কীভাবে মাহে রমযানের প্রস্তুতি নেব? || নিজ অনিষ্ট থেকে সবাইকে রক্ষা করুন এবং ক্রোধ দমন করুন || ৫ম মজলিস
কীভাবে মাহে রমযানের প্রস্তুতি নেব?
নিজ অনিষ্ট থেকে সবাইকে রক্ষা করুন এবং ক্রোধ দমন করুন
৫ম মজলিস
মাওলানা আবু মিকদাদ হাফিযাহুল্লাহ
بِسْمِ اللّٰهِ الرَّحْمٰنِ الرَّحِيْمِ
الحمد لله رب العالمين ، والصلاة والسلام على سيد الأنبياء والمرسلين، وعلى آله وصحبه أجمعين،
أما بعد فقد قال الله تعالى: يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ.
“হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর সিয়ামকে ফরয করা হয়েছে, যেমনিভাবে তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর ফরয করা হয়েছিল; যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার।” [সূরা বাকারা ০২: ১৮৩]
سبحانك لا علم لنا إلا ما علمتنا إنك أنت العليم الحكيم.
ইতিপূর্বে রমযানের পূর্ব প্রস্তুতির ছয়টি পয়েন্ট অতিবাহিত হয়েছে-
এক. তাওবা করে আল্লাহ তাআলার দিকে ফিরে আসা।
দুই. নামাযকে সুন্দর থেকে সুন্দরতর করা।
তিন. কুরআনের সাথে সম্পর্ক বৃদ্ধি করা।
চার. শাবান মাসে বেশি বেশি রোযা রাখা।
পাঁচ. বেশি বেশি দোয়া করা এবং তাওফীক কামনা করা।
ছয়. ইহতিসাব। অন্তরে আল্লাহর কাছ থেকে প্রতিদান পাওয়ার আশা পোষণ করা।
রমযানের পূর্বে আমরা যেসব প্রস্তুতি নেব, তন্মধ্যে সপ্তম প্রস্তুতি হলো-
০৭. নিজের সকল মন্দ আচরণ থেকে অপর মুসলিমকে হেফাযতে রাখার সংকল্প করা
রমযান শুরু হওয়ার আগেই এর অনুশীলন করব। তাহলে রমযানকে আঁচড় মুক্ত রাখা সহজ হবে ইনশাআল্লাহ।
প্রথমেই বলা হয়েছে, রমযানে মুবাহ বিষয়গুলোকে (পানহার ইত্যাদি) নিষিদ্ধ করার মাধ্যমে খুবই শক্তিশালী একটি প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে। মূলত প্রশিক্ষণ সবসময় বাস্তব যুদ্ধের চেয়ে কঠিনই হয়ে থাকে। যেন বাস্তব ক্ষেত্রে কাজ করা সহজ হয়।
তাকওয়ার এই কঠিন প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য, বান্দা যেন এর মাধ্যমে যেকোনো পরিস্থিতিতে আল্লাহর বিধান পালনে অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারে। কোনো ধরনের বেগ পেতে না হয়। কিন্তু এখন যদি কেউ তাকওয়ার তৃতীয় স্তরের প্রশিক্ষণে এসে প্রথম ও দ্বিতীয় স্তরকে ভাঙ্গতে শুরু করে, তাহলে নিঃসন্দেহে বলা চলে তার প্রশিক্ষণ ব্যর্থ। সুতরাং যে ব্যক্তি মুবাহ জিনিস পরিত্যাগ করার মাধ্যমে প্রশিক্ষণ করতে এসে হারামে লিপ্ত হয়ে যায়, তার প্রশিক্ষণ নিঃসন্দেহে ব্যর্থ হবে।
এ কারণেই হাদীসে এসেছে-
«مَنْ لَمْ يَدَعْ قَوْلَ الزُورِ وَالْعَمَلَ بِهِ فَلَيْسَ للهِ حَاجَةٌ فِي أنْ يَدَعَ طَعَامَهُ وَشَرَابَهُ» (رواه البخاري: 1903).
“যে ব্যক্তি রোযা রেখে মিথ্যা বলা এবং এর উপর আমল করা থেকে বিরত থাকতে পারলো না, এমন ব্যক্তির পানাহার পরিত্যাগ করার দ্বারা আল্লাহর কোনো প্রয়োজন নেই।” [সহীহ বুখারী: ১৯০৩]
এসব বলা অনেক সহজ। কিন্তু আমলে পরিণত করা অনেক কঠিন। তাই আগে থেকেই শুরু করতে হবে। আমাদের দ্বারা কোনো মুসলমানের সম্মানহানী হয় কিংবা কষ্ট হয়, এমন সকল কাজ এখন থেকেই পরিহার করব।
রোযায় দেহের পাশাপাশি দিলেরও পরিবর্তন হতে হবে
রোযার মাধ্যমে পেট খালি থাকে, দেহ দুর্বল হয়, চেহারা শুকিয়ে যায়… কিছু পরিবর্তন আমাদের দেহে হয়। কিন্তু এগুলো করে যদি আমরা আমাদের দিলে কোনো পরিবর্তন না আনতে পারি, যদি এতে আমাদের অন্তর বিগলিত না হয়, আমাদের তাকওয়া, ঈমান, আল্লাহর দিকে অগ্রসর হওয়া, দ্বীনের প্রতি দরদ, মুমিনদের প্রতি সহমর্মিতা, সর্বোপরি আল্লাহ তাআলার আনুগত্য যদি বৃদ্ধি না পায়, তাহলে এই কষ্ট করে কী লাভ?
হাদীসে এসেছে-
«رُبَّ قَائِمٍ حَظّهُ مِنْ قِيَامِهِ السَّهَرُ، وَرُبَّ صَائِمٍ حَظُّهُ مِنْ صِيَامِهِ الجُوعُ وَالعَطَشُ». -رواه ابن ماجه: 1690 وابن خزيمة: 1997 وقال البوصيري في مصباح الزجاجة (2/ 69) : هذا إسناد صحيح رجاله ثقات.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, “অনেক রাত্রিজাগরণকারী আছে যার ভাগে রাত্রি জাগা ছাড়া আর কিছুই নেই এবং অনেক রোযাদার আছে যার ভাগে ক্ষুধা এবং তৃষ্ণার কষ্ট ছাড়া কিছুই নেই।”-সুনানে ইবনে মাজাহ: ১৬৯০; সহীহ ইবনে খুযাইমা: ১৯৯৭
«الصِّيَامُ جُنَّةٌ، وَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلَا يَرْفُثْ، وَلَا يَصْخَبْ، فَإِنْ سَابَّهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ فَلْيَقُلْ: إِنِّي امْرُؤٌ صَائِمٌ» (رواه البخاري: 1904).
