প্রবন্ধ-নিবন্ধ

বাংলাদেশ-ইসরায়েল গোপন সম্পর্ক: মুনাফিকির নয়া উপাখ্যান

বাংলাদেশ-ইসরায়েল গোপন সম্পর্ক: মুনাফিকির নয়া উপাখ্যান

পিডিএফ ডাউনলোড করুন

ওয়ার্ড ডাউনলোড করুন

বাংলাদেশ-ইসরায়েল গোপন সম্পর্ক: মুনাফিকির নয়া উপাখ্যান

এনায়েত কারিম

 

বাংলাদেশ-ইসরায়েল গোপন সম্পর্ক:মুনাফিকির নয়া উপাখ্যান

বাংলাদেশের ই-পাসপোর্ট থেকে ইসরায়েলে ভ্রমণের নিষাধাজ্ঞা তোলে দেওয়া হয়েছে। ২০২১ সালের মে মাসে,১২ দিনের অসম যুদ্ধে ফিলিস্তিনের গাজ্জার অনেক এলাকা যখন ধ্বংস্তূপে পরিণত হয়েছে, দুই শতাধিক ফিলিস্তিনি শহীদ হয়েছেন যার একটি বড় অংশই নিরীহ নারী ও শিশু- ঠিক তার পরেই এ অনাকাঙ্ক্ষিত খবরটি জানতে পারে বিশ্ববাসী। চারটি আরব রাষ্ট্র- সংযুক্ত আরব আমিরাত, বাইরাইন, মরক্কো ও সুদানের পর আল-আকসা ও ফিলিস্তিনিদের প্রতি বিশ্বাসঘাতকার নজির স্থাপন করল বাংলাদেশ।

গিলাড কোহেন, এশিয়া ও প্রশান্তমহাসাগরীয় অঞ্চলে ইসরাসেলের দূত,  এক টুইটে বাংলাদেশের সরকারের এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের আহবান জানায়।বিস্ময়ের ব্যাপার এই যে, বাংলাদেশের কোনো মহলেই যখন ইসরায়েলের প্রতি প্রকাশ্য নমনীয়তা দেখা যায় না; এমনকি ফিলিস্তিনের প্রতি চালানো প্রতিটি আগ্রাসনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের জনগণ ও রাষ্ট্রের ‘কঠোর’ অবস্থান থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশ সরকার পাসপোর্ট থেকে ইসরায়েল ভ্রমণের নিষেধাজ্ঞাটি তুলে দিল। অজুহাত হিসেবে বাংলাদেশের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের দাবি, ই-পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক মান রাখতে গিয়েই এমন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। কতটুকু সত্য এই দাবি আর কতটা গ্রহণযোগ্য এই অজুহাত? পর্দার আড়ালে কি এমন কিছু চলছে যে ব্যাপারে বেখবর বাংলাদেশের সাধারণ মানুষ?

পররাষ্ট্রমন্ত্রীর মন্ত্রীর মিথ্যাচার কীসের ইঙ্গিত দেয়?

‘ইসরায়েলের সঙ্গে আমরা কূটনৈতিক সম্পর্ক করতে যাচ্ছি, এটা ঠিক নয়। এটা যেটা হয়েছে, আমরা যখন নতুন পাসপোর্ট করি প্রায় ছয় মাস আগে ওখানে আলাদা একটা সিল লাগানো ছিল ‘ইসরায়েল’ ব্যতীত; এ রকম লাগানো দুনিয়ার অন্য কোনো পাসপোর্টে নাই। বাংলাদেশের পাসপোর্টটা ইউনিক ছিল, সে কারণে এটা সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। দুনিয়ার কোনো দেশে এমন সিল লাগানো নেই। আমাদের নতুন পাসপোর্ট যেগুলো হয়েছে, সেগুলোকে আমরা স্ট্যান্ডার্ডাইজড করার জন্য শুধু সিলটা বাদ দেওয়া হয়েছে। তবে বাংলাদেশ এবং ইসরায়েলের পররাষ্ট্রনীতির কোনো পরিবর্তন নাই।’

