হক্কানি

উলামায়ে হক্কানি ও উলামায়ে সূ : পরিচিতি ও প্রকৃতি পর্ব- ৪

উলামায়ে হক্কানি ও উলামায়ে সূ : পরিচিতি ও  প্রকৃতি পর্ব- ৪ -মাওলানা আবদুল্লাহ রাশেদ (হাফিযাহুল্লাহ)

উলামায়ে হক্কানি ও উলামায়ে সূ : পরিচিতি ও  প্রকৃতি

পর্ব-

মাওলানা আবদুল্লাহ রাশেদ (হাফিযাহুল্লাহ)

 

  • উলামায়ে হক্বানি-রব্বানি : পরিচিতি ও প্রকৃতি

আলহামদুলিল্লাহ, এতক্ষণ আমরা উলামায়ে সূ-র পরিচিতি ও প্রকৃতি নিয়ে আলোচনা করেছি। উলামায়ে হক্কানি এর বিপরীত, যাঁদের মধ্যে উলামায়ে সূ-য়ের মন্দ সিফাতগুলো নেই। আরো একটু স্পষ্ট করার জন্য এখন আমরা ইনশাআল্লাহ উলামায়ে হক্কানি রাব্বানির মৌলিক কিছু সিফাত তুলে ধরব।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

إن العلماء هم ورثة الأنبياء، إن الأنبياء لم يورثوا دينارا ولا درهما، إنما ورثوا العلم -سنن ابن ماجه، رقم: 223؛ ط. الرسالة، ت: شعيب الأرنؤوط، -سنن ابي داود، رقم: 3641؛ ط. دار الرسالة العالمية، ت: شعَيب الأرنؤوط – محَمَّد كامِل قره بللي، قال الشيخ الأرنؤوط رحمه الله تعالى: حسن بشواهد. اهـ

“উলামারা ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া (তথা আম্বিয়ায়ে কেরামের উত্তরাধিকারী)। আর আম্বিয়ায়ে কেরাম কোনো দিরহাম-দিনার রেখে যাননি। রেখে গেছেন ইলম।” –সুনানে ইবনে মাজাহ : ২২৩, সুনানে আবু দাউদ : ৩৬৪১

অতএব, উলামাগণ আম্বিয়ায়ে কেরামের ইলমে অহির ওয়ারিস। হাফেয ইবনে হাজার রহ. (৮৫২হি.) বলেন,

الوارث قائم مقام الموروث فله حكمه فيما قام مقامه فيه -فتح الباري ج: 1، ص: 160؛ ط. دار المعرفة – بيروت

“যিনি মিরাস রেখে গেছেন উত্তরাধিকারী ব্যক্তি তার স্থলাভিষিক্ত হয়ে থাকেন। তিনি যে বিষয়ে তার স্থলাভিষিক্ত হয়েছেন সে বিষয়ে তার হুকুম তা-ই যে হুকুম মূল ব্যক্তির ছিল।” –ফাতহুল বারি : ১/১৬০

অতএব, অহিয়ে ইলাহির মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা আম্বিয়া কেরামের কাছে যে দ্বীন ও দ্বীনের ইলম নাযিল করেছেন, সে দ্বীন ও ইলমে আম্বিয়া কেরামের যে দায়িত্ব ছিল, উলামায়ে কেরামের সে একই দায়িত্ব। এক কথায় বলতে গেলে সে দায়িত্ব হলো, তাবলিগে দ্বীন তথা মাখলুকের কাছে দ্বীন পৌঁছে দেয়া। আল্লাহ তাআলা এ উদ্দেশ্যেই নবী রসূল প্রেরণ করেছেন। আল্লাহ তাআলা তার রসূলকে আদেশ দিচ্ছেন,

يَاأَيُّهَا الرَّسُولُ بَلِّغْ مَا أُنْزِلَ إِلَيْكَ مِنْ رَبِّكَ –المائدة 67

“হে রসূল! আপনার রবের পক্ষ থেকে আপনার কাছে যা নাযিল করা হয়েছে, আপনি তা (মানুষের কাছে) পৌঁছে দিন।” –সূরা মায়েদা (৫) : ৬৭

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. (৭২৮হি.) বলেন,

وجعل فيهم علماءهم ورثة الأنبياء يقومون مقامهم في تبليغ ما أنزل من الكتاب –مجموع الفتاوى، ج: 1، ص: 3، ط. مجمع الملك فهد

“আল্লাহ তাআলা উম্মাহর উলামাগণকে আম্বিয়ায়ে কেরামের উত্তরাধিকারী বানিয়েছেন। যে কিতাব তিনি নাযিল করেছেন তা পৌঁছে দেয়ার ক্ষেত্রে তাঁরা আম্বিয়ায়ে কেরামের স্থলাভিষিক্ত।” –মাজমুউল ফাতাওয়া : ১/৩

অন্যত্র আরেকটু ব্যাখ্যা করে বলেন,

ومن المستقر في أذهان المسلمين: أن ورثة الرسل وخلفاء الأنبياء هم الذين قاموا بالدين علما وعملا ودعوة إلى الله والرسول فهؤلاء أتباع الرسول حقا وهم بمنزلة الطائفة الطيبة من الأرض التي زكت فقبلت الماء فأنبتت الكلأ والعشب الكثير فزكت في نفسها وزكى الناس بها. وهؤلاء هم الذين جمعوا بين البصيرة في الدين والقوة على الدعوة ولذلك كانوا ورثة الأنبياء لذين قال الله تعالى فيهم: وَاذْكُرْ عِبَادَنَا إِبْرَاهِيمَ وَإِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ أُولِي الْأَيْدِي وَالْأَبْصَارِ (ص 45) فالأيدي القوة في أمر الله والأبصار البصائر في دين الله فبالبصائر يدرك الحق ويعرف وبالقوة يتمكن من تبليغه وتنفيذه والدعوة إليه. –مجموع الفتاوى، ج: 4، ص: 92، ط. مجمع الملك فهد

“সকল মুসলমানের ভাল করেই জানা যে, রসূলগণের উত্তরাধিকারী এবং আম্বিয়ায়ে কেরামের খলিফা তাঁরাই যারা ইলম, আমল এবং দাওয়াহ ইলাল্লাহর মাধ্যমে দ্বীন সংরক্ষণর দায়িত্ব পালন করেছেন। এরাই রসূলগণের প্রকৃত অনুসারী। তাঁরা ওই পবিত্র উর্বর ভূমির মতো যা (বৃষ্টির) পানি ধারণ করে প্রচুর ঘাস-লতা জন্মিয়েছে। নিজেও উপকৃত হয়েছে অন্যকেও উপকৃত করেছে। এরাই তাঁরা, যাদের মধ্যে ‘দ্বীনের বাসিরাত এবং জোরদারভাবে দ্বীনের দাওয়াত’: উভয়ের সমন্বয় ঘটেছে। এ কারণেই তাঁরা ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া, যে আম্বিয়াদের ব্যাপারে আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘স্মরণ করুন আমার বান্দা ইবরাহীম, ইসহাক ও ইয়াকুবকে। যারা ছিলেন শক্তি এবং বাসিরাতের অধিকারী’। (সূরা সোয়াদ (৩৮) : ৪৫) শক্তি দ্বারা আল্লাহর নির্দেশ বাস্তবায়নের শক্তি এবং বাসিরাত দ্বারা আল্লাহর দ্বীনের বিষয়ে সমঝ ও অন্তর্দৃষ্টি উদ্দেশ্য। বাসিরাতের দ্বারা হক জানা ও বুঝা যায় আর শক্তির দ্বারা হকের তাবলিগ, বাস্তবায়ন ও হকের দাওয়াত দেয়া সম্ভব হয়।” –মাজমুউল ফাতাওয়া : ৪/৯২

ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. এখানে উলামায়ে হক্কানির তিনটি বৈশিষ্ট্য তুলে ধরেছেন,

১. দ্বীনের বাসিরাত।

২. ইলম অনুযায়ী আমল।

৩. নির্ভীক এবং আপোষহীনতার সাথে দ্বীন বাস্তবায়ন ও দ্বীনের দাওয়াত।

 

উপরোক্ত ভূমিকার পর আমরা উলামায়ে হক্বানি-রাব্বানির মৌলিক কিছু গুণ উল্লেখ করতে পারি:

  • ইখলাস

ইখলাস এ পথের প্রথম শর্ত। সকল নবী-রাসূলের ঘোষণা একটাই ছিল,

وَمَا أَسْأَلُكُمْ عَلَيْهِ مِنْ أَجْرٍ إِنْ أَجْرِيَ إِلَّا عَلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ –الشعراء 109

“এর বদৌলতে আমি তোমাদের নিকট কোনো বিনিময় চাই না। আমার প্রতিদান তো কেবল রাব্বুল আলামিনের কাছে।” –সূরা শুআরা (২৬) : ১০৯

