ফাতওয়াফাতওয়া  নং  ৫৪২

টাকার মান কমে গেলে কি বাড়িয়ে ঋণ উসুল করা যাবে?

টাকার মান কমে গেলে কি বাড়িয়ে ঋণ উসুল করা যাবে?

পিডিএফ ডাউনলোড করুন
ওয়ার্ড ডাউনলোড করুন

প্রশ্ন:

আমরা একটি দ্বীনি সংস্থার দায়িত্বশীল। এ সংস্থা থেকে আমরা বিভিন্ন প্রয়োজনে কোনো কোনো ভাইকে লোন দিয়ে থাকি। দেখা গেছে, কারো কারো কাছে বেশ অনেক বছর ধরে লোন দেওয়া আছে। অনেক সময় মোটা অংকের লোনও হয়ে থাকে। ভাইরা অল্প অল্প করে আদায় করে থাকেন।

এখন প্রশ্ন হলো, যখন লোন দেওয়া হয়েছে তখন টাকার মান ভালো ছিল। যতই দিন যাচ্ছে মান কমছে। উদাহরণত, যখন লোন দেওয়া হয়েছে, তখন স্বর্ণের ভরি হয়তো এক লাখ টাকা ছিল। কিন্তু  যখন অল্প অল্প করে লোন আদায় করছেন তখন শেষ পর্যন্ত গিয়ে স্বর্ণের ভরি হয়ে যাচ্ছে দেড় লাখ টাকা। অতএব ওই ভাই লোন তো ওই টাকাই আদায় করছেন। কিন্তু বাস্তবে ওই টাকার মান কমে এক লাখ টাকা হয়ে যাচ্ছে হয়তো ৮০ হাজার টাকা।

এখন আমাদের জানার বিষয় হলো,

এক. এভাবে টাকার মানের দিকে তাকিয়ে এক লাখ টাকা নিয়ে যেন ৮০ হাজার উসুল করা হচ্ছে। এর ফলে এটি সুদী লেনদেন হচ্ছে কি না?

দুই. আমরা যদি টাকার মানের দিকে তাকিয়ে (স্বর্ণকে মূল ধরে) এক লাখ টাকায় এক লাখ ২০ হাজার টাকা উসূল করি, তাহলে সেটা সুদ হবে কি না?

-আবদুল মান্নান

উত্তর:

بسم الله الرحمن الرحيم

الحمد لله وسلام على عباده الذين اصطفى، أما بعد!

ঋণের ক্ষেত্রে নিয়ম হচ্ছে, মুদ্রার মান বাড়ুক বা কমুক; যত নিয়েছে ততই আদায় করবে। মুদ্রার মান কমে গেলেও বেশি আদায় করবে না, আবার মুদ্রার মান বেড়ে গেলেও কম আদায় করবে না। উভয় অবস্থায় যত নিয়েছে, ততই আদায় করতে হবে।

স্বর্ণের মূল্যের সাথে সামঞ্জস্য রেখেও আদায় করবে না। যেহেতু স্বর্ণ ঋণ নেয়নি, নিয়েছে টাকা। অতএব এক লাখ টাকা ঋণ নিলে এক লাখই আদায় করবে; যদিও মুদ্রার মান কমে যাওয়ায় স্বর্ণের মূল্যের বিবেচনায় তা আশি হাজার মনে হয়। এটি সুদ নয়। বরং স্বর্ণের মূল্যের বিবেচনায় এক লাখ ঋণ দিয়ে এক লাখের বেশি নিলে সেটিই সুদ হবে। -রদ্দুল মুহতার: ৩/৭৮৯, ৫/১৬৩[1] ; ইমদাদুল ফাতাওয়া (জাদীদ): ৭/২৯-৩০, যাকারিয়া; ফাতাওয়া মাহমুদিয়া: ১৬/৪০৫, ৪০৭, জামিয়া ফারুকিয়া করাচি; ফাতাওয়া মুফতী মুজাহিদুল ইসলাম কাসেমি: ১০৭; তিজারত কে মাসায়েল কা ইনসাইক্লোপিডিয়া (মুফতী এনামুল হক কাসেমি): ৫/১৯২-১৯৩

হাঁ, কোনো রকম পূর্বশর্ত ও চাপ ব্যতীত পরিশোধকারী যদি স্বেচ্ছায় কিছু বাড়িয়ে দেয়, তাহলে কোনো সমস্যা নেই; বরং ঋণ গ্রহীতার জন্য এভাবে কিছু অতিরিক্ত পরিশোধ করা উত্তম। হাদীসে এ ব্যাপারে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছে। সহীহ বুখারীতে এসেছে,

