স্বেচ্ছাচারিতা বৈ কিছুই নয়।” -মুসনাদে আহমাদ ৬/৫৩২, হাদীস ৭১২৮, তাহকীক- শায়খ আহমাদ শাকের।

 

মুহাদ্দিসগণের নিকট ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য একটা মূলনীতির ব্যাখ্যা

এখানে শায়খ আহমাদ শাকের রহিমাহুল্লাহ মুহাদ্দিসগণের নিকট ব্যাপকভাবে গ্রহণযোগ্য একটা মূলনীতির দিকে ইশারা করে তার ভিত্তিতে হাফেয যাহাবী রহিমাহুল্লাহ এর বক্তব্য খণ্ডন করেছেন। সে মূলনীতি হলো-

হাদীসের যে সকল ইমাম রিজালশাস্ত্রে কিতাব লিখেছেন; যেখানে তারা বিভিন্ন রাবির উপরে জারহ অথবা তা’দীল করে থাকেন, সেখানে তারা যদি এমন কোনো রাবির বিষয়ে চুপ থাকেন, যার ব্যাপারে কোনো জারহ পাওয়া যায় না এবং সে রাবি কোনো মুনকার হাদীসও বর্ণনা করেন না। তাহলে তার বিষয়ে উক্ত ইমামের চুপ থাকাকে সে রাবির ক্ষেত্রে তাওছীক ধরা হবে অর্থাৎ হাদীসবিশারদ সে ইমামের নিকট উক্ত রাবি গ্রহণযোগ্য বলে বিবেচিত হবে। বিশেষত, কোনো হাদীসের সনদে উল্লিখিত ব্যক্তি; যার বিষয়ে কোনো তথ্য জানা যায় না, তিনি যদি খাইরুল কুরুন তথা সাহাবী, তাবিঈ ও তাবে তাবিঈ-যুগের লোক হয়ে থাকেন অর্থাৎ যাদের উত্তম হওয়ার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাক্ষ্য রয়েছে, এমন ব্যক্তিদের ক্ষেত্রে জারহ-তা’দীলের ইমামগণ (যারা রিজাল শাস্ত্রে মন্তব্য করে থাকেন) যদি তাদের কিতাবে সে রাবির জীবনী এনে তার ব্যাপারে কোনো জারহ উল্লেখ না করেন এবং উক্ত রাবির কোনো মুনকার মতনও পাওয়া না যায়, তাহলে এটিকে তার স্বপক্ষে তাওছীক ধরা হবে।

ইমাম আবু হাতেম রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ২৭৭ হি.) ‘আলজারহু ওয়াত তা’দীল’ কিতাবের ২/৩৬ পৃষ্ঠায় এ বিষয়ে নিম্নোক্ত অধ্যায়ে বলেন,

بَابٌ فِيْ رِوَايَةِ الثِّقَةِ عَنْ غَيْرِ الْمَطْعُوْنِ عَلَيْهِ أنَّهَا تٌقَوِّيْهِ، وَعَنِ الْمَطْعُوْنِ عَلَيْهِ أنَّهَا لَا تٌقَوِّيْهِ.

“অধ্যায়: ‘গায়রে মাতউন’ বা অনভিযুক্ত রাবি থেকে নির্ভরযোগ্য রাবির বর্ণনা করা তাকে (অনভিযুক্ত রাবিকে) শক্তিশালী করবে। তবে অভিযুক্তকে শক্তিশালী করবে না।”

سَأَلْتُ اَبِيْ عَنْ رِوَايَةِ الثِّقَاتِ عَنْ رَجُلٍ غَيْرِ ثِقَةٍ مِمَّا يُقَوِّيْهِ ؟ قَالَ: “إِذَا كَانَ مَعْرُوْفًا بِالضُّعْفِ لَمْ تُقَوِّهِ رِوَايَتُهُ عَنْهُ وَإِذَا كَانَ مَجْهُوْلًا نَفَعَهُ رِوَايَةُ الثِّقَةِ عَنْهُ.

অর্থ: “ইবনে আবি হাতেম বলেন, ‘আমি আমার আব্বা আবু হাতেমকে জিজ্ঞাসা করলাম, ছিকাহ রাবি যদি ‘গায়রে ছিকাহ’ থেকে বর্ণনা করে তাহলে তা ‘গায়রে ছিকাহ’ রাবিকে শক্তিশালী করবে কিনা? তিনি বললেন, রাবি যদি যঈফ হিসাবে পরিচিত হয়, তাহলে ছিকাহ রাবি তার থেকে বর্ণনা করাটা তাকে (যঈফ হিসাবে পরিচিত রাবিকে) শক্তিশালী করবে না। আর যদি তার অবস্থা অজ্ঞাত থাকে (তার বিষয়ে ভালো-মন্দ কিছুই জানা না যায়), তাহলে শক্তিশালী করবে।”

অনুরূপভাবে ইমাম ইবনে কাছীর রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ৭৭৪ হি.) ‘ইখতিসারু উলূমিল হাদীস’ গ্রন্থের ৯৭ পৃষ্ঠায় বলেন,

فَأَمَّا الْمُبْهَمُ الَّذِيْ لَمْ يُسَمَّ، أَوْ مَنْ سُمِّيَ وَلَا تُعْرَفُ عَيْنُهُ فَهَذَا مِمَّنْ لَا يَقْبَلُ رِوَايَتَهُ اَحَدٌ عَلِمْنَاهُ. وَلَكِنَّهُ إِذَا كَانَ فِيْ عَصْرِ التَّابِعِيْنَ وَالْقُرُوْنِ الْمَشْهُوْدِ لَهُمْ بِالْخَيْرِ، فَإِنَّهُ يُسْتَأْنَسُ بِرِوَايَتِهِ، وَيُسْتَضَاءُ بِهَا فِيْ مَوَاطِنَ. وَقَدْ وَقَعَ فِيْ مُسْنَدِ الْإِمَامِ أَحْمَدَ وَغَيْرِهِ مِنْ هَذَا الْقَبِيْلِ كَثِيْرٌ وَاللهُ أَعْلَمُ.

অর্থ:“হাদীসের সনদে যদি এমন মুবহাম (অজ্ঞাত) ব্যক্তি থাকে, যার নাম উল্লেখ করা হয়নি অথবা নাম উল্লেখ করা হয়েছে কিন্তু সে রাবিকে চেনা যায় না, তাহলে তার বর্ণনা উলামায়ে কেরামের কেউ গ্রহণ করেন না। তবে যদি তিনি (সনদে উল্লিখিত ব্যক্তি; যার বিষয়ে কোনো তথ্য জানা যায় না) খাইরুল কুরুন তথা সাহাবী, তাবিঈ ও তাবে তাবিঈ-যুগের লোক হন অর্থাৎ যাদের উত্তম হওয়ার ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাক্ষ্য রয়েছে, তাহলে তার রেওয়ায়াত গ্রহণ করা হবে এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে তার বর্ণনা দ্বারা উপকৃত হওয়া যাবে। আর ‘মুসনাদে আহমাদ’সহ অন্যান্য কিতাবে এ ধরনের রাবি থেকে বহু বর্ণনা রয়েছে।”

আল্লামা মোল্লা আলী কারীও (মৃত্যু ১০১৪ হি.) ‘শারহু শারহি নুখবাতিল ফিকার’ গ্রন্থের ১৫৪ পৃষ্ঠায় এ ধরনের মত ব্যক্ত করেছেন। তিনি বলেন,

“…أَنَّ الْمَسْتُوْرَ مِنَ الصَّحَابَةِ وَالتَّابِعِيْنَ وَأَتْبَاعِهِمْ: يُقْبَلُ، بِشَهَادَةِ رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ (خَيْرُ الْقُرُوْنِ قَرْنِيْ ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ)، وَغَيْرُهُمْ لَا يُقْبَلُ إِلَّا بِتَوْثِيْقٍ، وَهُوَ تَفْصِيْلٌ حَسَنٌ”

“… হাদীসের সনদে যদি সাহাবা তাবেঈ ও তাবে তাবেঈদের মধ্য থেকে কোনো মাসতুর ব্যক্তি (সনদে উল্লিখিত এমন ব্যক্তি; যার বিষয়ে তেমন কোনো তথ্য জানা যায় না, যাতে তাকে চেনা যায়) থাকে, তাহলে তার বর্ণনা গ্রহণযোগ্য। কারণ, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁদের সম্পর্কে বলেছেন, خَيْرُ الْقُرُوْنِ قَرْنِيْ ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ ثُمَّ الَّذِيْنَ يَلُوْنَهُمْ  (সর্বোত্তম যুগ হলো আমার যুগ, এরপর আমার পরবর্তী যুগ অতঃপর তার পরবর্তী যুগ)। আর তাঁরা ছাড়া অন্যদের ক্ষেত্রে ইমামদের তাওছীক ব্যতীত তাঁদের বর্ণনা গ্রহণ করা হবে না। এটি একটি উত্তম বিশ্লেষণ।”

সুতরাং এ সমস্ত বক্তব্য থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, ইমাম বুখারী, আবু যুরআ, আবু হাতেম, ইবনে আবি হাতেম, ইবনে হিব্বান, ইবনে আদি, হাকেম কাবীর আবু আহমাদ, ইবনে নাজ্জার বাগদাদী এবং তাঁদের মতো অন্যান্য ইমামগণ যারা রাবিদের ক্ষেত্রে মন্তব্য করে থাকেন অথবা যাদের রিজাল শাস্ত্রে কিতাবাদি রয়েছে তাঁরা যদি এমন কোনো রাবির ব্যাপারে চুপ থাকেন, যার বিষয়ে কোনো জারহ পাওয়া যায় না এবং যিনি কোনো মুনকার বর্ণনাও করেন না, তাহলে এমন রাবির ব্যাপারে ইমামদের এ চুপ থাকাটা তার ছিকাহ হওয়ার প্রমাণ বহন করবে এবং তাকে ‘গায়রে ছিকাহ’ বা অগ্রহণযোগ্য হিসাবে গণ্য করা হবে না। আর তার বর্ণিত হাদীস ‘সহীহ’ অথবা ‘হাসান’ পর্যায়ের হবে কিংবা কমপক্ষে হাসানের স্তর থেকে নিচে নামবে না, যেহেতু তিনি যে কোনো ধরনের আপত্তি থেকে মুক্ত।

শায়খ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ১৪১৭ হি.) ‘আর রাফউ ওয়াত তাকমীল’ কিতাবের পাদটীকায় ২৩০-২৪৮ পৃষ্ঠায় উক্ত মূলনীতির বিষয়ে হাদীসের ইমামগণের বক্তব্য ও কর্ম সবিস্তারে আলোচনা করেছেন।

অতএব, ইমাম বুখারী বা তাঁর পূর্বের কোনো ইমাম স্বীয় গ্রন্থসমূহে এ হাদীসকে মুনকার বলেননি এবং এই হাদীসের তাবেঈ-স্তরের রাবি জাবর ইবনে আবীদাহ-কে কোনো ধরনের জারহ করেননি, তাই জাবর ইবনে আবীদাহ ছিকাহ ও গ্রহণযোগ্য রাবি এবং তার বর্ণিত এ হাদীস ‘সহীহ হাদীস’ হিসেবে গণ্য হবে।

 

দ্বিতীয় হাদীস

দ্বিতীয় হাদীসটি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল রহিমাহুল্লাহ (১৬৪-২৪১ হি.) তাঁর ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,

حَدَّثَنَا يَحْيَى بْنُ إِسْحَاقَ عَنِ الْبَرَاءِ عَنِ الْحَسَنِ عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ  قَالَ: حَدَّثَنِيْ خَلِيلِيْ الصَّادِقُ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ، أَنَّهُ قَالَ: “يَكُوْنُ فِيْ هَذِهِ الْأُمَّةِ بَعْثٌ إِلَى السِّنْدِ وَالْهِنْدِ، فَإِنْ أَنَا أدْركْتُهُ فَاسْتَشْهَدْتُ فَذَاكَ، وَإِنْ أَنَا فَذَكَرَ كَلِمَةً رَجَعْتُ وَأَنَا أَبُوْ هُرَيْرَةَ الْمُحَرَّرُ قَدْ أَعْتَقَنِيْ مِنَ النَّارِ”.

قَالَ الشَّيْخُ شُعَيْب اَلْأَرْنَؤُوْط فِيْ”تَعْلِيْقِهِ عَلَى المُسْنَدِ” 419:14 (8823) عَنْ هَذَا الإِسْنَادِ: إِسْنَادُهُ ضَعِيْفٌ لِضُعْفِ البَرَاءِ بْنِ عَبْدِ اللهِ الغَنَوِيْ، وَلِانْقِطَاعِهِ، فَإِنَّ الحَسَنَ -وَهُوَ البَصْرِيُّ- لَمْ يَسْمَعْ مِنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ. انتهى

قُلْتُ: إِسْنَادُهُ ضَعِيْفٌ كَمَا سَيَأْتِيْ، وَلَكِنَّ الْمَتْنَ صَحِيْحٌ بِالْحَدِيْثِ الْأَوَّلِ. وَأَمَّا سَمَاعُ الحَسَنِ عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ فَقَدْ أَثْبَتَ سَمَاعَهُ عَنْهُ بِدَلَائِلَ قَوِيَّةٍ وَاضِحَةٍ مُفَصِّلَةً الأُسْتَاذُ العَلَّامَةُ أحْمَد شَاكِر رَحِمَه اللهُ فِيْمَا عَلّقَهُ عَلَى “المُسْنَدِ” بِرَقْمِ (7138) وقَبْلَهُ الإمَامُ الحَافِظُ عَلاءُ الدِّيْن مُغُلْطَاي (المتوَفى:762 هـ) فِيْ كِتَابِهِ “إكْمَالُ تَهْذِيْبِ الْكَمَالِ” 2: 284 (1288) فَقَدْ أثْبَتَ سَمَاعَ الْحَسَنِ عَنْ أبِي هُرَيرةَ بِدَلائلَ قَوِيةٍ.

অর্থ:“ইয়াহইয়া ইবনে ইসহাক থেকে, তিনি বারা থেকে, তিনি হাসান বসরী থেকে, তিনি আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে বর্ণনা করেন; আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) বলেন, আমার সত্যবাদী বন্ধু রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাকে বলেছেন, এই উম্মতের মধ্যে একটি দল লড়াই করার জন্যে সিন্ধু ও হিন্দুস্তানে প্রেরিত হবে। (আবু হুরায়রাহ বলেন,) আমি যদি সেই যুদ্ধটি পাই এবং তাতে শহীদ হয়ে যাই, তাহলে তো ভালো কথা। আর যদি (জীবিত) ফিরে আসি, তাহলে তো আমি জাহান্নামের আগুন থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত আবু হুরায়রাহ হব।” -মুসনাদে আহমাদ ১৪/৪১৯, হাদীস ৮৮২৩, তাহকীক- শুআইব আরনাঊত।

মান: হাদীসটির সনদ যঈফ, তবে মতন বা মূলপাঠ সহীহ (প্রথম হাদীসের ভিত্তিতে)।

নিম্নে বর্ণনাকারীগণের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি পেশ করা হলো

এক. ইয়াহইয়া ইবনে ইসহাক আলবাজালী, আবু যাকারিয়া (মৃত্যু ২১০ হি.)। আহমাদ ইবনে হাম্বাল, মুহাম্মদ ইবনে সা’দ প্রমুখ মুহাদ্দিস তাঁকে ‘ছিকাহ’ বা নির্ভরযোগ্য বলেছেন। ইমাম মুসলিম তার থেকে ‘সহীহ মুসলিমে’ হাদীস বর্ণনা করেছেন। -তাহযীবুল কামাল ৮/০৮, রাবি ৭৩৭৬

দুই. বারা ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে ইয়াযীদ আলগনাবী। ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন, ইমাম আহমদ ও নাসাঈ তাঁকে যঈফ বলেছেন। হাফেয ইবনে হাজার রহিমাহুল্লাহ বলেন,

ضَعَّفَهُ أَحْمَد، وَابْنُ معِيْن وَالنَّسَائِيْ , وَلَمْ يُتَّهَمْ.

“ইমাম আহমদ, ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন ও নাসাঈ তাঁকে যঈফ বলেছেন কিন্তু মুত্তাহাম বলেননি বা তাঁর উপর মিথ্যার কোনো অভিযোগ করা হয়নি।” -লিসানুল মীযান ৯/২৬৬, রাবি ২৫৮

হাফেয ইবনে হাজার রহিমাহুল্লাহ বলেন, বারা ইবনে আব্দুল্লাহ যঈফ। -তাকরীবুত তাহযীব পৃ. ১২১, রাবি ৬৪৯; তাহযীবুল কামাল ১/৩৩২, রাবি ৬৪০

তিন. হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ১১০ হি.)। প্রখ্যাত তাবেঈ, ইমাম, মুহাদ্দিস ও ফক্বীহ। – তাহযীবুল কামাল, রাবি ১২০০; ইকমালু তাহযীবিল কামাল ২/২৭৮-২৯৩, রাবি ১২৮৮; তাহযীবুত তাহযীব ২/২৪৩-২৪৮, রাবি ১২৯৭

 

একটি আপত্তি ও পর্যালোচনা

শায়খ শুআইব আরনাঊত মুসনাদে আহমাদ এর টীকায় বলেন, “হাদীসটির সনদ যঈফ; বারা ইবনে আব্দুল্লাহ আলগনাবী দুর্বল রাবি। এছাড়া এ সনদে ইনকিতা (বিচ্ছিন্নতা) রয়েছে। কেননা, হাসান বসরী আবু হুরায়রাহ থেকে হাদীস শুনেননি।” -মুসনাদে আহমাদ ১৪/৪১৯, হাদীস ৮৮২৩, তাহকীক- শুআইব আরনাঊত।

শায়খ আহমাদ শাকের রহিমাহুল্লাহ মুসনাদে আহমাদের টীকায় খুব মজবুতভাবে দলিল-প্রমাণ দিয়ে এবং হাদীস শাস্ত্রের ইমামদের কথা ও কর্মের মাধ্যমে সাব্যস্ত করেছেন যে, আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ হাদীস শুনেছেন। যারা বলেন, আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ হাদীস শুনেননি, তিনি তাঁদের মতামত সুদৃঢ়ভাবে খণ্ডন করেছেন। -মুসনাদে আহমাদ, তাহকীক- শায়খ আহমাদ শাকের ১২/১০৭-১২২, হাদীস ৭১৩৮

তাছাড়া তাঁর পূর্বেই হিজরী অষ্টম শতকের বিশিষ্ট মুহাদ্দিস আলাউদ্দীন মুগলতাঈ রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ৭৬২ হি.) দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে সাব্যস্ত করেন যে, হাসান বসরী আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে হাদীস শুনেছেন। হাফেয মুগলতাঈ রহিমাহুল্লাহ শুরুতে ওই সকল ইমামগণের নাম উল্লেখ করেন, যারা বলেন: হাসান বসরী আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে হাদীস শোনেননি। এরপর বলেন,

وَالَّذِيْ يَظْهَرُ بِالدَّلِيْلِ صِحَّةُ سَمَاعِهِ مِنْهُ لِمَا نُوْرِدُهُ مِنْ أَقْوَالِ العُلَمَاءِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمْ.

অর্থ: “দলিল-প্রমাণের মাধ্যমে স্পষ্ট হয় যে, আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ হাদীস শোনার মতই সঠিক। এ বিষয়ে আমরা উলামায়ে কেরামের মতামত উল্লেখ করছি।”

এরপরে তিনি দলিল প্রমাণের মাধ্যমে সাব্যস্ত করেছেন যে, আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ হাদীস শুনেছেন। -ইকমালু তাহযীবিল কামাল ২/২৮৪, রাবি ১২৮৮

হাফেয ইবনে হাজার রহিমাহুল্লাহ ‘তাহযীবুত তাহযীব’ গ্রন্থে হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ এর জীবনীর শেষে এ প্রসঙ্গে বলেন,

وَهُوَ يُؤَيِّدُ أَنَّهُ سَمِعَ مِنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ فِيْ الجُمْلَةِ.

অর্থ: “আর তা এ বিষয়কে শক্তিশালী করে যে, মোটের উপর আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ হাদীস শুনেছেন”। -তাহযীবুত তাহযীব ২/২৪৭, রাবি ১২৯৬

এ বিষয়ে পক্ষে-বিপক্ষে বিস্তারিত দেখুন-

ইকমালু তাহযীবিল কামাল ২/২৭৮-২৯৩, রাবি ১২৮৮; তাহযীবুত তাহযীব ২/২৪৩-২৪৮, রাবি ১২৯৭; মুসনাদে আহমাদ, তাহকীক- শায়খ আহমাদ শাকের ১২/১০৭-১২২, হাদীস ৭১৩৮ টীকা; মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ, তাহকীক-শায়খ মুহাম্মাদ আউওয়ামাহ ১/৫১৭-৫১৯, হাদীস ৯৩৭ টীকা; আলকাশেফ, তাহকীক -শায়খ মুহাম্মাদ আউওয়ামাহ ২/২৬২-২৬৫, রাবি ১০২২ টীকা।

 

তৃতীয় হাদীস

এ হাদীসটি হিজরী তৃতীয় শতকের বিশিষ্ট মুহাদ্দিস ইবনে আবি আসেম রহিমাহুল্লাহ [1] (১) (২০৬-২৮৭ হি) তাঁর ‘কিতাবুল জিহাদ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,

حَدَّثَنَا أَبُو الْجَوْزَاءِ أَحْمَدُ بْنُ عُثْمَانَ – وَكَانَ مِنْ نُسَّاكِ أَهْلِ الْبَصْرَةِ – قَالَ: حَدَّثَنَا عَبْدُ الصَّمَدِ قَالَ: حَدَّثَنَا هَاشِمُ بْنُ سَعِيدٍ، عَنْ كِنَانَةَ بْنِ نُبَيْهٍ مَوْلَى صَفِيَّةَ، عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ قَالَ : وَعَدَنَا اللَّهُ وَرَسُولُهُ غَزْوَةَ الْهِنْدِ، فَإِنْ أُدْرِكْهَا أُنْفِقْ فِيهَا نَفْسِي وَمَالِي، فَإِنْ قُتِلْتُ كُنْتُ كَأَفْضَلِ الشُّهَدَاءِ، وَإِنْ رَجَعْتُ فَأَنَا أَبُو هُرَيْرَةَ الْمُحَرَّرُ.