উলামায়ে রাব্বানির পরিচয় দিতে গিয়ে হাফেয ইবনে হাজার রহ. (৮৫২হি.) বলেন,

وقال الأصمعي والإسماعيلي الرباني نسبة إلى الرب أي الذي يقصد ما أمره الرب بقصده من العلم والعمل -فتح الباري ج: 1، ص: 161؛ ط. دار المعرفة – بيروت

“আসমায়ি রহ. এবং ইসমাঈলি রহ. বলেন, রাব্বানি শব্দটি রবের দিকে সম্বন্ধিত। অর্থাৎ ইলম ও আমলের দ্বারা যার উদ্দেশ্য, রবের আদেশ পালন করা।” –ফাতহুল বারি : ১/১৬১

পক্ষান্তরে, দুনিয়াবি স্বার্থ যার উদ্দেশ্য থাকবে, আল্লাহ তাআলা তাকে অধোমুখে জাহান্নামে নিক্ষেপ করবেন- যেমনটা সহীহ মুসলিমের হাদিসে বর্ণিত হয়েছে। জান্নাতের ঘ্রাণও সে পাবে না- যেমনটা আবু দাউদের হাদিসে বর্ণিত  হয়েছে।

  • বাসিরাত ফিদ্ দ্বীন

আল্লাহ তাআলা আম্বিয়ায়ে কেরামের একটি গুণ উল্লেখ করেছেন, أُولِي الْأَبْصَارِ অর্থাৎ তারা দ্বীনের ব্যাপারে শরহে সদরের অধিকারী। দ্বীনের ব্যাপারে তাঁদের কোনো সন্দেহ সংশয় নেই। পরিপূর্ণ বুঝে-শুনে তাঁরা দ্বীন মানেন। মনে-প্রাণে দিল দেমাগে দ্বীনের সঞ্জীবনী শক্তি। কোনো ধোঁকাবাজ তাদের ধোঁকায় ফেলতে পারে না। জাহিরি চোখ দিয়ে যেমন বাহ্যিক বস্তু দেখা যায়, তাঁরা তেমনি রূহানি দৃষ্টিশক্তির অধিকারী, যার দ্বারা হক-বাতিল পরিষ্কার বুঝতে পারেন। ওরাসাতুল আম্বিয়ারও একই সিফাত। আল্লাহ তাআলা তাঁর রসূলকে বলেন,

قُلْ هَذِهِ سَبِيلِي أَدْعُو إِلَى اللَّهِ عَلَى بَصِيرَةٍ أَنَا وَمَنِ اتَّبَعَنِي –

“হে রসূল! আপনি বলে দিন, এ-ই আমার পথ। আমিও পরিপূর্ণ উপলব্ধির সাথে আল্লাহর দিকে ডাকি এবং যারা আমার অনুসরণ করে তারাও।” –সূরা ইউসুফ (১২) : ১০৮

  • আলেমে বা-আমল

ইলম অনুযায়ী আমল করেন। আহলে কিতাবের গাধাদের মতো না, যারা শুধু জানেই, আমল করে না। আল্লাহ তাআলা বলেন,

{إِنَّمَا يَخْشَى اللَّهَ مِنْ عِبَادِهِ الْعُلَمَاءُ} [فاطر: 28]

‘আল্লাহকে তো তাঁর বান্দাদের মধ্যে (যথাযথ) ভয় তারাই করে, যাঁরা ইলমের অধিকারী।’ –সূরা ফাতির (৩৫) : ২৮

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

أما والله إني لأخشاكم لله وأتقاكم له -صحيح البخاري، رقم: 4776؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا

“শোনো, তোমাদের মধ্যে আমিই সবচেয়ে বেশি আল্লাহভীরু এবং সবচেয়ে বড় মুত্তাকি।” –সহীহ বুখারি : ৪৭৭৬

ওয়ারাসাতুল আম্বিয়াগণও এমনই। তাঁদের ইলম যত বেশি হয় আমলও তত বেশি হয়। হাসান বসরি রহ. বলেন,

الذي يفوق الناس في العلم جدير أن يفوقهم في العمل -جامع بيان العلم وفضله- ابن عبد البر، ج: 1، ص: 705، رقم: 1270؛ ط. دار ابن الجوزي

“ইলমে যে এগিয়ে আমলেও তার এগিয়ে থাকা উচিৎ।” –জামিউ বয়ানিল ইলম : ১/৭০৫, আসার নং : ১২৭০

আরো বলেন,

العالم الذي وافق علمه عمله ومن خالف علمه عمله فذلك راوية أحاديث سمع شيئا فقاله -جامع بيان العلم وفضله- ابن عبد البر، ج: 1، ص: 698، رقم: 1241؛ ط. دار ابن الجوزي

“আলেম তো সে, যার ইলমের সাথে আমল আছে। ইলমের সাথে যার আমল নেই সে তো কিছু হাদিসের বর্ণনাকারী মাত্র। কিছু একটা শুনেছে, শুনে শুনে বলেছে।” -জামিউ বয়ানিল ইলম : ১/৬৯৮, আসার নং : ১২৪১

 

তাঁরা এমন নন যে, অন্যকে আমলের কথা বলেন আর নিজে এর উল্টো করেন। বরং তাঁদের আদর্শ তা-ই যা হযরত শুআইব আলাইহিস সালামের ছিল,

وَمَا أُرِيدُ أَنْ أُخَالِفَكُمْ إِلَى مَا أَنْهَاكُمْ عَنْهُ إِنْ أُرِيدُ إِلَّا الْإِصْلَاحَ مَا اسْتَطَعْتُ –

“আর আমি এটা চাই না যে, আমি তোমাদের যে কাজ করতে নিষেধ করি তোমাদের পশ্চাতে আমি নিজে সে কাজে লিপ্ত হই। আমি তো আমার সাধ্যমতো কেবল ইসলাহ করতে চাই।” –সূরা হুদ (১১) : ৮৮

 

  • ইলম ছাড়া কথা বলেন না

যা বলেন বুঝে শুনে বলেন। যে বিষয়ে ইলম নেই সে বিষয়ে কথা বলেন না। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ –

“আর যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই তার পিছে তুমি পড়ো না।” –সূরা ইসরা (১৭) : ৩৬

আরও ইরশাদ করেন,

أَلَمْ يُؤْخَذْ عَلَيْهِمْ مِيثَاقُ الْكِتَابِ أَنْ لَا يَقُولُوا عَلَى اللَّهِ إِلَّا الْحَقَّ (169) الأعراف

“ওদের থেকে কি কিতাবে এ অঙ্গীকার নেয়া হয়নি যে, আল্লাহর উপর সত্য ছাড়া মিথ্যা কিছু আরোপ করবে না?”

–সূরা আ’রাফ (৭) : ১৬৯

আরও ইরশাদ করেন,

قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ (33) الأعراف

“আপনি বলুন, আমার রব তো হারাম করেছেন শুধু অশ্লীল বিষয়াদি: তার মধ্যে যা প্রকাশ্য তাও, যা গোপন তাও। আর হারাম করেছেন পাপ, অন্যায় বাড়াবাড়ি এবং এবিষয় যে, তোমরা আল্লাহর সাথে এমন জিনিস শরীক করবে যার কোনো প্রমাণ আল্লাহ তাআলা নাযিল করেননি এবং এবিষয় যে, তোমরা আল্লাহর উপর এমন কথা আরোপ করবে যা তোমরা জাননা ।” –সূরা আ’রাফ (৭) : ৩৩

আরও ইরশাদ করেন,

وَلَا تَقُولُوا لِمَا تَصِفُ أَلْسِنَتُكُمُ الْكَذِبَ هَذَا حَلَالٌ وَهَذَا حَرَامٌ لِتَفْتَرُوا عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ إِنَّ الَّذِينَ يَفْتَرُونَ عَلَى اللَّهِ الْكَذِبَ لَا يُفْلِحُونَ –النحل 116

“তোমরা আল্লাহর উপর মিথ্যারোপ করে তোমাদের যবান দ্বারা বানানো মিথ্যার উপর নির্ভর করে বলো না যে, এটা হালাল এবং এটা হারাম। নিশ্চয়ই যারা আল্লাহর উপর মিথ্যা রটায়, তারা সফল হবে না।” –সূরা নাহল (১৬) : ১১৬

হাদিসে এসেছে,

القضاة ثلاثة: واحد في الجنة، واثنان في النار، فأما الذي في الجنة فرجل عرف الحق فقضى به، ورجل عرف الحق فجار في الحكم، فهو في النار، ورجل قضى للناس على جهل، فهو في النار -سنن ابي داود، رقم: 3573؛ ط. دار الرسالة العالمية، ت: شعَيب الأرنؤوط – محَمَّد كامِل قره بللي، الناشر: دار الرسالة العالمية