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “রোযা হচ্ছে ঢাল। সুতরাং তোমাদের যে ব্যক্তি রোযা রাখবে সে যেন অশ্লীল কথা না বলে, হৈচৈ না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় কিংবা মারামারি করতে চায়, সে যেন বলে, “আমি রোযাদার।” -সহীহ বুখারী: ১৯০৪
“আমি রোযাদার”- এ কথাটির চর্চা বৃদ্ধি করব
“আমি রোযাদার, তাই তোমার কথার কোনো প্রতিউত্তর দিবো না।”
ঘরের বাচ্চাদের মধ্যেও এ কথাটি চালু করার চেষ্টা করব। বাচ্চারা ঝগড়া করছে, তাদেরকে শিখিয়ে দিন, তারা যেন একে অপরকে এটা বলে। আমরা আমাদের স্ত্রীদেরকে বলব, তোমার কটু কথার উত্তর আমি দিবো না, কারণ আমি রোযাদার।
এমনভাবে চালু করব, যাতে আমাদের স্ত্রীরাও আমাদেরকে এটা বলতে পারে। এভাবে দেখা যাবে, একটা আবহ তৈরি হবে। মনে রাখবেন, যেহেতু কথাটি স্বয়ং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের শিখিয়েছেন, তাই হুবহু এ কথাটি বলার মধ্যে আমাদের জন্য অনেক কল্যাণ থাকবে। রোযা অবস্থায় যেকোনো বিবাদের মাঝে এ কথাটি পানি ঢেলে দেয়ার মতো কাজ করবে ইনশাআল্লাহ।
রোযার হেফাযত করুন
عن طليق بن قيس قال: قال أبو ذر – رضي الله عنه -: «إذا صُمْتَ فتحفَّظْ ما استطعْتَ». –المصنف لابن أبي شيبة: 8970
হযরত আবু যর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “তুমি যখন রোযা রাখ, তখন যথাসম্ভব নিজেকে হেফাযতে রাখ।” -মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা: ৮৯৭০
عن مجاهد قال: «من أحب أن يسلم له صومه؛ فليتجنب الغيبة والكذب». –الزهد لهناد بن السري: 2/572 ط. دار الخلفاء
হযরত মুজাহিদ রহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি চায়, তার রোযা নিরাপদ থাকুক, সে যেন গীবত ও মিথ্যা থেকে বিরত থাকে।” -আয-যুহদ, হান্নাদ ইবনুস সারী: ২/৫৭২
সবচেয়ে সহজ রোযা
وعن ميمون بن مهران: «إن أهون الصوم ترك الطعام والشراب». –المصنف لابن أبي شيبة: 8976
হযরত মাইমুন বিন মিহরান রহিমাহুল্লাহ বলেন, “সবচেয়ে সহজ রোযা হলো, পানাহার পরিত্যাগ করা।” -মুসান্নাফ ইবনে আবী শাইবা: ৮৯৭৬
সবচেয়ে কঠিন রোযা
সবচেয়ে কঠিন রোযা হলো, তাকওয়ার সকল স্তর ঠিক রেখে রোযা রাখা। ঈমানে আঘাত আসে এমন আচরণ না করা এবং সকল হারাম কাজ থেকে বিরত থাকা- এগুলো ঠিক রেখে তাকওয়ার তৃতীয় স্তর তথা পানাহার ও স্ত্রীর সঙ্গে নির্জন সাক্ষাত থেকে বিরত থাকা।
রমযানের পূর্বে আমরা যেসব প্রস্তুতি নেব, তন্মধ্যে অষ্টম প্রস্তুতি হলো-
০৮. গোস্বা সংবরণ, অপরকে ক্ষমা করা এবং জাহেলদেরকে এড়িয়ে চলার অনুশীলন
ক্রোধ দমন করা এবং অপরকে ক্ষমা করে দেওয়া। এটা আল্লাহ তাআলা মুত্তাকীদের সিফাত বলে বর্ণনা করেছেন।
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ (133) الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ (134) –آل عمران: 133، 134
মুত্তাকীদের গুরুত্বপূর্ণ দুটি গুণ হলো, গোস্বা হজম করা এবং মানুষকে ক্ষমা করে দেওয়া। [সূরা আলে-ইমরান ০৩: ১৩৩-১৩৪]
এই দুইটা সিফাত যদি আমরা আমাদের মধ্যে ধারণ করতে পারি তাহলে আশা করা যায়, আমাদের রমযান অতি সুন্দর হয়ে যাবে।
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কখনো নিজের স্বার্থে কারো উপর গোস্বা হননি। এটা বলা সহজ, কিন্তু আমল করা অত্যন্ত কঠিন।
যে যত বেশি স্বার্থের জাল চতুর্দিকে ছড়িয়ে দেয়, তার গোস্বাও তত বেশি আসে। আর যে নিজের স্বার্থগুলোকে যত ছোট ও সীমিত করে ফেলতে পারে, তার স্বার্থে মানুষের পাও তত কম পড়ে। আঘাতও কম লাগে। ফলে তার গোস্বা আসার সুযোগও কম হয়। আমাদের মধ্যে যে যত বেশি অন্যের স্বার্থে কাজ করতে পারবে, তার স্বার্থের জাল দিন দিন তত বেশি সংকুচিত হতে থাকবে।
গোস্বা সংবরণের অনুশীলন ঘর থেকে শুরু করব
আমরা একদিনেই প্রথম শ্রেণি থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে উঠতে পারব না। আমাদেরকে ধাপে ধাপে উঠতে হবে। সবার আগে আমরা নিজের উপর নিয়ন্ত্রণ আনার চেষ্টা করব। আগে বাচ্চাদের উপর কিংবা স্ত্রীর উপর যতটুকুতে রেগে যেতাম, ধীরে ধীরে তা কমিয়ে আনার চেষ্টা করব। সুন্দরভাবে তাদের ভুলের ইসলাহ করার চেষ্টা করব। একটু খেয়াল করলে দেখব, তাদের অনেক ভুল আছে এমন যে, তার মূল আমরাই। ঘরের যোগ্য কর্তা হওয়া সহজ কোনো বিষয় নয়। নিজেরা সব কাজে অলসেমি করি, আর স্ত্রীর কাছে আশা করি, সে তড়িৎ সব কাজ সেরে ফেলবে।
যে যত যোগ্য কর্তা হবে, তাকে তত বেশি সতর্ক ও সক্রিয় থাকতে হয়। পুরো সৃষ্টিকুলের কর্তা হলেন, মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামীন। তাঁর অবস্থা দেখুন, তিনি কখনো ঘুমান না। তাঁর কখনও তন্দ্রা পর্যন্ত আসে না। মূলত যে যত বড় কর্তা হবে, তার সজাগ ভাব ও সতর্কতা ততবেশি হতে হবে।
অনেক সময় আমরা আমাদেরই অলসতার প্রভাব আমাদের সন্তান ও স্ত্রীর মধ্যে দেখতে পাই। কিন্তু পরে আবার রাগ ঝাড়ি তাদেরই উপর। এসব বিষয় নিয়ে আমাদের গভীরভাবে চিন্তা করা উচিৎ। পরিবারের সবার ইসলাহের সূচনা হবে আমার নিজের ইসলাহ দিয়েই।
দ্বীনদারি সবার শেষে ঘরে আসে
হাদীস শরীফে এসেছে-
عَنِ أَبِي هُرَيْرَةَ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: ” أَكْمَلُ المُؤْمِنِينَ إِيمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا، وَخَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِنِسَائِهِمْ. رواه الترمذي: 1162 وقال: حديث حسن صحيح.