قُلْتُ: إسْنَادُهُ ضَعِيْفٌ لِضُعْفِ هَاشِمِ بْنِ سَعِيْدٍ، وَلكِنّ الْمَتْنَ صَحِيْحٌ بِالْحَدِيْثِ الْأوّلِ.

অর্থ:“আবুল জাওযা আহমাদ ইবনে উসমান থেকে, তিনি আব্দুস সামাদ থেকে, তিনি হাশিম ইবনে সাঈদ থেকে, তিনি কিনানাহ ইবনে নুবাইহ থেকে, তিনি আবু হুরায়রাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে; আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) বলেন, আল্লাহ এবং তাঁর রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমাদেরকে হিন্দুস্তানের জিহাদ সম্পর্কে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। (আবু হুরায়রাহ রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু  বলেন,) যদি আমি সে জিহাদ পেয়ে যাই, তাহলে আমার জান-মাল সব কিছু তাতে ব্যয় করব। যদি শাহাদাত বরণ করি, তাহলে আমি হব সর্বশ্রেষ্ঠ শহীদ। আর যদি (জীবিত) ফিরে আসি, তাহলে হব (জাহান্নামের আগুন থেকে) মুক্তিপ্রাপ্ত।” -কিতাবুল জিহাদ, ইবনু আবি আসিম ২/৬৬৮, হাদীস ২৯১ (বাবু ফাযলি গাযবিল বাহর বা সামুদ্রিক জিহাদের ফযিলত অধ্যায়)।

হাদীসের মান: হাদীসটির সনদ যঈফ, তবে মতন বা মূলপাঠ সহীহ (প্রথম হাদীসের ভিত্তিতে)।

নিম্নে রাবি বা বর্ণনাকারীগণের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি পেশ করা হলো,

এক. আবুল জাওযা আহমাদ বিন উসমান, (মৃত্যু ২৪৬ হি.)। ইমাম আবু হাতেম ও নাসাঈ তাঁকে ‘ছিকাহ’ (নির্ভরযোগ্য) বলেছেন। -তাহযীবুল কামাল, রাবি ৭৮

দুই. আব্দুস সামাদ ইবনে আব্দিল ওয়ারিছ (মৃত্যু ২০৭ হি.)। ইমাম আবু হাতেম তাঁকে ‘সাদুক, সালিহুল হাদীস’ (সত্যপরায়ণ ও হাদীস বর্ণনায় যোগ্য) বলেছেন, ইমাম হাকিম তাঁকে ‘ছিক্বাহ, মা’মুন’ (হাদীস বর্ণনায় নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত) বলেছেন। ইবনে হিব্বান ‘কিতাবুছ ছিকাত’-এ তাঁর জীবনী আলোচনা করেছেন, অর্থাৎ তাঁকে নির্ভরযোগ্যদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। -তাহযীবুল কামাল, রাবি ৪০১৯

তিন. হাশিম ইবনে সাঈদ আবু ইসহাক আলকুফী, আলবাসরী। ইমাম ইবনে মাঈন বলেন, তার হাদীস গ্রহণযোগ্য নয়। ইমাম আহমাদ বলেন, আমি তাকে চিনি না। ইবনে আদী বলেন, তার হাদীসের মুতাবে’ (অর্থাৎ উক্ত অর্থের হাদীস অন্য নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের থেকে) পাওয়া যায় না। ইমাম আবু হাতেম বলেন, সে ‘যঈফুল হাদীস’ বা দুর্বল বর্ণনাকারী। ইমাম তিরমিযী তাঁর ‘সুনান’ গ্রন্থে তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইবনে হিব্বান ‘কিতাবুছ ছিকাত’-এ তাঁর জীবনী আলোচনা করেছেন, অর্থাৎ তাঁকে হাদীস বর্ণনায় নির্ভরযোগ্যদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করেছেন।-আলজারহু ওয়াত তা’দীল, ইবনে আবী হাতেম ৯/১০৫, রাবি ৪৪৩; আল কামেল, ইবনে আদী ৮/৪১৯, রাবি ২০৩২; তাহযীবুল কামাল ৭/৩৮৫, রাবি ৭১৩৩; তাহযীবুত তাহযীব ১১/১৭, রাবি ৩৭

চার. কিনানাহ ইবনে নুবাইহ। উম্মুল মু’মিনীন ছাফিয়্যা (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহা) এর আযাদকৃত গোলাম। তিনি ২১ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১২১-১৩০ হিজরীর মধ্যে ইন্তেকাল করেন। উসমান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) এর খেলাফতকাল পেয়েছেন এবং পরবর্তীতে দীর্ঘ জীবন লাভ করেন। তিনি ছাফিইয়া ও আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে হাদীস বর্ণনা করেন। ইমাম তিরমিযি তাঁর ‘সুনান’ গ্রন্থে তার থেকে হাশিম ইবনে সাঈদের সূত্রে একটি হাদীস বর্ণনা করে বলেন, এই সনদটি মারুফ বা পরিচিত নয়।

ইমাম হাকেম রহিমাহুল্লাহ ‘মুসতাদরাক’ গ্রন্থে তার (অর্থাৎ কিনানাহ ইবনে নুবাইহ) থেকে হাশিম ইবনে সাঈদের সূত্রে একটি হাদীস বর্ণনা করে বলেন, এই হাদীসের সনদটি ইমাম বুখারী ও মুসলিমের শর্ত অনুযায়ী সহীহ। ইমাম যাহাবী রহিমাহুল্লাহ কিনানাহ ইবনে নুবাইহের সূত্রে বর্ণিত হাদীসকে সহীহ বলার ক্ষেত্রে ইমাম হাকেমের সাথে ঐকমত্য পোষণ করেন।

ইবনে হিব্বান ‘কিতাবুছ ছিকাত’-এ তাঁর জীবনী আলোচনা করেছেন, অর্থাৎ তাঁকে হাদীস বর্ণনায় নির্ভরযোগ্যদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। ইমাম বুখারী রহিমাহুল্লাহ ‘আলআদাবুল মুফরাদ’ গ্রন্থে কিনানাহ ইবনে নুবাইহ থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন। ইমাম ইবনে আদী রচিত যঈফ বর্ণনাকারীদের জীবনীগ্রন্থ ‘আলকামেল’ ও ইমাম যাহাবী রচিত ‘মীযানুল ই’তিদাল’ গ্রন্থে তার জীবনী আসেনি। অতএব বুঝা গেলো, ইমাম ইবনে আদী ও ইমাম যাহাবীর নিকট কিনানাহ ইবনে নুবাইহ দুর্বল বর্ণনাকারী নন। যদি এমনটি না হত, তাহলে তারা নিজ নিজ গ্রন্থে কিনানাহ ইবনে নুবাইহ এর জীবনী নিয়ে আসতেন। হাফেয ইবনে হাজার রহিমাহুল্লাহ ‘তাকরীব’ গ্রন্থে বলেন,

مَقْبُوْلٌ، ضَعَّفَهُ الْأَزْدِيُّ بِلَا حُجَّةٍ.

অর্থ: “বর্ণনাকারী হিসেবে কিনানাহ গ্রহণযোগ্য। কোনো ধরনের দলিল-প্রমাণ ছাড়া আযদী তাকে যঈফ বলেছেন।” -আলমুসতাদরাক, ইমাম হাকেম ১/৭৩২, হাদীস ২০০৮; তা’রীখুল ইসলাম ৩/৪৮৫;  তাহযীবুল কামাল ৬/১৭৯, রাবি ৫৫৮৯; তাহযীবুত তাহযীব ৮/৩৯২, রাবি ৫৮৯৪; তাকরীবুত তাহযীব পৃ.৪৬৩, রাবি ৫৬৬৯

সারকথাঃ আবু হুরায়রাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে গাযওয়ায়ে হিন্দ বিষয়ক হাদীস মাত্র একটি। উক্ত হাদীসটি তাঁর থেকে পৃথক তিনটি সূত্রে বর্ণিত হয়েছে। এর মধ্যে প্রথমটির সনদ সহীহ, পরের দু’টির সনদ দুর্বল। তবে প্রথম হাদীসের কারণে অর্থগত দিক থেকে পরের দু‘টিও সহীহ।

 

চতুর্থ হাদীস

গাযওয়ায়ে হিন্দ সম্পর্কে আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে বর্ণিত উপরোক্ত তিনটি হাদীসের শব্দ প্রায় একই রকম। তবে আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে উক্ত বিষয়েই আরো একটি হাদীস রয়েছে, যাতে আগের হাদীসের পুরো বিষয়সহ অতিরিক্ত কিছু তথ্য রয়েছে, যা পূর্বের হাদীসগুলোতে নেই। সে বিষয়গুলো গাযওয়ায়ে হিন্দেরই একটি অংশ; তাতে যুদ্ধ-পরবর্তী অবস্থা এবং এ যুদ্ধে অংশ গ্রহণ করার ফযিলত বর্ণিত হয়েছে।

এ হাদীসটি হিজরী তৃতীয় শতকের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস নুআইম ইবনে হাম্মাদ রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ২২৮ হিজরী) [2] তাঁর ‘কিতাবুল ফিতান’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,

حَدَّثَنَا بَقِيَّةُ بْنُ الْوَلِيْدِ عَنْ صَفْوَانَ عَنْ بَعْضِ الْمَشِيْخَةِ عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ: قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَذَكَرَ الهِنْد، فَقَالَ: “لَيَغْزُوَنَّ الهِنْدَ لَكُمْ جَيْشٌ، يَفْتَحُ اللهُ عَلَيْهِمْ حَتَّى يَأْتُوا بِمُلُوْكِهِمْ مُغَلِّلِيْنَ بِالسَّلَاسِلِ، يَغْفِرُ اللهُ ذُنُوْبَهُمْ، فَيَنْصَرِفُوْنَ حِيْنَ يَنْصَرِفُوْنَ فَيَجِدُوْنَ ابْنَ مَرْيَمَ بِالشَّامِ. قَالَ أَبُوْهُرَيْرَةَ: إِنْ أَنَا أَدْرَكْتُ تِلْكَ الغَزْوَةَ بِعْتُ كُلَّ طَارِفٍ لِيْ وَتَالِدٍ وَغَزَوْتُهَا، فَإِذَا فَتَحَ اللهُ عَلَيْنَا وَانْصَرَفْنَا فَأَنَا أَبُوْهُرَيْرَةُ المُحَرَّرُ، يَقْدِمُ الشَّامَ فَيَجِدُ فِيْهَا عِيْسَى بْنَ مَرْيَمَ، فَلَأَحْرِصَنَّ أَنْ أَدْنُوَ مِنْهُ فَأُخْبِرُهُ أَنِّيْ قَدْ صَحبْتُكَ يَا رَسُوْلَ اللهِ، قَالَ: فَتَبَسَّمَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَضَحِكَ، ثُمَّ قَالَ: هَيْهَاتَ هَيْهَاتَ

অর্থ: “বাকিয়্যাহ ইবনে ওয়ালীদ থেকে, তিনি সফওয়ান থেকে, তিনি জনৈক শায়খ থেকে, তিনি আবু হুরায়রাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেন; আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হিন্দুস্তানের যুদ্ধের আলোচনা প্রসঙ্গে বলেছেন, ‘অবশ্যই তোমাদের একটি দল হিন্দুস্তানে যুদ্ধ করবে। আল্লাহ তাঁদের বিজয় দান করবেন। তাঁরা হিন্দুস্তানের রাজাদের শিকল দিয়ে বেঁধে টেনে আনবে। আল্লাহ তাআলা সেই মুজাহিদদের সকলকে ক্ষমা করে দেবেন। অতঃপর মুসলিমরা যুদ্ধ থেকে ফিরে এসে ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালামকে শামে পেয়ে যাবে।’ আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) বলেন, ‘আমি যদি গাজওয়াতুল হিন্দের সময় বেঁচে থাকি, তাহলে আমার সমস্ত সহায়-সম্পত্তি বিক্রি করে দেব এবং সেই যুদ্ধে শরীক হব। এরপর যখন আল্লাহ তা’আলা আমাদের বিজয় দান করবেন এবং আমরা যুদ্ধ থেকে ফিরে আসব, তখন আমি হব (জাহান্নামের আগুন হতে) মুক্তিপ্রাপ্ত আবু হুরাইরা, যে শামে গিয়ে ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গে মিলিত হবে।’ (আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) বলেন, আমি তখন নবীজীকে বলেছিলাম,) ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমার খুব আকাংখা যে, আমি ঈসা আলাইহিস সালাম-এর নিকটবর্তী হয়ে তাঁকে সংবাদ দেব যে, আমি আপনার সংশ্রবপ্রাপ্ত একজন সাহাবী।’ তিনি বলেন, এতে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মুচকি মুচকি হাসতে লাগলেন এবং বললেন, সে (যুদ্ধ) তো অনেক দেরি! অনেক দেরি!” -আলফিতান, নুআইম ইবনে হাম্মাদ ১/৪০৯, হাদীস ১২৩৬

নুআইম ইবনে হাম্মাদ রহিমাহুল্লাহ ‘কিতাবুল ফিতান’ গ্রন্থে উক্ত হাদীসটি পরের পৃষ্ঠায় কিছুটা ভিন্ন শব্দে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন,

حَدَّثَنَا الوَلِيْدُ ثَنَا صَفْوَانُ بْنُ عَمْرٍو عَمَّنْ حَدَّثَهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ:  يَغْزُوْ قَوْمٌ مِنْ أمَّتِيْ الهِنْدَ، يَفْتَحُ اللهُ عَلَيْهِمْ حَتَّى يَأْتُوا بِمُلُوْكِ الهِنْدِ مَغْلُوْلِيْنَ فِيْ السَّلَاسِلِ، فَيَغْفِرُ اللهُ لَهُمْ ذُنُوْبَهُمْ، فَيَنْصَرِفُوْنَ إِلَى الشَّامِ، فَيَجِدُوْنَ عِيْسَى ابْنَ مَرْيَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ بِالشَّامِ.

অর্থ: “ওয়ালীদ থেকে, তিনি বিশিষ্ট তাবেয়ী সফওয়ান ইবনে আমর রহিমাহুল্লাহ থেকে, সফওয়ান ইবনে আমর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে একজনের মারফতে বর্ণনা করে বলেন, নবীজী বলেছেন, আমার উম্মতের একটি দল হিন্দুস্তানে যুদ্ধ করবে। আল্লাহ তাআলা তাদের বিজয় দান করবেন। এমনকি তারা হিন্দুস্তানের রাজাদের শিকলে আবদ্ধ করে নিয়ে আসবে। আল্লাহ তাঁদের সকল পাপ ক্ষমা করে দেবেন। এরপর তারা শামে চলে আসবে। শামে তারা ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালামকে পেয়ে যাবে।” -আলফিতান, নুআইম ইবনে হাম্মাদ ১/৪১০, হাদীস ১২৩৯

হাদীসটির সনদ বিশ্লেষণ ও রাবি বা বর্ণনাকারীগণের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি

প্রারম্ভিক কথা: নুআইম ইবনে হাম্মাদ প্রথম হাদীসটি বাকিয়্যাহ ইবনে ওয়ালীদ থেকে বর্ণনা করেছেন আর দ্বিতীয় হাদীসটি ওয়ালীদ বিন মুসলিম থেকে বর্ণনা করেছেন। তারা উভয়ে তাবেয়ী সফওয়ান ইবনে আমর থেকে এ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। সুতরাং ওয়ালিদ ইবনে মুসলিমের হাদীসটি বাকিয়্যাহ ইবনে ওয়ালীদের ‘মুতাবি’ হিসেবে গণ্য হবে। অর্থাৎ একটি অপরটি দ্বারা শক্তিশালী হবে।

নিম্নে এ তিনজন রাবির (বাকিয়্যাহ ইবনে ওয়ালীদ, ওয়ালীদ ইবনে মুসলিম ও তাবেঈ সফওয়ান ইবনে আমর) সংক্ষিপ্ত পরিচিতি দেয়া হলো-

এক. বাকিয়্যাহ ইবনে ওয়ালীদ আবু মুহাম্মদ আলকিলাঈ আলহিমসী (জন্ম ১১০ হি., মৃত্যু ১৯৭ হি.)। তিনি তাবেয়ী সফওয়ান ইবনে আমর ও শাম দেশের হিমস এলাকার অধিবাসী আরতাত ইবনে মুনযির থেকে হাদীস শুনেছেন।

বাকিয়্যাহ ইবনে ওয়ালীদ সম্পর্কে কিছু কথা

জারহ তা’দীলের ইমামগণ তার থেকে হাদীস গ্রহণ করার বিষয়ে কয়েকটি শর্তারোপ করেছেন- ১. হাদীস বর্ণনা করার সময় এমন শব্দ চয়ন করতে হবে যাতে বোঝা যায় যে, যাদের থেকে হাদীস বর্ণনা করছেন তাদের থেকে শুনে হাদীস বলছেন। যেমন: ‘হাদ্দাছানা’, ‘আখবারানা’ ইত্যাদি শব্দ ব্যবহার করা। ২. যার থেকে রেওয়ায়াত করছেন তিনি যদি শামের অধিবাসী হন। ৩. মারুফ বা পরিচিত রাবি থেকে হাদীস বর্ণনা করলে। যেমন: সফওয়ান ও অন্যান্য পরিচিত রাবি।

উল্লিখিত কোনো একটা শর্ত পাওয়া গেলে বাকিয়্যাহ ইবনে ওয়ালীদের হাদীস গ্রহণযোগ্য হবে। প্রকাশ থাকে যে, বাকিয়্যাহ উক্ত হাদীসটি সফওয়ান থেকে বর্ণনা করেছেন, আর সফওয়ান হলেন শামের অধিবাসী এবং তিনি মারুফ বা পরিচিত রাবি। অতএব, বাকিয়্যাহ থেকে বর্ণিত হাদীসে অন্য কোনো সমস্যা না থাকলে ইমামগণের উক্ত বক্তব্যের আলোকে বাকিয়্যাহর হাদীস গ্রহণযোগ্য হবে।

নিম্নে বাকিয়্যাহ ইবনে ওয়ালীদ সম্পর্কে ইমামগণের মতামত মূল আরবিতে (অনুবাদসহ) পেশ করা হলো-

আলী ইবনুল মাদীনী রহিমাহুল্লাহ বলেন,

بَقِيَّةُ صَالِحٌ فِيْمَا رَوَى عَنْ أَهْلِ الشَّامِ

অর্থ: “বাকিয়্যাহ ইবনে ওয়ালীদ শামের অধিবাসী থেকে যে সকল রেওয়ায়াত করেন, সেগুলো বিশুদ্ধ।”

ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন রহিমাহুল্লাহ বাকিয়্যাহ সম্পর্কে বলেন,

ثِقَةٌ، وَقَالَ أَيْضًا: إِذَا حَدَّثَ عَنِ الثِّقَاتِ مِثْلَ صَفْوَانَ وَغَيْرِهِ، وَقَالَ مَرَّةً أُخْرٰى: إِذَا لَمْ يُسَمِّ بَقِيَّةُ الرَّجُلَ الَّذِيْ يَرْوِيْ عَنْهُ وَكَنَّاهُ فَاعْلَمْ أَنَّهُ لَا يُسَاوِيْ شَيْئًا.

অর্থ: “যখন সফওয়ান ও তাঁর মতো ছিকাহ ও নির্ভরযোগ্য রাবিদের থেকে হাদীস বর্ণনা করবেন, তখন তাঁর রেওয়ায়াতগুলো বিশুদ্ধ ও দলীলযোগ্য হবে। তিনি আরো বলেন, বাকিয়্যাহ যখন ‘মারবী আনহুর’ (যার থেকে বর্ণনা করেছেন) নাম উল্লেখ না করে উপনাম উল্লেখ করবেন (যে উপনামে মারবী আনহু পরিচিত নয়), তাহলে তার হাদীস গ্রহণযোগ্য হবে না।”

ইয়াকুব ইবনে শায়বাহ রহিমাহুল্লাহ বলেন,

بَقِيَّةُ بْنُ الوَلِيْدِ صَدُوْقٌ ثِقَةٌ وَيُتَّقَى حَدِيْثُهُ عَنْ مَشِيْخَتِهِ الَّذِيْنَ لَا يُعْرَفُوْنَ وَلَهُ أَحَادِيْثُ مَنَاكِيْرُ

অর্থ: “বাকিয়্যাহ ইবনে ওয়ালীদ হাদীস বর্ণনায় সত্যপরায়ণ ও নির্ভরযোগ্য। তবে যাদের থেকে তিনি হাদীস বর্ণনা করেন, তাদের মধ্যে যারা অপরিচিত, তাদের থেকে বাকিয়্যাহ ইবনে ওয়ালীদের হাদীস পরিহার করতে হবে। আর তার বেশ কিছু মুনকার হাদীস রয়েছে।”

ইজলী রহিমাহুল্লাহ বলেন,

بَقِيَّةُ بْنُ الوَلِيْدِ ثِقَةٌ مَا رَوَي عَنِ المَعْرُوْفِيْنَ، وَمَا رَوَي عَنِ المَجْهُوْلِيْنَ فَلَيْسَ بِشَيْءٍ.

অর্থ: “বাকিয়্যাহ ইবনে ওয়ালীদ যখন মারুফ বা পরিচিত রাবি থেকে হাদীস বর্ণনা করবেন, তখন সেটা সহীহ হিসেবে গণ্য হবে, আর যখন মাজহুল বা অপরিচিত কোনো রাবি থেকে হাদীস বর্ণনা করবেন, তখন সে বর্ণনা মূল্যহীন হবে।”

ইমাম নাসাঈ রহিমাহুল্লাহ বলেন,

إِذَا قَالَ حَدَّثَنِيْ وَحَدَّثَنَا فَلَا بَأْسَ، وَقَالَ أَيْضًا: إِنْ قَالَ أَخْبَرَنَا أَوْ حَدَّثَنَا فَهُوَ ثِقَةٌ، وَإِنْ قَالَ (عَنْ فُلَانٍ) فلَا يَأْخُذُ عَنْهُ، لِأَنَّهُ لَا يُدْرَى عَمَّنْ أَخَذَهُ.

