ফাতওয়া  নং  ২৩

কোন মুসলিম করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে কি শহীদ হবে?

কোন মুসলিম করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে কি শহীদ হবে?

কোন মুসলিম করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে কি শহীদ হবে?

মুফতি আবু ‍মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি (হাফিযাহুল্লাহ)

 

প্রশ্ন:

আসসালামু আলাইকুম ওয়ারাহমাতুল্লাহ

বর্তমান করোনা পরিস্থিতির মধ্যে কোনো মুসলিম যদি আক্রান্ত হয়ে মারা যায়, তাহলে অনেক আলেম বলেন, এমন ব্যক্তি শহীদ হবে। আমার প্রশ্ন হল-

প্রথমত: আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করতে করতে শাহাদাতবরণ কারী শহীদের মর্যাদা আর করোনায় আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণ কারী শহীদের মর্যাদা কি এক হবে?

দ্বিতীয়তঃ আল্লাহর রাস্তায় শাহাদাতবরণ কারী শহীদদের কোন মৃত্যুর যন্ত্রণা হয় না, করোনা রোগে শাহাদাত বরণ করলে তার কি মৃত্যুর যন্ত্রণা হবে, নাকি হবে না? জাযাকুমুল্লাহ খাইরান

আজম খান

উত্তর:

কোনো মুমিন করোনায় আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে, সে যদি তা আল্লাহর ফায়সালা হিসেবে মেনে নেয় এবং ধৈর্য ধারণ করে ঈমানের উপর অটল থাকে, আশা করা যায়, পরকালে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করবে ইনশাআল্লাহ। তবে তার মর্যাদা ও আল্লাহর পথে জিহাদরত অবস্থায় শাহাদাত বরণকারীর মর্যাদা কখনো এক নয়। একইভাবে তার মৃত্যু যন্ত্রণা না হওয়ার কথাও নেই; বরং ওলামায়ে কেরাম বলেছেন, মৃত্যু যন্ত্রণা বেশি হবে বিধায়ই তাকে শাহাদাতের মর্যাদা দেয়া হবে।

শহীদ মূলত তিন প্রকার।

এক. দুনিয়া আখেরাত, উভয় বিচারে শহীদ।

যে ব্যক্তিকে আল্লাহর দ্বীনের জন্য জিহাদরত অবস্থায় হত্যা করা হয়। এমন ব্যক্তি দুনিয়া ও আখেরাত, উভয় বিচারে শহীদ। অর্থাৎ দুনিয়ায় তার কাফন দাফন শহীদের মতো হবে এবং পরকালেও তিনি শহীদের মর্যাদা লাভ করবেন।

দুই. শুধু দুনিয়ার বিচারে শহীদ।

যে ব্যক্তিকে জিহাদরত অবস্থায় হত্যা করা হয়, কিন্তু সে আল্লাহর দ্বীনের জন্য জিহাদ করেনি। বীরত্ব প্রদর্শন, গনিমত লাভ কিংবা এজাতীয় দুনিয়াবি কোনো উদ্দেশ্যে জিহাদ করেছে। এমন ব্যক্তি (বাহ্যত জিহাদরত অবস্থায় মারা যাওয়ার কারণে) দুনিয়ার বিচারে শহীদ হবে। তার কাফন দাফন শহীদের মতোই হবে। কিন্তু (নিয়ত সঠিক না থাকায়) পরকালে সে শহীদের মর্যাদা পাবে না।

তিন. শুধু আখেরাতের বিচারে শহীদ।

যারা ডায়রিয়া বা মহামারিতে মারা যায়, আগুনে পুড়ে কিংবা পানিতে ডুবে মারা যায় অথবা যাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হয়, তারা আখেরাতের বিচারে শহীদ হলেও দুনিয়ার বিচারে শহীদ নয়। সুতরাং তাদেরকে সাধারণ মৃত ব্যক্তির মতোই কাফন দাফন করা হবে। তবে তারা পরকালে শহীদের মর্যাদা লাভ করবে।

এই তৃতীয় প্রকারের শহীদটি অনেক ব্যাপক, হাদীসে এসেছে,

الشهداء خمسة: المطعون، والمبطون، والغرق، وصاحب الهدم، والشهيد في سبيل الله –رواه البخاري: 2829

“পাঁচ প্রকার ব্যক্তি শহীদ, ১. তাউন (প্লেগ) রোগে মৃত ব্যক্তি ২. পেটের পীড়ায় মৃত ব্যক্তি ৩. পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী ৪. দেয়াল ইত্যাদির নিচে চাপা পড়ে মৃত ব্যক্তি ৫. আল্লাহর পথে (জিহাদে) শহীদ।” -সহীহ বুখারী, ২৮২৯