“মুমিনদের মধ্যে ঈমানে সর্বাধিক পূর্ণ ওই ব্যক্তি যার আখলাক সবচেয়ে বেশি সুন্দর। আর তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ তারাই, যারা তাদের স্ত্রীদের কাছে শ্রেষ্ঠ।” -জামে তিরমিযী: ১১৬২
এটা একটা বিরাট বড় ঘোষণা। মানুষের দ্বীনদারি সর্বশেষ পর্যায়ে আসে তার ঘরে। তাই কেউ যদি ঘরে দ্বীনদার হয়ে যেতে পারে, তাহলে আমরা নিশ্চিত থাকব যে, সে বাইরেও দ্বীনদার হবে।
মানুষের একটা স্বাভাবিক চরিত্র হলো, যে জিনিসটা বেশি দৃশ্যমান তাকে সে আগে পরিচ্ছন্ন করে। ধরুন, হঠাৎ ঘরে মেহমান এলো। ঘর অগোছালো। সবাই তখন কী করে? আগে ড্রইংরুমটা দ্রুত পরিষ্কার করে। যত দ্রুত পারে। কারো ড্রইংরুম পরিষ্কার থাকার অর্থ এই না যে, তার ভেতরবাড়িও পরিচ্ছন্ন। কিন্তু দেখব, যে ঘরের ভেতরবাড়ি সবসময় পরিচ্ছন্ন থাকে, সে ঘরের ড্রইংরুমও পরিচ্ছন্ন থাকে।
এভাবে মানুষের দ্বীনদারিটাও বেশিরভাগ ঘরের বাইরে আগে থাকে। ঘরের ভেতরে পরে আসে।
রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে দোয়া শিখিয়েছেন,
اللَّهُمَّ اجْعَلْ سَرِيرَتِي خَيْرًا مِنْ عَلاَنِيَتِي، وَاجْعَلْ عَلاَنِيَتِي صَالِحَةً. –رواه الترمذي: 3586
“হে আল্লাহ! আমার অন্তরের অবস্থা বাহ্যিক অবস্থার চেয়ে উত্তম করে দিন এবং আমার বাহ্যিক অবস্থাও ঠিক করে দিন।” -জামে তিরমিযী: ৩৫৮৬
এখানেও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাহিরের চেয়ে ভেতরকে প্রাধান্য দিয়েছেন। কারণ ভেতরটা ভালো হলে তার প্রভাব বাইরে পড়বেই।
এ রমযানে আমরা সবাই নিজ নিজ স্ত্রীর কাছ থেকে একটি ‘চারিত্রিক সনদ’ নেওয়ার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।
আমরা সব সময় স্ত্রীদের কাজে সহযোগিতা করার চেষ্টা করব। বিশেষত রমযানে অন্য কাজের পরিমাণ কিছুটা কমিয়ে হলেও তাদেরকে একটু সহযোগিতা করার চেষ্টা করব। ইফতারি ও সাহরির জন্য অনেক কিছু আয়োজন করা থেকে বিরত থাকব। যেন তারাও অতিরিক্ত কিছু আমল করার জন্য সময় পায়। যাদের ঘরে ছোট বাচ্চা আছে, তারা স্ত্রীর তারাবীর জন্য বাচ্চাকে একটু সময় দিব। এটাও আমাদের জন্য অনেক বড় নেক আমল বলে গণ্য হবে ইনশাআল্লাহ।
‘গোস্বা সংবরণ’ রোযার পূর্ণতার অন্যতম উপাদান
রোযায় দিনব্যাপী পানাহার ইত্যাদি পরিত্যাগ করার মাধ্যমে আমরা নিজের শাহওয়াতকে দমন করার অনুশীলন করে থাকি। দিনের শেষভাগে এসে আমাদের পেট যত খালি হতে থাকে, শাহওয়াতের পরিমাণ তত হ্রাস পায়।
আমরা এই শাহওয়াতকে নিয়ন্ত্রণ করে থাকি মূলত ইবাদতের দিকে আমাদের মনকে ধাবিত করার জন্য। কিন্তু দিনের শেষভাগে এসে যখন আমাদের পেট একদম খালি হয়ে যায়, তখন আমাদের মাঝে অপর একটি অনিষ্ট জন্ম নেয়ার শঙ্কা তৈরি হয়। তা হলো, গোস্বা।
এটি একটি স্বাভাবিক বিষয়। যখন পেটে ক্ষুধা থাকে তখন প্রতিটি জীবই অস্থির হয়ে যায়। বনের পশুপাখিরা পর্যন্ত ক্ষুধার কারণে অনেক সময় লোকালয়ে চলে আসে।
ঘরের ছোট বাচ্চাদের ক্ষেত্রে দেখি যে, যখন তাদের ক্ষুধা লাগে, তারা অস্থির হয়ে যায়। কোনো কারণ ছাড়াই রেগে যায়, কাঁদতে থাকে।
বড়দের মধ্যেও ক্ষুধার প্রভাব পড়ে থাকে। তাদের মধ্যে অস্থিরতা বাড়ে; বাচ্চাদের মতো অকারণে না রাগলেও ছোট ছোট কারণে রেগে যায়।
তাই বলা চলে যে, রোযায় দিনের শেষভাগে তাকওয়ার অন্যতম সিফাত ‘গোস্বা সংবরণ’ এর অনুশীলন শুরু হয়।
মোটকথা, মানুষ গুনাহে লিপ্ত হওয়ার পেছনে দুটি বড় কারণ সক্রিয় থাকে। এক. শাহাওয়াত। দুই. গোস্বা। বিষয়টি ইমাম বায়যাবী রহিমাহুল্লাহও উল্লেখ করেছেন-
وقال البَيضاويُّ: … أنَّ جَميعَ المَفاسِدِ التي تَعرِضُ للإنسانِ إنَّما هي مِن شَهوتِه ومِن غَضَبِه -مرقاة المفاتيح شرح مشكاة المصابيح (8/ 3187 ط. دار الفكر)
মানুষের মাঝে যত সমস্যা তৈরি হয় এর পিছনে ক্রিয়াশীল মূল কারণ দুটি হয়ে থাকে। এক. শাহওয়াত তথা মন যা চায় তা করার প্রবণতা। দুই. গোস্বা। -মিরকাতুল মাফাতীহ: ৮/৩১৮৭ (দারুল ফিকর)
সুতরাং বলা যায়, শুধু শাহওয়াতকে দমন করার দ্বারাই রোযার মাহাত্ম্য অর্জিত হবে না, বরং শাহওয়াত দমনের পাশাপাশি গোস্বা সংবরণের প্রয়োজন রয়েছে। উভয় গুণের সম্মিলিত অনুশীলনের দ্বারা রোযার পূর্ণতা অর্জিত হবে।