“বাকিয়্যাহ ইবনে ওয়ালীদ যখন حَدَّثَنِيْ وَحَدَّثَنَا،أَخْبَرَنَا أَوْحَدَّثَنَا – শব্দগুলো দ্বারা হাদীস বর্ণনা করবেন, তখন তিনি নির্ভরযোগ্য রাবি হিসেবে গণ্য হবেন। আর যখন عَنْ – শব্দ দ্বারা বর্ণনা করবেন, তখন তার থেকে সে বর্ণনা গ্রহণ করা হবে না। জানা নেই, কার থেকে তিনি হাদীস নিয়েছেন।”

আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ বলেন,

كَانَ صَدُوْقًا وَلكِنَّهُ كَانَ يَكْتُبُ عَمَّنْ أَقْبَلَ وَأَدْبَرَ.

অর্থ: “তিনি হাদীস বর্ণনায় সত্যপরায়ণ, তবে তিনি ভালো-মন্দ সবার থেকেই হাদীস লিখতেন।”

ইয়াকুব ইবনে সুফিয়ান রহিমাহুল্লাহ বলেন,

بَقِيَّةُ إِذَا لَمْ يُسَمِّ الَّذِيْ يَرْوِىْ عَنْهُ وَكَنَّاهُ فَلَا يُسَاوِيْ حَدِيْثُهُ شَيْئًا.

অর্থ: “বাকিয়্যাহ যখন ‘মারবী আনহুর’ নাম উল্লেখ না করে উপনাম উল্লেখ করেন (যে উপনামে মারবী আনহু পরিচিত নয়), তাহলে বাকিয়্যাহর হাদীস সঠিক বলে বিবেচিত হবে না।”

এছাড়া ইমাম মুসলিমসহ[3] অন্যান্য ইমামগণ তাদের ‘সহীহ হাদীস-গ্রন্থে’ বাকিয়্যাহ ইবনে ওয়ালীদ থেকে হাদীস গ্রহণ করেছেন। -তারীখে বাগদাদ ৫/৩৯৩, রাবি ৩৫৬০; তাহযীবুল কামাল ১/৩৬৭, রাবি ৭২৬

দুই. ওয়ালীদ ইবনে মুসলিম আলকুরাশী আবুল আব্বাস আদদিমাশকী (জন্ম ১১৯ হি., মৃত্যু ১৯৫ হি.)। ইমাম আবু হাতেম, ইজলী, ইয়াকুব ইবনে শায়বা ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ তাঁকে ‘ছিকাহ’ বা নির্ভরযোগ্য বলেছেন। -তাহযীবুল কামাল, ৭/৪৮৭; সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, ৯/২১১; তাযকিরাতুল হুফফায ১/২২২

তিন. সফওয়ান ইবনে আমর (জন্ম ৭২ হি., মৃত্যু ১৫৫ হি.)। তিনি তাবিঈ ছিলেন। তিনি সাহাবী আব্দুল্লাহ ইবনে বুসর আল মাযিনী থেকে হাদীস বর্ণনা করেন। হাফেয যাহাবী রহিমাহুল্লাহ তার সম্পর্কে বলেন,

هُوَ الإِمَامُ المُحَدِّثُ الحَافِظُ، أَبُوْ عَمْرٍو السَّكْسَكِيْ، الحِمْصِيْ، مُحَدِّثُ حِمْص. ثِقَةٌ مِنْ صِغَارِ التَّابِعِيْنَ.

“তিনি হাদীসের ইমাম, মুহাদ্দিস ও হাফেযে হাদীস। হিমসের অধিবাসী এবং সেখানকার বিশিষ্ট মুহাদ্দিস। হাদীসের বর্ণনাকারী হিসেবে ছিকাহ বা নির্ভরযোগ্য। ছোট বয়সী তাবিঈদের অন্তর্ভুক্ত।” -তাহযীবুল কামাল ৩/৪৬১, রাবি ২৮৭৪; সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৬/৩৮০

একটি পর্যালোচনা

এ হাদীসের সনদদ্বয়ে সফওয়ান ইবনে আমর রহিমাহুল্লাহ এর উস্তাদের নাম স্পষ্ট করা হয়নি। প্রথম সনদে ‘জনৈক শায়খ থেকে’ (عَنْ بَعْضِ الْمَشِيْخَةِ) এবং দ্বিতীয় সনদে ‘নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে একজনের মারফতে’ (عَمَّنْ حَدَّثَهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ) শব্দ ব্যবহার করে উস্তাদের নাম অস্পষ্ট রাখা হয়েছে। এ কারণে কেউ কেউ এ হাদীসের ব্যাপারে কঠিন আপত্তি করেছেন!

উল্লেখ্য, রাবি ‘সফওয়ান ইবনে আমর’ নির্ভরযোগ্য তাবেঈ। এমন কোনো প্রমাণ নেই যে, তিনি কখনো মুনকার বা পরিত্যাজ্য হাদীস বর্ণনা করেছেন। আর যে সকল মাশায়েখ থেকে তিনি হাদীস বর্ণনা করেছেন, তারাও প্রসিদ্ধ তা’বেঈ ছিলেন। আর এটা খুবই সম্ভব যে, সফওয়ানের পরবর্তী রাবি (অর্থাৎ সফওয়ানের শাগরিদ বা তার নিচের স্তরের কোনো রাবি) এই হাদীসের সনদ সংক্ষেপে উল্লেখ করতে গিয়ে সফওয়ানের উস্তাদের নাম বাদ দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে শুধু বাহ্যিক ‘ইনকিতা’ ছাড়া প্রকৃতপক্ষে কোনো ‘ইনকিতা’ (রাবির বিচ্ছিন্নতা) থাকে না। আর এ কারণে কোনো হাদীস সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য হতে পারে না। তাছাড়া, ‘তাবে তাবিঈ’ থেকে তাবিঈ স্তরে কোনো তাবিঈ এর নাম উল্লেখ না থাকা অর্থাৎ উস্তাদের নাম অস্পষ্ট থাকার (যখন অন্য গ্রহণযোগ্য সূত্রে সে হাদীসের মুতাবি বা শাওয়াহিদ বিদ্যমান থাকবে) উদাহরণ ‘সহীহ বুখারী’ ও ‘সহীহ মুসলিমে’ও বিদ্যমান রয়েছে। যেমন: ‘সহীহ বুখারীর’ একটি বর্ণনায় রাবি শাবীব ইবনে গারকাদাহ[4]  তার উস্তাদের নাম উল্লেখ না করে বলেন,

(شَبِيْبُ بْنُ غَرْقَدَةَ قَالَ سَمِعْتُ الحَيَّ يُحَدِّثُوْنَ عَنْ عُرْوَةَ) “ শাবীব ইবনে গারকাদাহ বলেন, আমি এলাকাবাসী থেকে শুনেছি, যারা উরওয়া থেকে শুনেছে।” -সহীহ বুখারী, কিতাবুল মানাকিব ১/৫১৪, হাদীস ৩৫১৩।

সহীহ মুসলিমের একটি বর্ণনায় রাবি ইবনে শিহাব যুহরী[5] উস্তাদের নাম উল্লেখ না করে বলেন, (عَنِ ابْنِ شِهَابٍ، أَنَّهُ قَالَ: حَدَّثَنِيْ رِجَالٌ، عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ) “আমি এমন ব্যক্তিদের থেকে শুনেছি, যারা আবু হুরায়রা থেকে শুনেছেন।”

অবশ্য ইমাম মুসলিম প্রথমে ইবনে শিহাব ও আবু হুরায়রাহ রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু র মাঝে ওয়াসেতা বা মাধ্যম উল্লেখ করে হাদীসটা এনেছেন। পরে ওয়াসেতা ছাড়া উক্ত হাদীসটা আনেন, যাতে কিছু অতিরিক্ত শব্দ রয়েছে। -সহীহ মুসলিম, জানাযা অধ্যায়- ১/৩০৭, হাদীস ৯৪৫

 

দ্বিতীয় অংশ

পঞ্চম হাদীস

পঞ্চম হাদীসটি সাওবান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে বর্ণনা করেছেন। সাওবান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে চতুর্থ স্তর পর্যন্ত সনদের ধারা একটিই। এরপর চতুর্থ স্তর তথা মুহাম্মদ বিন ওয়ালিদ আয-যুবাইদী থেকে তাঁর তিনজন ছাত্র বর্ণনা করেছেন। এভাবে একটি সনদ চতুর্থ স্তরে গিয়ে দুইটি তরিক বা শাখায় রূপান্তরিত হয়েছে। নিম্নে সনদ বিশ্লেষণ ও পর্যালোচনার সুবিধার্থে সনদের দুইটি শাখা (طريق) পৃথকভাবে ‘ক’ ও ‘খ’ শিরোনামে আলোচনা করা হলো।

(ক)

হাদীসটি ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বাল রহিমাহুল্লাহ (১৬৪-২৪১ হি.) তাঁর ‘মুসনাদ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,

حَدَّثَنَا أَبُو النَّضْرِ، حَدَّثَنَا بَقِيَّةُ، حَدَّثَنَا عَبْدُ اللهِ بْنُ سَالِمٍ، وَأَبُو بَكْرٍ بْنُ الْوَلِيدِ الزُّبَيْدِيُّ، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْوَلِيدِ الزُّبَيْدِيِّ، عَنْ لُقْمَانَ بْنِ عَامِرٍ الْوُصَابِيِّ، عَنْ عَبْدِ الْأَعْلَى بْنِ عَدِيٍّ الْبَهْرَانِيِّ، عَنْ ثَوْبَانَ مَوْلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قال، قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: “عِصَابَتَانِ مِنْ أُمَّتِي أَحْرَزَهُمَا اللَّهُ مِنَ النَّارِ: عِصَابَةٌ تَغْزُو الْهِنْدَ، وَعِصَابَةٌ تَكُونُ مَعَ عِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ.”

قُلْتُ: إِسْنَادُهُ حَسَنٌ، وَالْحَدِيْثُ صَحِيْحٌ لِغَيْرِهِ وَخُلَاصَتُهُ: رِجَالُ هَذَا الْإِسْنَادِ كُلُّهُمْ ثِقَاتٌ غَيْرُ أَبِي بَكْرٍ الزُّبَيْدِيِّ فَهُوَ مَجْهُوْلُ الْحَالِ لَكِنَّهُ مَقْرُوْنٌ هُنَا مَعَ عَبْدِ اللهِ بْنِ سَالِمٍ وَ هُوَ ثِقَةٌ مِنْ رِجَالِ الْبُخَارِيِّ، وَ بَقِيَّةُ بْنُ الْوَلِيْدِ مُدَلِّسٌ وِلَكِنَّهُ قَدْ صَرَّحَ بِالتَّحْدِيْثِ، عَلَى أَنَّهُ قَدْ تَابَعَهُ هِشَامُ بْنُ عَمَّارٍ[6]  وَهُوَ مِنْ شُيُوْخِ الْبُخَارِيِّ، وَثَّقُوْهُ وَ كَانَ يَتَلَقَّنُ، لَكِنْ تَابَعَهُ سُلَيْمَانُ وَ هُوَ ثِقَةٌ.

قَالَ الشَّيْخُ  الأَلْبَانِيُّ فِي “سِلْسِلَةُ الْأَحَادِيْثِ الصَّحِيْحَةِ ” 4 / 570- 571 (1934) بَعْدَ ذِكْرِ إِسْنَادِ الْإِمَامِ أَحْمَدَ وَ النَّسَائِيِّ (الآتِي ذِكْرُهُ): وَ هَذَا إِسْنَادٌ جَيِّدٌ، ثُمَّ ذَكَرَ إِسْنَادَ الْبُخَارِيِّ فِي ” التَّارِيْخُ الْكَبِيْرُ [7]  وَقَالَ: وَ هَذَا إِسْنَادٌ قَوِيُّ ، فَصَحَّ الحْدِيْثُ وَ الْحَمْدُ لِلَّه .اهـ 

অর্থ: “আবুন নযর রহিমাহুল্লাহ বাকিয়্যা বিন ওয়ালিদ থেকে, তিনি আব্দুল্লাহ বিন সালিম ও আবু বকর বিন ওয়ালিদ থেকে, তাঁরা উভয়ে মুহাম্মদ বিন ওয়ালিদ আয-যুবাইদী থেকে, তিনি লুকমান বিন আমের থেকে, তিনি আব্দুল আ’লা বিন আদি থেকে, তিনি সাওবান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেন; সাওবান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে দুটি দলকে আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। একটি দল, যারা হিন্দুস্তানের যুদ্ধে শরিক হবে। আর দ্বিতীয় দল, যারা ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গী হয়ে যুদ্ধ করবে।”

-মুসনাদে আহমাদ ৩৭/৮১, হাদীস ২২৩৯৬, তাহকীক-শায়খ শুআইব আরনাঊত; হাদীসটির বর্ণনা আরো যে সকল কিতাবে রয়েছে- সুনানে নাসাঈ ২/৫২, হাদীস ৩১৭৫; মুসনাদে শামিয়্যিন, তবারনী ৩/৮৯, হাদীস ১৮৫১; আলফিরদাউস, দায়লামী ৩/৩৮, হাদীস ৪১২৪

ইমাম নাসাঈ রহিমাহুল্লাহ ও ইমাম তবারানী রহিমাহুল্লাহ সনদের কিছুটা ভিন্নতাসহ এই হাদীসটি বর্ণনা করেছেন। নিম্নে সে বিষয়টি তুলে ধরা হলো-

এই হাদীসটি ইমাম নাসাঈ বর্ণনা করেছেন আসাদ বিন মুসা থেকে, তিনি বাকিয়্যা বিন ওয়ালিদ থেকে, আর বাকিয়্যা বর্ণনা করেছেন আবু বকর বিন ওয়ালিদ থেকে; অন্যদিকে ইমাম তবারানী হাদীসটি বর্ণনা করেছেন হাইওয়াহ বিন শুরাইহ থেকে, তিনি বাকিয়্যা বিন ওয়ালিদ থেকে, আর বাকিয়্যা বর্ণনা করেছেন আব্দুল্লাহ বিন সালেম থেকে; আবু বকর বিন ওয়ালিদ এবং আব্দুল্লাহ বিন সালেম উভয়ে বর্ণনা করেছেন মুহাম্মদ বিন ওয়ালিদ আয-যুবাইদী থেকে, তিনি লুকমান বিন আমের থেকে, তিনি আব্দুল আ’লা বিন আদি থেকে, তিনি সাওবান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন।

হাদীসটির মান: সনদটি হাসান পর্যায়ের। তবে ‘মুতাবাআত’ বা সমর্থক বর্ণনাকারীর ভিত্তিতে হাদীসটি সহীহ লি-গাইরিহী।

সংক্ষিপ্ত বিবরণ: সনদের রাবিগণ নির্ভরযোগ্য। তবে আবু বকর বিন ওয়ালিদ; যার থেকে ইমাম নাসাঈ ‘সুনানে নাসাঈ’ গ্রন্থে হাদীস বর্ণনা করেন, তিনি ‘মাজহুল’ পর্যায়ের। অর্থাৎ তাঁর সম্পর্কে কোনো ‘তাওছীক্ব’ পাওয়া যায় না। কিন্ত আবু বকর বিন ওয়ালিদের মুতাবি’ তথা সমর্থক বর্ণনাকারী রয়েছেন আব্দুল্লাহ বিন সালেম, যিনি রাবি হিসেবে নির্ভরযোগ্য, সহীহ বুখারীতে তাঁর রেওয়ায়াত আছে। আবু বকর বিন ওয়ালিদের আরো একজন মুতাবি’ আছেন “জাররাহ বিন মালিহ”। তাঁর আলোচনা এই হাদীসের ‘খ’ অংশে আসছে।

অন্যদিকে, রাবি বাকিয়্যা বিন ওয়ালিদের ব্যাপারে তাদলীসের অভিযোগ রয়েছে, তবে এই হাদীসটি তিনি ‘হাদ্দাছানা’ শব্দে বর্ণনা করেছেন। [8] উপরন্তু তাঁর মুতাবি’ তথা সমর্থক বর্ণনাকারী রয়েছেন হিশাম বিন আম্মার। হিশামের বার্ধক্য বয়সে হিফয ও স্মৃতিশক্তির ব্যাপারে অভিযোগ থাকলেও তাঁর মুতাবি’ তথা সমর্থক বর্ণনাকারী রয়েছেন সুলাইমান বিন আব্দুর রহমান।

শায়খ আলবানী হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। সিলসিলা সহীহাহ, হাদীস ১৯৩৪; সহীহু ওয়া যঈফু সুনানিন নাসাঈ, হাদীস ৩১৭৫।[9]

নিম্নে বর্ণনাকারীগণের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি পেশ করা হল

১. আবুন নযর, (জন্ম  ১৩৪ হি., মৃত্যু ২০৭ হি.)। ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন, আলী ইবনুল মাদিনী, মুহাম্মাদ ইবনে সা’দ, আবু হাতেম, ইজলী প্রমুখ ইমামগণ তাঁকে ‘ছিক্বাহ’ বা নির্ভরযোগ্য বলেছেন। -তাহযীবুল কামাল, ৭/৩৮৫, রাবি ৭১৩৫

২. বাকিয়্যাহ বিন ওয়ালিদ, (জন্ম  ১১০ হি., মৃত্যু ১৯৭ হি.)। ইমাম নাসাঈ রহিমাহুল্লাহ বলেন, إِنْ قَالَ أَخْبَرَنَا أَوْ حَدَّثَنَا فَهُوَ ثِقَةٌ অর্থ্যাৎ “যখন তিনি ‘হাদ্দাছানা বা আখবারানা’ শব্দে হাদীস বর্ণনা করেন তখন ‘ছিক্বাহ’ (নির্ভরযোগ্য)।”  ইজলী বলেন, “যখন তিনি পরিচিত (মারুফ) রাবি থেকে বর্ণনা করবেন তখন তা সহীহ। আর অপরিচিত (মাজহুল) রাবি থেকে বর্ণনা করলে তা সহীহ হবে না।” পরবর্তীদের মধ্যে হাফেয ইবনে হাজার রহিমাহুল্লাহ বলেন, “তিনি ‘সাদুক’ (সত্যপরায়ণ), তবে তিনি ‘যঈফ’ রাবিদের থেকে ব্যাপক তাদলীস করতেন।”-তাহযীবুল কামাল ১/৩৬৭, রাবি ৭২৬; মীযানুল ই’তিদাল ১/৩৩১, রাবি ১২৫০; তাক্বরীব, রাবি ৭৩৪, পৃ. ১২৬

উল্লেখ্য, বাকিয়্যাহ বিন ওয়ালিদের ব্যাপারে তাদলীসের অভিযোগ রয়েছে, তবে এই হাদীসটি তিনি ‘হাদ্দাছানা’ শব্দে বর্ণনা করেছেন, সেক্ষেত্রে সনদে আর কোনো সমস্যা থাকে না।

৩. সনদের এ স্তরে দুইজন বর্ণনাকারী রয়েছেন-

(ক) আব্দুল্লাহ বিন সালেম আলআশআরী, (মৃত্যু ১৭৯ হি.)। ইমাম নাসাঈ বলেন, لَيْسَ بِهِ بَأسٌ (রাবি হিসেবে তাঁর মধ্যে কোনো সমস্যা নেই)। ইবনে হিব্বান ‘কিতাবুছ ছিকাত’-এ তাঁর জীবনী আলোচনা করেছেন। অর্থাৎ তাঁকে হাদীস বর্ণনায় নির্ভরযোগ্যদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। -তাহযীবুল কামাল ৪/১৪১, রাবি ৩২৭৩

(খ) আবু বকর বিন ওয়ালিদ আয-যুবাইদী। তিনি মুহাম্মদ বিন ওয়ালিদের ভাই। ইমাম নাসাঈ তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। -তাহযীবুল কামাল ৮/২৬৩ রাবি ৭৮৫৬

৪. মুহাম্মদ বিন ওয়ালিদ আবুল হুযাইল আলহিমসী। জন্ম ৭২ হি., মৃত্যু ১৪৬/১৪৭ হি.। ইমাম ইজলী, আলী ইবনুল মাদিনী, আবু যুরআ ও নাসাঈ তাঁকে ছিক্বাহ বা নির্ভরযোগ্য বলেছেন। ইবনে হিব্বান ‘কিতাবুছ ছিকাত’-এ তাঁর জীবনী আলোচনা করেছেন, অর্থাৎ তাঁকে হাদীস বর্ণনায় নির্ভরযোগ্যদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। -তাহযীবুল কামাল ৬/৫৪৬, রাবি ৬২৬৫

৫. লুকমান বিন আমের আলউসাবী। ১১১ থেকে ১২০ হিজরির মধ্যে মৃত্যুবরণ করেন। ইমাম ইজলী বলেন, شَامِيٌّ تَابِعِيٌّ، ثِقَةٌ (তিনি শামের অধিবাসী, তাবিঈ, ‘ছিক্বাহ’ বা নির্ভরযোগ্য)। ইমাম আবু হাতিম বলেন, يُكْتَبُ حَدِيْثُهُ. (তার হাদীস লেখা যায়)। ইবনে হিব্বান ‘কিতাবুছ ছিকাত’-এ তাঁর জীবনী আলোচনা করেছেন, অর্থাৎ তাঁকে হাদীস বর্ণনায় নির্ভরযোগ্যদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। -আছ-ছিক্বাত, ইবনে হিব্বান ৫/৩৪৫, রাবি ৫১৫০; তাহযীবুল কামাল ৬/১৮২, রাবি ৫৬০০; তাহযীবুত তাহযীব ৮/৩৯৮, রাবি ৫৯০৫

৬. আব্দুল আলা বিন আদি আলবাহরানী (মৃত্যু ১০৪ হি.)। আবু দাউদ তাঁকে ‘ছিক্বাহ’ (নির্ভরযোগ্য) বলেছেন। ইবনে হিব্বান ‘কিতাবুছ ছিকাত’-এ তাঁর জীবনী আলোচনা করেছেন, অর্থাৎ তাঁকে হাদীস বর্ণনায় নির্ভরযোগ্যদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। -তাহযীবুল কামাল ৪/৩৩৭ রাবি ৩৬৭৬; তাহযীবুত তাহযীব ৬/৮৮, রাবি ৩৮৬৬