“কাযি তিন শ্রেণীর; এক শ্রেণী জান্নাতী, দুই শ্রেণী জাহান্নামী। জান্নাতী হলো সে, যে হক (সত্য ও ন্যয়) জেনেছে এবং সে অনুযায়ী ফয়াসালা দিয়েছে। আর যে ব্যক্তি হক জেনেছে কিন্তু না-হক (অন্যায়) ফায়সালা দিয়েছে সে জাহান্নামী। আরেক ব্যক্তি যে অজ্ঞতা নিয়েই ফয়াসালা দিয়ে দিয়েছে সেও জাহান্নামী।” –সুনানে আবু দাউদ : ৩৫৭৩

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

أيها الناس من علم منكم شيئا فليقل، ومن لم يعلم فليقل لما لا يعلم: الله أعلم؛ فإن من علم المرء أن يقول لما لا يعلم: الله أعلم -جامع بيان العلم وفضله- ابن عبد البر، ج: 2، ص: 831، رقم: 1556؛ ط. دار ابن الجوزي

“হে লোকসকল! যার কিছু জানা আছে সে তা বলবে। আর যার জানা নেই, সে যেন তার অজানা বিষয়ে বলে, ‘আল্লাহু আ’লাম’ তথা ‘আল্লাহই ভাল জানেন’। কেননা, কোনো ব্যক্তি ইলমওয়ালা হওয়ার এটিও একটি প্রমাণ যে, সে তার অজানা বিষয়ে বলবে, আল্লাহু আ’লাম।” –জামিউ বয়ানিল ইলম : ২/৮৩১, আসার নং : ১৫৫৬

 

  • নির্ভীক ও আপোষহীন দাঈ, হকের পথে অটল

আল্লাহর দ্বীন বাস্তবায়ন এবং দ্বীনের তাবলিগ সকল নবীর মিশন এবং একমাত্র মিশন। নবী রসূলদের পর ওরাসাতালু আম্বিয়ার এ দায়িত্ব। তাঁরা শুধু ব্যক্তিগত আমল নিয়েই ক্ষান্ত থাকেন না, নবী রসূলদের রেখে যাওয়া এ আমানত আদায় করেন। এ দায়িত্ব পালনে তাঁরা কোনরূপ শিথিলতা করেন না। আল্লাহ তাআলা আম্বিয়ায়ে কেরামের একটি সিফাত বলেছেন, أُولِي الْأَيْدِي অর্থাৎ দ্বীনের বিষয়ে কঠোর, হিম্মতের অধিকারী এবং আপোষহীন। কোনো কিছুই তাঁদেরকে রুখতে পারে না। যেমন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, “আমার এক হাতে চন্দ্র আরেক হাতে সূর্য এনে দিলেও এ পথ থেকে বিরত হব না”।

  • দ্বীনের কোনো কিছু গোপন করেন না বা অপব্যাখ্যা করেন না

মাখলুখের কাছে ঠিক ঠিকভাবে দ্বীন পৌঁছে দেয়ার যে অঙ্গীকার আল্লাহ তাআলা আহলে ইলম থেকে নিয়েছেন তাঁরা তা শতভাগ পালন করেন। আহলে কিতাব ও উলামায়ে সূ-দের মতো দুনিয়াবি স্বার্থে দ্বীনের কোনও কিছু গোপন করেন না বা দ্বীনের অপব্যাখ্যা করেন না।

  • সত্য উচ্চারণে নির্ভীক

আল্লাহ তাআলা আদেশ দিচ্ছেন,

فَاصْدَعْ بِمَا تُؤْمَرُ

“তোমাকে যে বিষয়ে আদেশ দেয়া হয় তুমি তা প্রকাশ্যে শুনিয়ে দাও।” –সূরা হিজর (১৫) : ৯৪

এ দায়িত্ব পালনে তাঁরা কোনও পরোয়া করেন না। যেমন পরোয়া করতেন না আম্বিয়ায়ে কেরাম। আল্লাহ তাআলা নবী রসূলদের এ গুণ প্রসঙ্গে বলেন,

الَّذِينَ يُبَلِّغُونَ رِسَالَاتِ اللَّهِ وَيَخْشَوْنَهُ وَلَا يَخْشَوْنَ أَحَدًا إِلَّا اللَّهَ –الأحزاب 39

“যাঁরা আল্লাহর পয়গামসমূহ মানুষদের কাছে পৌঁছে দেন এবং তাঁকেই ভয় করেন; আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করেন না।” সূরা আহযাব (৩৩) : ৩৯

  • ফিতনা ও বাতিলের মোকাবেলায় সোচ্চার

যখনই কোনো নতুন ফিতনা মাথাচাড়া দেয়, উলামায়ে হক্কানি কোমর বেঁধে নামেন। উলামায়ে হক্কানির এটি চিরন্তন বৈশিষ্ট্য। রাওয়াফেজ, খাওয়ারেজ, মু’তাজিলা, বাতিনি- যত ফিতনা যখনই উঠেছে উলামায়ে হক তা প্রতিহত করেছেন। অকাট্য দলীল প্রমাণ দ্বারা খণ্ডন করেছেন। হক বাতিল পরিষ্কার করে দিয়েছেন। যেমনটি হাদিসে এসেছে,

يحمل هذا العلم من كل خلف عدوله ينفون عنه تحريف الغالين وانتحال المبطلين وتأويل الجاهلين –شرح مشكل الآثار للطحاوى، رقم: 3884، تحقيق: شعيب الأرنؤوط، الناشر: مؤسسة الرسالة

“প্রত্যেক পরবর্তী প্রজন্মের আদেল ও ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিবর্গই এই ইলমের ধারক-বাহক হবেন; যারা সীমালঙ্ঘনকারীদের বিকৃতি, বাতিল লোকদের মিথ্যারোপ এবং মূর্খদের অপব্যাখ্যা থেকে এই ইলমকে রক্ষা করবেন।”

-শরহু মুশকিলিল আসার লিত-ত্বহাবি : ৩২৬৯

এই শ্রেণীর উলামায়ে হক কেয়মাত পর্যন্তই থেকে যাবে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সে সুসংবাদ দিয়ে গেছেন,

لا تزال طائفة من أمتى قائمة بأمر الله لا يضرهم من خذلهم أو خالفهم حتى يأتى أمر الله وهم ظاهرون على الناس-صحيح مسلم، رقم: 5064؛ ط. دار الجيل بيروت + دار الأفاق الجديدة ـ بيروت

“আমার উম্মতের একটি দল সব সময় আল্লাহর দ্বীনের দায়িত্ব পালন করেই যাবে। যারা তাদের সাহায্য না করবে বা বিরোধিতা করবে তারা তাঁদের কোনও ক্ষতি করতে পারবে না। আল্লাহ তাআলার ফায়সালা উপস্থিত হওয়া পর্যন্ত (তথা কেয়ামতের পূর্ব পর্যন্ত) তাঁরা লোকদের উপর বিজয়ীই থেকে যাবে।” –সহীহ মুসলিম : ৫০৬৪

রাওয়াফেজ ও খাওরেজদের উৎপত্তির সাথে সাথে সাহাবায়ে কেরামসহ আইম্মায়ে দ্বীন তাদের বিভ্রান্তি উম্মাহর সামনে স্পষ্ট করে দেন। মু’তাজিলা ফিরকা যখন ক্ষমতা পেয়ে যায় এবং খালকে কুরআনের ফিতনা দেখা দেয় তখন ইমাম আহমদ বিন হাম্বল রহ. এর মতো উলামায়ে হক অটল অবিচলতার সাথে সেই ফিতনার মোকাবেলা করেন। বাতিনিদের খণ্ডনে উলামায়ে মাগরিবের ভূমিকা ছিল অবিস্মরণীয়। এ জন্য তাঁরা যে কী পরিমাণ জুলুম নির্যাতনের শিকার হন তার কোনো সীমা-পরিসীমা নেই। শিরক ও বিদআত খণ্ডনে ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. ও মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল ওয়াহহাব নজদি রহ. এর ভূমিকা সকলেরই জানা। হিন্দুস্তানে খৃস্টান মিশনারি তৎপরতা শুরু হলে আমাদের আকাবিরগণ জীবন বাজি রেখে সেই ফিতনার মোকাবেলা করেন। এ কারণে তাঁদেরকে সীমাহীন কষ্ট সহ্য করতে হয়, জেল-জুলুমের শিকার হতে হয়। পক্ষান্তরে, বেরেলবি ও নামধারী আহলে হাদিসরা তখন ইংরেজদের ছত্রছায়ায় আয়েশি জীবন যাপন করেছে। বর্তমানে যখন সারা বিশ্বে উম্মুল ফিতান তথা কুফরি গণতন্ত্রের চর্চা শুরু হয়েছে তখন হক্কানি উলামায়ে কেরাম উম্মাহর সামনে এর মুখোশ উন্মোচন করে দিয়েছেন। পরিণামে তাদের অনেকের উপর দিয়ে জেল-জুলুম আর নির্যাতনের স্টিম রোলায় বয়ে গেছে, এ ধারা এখনো চলছে। এ কারণে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের তাগুতের যিন্দানখানায় শাহাদাত বরণ করেছেন কতশত আলেম উলামা তার কোন হিসেব নেই। এরাই হলেন প্রকৃত অর্থে ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া।

ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. উলামায়ে হকের পরিচয় তুলে ধরেন,

الحمد لله الذي جعل في كل زمان فترة من الرسل، بقايا من أهل العلم يدعون من ضل إلى الهدى، ويصبرون منهم على الأذى، يحيون بكتاب الله الموتى، ويبصرون بنور الله أهل العمى، فكم من قتيل لإبليس قد أحيوه، وكم من ضالٍ تائه قد هدوه، فما أحسن أثرهم على الناس، وأقبح أثر الناس عليهم. ينفون عن كتاب الله تحريف الغالين، وانتحال المبطلين، وتأويل لجاهلين –الرد على الجهمية والزنادقة، ص: 55-56، ط. دار الثبات للنشر والتوزيع

“আলহামদুলিল্লাহ, যিনি রসূলদের অনুপস্থিতির প্রত্যেক যামানায় কিছু আহলে ইলম অবশিষ্ট রেখেছেন, যাঁরা পথহারাদের হিদায়াতের দিকে ডাকেন। পরিণামে যে কষ্ট-ক্লেশ আসে তাতে সবর করেন। কিতাবুল্লাহ দ্বারা মৃতদের মাঝে হায়াত সঞ্চার করেন। আল্লাহর নূর দ্বারা অন্ধকে করে তোলেন চক্ষুষ্মান। ইবলিসের হাতে নিহত কতশত মুর্দাকে তাঁরা জীবিত করেছেন। কতশত উদভ্রান্ত পথহারাকে পথ দেখিয়েছেন। জনমানুষের প্রতি তাঁদের অবদান কতোই মহান। পরিণামে তাঁদের সাথে মানুষের আচরণ কতই না মন্দ। সীমালঙ্ঘনকারীদের বিকৃতি, বাতিল লোকদের মিথ্যারোপ এবং মূর্খদের অপব্যাখ্যা থেকে কিতাবুল্লাহকে তাঁরা সুরক্ষিত রাখেন।” –আররদ্দু আলাল জাহমিয়াহ ওয়াযযানাদিকা : ৫৫-৫৬

 

  • শাসকের দরবার থেকে দূরে

শাসক থেকে দূরে থাকা সব যুগের হক্কানির উলামায়ে কেরামের বৈশিষ্ট্য। একান্ত বাধ্য না করা হলে তাঁরা শাসকের দরবারে একদমই যেতেন না। আমরা আলোচনা করেছি, শাসকের দরবার ফিতনার চারণভূমি। এ দরবারে আলেমের দ্বীনদারিতা ঠিক থাকে না। পক্ষান্তরে, শাসকের দরবার উলামায়ে সূ-দের সমাগমস্থল। বিভিন্ন বাহানায় তারা শাসকের সাথে এবং ক্ষমতাশীলদের সাথে সম্পর্ক গড়তে প্রয়াস চালায়। উলামায়ে হক্কানি সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম। যদি কখনও যেতেন, হয়তো আমর বিল মা’রূফ ও নাহি আনিল মুনকারের উদ্দেশ্যে যেতেন, নয়তো জবরদস্তি ধরে নেয়া হতো। (বক্তব্য আরেকটু পরিষ্কার করা দরকার) আব্দুল্লাহ ইবনে আউন রহ. (১৫১হি.) বলেন,

كان الرجل يفر بما عنده من الأمراء جهده فإذا أخذ لم يجد بدا -جامع بيان العلم وفضله – ابن عبد البر، ج: 1، ص: 636، رقم: 1095؛ ط. دار ابن الجوزي

“এক সময় ছিল যখন আলেম তাঁর দ্বীন ও ঈমান নিয়ে উমারাদের থেকে পালাতেন। তবে যদি জবরদস্তি করে ধরে আনা হতো তখন তো আর গত্যন্তর ছিল না।” –জামিউ বায়ানিল ইলম : ১/৬৩৬, আসার নং : ১০৯৫

 

সুফিয়ান সাওরি রহ. বলেন,

كان خيار الناس وأشرافهم والمنظور إليهم في الدين الذين يقومون إلى هؤلاء فيأمرونهم يعني الأمراء -جامع بيان العلم وفضله – ابن عبد البر، ج: 1، ص: 640، رقم: 1107؛ ط. دار ابن الجوزي

“সবচে’ ভাল, সবচে’ সম্মানী এবং দ্বীনে অনুসরণীয় ওইসব লোক ছিলেন, যাঁরা উমারাদের কাছে গিয়ে আমর বিল মা’রূফ করতেন।” –জামিউ বায়ানিল ইলম : ১/৬৪০, আসার নং : ১১০৭

 

  • আমর বিল মারূফ নাহি আনিল মুনকার

আমর বিল মা’রূফ নাহি আনিল মুনকার এ উম্মাহর শিয়ার-প্রতীক। উম্মাহর শ্রেষ্ঠত্বের কারণ। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

{كُنتُمْ خَيْرَ أُمَّةٍ أُخْرِجَتْ لِلنَّاسِ تَأْمُرُونَ بِالمَعْرُوفِ وَتَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنكَرِ…}

“তোমরাই (দুনিয়ায়) সর্বোত্তম জাতি। মানুষের কল্যাণের জন্যই তোমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে। (শ্রেষ্ঠ জাতি হিসেবে তোমাদের কাজ হচ্ছে) তোমরা দুনিয়ার মানুষদের সৎকাজে আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজে বাধা দেবে।” –সূরা আলে ইমরান (৩) : ১১০

আরও ইরশাদ করেন,

{وَلْتَكُنْ مِّنكُمْ أُمَّةٌ يَدْعُونَ إِلى الخَيْرِ وَيَأْمُرُونَ بِالمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ اْلمُنكَرِ وَأُوْلَئِكَ هُمُ المُفْلِحُونَ}

“তোমাদের মধ্যে এমন একটি দল থাকা চাই- যারা (মানুষকে) কল্যাণের দিকে ডাকবে, সৎ কাজের আদেশ দেবে এবং মন্দ কাজে বাধা দেবে। আর এরূপ লোকই সফলকাম।” –সূরা আলে ইমরান (৩) : ১০৪

আল্লাহ তাআলা লুকমান আলাইহিস সালামের উপদেশ বিবৃত করেন,

{يَابُنَيَّ أَقِمِ الصَّلَاةَ وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ}

“ওহে আমার পুত্র! নামায কায়েম কর, সৎকাজে আদেশ দাও, মন্দ কাজে বাধা দাও এবং (এ কারণে) তোমার যে কষ্ট দেখা দেয় তাতে সবর কর। নিশ্চয়ই এটা বড় হিম্মতের কাজ।” –সূরা লুকমান (৩১) : ১৭

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন,

من رأى منكم منكرا فليغيره بيده فان لم يستطع فبلسانه فان لم يستطع فبقلبه وذلك اضعف الايمان -صحيح مسلم، رقم: 186؛ ط. دار الجيل بيروت + دار الأفاق الجديدة ـ بيروت

“তোমাদের যে কেউ কোনো মন্দ কাজ দেখবে, সে যেন স্বহস্তে (শক্তিবলে) তা প্রতিহত করে। যদি তাতে সক্ষম না হয়, তাহলে যেন তার যবান দিয়ে প্রতিহত করে। যদি তাতেও সক্ষম না হয়, তাহলে অন্তর দিয়ে। আর এটা১ দুর্বলতম ঈমান।” -সহীহ মুসলিম : ১৮৬

অন্য হাদিসে ইরশাদ করেন,

إن الناس إذا رأوا الظالم فلم يأخذوا على يديه أوشك أن يعمهم الله بعقاب -سنن ابي داود، رقم: 4338؛ ط. دار الرسالة العالمية، ت: شعَيب الأرنؤوط – محَمَّد كامِل قره بللي. قال الأرنؤوط رحمه الله تعالى: إسناده صحيح. اهـ

“যখন লোকজন জালেমকে (জুলুম করতে) দেখেও তার হাত না আটকাবে, তখন অচিরেই আল্লাহ তাআলা ব্যাপকভাবে তাদের উপর আযাব নাযিল করবেন।” –সুনানে আবু দাউদ : ৪৩৩৮