মূলত আমাদের ইবাদত তখনই সুন্দরভাবে সম্পন্ন হবে, যখন আমরা নফসের অনিষ্ট থেকে নিজে বেঁচে থাকতে পারি এবং অপরকেও নিজের অনিষ্ট থেকে যখন বাঁচাতে পারি। সুতরাং রোযার মাধ্যমে যখন কোনো ব্যক্তির শাহওয়াত দমিত হয়, তখন সে নফসের অনিষ্ট থেকে রক্ষা পায়। আর যখন সে গোস্বা সংবরণ করে, তখন অন্যরা তার অনিষ্ট থেকে রক্ষা পায়। এভাবে আমাদের ইবাদতগুলো হয় দামি। কারণ ইবাদতগুলোকে নষ্ট করার মতো উপাদান এখন আমাদের থেকে বিদায় নিয়েছে।
এ কারণেই হাদীস শরীফে এসেছে-
«الصِّيَامُ جُنَّةٌ، وَإِذَا كَانَ يَوْمُ صَوْمِ أَحَدِكُمْ فَلَا يَرْفُثْ، وَلَا يَصْخَبْ، فَإِنْ سَابَّهُ أَحَدٌ أَوْ قَاتَلَهُ فَلْيَقُلْ: إِنِّي امْرُؤٌ صَائِمٌ» (رواه البخاري: 1904).
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “রোযা হচ্ছে ঢাল। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে রোযা রাখবে সে যেন অশ্লীল কথা না বলে, হৈচৈ না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় কিংবা মারামারি করতে চায়, সে যেন বলে, “আমি রোযাদার।” -সহীহ বুখারী: ১৯০৪
হাদীসে রোযাকে ঢাল বলা হয়েছে। অর্থাৎ রোযার মাধ্যমে আমরা আমাদেরকে জাহান্নাম থেকে মুক্ত করতে সক্ষম হই। কারণ রোযার মাধ্যমে আমরা আমাদের শাহওয়াতকে দমন করার চেষ্টা করে থাকি। আর যারা শাহওয়াত দমন করতে পারলে তাদের ঠিকানা হবে জান্নাত; এটা কুরআনে এসেছে-
وَأَمَّا مَنْ خَافَ مَقَامَ رَبِّهِ وَنَهَى النَّفْسَ عَنِ الْهَوَى . فَإِنَّ الْجَنَّةَ هِيَ الْمَأْوَى.- (سورة النازعات: 40-41)
আর যে তার রবের সামনে দাঁড়াতে ভয় করে এবং নফসকে খাহেশাত থেকে বাধা দেয়, নিশ্চয় জান্নাতই তার ঠিকানা। – [সূরা নাযিআত, ৭৯:৪০-৪১]
কিন্তু এই ঢাল তখনই ঢালের ন্যায় কাজ করবে, যখন আমরা অনিষ্ট থেকে নিজেকে বাঁচানোর পাশাপাশি অন্যদেরকেও বাঁচানোর জন্য প্রয়াসী হবো। তাই হাদীসে বলা হয়েছে, এমন ব্যক্তি যেন রোযা রেখে অশ্লীল কথা না বলে, হৈচৈ না করে। যদি কেউ তাকে গালি দেয় কিংবা মারামারি করতে চায়, সে যেন বলে, “আমি রোযাদার।
গোস্বা বিষয়ে কিছু বিশ্লেষণ
মুত্তাকীদের একটি বড় সিফাত হলো, তারা রাগ তথা গোস্বাকে সংবরণ করে। মূলত অসংখ্য গুনাহের মূল হলো গোস্বা। তাই এ বিষয়ে কিছু আলোচনা করা জরুরি মনে হচ্ছে;
এ সংক্রান্ত কয়েকটি পরিভাষা আগে বুঝে নিই
# (الغضب) গজব যেকোনো রাগ বা গোস্বাকে বলে। এটি একটি ব্যাপক শব্দ। কারো মন্দ বা অসমীচীন আচরণে রাগ হওয়াকে গজব বলে। এই গোস্বা কথা বা কাজ দ্বারা প্রকাশও পেতে পারে; যেমন- রাগের কারণে বকাঝকা করা বা গালিগালাজ করা। কিংবা রাগের কারণে শাস্তি দেওয়া অথবা মারধর করা। আবার প্রকাশ নাও পেতে পারে। উভয় অবস্থায় এটাকে গজব বলা যাবে। গজব-সাধারণ রাগ বড়রা যেমন ছোটদের প্রতি করতে পারে, ছোটরাও বড়দের প্রতি করতে পারে।
ছোট বাচ্চা গোস্বা করে বাবাকে মারে, আবার বাবা গোস্বা করে তার সন্তানকে মারে। উভয় ক্ষেত্রেই এটাকে গজব বলা যাবে।
# (السخط) আর ‘সাখাত’ অর্থও গোস্বা। কিন্তু এটা শুধু বড়র পক্ষ থেকে ছোটর প্রতি হয়। যেমন আল্লাহ তাআলার বান্দার প্রতি কিংবা বাবা সন্তানের প্রতি গোস্বাকে ‘সাখাত’ বলা যাবে।
# (الغيظ) কারো প্রতি গোস্বা করার পর যতক্ষণ তা কথা বা কাজ দিয়ে প্রকাশ না পাবে, ততক্ষণ তা গাইজ। আর এটাকে ভেতরে গিলে ফেলা তথা সংবরণ করে ফেলার নামই হলো (كظم الغيظ) কাজমুল গাইজ। এটি মস্তবড় ইবাদত। এটি মুহসীনদের বৈশিষ্ট্য।
যদি কারোর প্রতি গোস্বা করার পর প্রতিশোধ নেয়ার সক্ষমতা সত্ত্বেও গোস্বাকে সংবরণ করে নেওয়া হয়, তাকে কাজমুল গাইজ বলে। মন থেকে ওই ব্যক্তিকে ক্ষমা করে দিক বা না দিক, উভয় অবস্থায়ই এটা উন্নত গুণ। এটা যে কেউ করতে পারে না। তাই এর পুরস্কারও অনেক বড়। নগদ কিছু পুরস্কার যেমন-
০১. তার মধ্যে মুত্তাকীদের একটি সিফাত অর্জিত হয়।
০২. এমন ব্যক্তি ইহসান ওয়ালা।
০৩. এমন ব্যক্তিকে আল্লাহ তাআলা ভালোবাসেন।
এই তিনটা বিষয়ই কুরআনের এ আয়াতে রয়েছে-
وَسَارِعُوا إِلَى مَغْفِرَةٍ مِنْ رَبِّكُمْ وَجَنَّةٍ عَرْضُهَا السَّمَاوَاتُ وَالْأَرْضُ أُعِدَّتْ لِلْمُتَّقِينَ (133) الَّذِينَ يُنْفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ (134) –آل عمران: 133، 134