৭. সাওবান (রাযি)। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের সাহাবী। তিনি ৫৪ হিজরিতে ইনতেকাল করেন। শামের হিমস এলাকার অধিবাসী। -তাহযীবুল কামাল ১/৪১৮, রাবি ৮৪৪; সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ৩/১৫, রাবি ৫

উল্লেখ্য: এই হাদীসটি বাকিয়্যা থেকে তিনজন রাবি বর্ণনা করেছেন। মুসনাদে আহমাদের রেওয়ায়াতে ‘আবুন নযর’, সুনানে নাসাঈর রেওয়ায়াতে ‘আসাদ বিন মুসা’ এবং তবারানীর রেওয়ায়াতে ‘হাইওয়াহ বিন শুরাইহ’। আর বাকিয়্যা হাদীসটি বর্ণনা করেছেন দুইজন থেকে; আব্দুল্লাহ বিন সালেম এবং আবু বকর বিন ওয়ালিদ থেকে। তাঁরা উভয়ে বর্ণনা করেছেন মুহাম্মদ বিন ওয়ালিদ আয-যুবাইদী থেকে। অর্থাৎ এই হাদীসটিতে সাওবান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে রাবিদের চতুর্থ স্তর পর্যন্ত সনদের ধারা একটিই। এরপর চতুর্থ স্তর তথা রাবি মুহাম্মদ বিন ওয়ালিদ আয-যুবাইদী থেকে তাঁর তিনজন ছাত্র বর্ণনা করেছেন। যথাক্রমে- ১. আব্দুল্লাহ বিন সালেম, ২. আবু বকর বিন ওয়ালিদ, ৩. জাররাহ বিন মালিহ। রাবি আব্দুল্লাহ বিন সালেম ও আবু বকর বিন ওয়ালিদ থেকে বর্ণনা করেছেন বাকিয়্যা বিন ওয়ালিদ। এবং জাররাহ বিন মালিহ থেকে বর্ণনা করেছেন, হিশাম বিন আম্মার ও সুলাইমান বিন আব্দুর রহমান। এভাবে একটি সনদ উপর থেকে চতুর্থ স্তরে এসে দুইটি শাখায় রূপান্তরিত হয়েছে।

(খ)

আব্দুল্লাহ বিন সালেম ও আবু বকর বিন ওয়ালিদের বর্ণনাকৃত সনদ সম্পর্কে উপরে আলোচনা করা হয়েছে।  নিম্নে জাররাহ বিন মালিহের বর্ণনাকৃত সনদ সম্পর্কে আলোচনা করা হলো-

ইমাম ইবনে আবি আসিম রহিমাহুল্লাহ (২০৬-২৮১/২৯০ হি.) হাদিসটি তাঁর ‘কিতাবুল জিহাদ’ গ্রন্থে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন,

حَدَّثَنَا هِشَامُ بن عمَّار قال حَدَّثَنَا الجرَّاحُ بن مليحٍ الْبَهْرَانِيُّ،  قال حدثنا مُحَمَّدُ بْنُ الْوَلِيدِ الزُّبَيْدِيُّ، عَنْ لُقْمَانَ بْنِ عَامِرٍ الْوُصَابِيِّ، عَنْ عَبْدِ الْأَعْلَى بْنِ عَدِيٍّ الْبَهْرَانِيِّ، عَنْ ثَوْبَانَ مَوْلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قال، قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: عِصَابَتَانِ مِنْ أُمَّتِي أَحْرَزَهُمَا اللَّهُ مِنَ النَّارِ: عِصَابَةٌ تَغْزُو الْهِنْدَ، وَعِصَابَةٌ تَكُونُ مَعَ عِيسَى ابْنِ مَرْيَمَ عَلَيْهِ السَّلامُ.

قُلْتُ: إِسْنَادُهُ حَسَنٌ كَمَا مَرَّ فِي الطَّرِيْقِ الْأَوَّلِ لِهَذَا الْحَدِيْثِ.

অর্থ: “হিশাম বিন আম্মার রহিমাহুল্লাহ জাররাহ বিন মালিহ থেকে, তিনি মুহাম্মাদ বিন ওয়ালিদ আয-যুবাইদী থেকে, তিনি লুকমান বিন আমের থেকে, তিনি আব্দুল আ’লা বিন আদি থেকে, তিনি সাওবান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণনা করেন; সাওবান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে দুটি দলকে আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। একটি দল, যারা হিন্দুস্তানের যুদ্ধে শরিক হবে। আর দ্বিতীয় দল, যারা ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গী হয়ে যুদ্ধ করবে।” -কিতাবুল জিহাদ, ইবনে আবি আসিম ২/৬৬৫, হাদীস ২৮৮

হাদীসটির বর্ণনা আরো যে সকল কিতাবে রয়েছে- আলমু’জামুল আওসাত, তবারানী ৭/৫৫, হাদীস ৬৭৪১; [10] আলকামিল, ইবনে আদি ২/৪০৮, রাবি ৩৫১; আসসুনানুল কুবরা, বাইহাকী ৯/২৯৭-২৯৮, হাদীস ১৮৬০০ (বাবু মা জাআ ফি কিতালিল হিন্দ); তা’রীখে দিমাশ্ক, ইবনে আসাকির (মৃত্যু. ৫৭১ হি.)  ৫২/২৪৮

উল্লিখিত ইমামগণ এ হাদীসটি নিজ নিজ সূত্রে হিশাম বিন আম্মার রহিমাহুল্লাহ থেকে, তিনি জাররাহ বিন মালিহ থেকে, তিনি মুহাম্মাদ বিন ওয়ালিদ আয-যুবাইদী থেকে, তিনি লুকমান বিন আমের থেকে, তিনি আব্দুল আ’লা বিন আদি থেকে, তিনি সাওবান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে বর্ণনা করেছেন।

হাদীসটির দ্বিতীয় সনদের মান: সনদটি হাসান পর্যায়ের। এই হাদীসের উভয় সনদ মিলে হাদীসটি সহীহ লি-গাইরিহী।

নিম্নে রাবি বা বর্ণনাকারীগণের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি পেশ করা হলো

১. হিশাম বিন আম্মার (জন্ম ১৫৩ হি., মৃত্যু ২৪৫ হি.)।  ইয়াহইয়া বিন মাঈন ও ইজলী তাঁকে ‘ছিক্বাহ’ (নির্ভরযোগ্য) বলেছেন। নাসাঈ বলেন,  لا بأس به (তার মধ্যে কোনো সমস্যা নেই)। আবু হাতিম বলেন,

هِشَامُ ابْنُ عَمَّارٍ لَمَّا كَبُرَ تَغَيَّرَ فَكُلُّ مَا دُفِعَ إِلَيْهِ قَرَأَهُ وَ كُلَّمَا لُقِّنَ تَلَقَّنَ وَ كَانَ قَدِيْمًا أَصُحُّ وَ كَانَ يَقْرَأُ مِنْ كِتَابِهِ

“হিশাম বিন আম্মার যখন বাধর্ক্যে উপনীত হন, তখন তাঁর হিফয ও স্মৃতিশক্তিতে পরিবর্তন দেখা দেয়; যে কোনো জিনিস তাঁর কাছে পেশ করা হলে তিনি তা পড়ে দিতেন, কোনো কিছু তাঁকে শিখিয়ে দেয়া হলে গ্রহণ করতেন। বার্ধক্যের পূর্বে তিনি অধিকতর বিশুদ্ধ হাদীস বর্ণনাকারী ছিলেন। তখন সর্বদা তার কিতাব থেকে পড়তেন।”-তাহযীবুল কামাল ৭/৪১১, রাবি ৭১৮১; সিয়ারু আলামিন নুবালা ১১/৪২০, রাবি ৯৮

২. জাররাহ বিন মালিহ আশশামী। আবু হাতিম বলেন, صَالِحُ الحَدِيْثِ. (তার হাদীস গ্রহণযোগ্য)। নাসাঈ বলেন, لَيْسَ بِهِ بَأْسٌ (তার মধ্যে কোনো সমস্যা নেই)। ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন বলেন,

مَشْهُوْرٌ فِي أَهْلِ الشَّامِ وَ هُوَ لَا بَأْسَ بِهِ، وَ بِرِوَايَاتِهِ، وَ لَهُ أَحَادِيْثُ صَالِحَةٌ جِيَادٌ

“শামের অধিবাসীদের মধ্যে তিনি প্রসিদ্ধ। তার এবং তার বর্ণনায় কোনো ধরণের সমস্যা নেই। বিশুদ্ধতার দিক থেকে বেশ কিছু গ্রহণযোগ্য হাদীস তার রয়েছে।”

ইবনে আদি বলেন, لَهُ أَحَادِيْثُ سِوَى مَا ذَكَرْتُ عَنِ الزُّبَيْدِيِّ (আমি যা উল্লেখ করলাম, এর বাইরেও যুবাইদী থেকে তার আরো হাদীস রয়েছে)। ইবনে হিব্বান ‘কিতাবুছ ছিকাত’-এ তাঁর জীবনী আলোচনা করেছেন, অর্থাৎ তাঁকে হাদীস বর্ণনায় নির্ভরযোগ্যদের অন্তর্ভুক্ত করেছেন। -তাহযীবুল কামাল ১/৪৪২, রাবি ৮৯৪

উক্ত হাদীসের প্রথম সনদের পর্যালোচনায় মুহাম্মাদ বিন ওয়ালিদ আয-যুবাইদী, লুকমান বিন আমের এবং আব্দুল আ’লা বিন আদি সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে।

ইমাম বুখারী এই হাদীসটি সুলাইমান বিন আব্দুর রহমান থেকে, তিনি জাররাহ বিন মালিহ থেকে উপরিউক্ত সনদে বর্ণনা করেছেন। -আত তারীখুল কাবীর, বুখারী ৬/৭২, রাবি ১৭৪৭

নিম্নে ইমাম বুখারীর রাবি বা বর্ণনাকারী সুলাইমান বিন আব্দুর রহমানের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি পেশ করা হলো,

সুলাইমান বিন আব্দুর রহমান। (জন্ম  ১৫৩ হি., মৃত্যু ২৩৩ হি.)। ইয়াহইয়া বিন মাঈন বলেন,  لَيْسَ بِهِ بَأْسٌ  (তার মধ্যে কোনো সমস্যা নেই)।  তিনি আরো বলেন, ثِقَةٌ إِذَا رَوَى عَنِ الْمَعْرُوْفِيْنَ. “যখন তিনি মারুফ বা পরিচিত রাবি থেকে বর্ণনা করবেন, সে ক্ষেত্রে তিনি ‘ছিক্বাহ’ বা নির্ভরযোগ্য।” আবু দাউদ বলেন, ‘ছিক্বাহ’ (নির্ভরযোগ্য)।  নাসাঈ বলেন, তিনি সাদুক (সত্যপরায়ণ)।

আবু হাতিম বলেন, صَدُوْقٌ، مُسْتَقِيْمُ الْحَدِيْثِ وَ لكِنَّهُ رَوَى النَّاسَ عَنِ الضُّعَفَاءِ وَ الْمَجْهُوْلِيْنَ.  (তিনি সাদুক বা সত্যপরায়ণ, সঠিক হাদীস বর্ণনাকারী, কিন্তু তিনি লোকজনকে দুর্বল ও অপরিচিত ব্যক্তি থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন)।

ইবনে হিব্বান বলেন,

يُعْتَبَرُ حُدِيْثُهُ إِذَا رَوَىَ عَنِ الثِّقَاتِ الْمَشَاهِيْرِ، فَأَمَّا إِذَا رَوَى عَنِ الْمَجَاهِيْلِ فَفِيْهَا مَنَاكِيْرُ

অর্থ: “যখন তিনি মশহুর ছিক্বাহ রাবি থেকে বর্ণনা করেন তখন তার হাদীস গ্রহণযোগ্য। আর যখন তিনি মাজহুল রাবি থেকে বর্ণনা করেন তখন তাতে মুনকার বর্ণনা থাকে।” -তাহযীবুল কামাল ৩/২৮৯, রাবি ২৫২৭

হাদীসটির সনদ বিশ্লেষণের সার সংক্ষেপ

এই হাদীসটি জাররাহ বিন মালিহ থেকে দুইজন রাবি বর্ণনা করেছেন। ইবনে আবি আসিম, তবারানী, ইবনে আদি, বাইহাকী ও ইবনে আসাকিরের রেওয়ায়াতে ‘হিশাম বিন আম্মার’ রয়েছেন। এবং ইমাম বুখারীর ‘আত তারীখুল কাবীরে’র রেওয়ায়াতে ‘সুলাইমান বিন আব্দুর রহমান’ রয়েছেন।

রাবি হিশাম বিন আম্মারের ব্যাপারে ইয়াহইয়া বিন মাঈন, ইজলী ও নাসাঈ বলেছেন: তিনি ‘ছিক্বাহ’ (নির্ভরযোগ্য)। তবে আবু হাতিম বলেন, ‘যখন তিনি বাধর্ক্যে উপনীত হন, তখন তাঁর হিফয ও স্মৃতিশক্তিতে পরিবর্তন দেখা দেয়।’ কিন্তু তাঁর মুতাবি’ তথা সমর্থক বর্ণনাকারী রয়েছেন সুলাইমান বিন আব্দুর রহমান। সুলাইমান বিন আব্দুর রহমানের বিষয়ে ইয়াহইয়া বিন মাঈন বলেন, যখন তিনি মারুফ বা পরিচিত রাবি থেকে বর্ণনা করবেন, সে ক্ষেত্রে তিনি ছিক্বাহ বা নির্ভরযোগ্য। আর তাঁদের উভয় থেকে বর্ণনা করেছেন জাররাহ বিন মালিহ, যিনি মুহাদ্দিসদের নিকট প্রসিদ্ধ ও ‘ছিক্বাহ’ (নির্ভরযোগ্য)। এছাড়া তাঁর মুতাবাআত করেছেন আব্দুল্লাহ বিন সালেম এবং আবু বকর বিন ওয়ালিদ[11]। সুতরাং রাবিদের পরস্পরের ‘মুতাবাআত’ এর ভিত্তিতে এই সনদে আর সমস্যা রইল না। তাই সনদটি কমপক্ষে হাসান পর্যায়ের।

এই হাদীসের সবগুলো সনদের ‘মাদার’ বা কেন্দ্রীয় ব্যক্তি হলেন ‘মুহাম্মাদ বিন ওয়ালিদ আয-যুবাইদী’। ইমাম তবারানী রহিমাহুল্লাহ (২৬০-৩৬০ হিজরি) ‘আলমুজামুল আওসাত’ গ্রন্থে উক্ত হাদীস বর্ণনা করে বলেন,

لَا يُرَوَى هَذَا الْحَدِيْثُ عَنْ ثَوْبَانَ إِلَّا بِهَذَا الْإِسْنَادِ، تَفَرَّدَ الزُّبَيْدِيِّ.

অর্থ: “এই হাদীস সাওবান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে এই সূত্রেই বর্ণিত, (মুহাম্মাদ বিন ওয়ালিদ) আয-যুবাইদী একাই তা বর্ণনা করেন।” -আলমু’জামুল আওসাত, ত্বাবরানী ৭/৫৫, হাদীস ৬৭৪১

মুহাম্মাদ বিন ওয়ালিদ আয-যুবাইদী থেকে হাদীসটি বর্ণনা করেছেন তিনজন। যথাক্রমে- ১. আব্দুল্লাহ বিন সালেম, ২. আবু বকর বিন ওয়ালিদ, ৩. জাররাহ বিন মালিহ। অতঃপর আব্দুল্লাহ বিন সালেম ও আবু বকর বিন ওয়ালিদ থেকে বর্ণনা করেছেন বাকিয়্যাহ বিন ওয়ালিদ। আর জাররাহ বিন মালিহ থেকে বর্ণনা করেছেন, হিশাম বিন আম্মার ও সুলাইমান বিন আব্দুর রহমান। তাঁদের অবস্থা পূর্বে আলোচনা করা হয়েছে। এভাবে সনদটি উপর থেকে চতুর্থ স্তরে এসে দুইটি শাখায় রূপান্তরিত হয়েছে। সর্বোপরি, উভয় সনদ মিলে হাদীসটি সহীহ লি-গাইরিহী।

তৃতীয় অংশ

গাযওয়ায়ে হিন্দ কি সংঘটিত হয়ে গেছে, না, শেষ জামানায় হবে?

উপরে উল্লিখিত সাওবান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) এর হাদীস, যেখানে বলা হয়েছে, ‘দুটি দলকে আল্লাহ তাআলা জাহান্নাম থেকে নিরাপত্তা দিয়েছেন। একটি দল, যারা হিন্দুস্তানের যুদ্ধে শরিক হবে। আর দ্বিতীয় দল, যারা ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালাম-এর সঙ্গী হয়ে যুদ্ধ করবে।’ কোনো কোনো গবেষকের ধারণা, ‘এই হাদীসে আলোচিত দুটি দলের মাঝে পারস্পারিক কোনো সম্পর্ক নেই। এবং উভয় দলের যুদ্ধ একই জামানায় হওয়াও জরুরি নয়।’ তাদের দৃষ্টিতে ‘গাযওয়ায়ে হিন্দ’ উমাইয়া যুগে সংঘটিত হয়ে গেছে। আর ‘দাজ্জালের সাথে ঈসা (আলাইহিস সালাম) এর বাহিনীর যুদ্ধ শেষ জামানায় ঘটবে।’ এভাবে তারা একই হাদীসে উল্লিখিত দুটি যুদ্ধের সময়কালের মাঝে ব্যাপক পার্থক্য আছে বলে মনে করেন। উক্ত বিষয় সম্পর্কে সামনে পৃথক আলোচনা আসছে।

তবে বিশিষ্ট তাবিঈ আরতাত রহিমাহুল্লাহ এর বর্ণনা থেকে সুস্পষ্ট বোঝা যায়, সাওবান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) এর বর্ণিত হাদীসে আলোচিত দুটি যুদ্ধের ঘটনা একই যুগে সংঘটিত হবে।

উল্লেখ্য, আরতাত রহিমাহুল্লাহ শামের হিমস এলাকার অধিবাসী। আর সাওবান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) শেষ বয়সে শামের হিমস এলাকায় বসবাস করেন এবং সেখানেই ইন্তেকাল করেন[12]। আর এ কারণে তাবিঈ আরতাত রহিমাহুল্লাহ সাওবান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) এর সাক্ষাত পেয়েছিলেন। তাই এটা খুবই সম্ভব যে, তিনি সাওবান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকেই এ হাদীসটি জানতে পেরেছেন এবং সে অনুযায়ী তা বর্ণনা করেছেন।

বিশিষ্ট তাবিঈ আরতাত রহিমাহুল্লাহ এর বর্ণনা

আরতাত রহিমাহুল্লাহ এর বর্ণনাটি নুআইম বিন হাম্মাদ (মৃত্যু ২২৮ হি.) তাঁর ‘আলফিতান’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন,

حَدَّثَنَا الْوَلِيْدُ بْنُ مُسْلِمٍ عَنْ جَرَّاْحٍ عَنْ أَرْطَاْةَ قَالَ: عَلَى يَدَيْ ذَلِكَ الْخَلِيْفَةِ الْيَمَانِيِّ الَّذِيْ تُفْتَحُ الْقُسْطَنْطِيْنِيَّةُ وَرُوْمِيَّةُ عَلَى يَدَيْهِ، يَخْرُجُ الدَّجَّالُ وَ فِيْ زَمَانِهِ يَنْزِلُ عِيْسَى ابْنُ مَرْيَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ، عَلَى يَدَيْهِ تَكُوْنُ غَزْوَةُ الْهِنْدِ، وَهُوَ مِنْ بَنِيْ هَاْشِمٍ، غَزْوَةُ الْهِنْدِ الَّتِي قَالَ فِيْهَا أَبُوْ هُرَيْرَةَ.

قَالَ الْوَلِيدُ: قَالَ جَرَّاحٌ، عَنْ أَرْطَاةَ، عَلَى يَدَيْ ذَلِكَ الْخَلِيفَةِ، وَهُوَ يَمَانٌ، تَكُونُ غَزْوَةُ الْهِنْدِ الَّتِي قَالَ فِيهَا أَبُو هُرَيْرَةَ

قُلْتُ: إِسْنَاْدُهُ إلى أَرْطَاْةَ صَحِيْحٌ.

