ফাতওয়া  নং  ২২৫

পুরুষ শিক্ষকের সামনে চেহারা খোলা রেখে ক্লাস করা কি জায়েয হবে?

পুরুষ শিক্ষকের সামনে চেহারা খোলা রেখে ক্লাস করা কি জায়েয হবে?

পিডিএফ ডাউনলোড করুন

ওয়ার্ড ডাউনলোড করুন

পুরুষ শিক্ষকের সামনে চেহারা খোলা রেখে ক্লাস করা কি জায়িয হবে?

 

প্রশ্ন: 

আমার বোন ঢাকার প্রসিদ্ধ একটি স্কুলে ক্লাস নাইনে পড়ে। সেখানে ছেলে-মেয়েদের আলাদা শিফট আছে। মেয়েদের মর্নিং শিফট। ছেলেদের ডে শিফট। এক্ষেত্রে কোন সমস্যা নেই। সে সম্পূর্ণ পর্দা মেনেই স্কুলে যায়। কিন্তু সমস্যা হল, পুরুষ শিক্ষকদের সামনে তাকে চেহারা খোলা রেখে ক্লাস করতে হয়। এমতাবস্থায় তার জন্য সেখানে পড়া কি জায়িয হবে?

প্রশ্নকারী-আব্দুর রহমান

উত্তর:

بسم الله الرحمن الرحيم

الحمد لله وكفى وسلام علي عباده الذين اصطفى أمابعد

প্রাপ্তবয়স্ক প্রত্যেক নারীর জন্য বেগানা পুরুষ থেকে পর্দা করা ফরজ। একান্ত প্রয়োজন না থাকলে নারীকে গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান করতে বলা হয় এবং সৌন্দর্য প্রকাশ করতে নিষেধ করা হয়।

আল্লাহ তায়ালা বলেন-

وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى.

“তোমরা গৃহাভ্যন্তরে অবস্থান কর। আগের জাহিলী যুগের অনুরূপ নিজেদেরকে প্রদর্শন কর না।” (সূরা আহযাব ৩৩ : ৩৩)

কখনও নিতান্ত প্রয়োজনে ঘর থেকে বের হলে পূর্ণ শরয়ী পর্দা সহকারে বের হতে হবে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-

يَاأَيُّهَا النَّبِيُّ قُلْ لِأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِنْ جَلَابِيبِهِنَّ ذَلِكَ أَدْنَى أَنْ يُعْرَفْنَ فَلَا يُؤْذَيْنَ وَكَانَ اللَّهُ غَفُورًا رَحِيمًا.

“হে নবী! আপনি আপনার পত্নীগণকে ও কন্যাগণকে এবং মু`মিনদের স্ত্রীগণকে বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিয়দাংশ নিজেদের (মুখের) ওপর নামিয়ে দেয়। এতে তাদেরকে চেনা সহজতর হবে (যে, তারা সতী সাধ্বী মু`মিন নারী), ফলে তাদেরকে উত্যক্ত করা হবে না। আল্লাহ অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।” (সূরা আহযাব ৩৩ : ৫৯)

এ আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম ইবন কাসীর (র) (৭৭৪ হি.) বলেন-

قال علي بن أبي طلحة، عن ابن عباس: أمر الله نساء المؤمنين إذا خرجن من بيوتهن في حاجة أن يغطين وجوههن من فوق رؤوسهن بالجلابيب، ويبدين عينا واحدة. (تفسير ابن كثير: 6/442)

“আলী ইবন আবী তালহা, ইবন আব্বাস (রা) থেকে বর্ণনা করেন, আল্লাহ তা`আলা মু`মিন নারীদেরকে নির্দেশ দেন যে, তারা যখন নিজ ঘর থেকে কোন প্রয়োজনে বের হয়, তখন তাদের মুখমণ্ডলকে যেন মাথার ওপর থেকে বড় চাদর দিয়ে ঢেকে নেয় এবং এক চোখ খোলা রাখে।” (তাফসিরে ইবন কাসীর: ৬/৪৪২)

ইমাম আবু বকর জাসসাস (র) (৩৭০ হি.) বলেন-

في هذه الآية دلالة على أن المرأة الشابة مأمورة بستر وجهها عن الأجنبيين وإظهار الستر والعفاف عند الخروج لئلا يطمع أهل الريب فيهن. اهـ (احكام القران: 3/486)

“এ আয়াত এ ব্যাপারে স্পষ্ট প্রমাণ যে, যুবতী নারী বের হওয়ার সময় নিজ মুখমণ্ডল পরপুরুষ থেকে ঢেকে রাখা এবং পর্দা ও সংযম প্রকাশ করার বিষয়ে আদিষ্ট, যেন অসাধু ব্যক্তিরা তাদের ব্যাপারে কোন লালসা করতে না পারে।” (আহকামুল কুরআন: ৩/৪৮৬)

সুতরাং আপনার বোনের জন্য যদি পর্দার ফরজ বিধান রক্ষা করে ঐ স্কুলে ক্লাস করা সম্ভবপর না হয়, তাহলে তার জন্য সেখানে যাওয়া সম্পূর্ণ নাজায়িয। অবিলম্বে সেখানে যাতায়াত বন্ধ করা জরুরি।

ইমাম মুহাম্মদ বিন শিহাব আল-বাযযায (৮২৭ হি.) (র) বলেন:

ولا يأذن بالخروج إلى المجلس الذي يجتمع فيه الرجال والنساء وفيه من المنكرات.اهـ – الفتاوى البزازية (2/ 26)

“(নারীদের) এমন মজলিসে যেতে অনুমতি দেয়া যাবে না, যেখানে নারী-পুরুষ একত্র হয় ….।” (ফাতওয়া বাযযাযিয়া: ২/২৬)