“আর নিজ রবের পক্ষ হতে মাগফিরাত ও সেই জান্নাত লাভের জন্য দ্রুত অগ্রসর হও, যার প্রশস্ততা আকাশমণ্ডল এবং পৃথিবীতুল্য। তা মুত্তাকীদের জন্য প্রস্তুত করা হয়েছে। তারা ঐসব লোক, যারা সচ্ছল এবং অসচ্ছল অবস্থায় দান করে এবং যারা নিজেদের ক্রোধ হজম করতে এবং মানুষকে ক্ষমা করতে অভ্যস্ত। আর আল্লাহ এরূপ পুণ্যবানদের ভালোবাসেন।” [সূরা আলে-ইমরান ০৩: ১৩৩-১৩৪]
এক হাদীসে এসেছে-
عَنْ سَهْلِ بْنِ مُعَاذِ بْنِ أَنَسٍ، عَنْ أَبِيهِ، أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: مَنْ كَظَمَ غَيْظًا وَهُوَ يَسْتَطِيعُ أَنْ يُنَفِّذَهُ دَعَاهُ اللَّهُ يَوْمَ القِيَامَةِ عَلَى رُءُوسِ الخَلاَئِقِ حَتَّى يُخَيِّرَهُ فِي أَيِّ الحُورِ شَاءَ.-رواه الترمذي: 2021 وقال: هذا حديث حسن.
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “যে ব্যক্তি নিজের গোস্বা প্রয়োগ করার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তা সংবরণ করে; আল্লাহ তাআলা তাকে কিয়ামতের দিন সমস্ত মাখলুকের সামনে ডাকবেন এবং তাকে তার ইচ্ছামত যেকোনো হুর নির্বাচন করে নেওয়ার সুযোগ দিবেন।” [জামে তিরমিযী: ২০২১]
# (العفو) কাজমুল গাইজের পর যদি আবার ওই ব্যক্তিকে ক্ষমাও করে দেয়া হয়, যাতে সে আল্লাহর কাছে আটকে না যায়, তাহলে এর নাম আফব (العفو)। এটি আরও বড় ইবাদত। এটি কাজমুল গাইজের চেয়েও আরও উঁচু স্তর। এটিও মুহসীনদের বৈশিষ্ট্য।
গোস্বা সংক্রান্ত একটি হাদীস
মুয়াত্তা মালিকের এক হাদীসে এসেছে-
عَنْ حُمَيْدِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ عَوْفٍ، أَنَّ رَجُلا أتَى إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، عَلِّمْنِي كَلِمَاتٍ أَعِيشُ بِهِنَّ، وَلَا تُكْثِرْ عَلَيَّ فَأَنْسَى، فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ: «لَا تَغْضَبْ» -المؤطا: 2/905 ط. دار إحياء التراث، وأخرج البخاري نحوه: 6116 من حديث أبي هريرة.
অর্থ: এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের নিকট এসে বললেন, “ইয়া রাসুলাল্লাহ! আমাকে এমন কিছু কথা শিখিয়ে দিন যা নিয়ে আমি আমার জীবন কাটিয়ে দিব। বেশি কিছু দরকার নেই, নয়তো ভুলে যাব।” তখন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, (لا تَغضَبْ) “তুমি গোস্বা করিও না।” -মুয়াত্তা মালেক: ২/৯০৫ আরো দেখুন, সহীহ বুখারী: ৬১১৬
একটু লক্ষ করি, কেউ মন্দ আচরণ করলে গোস্বা এসে যাওয়াটা সাধারণত একটি গায়রে ইখতিয়ারি বিষয়। আমাদের ইচ্ছার বাইরেই গোস্বা এসে যায়। তাহলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে বললেন, (لا تَغضَبْ) “তুমি গোস্বা করিও না”- এ কথার কী উদ্দেশ্য হতে পারে? গোস্বা তো করতে হয় না, এমনিতেই এসে যায়।
ইবনে রজব রহিমাহুল্লাহ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন,
(لا تَغضَبْ) কথাটির দুটি ব্যাখ্যা হতে পারে।
এক. অর্থাৎ তুমি উত্তম আখলাকের দ্বারা এমনভাবে সমৃদ্ধ হও যে, মানুষ তোমার সাথে মন্দ আচরণ করার সুযোগই তৈরি না হয়। অর্থাৎ মানুষের সামনে তাওয়াজুর সাথে থাক, হাস্যোজ্জ্বল চেহারা নিয়ে থাক, বদান্যতার সাথে থাক, নম্র আচরণ কর। কিংবা এমন উত্তম আখলাকের অধিকারী হও যে, কেউ মন্দ আচরণ করলেও তোমার মধ্যে গোস্বা তৈরি না হয়। অর্থাৎ ধৈর্য, সহ্য ক্ষমতা, পাশ কাটিয়ে যাওয়া, গোস্বা সংবরণ করা, ক্ষমা করে দেওয়া ইত্যাদি গুণের অধিকারী হও।
দুই. (لا تَغضَبْ) এর অর্থ হলো, গোস্বার কারণে যা করতে মন চাচ্ছে সেটা বাস্তবায়ন করা থেকে বিরত থাক। -জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ১/৪০৪ (দারুস সালাম)
وقال البَيضاويُّ: لعلَّه لمَّا رَأى أنَّ جَميعَ المَفاسِدِ التي تَعرِضُ للإنسانِ إنَّما هي مِن شَهوتِه ومِن غَضَبِه، وكانت شَهوةُ السَّائِلِ مَكسورةً، فلمَّا سَأل عَمَّا يحتَرِزُ به عن القَبائِحِ نَهاه عن الغَضَبِ الذي هو أعظَمُ ضَرَرًا مِن غَيرِه، وأنَّه إذا مَلك نَفسَه عِندَ حُصولِه كان قد قَهرَ أقوى أعدائِه. -مرقاة المفاتيح شرح مشكاة المصابيح (8/ 3187 ط. دار الفكر)