অন্য হাদিসে এসেছে,

ما من قوم يعمل فيهم بالمعاصى ثم يقدرون على أن يغيروا ثم لا يغيروا إلا يوشك أن يعمهم الله منه بعقاب -سنن ابي داود، رقم: 4338؛ ط. دار الرسالة العالمية، ت: شعَيب الأرنؤوط – محَمَّد كامِل قره بللي. قال الأرنؤوط رحمه الله تعالى: إسناده صحيح. اهـ

“যখন কোনো সম্প্রদায়ে গুনাহের কাজ হয়, আর জাতির অন্য লোকসকল তা প্রতিহত করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও প্রতিহত করেনা, তখন অতিশীঘ্রই আল্লাহ তাআলা ব্যাপকভাবে তাদের উপর তাঁর আযাব নাযিল করেন।” –সুনানে আবু দাউদ : ৪৩৩৮

অন্যায় প্রতিহত করার এ দায়িত্ব সামর্থ্যানুযায়ী উম্মাহর সকলের উপর ফরয। এ দায়িত্ব ব্যাপকভাবে পরিত্যাগ করায় বনি ইসরাঈলের উপর লা’নত বর্ষিত হয়েছিল। আজ মুসিলম উম্মাহর অধঃপতন এ ফরয ত্যাগ করার কারণেই। জালেমকে যদি সময়মতো আটকানো হতো তাহলে এ অধঃপতন হতো না।

এ দায়িত্ব উলামায়ে কেরামের উপর আরও বেশি। বনি ইসরাঈলের উলামা ও দরবেশদের ধমক দিয়ে আল্লাহ তাআলা বলেন,

لَوْلَا يَنْهَاهُمُ الرَّبَّانِيُّونَ وَالْأَحْبَارُ عَنْ قَوْلِهِمُ الْإِثْمَ وَأَكْلِهِمُ السُّحْتَ لَبِئْسَ مَا كَانُوا يَصْنَعُونَ (63) المائدة

“উলামা ও দরবেশরা কেন তাদের নিষেধ করতনা পাপের কথা বলা এবং হারাম খাওয়া থেকে? কত নিকৃষ্ট কাজই না তারা করত।” –সূরা মায়েদা (৫) : ৬৩

হক্কানি উলামায়ে কেরাম আল্লাহ তাআলার এ অকাট্য নির্দেশের উপর আমল করেন।

হাদিসে এসেছে,

أفضلُ الجهاد كلمةُ عدلٍ عند سُلطانٍ جائرٍ -سنن ابي داود، رقم: 4344؛ ط. دار الرسالة العالمية، ت: شعَيب الأرنؤوط – محَمَّد كامِل قره بللي. قال الأرنؤوط رحمه الله تعالى: صحح لغيره. اهـ

“সর্বোত্তম জিহাদ হল জালিম শাসকের সামনে হক কথা বলা।” –সুনানে আবু দাউদ : ৪৩৪৪

অন্য হাদিসে এসেছে,

عن أبي عُبيدة بن الجراح ، قال : قلتُ : يا رسول الله ، أيُّ الشُّهداءِ أكرم على الله ؟ قال : رجلٌ قام إلى إمامٍ جائرٍ، فأمره بمعروفٍ ، ونهاه عن المنكر فقتله –مسند البزاز، رقم: 1285، ط. مكتبة العلوم والحكم – المدينة المنورة

“হযরত আবু উবায়দা ইবনুল জাররাহ রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, ‘আমি আরজ করলাম, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আল্লাহ তাআলার কাছে সর্বাপেক্ষা সম্মানিত শহীদ কোন ব্যক্তি’? তিনি উত্তর দিলেন, ‘ওই ব্যক্তি যে, কোনো জালিম শাসকের সামনে গিয়ে তাকে সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজে বাধা দেয়, ফলে তারা তাঁকে হত্যা করে ফেলে।” -মুসনাদে বাযযার : ১২৮৫

এ ফজিলত লাভের জন্য উলামায়ে হক্কানি যুগে যুগে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অসৎ কাজে বাধা দিতেন। এতে কেউ শহীদ হয়েছেন কেউবা নির্যাতন ভোগ করেছেন। তবুও পিছপা হননি। হযরত হুসাইন রাদিয়াল্লাহু আনহু, ইমাম আবু হানিফা রহ., ইব্রাহিম সায়িগ রহ.- প্রমুখ বরেণ্যদের শাহাদাতের রক্তে এ ইতিহাস লিখা। হযরত সায়িদ বিন মুসায়্যিব, ইবনুল মুনকাদির, ইবনে আবি যি’ব ও ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ.র মতো বরেণ্যরা এ ক্ষেত্রে আমাদের অনুসরণীয়।

পক্ষান্তরে, যারা মিষ্টি মিষ্টি সুন্নত পালনে আগ্রহী আর কঠিনগুলো থেকে দূরে, তারা আসলে ওরাসালাতুল আম্বিয়া নয়। এ প্রসঙ্গে ইবনুল কায়্যিম রহ. এর খুবই মূল্যবান একটি কথা আছে, যা স্বর্ণাক্ষরে লিখে রাখার মতো। তাঁর কথাটি উল্লেখ না করে পারছি না। তিনি বলেন,

وقد غر إبليس أكثر الخلق بأن حسن لهم القيام بنوع من الذكر والقراءة والصلاة والصيام والزهد في الدنيا والانقطاع، وعطلوا هذه العبوديات، فلم يحدثوا قلوبهم بالقيام بها، وهؤلاء عند ورثة الأنبياء من أقل الناس دينا؛ فإن الدين هو القيام لله بما أمر به، فتارك حقوق الله التي تجب عليه أسوأ حالا عند الله ورسوله من مرتكب المعاصي؛ فإن ترك الأمر أعظم من ارتكاب النهي من أكثر من ثلاثين وجها ذكرها شيخنا – رحمه الله – في بعض تصانيفه؛ ومن له خبرة بما بعث الله به رسوله – صلى الله عليه وسلم – وبما كان عليه هو وأصحابه رأي أن أكثر من يشار إليهم بالدين هم أقل الناس دينا، والله المستعان، وأي دين وأي خير فيمن يرى محارم الله تنتهك وحدوده تضاع ودينه يترك وسنة رسول الله – صلى الله عليه وسلم – يرغب عنها وهو بارد القلب ساكت اللسان؟ شيطان أخرس، كما أن المتكلم بالباطل شيطان ناطق، وهل بلية الدين إلا من هؤلاء الذين إذا سلمت لهم مآكلهم ورياساتهم فلا مبالاة بما جرى على الدين؟ ، وخيارهم المتحزن المتلمظ، ولو نوزع في بعض ما فيه غضاضة عليه في جاهه أو ماله بذل وتبذل وجد واجتهد، واستعمل مراتب الإنكار الثلاثة بحسب وسعه. وهؤلاء – مع سقوطهم من عين الله ومقت الله لهم – قد بلوا في الدنيا بأعظم بلية تكون وهم لا يشعرون، وهو موت القلوب؛ فإنه القلب كلما كانت حياته أتم كان غضبه لله ورسوله أقوى، وانتصاره للدين أكمل.

وقد ذكر الإمام أحمد وغيره أثرا «أن الله سبحانه أوحى إلى ملك من الملائكة أن اخسف بقرية كذا وكذا، فقال: يا رب كيف وفيهم فلان العابد؟ فقال: به فابدأ؛ فإنه لم يتمعر وجهه في يوما قط» .

وذكر أبو عمر في كتاب التمهيد «أن الله سبحانه أوحى إلى نبي من أنبيائه أن قل لفلان الزاهد: أما زهدك في الدنيا فقد تعجلت به الراحة، وأما انقطاعك إلي فقد اكتسبت به العز، ولكن ماذا عملت فيما لي عليك؟ فقال: يا رب وأي شيء لك علي؟ قال: هل واليت في وليا أو عاديت في عدوا» ؟ -إعلام الموقعين ، ج: 2، ص: 120-121، دار الكتب العلمية – ييروت

“ইবলিস অধিকাংশ মানুষকে এভাবে ধোঁকায় ফেলে দিয়েছে যে, নির্দিষ্ট কিছু যিকির, তিলাওয়াত, নামায, রোযা, যুহদ ও দুনিয়াত্যাগের মতো আমলসমূকে তাদের সামনে সুসজ্জিত করে দেখিয়েছে। আর তারা (আমর বিল মা’রূফ, নাহি আনিল মুনকার, জিহাদ ও দ্বীনের পথের কষ্টসাধ্য) এসব আমল পরিত্যাগ করেছে। বাস্তবে নবীগণের প্রকৃত উত্তরসূরিদের দৃষ্টিতে এরাই সবচেয়ে কম দ্বীনদার শ্রেণীর লোক। কেননা, দ্বীন তো হলো আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য আল্লাহর আদেশ পালন করা। যে ব্যক্তি তার উপর আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত আবশ্যকীয় হকগুলো আদায় করে না, সে আল্লাহ ও তাঁর রসূলের দৃষ্টিতে গুনাহে লিপ্ত ব্যক্তির চেয়েও নিকৃষ্ট। কেননা, আদেশ পালন না করা ত্রিশ দিক দিয়ে নাফরমানী করার চেয়েও গুরুতর অপরাধ। আমাদের শায়েখ (ইবনে তাইমিয়া) রহ. তাঁর এক কিতাবে সেগুলো উল্লেখ করেছেন।

