উলামা-মাশায়েখ, প্রবন্ধ-নিবন্ধ

সবর ও ইয়াকীন দ্বীনী নেতৃত্বের চাবিকাঠি || উস্তাদ আহমাদ নাবিল হাফিযাহুল্লাহ

সবর ও ইয়াকীন দ্বীনী নেতৃত্বের চাবিকাঠি || উস্তাদ আহমাদ নাবিল হাফিযাহুল্লাহ

পিডিএফ ডাউনলোড করুন
ওয়ার্ড ডাউনলোড করুন 

 

بالصبر واليَقِين تنال الإمامَة في الدّين

সবর ও ইয়াকীন

দ্বীনী নেতৃত্বের চাবিকাঠি

 

উস্তাদ আহমাদ নাবিল হাফিযাহুল্লাহ

 

 

 

 

 

 

 

 

 

 

ভূমিকা

সম্মানিত তাওহীদবাদী ভাই ও বোনেরা! মুহতারাম মাওলানা উস্তাদ আহমাদ নাবিল হাফিযাহুল্লাহ’র বক্ষ্যমাণ “সবর ও ইয়াকীন: দ্বীনী নেতৃত্বের চাবিকাঠি” লেখাটি কতটা গুরুত্বপূর্ণ, আশা করছি আপনারা নাম দেখেই অনুধাবন করতে পেরেছেন। প্রতিজন মুজাহিদ ও ইসলামী নেতৃবৃন্দ ও কর্মীদের জন্য এটিতে রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ দিকনির্দেশনা। লেখক এতে ইসলামী ইমারাহ আফগানিস্তানের মুজাহিদদের বিজয়ের কারণ ও তা থেকে আমাদের শিক্ষা’র বিষয়টি অত্যান্ত সাবলীলভাবে তুলে ধরেছেন। এই লেখাটির উর্দু সংস্করণ ইতিপূর্বে ‘জামাআত কায়িদাতুল জিহাদ উপমহাদেশ শাখা’র অফিসিয়াল উর্দু ম্যাগাজিন ‘নাওয়ায়ে গাযওয়ায়ে হিন্দ’ এর গত আগস্ট-সেপ্টেম্বর ২০২১ ইংরেজি সংখ্যায় “সাবর ওয়া ইয়াকিন সে হাসিল হুতি হায় দ্বীন কি কিয়াদাত” (صبر و یقین سے حاصل ہوتی  ہے دین کی قیادت)   শিরোনামে  প্রকাশিত হয়েছিল। উল্লেখ্য এই সংখ্যাটি ইসলামী ইমারাহ আফগানিস্তানের বিজয় উপলক্ষে ‘ফাতহে ইমারাতে ইসলামী নাম্বার’ নামে বিশেষ সংখ্যা হিসেবে প্রকাশিত হয়েছিল।

অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই লেখাটির বাংলা মূল সংস্করণটি লেখক আমাদের কাছে প্রেরণ করেছেন, যা এখন পুস্তিকা আকারে আপনাদের সম্মুখে বিদ্যমান। আলহামদু লিল্লাহ ছুম্মা আলহামদু লিল্লাহ।

আম-খাস সকল মুসলিম ভাইদের ও বোনদের জন্য এই রিসালাহটি  ইনশাআল্লাহ উপকারী হবে। সম্মানিত পাঠকদের কাছে নিবেদন হল- লেখাটি গভীরভাবে বারবার পড়বেন, এবং নিজের করণীয় সম্পর্কে সচেতন হবেন ইনশা আল্লাহ। আল্লাহ এই রচনাটি কবুল ও মাকবুল করুন! এর ফায়েদা ব্যাপক করুন! আমীন।

 

সম্পাদক

০১ রবিউস সানী, ১৪৪৩ হিজরি

০৭ নভেম্বর, ২০২১ ইংরেজি

 

 

১৪৩০ হিজরির কোন এক দিন। আফগানিস্তানের পর্বতমালার পাদদেশে বসে আছেন সাদা-কালো শ্মশ্রুমণ্ডিত মধ্যবয়স্ক একজন বুজুর্গ ব্যক্তি। মাথায় শোভা পাচ্ছে, আফগানী ধাঁচে বাঁধা বিখ্যাত কাল পাগড়ী। পাশেই পাথরের কোল ঘেঁষে রাখা একে-৪৭। তিনি ক্যামেরার সামনে তৎকালীন অ্যামেরিকান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাকে লক্ষ্য করে কিছু কথা বলছিলেন। খুব শান্ত কণ্ঠে, সাবলীল ভাষায়, সহজ কিছু বাক্য। কিন্তু তাঁর প্রতিটি শব্দ হৃদয়ে নাড়া দিচ্ছিল, গভীর প্রভাব ফেলছিল এবং অন্তরকে ছুঁয়ে যাচ্ছিল।