ইমাম বায়যাবী রহিমাহুল্লাহ বলেন,
মানুষের মাঝে যত সমস্যা তৈরি হয় এর পিছনে মূল কারণ দুটি। এক. শাহওয়াত তথা মন যা চায় তা করা। দুই. গোস্বা। সম্ভবত রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঐ ব্যক্তির মাঝে লক্ষ করেছেন যে, তার শাহওয়াতের বিষয়টি নিয়ন্ত্রিত। তাই তিনি ঐ সাহাবীকে দ্বিতীয় বিষয়টির প্রতি গুরুত্বারোপ করেছেন। অর্থাৎ কেউ যদি গোস্বা না করে থাকতে পারে, তাহলে তার দ্বারা ফাসাদ তৈরি হওয়ার সব রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। -মেরকাতুল মাফাতীহ: ৮/৩১৮৭ (দারুল ফিকর)
এক হাদীসে এসেছে-
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ؛ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صلى الله عليه وسلم قَالَ: «لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ. إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الْغَضَبِ».-صحيح البخاري: 6114 صحيح مسلم: 2609
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “কুস্তিতে প্রচুর ধরাশায়ী করতে পারে এমন ব্যক্তি মূলত শক্তিশালী নয়, বরং প্রকৃত শক্তিশালী ঐ ব্যক্তি, যে গোস্বার সময় নিজের নফসকে কাবু (ধরাশায়ী) করতে পারে।” [সহীহ বুখারী: ৬১১৪; সহীহ মুসলিম: ২৬০৯]
গোস্বার ব্যাপার সালাফদের কিছু উক্তি
قال أبو الدَّرداءِ: أقرَبُ ما يكونُ العَبدُ مِن غَضَبِ اللهِ إذا غَضِبَ. –البيان والتبيين للحاحظ: 2/136 ط. دار الهلال،
হযরত আবু দারদা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, “বান্দা আল্লাহর গোস্বার সবচেয়ে কাছাকাছি তখন থাকে যখন সে নিজে গোস্বায় পতিত হয়।” -আল-বয়ান, জাহেয: ২/১৩৬ (দারুল হেলাল)
كان عمر بن الخطاب إذا خطب الناس يقول في خطبته: أفلح منكم من حفظ من الهوى والطمع والغضب. –الزهد لأبي داود: 48
হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু খুতবায় বলতেন, “যে ব্যক্তি হাওয়া (মন যা চায় তা করা), লোভ এবং গোস্বা থেকে বেঁচে থাকতে পারলো, সে সফলকাম।” -আয-যুহদ, আবু দাউদ: ৪৮
وقيل لابنِ المُبارَكِ: اجمَعْ لنا حُسنَ الخُلُقِ في كَلِمةٍ، قال: تَركُ الغَضَبِ. –جامع العلوم والحكم: 1/403 ط. دار السلام
হযরত আব্দুল্লাহ বিন মোবারক রহিমাহুল্লাহকে বলা হলো, আপনি ‘উত্তম আখলাক’ কে এক শব্দে বিশ্লেষণ করুন। তখন তিনি বললেন, “গোস্বা পরিত্যাগ করা।” -জামিউল উলুমি ওয়াল হিকাম: ১/৪০৩ (দারুস সালাম)
وقال بَكرُ بنُ عَبدِ اللهِ المُزَنيُّ: (لا يكونُ الرَّجُلُ تَقيًّا حتَّى يكونَ نَقيَّ الطَّمَعِ، نَقيَّ الغَضَبِ) . –القناعة لابن أبي الدنيا، ص: 76 ط. مؤسسة الكتب
হযরত বকর বিন আব্দুল্লাহ মুযানী রহিমাহুল্লাহ বলেন, “কোনো ব্যক্তি ততক্ষণ মুত্তাকী হবে না, যতক্ষণ না সে লোভ ও গোস্বা থেকে পবিত্র হয়।” -আল-কানাআহ, ইবনু আবিদ দুনয়া, পৃ: ৭৬ (মুআসসাসাতুল কুতুব)
ইমাম ইবনে হিব্বান রহিমাহুল্লাহ বলেন,
أحضَرُ النَّاسِ جَوابًا مَن لم يغضَب. –روضة العقلاء، ص: 138 ط. دار الكتب العلمية
“মজলিসে উপস্থিত উত্তর সবচেয়ে ভালো ঐ ব্যক্তি দিতে পারে, যে গোস্বা করেনি।” -রওযাতুল উকালা, ইবনে হিব্বান, পৃ: ১৩৮ (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ)
عن ابنِ عُمَرَ رَضيَ اللهُ عنهما قال: قال رَسولُ اللهِ صلَّى اللهُ عليه وسلَّم: ما مِن جُرعةٍ أعظَمُ أجرًا عندَ اللهِ مِن جَرعةِ غَيظٍ كَظمَها عَبدٌ ابتِغاءَ وَجهِ اللهِ. –سنن ابن ماجه: 4189
হযরত ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, “আল্লাহর নিকট সর্বোত্তম ঢোক গিলা সেটাই, যেটা বান্দা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য গোস্বাকে গিলে থাকে।” -সুনানে ইবনে মাজাহ: ৪১৮৯
قال الأحنَفُ: مَن لم يصبِرْ على كَلِمةٍ سَمِعَ كَلِماتٍ، وقال: رُبَّ غَيظٍ تجَرَّعتُه مَخافةَ ما هو أشَدُّ منه. –البيان والتبيين للجاحظ: 2/50، 51
হযরত আহনাফ রহিমাহুল্লাহ বলেন, “যে ব্যক্তি একটি কথার উপর ধৈর্য ধরতে পারে না, তাকে অনেক কথা শুনতে হয়। তিনি বলেন, আমি অনেক গোস্বাকে (ঢোকের মতো) গিলে ফেলেছি, এরচেয়ে কঠিন বিষয় গিলতে হবে এই ভয়ে।” -আল-বয়ান, জাহেয: ২/৫০, ৫১