অর্থ:“ওয়ালিদ বিন মুসলিম রহিমাহুল্লাহ জাররাহ বিন মালীহ থেকে, তিনি বিশিষ্ট তাবেয়ী আরতাত রহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণনা করেছেন; আরতাত রহিমাহুল্লাহ বলেন, ইয়ামানী খলিফার নেতৃত্বে কনস্টান্টিনোপল (ইস্তাম্বুল) ও রোম বিজয় হবে। তাঁর সময়েই দাজ্জাল আত্মপ্রকাশ করবে। তাঁর যুগেই ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালাম অবতরণ করবেন এবং তাঁর নেতৃত্বেই হিন্দুস্তানের যুদ্ধ সংঘটিত হবে। তিনি হবেন হাশেমী বংশের লোক। আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) হিন্দের এই যুদ্ধ সম্পর্কেই (হাদীস) বর্ণনা করেছেন।” [13] -আলফিতান, নুআইম বিন হাম্মাদ ১/৪১০, হাদীস ১২৩৮, ১২০১

বর্ণনাটির মান: বর্ণনাটির সনদ সহীহ।

নিম্নে রাবি বা বর্ণনাকারীগণের সংক্ষিপ্ত পরিচিত পেশ করা হলো-

১. ওয়ালিদ বিন মুসলিম আলকুরাশী আবুল আব্বাস আদদিমাশকী। জন্ম ১১৯ হি., মৃত্যু ১৯৫ হি.। ইমাম আবু হাতিম, ইজলী, ইয়াকুব বিন শায়বাহ ও অন্যান্য মুহাদ্দিসগণ তাঁকে ‘ছিক্বাহ’ (নির্ভরযোগ্য) বলেছেন। -তাহযীবুল কামাল ৭/৪৮৭, রাবি ৭৩৩২; সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৯/২১১; তাযকিরাতুল হুফফায ১/২২২

২. জাররাহ বিন মালীহ, আলবাহরানী। মৃত্যু ১৭১-১৮০ হি.। আবু হাতিম বলেন, صَالِحُ الْحَدِيْثِ  (তিনি হাদীস বর্ণনায় যোগ্য), নাসাঈ বলেন, صَدُوْقٌ، لَيْسَ بِهِ بَأسٌ  (তিনি রাবি হিসেবে সত্যপরায়ণ, কোনো সমস্যা নেই)। -তাহযীবুল কামাল ১/৪৪২, রাবি ৮৯৪; তা’রীখুল ইসলাম ৪/৫৯২

৩. আরতাত বিন মুনযির। জন্ম ৭৩ হি., মৃত্যু ১৬৩ হি.। তাঁর পুরো নাম হল, আরতাত বিন মুনযির বিন আসওয়াদ বিন সাবিত আসসুকুনী আবু আদি। তিনি শামের হিমস এলাকার অধিবাসী। তিনি সাওবান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) ও আবু উমামাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) প্রমুখ সাহাবীদের সাক্ষাত পেয়েছিলেন। আরতাত রহিমাহুল্লাহ আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু)কে পাননি। কারণ তাঁর জন্মের পূর্বে আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) এর ইন্তেকাল হয়ে যায়। তবে তার বেশ কয়েকজন ছাত্র বা তার থেকে বর্ণনাকারীগণকে পেয়েছেন এবং তাঁদের থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন। যেমন, সাঈদ ইবনুল মুসাইয়াব, আব্দুর রহমান ইবনে গনম আলআশআরি, আতা ইবনে আবি রবাহ, উমায়ের ইবনুল আসওয়াদ, কাছির বিন মুররাহ ও মুজাহিদ বিন জাবর প্রমুখ। ইমাম আহমাদ বলেন,  ثقة ثقة (তিনি হাদীস বর্ণনায় অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য)। ইয়াহইয়া বিন মাঈন বলেন, তিনি ছিক্বাহ বা নির্ভরযোগ্য। ইবনু হিব্বান বলেন, ثقة حافظ فقيه  (তিনি ছিক্বাহ বা নির্ভরযোগ্য, হাফেযে হাদীস ও ফকীহ।) -তাহযীবুল কামাল ১/১৬১, রাবি ২৯২; তা’রীখুল ইসলাম ৪/৩০৪ (আবু হুরায়রাহ রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু  এর ছাত্রদের তালিকা-তাহযীবুল কামাল ৮/৪৪৮-৪৪৯, রাবি ৮২৭৬

সম্ভবত আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) এর উক্ত ছাত্রদের থেকে শুনে আরতাত রহিমাহুল্লাহ বলেছেন, “আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) হিন্দের এই যুদ্ধ সম্পর্কেই (হাদীসটি) বর্ণনা করেছেন।”

প্রকাশ থাকে যে, উক্ত হাদীসে ‘ইয়ামানী খলিফা’ দ্বারা উদ্দেশ্য হলো হাশেমী বংশের একজন খলীফা, যিনি (কিয়ামাতের পূর্বে এসে প্রথমে) ইয়েমেনে বসবাস করে বাইতুল মুক্বাদ্দাসে আগমন করবেন। তাঁর শাসনামলে পৃথিবী ন্যায়-ইনসাফে ভরে যাবে। তিনিই হবেন হাদীসে প্রতিশ্রুত ইমাম মাহদী।[14]

বিশিষ্ট তাবিঈ কাআব আহবার রহিমাহুল্লাহ এর বর্ণনা

আরতাত রহিমাহুল্লাহ এর বক্তব্যকে অধিকতর স্পষ্ট করে দেয় বিশিষ্ট তাবিঈ কা’আব আহবার রহিমাহুল্লাহ এর এ-সংক্রান্ত একটি বর্ণনা। বর্ণনাটি নুআইম বিন হাম্মাদ ‘আলফিতান’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন। তিনি বলেন,

حَدَّثَنَا الْحَكَمُ بْنُ نَافِعٍ عَمَّنْ حَدَّثَهُ عَنْ كَعْبٍ قَالَ:”يَبْعَثُ مَلِكٌ فِيْ بَيْتِ الْمَقْدِسِ جَيْشًا إِلَى الْهِنْدِ فَيَفْتَحُهَا، فَيَطَئُوْا أَرْضَ الْهِنْدِ، وَيَأْخُذُوْا كُنُوْزَهَا، فَيُصَيِّرُهُ ذَلِكَ الْمَلِكُ حِلْيَةً لِبَيْتِ الْمَقْدِسِ، وَيُقَدِّمُ عَلَيْهِ ذَلِكَ الْجَيْشُ بِمُلُوْكِ الْهِنْدِ مُغَلَّلِيْنَ، وَيُفْتَحُ لَهُ مَابَيْنَ الْمَشْرِقِ وِالْمَغْرِبِ، وَيَكُوْنُ مَقَامُهُمْ فِيْ الْهِنْدِ إِلَى خُرُوْجِ الدَّجَّالِ”.

قُلْتُ: رِجَالُ هَذَا الْإِسْنَادِ ثِقَاتٌ إِلَّا أَنَّ فِيْهِ اِنْقِطَاعٌ ظَاهِرًا، وَلَعَلَّ الْمَحْذُوفَ فِيْهِ “صَفْوَانَ بْنِ عَمْرٍو عَنْ شُرَيْحِ بْنِ عُبَيْدٍ”، وَالدَّلِيْلُ عَلَيْهِ أَنَّ نُعَيْمَ  بْنَ حَمَّادٍ رَوَىَ فِي كِتَابِهِ “الْفِتَن” غَيْرَ وَاحِدٍ مِنَ الْأَحَادِيْثِ مِنْ طَرِيْقِ “الْحَكَمِ بْنِ نَافِعٍ عَنْ صَفْوَانَ بْنِ عَمْرٍو عَنْ شُرَيْحِ بْنِ عُبَيْدٍ عَنْ كَعْبٍ  الْأَحْبَارِ”، (و أَرْقَامُهُ 238،241،294،609،667)

অর্থ:“নুআইম বিন হাম্মাদ রহিমাহুল্লাহ হাকাম বিন নাফি’ থেকে, তিনি জনৈক শায়খ থেকে, তিনি কা’ব আহবার থেকে বর্ণনা করেছেন; কা’ব রহিমাহুল্লাহ বলেন, বাইতুল মাকদিসের (জেরুসালেমের) একজন বাদশাহ হিন্দুস্তানের দিকে একটি সৈন্যদল পাঠাবেন। সৈন্যদল হিন্দুস্তানের ভূমি জয় করে তা পদানত করবে। তারা সেখানকার গুপ্ত ধন-ভাণ্ডার করায়ত্ব করবেন। তারপর বাদশাহ এসব ধনদৌলত বাইতুল মাকদিসের সৌন্দর্য বর্ধনে ব্যবহার করবেন। সৈন্যদলটি হিন্দুস্তানের রাজাদের শিকল দিয়ে বেঁধে বন্দী করে তাঁর নিকট উপস্থিত করবে। প্রাচ্য-পাশ্চাত্যের সকল এলাকায় তিনি জয়লাভ করবেন। দাজ্জালের আবির্ভাব পর্যন্ত তাঁরা হিন্দুস্তানেই অবস্থান করবেন।” -নুআইম বিন হাম্মাদ, আলফিতান ১/৪০৯, হাদীস ১২৩৫, ১২১৫

হাদীসটির মান: সনদটির বর্ণনাকারীগণ ছিকাহ বা নির্ভরযোগ্য। তবে সনদে বাহ্যত ইনকিতা বা রাবির বিচ্ছিন্নতা রয়েছে। সম্ভবত হাকাম বিন নাফি’ বর্ণনাটি বলার সময় সংক্ষিপ্ত করার জন্য মাঝের দুজন বর্ণনাকারীর নাম (সফওয়ান বিন আমর ও শুরাইহ বিন উবায়দ) বাদ দিয়েছেন। আর বিষয়টি এভাবে বুঝে আসে যে, নুআইম বিন হাম্মাদ ‘আলফিতান’ গ্রন্থে হাকাম বিন নাফি’ থেকে, তিনি সফওয়ান বিন আমর থেকে, তিনি শুরাইহ বিন উবায়দ থেকে, তিনি কা’ব আহবার থেকে

(الحَكَمِ بْنِ نَافِعٍ عَنْ صَفْوَانَ بْنَ عَمْرٍو عَنْ شُرَيْحِ بْنِ عُبَيْدٍ عَنْ كَعْبٍ  الْأَحْبَارِ) একাধিক হাদীস বর্ণনা করেছেন। (হাদীস ২৩৮, ২৪১, ২৯৪, ৬০৯, ৬৬৭)

 নিম্নে রাবি বা বর্ণনাকারীগণের সংক্ষিপ্ত পরিচিত পেশ করা হলো-

১. হাকাম বিন নাফিআবুল ইয়ামান আলবাহরানী। তিনি হিমসের অধিবাসী ছিলেন। জন্ম. ১৩৮ হিজরি এবং মৃত্যু ২২২ হিজরি। তিনি হাফিযে হাদীস ছিলেন, হাদীসের ক্ষেত্রে তাকে ইমাম হিসেবে গণ্য করা হত। তিনি উচ্চপর্যায়ের ছিকাহ রাবি ছিলেন। সফওয়ান বিন আমর ও আরতাত বিন মুনযির থেকে তিনি হাদীস শুনেছেন। -তাযকিরাতুল হুফফায ১/৩০১, রাবি ৪১৮

২. সফওয়ান ইবনে আমর (জন্ম ৭২ হি., মৃত্যু ১৫৫ হি.) তিনি তাবিঈ ছিলেন। তিনি শুরাইহ বিন উবায়দ ও অন্যান্যদের থেকে হাদীস বর্ণনা করেন। হাফেয যাহাবি রহিমাহুল্লাহ তার সম্পর্কে বলেন,

هُوَ الإِمَامُ المُحَدِّثُ الحَافِظُ، أَبُوْ عَمْرٍو السَّكْسَكِيْ، الحِمْصِيْ، مُحَدِّثُ حِمْص. ثِقَةٌ مِنْ صِغَارِ التَّابِعِيْنَ.

“তিনি হাদীসের ইমাম, মুহাদ্দিস ও হাফেযে হাদীস। হিমসের অধিবাসী এবং সেখানকার বিশিষ্ট মুহাদ্দিস। হাদীসের বর্ণনাকারী হিসেবে ছিকাহ বা নির্ভরযোগ্য, তাবিঈদের অন্তর্ভুক্ত।” -তাহযীবুল কামাল ৩/৪৬১, রাবি ২৮৭৪; সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৬/৩৮০

৩. শুরাইহ বিন উবায়দ। তিনি তাবিঈ ছিলেন। তিনি শামের হিমস এলাকার অধিবাসী। মৃত্যু ১০০ হিজরির পরে। ইমাম নাসাঈ, ইজলী ও দুহাইম বলেন, তিনি ছিক্বাহ বা নির্ভরযোগ্য। -তাহযীবুল কামাল ৩/৩৮০, রাবি ২৭১১; তাকরীবুত তাহযীব, রাবি ২৭৭৫, পৃ. ২৬৫

৪. কাব আলআহবার। তিনি ইয়ামানের অধিবাসী ছিলেন। অতঃপর শামে বসবাস করেন। কা’ব আহবার রহিমাহুল্লাহ রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের জামানা পেয়েছেন, তবে ইসলাম গ্রহণ করেছেন আবু বকর (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) এর খেলাফতকালে। তিনি উসমান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) এর খেলাফতকালে ইন্তেকাল করেন। হাফেয যাহাবি রহিমাহুল্লাহ বলেন, “ কা’ব আহবার রহিমাহুল্লাহ সোহাইব রুমি, ওমর ইবনুল খাত্তাব ও আয়শা (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে হাদীস বর্ণনা করেন। …তিনি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম থেকে মুরসাল (সাহাবির নাম বাদ দিয়ে) হাদীসও বর্ণনা করেন।” -তাহযীবুল কামাল ৬/১৬৯, রাবি ৫৫৬৯, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা ৩/৪৮৯

একটি পর্যালোচনা

ইসলামের প্রাচীন কোনো কোনো ইতিহাসগ্রন্থে হিন্দুস্তানের যে সকল অভিযানকে ‘গাযওয়ায়ে হিন্দ’ নামে অভিহিত করা হয়েছে, তার আলোকে কিছু কথা

উপরোক্ত সহীহ হাদীসসমূহ ও আছারের মাধ্যমে এটা স্পষ্ট যে, গাযওয়ায়ে হিন্দ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী শেষ জামানায় ঈসা আলাইহিস সালামের আগমনের পূর্ব সময়ে প্রকাশ পাবে। সাওবান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে বর্ণিত সহীহ হাদীসে দু’টি ঘটনা (গাযওয়ায়ে হিন্দ ও দাজ্জালের বিরুদ্ধে ঈসা আলাইহিস সালামের যুদ্ধ) একই সাথে উল্লেখ করা হয়েছে। আর এ দু’টি ঘটনা যে একই সময়ে ঘটবে, তা তাবেঈ আরতাত রহিমাহুল্লাহ  (যিনি সাওবান রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু  এর যুগের একজন তাবেঈ) এর আছার থেকে খুবই স্পষ্ট।

তথাপি কারো কারো ধারণা, উক্ত হাদীসগুলোতে আলোচিত ‘গাযওয়ায়ে হিন্দ’ অতীতে সংঘটিত হয়ে গেছে। তারা দাবি করেন যে, শেষ জামানায় দাজ্জাল বের হওয়ার পূর্বে পুনরায় ‘গাযওয়ায়ে হিন্দ’ সংঘটিত হওয়ার বিষয়ে উক্ত হাদীসগুলোতে কোনো ইঙ্গিত বা নির্দেশনা নেই। তারা নিজেদের মতের পক্ষে ইবনে কাসীর রহিমাহুল্লাহ ও আল্লামা সিদ্দীক হাসান খান রহিমাহুল্লাহ এর বক্তব্যকে প্রমাণ হিসেবে পেশ করেন।

ইবনে কাসীর রহিমাহুল্লাহ স্বীয় ‘আন-নিহায়াহ ফিল ফিতান’ গ্রন্থে ‘অচিরেই মুসলিম সৈন্যবাহিনী হিন্দ ও সিন্ধে পৌঁছবে মর্মে নববী ইঙ্গিত’ অধ্যায়ের অধীনে বলেন, ‘মুসলিমগণ মুআবিয়া (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) এর যুগে ৪৪ হিজরীতে হিন্দে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করেছেন।’  ইবনে কাসীরের এই বক্তব্য থেকে তারা ধরে নিয়েছেন যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের গাযওয়ায়ে হিন্দের ভবিষ্যদ্বাণী মুআবিয়া (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) এর যুগে ৪৪ হিজরীর হিন্দ-অভিযানের মাধ্যমেই পূর্ণ হয়ে গেছে।

কিন্তু ইবনে কাসীর ও সিদ্দীক হাসান খান রহিমাহুল্লাহ এর পুরো বক্তব্যকে সামনে রাখলে বিষয়টি সেরকম বুঝে আসে না।

ইবনে কাসীর রহিমাহুল্লাহ শুধু মুআবিয়া (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) এর যুগের অভিযানই নয় বরং এর পরবর্তী মুহাম্মাদ বিন ক্বাসিম রহিমাহুল্লাহ এর হিন্দ অভিযান[15] ও সুলতান মাহমুদ গজনবীর হিন্দ-অভিযানগুলোকেও ‘গাযওয়ায়ে হিন্দ’ নামে আখ্যায়িত করেছেন। ইবনে কাসীর রহিমাহুল্লাহ স্বীয় ইতিহাস-গ্রন্থসমূহে তাঁর যুগ পর্যন্ত সংঘটিত এসবগুলো ঘটনাকে গাযওয়ায়ে হিন্দের অন্তর্ভুক্ত করেছেন এবং সিদ্দীক হাসান খান রহিমাহুল্লাহও ইবনে কাসীর রহিমাহুল্লাহ এর মতো ‘গাযওয়ায়ে হিন্দ’কে অতীতের কোনো ঘটনার মাঝে সীমাবদ্ধ করেননি। নিম্নে ইবনে কাসীর ও সিদ্দীক হাসান খান রহিমাহুল্লাহ এর মূল বক্তব্য তুলে ধরা হল-

ইবনে কাসীর রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ৭৭৪ হি.) ‘আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ’ গ্রন্থে  الاخْبَارُ عَنْ غَزْوَةِ الْهِنْدِ  (গাযওয়াতুল হিন্দ সংক্রান্ত হাদীসসমূহ) শিরোনামের অধীনে অত্র প্রবন্ধে প্রথম ও দ্বিতীয় হাদীস উল্লেখ করে বলেন,

وَقَدْ غَزَا الْمُسْلِمُوْنَ الْهِنْدَ فِي أَيَّامِ مُعَاوِيَةَ سَنَةَ أَرْبَعِ وَّأَرْبَعِيْنَ، وَكَانَتْ هُنَالِكَ أُمُوْرٌ سَيَأْتِيْ بَسْطُهَا فِي مَوْضِعِهَا، وَقَدْ غَزَا الْمَلِكُ الْكَبِيْرُ الْجَلِيْلُ مَحْمُوْدُ بْنُ سُبُكْتُكِينْ، صَاحِبُ غَزْنَةَ، فِي حُدُوْدِ أَرْبَعِمِائَةٍ، بِلَادَ الْهِنْدِ فَدَخَلَ فِيْهَا وَقَتَلَ وَأَسَرَ وَسَبَى وَغَنِمَ وَدَخَلَ السُّومْنَاتْ وَكَسَرَ النّدَّ الْاَعْظَمَ الَّذِيْ يَعْبُدُوْنَهُ . . . . ثُمَّ رَجَعَ سَالِمًا مُؤَيَّدًا مَنْصُوْرًا.

“৪৪ হিজরিতে মুআবিয়া (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) এর শাসনামলে মুসলমানরা সর্বপ্রথম হিন্দুস্তানে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করেন। সেসময়ের ঘটনাপ্রবাহের বিস্তারিত বিবরণ সামনে আলোচনা করা হবে।[16]  হিজরি চার শত (৪০০) সনের দিকে গযনীর সুলতান মাহমুদ সবুক্তগীনও হিন্দুস্তানে যুদ্ধাভিযান পরিচালনা করেন।[17] সেসকল যুদ্ধে তিনি অনেক মুশরিককে হত্যা ও বন্দি করেন এবং গনিমত হিসেবে প্রচুর ধন-সম্পদ লাভ করেন। তিনি সোমনাথ মন্দিরে প্রবেশ করে মূর্তিপূজকদের সবচেয়ে বড় মূর্তিটি ভেঙ্গে ফেলেন। …. এরপর তিনি বিজয়বেশে নিরাপদে হিন্দুস্তান থেকে গজনিতে ফিরে আসেন।” -ইবনে কাসীর, আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ : ৪/৬৩১

ইবনে কাসীর রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ৭৭৪ হি.) তাঁর ‘আননিহায়াহ ফিল ফিতান’ গ্রন্থে প্রায় কাছাকাছি আলোচনা করেছেন। সেখানে তিনি

إِشَارَةٌ نَبَوِيَّةٌ إِلَى أَنَّ الْجَيْشَ الْمُسْلِمَ سَيَصِلُ إِلَى الْهِنْدِ وَالسِّنْدِ

(অচিরেই হিন্দ এবং সিন্ধুতে মুসলিমবাহিনীর প্রবেশের ব্যাপারে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী) শিরোনামের অধীনে অত্র পুস্তিকার প্রথম ও দ্বিতীয় হাদীস উল্লেখ করার পরে বলেন,

وَقَدْ غَزَا الْمُسْلِمُوْنَ الْهِنْدَ فِي سَنَةِ أَرْبَعِ وَأَرْبَعِيْنَ فِي إِمَارَةِ مُعَاوِيَةَ بْنِ أَبِيْ سُفْيَانَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ فَجَرَتْ هُنَاكَ أُمُوْرٌ فَذَكَرْنَاهَا مَبْسُوطَةً، وَقَدْ غَزَاهَا الْمَلِكُ الْكَبِيْرُ السَّعِيْدُ مَحْمُودُ بْنُ سُبُكْتُكِينْ صَاحِبُ بِلَادِ غَزْنَةَ وَمَا وَالَاهَا فِي حُدُوْدِ أَرْبَعِ مِائَةٍ فَفَعَلَ هُنَالِكَ أَفْعَالًا مَشْهُورَةً وَأُمُوْراً مَشْكُورَةً وَكَسَرَ الصَّنَمَ الْأَعْظَمَ الْمُسَمَّى بِسُومْنَاتْ . . . وَرَجَعَ إِلَى بِلَادِهِ سَالِماً غَانِماً.

“৪৪ হিজরীতে মুআবিয়া (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) এর শাসনামলে মুসলমানরা সর্বপ্রথম হিন্দুস্তান আক্রমণ করে। সেসময়ের ঘটনাপ্রবাহের বিবরণ বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। হিজরী চার শত (৪০০) সনের দিকে গযনী ও তার আশপাশের অঞ্চলের মহান অধিপতি সুলতান মাহমুদ সবুক্তগীনের হিন্দুস্তান-অভিযান ও তাঁর বীরত্বের কাহিনী সর্বজনবিদিত এবং প্রশংসিত। তিনি সেখানের সোমনাথ মন্দিরের সর্ববৃহৎ মূর্তিটি ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেন। …. এরপর তিনি গনিমত হিসেবে প্রচুর যুদ্ধলব্ধ সম্পদ নিয়ে নিরাপদে স্বদেশে ফিরে যান।” -আননিহায়াহ ফিল ফিতান ওয়াল মালাহিম, ইবনে কাসীর পৃ.১২

আল্লামা ছিদ্দিক হাসান খান কিন্নৌজী রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ১৩০৭হি.) বলেন,

وَأَمَّا الْهِنْدُ : فَقَدْ فُتِحَ فِي عَهْدِ الْوَلِيْدِ بْنِ عَبْدِ الْمَلِكِ عَلى يَدِ مُحَمَّدِ بْنِ قَاسِمٍ الثَّقَفِيِّ سَنَةَ اثْنَتَيْنِ وَتِسْعِيْنَ الْهِجْرِيَّةَ وَبَلَغَتْ رَايَاتُهُ الْمِظَلَّةُ عَلَى الْفَوْجِ مِنْ حُدُوْدِ السِّنْدِ إِلَى أَقْصَى قَنُوْجَ سَنَةَ خَمْسِ وَتِسْعِيْنَ وَبَعْدَ مَا عَادَ وُلَاةُ الْهِنْدِ إِلَى أَمْكِنَتِهِمْ وَبَقِيَ الْحُكَّامُ مِنَ الْخُلَفَاءِ الْمَرْوَانِيَّةِ وَالْعَبَّاسِيَّةِ بِبِلَادِ السِّنْدِ وَقَصَدَ السُّلْطَانُ مَحْمُوْدُ الغَزْنَوِيُّ – أَوَاخِرَ الْمِائَةِ الرَّابِعَةِ – غَزْوَ الْهِنْدِ وَأَتَى مِرَارًا وَغَلَبَ وَأَخَذَ الْغَنَائِمَ …….. وَمِنْ هَذَا التَّارِيْخِ إِلَى آخِرِ الْمِائَةِ الثَّانِيَةَ عَشَرَ كَانَتْ مَمَالِكُ الْهِنْدِ فِي يَدِ السَّلَاطِيْنِ الْإِسْلَامِيَّةِ. 