তার এই ব্যাখ্যাকে সন্দেহের চোখে দেখার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। বিশেষ করে, গত কয়েকবছরে বাংলাদেশের সরকারের সাথে ইসরায়েলের গোপন যোগাযোগ ও লেনদেনের খবর বেরোনোর পর আনুষ্ঠানিকভাবে পাসপোর্ট থেকে ইসরায়েল-বিরোধী বার্তাটি তুলে দেয়া এক গোপন আঁতাতেরই ইঙ্গিত দেয়। আমরা যদি বাংলাদেশ সরকার ও ইসরায়েলের মাঝে তৎপরতার আদ্যোপান্ত জানতে পারি, তাহলে মুসলিম বিশ্বে জবরদস্তিমূলকভাবে চেপে বসা সরকারগুলোর টিকে থাকার মূলমন্ত্রটি খুব ভালোভাবেই বুঝি নিতে পারব। সেজন্য দরকার আরো কিছু চাঞ্চল্যকর তথ্যের বিশ্লেষণ।

বাস্তবতা হচ্ছে ইসরায়েল দীর্ঘদিন থেকেই বাংলাদেশ সরকার ও রাজনৈতিক দলগুলোর বিভিন্ন পর্যায়ে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করে চলেছে। পূর্ব পাকিস্তানের পতনের পর বাংলাদেশ নামের নতুন রাষ্ট্রকে স্বীকৃতির জালে বেঁধে ফেলতে চেয়েছিল ইসরায়েল; এতে করে নিজেরাও একটি মুসলিম দেশের স্বীকৃতি পেয়ে যেত।কিন্তু ১৯৭২ সালের সেই স্বীকৃতিকে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে বাংলাদেশ।তখনো আরব-ইসরায়েল যুদ্ধের আঁচ বাকি থেকে গিয়েছিল।বাংলাদেশের পক্ষে এমন স্বীকৃতি বিনিময়ের ফলে মধ্যপ্রাচ্যের দরজা বন্ধ হয়ে যাবার সম্ভাবনা ছিল। তখন সে ঝুঁকি নেয়নি বাংলাদেশ।। কিন্তু সময় গড়িয়ে গেছে অনেক। ১৯৭৯ সালেই মিশরের প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত ইসরায়েলের সাথে সমঝোতায় পৌঁছে যায়; ফলে মিশর ইসরায়েলকে স্বিকৃতি দেবার পাশাপাশি নির্বিঘ্নে সুয়েজ খাল ব্যবহারের ব্যবস্থা করে দেয়। সেই সময় আনোয়ার সাদাত তার এই বিশ্বাসঘাতকতার পরিণামে একদল মর্দে মুজাহিদের হাতে একটি রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠান চলাকালীন খুন হয়। যদিও আজকের দিনে অনেকের পক্ষেই এরকমটা ভাবা কষ্টকর, তবে মুসলিম বিশ্বে ইসরায়েল বিরোধী জনরোষ সবসময়ই ছিল। তাহলে কিভাবে একে একে “মুসলিম রাষ্ট্রগুলো” এত সহজেই ইসরায়েলের সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক করে নিতে পারছে?