এই ঢোকের মতো গিলে ফেলার প্রশিক্ষণ আমরা নিতে পারব কি? আমরা অন্তত চেষ্টা করে দেখতে পারি, ইনশাআল্লাহ আল্লাহ আমাদের চেষ্টা বৃথা করবেন না। এর অনুশীলন আমরা আমাদের ঘর থেকে শুরু করব ইনশাআল্লাহ।
মানুষের জাহালাতপূর্ণ আচরণকে এড়িয়ে চলব
মানুষকে তার স্ব স্ব স্থানে রাখা একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। সহীহ মুসলিমের মুকাদ্দামায় ইমাম মুসলিম রহিমাহুল্লাহ হযরত আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহার বরাতে একটি হাদীস উল্লেখ করেছেন-
عَنْ عَائِشَةَ رَضِيَ اللهُ تَعَالَى عَنْهَا، أَنَّهَا قَالَتْ: أَمَرَنَا رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ نُنَزِّلَ النَّاسَ مَنَازِلَهُمْ
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে নির্দেশ করেছেন, “আমরা যেন মানুষকে তাদের নিজ নিজ অবস্থানে রাখি।”- [মুকাদ্দামাতু সহীহি মুসলিম]
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি। আমরা কাউকে তার অবস্থানের চেয়ে বড় অবস্থান দিলে মূলত ওই ব্যক্তিকে ফিতনায় ফেলা হবে। প্রত্যেককে তার যোগ্যতা অনুযায়ী স্থান দিতে হবে। আর তার অবস্থান অনুযায়ী তাকে সম্মান করতে হবে।
মানুষ যখন অন্যের সাথে আচরণে তাকে তার অবস্থানে না রাখে এবং অবস্থান অনুযায়ী তাকে মূল্যায়ন না করে, সেক্ষেত্রে জাহালাতপূর্ণ আচরণের অবতারণা ঘটে।
যেমন ধরি, অফিসের প্রধানের সাথে কোনো কর্মচারী যদি এমন আচরণ করে যা অফিসের নিরাপত্তা রক্ষীর সাথে করা হয়, তাহলে এর দ্বারা প্রধানকে অবমূল্যায়ন করা হবে। এমন আচরণকে বেয়াদবিমূলক আচরণ বলে। এটা জাহালাতপূর্ণ আচরণ। মূর্খতাসুলভ আচরণ। আবার যদি কেউ নিরাপত্তা রক্ষীর সাথে প্রধানের মতো আচরণ করে, তাহলে এটা হবে রক্ষীর সাথে বিদ্রূপ। এর দ্বারাও মানুষকে ছোট করা হয়। তাই এটাও জাহালাতপূর্ণ আচরণ।
অনেক সময় বন্ধুরা একে অপরকে নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। এগুলো যতক্ষণ পর্যন্ত মনঃকষ্টের কারণ না হয়, ততক্ষণ এগুলো জাহালাতপূর্ণ আচরণ হয় না। ঠাট্টা-বিদ্রূপ সমপর্যায়ের মানুষদের পরিবেশে সাধারণত দূষণীয় নয়। কিন্তু যেখানে পারস্পরিক সম্পর্ক হয় সম্মানের, সেখানে বিদ্রূপকে জাহালাতপূর্ণ আচরণ বলা হবে। এ কারণেই অফিসের একজন মাঝারি স্তরের কর্মচারী যদি পিয়নের সাথে এমন আচরণ করে যা প্রধানের সাথে করা হয়, তাহলে সেটাকে বিদ্রূপ বলা হবে। মূর্খতাসুলভ আচরণ বলা হবে। নিচের আয়াতে হযরত মূসা আলাইহিস সালামের কথাটি লক্ষ করুন-
وَإِذْ قَالَ مُوسَى لِقَوْمِهِ إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تَذْبَحُوا بَقَرَةً قَالُوا أَتَتَّخِذُنَا هُزُوًا قَالَ أَعُوذُ بِاللَّهِ أَنْ أَكُونَ مِنَ الْجَاهِلِينَ – سورة البقرة: 67
“এবং (স্মরণ কর), যখন মূসা তাঁর সম্প্রদায়কে বলেছিলেন, “নিশ্চয় আল্লাহ তোমাদেরকে একটি গাভী যবেহ করতে আদেশ করেছেন।” তারা বলল, ‘আপনি কি আমাদেরকে ঠাট্টার পাত্র বানাচ্ছেন?’ তিনি বললেন, “আমি আল্লাহর আশ্রয় নিচ্ছি জাহেলদের অন্তর্ভুক্ত হওয়া থেকে।” – সূরা বাকারা, ০২:৬৭
একজন পয়গম্বর আল্লাহর বিধান নিয়ে ঠাট্টা করতে পারে না। তাই তিনি বলছেন, এমন জাহালাতপূর্ণ আচরণ থেকে আমি আল্লাহর আশ্রয় নিচ্ছি।
মানুষের জান, মালের উপর যেকোনো আঘাতকে জুলুম বলে। আর মানুষের ইজ্জতের উপর কেউ যদি এমনভাবে আঘাত করে যা স্থায়ী হয়, দীর্ঘমেয়াদি হয়, তাহলে এটাও জুলুম। তাই গীবত, চোগলখোরীর দ্বারাও মানুষের উপর জুলুম হয়।
পক্ষান্তরে মানুষের ইজ্জত-সম্মানে কেউ যদি এমন আঘাত করে যা স্থায়ী নয়, বরং সাময়িকভাবে তাকে হেয়-তাচ্ছিল্য করা হয়েছে, তাহলে এমন আচরণকেই মূলত জাহালাতপূর্ণ আচরণ বলে। যেমন ধরি, একজন বাসের হেল্পার একজন আলেমকে বাসে উঠাতে চাচ্ছে, কিন্তু তিনি এই বাসে যাবেন না, তাই উঠতে চাচ্ছেন না। এর প্রেক্ষিতে হেল্পার ওই আলেমকে মোল্লা বলে তাচ্ছিল্য করলো, কিংবা ক্ষেত বলল… ইত্যাদি।