“আর হিন্দুস্তানের বিষয় হলো, হিজরী ৯২ সালে উমাইয়া খলীফা ওয়ালিদ বিন আব্দুল মালিকের [18] শাসনামলে মুহাম্মাদ বিন ক্বাসিমের নেতৃত্বে হিন্দুস্তান বিজয়ের সূচনা হয়। ৯৫ হিজরীতে সিন্ধু থেকে কনৌজের শেষসীমানা পর্যন্ত মুসলমানদের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। এরপর হিন্দুস্তানের ক্ষমতায় রদবদল হলেও সিন্ধুতে ধারাবাহিকভাবে উমাইয়া এবং আব্বাসি খলীফাদের প্রতিনিধিগণ দাপটের সাথে রাজত্ব করেছেন। ৪র্থ হিজরীর শেষ দিকে সুলতান মাহমুদ গযনবী হিন্দুস্তানে আক্রমণ করেন। দফায় দফায় হামলা চালিয়ে তিনি বিজয় ছিনিয়ে আনেন এবং প্রচুর গনীমত লাভ করেন।……….

(অতঃপর সুলতান মাহমুদ গযনবীর ক্ষমতা গ্রহণ, তাঁর শাসনাধীন বিস্তীর্ণ এলাকার বিবরণ, সুলতান মুঈযুদ্দীন ঘুরীর আগমন এবং ৫৮৯ হিজরিতে হিন্দুস্তানের বিস্তীর্ণ অঞ্চল দখল করে দিল্লীতে রাজধানী স্থানান্তরের বর্ণনা করে) সিদ্দীক হাসান খান রহিমাহুল্লাহ বলেন, তখন থেকে হিজরি ১২শত শতক পর্যন্ত হিন্দুস্তানের ক্ষমতা ইসলামী সালতানাতের অধীনেই ছিল।” – আবজাদুল উলূম ৩/২১৪

ইবনে কাসীর রহিমাহুল্লাহ তাঁর কিতাবে আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) বর্ণিত বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধের প্রথম দুটি হাদীস এনেছেন। যেখানে শুধু হিন্দুস্তানে যুদ্ধের কথা বলা হয়েছে। সেটা কবে হবে বা শেষ জামানায় হবে কিনা (যা অন্যান্য হাদীসে এসেছে) সে হাদীসদ্বয়ে এমন কিছু বলা হয়নি। তাই ইবনে কাসীর রহিমাহুল্লাহ তাঁর জামানা পর্যন্ত হিন্দের সকল যুদ্ধকে এই হাদীসদ্বয়ের অধীনে আলোচনায় এনেছেন। অনুরূপভাবে সিদ্দীক হাসান খান রহিমাহুল্লাহও গাযওয়ায়ে হিন্দকে বিশেষ কোনো জামানার সাথে নির্দিষ্ট করেননি। তিনিও মুআবিয়া (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) এর যুগের অভিযান, মুহাম্মাদ বিন ক্বাসিমের হিন্দ অভিযান বা এর পরের সুলতান মাহমুদ গযনবী ও সুলতান মুঈযুদ্দীন ঘুরীসহ সকলের অভিযানকে ‘গাযওয়ায়ে হিন্দে’র মাঝে শামিল করেছেন। অর্থাৎ তাঁরা নিজেদের সময় পর্যন্ত অতীতে হিন্দের ভূমিতে মুসলিম ও মুশরিকদের মাঝে সংঘটিত হওয়া সকল যুদ্ধকে হিন্দের যুদ্ধ হিসেবে গণ্য করেছেন। নির্দিষ্ট কোনোটাকেই ‘গাযওয়ায়ে হিন্দে’র চূড়ান্ত বা সর্বশেষ যুদ্ধ হিসেবে সাব্যস্ত করেননি। তাদের কথার পূর্বাপর থেকে সুস্পষ্ট বুঝা যায় যে, ভবিষ্যতের সকল যুদ্ধও হিন্দের যুদ্ধের মাঝে শামিল হবে। তাছাড়া ভবিষ্যতে হিন্দের কোনো অভিযান গাযওয়ায়ে হিন্দের মাঝে শামিল হবে না, এমন দাবিও তাঁরা করেননি।  কাজেই এটা স্পষ্ট যে,  ইবনে কাসীর বা সিদ্দীক হাসান খান রহিমাহুল্লাহ এর কথার উদ্ধৃতি দিয়ে এমনটি দাবি করা মোটেও যৌক্তিক হবে না যে, তাঁদের মতে হাদীসে প্রতিশ্রুত গাযওয়ায়ে হিন্দ অতীতেই সম্পন্ন হয়ে গেছে!

তবে বাস্তবতা এটাই যে, ইসলামের ইতিহাসে বিভিন্ন সময়ে হিন্দের জমিনে মুসলিম ও মুশরিকদের মাঝে অনেক যুদ্ধ সংঘটিত হলেও অত্র প্রবন্ধে উল্লিখিত সহীহ হাদীসসমূহ ও আছারের মাধ্যমে এটা স্পষ্ট যে, গাযওয়ায়ে হিন্দ সম্পর্কে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের ভবিষ্যদ্বাণী এখনো ঘটেনি, বরং শেষ জামানায় ঈসা আলাইহিস সালামের আগমনের পূর্ব-সময়ে প্রকাশ পাবে। এবং এ যুদ্ধের অবশিষ্ট মুজাহিদরা ঈসা আলাইহিস সালামের সাথে শামে সাক্ষাৎ করবে। এতদসংক্রান্ত হাদীস আমরা পূর্বেই আলোচনা করেছি।

সুতরাং অতীতে ঘটে যাওয়া মুআবিয়া (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) এর জামানায় হিন্দ অভিযান, মুহাম্মাদ বিন ক্বাসিম বা সুলতান মাহমুদ গজনবীর হিন্দ অভিযানের মাধ্যমে হাদীসে আলোচিত ‘গাযওয়ায়ে হিন্দ’ এর সমাপ্তি ঘটার দাবি গ্রহণযোগ্য নয় ।

প্রসঙ্গত, হাদীসে প্রতিশ্রুত ‘গাযওয়ায়ে হিন্দ’ শেষ জামানায় ঘটার ব্যাপারে সহীহ রেওয়ায়েতের পাশাপাশি সমকালীন কতিপয় মুহাক্কিকও মত ব্যক্ত করেছেন। যেমন-

শাইখ হামূদ তুওয়াইজিরী রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ১৪১৩ হি.) বলেন,

وَمَا ذُكِرَ فِيْ حَدِيْثِ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ الَّذِيْ رَوَاهُ نُعَيْمُ بْنُ حَمَّادٍ مِنْ غَزْوِ الْهِنْدِ؛ فَهُوَ لَمْ يَقَعْ إِلَى الْآنَ، وَسَيَقَعُ عَنْدَ نُزُوْلِ عِيْسَى ابْنِ مَرْيَمَ عَلَيْهِمَا الصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ إِنْ صَحَّ الْحَدِيْثُ بِذَلِكَ. وَاللهُ أَعْلَمُ.

“নুআইম বিন হাম্মাদ কর্তৃক বর্ণিত আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) এর হাদীসে যে গাযওয়ায়ে হিন্দের কথা এসেছে তা এখনো সংঘটিত হয়নি। এ হাদীসটি সহীহ হলে সত্বরই তা ঈসা (আলাইহিস সালাম) এর অবতরণের সময়কালে সংঘটিত হবে।” -ইতহাফুল জামাআহ ১/৩৬৬, গাযওয়ায়ে হিন্দ সংক্রান্ত অধ্যায়।

শাইখ সালেহ আলমুনাজ্জিদ বলেন,

 الَّذِيْ يَبْدُوْ مِنْ ظَاهِرِ حَدِيْثِ ثَوْبَانَ وَحَدِيْثِ أَبِيْ هُرَيْرَةَ ـ إِنْ صَحَّ ـ أَنَّ غَزْوَةَ الْهِنْدِ الْمَقْصُوْدَةَ سَتَكُوْنُ فِيْ آخِرِ الزَّمَانِ،  فِي زَمَنِ قُرْبِ نُزُوْلِ عِيْسَى بْنِ مَرْيَمَ عَلَيْهِمَا السَّلَامُ ، وَلَيْسَ فِي الزَّمَنِ الْقَرِيْبِ الَّذِيْ وَقَعَ فِي عَهْدِ مُعَاوِيَةَ بْنِ أَبِيْ سُفْيَانَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ.

“সাওবান (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) ও আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) এর হাদীস সহীহ হয়ে থাকলে এর স্পষ্ট ভাষ্য থেকে এটাই প্রতীয়মান হয় যে, কাঙ্খিত গাযওয়ায়ে হিন্দ শেষ জামানায় ঈসা (আলাইহিস সালাম) এর অবতরণের নিকটবর্তী সময়ে সংঘটিত হবে। মুআবিয়া (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) এর যুগের কাছাকাছি সময়ে যে সকল যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে সেগুলো নয়। -ইসলাম সুওয়াল ও জাওয়াব: প্রশ্নোত্তর নং- ১৪৫৬৩৬ (www.islamqa.info/ar/145636)

 

পরিশিষ্ট

নুআইম ইবনে হাম্মাদ ও তাঁর রচিত ‘কিতাবুল ফিতান’ গ্রন্থ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু কথা

গাযওয়ায়ে হিন্দের সংশ্লিষ্ট কিছু হাদীস এককভাবে শুধু নুআইম ইবনে হাম্মাদ তাঁর রচিত ‘কিতাবুল ফিতানে’ বর্ণনা করেছেন। যদিও সে হাদীসগুলোর কোনো কোনোটির সনদ সহীহ এবং অন্য কোনো সহীহ হাদীসের বিপরীতও নয়। তাই নুআইম ইবনে হাম্মাদ (মৃত্যু ২২৮ হি.) ও তাঁর রচিত ‘কিতাবুল ফিতান’ গ্রন্থ সম্পর্কে পৃথকভাবে সংক্ষিপ্ত কিছু আলোচনা তুলে ধরা হলো-

নুআইম ইবনে হাম্মাদ (মৃত্যু ২২৮ হি.): প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ মুহাম্মাদ ইবনে সা‘দ (মৃত্যু ২৩০ হিজরি) বলেন,

نُعَيْمُ بنُ حمَّادٍ: وَكَانَ مِنْ أَهْلِ خُرَاسَانَ مِنْ أَهْلِ مَرْو، وَطَلَبَ الحَدِيْثَ طَلَباً كَثِيْراً بِالعِرَاقِ وَالحِجَازِ، ثُمَّ نَزَلَ مِصْرَ، فَلَمْ يَزَلْ بِهَا حَتَّى أُشْخِصَ مِنْهَا فِي خِلاَفَةِ أَبِي إِسْحَاقَ -يَعْنِي: المُعْتَصِمَ- فَسُئِلَ عَنِ القُرْآنِ، فَأَبَى أَنْ يُجِيْبَ فِيْهِ بِشَيْءٍ مِمَّا أَرَادُوهُ عَلَيْهِ، فَحُبِسَ بِسَامَرَّاءَ، فَلَمْ يَزَلْ مَحْبُوساً بِهَا حَتَّى مَاتَ فِي السِّجْنِ، سَنَةَ ثَمَانٍ وَعِشْرِيْنَ وَمِئَتَيْنِ.

অর্থ:“নুআইম ইবনে হাম্মাদ খোরাসানের মারও (মার্ভ) এলাকার অধিবাসী ছিলেন। তিনি ইরাক এবং হেজায থেকে অনেক হাদিস সংগ্রহ করেছেন। অতঃপর তিনি মিসর যান। তিনি সেখানেই অবস্থান করছিলেন; এক পর্যায় আবু ইসহাক অর্থাৎ মু’তাসিমের খেলাফতকালে তাকে সেখান থেকে বন্দী করে নিয়ে আসা হয়। তাকে কুরআন (সৃষ্ট কি সৃষ্ট না) এ ব্যাপারে জিজ্ঞাসা করা হয়। প্রশাসনিক লোকজন তার নিকট যেভাবে উত্তর আশা করেছিল তিনি সেভাবে কোনো প্রকার জবাব দিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে তাকে ‘সামাররা’ নামক স্থানে বন্দী করে রাখা হয়। সেখানে তিনি বন্দী অবস্থায় ২২৮ হিজরিতে মৃত্যুবরণ করেন।” -তবাকাতে ইবনে সাআদ ৫/৪২১, রাবি ৪০৭৮; সিয়ারু আলামিন নুবালা ১০/৬১১, রাবি ২০৯

হাকাম ইবনুল মুবারক রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ২৪০ হি.) বলেন,

خَرَجَ إِلَى مِصْرَ، فَأَقَامَ بِهَا نَحْوَ نَيِّفٍ وَأَرْبَعِيْنَ سَنَةً، وَكَتَبُوا عَنْهُ بِهَا، وَحُمِلَ إِلَى العِرَاقِ فِي امْتِحَانِ “القُرْآنُ مَخْلُوْقٌ”، مَعَ البُوَيْطِيِّ مُقَيَّدَيْنِ.

অর্থ: “তিনি মিশরে চলে যান। সেখানে প্রায় বিয়াল্লিশ বছর অবস্থান করেন। মিসরের ওলামায়ে কেরাম তার থেকে হাদীস লেখেন। অতঃপর ‘খলকে কুরআনে’র ফিতনার সময় বুওয়াইতির সাথে তাঁকে বন্দী করে ইরাক নিয়ে যাওয়া হয়।” -তাহযীবুল কামাল ৭/৩৫১, রাবি ৭০৪৬; সিয়ারু আলামিন নুবালা ১০/৫৯৯, রাবি ২০৯

তিনি যেসকল প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিস থেকে হাদীস বর্ণনা করেছেন

তারা হলেন- আবু হামযাহ আসসুক্কারি, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, ফুযাইল ইবনে ইয়ায, সুফিয়ান ইবনে উয়াইনাহ, রিশদীন ইবনে সাআদ, হাফস্ ইবনে গিয়াস, ইবনে ওয়াহব, ইয়াহয়া আলকাত্তান, ইমাম আব্দুর রাজ্জাক, আবু দাউদ তয়ালিসী-সহ খুরাসান, মক্কা-মদীনা, শাম, ইয়ামান ও মিসরের আরো অনেক মুহাদ্দিস থেকে তিনি হাদীস বর্ণনা করেন।

তাঁর থেকে গুরুত্বপূর্ণ যেসকল মুহাদ্দিস হাদীস বর্ণনা করেছেন 

ইয়াহইয়া ইবনে মাঈন, ইমাম যুহলী, আবু হাতেম, ইমাম বুখারী, ইমাম মুসলিম, ইমাম তিরমিযী ও আবু দাউদ-সহ আরো অনেক বিশিষ্ট মুহাদ্দিস তার থেকে হাদীস বর্ণনা করেন। -সিয়ারু আলামিন নুবালা ১০/৫৯৫-৫৯৬, রাবি ২০৯; তাহযীবুল কামাল ৭/৩৫০, রাবি ৭০৪৬

সহীহ বুখারি ও সহিহ মুসলিমসহ প্রসিদ্ধ ছয়টি হাদীস গ্রন্থে তাঁর বর্ণিত হাদীসের একটি সংক্ষিপ্ত তালিকা –

১. ‘সহীহ বুখারি’র সালাত অধ্যায়, ১/৫৬, হাদীস ৩৯০

২. ‘সহীহ বুখারি’র ‘কাসামাহ’ অধ্যায়, ১/৫৪৩, হাদীস ৩৭১১

৩. ‘সহীহ বুখারি’র নুবুওয়াতের আলামত অধ্যায়, ১/৫২৯, হাদীস ৩৬০০

৪. ‘সহিহ মুসলিমে’র মুকাদ্দিমাহ বা ভূমিকা, ১/১৭

৫. ইমাম তিরমিযি রহিমাহুল্লাহ তার থেকে ‘সুনানে তিরমিযি’র ‘জিহাদ’ অধ্যায়ে (১/২৯৫, হাদীস ১৬৬৩) হাদিস বর্ণনা করেছেন। উক্ত হাদিস উল্লেখ করে ইমাম তিরমিযি রহিমাহুল্লাহ বলেন,هذا حَدِيْثٌ صَحِيْحٌ غَرِيْبٌ এই হাদিসটি ‘সহিহ গরীব’।

৬. ইমাম ইবনে মাজাহ ‘সুনান’ গ্রন্থে (১/১২৭, হাদীস ১৭৭৪) তার থেকে একটি হাদীস বর্ণনা করেছেন। ইমাম বুছিরী রহিমাহুল্লাহ সে হাদীস সম্পর্কে বলেন, هذَا إِسْنَادٌ صَحِيْحٌ، رِجَالُهُ مَوْثُوْقُوْنَ. (এই হাদিসের সনদ সহিহ এবং বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য।) -যাওয়ায়েদে ইবনে মাজাহ, পৃষ্ঠা ২৫৭, হাদীস ২৫৭

 

নুআইম ইবনে হাম্মাদ সম্পর্কে আরও বিস্তারিত জানার জন্য নিম্নোক্ত কিতাবগুলো দেখা যেতে পারে-

আলজারহু ওয়াত তাদীল, ইবনে আবি হাতেম ৮/৫২৯, রাবি ১৫৪৩২; আলকামেল, ইবনে আদী ৮/২৫৬-২৫৬, রাবি ১৯৫৯; কিতাবুছ্ ছিকাত, ইবনে হিব্বান ৯/২১৯; রাবি ৫০২১; তাহযীবুল কামাল ৭/৩৫০-৩৫৩, রাবি ৭০৪৬; সিয়ারু আলামিন নুবালা ১০/৫৯৫-৬১২, রাবি ২০৯; তাযকিরাতুল হুফফায ২/৬-৭, রাবি ৪২৪; মিযানুল ইতিদাল ৪/২৬৭-২৭০, রাবি ৯১০২; আলমুগনি ফিদ দুআফা ২/৪৬২-৪৬৩, রাবি ৬৬৫৯; ইকমালু তাহযীবিল কামাল, আলাউদ্দীন মুগলতাঈ ৬/৪৩১-৪৩৩, রাবি ৫০২১; আলকাশেফ ৪/৪০০-৪০১, রাবি ৫৮৫৬; আলইবার ফি খবারি মান গবার ১/৪০৫ (২২৯ হিজরি সনের আলোচনা প্রসংগে); তাহযিবুত তাহযিব ১০/৪৬২- ৫৭২, রাবি ৮৪২৮; মুকাদ্দিমা ফাতহুল বারি পৃ. ৫৯৭; আলই’লান বিত-তাওবিখ, হাফেয সাখাবী রহিমাহুল্লাহ পৃ. ১১০; এলাউস সুনান ২১/৩৪; ফিকহু আহলিল ইরাকি ওয়া হাদীসুহুম পৃ.১০৬-১০৭; আলইমামু ইবনে মাজাহ ওয়া কিতাবুহু আসসুনান, আব্দুর রশীদ নোমানী; তাহকীক- আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ পৃ. ৯৭-৯৮

 

কিতাবুল ফিতান

গাযওয়ায়ে হিন্দের বেশ কিছু হাদীস সহীহ সনদ দ্বারা প্রমাণিত। সেগুলো হাদীসের বিভিন্ন ইমামগণ তাঁদের সুপ্রসিদ্ধ হাদীসগ্রন্থসমূহে বর্ণনা করেছেন, যা ইতিপূর্বে সবিস্তারে আলোচনা করা হয়েছে। তবে গাযওয়ায়ে হিন্দের সংশ্লিষ্ট কিছু হাদীস এককভাবে শুধু নুআইম ইবনে হাম্মাদ তাঁর রচিত ‘কিতাবুল ফিতানে’ বর্ণনা করেছেন। যদিও সে হাদীসগুলোর কোনো কোনোটির সনদ সহীহ। এবং অন্য কোনো সহীহ হাদীসের বিপরীতও নয়। কিন্তু উক্ত কিতাব সম্পর্কে ইমাম যাহাবি রহিমাহুল্লাহ ‘সিয়ারু আলামিন নুবালা’ গ্রন্থে বলেছেন, ‘সেখানে অনেক আশ্চর্যজনক ও মুনকার হাদীস রয়েছে।’ একথা দ্বারা কেউ কেউ সে কিতাবে উল্লিখিত গাযওয়ায়ে হিন্দের সকল হাদীসের উপর আপত্তি উত্থাপনের চেষ্টা করেন। তাই বিষয়টি নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। নিম্নে এবিষয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা তুলে ধরা হলো-

ইমাম যাহাবি তাঁর রচিত সাতটি কিতাব ( ১. ‘আলকাশেফ’ ২. ‘মিযানুল ইতিদাল’ ৩. ‘সিয়ারু আলামিন নুবালা’ ৪. ‘আলমুগনি’ ৫. ‘তারিখুল ইসলাম’ ৬. ‘তাযকিরাতুল হুফফায’  ৭. ‘আলইবার’) এর মধ্যে নুআইম ইবনে হাম্মাদ এর জীবনী আলোচনা করেন। কিন্তু ‘সিয়ারু আলামিন নুবালা’ ব্যতীত অন্য কোনো কিতাবে এমন কথা বলেননি। তবে সেখানে একথা বলে সাথে সাথে ইবনে আদির নিম্নোক্ত কথা বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে আদি নুআইম ইবনে হাম্মাদ এর সকল হাদীস থেকে তালাশ করে দশটা মুনকার হাদীস পেয়েছেন। সেগুলো সম্পর্কে বিস্তারিত পর্যালোচনা শেষে চূড়ান্ত মন্তব্য পেশ করে বলেন, এর বাহিরের সকল হাদীস সঠিক হবে। ইমাম যাহাবি রহিমাহুল্লাহ এর সম্পূর্ণ কথা ‘সিয়ারু আলামিন নুবালা’ গ্রন্থ থেকে নিম্নে পেশ করা হলো,