শাইখ বলছিলেন-

‘হে ওবামা! আমি আফগানিস্তানকে ইতিহাসের এক মোজেযা মনে করি, অথবা বলতে পার, একে আমি এযুগের এক অলৌকিক ঘটনা মনে করি। বর্তমান বিশ্বের দুই পরাশক্তি! (খেয়াল করো) বিশ্বের পরাশক্তি কোন দুই রাষ্ট্র?! রাশিয়া ও অ্যামেরিকা। তারা পরাশক্তি হওয়া সত্ত্বেও আফগান মুজাহিদদের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করতে পারেনি। সুবহানাল্লাহ! কি আশ্চর্য! অথচ এই মুজাহিদরা দুর্বল! তাঁদের উল্লেখযোগ্য কোন সামান নেই।

হে ওবামা! তুমি কী উত্তর দেবে?! অন্য সকল রাষ্ট্র তোমাদের পক্ষ অবলম্বন করেছে। তোমাদের সামনে মাথানত করেছে। তুমি কী বলবে? কেউ যদি তোমাকে বলে, পাঁচশত বছর আগে পৃথিবীর সকল রাষ্ট্র মিলে একটি দরিদ্র, দুর্বল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সংবদ্ধ হয়েছিল। যে দুর্বল রাষ্ট্রের কাছে উল্লেখযোগ্য কোন সমরাস্ত্র ছিল না। এরপরও সকল রাষ্ট্র মিলে এই এক দুর্বল রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করতে পারেনি। বরং দরিদ্রতম রাষ্ট্রটিই সর্বাধিক ধনী ও সুপ্রিম পাওয়ারের অধিকারী দেশগুলোর বিরুদ্ধে জিতে গিয়েছিল।

এই গল্প কেউ যদি তোমাকে শোনায়, তুমি কি তা বিশ্বাস করবে?!

আমি বিশ্বাস করব না, স্পষ্ট করেই বলছি, আমি তা বিশ্বাস করব না এবং বিশ্বাস করা সম্ভব নয়। সবগুলো রাষ্ট্র মিলে এক দুর্বল সহায়-সম্বলহীন রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে জিততে পারেনি, এমন দুর্বল দেশ যাদের কাছে তেমন কোন অস্ত্র নেই। যা আছে, তা সাধারণ কিছুমাত্র। এরপরও সকলে মিলে সেই রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে বিজয় লাভ করতে পারে নি! এমন হতে পারে না!

যেমনটি আমি তোমাকে বললাম, ‘আফগানিস্তান’ ইতিহাসের এক অলৌকিক ঘটনা। এ যুগের এক মোজেযা।’

আমরা এখন যে শাইখের কথা বলছি, এই শাইখ আফগানিস্তানের কেউ ছিলেন না। তিনি ছিলেন আরবের এক বুজুর্গ। কুয়েত থেকে এসেছিলেন। তিনি এই মহান জিহাদে অংশ নেন, ইতিহাসকে বাকরুদ্ধ করা এ ঘটনার তিনি ছিলেন একজন প্রত্যক্ষদর্শী সাক্ষী। তিনি আর কেউ নেন, তিনি আমাদের শাইখ আবু যায়দ আলকুয়েতী রহিমাহুল্লাহ। যাকে পৃথিবীর মানুষ, খালিদ বিন আব্দির রহমান আলহুসাইনান নামে চিনেন। শাইখ আবু ইয়াহয়া লিবী রহিমাহুল্লাহুর শাহাদাতের পর তিনি তানযীমু ক্বায়িদাতিল জিহাদের কেন্দ্রীয় শরিয়াহ বোর্ডের প্রধান হয়ে ছিলেন। এই জিহাদেই যিনি শাহাদাত বরণ করে শহীদগনের বরকতময় জামাতে শামিল হয়েছেন। মহান আল্লাহ তাআলা তাঁর শাহাদাতকে কবুল করুন।

শাইখ রহিমাহুল্লাহ যখন এসব কথা বলছিলেন, তখনও পূর্ণ বিজয় আসেনি। জিহাদ চলমান ছিল। রণক্ষেত্র উত্তপ্ত ছিল। তবে আমাদের সৌভাগ্য, ইতিহাসের এই বিস্ময়কর বিজয় আমরা দেখতে পেলাম। আমরা এর সাক্ষী হলাম। যে চূড়ান্ত বিজয়ের খুশীতে প্রতিটি মুমিনের হৃদয় প্রশান্তি ও তৃপ্তিতে ভরে গেছে।

কিন্তু একটু ভাবুন!  কিভাবে কোন পথ মাড়িয়ে দ্বীনের এই বিজয় এল?! এই বিজয়ের পেছনে কী রহস্য লুকিয়ে আছে?! পৃথিবীর দিগদিগন্তে, প্রান্তে প্রন্তে শত শত বছর হতে কতশত প্রচেষ্টা চলছে। এমন একটি বিজয়ের জন্য উম্মত কত অর্থ, শ্রম, রক্ত বিসর্জন দিয়ে যাচ্ছে! কিন্তু কাঙ্ক্ষিত সে বিজয় আফগান মুজাহিদীন ও তাঁদের মত স্বল্পসংখ্যক কাফেলা ব্যতীত কারো কাছেই ধরা দিচ্ছে না। অধিকাংশ অঞ্চলেই প্রচেষ্টাগুলো ফলপ্রসূ হচ্ছে না, বিজয়ের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না।

আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি যে, এর কারণ কী? এর রহস্য কী?!