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ، قَالَ: … قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «إِنَّ خِيَارَكُمْ أَحْسَنُكُمْ قَضَاءً»[2].  -صحيح البخاري (طوق النجاة، 3/ 117): 2393، كِتَاب فِي الِاسْتِقْرَاضِ وَأَدَاءِ الدُّيُونِ وَالحَجْرِ وَالتَّفْلِيسِ، باب حسن القضاء

“আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম ব্যক্তি হচ্ছে যারা উত্তমভাবে পাওনা পরিশোধ করে।” –সহীহ বুখারী: ২৩৯৩

কিছু বাড়িয়ে পরিশোধ করাও উত্তমভাবে পাওনা পরিশোধের অন্তর্ভুক্ত। যেমন সহীহ বুখারীর আরেক বর্ণনায় এসেছে,

عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، قَالَ: أَتَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَهُوَ فِي المَسْجِدِ – قَالَ مِسْعَرٌ: أُرَاهُ قَالَ: ضُحًى – فَقَالَ: «صَلِّ رَكْعَتَيْنِ»، وَكَانَ لِي عَلَيْهِ دَيْنٌ، فَقَضَانِي وَزَادَنِي. -صحيح البخاري (طوق النجاة، 3/ 117): 2394، كِتَاب فِي الِاسْتِقْرَاضِ وَأَدَاءِ الدُّيُونِ وَالحَجْرِ وَالتَّفْلِيسِ، باب حسن القضاء

“জাবের বিন আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন: আমি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের কাছে গেলাম। তাঁর কাছে আমার কিছু পাওনা ছিল। তিনি পাওনা পরিশোধ করে দিলেন এবং কিছু বাড়িয়ে দিলেন।” –সহীহ বুখারী: ২৩৯৪

পক্ষান্তরে পরিশোধ করার শর্ত করলে কিংবা বাড়িয়ে দেয়ার চাপ দিলে জায়েয হবে না; বরং অতিরিক্তটা সুদ গণ্য হবে।[3]  -রদ্দুল মুহতার: ৫/১৬৫

উল্লেখ্য, মুদ্রার মূল্যমানে অস্থিতিশীলতা এবং মূল্যস্ফীতি বর্তমান বিশ্বের একটি সমস্যা। দিন দিন মুদ্রার মান পড়ে যেতে থাকায় দীর্ঘ মেয়াদি ঋণসমূহে এর বড় রকমের প্রভাব দেখা দিচ্ছে। এই দিকটি বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি ঋণসমূহকে স্বর্ণের মূল্যের সাথে বেঁধে দেয়া যায় কি না, এবিষয়ে ফুকাহায়ে কেরাম গবেষণা করেছেন এবং করছেন। কেউ কেউ বেঁধে দেয়ার মতও দিয়েছেন। তবে নির্ভরযোগ্য উলামায়ে কেরামের পক্ষ থেকে এখনও তা ফতোয়া ও সিদ্ধান্ত হিসেবে স্থির হয়নি। যতদিন এবিষয়ে নির্ভরযোগ্য উলামায়ে কেরামের সিদ্ধান্ত না আসবে, ততদিন পূর্বের ফতোয়ার উপরই আমল করতে হবে। অর্থাৎ ঋণ আদায়ে মুদ্রার মূল্যমান বিবেচনায় কমবেশ করা যাবে না।

বিস্তারিত দেখুন: বুহুস: ১/১৮০-২০৩, মাকালা: আহকামুল আওরাকিন নাকদিয়া; জাদিদ ফিকহি মাসায়েল: ৫/২১-৫১

فقط، والله تعالى أعلم بالصواب

আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি (উফিয়া আনহু)

১৩-০৮-১৪৪৬ হি.

১৩-০২-২০২৫ ঈ.

 

আরও পড়ুনঃ দুই দেশের মুদ্রা বিনিময় করা কি বৈধ?