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে আল্লাহ তায়ালা যে দ্বীন দিয়ে প্রেরণ করেছেন এবং তিনি ও তাঁর সাহাবিগণ যে দ্বীন পালন করে গেছেন, সে সম্পর্কে যাঁরা জ্ঞান রাখেন, তাঁরা দেখতে পান, দ্বীনদ্বার বলে প্রসিদ্ধ ব্যক্তিদের অধিকাংশই (এখন) সবচেয়ে কম দ্বীনদ্বার শ্রেণীর লোক। আল্লাহর পানাহ! আল্লাহ তায়ালার নিষিদ্ধ বস্তুগুলো পদদলিত হতে দেখেও, আল্লাহর বেঁধে দেয়া সীমা লঙ্ঘিত হতে দেখেও, আল্লাহর দ্বীন পরিত্যক্ত হতে দেখেও এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহর প্রতি বিমুখতা দেখেও যার অন্তর প্রশান্ত, যবান নিশ্চুপ- তার মধ্যে আবার কিসের দ্বীনদারী? কিসের কল্যাণ? সে তো বোবা শায়তান, যেমন বাতিল বলনেওয়ালা সবাক শয়তান। দ্বীনের ধ্বংস তো এদের কারণেই হচ্ছে; উদরপূর্তির ব্যবস্থা আর গদি ঠিক থাকলে দ্বীনের কি হল না হল সে নিয়ে যাদের কোনো মাথাব্যথা নেই। তাদের মধ্যে যাদের দ্বীনদারি সবচেয়ে ভালো, তাদের অবস্থা হল: একটু চিন্তিত হয় আর হালকা সমালোচনা করেই ক্ষান্ত হয়। পক্ষান্তরে, যদি এদের সম্মান ও সম্পদে কোন আঘাত লাগে, তাহলে রেগে আগুন হয়ে যায়। সর্বসামর্থ্য দিয়ে নাহি আনিল মুনকারের তিনটি স্তর (হাত, যবান ও অন্তর) প্রয়োগ করে।

এরা যে শুধু আল্লাহর (রহমতের) দৃষ্টি থেকে সরে গেছে এবং আল্লাহ তাআলা তাদের উপর অসন্তুষ্ট হয়েছেন তা-ই নয়, বরং এরা নিজেদের অজান্তেই দুনিয়ার সবচেয়ে বড় মুসিবতের শিকার হয়েছে। আর তা হলো- অন্তরের মৃত্যু। কেননা অন্তর যতটা প্রাণবন্ত হয় আল্লাহ ও তাঁর রসূলের পথে তার ক্রোধ তত বেশি হয়; দ্বীনের জন্য তত বেশি প্রতিশোধ পরায়ণ হয়।

ইমাম আহমদ রহ.সহ আরও অনেকে একটি হাদিস উল্লেখ করেছেন। হাদিসটি হল, আল্লাহ তায়ালা এক ফেরেশতাকে আদেশ দিলেন, অমুক অমুক জনপদ ধ্বসিয়ে দাও। ফেরেশতা আরজ করল, ‘হে রব! সেখানে তো অমুক ইবাদতগুজার বান্দা আছে, তাহলে কীভাবে ধ্বংস করবো’? আল্লাহ তায়ালা উত্তর দেন, ‘তাকে দিয়েই শুরু করো। (অন্যায় কাজ দেখেও) আমার জন্য কোনো এক দিনও তার চেহারায় অসন্তুষ্টি দেখা দেয়নি’।

আবু উমার (ইবনে আব্দুল বার) রহ. ‘তামহিদ’ গ্রন্থে উল্লেখ করেন, আল্লাহ তায়ালা এক নবীর নিকট ওহী পাঠান, তুমি অমুক যাহেদকে বলো, ‘দুনিয়াবিমুখতার দ্বারা তুমি দুনিয়াতে অগ্রিম প্রশান্তি বেছে নিয়েছ। আমার ইবাদতে নিমগ্ন হওয়ার দ্বারা তুমি সম্মান লাভ করেছ। কিন্তু তোমার উপর আমার যে হক রয়েছে, তার জন্য তুমি কী করেছ’? যাহেদ আরজ করল, ‘হে রব! আমার উপর আপনার কোন্ হক পাওনা আছে’? আল্লাহ তায়ালা উত্তর দিলেন, ‘তুমি কি আমার সন্তুষ্টির জন্য কাউকে মহব্বত করেছ? কিংবা আমার সন্তুষ্টির জন্য কারো সাথে শত্রুতা পোষণ করেছ?” -ই’লামুল মুয়াককিয়িন : ২/১২০-১২১

  • বিপদাপদে সবর করা

দ্বীনের পথে কষ্ট-নির্যাতন বরদাশত করা আম্বিয়ায়ে কেরামের সুন্নত। মিরাস সূত্রে উলামায়ে হক্কানি এ সুন্নতের উত্তরাধিকারী। ইমাম আহমদ ও ইমাম ইবনে মাজা রহ.সহ আরও অনেকে হযরত সা’দ বিন আবি ওয়াককাস রাদিয়াল্লাহু আনহু থেকে একটি হাদিস বর্ণনা করেন। হযরত সা’দ বিন আবি ওয়াককাস রাদিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

قلت: يا رسول الله أي الناس أشد بلاء؟ قال: ” الأنبياء، ثم الصالحون، ثم الأمثل، فالأمثل من الناس، يبتلى الرجل على حسب دينه، فإن كان في دينه صلابة زيد في بلائه، وإن كان في دينه رقة خفف عنه، وما يزال البلاء بالعبد حتى يمشي على ظهر الأرض ليس عليه خطيئة ” -مسند الإمام أحمد، رقم: 1481؛ ط. الرسالة، ت: شعيب الأرنؤوط، عادل مرشد، وآخرون. قال المحققون: إسناده حسن. اهـ

“আমি জিজ্ঞেস করলাম, ‘ইয়া রাসূলাল্লাহ! সবচে’ বেশি বিপদাপদ কাদের উপর আসে’? তিনি উত্তর দেন, ‘আম্বিয়াদের উপর, তারপর সালিহিনদের উপর, তারপর ক্রমানুসারে যে যত ভাল। ব্যক্তি তার দ্বীনদারির মাত্রা অনুযায়ী বিপদের সম্মুখীন হয়। দ্বীনদারিতে পাকা হলে মুসিবত বেশি আসে। দ্বীনদারি কাঁচা হলে বিপদও কম আসে। বান্দার উপর বিপদাপদ আসতেই থাকে আসতেই থাকে, শেষে এ পর্যায়ে পৌঁছে যায় যে, যমিনের উপর দিয়ে সে এ অবস্থায় চলাফেরা করে যে, তার কোনোই গোনাহ নেই।” –মুসনাদে আহমাদ : ১৪৮১

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন আমর বিল মা’রূফ এবং নাহি আনিল মুনকারের কথা বলেই বিপদাপদে সবর করার তালকিন করেছেন,

وَأْمُرْ بِالْمَعْرُوفِ وَانْهَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَاصْبِرْ عَلَى مَا أَصَابَكَ إِنَّ ذَلِكَ مِنْ عَزْمِ الْأُمُورِ -لقمان 17

“সৎকাজে আদেশ দাও, মন্দ মন্দ কাজে বাধা দাও এবং (এ কারণে) তোমার যে কষ্ট দেখা দেয় তাতে সবর কর। নিশ্চয়ই এটা বড় হিম্মতের কাজ।” –সূরা লুকমান (৩১) : ১৭

ইমাম তাবারি রহ. বলেন,

(وأمُرْ بالمعْرُوفِ) يقول: وأمر الناس بطاعة الله، واتباع أمره (وَانْهَ عَنِ المُنْكَرِ) يقول: وانه الناس عن معاصي الله ومواقعة محارمه (وَاصْبِرْ عَلى ما أصَابَكَ) يقول: واصبر على ما أصابك من الناس في ذات الله، إذا أنت أمرتهم بالمعروف، ونهيتهم عن المنكر، ولا يصدّنك عن ذلك ما نالك منهم (إنَّ ذلكَ مِنْ عَزْمِ الأمُورِ) يقول: إن ذلك مما أمر الله به من الأمور عزما منه. –جامع البيان في تأويل القرآن، ج: 20، ص: 142؛ ط. مؤسسة الرسالة، ت: أحمد شاكر