মূলত, উম্মতের বিজয়ের ক্ষেত্রে আল্লাহ্‌ তাআলার সুন্নাহ একই, নিয়ম অভিন্ন। আর তা হচ্ছে, আল্লাহ্‌ তাআলা তাঁর উপযুক্ত বান্দাদের বিজয় দান করেন। এটা নতুন কিছু নয়, যুগ হতে যুগান্তরে এটাই ঘটে আসছে, আল্লাহর এই সুন্নাহের মাঝে আপনি কোন পরিবর্তন পাবেন না।

আসুন আল্লাহ্‌ তাআলার কুরআন থেকে একটি বিজয়ের গল্প শোনাই, হাজার-হাজার বছর আগের এক উম্মতের এবং সে উম্মতের দ্বীনের এক বিজয়ের গল্প। জালিমের বিরুদ্ধে মাযলুমের বিজয়ের গল্প আপনাদেরকে শোনাব। কোরআনে বর্ণীত সেই গল্পকে আপনি বর্তমান তালিবানের সাথে, আফগানিস্তানের সাথে মিলিয়ে দেখুন, আপনি এ দুয়ের মাঝে মিল খুঁজে পাবেন।

সময়টি ছিল, আল্লাহর নবী শামুয়িল (স্যামুয়েল) আলাইহিস সালামের নুবুয়্যাতকাল। তিনি আল্লাহর নির্দেশে তালুতকে তাঁর উম্মতের আমীর নিযুক্ত করেন, যাতে তার নেতৃত্বে উম্মত জিহাদ করে। তৎকালে জালুত নামে এক আল্লাহদ্রোহী কাফের অস্বাভাবিক পরাশক্তির মালিক ছিল, যারা নবীর উম্মতের উপর আক্রমণের প্রস্তুতি নিচ্ছিল। তালূত তাঁর মুজাহিদ বাহিনী নিয়ে জালুতের বিরুদ্ধে জিহাদের উদ্দেশ্যে বের হলেন, সে সম্পর্কে কোরআনে এভাবে বর্ণনা এসেছে-

فَلَمَّا فَصَلَ طَالُوتُ بِالْجُنُودِ قَالَ إِنَّ اللَّهَ مُبْتَلِيكُم بِنَهَرٍ فَمَن شَرِبَ مِنْهُ فَلَيْس مِنِّي وَمَن لَّمْ يَطْعَمْهُ فَإِنَّهُ مِنِّي إِلَّا مَنِ اغْتَرَفَ غُرْفَةً بِيَدِهِ ۚ فَشَرِبُوا مِنْهُ إِلَّا قَلِيلًا مِّنْهُمْ ۚ فَلَمَّا جَاوَزَهُ هُوَ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ قَالُوا لَا طَاقَةَ لَنَا الْيَوْمَ بِجَالُوتَ وَجُنُودِهِ ۚ قَالَ الَّذِينَ يَظُنُّونَ أَنَّهُم مُّلَاقُو اللَّهِ كَم مِّن فِئَةٍ قَلِيلَةٍ غَلَبَتْ فِئَةً كَثِيرَةً بِإِذْنِ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ مَعَ الصَّابِرِينَ . وَلَمَّا بَرَزُوا لِجَالُوتَ وَجُنُودِهِ قَالُوا رَبَّنَا أَفْرِغْ عَلَيْنَا صَبْرًا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْمِ الْكَافِرِينَ. فَهَزَمُوهُم بِإِذْن الله وَقَتَلَ دَاوُودُ جَالُوتَ وَآتَاهُ اللَّهُ الْمُلْكَ وَالْحِكْمَةَ وَعَلَّمَهُ مِمَّا يَشَاء…..

“অতঃপর যখন তালূত সৈন্যবাহিনী নিয়ে বের হল, তখন সে বলল, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে একটি নদী দ্বারা পরীক্ষা করবেন। অতএব, যে তা হতে পান করবে, সে আমার দলভুক্ত নয়, আর যে তা পান করবে না, নিশ্চয় সে আমার দলভুক্ত। তবে কেউ যদি নিজ হাতে এক আজলা পরিমাণ পান করে (সমস্যা নেই)। কিন্তু তাদের মধ্য থেকে স্বল্পসংখ্যক ছাড়া বাকি সকলে তা থেকে পান করল। অতঃপর যখন সে ও তার সাথী মুমিনগণ ঐ নদি অতিক্রম করল, তার সাথীরা বলল, ‘আজ আমাদের জালূত ও তার সৈন্যবাহিনীর সাথে লড়াই করার ক্ষমতা নেই’। যারা বিশ্বাস রাখত যে, নিশ্চয় তারা আল্লাহর সাথে মিলিত হবে, তারা বলল, ‘কত ছোট দল আল্লাহর হুকুমে বড় দলকে পরাজিত করেছে’! আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। যখন তারা জালুত ও তার সৈন্যদের সম্মুখীন হল, তখন বলল, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ধৈর্য ধারণের শক্তি দান করুন, আমাদের পদগুলো দৃঢ় করুন এবং কাফির বাহিনীর উপর আমাদেরকে জয়যুক্ত করুন’। অতঃপর তারা আল্লাহর হুকুমে তাদেরকে পরাজিত করল এবং দাঊদ জালূতকে হত্যা করল। আর আল্লাহ দাঊদকে রাজত্ব ও প্রজ্ঞা দান করলেন এবং তাকে যা ইচ্ছা শিক্ষা দিলেন।” (সূরা বাকারাঃ ২৪৯-২৫১)