উক্ত হাদীসে পাঁচ প্রকার ব্যক্তিকে শহীদ বলা হলেও অন্যান্য হাদীসে আরও অনেক ধরনের ব্যক্তিকে শহীদ বলা হয়েছে। হাফেয ইবনে হাজার রহ. দেখিয়েছেন, সহীহ হাদীসসমূহে মোট ২৭ প্রকার ব্যক্তিকে শহীদ বলা হয়েছে। সুয়ুতী রহ. ও শায়েখ যাকারিয়া কান্ধলভী রহ.র বিবরণ অনুযায়ী সহীহ ও যয়ীফ হাদিস মিলিয়ে প্রায় ৬০ প্রকার ব্যক্তিকে শহীদ বলা হয়েছে। এজন্য আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী রহ. বলেন,

فلما رأيت أن الأحاديث لا تستقر فيه على عدد معين، بدا لي أن توضع له ضابطة، فاستفدت من الأحاديث: أن كل من مات في علة مؤلمة متمادية، أو مرض هائل، أو بلاء مفاجىء فله أجر الشهيد. فمن النوع الأول: المبطون، ومن النوع الثاني: المطعون، ومن الثالث: الغريق. -فيض الباري على صحيح البخاري 2/248  دار الكتب العلمية بيروت – لبنان الطبعة: الأولى، 1426 هـ

“যখন আমি দেখলাম, এ ব্যাপারে বর্ণিত হাদীসসমূহে নির্দিষ্ট সংখ্যা উদ্দেশ্য না, তখন আমার মনে হল, এক্ষেত্রে (হাদীসের আলোকে) একটি মূলনীতি দাঁড় করানো যায়। আমি সবগুলো হাদীসের আলোকে যা বুঝলাম, তা হল, প্রত্যেক এমন রোগ যা দীর্ঘস্থায়ী ও অধিক কষ্টদায়ক হয় কিংবা ভয়ংকর কোন ব্যাধি অথবা আকস্মিক বিপদে মৃত ব্যক্তিগণ শহীদের সওয়াব পাবেন। প্রথম প্রকারের উদাহরণস্বরূপ হাদীসে পেটের পীড়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে, দ্বিতীয় প্রকারের উদাহরণ দেয়া হয়েছে, তাউন (প্লেগ) রোগের মাধ্যমে, আর তৃতীয় প্রকারের উদাহরণ হচ্ছে পানিতে ডুবে মৃত্যুবরণকারী ব্যক্তি।” –ফয়যুল বারী, ২/২৪৮; আবওয়াবুস সাআদাহ ফি আসবাবিশ শাহাদাহ, সুয়ুতী, পৃ: ২০; তাকমিলাতু মাআরিফিস সুনান, মুহাম্মদ যাহেদ ১/৫৪৭

সুতরাং আশা করা যায়, কেউ করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে মারা গেলে, তিনি যদি এটিকে আল্লাহর ফায়সালা হিসেবে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিয়ে ধৈর্য ধারণ করেন, তাহলে তিনিও আখেরাতে শাহাদাতের মর্যাদা লাভ করবেন ইনশাআল্লাহ।

তবে মহামারিতে মৃত্যু বরণকারী শহীদ আর আল্লাহর পথে জিহাদরত অবস্থায় মৃত্যু বরণকারী শহীদের মর্যাদা কখনও এক নয়। বরং যারা আল্লাহর পথে শহীদ হয়েছেন, তাদেরও সকলের মর্যাদা সমান নয়। সহীহ বুখারীর একটি হাদীসে এসেছে,

إن في الجنة مائة درجة أعدها الله للمجاهدين في سبيله، كل درجتين ما بينهما كما بين السماء والأرض. -رواه البخاري: 6987

“আল্লাহর পথে জিহাদকারীদের জন্য আল্লাহ তাআলা জান্নাতে একশটি স্তর প্রস্তুত রেখেছেন। প্রতি দুটি স্তরের ব্যবধান আসমান যমিনের সমপরিমাণ।” -সহীহ বুখারী: ৬৯৮৭

হযরত উমর রাযি. থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে এসেছে, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

الشهداء أربعة: رجل مؤمن جيد الإيمان، لقي العدو، فصدق الله حتى قتل، فذلك الذي يرفع الناس إليه أعينهم يوم القيامة هكذا ورفع رأسه حتى وقعت قلنسوته، قال: فما أدري أقلنسوة عمر أراد أم قلنسوة النبي صلى الله عليه وسلم؟ قال: ورجل مؤمن جيد الإيمان لقي العدو فكأنما ضرب جلده بشوك طلح من الجبن أتاه سهم غرب فقتله فهو في الدرجة الثانية، ورجل مؤمن خلط عملا صالحا وآخر سيئا لقي العدو فصدق الله حتى قتل فذلك في الدرجة الثالثة، ورجل مؤمن أسرف على نفسه لقي العدو فصدق الله حتى قتل فذلك في الدرجة الرابعة. رواه الترمذي (1644) وقال: هذا حديث حسن. وروى أحمد (17657) من حديث  عن عتبة بن عبد السلمي نحوه، وزاد فيه: فمصمصة محت ذنوبه وخطاياه، إن السيف محاء الخطايا، وأدخل من أي أبواب الجنة شاء.