“আল্লাহ তাআলা বলছেন, লোকদেরকে আল্লাহর আনুগত্য করতে এবং তাঁর আদেশ মেনে চলতে আদেশ দাও এবং তাদেরকে আল্লাহর নাফরমানি এবং তাঁর হারামসমূহে লিপ্ত হওয়া থেকে বাধা দাও। যখন নেক কাজে আদেশ দেবে, অসৎ কাজে বাধা দেবে তখন আল্লাহর পথে যে বিপদাপদ আসবে তাতে সবর করবে। তাদের থেকে যে কষ্ট তুমি পাচ্ছো তা যেন তোমাকে এ কাজ থেকে বিরত না রাখে। এটি আল্লাহ তাআলার অবশ্যপালনীয় নির্দেশ।” –তাফসিরে তাবারি : ২০/১৪২

শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন,

والله تعالى قد جعل أكمل المؤمنين إيمانا أعظمهم بلاء -قاعدة فى المحبة 150، ط. مكتبة التراث الإسلامي، القاهرة، مصر

“যাঁরা সবচে বেশি বিপদাপদের শিকার, আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকেই কামেল মুমিন বানান।” –কায়িদাতুন ফিল মাহাব্বাহ : ১৫০

আরো বলেন,

ثم إذا أمر ونهى فلا بد أن يؤذى في العادة، فعليه أن يصبر ويحلم. كما قال تعالى: {وأمر بالمعروف وانه عن المنكر واصبر على ما أصابك إن ذلك من عزم الأمور} (سورة: لقمان 17 )

وقد أمر الله نبيه بالصبر على أذى المشركين في غير موضع، وهو إمام الآمرين بالمعروف الناهين عن المنكر. -منهاج السنة النبوية، ج: 5، ص: 254، ط. جامعة الإمام محمد بن سعود الإسلامية

“সৎ কাজে আদেশ দেয়া ও মন্দ কাজে বাধা দেয়ার পর স্বাভাবিক কিছু কষ্ট পোহাতেই হয়। তাই সবর করতে হবে এবং সহনশীল হতে হবে। … আল্লাহ তাআলা অনেক আয়াতে তাঁর নবীকে মুশরিকদের দেয়া কষ্ট-ক্লেশ বরদাশত করতে বলেছেন। আর তিনিই তো আমর বিল মা’রূফ ওয়া নাহি আনিল মুনকারের ইমাম।”

–মিনহাজুস সুন্নাহ : ৫/২৫৪

রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নবী হওয়ার পর যখন ওয়ারাকা বিন নাওফেলের কাছে যান, তখন তিনি বলেছিলেন, অচিরেই তোমার কওম তোমাকে এ ভূমি থেকে বের করে দেবে। তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আশ্চর্যান্বিত হয়ে জিজ্ঞেস করছিলেন, ‘তারা আমাকে বের করে দেবে’? ওয়ারাকা বিন নাওফেল জওয়াব দিয়েছিলেন,

نعم، لم يأت رجل قط بمثل ما جئت به إلا عودي -صحيح البخاري، رقم: 3؛ ط. دار ابن كثير، اليمامة – بيروت؛ تحقيق: د. مصطفى ديب البغا

“হ্যাঁ! তুমি যে দাওয়াত নিয়ে এসেছ, ইতিপূর্বে যারাই এ দাওয়াত নিয়ে এসেছে তাঁদের সবার সাথেই দুশমনি করা হয়েছে।” –সহীহ বুখারি : ৩

কিন্তু আজকের দুনিয়ায় সমীকরণ পাল্টে গেছে। আজকাল যাদেরকে নবীদের ওয়ারিস গণ্য করা হচ্ছে তারা ফুলেল বিছানায় শুয়ে-বসে সরকারি নিরাপত্তায় জীবন কাটাচ্ছে, অথচ একই সময় সরকারের যিন্দানখানায় হাজারো যুবক-তরুণ, আলেম-দাঈ অমানবিক নির্যাতনে কাতরাচ্ছেন।

অনেকে আবার গর্ব করে বলেও বেড়ান, ‘আলহামদুলিল্লাহ! কারও সাথেই আমার দুশমনি নাই। আমার কোনও শত্রু নাই’।

কেউ কেউ তো আরও অগ্রসর হয়ে বলেন, ‘কাদিয়ানিরা পর্যন্ত আমার কথায় সন্তুষ্ট’।

ইন্নালিল্লাহ! ইন্নালিল্লাহ! এমন ভালো (?) মানুষগুলো সত্যিকারের ওয়ারাসাতুল আম্বিয়া হবেন কীভাবে?

ইমাম ইবনুল কায়্যিম রহ. এর কথাটা আবারও স্বরণ করিয়ে দিই,

وهؤلاء عند ورثة الأنبياء من أقل الناس دينا

“(সত্যিকার) ওয়ারাসাতুল আম্বিয়াদের দৃষ্টিতে এরাই সবচেয়ে দুর্বল দ্বীনদার”।

 

  • রিবাত ও জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ

জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ আম্বিয়ায়ে কেরাম ও তাঁদের সত্যিকারের অনুসারীদের বৈশিষ্ট্য। পক্ষান্তরে, জিহাদ থেকে দূরে থাকা মুনাফিক ও দুর্বল ঈমানদারদের বৈশিষ্ট্য। আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

وَكَأَيِّنْ مِنْ نَبِيٍّ قَاتَلَ مَعَهُ رِبِّيُّونَ كَثِيرٌ فَمَا وَهَنُوا لِمَا أَصَابَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَا ضَعُفُوا وَمَا اسْتَكَانُوا وَاللَّهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ –آل عمران 146

“এমন কত নবী ছিলেন যাদের সঙ্গে মিলে বহু আল্লাহওয়ালা যুদ্ধ করেছেন। আল্লাহর পথে তাঁদের যে কষ্ট-বিপদ এসেছে তার কারণে তাঁরা সাহস হারাননি, দুর্বলও হননি এবং (শত্রুর সামনে) মাথা নতও করেননি। আর আল্লাহ অটল অবিচল লোকদের ভালবাসেন।” –আলে ইমরান (৩) : ১৪৬

رِبِّيُّونَ দ্বারা কারা উদ্দেশ্য, এ প্রসঙ্গে ইবনে কাসির রহ. বলেন,

وقال عبد الرزاق، عن معمر عن الحسن: {ربيون كثير} أي: علماء كثير، وعنه أيضا: علماء صبر أبرار أتقياء. –تفسير القرآن العظيم ، ج: 2، ص: 131؛ ط. دار طيبة للنشر والتوزيع

“আব্দুর রাযযাক রহ. মা’মার রহ. এর সূত্রে হাসান বসরি রহ. থেকে বর্ণনা করেন, رِبِّيُّونَ كَثِيرٌ মানে অনেক অনেক উলামা। হাসান বসরি রহ. থেকে এও বর্ণিত আছে যে, তাঁরা হলেন নেককার, মুত্তাকি ও অটল অবিচল উলামা।”

–তাফসিরে ইবনে কাসির : ২/১৩১

আয়াতে দুই রকম কেরাত আছে:

قَاتَلَ- যুদ্ধ করেছে;

قُتِلَ- নিহত হয়েছে।

ইবনে কাসির রহ. তাবারি রহ. এর সূত্রে বলেন,

معناه: كم من نبي قتل وقتل معه ربيون من أصحابه كثير. –تفسير القرآن العظيم ، ج: 2، ص: 130؛ ط. دار طيبة للنشر والتوزيع

“অর্থ: অনেক নবী শহীদ হয়েছেন এবং তাঁদের সাথে তাঁদের অসংখ্য আল্লাহওয়ালা সাথীরাও শহীদ হয়েছেন।” –তাফসিরে ইবনে কাসির : ২/১৩০

নবী এবং নবীর সাথে তাঁর বড় বড় মুত্তাকি আলেম ও আল্লাহওয়ালা সাথীরা শহীদ হয়ে যাওয়ার পরও বাকিরা ভেঙে পড়েননি। তাঁরা নবীর আনীত দ্বীনের জন্য শহীদদের পথ ধরেই অটল অবিচল থাকেন এবং কিতাল চালিয়ে যান।

এ হল ওয়ারাসাতুল আম্বিয়াদের বৈশিষ্ট্য। যখন থেকে জিহাদ শুরু তখন থেকেই এ বৈশিষ্ট্য) তাঁদের ছিল। রসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের এমন একজন সাহাবিও পাওয়া যাবে না, যিনি জিহাদ করেননি। সবাই জিহাদ করেছেন।

সাহাবায়ে কেরাম চলে যাওয়ার পর উলামায়ে সালাফের একই নীতি ছিল। জিহাদ ও রিবাতের ময়দান ছিল তাদের পদচারণায় মুখর। বরং রিবাতের অশেষ সওয়াব ও ফজিলত লাভের জন্য উলামায়ে কেরাম বসবাসের জন্য সীমান্তে চলে যেতেন। এ কারণেই সীমান্ত এলাকা ছিল বড় বড় মুহাদ্দিস ও ফুকাহায়ে কেরামের সমাগমস্থল। ইমাম ইবনে তাইমিয়া রহ. বলেন,

وما زال خيار المسلمين من الصحابة والتابعين وتابعيهم من بعدهم من الأمراء والمشايخ يتناوبون الثغور لأجل الرباط وكان هذا على عهد أبي بكر وعثمان أكثر، حتى كان عبد الله بن2 وغيره مرابطين.