কোরআনে বর্ণিত এই ঘটনার দিকে গভীরভাবে লক্ষ্য করুন, মহান আল্লাহ্‌ তাআলা মুজাহিদ বাহিনীর সর্বপ্রথম সবরের পরীক্ষা নিয়েছেন। আমীরের আনুগত্যে, সবর ইখতিয়ার করে অবিচল থাকার পরীক্ষা। দীর্ঘ সফরের ক্লান্তিতে পিপাসিত হওয়া সত্ত্বেও, আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয় গ্রহণ না করে ধৈর্য ধারণের পরীক্ষা। যারা হারাম থেকে বেঁচে আমীরের আনুগত্যে সবরের সাথে থাকতে পেরেছেন, তাঁরাই আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্বাচিত হয়েছেন। বাকিরা পথ থেকে সরে গেছে। পানি পান করা সত্ত্বেও শক্তি ও হিম্মত হারিয়ে ফেলেছে। কেননা তারা শরিয়ার উপর অবিচল থাকতে পারেনি।

এই নির্বাচিত ধৈর্যশীল মুজাহিদগণের দ্বিতীয় যে বৈশিষ্ট্য ছিল তা হচ্ছে, আল্লাহর উপর ইয়াকীন ও দৃঢ় বিশ্বাস। এক বিশাল কাফেলা এক সাথে শত্রুর মোকাবেলা করতে বের হয়ে ছিল, যাদের সংখ্যা কোন কোন মুফাসসির আশি হাজার বর্ণনা করেছেন। এর মধ্য থেকে সিংহভাগ পথ থেকেই বিচ্ছিন্ন হয়ে সরে গেছে। অল্প কিছু সংখ্যক বাকি ছিলেন। কোন বর্ণনা অনুসারে মাত্র ৩১৩ জন, কোন বর্ণনায় ৪ হাজার। কি কঠিন পরিস্থিতি খেয়াল করুন।

এমন পরিস্থিতিতে এই মুষ্টিময় মুজাহিদীনের কাফেলা ঘোষণা দিচ্ছেন, ‘কত ছোট ছোট দল আল্লাহর হুকুমে বড় বড় দলকে পরাজিত করেছে’! কতটা দৃঢ় ঈমান হলে এই কঠিন মুহূর্তে এমন ঘোষণা দেয়া যায়। আর তাদের ঘোষণা থেকে অপর একটা বিষয় স্পষ্ট হয়, ছোট দল বড় দলকে পরাজিত করার ইতিহাস সেটাই প্রথম ছিল না, যুগে যুগে এটা ঘটে এসেছে, যখন ঈমানের সাথে সবরের সংমিশ্রণ ঘটেছে। তাঁদের বিশ্বাসী হবার বর্ণনা আল্লাহ্‌ তাআলা নিজেই দিচ্ছেন, ‘যারা বিশ্বাস রাখত যে, নিশ্চয় তারা আল্লাহর সাথে মিলিত হবে…।’ অর্থাৎ তাঁদের পরকালের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস ছিল। তাঁদের এই ভয় ছিল, আল্লাহর সামনে তাঁদের দাঁড়াতে হবে।

তাঁদের তৃতীয় বৈশিষ্ট্য ছিল, জিহাদের ময়দানে তাঁরা আল্লাহর যিকির ও স্মরণে ছিলেন। আল্লাহর কাছে দুয়া করছিলেন, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদেরকে ধৈর্যধারণের শক্তি দান করুন, আমাদের পদগুলো দৃঢ় করুন এবং কাফির বাহিনীর উপর আমাদেরকে জয়যুক্ত করুন।’ তাঁরা আল্লাহ্‌মুখী ছিলেন, তাঁর স্মরণ থেকে গাফেল ছিলেন না।

ফলাফল দাঁড়িয়েছে, তাঁদের মধ্য থেকে একজন অল্প বয়সের যুবক দাউদ, (আলাইহিস সালাম, যিনি তখনও নুবুয়্যাতপ্রাপ্ত হননি) জালূতের মত শক্তিধর সেনাপতিকে সম্মুখযুদ্ধে পরাজিত করে দিয়েছেন, যার ভয়ে সকলে থরথর করে কাঁপত। আর সেই যুবকের অস্ত্র কী ছিল জানেন?! পাথর! শুধু তিনটি পাথর খণ্ড তাঁর অস্ত্র ছিল!