স্পাইওয়্যার ক্রয় ও বাংলাদেশের বৈশ্বিক কুফরি ব্যবস্থার অংশীদার হয়ে ওঠা

এমন একটি রাষ্ট্রের সাথে ঢাকার সম্পর্ক স্বাভাবিকের চেষ্টার পেছনে ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে কুফুরি শক্তির অনন্ত যুদ্ধের সম্বন্ধ অত্যন্ত জীবন্ত এক ব্যাপার।আর উপমহাদেশে এই যুদ্ধের ঠিকাদার হলো ভারত; যা অঞ্চলের মুসলমানদের বিরুদ্ধে সর্বব্যাপী কর্মসূচী নিয়ে কাজ করে চলেছে। আর তাদের সেই কর্মসূচীর গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হলো ইসরায়েল।মেনদি সাফাদি,ইসরায়েল সাবেক প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহুর দল লিকুদ পার্টর নেতা, কলকতায় একটি সংবাদ সম্মেলনে বাংলাদেশ সরকারকে সন্ত্রাসী কার্যক্রমে জড়িত বলে অভিযোগ করে। আরেকটি অনুষ্ঠানে সে একটি মিশনের কথা জানায় যার উদ্দেশ্য হলো বাংলাদেশে স্বাধীনতা ও গণতন্ত্র ফিরিয়ে আনা। আর এই মিশনে সর্বতোভাবে তার সংযোগী ও প্রতিনিধি হিসেবে শিপন কুমার বসু নামের এক ব্যক্তিকে পরিচয় করিয়ে দেয়। এই শিপন বসু ২০১৬ সালে বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর সাথে মেনদি সাফাদির সাক্ষাতের ব্যবস্থা করে। একই লোক ২০২১ সালে  বিএনপি ও আওয়ামী লীগের দু’জন মধ্যম সারির নেতার সাথে মেনদি সাফাদির বৈঠকের ব্যবস্থা করে।এদের একজন বিএনপির নেতা চৌধুরী আব্দুল্লাহ আল ফারুক। অন্যজন মেজর (অবসরপ্রাপ্ত) খোন্দকার এ হাফিজ, যে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর নিরপত্তা উপদেষ্টা জেনারেল (অবঃ) তারিক আহমদ সিদ্দিকির ঘনিষ্টজন। এখানেই ঘটনার শেষ নয়। সবচে’ চাঞ্চল্যকর তথ্যটি বেরিয়ে আসে ২১ এর ফেব্রুয়ারি মাসে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম আল-জাজিরার একটি রিপোর্ট থেকে। এতে দেখা যায়,বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর গোয়েন্দা বিভাগ, ডিজিএফআই ইসরায়েলি কোম্পানি পিকসিক্স থেকে ফোনে আড়িপাতা ও নজরদারির প্রযুক্তি ক্রয় করে। যা মূলত বাংলাদেশের জনগণ এবং বিশেষভাবে, বিরোধী মত, আলেম-উলামা ও মুসলিম নেতৃত্বের ওপর নজরদারির ক্ষেত্রে কাজে লাগবে। বাংলাদেশের জনগণকে অন্ধকারে রেখে ইসরায়েলের সাথে এরকম পরোক্ষ সামরিক ও বাণিজ্যিক সম্পর্ক মূলত বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও বাংলাদেশ সরকারি নৈতিক অবস্থানকে স্পষ্ট করে দেয়। পাশাপাশি ইসরায়েল যে মধ্যপ্রাচ্য ও মুসলিমবিশ্বের অন্যান্য দেশের সরকারকে বিভিন্নভাবে নির্ভরশীলতার জালে বেঁধে ফেলতে ফেলতে চাইসে, তাও দিনের আলোর মত স্পষ্ট করে দেয়।

দীর্ঘদিন থেকে গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, এমনকি সাজানো বিচারে অন্যায়ভাবে কারাদণ্ড ও মৃত্যুদণ্ড দেয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ রয়েছে বাংলাদেশের আইন-আদালত ও সরকারের বিরুদ্ধে। মিডিয়া ক্যাম্পেইন ও হুমকি-ধমকির মাধ্যমে এসব ধামাচাপা দিতে চাইলেও এসব গোপন থাকে না যখন এসব অহরহ ঘটতে থাকে। ফলে ইসরায়েল রাষ্ট্রের চরিত্রের সাথে বাংলাদেশ সরকারের সাথে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ব্যক্তি ও চরিত্রের খুব বেশি পার্থক্য নেই। ওআইসির সদস্য থাকা বা ফিলিস্তিনের পক্ষে দু’চারবার বিবৃতি দিলেই এই চরিত্র কিছুমাত্র ঢেকে রাখা যায় না। ফলে ইসরায়েলের সাথে এদের ঘনিষ্ঠতা পীড়াদায়ক ও বিশ্বাসঘাতকতা  র শামিল হলেও তা মূলত বাস্তবতারই বহিঃপ্রকাশ। এর মাধ্যমে এটাই প্রমাণিত হয় যে, তৃতীয় বৃহত্তম মুসলিম জনগোষ্ঠীর এই দেশটির শাসনব্যবস্থা মূলত বৈশ্বিক কুফুরি ব্যবস্থার অংশীদার এবং তা বিবেচনায় রেখেই ইসলামি প্রতিরোধ আন্দোলনের প্রতিটি পদক্ষেপ নিতে হবে৷

কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ইসলামপ্রিয় অনেক ত্যাগী ব্যক্তি ও দলকে বাস্তবতাকে পুরোপুরি উপলব্ধি না করে বিভিন্ন ভুল ও অদূরদর্শী পদক্ষেপ নিতে দেখা যায়। বছরের পর এই রাষ্ট্রেরই বিভিন্ন সংস্থা, আইন ও বিচারকাঠামো, ও শাসনব্যবস্থার অংশ হবার জন্য সময়, শ্রম, অর্থ, এমনকি জীবন বাজি রাখতে দেখা যায় অনেককে। কিন্তু এই অসম লড়াইয়ে আমাদের কৌশল হওয়া উচিৎ ছিল ভিন্ন কিছু। মুসলিম ভূমি থেকে কাফেরদের বিতাড়ণ ও সর্বত্র শরীয়া কায়েমের আহবান সকল মুসলিমের কানে কানে পৌঁছে দেয়া ছিল আমাদের কর্তব্য। তা বাদ দিয়ে প্রচলিত রাজনীতি ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনে জড়িয়ে পড়ার মাধ্যমে আমরা মূলত অন্যের সাজানো ছকেই তাদেরকে হারানোর চেষ্টায় লিপ্ত হচ্ছি- যা বোকামি ও জনবল অপচয় ব্যতিত কিছুই নয়। কেননা, এসবের ফলে দিনদিন সংকট আরো ঘনীভূত হয়েছে এবং ইসলামি পুণর্জাগরণের আওয়াজ আস্তে আস্তে ক্ষীণ হয়ে গেছে। ইসলামি আন্দোলন সমূহের সেই শৌর্যবীর্য ও প্রভাব ধরে রাখা যায়নি, যার ফলে ফিলিস্তিন,কাশ্মীর, সোমালিয়াসহ মুসলিমবিশ্বের অন্যান্য জায়গায়  বিশ্বাসঘাতক ও প্রতারকদের বিচরণ বেড়েছে। ইসলামবিদ্ধেষীমহল আরও সহজেই মুসলমান ছেলেমেয়েদেরকে গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতার সবক দিতে পারছে।

উমার ইবনুল খাত্তাব (রাদিয়াল্লাহু আনহু) বলেছিলেন,”আমরা তো মর্যাদাহীন লোক ছিলাম, আল্লাহ আমাদেরকে সম্মানিত করেছেন ইসলামের মাধ্যমে। সুতরাং, আমরা যদি আল্লাহ আমাদেরকে যা দ্বারা সম্মানিত করেছেন তা থেকে দূরে সরে গিয়ে অন্য কোথাও সম্মান খুঁজি তাহলে আল্লাহ আমাদেরকে পুনরায় অপমানিত করবেন।”

এজন্য আমাদের উচিৎ মানুষকে সরাসরি আল্লাহর দীনের দিকে আহবান করা ও রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ও সাহাবাদের আদর্শ বুলন্দ করা তথা জিহাদ-ফি-সাবিলিল্লাহর আবশ্যক বিধানকে নিজেদের জান-মাল দিয়ে বাস্তবায়নের মেহনতে লেগে পড়া। এতদ্ব্যাতিত মুসলমানদের মুক্তির আশা সুদূর পরাহত।