وكان عمر من يسأله عن أفضل الأعمال إنما يدله على الرباط والجهاد، كما سأله عن ذلك من سأله، كالحارث بن هشام وعكرمة بن أبي جهل وصفوان بن أمية وسهيل بن عمرو وأمثالهم ثم كان بعد هؤلاء إلى خلافة بني أمية وبني العباس ولهذا يذكر من فضائلهم وأخبارهم في الرباط أمور كثيرة. – المرابطة بالثغور، ص: 48، ط. أضواء السلف

“সাহাবা, তাবিয়িন এবং তাবে তাবিয়িনদের উমারা মাশায়েখগণ, যারা মুসলিম সমাজের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যক্তিত্ব তাঁরা সবসময় পালাক্রমে রিবাতের কাজ করে আসছেন। হযরত আবু বকর রা. ও উসমান রা. এর যামানায় এটি ছিল বেশি পরিমাণে।…কেউ হযরত উমার রা.কে সর্বশ্রেষ্ঠ আমল কোনটি জিজ্ঞেস করলে তিনি রিবাত ও জিহাদের কথা বলতেন। যেমন হারিস বিন হিশাম, ইকরিমা বিন আবু জাহল, সাফওয়ান বিন উমাইয়া ও সুহাইল বিন আমরসহ অনেকে জিজ্ঞেস করেছিলেন। তাঁদের পর উমাইয়া ও আব্বাসি খেলাফতের সময়ও এটি চলে এসেছে। এ কারণেই তাঁদের মর্যাদা সম্পর্কে এবং তাঁদের রিবাতের ঘটনাবলী নিয়ে এত কিছু বর্ণিত হয়ে আসছে।” –আলমুরাবাতা বিসসুগুর : ৪৮

তিনি আরও বলেন,

كان أصحاب مالك كابن القاسم نحوه يرابط بالثغور المصرية … فكان عبد الله بن المبارك يقدم من خرسان فيرابط بثغور الشام، وكذلك ابراهيم ابن أدهم ونحوهما، كما كان يرابط بها ومشايخ الشام كالأوزاعي وحذيفة المرعشي ويوسف بن أسباط وأبي اسحاق الفزاري ومخلد بن الحسين وأمثالهم. -المرابطة بالثغور، ص: 49، ط. أضواء السلف

“ইমাম মালেকের শাগরেদরা- যেমন ইবনুল কাসিম ও অন্যান্যরা- মিশরের সীমান্ত এলাকাগুলোতে রিবাতের দায়িত্ব পালন করতেন। … আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. খুরাসান থেকে এসে শামের সীমান্ত এলাকায় রিবাতের দায়িত্ব পালন করতেন। ইবরাহীম বিন আদহামও এমনটি করতেন। তাঁদের মতো অন্যরাও এমন করতেন। যেমনটা করতেন শামের মাশায়িখগণ। যেমন আওযায়ি, হুযায়ফা আলমারআশি, ইউসুফ বিন আসবাত, আবু ইসহাক আলফাজারি এবং মাখলাদ বিন হুসাইনসহ আরও অনেকে।” –আলমুরাবাতা বিসসুগুর : ৪৮

وكان ابن المبارك وأحمد بن حنبل وغيرهم يقولون: “إذا اختلف الناس في شيء فانظروا ما عليه أهل الثغر، فإن الحق معهم؛ لأن الله تعالى يقول: {وَالَّذِينَ جَاهَدُوا فِينَا لَنَهْدِيَنَّهُمْ سُبُلَنَا} (العنكبوت: من الآية69) ” –المرابطة بالثغور، ص: 50، ط. أضواء السلف

“আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রহ. ও আহমদ বিন হাম্বল রহ.সহ আরও অনেকে বলতেন, ‘কোনো বিষয়ে উলামাদের মতভেদ দেখা দিলে দেখবে সীমান্তে অবস্থানকারী উলামায়ে কেরামের মত কী। কারণ, হক সর্বদা তাঁদের সাথেই থাকে। কেননা, আল্লাহ তাআলা বলেছেন, ‘যারা আমার রাস্তায় জিহাদ করে আমি তাঁদের সামনে হিদায়াতের অসংখ্য রাস্তা উন্মোচন করে দিই। (আনকাবুত ৬৯)” –আলমুরাবাতা বিসসুগুর : ৪৮

বর্তমানে কিছু কিছু আলেম-উলামা ও পীর-মাশায়েখ ইলম ও জিহাদের একটিকে অপরটির বিপরীত মনে করছেন। তারা, তাদের কথায় ও কাজে সাধারণ মুসলমানদেরকে এটিই বুঝাচ্ছেন। তারা না নিজেরা জিহাদের কথা বলেন আর না কেউ বললে তা পছন্দ করেন। নিজে জিহাদে যাওয়া কিংবা কাউকে জিহাদে যেতে উৎসাহিত করা তো দূরেরই কথা। নিঃসন্দেহে এটা দ্বীনের নামে মিথ্যাচার। সালাফে সালিহিন এবং কোনো যুগের হক্কানি উলামায়ে কেরামের মানসিকতা ও ত্বরিকা এমন ছিল না। তাঁরা হাদিসের মসনদে যেমন ছিলেন বিজ্ঞ শাইখ, জিহাদ ও রিবাতের ময়দানেও ছিলেন অভিজ্ঞ শাহ সওয়ার। হযরত হাসান বসরি, আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, আওযায়ি, ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল, ইমাম শাফিয়ি, ইমাম বুখারি, ইব্রাহিম নাখায়ি, ইব্রাহিম বিন আদহাম, শাকিক বলখি, আবু ইসহাক ফাজারি, ইবনে কুদামা, ইবনে তাইমিয়া (আল্লাহ তাআলা তাঁদের সবার উপর রহম করুন)- কত জনের নাম নেব? সালাফে সালিহীন এবং আইম্মায়ে দ্বীনের সবাই এমন ছিলেন। নিকট অতীতের হিন্দুস্তানি আকাবিরগণেরও একই ত্বরিকা ছিল। সায়্যিদ আহমাদ শহীদ, শাহ ইসমাইল শহীদ, মাওলানা আব্দুল হাই রহ., হাজি ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী, মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহি, কাসিম নানুতুবি তাঁরা সকলেই ছিলেন এ পথের পথিক।

 

সারকথা:

উপরে উলামায়ে হক্বানির যেসব বৈশিষ্ট্য আলোচিত হয়েছে এক নজরে তা হল,

  • ইখলাস
  • বাসিরাত ফিদ্ দ্বীন
  • ইলম বা-আমল
  • ইলম ছাড়া কথা বলেন না
  • নির্ভীক ও আপোষহীন দাঈ, হকের পথে অটল
  • দ্বীনের কোনো কিছু গোপন করেন না বা অপব্যাখ্যা করেন না
  • সত্য উচ্চারণে নির্ভীক
  • ফিতনা ও বাতিলের মোকাবিলায় সোচ্চার
  • শাসকের দরবার থেকে দূরে থাকেন
  • আমর বিল মা’রূফ নাহি আনিল মুনকার
  • সবর আলা বালা
  • রিবাত ও জিহাদ ফি সাবিলিল্লাহ।

উলামায়ে হক্কানি-রব্বানির বৈশিষ্ট্য ও কার্যক্রমের ফিরিস্তি অনেক দীর্ঘ। আম্বিয়ায়ে কেরামের মতো তাঁদের জীবনও পুরোটাই সংগ্রাম আর সাধনার জীবন। এখানে সংক্ষেপে তাঁদের মৌলিক কিছু বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করা হলো মাত্র। তাঁদের বৈশিষ্ট্যগুলোর সাথে উলামায়ে সূ-দের অবস্থাগুলো মিলালে যে কারোর পক্ষে বোঝা সহজ হয়ে যাবে যে, বর্তমানে বিশেষ করে আমাদের এ দেশে কারা উলামায়ে হক্কানি আর কারা উলামায়ে সূ?

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে উলামায়ে সূ-দের থেকে দূরে থাকার এবং উলামায়ে হক্কানি-রব্বানিদের পথে চলার এবং তাঁদের সঙ্গে থাকার তাওফিক দান করুন। আমীন।

الحمد لله الذي بنعمته تتم الصالحات، وصلى الله تعالى على خير خلقه محمد وعلى آله وآصحابه أجمعين