বিজয়ের পথ এটাই, আল্লাহর প্রতি ও পরকালের প্রতি দৃঢ় ঈমান এবং শত সংকটেও সবরের সাথে শরিয়ার উপর অবিচল থাকা। সাথে সাথে আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফেল না হওয়া। পূর্ববর্তী উম্মতসমূহের ব্যাপারে মহান আল্লাহ্‌ তাআলা অপর আয়াতে বলেন-

وَجَعَلْنا مِنهم أئِمَّةً يَهْدُونَ بِأمْرِنا لَمّا صَبَرُوا وكانُوا بِآياتِنا يُوقِنُون.

“আর আমি তাদের মধ্য থেকে অনেককে ইমাম-নেতা বানিয়েছিলাম, যারা আমাদের নির্দেশ অনুসারে পথপ্রদর্শন করত; (ইহা তখন) যখন তারা ধৈর্য ধারণ করেছিল। আর তারা আমার আয়াতসমূহে দৃঢ় বিশ্বাস রাখত।” (সূরা সাজদাহঃ ২৪)

এখানেও আল্লাহ্‌ তাআলা জমিনের নেতৃত্ব দেয়ার দু’টি কারণ উল্লেখ করছেন, আল্লাহর নির্দেশনার প্রতি ইয়াকীন ও দ্বীনের পথে সবর। এই আয়াতের ব্যাখ্যায়, ইমাম ইবনুল কায়্যিম রহিমাহুল্লাহ বলেন-

فبالصبر واليَقِين تنال الإمامَة في الدّين

فَقيل بِالصبرِ عَن الدُّنْيا، وَقيل بِالصبرِ على البلاء، وَقيل بِالصبرِ عَن المناهي والصَّواب أنه بِالصبرِ عَن ذَلِك كُله بِالصبرِ على أداء فَرائض الله والصَّبْر عَن مَحارمه والصَّبْر على أقداره.

“সবর ও ইয়াকীনের মাধ্যমেই অর্জিত হয় দ্বীনের নেতৃত্ব।

সবরের ব্যাখ্যায় কেউ বলেছেন, দুনিয়া গ্রহণ করা থেকে সবর করা, কেউ বলেছেন বিপদের মুহূর্তে সবর করা, কেউ বলেছেন, নিষিদ্ধ বিষয় থেকে সবর করা। কিন্তু সঠিক মত হচ্ছে, এই সব কিছুর ক্ষেত্রেই সবর করা। আল্লাহর ফারায়েজগুলো সবরের সাথে আদায় করা, হারামগুলো থেকে সবরের সাথে বেঁচে থাকা। তাকদীরের উপর সবর করা।”

আমরা ইমারাহতে ইসলামিয়্যার বিজয়ে আনন্দিত, সাথে সাথে আশ্চর্যান্বিত, কিভাবে সম্ভব হল এই বিজয়! অনেকে নিজেদের ব্যাপারে হতাশাগ্রস্থ, নিজেদের কত চেষ্টা ব্যর্থ সাব্যস্ত হচ্ছে, কত পদ্ধতি নিষ্ফল প্রমাণিত হচ্ছে। কিন্তু আমরা কি খুঁজে দেখছি, এই বিজয়ের পেছনে কি নিগূঢ় রহস্য লুকিয়ে রয়েছে? আমরা যদি সেই রহস্য খুঁজে বের করতে পারি, নিজেদের কর্মপদ্ধতি সেই আলোকে সাজাতে পারি, তাহলে এই বিজয় ও বিজয়ের আনন্দ আমাদের জন্য সার্থক হবে, অর্থবহ হবে এবং ফলদায়ক হবে।

এই বিজয়ের পথ সেটাই ছিল, যে পথ পাড়ি দিয়ে বিজয় অর্জন করেছিলেন, তালূত আর তাঁর মুজাহিদ বাহিনী। যে পথে চলার ফলে, যুগেযুগে আল্লাহর নির্বাচিত বান্দাগণ নেতৃত্ব অর্জন করেছিলেন। সে পথ হচ্ছে ঈমান ও ইয়াকীনের পথ, ইবতেলা ও সবরের পথ। আসহাবে তালুত থেকে শুরু করে আসহাবে মুহাম্মাদ পর্যন্ত প্রতিটি কাফেলা এ পথেই বিজয় অর্জন করেছেন। উমরে আউয়াল থেকে উমরে সালেস পর্যন্ত সবাই এ পথেই বিজয় ছিনিয়ে এনেছেন। আমরা তাঁদের বিজয় পড়ে, শুনে ও দেখে গৌরবান্বিত হই, আপ্লুত হই, কিন্তু তাঁদের পথে চলতে নিজেদের প্রস্তুত করি না। তাঁদের মানহাজকে গ্রহণ করতে চাই না। এটাই তাঁদের ও আমাদের মাঝে পার্থক্য তৈরি করে দেয়।