 وَقَدْ صَنَّفَ كِتَابَ (الفِتَنِ)، فَأَتَى فِيْهِ بِعَجَائِبَ وَمَنَاكِيْرَ. وَقَدْ قَالَ ابْنُ عَدِيٍّ عَقِيْبَ مَا سَاقَ لَهُ مِنَ المَنَاكِيْرِ: وَقَدْ كَانَ أَحَدَ مَنْ يَتَصَلَّبُ فِي السُّنَّةِ، وَمَاتَ فِي مِحْنَةِ القُرْآنِ، فِي الحَبْسِ، وَعَامَّةُ مَا أُنْكِرَ عَلَيْهِ هُوَ مَا ذَكَرْتُهُ، وَأَرْجُو أَنْ يَكُوْنَ بَاقِي حَدِيْثِهِ مُسْتَقِيْماً

অর্থ: “তিনি ‘কিতাবুল ফিতান’ রচনা করেছেন। তাতে বেশ কিছু আশ্চর্যজনক ও মুনকার ঘটনা বর্ণনা করেছেন। ইমাম ইবনে আদি তার বেশ কিছু মুনকার উল্লেখ করে বলেন, ‘তিনি ছিলেন সুন্নাহর ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর। তিনি খলকে কুরআনের মাসআলায় নির্যাতিত হয়ে বন্দী অবস্থায় মৃত্যু বরণ করেন। সাধারণত তার যেসকল হাদীসের উপর আপত্তি করা হয় সেগুলো আমি উল্লেখ করলাম। সুতরাং আমি আশা করি তার বর্ণনাকৃত অবশিষ্ট হাদীস নির্ভরযোগ্য।” -সিয়ারু আলামিন নুবালা ১০/৬০৯-৬১০

 

ইবনে আদির চি‎হ্নিত সে সকল হাদীসের মধ্যে আমাদের এ প্রবন্ধে উল্লিখিত গাযওয়ায়ে হিন্দ সংক্রান্ত কোনো হাদীস আসেনি। সুতরাং ইমাম যাহাবি রহিমাহুল্লাহ এর উক্ত কথার কারণে গাযওয়ায়ে হিন্দের হাদীসের উপর আপত্তির সুযোগ নেই। বিশেষত যে হাদীসগুলো সনদের দিক থেকে সহীহ হিসেবে সাব্যস্ত।[19]

মাসলামা ইবনে কাসেমও নুআইম ইবনে হাম্মাদের বিষয়ে একটি কথা বলেছেন। তবে সেটা সরাসরি গাযওয়ায়ে হিন্দ সম্পর্কিত নয়। সেটি হল, শেষ জামানায় সংঘটিতব্য মহা-যুদ্ধ সংক্রান্ত। তার হুবহু বক্তব্য নিচে উল্লেখ করা হল,

মাসলামা ইবনে কাসেম বলেন, لَهُ أَحَادِيْثُ مُنْكَرَةٌ فِيْ الْمَلَاحِمِ اِنْفَرَدَ بِهَا  (তিনি শেষ জামানায় সংঘটিতব্য মহা-যুদ্ধ সংক্রান্ত বেশ কিছু মুনকার হাদিস বর্ণনা করেছেন, যা অন্য কেউ বর্ণনা করেনি।) -তাহযিবুত তাহযিব ১০/৫৭১

তার কথার ক্ষেত্রেও নুআইম ইবনে হাম্মাদের বিষয়ে ইবনে আদির চুড়ান্ত ফায়সালার কথা (যা উপরে উল্লেখ করা হয়েছে এবং ইমাম মিযযি, যাহাবি ও ইবনে হাজার যাকে সঠিক বলে মেনে নিয়েছেন) স্মরণ করা যেতে পারে। -সিয়ারু আলামিন নুবালা ১০/৬০৯-৬১০; তাহযীবুল কামাল ৭/৩৫০-৩৫৩, রাবি ৭০৪৬; মুকাদ্দিমা ফাতহুল বারি পৃ. ৫৯৭

উল্লেখ্য, নুআইম ইবনে হাম্মাদ সম্পর্কে প্রবন্ধকারের বিস্তারিত একটি পুস্তিকা রয়েছে। সেখান থেকে সংক্ষেপে কিছু কথা এখানে তুলে ধরা হল। ‘ফিতান’ সংক্রান্ত গ্রন্থসমূহ সম্পর্কে একটি বিস্তারিত প্রবন্ধ লেখার ইচ্ছা আছে। সেখানে নুআইম বিন হাম্মাদ সম্পর্কিত বিস্তারিত সে প্রবন্ধটি তুলে ধরার ইচ্ছা আছে।

উপসংহার

উপরিউক্ত হাদীসগুলো একজন মুমিনকে যে সকল বার্তা দেয়-

১. গাযওয়ায়ে হিন্দ বা হিন্দুস্তানের যুদ্ধ আল্লাহ ও তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্তৃক প্রতিশ্রুত একটি যুদ্ধের ভবিষ্যদ্বাণী, যা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের যুগের অনেক পরে তথা শেষ জামানায় সংঘটিত হবে এবং যুদ্ধটি হবে ভারত উপমহাদেশব্যাপী বিস্তৃত।

২. এ যুদ্ধ (গাযওয়াতুল হিন্দ) বাইতুল মাকদিস তথা জেরুজালেম থেকে ইমাম মাহদীর নেতৃত্বে পরিচালিত হবে। ইমাম মাহদী হিন্দুস্তানের দিকে একটি সৈন্যদল পাঠাবেন। সৈন্যদল হিন্দুস্তানের ভূমি জয় করে তা পদানত করবে। দাজ্জালের আবির্ভাব পর্যন্ত তাঁরা হিন্দুস্তানেই অবস্থান করবেন। সেসময় দাজ্জালের আবির্ভাব ঘটবে এবং ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালাম আসমান থেকে অবতরণ করবেন। ঈসা আলাইহিস সালাম ইমাম মাহদীর ইমামতিতে সালাত আদায় করবেন।

৩. এ যুদ্ধে মুসলমানদের বিজয় হবে এবং মুসলিম সৈন্যদলটি হিন্দুস্তানের রাজাদের শিকল দিয়ে বেঁধে বন্দী করে জেরুজালেমে ইমাম মাহদীর নিকট উপস্থিত করবেন।

৪. এ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদগণ হিন্দুস্তান থেকে ফিরে শামে চলে আসবেন। তারা শামে ঈসা ইবনে মারইয়াম আলাইহিস সালামের সাক্ষাৎ লাভ করবেন।

৫. এ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদদেরকে আল্লাহ তাআলা ক্ষমা করে দেয়ার ঘোষণা করেছেন।

৬. এ যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী মুজাহিদদেরকে আল্লাহ তায়ালা জাহান্নাম থেকে মুক্ত ঘোষণা করেছেন।

৭. এ যুদ্ধের শহীদগণ হবেন শ্রেষ্ঠ শহীদদের অন্তর্ভুক্ত।

৮. তাই এ যুদ্ধে প্রত্যেক মুমিনের সর্বাত্মকভাবে নিজের জান-মাল সবকিছু ব্যয় করে অংশগ্রহণ করা উচিত, যেমনটি আবু হুরায়রাহ (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) বলেছেন। এমনকি তিনি এ যুদ্ধ শেষ জামানায় হবে জেনেও তাতে শরীক হয়ে ঈসা আলাইহিস সালামের সাক্ষাতের আকাঙ্খা পোষণ করেছিলেন।

৯. এ যুদ্ধ কোথায় এবং কার সাথে হবে?

হাদীসে বর্ণিত “আলহিন্দ” বলতে ভারত উপমহাদেশ উদ্দেশ্য। তাই গাযওয়ায়ে হিন্দ আমাদের এ ভূখন্ডেই সংঘটিত হবে। এর প্রতিপক্ষ দলটি হবে হিন্দু-মুশরিকরা।

১০. এ যুদ্ধ কবে হবে?

এ যুদ্ধ পূর্বে হয়ে গেছে নাকি অদূর ভবিষ্যতে হবে, এ নিয়ে বিশদ আলোচনা করা হয়েছে। কারো কারো মতে এ যুদ্ধ বনী উমাইয়ার শাসনামলে মুহাম্মাদ বিন ক্বাসিম রহিমাহুল্লাহ এর ভারত বিজয়ের মাধ্যমে সংঘটিত হয়ে গেছে। করো মতে সুলতান মাহমুদ গযনবী রহিমাহুল্লাহ এর ভারত অভিযানের দ্বারাই এ যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু গাযওয়ায়ে হিন্দের সবগুলো হাদীস সামনে রাখলে প্রতিভাত হয় যে, এ যুদ্ধ এখনো হয়নি। বরং ঈসা আলাইহিস সালামের আগমনের কিছুকাল পূর্বে ইমাম মাহদীর নেতৃত্বে সংঘটিত হবে এবং এ যুদ্ধের গাযীরাই শামে গিয়ে ঈসা আলাইহিস সালামের সাথে সাক্ষাৎ করবেন।

পরিশেষে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার নিকট এই কামনা করি, তিনি যেন আমাদেরকে সঠিক বিষয় বোঝার এবং সঠিক পথে চলার তাওফিক দান করেন। আমীন।

وصلى الله على سيدنا ومولانا محمد وعلى آله وصحبه وسلم

 

০২ রবিউস সানী, ১৪৪২ হিজরি

১৮ নভেম্বর, ২০২০ ঈসায়ী।

 

 

 

গ্রন্থপঞ্জি

 

১. সুনানে সাঈদ ইবনে মানসুর (২২৭হি.), তাহকীক- হাবীবুর রহমান আযমী; দারুস সামিয়ী, রিয়াদ, ১ম সংস্করণ ১৪৩৩ হি.।

২. কিতাবুল ফিতান, নুআইম ইবনে হাম্মাদ রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ২২৮ হিজরী), তাহকীক: সামীর ইবনে আমীন ঝুহাইরী, মাকতাবাতুত তাওহীদ, কায়রো।

৩. তবাকাতে ইবনে সাআদ, মুহাম্মাদ ইবনে সা‘দ (মৃত্যু ২৩০ হিজরি), দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, প্রথম সংস্করণ, ১৪১০ হি.।

৪. মুসান্নাফে ইবনে আবি শাইবা, আব্দুল্লাহ ইবনে আবি শাইবা (২৩৫হি.), (তাহকীক: শায়খ মুহাম্মাদ আওয়ামাহ), দারুল মিনহাজ, জিদ্দাহ, ১ম সংস্করণ, ২০০৬ খ্রি.।

৫. তারীখে খলীফা ইবনে খাইয়াত, ইবনে খাইয়াত (মৃত্যু ২৪০ হি.), দারুল কলম, বৈরুত, দিমাশক।

৬. মুসনাদে আহমাদ, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (মৃ. ২৪১হি.), তাহকীক: শায়খ শুআইব আলআরনাউত (১৪৩৮হি.), মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ২০১৫ খ্রি.।

৭. মুসনাদে আহমাদ, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল (২৪১হি.) তাহকীক: আহমাদ শাকের, দারুল মা’আরিফ, মিসর।

৮. সহীহ বুখারী, মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাইল আলবুখারী (মৃ. ২৫৬হি.), আল মাকতাবাতুল ইসলামিয়া, বাংলাবাজার, ঢাকা।

৯. আততারীখুল কাবীর, ইমাম বুখারী রহিমাহুল্লাহ (২৫৬হি.), মুআসসাসাতুল কুতুবিস সাক্বাফিয়্যাহ্, বৈরুত, ১৪০৭হি.।

১০. সহীহ মুসলিম, ইমাম মুসলিম ইবনুল হাজ্জাজ (মৃ.২৬১হি.), আল মাকতাবাতুল ইসলামিয়া, বাংলাবাজার, ঢাকা।

১১. সুনানে ইবনে মাজাহ, ইমাম ইবনে মাজাহ (২৭৫ হি.), আল মাকতাবাতুল ইসলামিয়া, বাংলাবাজার, ঢাকা।

১২. সুনানে তিরমিযী, ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে ঈসা আত-তিরমিযী (মৃ. ২৭৯ হি.), আল মাকতাবাতুল ইসলামিয়া, বাংলাবাজার, ঢাকা।

১৩. আল আহাদ ওয়াল মাসানী, ইবনে আবী আসেম (২০৬-২৮৭ হিজরী), দারুর রা-য়াহ, রিয়াদ, সৌদি আরব।

১৪. কিতাবুল জিহাদ, ইবনে আবি আসেম রহিমাহুল্লাহ (২০৬-২৮৭ হি), তাহকীক: আবু আব্দুর রহমান, মাকতাবাতুল উলূম ওয়াল হিকাম, মদীনা মুনাওয়ারাহ।

১৫. মুসনাদে বাযযার, ইমাম আবু বকর আহমাদ ইবনে আমর আল বাযযার (২৯২হি.), দারুল হাদীস, কায়রো, ১ম সংস্করণ ১৪৩৪ হি.

১৬. সুনানে নাসায়ী, ইমাম নাসায়ী (৩০৩হি.), আল মাকতাবাতুল ইসলামিয়া, বাংলাবাজার, ঢাকা।

১৭. আলজারহু ওয়াত-তা’দীল, ইবনে আবী হাতেম আর-রাযী (৩২৭হি.), দারুল কুতুব আল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ২য় সংস্করণ ২০১০ ঈসায়ী।

১৮. কিতাবুছ ছিকাত, ইমাম ইবনে হিব্বান (৩৫৪হি.), দারুল ফিকর, বৈরুত, ১ম সংস্করণ ১৪০১ হি.।

১৯. আলমুজামুল আওসাত, ইমাম তবারানী রহিমাহুল্লাহ (২৬০-৩৬০ হিজরি), তাহকীক, আইমান সালেহ, দারুল হাদীস, ১ম সংস্করণ ১৪১৭ হি.।

২০. মুসনাদে শামিয়্যিন, তবারনী (৩৬০হি.), মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১ম সংস্করণ ১৪৩৫ হি.।

২১. আল কামেল ফী দুআফাইর রিজাল, ইবনে আদী (৩৬৫হি.), তাহকীক, শায়েখ আদেল আহমাদ, দারুল কুতুব আল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, লেবানন, ১ম সংস্করন ১৪১৮হি.।

২২. মুসতাদরাকে হাকেম, আবু আব্দুল্লাহ আলহাকেম (৪০৫হি.), দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, লেবানন, ১ম সংস্করণ ১৯৯০ খ্রি.।

২৩. হিলয়াতুল আওলিয়া, আবু নুআইম আসফাহানী (৪৩০হি.), দারুল হাদীস, কায়রো।

২৪. আসসুনানুল ওয়ারিদাহ ফিল ফিতান ওয়া গাওয়া ইলিহা ওয়াসসাআতি ওয়া আশরাতিহা, আবু আমর উসমান বিন সাঈদ আলমুকরি আদ্দানী (মৃত্যু ৪৪৪ হি.), তাহকীক- রিযাউদ্দীন মুবারকপুরী, দারুল আসেমাহ।

২৫. সুনানে কুবরা, আবু বকর বাইহাকী রহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৪৫৮ হি:), দারুল কুতুব আলইলমিয়্যাহ, বৈরুত।

২৬. দালাইলুন নুবুওয়্যাহ, বায়হাকী (৪৫৮হি.), দারুল হাদীস, কায়রো, ২০০৭ খ্রি.।

২৭. তারীখে বাগদাদ, খতীবে বাগদাদী (৪৬৩হি.), তাহকীক, সিদকী জামীল আল-আত্তার, দারুল ফিকর বৈরুত, ১ম সংস্করণ, ১৪২৪-১৪৩৩ হি.।

২৮. আলফিরদাউস, দায়লামী (৫০৯হি.) দারুল কুতুব আল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১ম সংস্করণ ৪০৬ হিজরী।

২৯. তা’রীখে দিমাশ্ক, ইবনে আসাকির (মৃত্যু. ৫৭১ হি.), দারুল ফিকর, বৈরুত, লেবানন।

৩০. আলকামিল, ইবনুল আসীর (মৃত্যু ৬৩০ হি.)

৩১. আল মুগনী, শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪৮ হি.), দারুল কুতুব আলইলমিয়্যাহ, বৈরুত।

৩২. আলকাশেফ, শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪২ হি.), দারুল কুরতুবা, বৈরুত।

৩৩. তাহযীবুল কামাল, আবুল হাজ্জাজ ইউসুফ আলমিযযী (৭৪৮হি.), মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত।

৩৪. সিয়ারু আ’লামিন নুবালা, শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪৮হি.), মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত।

৩৫. মিযানুল ইতিদাল, ইমাম যাহাবী (৭৪৮হি.), দারুল ফিকর।

৩৬. আলইবার ফি খবারি মান গবার , ইমাম যাহাবী (৭৪৮হি.), হুকুমাত আল-কুয়েত ১৯৮৪ খৃষ্টাব্দ।

৩৭. তা’রীখুল ইসলাম, শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪৮হি.), তাহকীক: ড. বাশশার আওয়াদ, দারুল গরব আল ইসলামী।

৩৮. মীযানুল ই’তিদাল, শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪৮ হি.), দারুল ফিকর।

৩৯. তাযকিরাতুল হুফ্ফায, শামসুদ্দীন আয-যাহাবী (৭৪৮ হি.), দারুল কুতুব আলইলমিয়্যাহ, বৈরুত।

৪০. ইকমালু তাহযীবিল কামাল, আলাউদ্দীন মুগলতাঈ (৭৬২হি.), দারুল কুতুব আল-ইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১ম সংস্করণ, ২০১১ খৃষ্টাব্দ।

৪১. তাফসিরে ইবনে কাছির, ইসমাঈল ইবনে কাছির (মৃ. ৭৭৪ হি:), দারুল হাদিস, কায়রো, মিসর।

৪২. আল বিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ইবনে কাসীর ( মৃত্যু ৭৭৪ হি.), দারুল ফিকর, বৈরুত।

৪৩. আন-নিহায়াহ ফিল ফিতান ওয়াল মালাহিম, ইবনে কাসীর ( মৃত্যু ৭৭৪ হি.), দারুল হাদিস, কায়রো, মিশর।

৪৪. শারহু ইলালিত তিরমিযি, ইবনে রজব হাম্বলী রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ৭৯৫ হি.), তাহকীক- হাম্মাম সাঈদ, ৫ম সংস্করণ ১৪৩৩হি.।

৪৫. মাজমাউয যাওয়ায়েদ, নুরুদ্দীন হাইসামী (মৃ.৮০৭হি.), দারুল কিতাব আলআরাবী, ১ম সংস্করণ ১৪০২ হি.।

৪৬. যাওয়ায়েদে ইবনে মাজাহ, আলবুসিরী (৮৪০ হি.), দারুল কুতুব আলইলমিয়্যাহ, লেবানন, ১ম সংস্করণ ১৪১৪ হি.।

৪৭. মুকাদ্দিমা ফাতহুল বারি , হাফেয ইবনে হাজার আল আসকালানী (৮৫২ হি.), দারুল ফিকর, বৈরুত।

৪৮. তাহযীবুত তাহযীব, ইবনে হাজার আলআসকালানী (৮৫২ হি.), দারুল কুতুব আলইলমিয়্যাহ, বৈরুত, ১ম সংস্করণ ১৪১৫ হি.।

৪৯. তাকরীবুত তাহযীব, হাফেয ইবনে হাজার আসকালানী (৮৫২হি.), তাহক্বীক: শায়েখ মুহাম্মাদ আওয়ামাহ, দারুর রশীদ, হালাব, সিরিয়া, ২য় সংস্করণ, ১৪০৮হি.।

৫০. লিসানুল মীযান, ইবনে হাজার আল আসকালানী (৮৫২হি.), দারুল বাশাইর আল-ইসলামিয়্যাহ, বৈরুত, ১ম সংস্করণ, ১৪২৩ হি.।

৫১. আলই’লান বিত-তাওবিখ, হাফেয সাখাবী রহিমাহুল্লাহ (৯০২), মুয়াসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরুত, ১ম সংস্করণ ১৪০৭ হি.।

৫২. শারহু শারহি নুখবাতিল ফিকার, মোল্লা আলী কারী (মৃত্যু ১০১৪ হি.), দারুল আরকাম, বৈরুত, লেবানন।

৫৩. আর রাফউ ওয়াত তাকমীল, আব্দুল হাই লাখনবী (১৩০৪হি.), শায়খ আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ১৪১৭ হি.), দারুল বাশাইরুল ইসলামিয়্যাহ, বৈরুত, লেবানন।

৫৪. আবজাদুল উলূম, ছিদ্দিক হাসান খান কিন্নৌজী রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ১৩০৭হি.), দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরুত।

৫৫. ফিকহু আহলিল ইরাকি ওয়া হাদীসুহুম, যাহেদ আল কাউসারী (১৩৭১ হি.), মুআসসাসাতুর রাইয়ান বৈরুত, ২য় সংস্করণ, ১৪২৪হি.।

৫৬. বাযলুল মাজহুদ ফি হাল্লি সুনানি আবি দাউদ, আল্লামা খলীল আহমাদ সাহারানপুরী (মৃত্যু ১৩৪৬ হি.), মারকাযুশ শায়খ আবুল হাসান আলী নাদাবী, ভারত।

৫৭. এলাউস সুনান, যাফর আহমাদ উসমানী (১৩৯৪হি.), আলমাকতাবাতুল ইসলামিয়া, ১ম সংস্করণ ২০০০ খৃষ্টাব্দ।

৫৮. আলআলাম, যিরিকলি (১৩৯৬ হিজরি), দারুল ইলম, বৈরুত, ৯ ম সংস্করণ, ১৯৯০ খৃষ্টাব্দ।

৫৯. সিলসিলাতুল আহাদীসিস সহীহা, শায়েখ মুহাম্মাদ আলবানী (১৪২০ হি.), মাকতাতুল মাআরিফ, রিয়াদ।