 

[1]   الدر المختار وحاشية ابن عابدين (رد المحتار) (3/ 789)، كتاب الأيمان: قَالُوا إنَّ الدُّيُونَ تُقْضَى بِأَمْثَالِهَا أَيْ إذَا دَفَعَ الدَّيْنَ إلَى دَائِنِهِ ثَبَتَ لِلْمَدْيُونِ بِذِمَّةِ دَائِنِهِ مِثْلُ مَا لِلدَّائِنِ بِذِمَّةِ الْمَدْيُونِ. اهـ

الدر المختار وحاشية ابن عابدين (رد المحتار) (5/ 163): وَبِهَذَا ظَهَرَ أَنَّهُ لَوْ كَانَتْ الدَّرَاهِمُ فِضَّتُهَا خَالِصَةٌ أَوْ غَالِبَةٌ كَرِيَالِ الْفِرِنْجِيِّ فِي زَمَانِنَا فَالْوَاجِبُ رَدُّ مِثْلِهَا، وَإِنْ كَانَا فِي بَلْدَةٍ أُخْرَى، لِأَنَّ ثَمَنِيَّةَ الْفِضَّةِ لَا تَبْطُلُ بِالْكَسَادِ، وَلَا بِالرُّخْصِ أَوْ الْغَلَاءِ. وَيَدُلُّ عَلَيْهِ مَا قَدَّمْنَاهُ عَنْ كَافِي الْحَاكِمِ مِنْ أَنَّهُ لَا يُنْظَرُ إلَى غَلَاءِ الدَّرَاهِمِ وَلَا إلَى رُخْصِهَا. هَذَا مَا ظَهَرَ لِي فَتَأَمَّلْ وَانْظُرْ مَا كَتَبْنَاهُ أَوَّلَ الْبُيُوعِ. اهـ

جاء في العقود الدرية في تنقيح الفتاوى الحامدية (1/ 279)، كتاب البيوع، باب القرض، ط/ دار المعرفة: (سئل) في رجل استقرض من آخر مبلغا من الدراهم وتصرف بها ثم غلا سعرها فهل عليه رد مثلها؟ (الجواب) : نعم، ولا ينظر إلى غلاء الدراهم ورخصها كما صرح به في المنح في فصل القرض مستمدا من مجمع الفتاوى.اهـ

وجاء فيه أيضا: (سئل) فيما إذا استدان زيد من عمرو مبلغا معلوما من المصاري المعلومة العيار على سبيل القرض ثم رخصت المصاري ولم ينقطع مثلها وقد تصرف زيد بمصاري القرض ويريد رد مثلها فهل له ذلك؟ (الجواب): الديون تقضى بأمثالها. -العقود الدرية في تنقيح الفتاوى الحامدية (1/ 281)، كتاب البيوع، باب القرض، ط/ دار المعرفة

[2] مرقاة المفاتيح شرح مشكاة المصابيح (5/ 1954)، باب الإفلاس والإنظار، ط/ دار الفكر: من استقرض شيئا فرد أحسن أو أكثر منه من غير شرطه كان محسنا ويحل ذلك للمقرض، وقال النووي – رحمه الله: يجوز للمقرض أخذ الزيادة سواء زاد في الصفة أو في العدد، ومذهب مالك أن الزيادة في العدد منهي عنها، وحجة أصحابنا عموم قوله – صلى الله عليه وسلم -: ” «فإن خير الناس أحسنهم قضاء» “، وفي الحديث دليل على أن رد الأجود في القرض أو في الدين سنة ومكارم الأخلاق، وليس هو من قرض جر منفعة؛ لأن المنهي عنه ما كان مشروطا في عقد القرض.اهـ

 

[3] رد المحتار (5/ 166)، كتاب البيوع، فصل في القرض، ط/ دار الفكر: (قوله كل قرض جر نفعا حرام) أي إذا كان مشروطا … وإن لم يكن النفع مشروطا في القرض، فعلى قول الكرخي لا بأس به… في جواهر الفتاوى: إذا كان مشروطا صار قرضا فيه منفعة وهو ربا وإلا فلا بأس به اهـ

رد المحتار (5/ 351)، كتاب الحوالة، ط/ دار الفكر: لو قضاه مثل قرضه ثم زاده درهما مفروزا أو أكثر، جاز إن لم يكن مشروطا، وقدمنا هناك عن خواهر زاده: أن المنفعة في القرض إذا كانت غير مشروطة، تجوز بلا خلاف. اهـ

الدر المختار على صدر رد المحتار (5/ 350)، كتاب الحوالة، ط/ دار الفكر: قالوا: إذا لم تكن المنفعة مشروطة ولا متعارفة فلا بأس.اهـ قال الشامي رحمه الله: لو قضاه أحسن مما عليه لا يكره إذا لم يكن مشروطا، قالوا: إنما يحل ذلك عند عدم الشرط إذا لم يكن فيه عرف ظاهر، فإن كان يعرف أن ذلك يفعل كذلك فلا. اهـ. -رد المحتار (5/ 350)، كتاب الحوالة، ط/ دار الفكر

Related Articles

Back to top button