বিশ্ব ইতিহাসের সর্বাধিক শক্তিশালী সামরিক জোটকে পরাজিত করার ঘটনা আমরা দেখলাম। কিন্তু কখনও কি ভেবে দেখেছি, এর পিছনে ছিল- সময়ের, ফেরাউন, নমরুদ ও জালুতের সমন্বিত শক্তির সামনে, পাহাড়সম ঈমানের দৃঢ়তা, রক্তনদীর স্রোতে সাঁতার কেটেও দ্বীনের উপর লৌহকঠিন অবিচলতা। ২০ বছরের অধিক সময় আগুন ও রক্ত নদী পার হয়ে দুপায়ে দাঁড়িয়েছিল একটি ইসলামি ইমারাহ। বিশ্বের মধ্যে একমাত্র পূর্ণ শরিয়া দ্বারা পরিচালিত ইসলামি ভূখণ্ড। সকল মুমিনের আশার প্রদীপ। ২০ বছর বারুদের গন্ধ থেকে মুক্ত হয়ে কিছুটা নির্মল বাতাসে শ্বাস নিচ্ছিল একটা দরিদ্র মুসলিম সম্প্রদায়। আর তখনই যামানার ফেরাউন ঘোষণা দিল, এক মুমিনকে দিয়ে দাও! উসামাকে দিয়ে দাও! না হয় আমরা আসছি, তোমাদেরকে সমূলে উৎখাত করে দেব।

বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদেরকে বলল, হয়ত তোমরা আমাদের সাথে না হয় সন্ত্রাসীদের সাথে। সকলে ফেরাউনের সামনে সেজদায় পড়ে গেল। লাব্বাইক ইয়া ফেরআউন! বলে সবাই ফেরাউনের সামনে হাতজোড় করে দাঁড়িয়ে গেছে এবং বলতে থেকেছে, আমরা হাজির আপনার দরবারে। কী কী লাগবে বলুন?! পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি সবাই ফেরাউনের সামনে সিজদাবনত।  কোন দিকে কোন সাহায্যকারী নেই। মুষ্টিময় মুমিন, সম্বল কিছু একে-৪৭, আর কিছু নেই। ওলামায়ে কেরাম এসে উপস্থিত হলেন। আমীরুল মুমিনীন! একমাত্র দারুল ইসলাম! তাঁকে রক্ষায় একজন মুমিনকে তুলে দেয়া যায় কি না? একজন মুমিনের বিসর্জনে দারুল ইসলাম রক্ষা পাবে। লাখো মুমিনের জীবন বাঁচবে!

আমীরুল মুমিনীন বললেন- কিভাবে সম্ভব আমি একজন মুহাজির, মুজাহিদকে কাফেরদের হাতে তুলে দেব, যিনি আরব থেকে এসেছেন আমাদের দ্বীন রক্ষার জিহাদে?! এটা কখনো সম্ভব নয়!

ঘোষণা দিলেন, শুনুন তাঁর ঐতিহাসিক সেই বাণী-

لقد توعدنا بوش بالهزيمة ووعدنا الله بالنصر وسنرى أي الوعدين أوفى

“বুশ আমাদেরকে প্রতিশ্রুতি (ধমকি) দিয়েছে পরাজয়ের আর আল্লাহ আমাদেরকে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন বিজয়ের, আমরা দেখব কোন প্রতিশ্রুতি পূর্ণ হয়?”

ফেরাউন আক্রমণ করে বসল, ইসলামি ইমারাহর পতন ঘটল, নেমে এলো আবার সেই কঠিন যুদ্ধ ও রক্তের খেলা। সম্ভবত ২০০৮ বা ২০০৯ সালের ঘটনা। পশ্চিমা এক সাংবাদিক, তালিবানের সামরিক প্রধান মোল্লা দাদুল্লাহ রহিমাহুল্লাহুর সাক্ষাৎকার নিচ্ছিলেন,

“সাংবাদিকঃ আপনারা তো এক উসামার জন্য আপনাদের ইমারাহকে বিসর্জন দিলেন। যদি আবার আপনাদের হাতে ইমারাহ আসে এবং আবার কোন একজনের পরিবর্তে ইমারাহকে বিসর্জন দেয়ার বিষয় সামনে আসে, আপনারা কি এই একই ভুল আবারও করবেন?!

মোল্লা দাদুল্লাহঃ যদি আরও একশত বার আমাদের হাতে রাষ্ট্রক্ষমতা আসে, আর একজন মুমিনকে রক্ষায় একশবারই রাষ্ট্র ক্ষমতাকে বিসর্জন দিতে হয়, আমরা একশবার সেই সৌভাগ্য গ্রহণ করব।”

সুবহানাল্লাহ! আপনি কল্পনা করতে পারছেন! কি কঠিন ঈমান?! কি দৃঢ় ইয়াকীন?!

২০০৮ সালে আলজাযিরার বিখ্যাত সাংবাদিক আহমাদ যাইদান, তালিবানের শুরা সদস্য ও আমীরুল মুমিনীনের খাস পরামর্শক মোল্লা হাসান রহমানী হাফিযাহুল্লাহুর এক সাক্ষাৎকার নেন, সেখানে তিনি প্রশ্ন করেন-

“আহমাদ যাইদানঃ উসামাকে অ্যামেরিকার হাতে তুলে না দেয়ার সিদ্ধান্তের কারণে কি আপনাদের অনুশোচনা হয়? আপনারা লজ্জিত?