চার শ্রেণির মানুষ শহীদ:

১. মযবুত ঈমানের অধিকারী (মুত্তাকী ও সাহসী) ব্যক্তি। সে শত্রুর মুখোমুখি হয়ে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে আল্লাহর সঙ্গে কৃত অঙ্গীকার পূর্ণ করে নিহত হয়। কিয়ামতের দিন মানুষ তার দিকে এভাবে চোখ তুলে তাকিয়ে থাকবে, (এ কথা বলে) তিনি তাঁর মাথা উত্তোলন করে দেখালেন, এমনকি এতে তাঁর টুপি পড়ে যায়, (বর্ণনাকারী বলেন) আমি জানি না, এখানে কার টুপি উদ্দেশ্য, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের টুপি? না উমরের টুপি?

২. মজবুত ঈমানের অধিকারী (কিন্তু ভীরু)। যখন সে শত্রুর মুখোমুখি হয়, ভীরুতার কারণে তার নিকট মনে হয়, যেন তার চামড়ায় বাবলা গাছের কাঁটা দিয়ে আঘাত করা হচ্ছে। হঠাৎ একটি তীর বিদ্ধ হয়ে তাকে হত্যা করে ফেলল। সে হল দ্বিতীয় স্তরের শহীদ।

৩. এমন মুমিন, যে কিছু নেক আমলও করেছে এবং গুনাহের কাজও করেছে। সে শত্রুর মুখোমুখি হয়ে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে নিহত হয়। সে হল তৃতীয় স্তরের শহীদ।

৪. এমন মুমিন যে অনেক গুনাহ করে নিজের উপর জুলুম করেছে, সে শত্রুর মুখোমুখি হয়ে বীরত্বের সাথে যুদ্ধ করে আল্লাহর সঙ্গে কৃত ওয়াদা পূর্ণ করে এবং নিহত হয়। সে হলো চতুর্থ স্তরের।”

মুসনাদে আহমদে বর্ণিত অপর হাদিসে এসেছে, “এই মৃত্যু তার গুনাহকে মিটিয়ে দিবে। নিশ্চয়ই তরবারী গুনাহকে সম্পূর্ণরূপে মিটিয়ে দেয় এবং সে জান্নাতের যে দরজা দিয়ে ইচ্ছা, প্রবেশ করবে।”-জামে তিরমিযী, ১৬৪৪; মুসনাদে আহমদ, ১৭৬৫৭ ইমাম তিরমিযী হাদিসটিকে হাসান বলেছেন।

আরেকটি হাদীসে এসেছে,

سيد الشهداء يوم القيامة حمزة بن عبد المطلب ورجل قام إلى إمام جائر فنهاه وأمره فقتله – رواه الطبراني فى المعجم الأوسط: 4079، قال الهيثمي في مجمع الزوائد (رقم: 12165): رواه الطبراني في الأوسط وفيه شخص ضعيف. اهـ

“কেয়ামতের দিন শহীদদের সরদার হবে হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব এবং ওই ব্যক্তি, যে কোন জালিম বাদশার সামনে দাঁড়াল, তাকে (অন্যায় থেকে) নিষেধ করল এবং (ভালো কাজের) আদেশ করল, অত:পর বাদশা তাকে হত্যা করে ফেলল।” –আলমু’জামুল আওসাত, তাবারানি: ৪০৭৯

একইভাবে জিহাদরত শহীদের ব্যাপারে হাদীসে যে মৃত্যু যন্ত্রণা না হওয়ার কথা এসেছে, মহামারিতে শহীদের ব্যাপারে এমন কথা নেই। বরং ইবনুত তীন রহ. বলেছেন, কষ্ট অধিক হওয়ার কারণেই আল্লাহ তাআলা তাকে শহীদের মর্যাদা দান করেন।

হাফেয ইবনে হাজার রহ. (৮৫২ হি.) বলেন,

قال ابن التين هذه كلها ميتات فيها شدة تفضل الله على أمة محمد صلى الله عليه و سلم بأن جعلها تمحيصا لذنوبهم وزيادة في أجورهم يبلغهم بها مراتب الشهداء. –فتح الباري، ج: 6، ص: 44، ط. دار المعرفة – بيروت

“ইবনুত তীন রহ. বলেন, এ সবগুলো হল কষ্টের মৃত্যু। আল্লাহ তাআলা অনুগ্রহ করে উম্মতে মুহাম্মাদির জন্য সেগুলোকে গুনাহ মাফের কারণ ও সওয়াব বৃদ্ধির মাধ্যম বানিয়েছেন, যার উসিলায় তিনি তাদেরকে শহীদদের মর্যাদায় পৌঁছে দেবেন।” -ফাতহুল বারী, ৬/৪৪

فقط. والله تعالى اعلم بالصواب

আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি

৯ই জুন, ২০২০ ঈ.