এ হল শুধু পর্দার বিধানের কথা। এছাড়াও বর্তমান জেনারেল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় পর্যায়ে বিভিন্ন বিজাতীয় দিবস, সভ্যতা ও সংস্কৃতি ইত্যাদিতে যোগ দেয়ার বাধ্যবাধকতা আছে, যেগুলোতে অনেক সময়ই একজন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন হারাম ও কুফরি কাজে লিপ্ত হতে হয়।

আরও গুরুতর সমস্যা হচ্ছে, এদেশের প্রচলিত ধারার পুরো শিক্ষাব্যবস্থাই সেক্যুলার ও বস্তুবাদী কুফরি চিন্তাদর্শনের ভিত্তিতে গড়া এবং এ শিক্ষাব্যবস্থা তাদের কুফরি ও ত্বাগুতি রাষ্ট্রব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তিমূল। এর অন্যতম লক্ষ্যই হচ্ছে, একজন মুসলিম নামে মুসলিম থাকলেও, আকীদা বিশ্বাস ও চিন্তা-চেতনায় হয়ে উঠবে একজন সেক্যুলার মুশরিক কিংবা বস্তুবাদী নাস্তিক। সে নামে মুসলিম হলেও অন্য সব কুফরি ধর্ম ও ধর্মবিশ্বাসকে সম্মান করা জরুরি মনে করবে। মসজিদে গিয়ে জামা`আতের সঙ্গে সালাত আদায় করলেও; সমাজ, রাষ্ট্র ও আইন আদালতে ইসলামকে অচল মনে করবে। ইসলামের বিধানকে উন্নতি ও অগ্রগতির অন্তরায় মনে করবে। ইসলাম ধর্ম ও কুফরি ধর্মকে সমমর্যাদার মনে করবে। ইসলামের অনেক বিধানকে সেকেলে, অচল, পশ্চাতপদ ও বর্বর মনে করবে। ইসলামী বিধানের মোকাবেলায় পশ্চিমাদের বিধানকে যুগোপযোগী, আধুনিক ও কল্যাণকর মনে করবে। এগুলোর প্রত্যেকটিই সুস্পষ্ট কুফর। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার এসব ফলাফল আজ আমাদের চোখের সামনে। এমন অসংখ্য উদাহরণের মাঝে লড়াই করেই আজ আমাদেরকে সমাজে কোন রকম ঈমান বাঁচিয়ে টিকে থাকতে হচ্ছে। যারা এ শিক্ষাব্যবস্থার কাছে নিজেদেরকে সঁপে দিচ্ছেন, তারা আজ শুধু ঈমানহারা হচ্ছেন তাই নয়; বরং ঈমান, ইসলাম ও ইসলামী শরীয়াহর বিরুদ্ধে বিদ্রোহী হয়ে উঠছেন। আল্লাহর বিশেষ করুণায় কেউ বেঁচে গেলে ভিন্ন কথা।

সুতরাং যেসব প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করলে এমন নাজায়িয, হারাম ও কুফর শিরকে লিপ্ত হওয়া অবশ্যম্ভাবী, সেসব প্রতিষ্ঠানে পড়ালেখা করা কোন মু`মিনের জন্য জায়িয নয়। অনেক ক্ষেত্রে ঈমানহারা হওয়ারও  আশঙ্কা আছে। অভিভাবকের জন্যও সন্তানকে এসব প্রতিষ্ঠানে পাঠানো জায়িয নয়। আল্লাহর এমন নাফরমানির কাজে পিতামাতার অনুগত্যও সন্তানের জন্য জায়িয নয়।

হাদীসে এসেছে-

عن علي، قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: «لا طاعة لبشر في معصية الله». –صحيح البخاري (7257) ، صحيح مسلم (1840) مصنف ابن أبي شيبة (34998) واللفظ له.

 “আলী (রা) থেকে বর্ণিত, রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, আল্লাহ তা`আলার অবাধ্য হয়ে কোন মানুষের আনুগত্য করা যাবে না।” (সহীহ বুখারী: ৭২৫৭; সহীহ মুসলিম: ১৮৪০; মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবা: ৩৪৯৯৮)

উমারাহ (র) বলেন-

نزل معضد إلى جنب شجرة، فقال: ما أبالي أطعت رجلا في معصية الله، أو سجدت لهذه الشجرة من دون الله. -مصنف ابن أبي شيبة: 34403

“(বিশিষ্ট তাবিয়ী) মি’দাদ (র) একটি গাছের পাশে অবতরণ করেন। অত:পর তিনি বলেন, আল্লাহর অবাধ্য হয়ে কোন মানুষের আনুগত্য করা, আর আল্লাহর পরিবর্তে এই গাছকে সিজদা করা আমার নিকট বরাবর।” (মুসান্নাফ ইবন আবী শাইবা: ৩৪৪০৩)

আল্লাহ তা`আলা আমাদের হিফাজত করুন। আ-মীন।

আরও জানার জন্য নিচের ফতোয়াগুলো দেখুন:

সরকারপ্রদত্ত উপবৃত্তির টাকা গ্রহণ করার হুকুম কী?

https://fatwaa.org/2021/08/01/2368 /

বিশ্ববিদ্যালয় ও হাই স্কুলে শিক্ষকতা করার হুকুম কী?

https://fatwaa.org/2021/06/03/2291/

সহশিক্ষার হুকুম কী?

https://fatwaa.org/2021/01/11/2057/

فقط والله تعالي أعلم بالصواب

আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি (উফিয়া আনহু)

০৩-০৬-১৪৪৩ হি.

০৭-০১-২০২২ ঈ.