মোল্লা হাসান রহমানীঃ  আপনারা ভালভাবেই জানেন, তালিবান হচ্ছে আল্লাহর পথের মুজাহিদীনের জামাত, যারা শক্তিশালী ঈমান ও মজবুত আকীদার অধিকারী। আর এ জন্যই তাঁরা জিহাদ করে। তাহলে এটা কিভাবে কল্পনা করা যায় যে, মুজাহিদরা উসামা বিন লাদিনকে শত্রুর হাতে সোপর্দ না করার কারণে অনুশোচিত হবে?! অথচ আমাদের ঈমান ও আকীদার মূলনীতি হচ্ছে, প্রত্যেক মুসলিমকে কুফর ও কুফফার থেকে রক্ষা করা। তাই এটা কল্পনা করাই সম্ভব নয় যে, তাঁকে শত্রুর হাতে না তুলে দেয়ার ফলে কোন অনুশোচনা হবে! তিনি তো আমাদের সম্মান, আমাদের গর্ব। কুফর ও কুফফারদের মোকাবেলায় দাঁড়ানোর ফলে এবং ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে তাঁর অবস্থানের কারণে আমরা তো তাঁকে ইজ্জত করি। আমরা শাইখ উসামা বা অন্য কোন মুসলিমকে কখনই শত্রুর হাতে সোপর্দ করব না। এটা কোন অবস্থাতেই ঘটবে না, ঘটতে পারে না।”

এই হচ্ছে তাঁদের ঈমান। দ্বীনের পথে তাঁদের দৃঢ়তা ও অবিচলতা। শরিয়ার সামনে নিজেদেরকে সোপর্দ করে দেয়ার নমুনা।

কী পরমাণ কোরবানি তাঁদের করতে হয়েছে? কী পরমাণ সবর তাঁদেরকে করতে হয়েছে?! এর একটা নমুনা দেখুন, উপরে উল্লেখিত আলোচনায় সেই ১৪৩০ হিজরিতে শাইখ খালিদ আল-হুসাইনান বলছেন-

أنا ذهبت إلى كابل وتجولت في كابل , بس فقط في كابل تصور يا أوباما 40 ألف أرملة!

“আমি কাবুলে গিয়েছিলাম, কাবুল ঘুরেফিরে দেখেছি, ওবামা! কল্পনা কর! শুধু কাবুলেই ৪০ হাজার বিধবা আছে।”

এটা হচ্ছে এখন থেকে ১২ বছর আগে কাবুলের হিসাব! তখনই সেখানে ৪০ হাজার এমন বিধবা মা-বোন ছিল যাদের স্বামী নিহত হয়েছেন, আর তাঁদের কোথাও বিয়ের ব্যবস্থাও হয় নি। আমরা কল্পনা করতে পারি?!

আজ আমরা বিজয় দেখছি, অত্যাধুনিক সমরাস্ত্র দেখছি, উন্নতমানের হাজার-হাজার গাড়ি দেখছি। দেখছি আধুনিক সব যুদ্ধবিমান ও হেলিকপ্টার। কিন্তু সেগুলো অর্জন করতে কোন পথ পাড়ি দিতে হয়েছে?! কেমন পর্বগুলো পার করতে হয়েছে?! শাইখ খালিদ আলহুসাইনান বলেন-

أنا عاشرت المجاهدين من حركة طالبان و جلست مع الأمراء والقادة، والله ما عندهم شيء، ليس عندهم شيء يا أوباما! والله إن بعضهم أحذيتهم والله مقطعة مخيطة، الأسلحة قديمة.

“আমি তালিবান মুজাহিদিনের সাথে চলাফেরা করেছি। আমি উমারা ও নেতৃবর্গের সাথে উঠাবসা করেছি, তাঁদের কাছে কিছুই নেই, একবারে কিছুই নেই, ওবামা!। ওয়াল্লহি! তাঁদের অনেকের জুতা ফাটা, তালিযুক্ত। পুরাতন কিছু অস্ত্র ……।”

তাঁদের সবরের ব্যাপারে বলেন-

الشعب الأفغاني يُضرب فيه المثل في الصبر

“আফগান জাতি তো হচ্ছে, ধৈর্য্যের প্রবাদপুরুষ”

বিজয় এভাবেই আসে। ঈমান, ইবতেলা ও সবরের পথ মাড়িয়েই দ্বীনের নেতৃত্ব অর্জন করতে হয়। মহান আল্লাহ্ তাআলা ইব্রাহিম আলাইহিস সালামের ব্যাপারে বলেন-

وَإِذِ ابْتَلَى إِبْرَاهِيمَ رَبُّهُ بِكَلِمَاتٍ فَأَتَمَّهُنَّ قَالَ إِنِّي جَاعِلُكَ لِلنَّاسِ إِمَامًا قَالَ وَمِنْ ذُرِّيَّتِي قَالَ لَا يَنَالُ عَهْدِي الظَّالِمِينَ