৬০. তারীখুত দাওলাতিল উসমানীয়্যাহ, আমির শাকিব আরসালান, দারু ইবনে কাসীর, ১ম সংস্করণ, ১৪৩২ হিজরী।

৬১. সহীহু ওয়া যঈফু সুনানিন নাসাঈ, শায়খ নাসির উদ্দীন আলবানী (১৪২০ হি.)।

৬২. সহীহ ওয়া যয়ীফ সুনানে আবু দাউদ, শায়খ নাসির উদ্দীন আলবানী (১৪২০ হি.)।

৬৩. আলমুজামুল ওয়াসীত, আলমাকতাবাতুল ইসলামিয়াহ, কায়রো, মিশর।

৬৪. আলমুনজিদ ফীল আ’লাম, দারুল মাশরিক, বৈরুত, লেবানন।

৬৫. আলইমামু ইবনে মাজাহ ওয়া কিতাবুহু আস-সুনান, আব্দুর রশীদ নোমানী (১৪২০ হি.), তাহকীক- আব্দুল ফাত্তাহ আবু গুদ্দাহ, দারুল বাশাইরুল ইসলামিয়্যাহ, বৈরুত, লেবানন।

৬৬. ইতহাফুল জামাআহ, শাইখ হামূদ তুওয়াইজিরী রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু: ১৪১৩ হি.) দারু সামীঈ, রিয়াদ।

৬৭. ইসলাম সুওয়াল ও জাওয়াব, শাইখ সালেহ আলমুনাজ্জিদ – www.islamqa.info/ar/145636

৬৮. আলমুখতাসার ফি আখবারিল বাশার, আবুল ফিদা।

৬৯. আলমাওসুআহ ফী আহাদীসিল মাহদী আয্ যঈফাহ ওয়াল মাওযুআহ, ড. আব্দুল আলীম আব্দুল আযীম আলবাসতাবি, দারু ইবনে হাযাম, বৈরুত, লেবানন, ১ম সংস্করণ, ১৪২০ হিজরী।

 

***

টীকা:

[1]. ইবনে আবি আসেম রাহ. এর জীবনীর জন্য দেখুন- ইমাম যাহাবী রহিমাহুল্লাহ রচিত ‘সিয়ারু আলামিন নুবালা’ ১৩/৪৩০-৪৩৯, রাবি ২১৫

[2]. নুআইম ইবনে হাম্মাদ ও তাঁর রচিত ‘কিতাবুল ফিতান’ গ্রন্থ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত কিছু কথা প্রবন্ধের ‘পরিশিষ্টে’ দেখুন।

[3]. رَوَى الإِمَامُ البُخَارِيُّ فِيْ “صَحِيْحِهِ” عَنْ بَقِيَّةَ بْنِ الوَلِيْدِ تَعْلِيْقًا

[4]. শাবীব ইবনে গারকাদাহ, তাবেঈ (মৃত্যু ১৩৭ হিজরী)। ইমাম আহমাদ, ইয়াহয়া ইবনে মাঈন, নাসাঈসহ অন্যান্য ইমামগণ তাকে ছিকাহ বা হাদীস বর্ণনায় নির্ভরযোগ্য বলেছেন। -তাহযীবুল কামাল ৩/৩৬৩, রাবি ২৬৭৯; ইকমালু তাহযীবিল কামাল ৪/১৩, রাবি ২৫১৫; তাকরীবুত তাহযীব পৃ.২৬৪, রাবি ২৭৪৩

[5] ইমাম ইবনে শিহাব যুহরী; তাবেঈ, হাদীসের প্রসিদ্ধ ইমাম। জন্ম ৫০/৫১ হি., মৃত্যু ১২৫ হি.। -তাহযীবুল কামাল ৬/৫০৭, রাবি ৬১৯৭

[6]. أخرجه ابن عدي (المتوفى 365هـ) في “الكامل” (2/ 58) و ابن عساكر (المتوفى571هـ) في “تاريخ دمشق” (238:52) عن هشام بن عمار قال حدثنا الجراح بن مليح البهراني قال حدثنا محمد بن الوليد الزبيدي عن لقمان بن عامر عن عبد الأعلى البهراني عن ثوبان رضي الله عنه مولى رسول الله صلى الله عليه وسلم به مرفوعا.

 

[7]. أخرجه البخاري في ” التاريخ الكبير ” ( 3 / 2 / 72 ) عن سليمان قال حدثنا الجراح بن مليح قال حدثنا الزبيدي عن لقمان بن عامر عن عبد الاعلى بن عدي البهراني عن ثوبان رضي الله عنه به مرفوعا.

 

[8]. বাকিয়্যা বিন ওয়ালিদ সম্পর্কে চতুর্থ হাদীসের অধীনে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। সামনে পুনরায় সংক্ষেপে বর্ণনা করা হবে।

[9]. একটি আপত্তি ও তার জবাব

শায়খ শুআইব আরনাঊত তাঁর তাহকীককৃত ‘মুসনাদে আহমাদ’ এর টীকায় বলেন, “হাদীসটি হাসান। তবে ‘বাকিয়্যা বিন ওয়ালিদ’ থাকার কারণে এই সনদটি যঈফ। অবশ্য তাঁর মুতাবি’ তথা সমর্থক বর্ণনাকারী রয়েছে। সনদের অন্য রাবিগণ নির্ভরযোগ্য। তবে আবু বকর বিন ওয়ালিদ ‘মাজহুল’ পর্যায়ের। কিন্ত তাঁর মুতাবি’ তথা সমর্থক বর্ণনাকারী রয়েছেন আব্দুল্লাহ বিন সালেম, যিনি রাবি হিসেবে নির্ভরযোগ্য।” -মুসনাদে আহমাদ, ৩৭/৮১, হাদীস ২২৩৯৬

পর্যালোচনা: ‘বাকিয়্যা বিন ওয়ালিদ’ থাকার কারণে এই সনদটি যঈফ’, শায়খ শুআইব আরনাঊতের এই কথাটি যথোপযুক্ত নয়। কেননা, মুদাল্লিস রাবি ‘হাদ্দাছানা’ শব্দে বর্ণনা করলে তাঁর রেওয়ায়াত নির্ভরযোগ্য হিসেবে বিবেচিত হয়। যেমন, ইমাম নাসাঈ রহিমাহুল্লাহ বলেন, “বাকিয়্যা বিন ওয়ালিদ যখন أَخْبَرَنَا  অথবা  حَدَّثَنَا শব্দগুলো দ্বারা হাদীস বর্ণনা করবেন, তখন তিনি নির্ভরযোগ্য রাবি হিসেবে গণ্য হবেন। -তাহযীবুল কামাল ১/৩৬৭, রাবি ৭২৬; মীযানুল ই’তিদাল ১/৩৩১, রাবি ১২৫০; তাক্বরীব, রাবি ৭৩৪, পৃ. ১২৬

[10]. একটি ভুল সংশোধনী

হাফেয হাইসামী রহিমাহুল্লাহ এই হাদীসটি ‘মাজমাউয যাওয়াইদ’ কিতাবে উল্লেখ করার পর বলেন,

رَاشِدُ بْنُ سَعَدٍ وَ بَقِيَّةُ رِجَالِهِ ثِقَاتٌ الطَّبَرَانِيُّ فِي” الْأَوْسَطِ” وَسَقَطَ تَابِعِيُّهُ وَالظَّاهِرُ أَنَّهُ رَوَاهُ

অর্থ: “তবারানী হাদীসটি ‘মু’জামুল আওসাতে’ রেওয়ায়াত করেছেন এবং তাবেঈ স্তরের রাবির নাম উল্লেখ করেননি। এটা স্পষ্ট যে, উক্ত স্তরের রাবি হলেন রাশেদ বিন সা’দ। সনদের অন্য রাবিগণ ছিকাহ বা নির্ভরযোগ্য।”  -মাজমাউয যাওয়াইদ, অধ্যায়: গযওয়াতুল হিন্দ, ৫/২৮২

অবশ্য তিনি তাঁর ‘মাজমাউল বাহরাইন’ কিতাবে মু’জামুল আওসাতের এ হাদীসটি উল্লেখ করে কোনো মন্তব্য করেননি। -মাজমাউল বাহরাইন, অধ্যায়: গযওয়াতুল হিন্দ, ৫/২৬; তাহকীক- আব্দুল কুদ্দুস বিন মুহাম্মাদ নাযির; মাকতাবাতুর রুশদ, রিয়াদ, ১ম সংস্করণ ১৪১৩ হিজরী।

পর্যালোচনা: সম্ভবত হাইসামী রহিমাহুল্লাহ এর কাছে ‘মু’জামুল আওসাতে’র যে নুসখা ছিল তার ভিত্তিতে উপরিউক্ত কথাটি বলেছেন। তিনি বলছেন যে, তাবেঈ স্তরে রাবির নাম হবে, রাশেদ বিন সা’দ!

প্রথমত, এই সনদের কোথাও ‘ইনকিতা’ বিচ্ছিন্নতা নেই। দ্বিতীয়ত, তাঁর কাছে বিদ্যমান ‘মু’জামুল আওসাতে’র নুসখায় তাবেঈ স্তরের যে রাবির নাম ছুটে গেছে, তিনি ‘রাশেদ বিন সা’দ’ নন। বরং তিনি আব্দুল আ’লা বিন আদি, তাঁর থেকে লুকমান বিন আমের, তাঁর থেকে মুহাম্মাদ বিন ওয়ালিদ আয-যুবাইদী, তাঁর থেকে জাররাহ বিন মালিহ, তাঁর থেকে হিশাম বিন আম্মার, তাঁর থেকে ইমাম তবারানীর উস্তায মুহাম্মাদ ইবনে আবু যুরআ হাদীসটি বর্ণনা করেছেন।

 قال الإمام الطبراني: حَدَّثَنَا محمد بن أبي زرعة، ثَنَا هِشَامُ بن عمَّار، ثنا الجرَّاحُ بن مليحٍ البهراني، عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ الْوَلِيدِ الزُّبَيْدِيِّ، عَنْ لُقْمَانَ بْنِ عَامِرٍ الْوُصَابِيِّ، عَنْ عَبْدِ الْأَعْلَى بْنِ عَدِيٍّ الْبَهْرَانِيِّ، عَنْ ثَوْبَانَ مَوْلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ به مرفوعا.

হাদীসটি অন্যান্য সকল কিতাবে তাবেঈ স্তরে রাবির নাম ‘আব্দুল আ’লা বিন আদি’ উল্লেখ রয়েছে। যেমন- মুসনাদে আহমাদ ৩৭/৮১, হাদীস ২২৩৯৬, তাহক্বীক- শুআইব আরনাঊত; সুনানে নাসাঈ ২/৫২, হাদীস ৩১৭৫; মুসনাদে শামিয়্যিন, তবারানী ৩/৮৯, হাদীস ১৮৫১; আলফিরদাউস, দায়লামী ৩/৩৮, হাদীস ৪১২৪; কিতাবুল জিহাদ, ইবনে আবি আসিম ২/৬৬৫, হাদীস ২৮৮; আলকামিল, ইবনে আদি ২/৪০৮, রাবি ৩৫১; আস-সুনানুল কুবরা, বাইহাকী ৯/২৯৭-২৯৮, হাদীস ১৮৬০০ (বাবু মা- জাআ ফি কিতালিল হিন্দ- হিন্দুস্তানের যুদ্ধের বিষয়ে যা বর্ণিত হয়েছে); তা’রীখে দিমাশক, ইবনে আসাকির ৫২/২৪৮

[11]. ‘ক’ অংশ দ্রষ্টব্য।

 

[12]. তাহযীবুল কামাল ১/৪১৮, রাবি ৮৪৪; সিয়ারু আ’লামিন নুবালা ৩/১৫, রাবি ৫

[13]. কুসতুনতুনিয়া বা কনস্টান্টিনোপল বিজয়: একটি জিজ্ঞাসার জবাব                             

 قَالَ رَسُوْلُ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” لَتُفْتَحَنَّ الْقُسْطَنْطِينِيَّةُ، فَلَنِعْمَ الْأَمِيرُ أَمِيرُهَا، وَلَنِعْمَ الْجَيْشُ ذَلِكَ الْجَيْشُ “.

“রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন ‘অবশ্যই কুসতুনতুনিয়া (ইস্তাম্বুল) বিজিত হবে, কতই না উত্তম ঐ বিজয়ের সেনাপতি, আর কতই না উত্তম বাহিনী সেই বাহিনী!”

ইমাম হাকেম রহিমাহুল্লাহ হাদীসটিকে সহীহ বলেছেন। হাইসামী রহিমাহুল্লাহ বলেন: হাদীসটির বর্ণনাকারীগণ নির্ভরযোগ্য। -মুসনাদে আহমদ ৩১/২৮৭, হাদীস ১৮৯৫৭; মুসতাদরাকে হাকেম ৪/৪৬৮, হাদীস ৮৩০০; মাজমাউয যাওয়াইদ ৬/২১৮

উল্লেখ্য, উক্ত হাদীসে কুসতুনতুনিয়া বা কনস্টান্টিনোপল বিজয়ের কোনো সময় উল্লেখ করা হয়নি। তবে ঐতিহাসিকগণ বলেন, ৮৫৭ হিজরি মোতাবেক ১৪৫৩ খৃস্টাব্দে মুহাম্মাদ আলফাতেহ কুসতুনতুনিয়া বিজয় করেন। তাঁর মাধ্যমে এই হাদীসের বাস্তবায়ন ঘটে। মুহাম্মাদ আলফাতেহ ৮৩৩ হিজরি মোতাবেক ১৪২৯ খৃস্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেন এবং ৮৮৬ হিজরি মোতাবেক ১৪৮১ খৃষ্টাব্দে ৫৩ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।-আলআলাম, যিরিকলি ৭/২২৮; তারীখুত দাওলাতিল উসমানীয়্যাহ, আমির শাকিব আরসালান পৃ. ৯০; আলমুনজিদ ফীল আ’লাম পৃ. ২৫, ৫৩০

১৯২৪ খৃষ্টাব্দ পর্যন্ত সেখানে ইসলামি শরীআ ছিল। কিন্তু এরপর থেকে (উসমানী খেলাফতের পতনের পর) অদ্যাবধি সেখানে শরীআ আইন নেই বরং মানব রচিত আইনে শাসন চলছে। আর উপরের হাদীসে উক্ত এলাকা দাজ্জালের আবির্ভাব ও ঈসা আলাইহিস সালামের আগমন সময়ে বিজয়ের কথা বলা হয়েছে।

[14] . কিয়ামতের পূর্বে ইমাম মাহদীর আগমন সম্পর্কে বেশ কিছু হাদীস বর্ণিত হয়েছে। সেখান থেকে দু‘টি হাদীস নিম্নে উল্লেখ করা হল।  

এক. ইমাম মাহদীর আগমনের সময় পৃথিবী জুলুমে পরিপূর্ণ থাকবে। তিনি এসে সারা পৃথিবীতে ন্যায়-ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করবেন। হাদীসটি নিম্নরূপ;

عَنْ عَلِيٍ عَنِ النَّبِيِّ  صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: لَوْ لَمْ يَبْقَ مِنَ الدَّهْرِ إِلَّا يَوْمٌ، لَبَعَثَ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ رجُلاَ مِنْ أَهْلِ بَيْتِيْ يَمْلَؤُهَا عَدْلاَ كَمَا مُلِئَتْ جَوْرًا.

আলী (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন, যদি পৃথিবীর একদিন সময়ও বাকি থাকে, তবুও আল্লাহ তাআলা নবী পরিবারের এক ব্যক্তিকে প্রেরণ করবেন। তিনি এসে জুলুম-অত্যাচারে পূর্ণ পৃথিবীকে ন্যায় ও ইনসাফে পরিপূর্ণ করে দিবেন। শায়খ শুয়াইব আরনাউত বলেন, হাদীসটির সনদ সহীহ। -সুনানে আবু দাউদ ৬/৩৪১, হাদীস ৪২৮৩, তাহকীক- শায়খ শুয়াইব আরনাউত।

দুই. ইমাম মাহদী হবেন নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বংশধর। তিনি ন্যায়-ইনসাফের সাথে সাত বছর পৃথিবী শাসন করবেন।

আবু সাঈদ খুদরী (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন,

اَلْمَهْدِيُّ مِنِّيْ أَجْلَى الْجَبْهَةِ، أَقْنَى الْأَنْفِ، يَمْلَأُ الْأَرْضَ قِسْطْاً وَعَدْلاً، كَمَا مُلِئَتْ جَوْراً وظُلْماً، يَمْلِكُ سَبْعَ سِنِيْنَ.

ইমাম মাহদী আমার বংশগত সন্তান। তিনি প্রশস্ত ললাটের অধিকারী ও উঁচু নাক বিশিষ্ট হবেন। তিনি জুলুম-অত্যাচারে পূর্ণ পৃথিবীকে ন্যায়-নীতি ও ইনসাফে ভরপুর করবেন। তিনি সাত বছর পৃথিবী শাসন করবেন। শায়খ শুয়াইব আরনাউত বলেন, হাদীসটির সনদ জাইয়িদ।-সুনানে আবু দাউদ ৬/৩৪২, হাদীস ৪২৮৫, তাহকীক- শায়খ শুয়াইব আরনাউত; বাযলুল মাজহুদ, ১২/৩২৭-৩২৮; শায়খ নাসির উদ্দীন আলবানী বলেন, হাদীসটির সনদ হাসান। -সহীহ ওয়া যয়ীফ সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ৪২৮৫

 

[15]. মুহাম্মাদ বিন ক্বাসিমের হিন্দ অভিযান ছিল ৯৩ থেকে ৯৫ হিজরির মধ্যে।

[16]. মুআবিয়া (রাযিআল্লাহু তাআলা আনহু) (মৃত্যু ৬০ হি.) এর জামানায় হিন্দুস্তানের অভিযান সম্পর্কে জানার জন্য দেখুন- তারীখে খলীফা ইবনে খাইয়াত, ইবনে খাইয়াত (মৃত্যু ২৪০ হি.) পৃ. ৪৮-৪৯; আলকামিল, ইবনুল আসীর (মৃত্যু ৬৩০ হি.) ২/১১৯, অধ্যায়: সিন্ধু অভিযান;আলবিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ইবনে কাসীর, ৬/২৪৯; তারিখুল ইসলাম, যাহাবী ৪/১২; আলইবার, যাহাবী (মৃত্যু ৭৪৮ হি.) ১/৩৭; তারিকে দিমাশক, ইবনে আসাকির (মৃত্যু ৫৭১ হি.)  ৬১/২৮৯

[17]. সুলতান মাহমুদ গযনবী রহিমাহুল্লাহ এর হিন্দুস্তান অভিযান সম্পর্কে জানার জন্য দেখুন-  আলবিদায়াহ ওয়ান নিহায়াহ, ইবনে কাসীর, ১১/৩৭৯-৩৮৮

[18]. ওয়ালীদ বিন আব্দুল মালিক ৮৬ হিজরীতে তার পিতা আব্দুল মালিকের মৃত্যুর পরে খলীফা নিযুক্ত হন। – আলমুখতাসার ফি আখবারিল বাশার ১/১৩৭

[19]. একটি ভুল ধারণার অপনোদন

একজন হাদীস চর্চাকারীর কোন ধরনের কিতাবের প্রতি গুরুত্ব দেওয়া উচিত অথচ সে কোন ধরনের কিতাবের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে থাকে, এ ব্যাপারে খতীব বাগদাদী রহিমাহুল্লাহ (মৃত্যু ৪৬৩ হি.) এর বক্তব্যের সমর্থনে ইবনে রজব হাম্বলী রহিমাহুল্লাহ ( মৃত্যু ৭৯৫ হি.) বলেন,

وَهَذَا الَّذِيْ ذَكَرَهُ الْخَطِيْبُ حَقٌّ، وَنَجِدُ كَثِيْراً مِمَّنْ يُنْتَسَبُ إِلَى الْحدِيْثِ لَا يَعْتَنِيْ بِالْأُصُوْلِ الصِّحَاحِ كَالْكُتُبِ السِّتَّةِ وَنَحْوِهَا، وَيَعْتَنِيْ بَالْأَجْزَاءِ الْغَرِيْبَةِ وَبِمِثْلِ مُسْنَدِ الْبَزَّارِ وَمَعَاجِمِ الطَّبَرَانِيِّ،  أَوْ أَفْرَادِ الدَّارَقُطْنِيْ، وَهِيَ مَجْمَعُ الْغَرَائِبِ وَالْمَنَاكِيْرِ .

অর্থ: “খতীবে বাগদাদী রহিমাহুল্লাহ যে বিষয়টি উল্লেখ করেছেন তা সত্য। হাদীসের সাথে সম্পৃক্ততা রয়েছে এমন অনেককেই আমরা দেখতে পাই যে, তাঁরা ছয়টি বিশুদ্ধ হাদীস গ্রন্থ ও হাদীসের অন্যান্য মৌলিক (ও প্রসিদ্ধ) গ্রন্থসমূহের প্রতি গুরুত্ব দেন না। বরং তারা বিভিন্ন অপরিচিত (ও অপ্রসিদ্ধ) হাদীসগ্রন্থ, মুসনাদে বায্যার, ত্ববরানীর মু‘জামসমূহ ও দারাকুত্বনীর ‘আফরাদ’ এর মতো কিতাবসমূহের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে থাকেন। অথচ এসকল গ্রন্থ গারাইব (অপরিচিত) ও মুনকার বর্ণনায় পরিপূর্ণ।” -শারহু ইলালিত তিরমিযি, তাহকীক- হাম্মাম সাঈদ ২/৬২৪

মন্তব্য:

অথচ এসকল কিতাব থেকে যথাযথ উসূলের আলোকে যুগে যুগে সকল মুহাদ্দিস ও ফকীহগণ সহীহ হাদীস গ্রহণ করেছেন। সেখানে গারাইব ও মুনকার থাকার কারণে পুরো কিতাবগুলোকে কেউ বাদ দেননি। অনুরূপভাবে নুআইম ইবনে হাম্মাদের ‘কিতাবুল ফিতান’ সম্পর্কেও একই কথা প্রযোজ্য হবে।