“এবং (স্মরণ করুন সে সময়কে) যখন ইবরাহীমকে তাঁর রব কয়েকটি বিষয় দ্বারা পরীক্ষা করলেন, আর ইবরাহীম তা পূর্ণ করল। আল্লাহ্ তাআলা বললেন, আমি তোমাকে মানুষের ইমাম/নেতা বানাব। ইবরাহীম বলল, আর আমার সন্তানদের মধ্য হতে? আল্লাহ্ তাআলা বললেন, আমার প্রতিশ্রুতি জালিমদের জন্য প্রযোজ্য নয়।” (সুরা বাকারাঃ ১২৪)

দেখুন- মহান আল্লাহ্ তাআলা ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে মানবজাতির নেতা ও পথপ্রদর্শক বানানোর আগে অনেকগুলো পরীক্ষায় ফেলেছেন, ইবরাহীম আলাইহিস সালাম সেই পরীক্ষাসমূহে উত্তীর্ণ হবার পরেই তাঁকে জাতীর ইমাম বানিয়েছেন। নিজ সন্তানদের দ্বীনের নেতৃত্বের ব্যাপারে জিজ্ঞেস করলে আল্লাহ্ তাআলা স্পষ্ট জানিয়ে দিয়েছেন, তাঁরা অবাধ্য জালিম হলে এই প্রতিশ্রুতির অন্তর্ভুক্ত তারা হবে না।

আল্লাহ্ তাআলা পূর্ববর্তী নবী ও আল্লাহ্ ওয়ালাদের অবস্থা বর্ণনা করে বলেন-

وكأين مِّن نَّبِيٍّ قَاتَلَ مَعَهُ رِبِّيُّونَ كَثِيرٌ فَمَا وَهَنُوا لِمَا أَصَابَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَا ضَعُفُوا وَمَا اسْتَكَانُوا ۗ وَاللَّهُ يُحِبُّ الصَّابِرينَ – وَمَا كَانَ قَوْلَهُمْ إِلَّا أَن قَالُوا رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا ذُنُوبَنَا وَإِسْرَافَنَا فِي أَمْرِنَا وَثَبِّتْ أَقْدَامَنَا وَانصُرْنَا عَلَى الْقَوْم الكافرين –

“আর কত নবী ছিল, যার সাথে থেকে অনেক আল্লাহওয়ালা লড়াই করেছে। তবে আল্লাহর পথে তাদের উপর যা আপতিত হয়েছে তার জন্য তারা হতোদ্যম হয়নি, দুর্বল হয়নি এবং নত হয়নি। আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদেরকে ভালবাসেন। তাদের মুখ হতে কেবল এ কথাই বেরিয়েছিল- ‘হে আমাদের রব! আমাদের অপরাধগুলো এবং আমাদের কাজ-কর্মে বাড়াবাড়িগুলোকে  ক্ষমা করে দিন, আমাদেরকে দৃঢ়পদ রাখুন এবং কাফির দলের উপর আমাদেরকে সাহায্য করুন।” (সুরা আলে ইমরানঃ ১৪৬-১৪৭)

পূর্ববর্তী নবী ও আল্লাহ্‌ ওয়ালাগণ দ্বীনের পথে শতবাঁধার মুখে অবিচল থেকে কিতাল করেছেন। সবরের মাধ্যমে আল্লাহর ভালোবাসা অর্জন করেছেন। দোয়ার মাধ্যমে আল্লাহর রহমতের নিকটবর্তী হয়েছেন। আর এভাবেই তাঁরা বিজয় অর্জন করেছেন। বর্তমান তালিবানের দিকে তাকালে আপনি সেই নমুনাই দেখতে পাবেন। এই অস্ত্র ব্যবহার করেই তাঁরা এ ঐতিহাসিক বিজয় অর্জন করেছেন। পৃথিবীর প্রান্তে প্রান্তে দ্বীন কায়েমের জন্য উম্মতের যত ধরনের চেষ্টা প্রচেষ্টা চলছে তার উৎকৃষ্ট নমুনা এটাই। যদি এখনও উম্মতের কিছু মানুষ দৃঢ় প্রত্যয় নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। দ্বীনের পথে সামান্য ছাড় না দেয়ার মানসিকতায় অবিচল থাকে। সবরের সাথে এই সমুদ্র পাড়ি দিতে পারে। নিজেকে সব সময় আল্লাহর নিকট সোপর্দ করে রাখে, তাহলে তাঁদের উপরও সেই আসমানী সাহায্য অবতীর্ণ হবে যা হয়েছিল হাজারো বছর পূর্বে তালুতের দুর্বল সৈন্যবাহিনীর উপর, এমনিভাবে যে নুসরত হল আমাদের চোখের সামনে ভুখানাঙ্গা তালিবান মুজাহিদিনের উপর। পৃথিবীর এমন কোন পরাশক্তির শক্তি নেই তাঁদের দমিয়ে রাখবে। আল্লাহ্‌ যাদের সহায় তাঁদের রুখবে, এমন সাধ্য কার!