আবার কোনো একটি জিনিস কেনার জন্য আমরা কোনো দোকানে ঘুরে দেখলাম, কিন্তু পছন্দ হয়নি। ফেরত আসার পথে দোকানদার কোনো বিদ্রুপমূলক আচরণ করলো। এগুলো জাহালাতপূর্ণ আচরণ। অনেক সময় বাসের হেল্পারের সাথে ভাড়া নেয়ার সময় যাত্রীরা জাহালাতপূর্ণ আচরণ করে। আবার এর উল্টোটাও অনেক সময় হয়। এগুলো সব জাহালাতপূর্ণ আচরণ। এসব আচরণ কেউ করলে ইসলামের শিক্ষা হলো এড়িয়ে চলা। আল্লাহ তাআলা বলেন-
خُذِ الْعَفْوَ وَأْمُرْ بِالْعُرْفِ وَأَعْرِضْ عَنِ الْجَاهِلِينَ – سورة الأعراف:199
“আপনি ক্ষমাপরায়ণতা অবলম্বন করুন, সৎকাজের আদেশ করুন এবং অজ্ঞ লোকদের এড়িয়ে চলুন।” [সূরা আরাফ, ০৭:১৯৯]
সুনানে আবু দাউদে এসেছে-
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ، قَالَتْ: مَا خَرَجَ النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مِنْ بَيْتِي قَطُّ إِلَّا رَفَعَ طَرْفَهُ إِلَى السَّمَاءِ فَقَالَ: «اللَّهُمَّ أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَضِلَّ، أَوْ أُضَلَّ، أَوْ أَزِلَّ، أَوْ أُزَلَّ، أَوْ أَظْلِمَ، أَوْ أُظْلَمَ، أَوْ أَجْهَلَ، أَوْ يُجْهَلَ عَلَيَّ» – (سنن أبي داود ، رقم الحديث: 5094)
হযরত উম্মে সালামা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত; তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমার ঘর থেকে যখনই বের হয়েছেন তখনই আসমানের দিকে তাকিয়ে এই দোয়া পড়েছেন, (اللَّهُمَّ أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَضِلَّ، أَوْ أُضَلَّ، أَوْ أَزِلَّ، أَوْ أُزَلَّ، أَوْ أَظْلِمَ، أَوْ أُظْلَمَ، أَوْ أَجْهَلَ، أَوْ يُجْهَلَ عَلَيَّ) “হে আল্লাহ! আমি আপনার আশ্রয় নিচ্ছি (ঘরের বাইরে গিয়ে) নিজে নিজে বা কারো দ্বারা পথভ্রষ্ট হওয়া থেকে অথবা নিজে নিজে বা কারো দ্বারা পদস্খলিত হওয়া থেকে। কিংবা কারও প্রতি জুলুম করা বা কারও দ্বারা জুলুমের স্বীকার হওয়া থেকে। অথবা কারো সাথে জাহালাতপূর্ণ আচরণ করা থেকে কিংবা কারো জাহালাতপূর্ণ আচরণের স্বীকার হওয়া থেকে।” [সুনানে আবু দাউদ: ৫০৯৪]
দোয়াটি আমাদের প্রত্যেকের মুখস্থ করা এবং আমলে আনা উচিত। এ দোয়া পড়ার মাধ্যমে ঘর থেকে বের হওয়ার পর যত ধরনের গুনাহের পথ এবং অনাকাঙ্ক্ষিত পথ আছে সকল পথ বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে।
কেউ যখন মূর্খতাসুলভ আচরণ করে, এর সর্বোত্তম জবাব হলো, তাকে এড়িয়ে যাওয়া। ওই ব্যক্তি তার আচরণের মাধ্যমে আমাদের সম্মান নষ্ট করতে চাচ্ছে। এখন যদি তার কথার প্রতিউত্তর দেওয়া হয়, তাহলে আমাদের সম্মান আরও নষ্ট হতে থাকবে। তার কথার উত্তর দিয়ে আমরা আমাদের সম্মান উদ্ধার করে আনতে পারব না। এরচেয়ে বরং যখন তাকে উপেক্ষা করব, তখন আশপাশে যারা আছে তারা বুঝে নিবে যে, আমরা ভদ্র ও সম্মানিত; তাই তার এমন আচরণের প্রতিউত্তর আমরা দেইনি। মূলত জাহেলদের সাথে বিতণ্ডায় লিপ্ত হওয়া মানে নিজেদের সম্মানকে আরও নষ্ট করা।
তাছাড়া যখন আমরা তার কথার উত্তর দিতে যাব, তখন ঐ জাহেল তার জাহালাত আরও বাড়িয়ে দিবে। আর এমন ব্যক্তির পরবর্তীতেও অনুশোচিত হওয়ার পথ বন্ধ হয়ে যাবে। পক্ষান্তরে যখন আমরা তাকে এড়িয়ে চলে আসব, তখন কোনো এক সময় হয়তো ওই জাহেল ব্যক্তি তার কৃতকর্মের জন্য লজ্জিত হবে। হয়তো আমাদের এড়িয়ে যাওয়ার কারণে তার জন্য এমন আচরণ থেকে ফিরে আসার পথ তৈরি হবে।
হিলম ও হুলম
আরবীতে একটি শব্দ আছে হিলম অর্থাৎ সহ্য ক্ষমতা। আরেকটি শব্দ ‘হুলম’ যার অর্থ আকল। মানুষের যখন ‘হুলম’ (আকল তথা বিবেক) পূর্ণতা পায় তখনই তার মধ্যে ‘হিলম’ তৈরি হয়।
মনে রাখব, যার বিবেক যত পরিপূর্ণ, তার হিলম (ধৈর্য ক্ষমতা) তত বেশি। সুতরাং এমন ব্যক্তিরা মানুষের জাহালাতপূর্ণ আচরণে ক্ষুব্ধ হয় না। হিলমের অধিকারী ব্যক্তি ঝগড়া করার আগে তার বিবেক তার সাথে ঝগড়া করে। ফলে তারা অন্যের সাথে ঝগড়া করার সুযোগ পায় না।
জাহালাতপূর্ণ আচরণের জন্ম হয় অনিয়ন্ত্রিত গোস্বার কারণে। যার গোস্বার কোনো নিয়ন্ত্রণ নাই, সে ছোট ছোট বিষয়ে মানুষের উপর গোস্বা করে। আর তখনই মূর্খতাসুলভ আচরণ তার থেকে প্রকাশ পায়। এ ধরনের গোস্বার মোকাবেলা কখনোই আমরা গোস্বা দিয়ে করতে পারব না। কারণ যার গোস্বার কোনো নিয়ন্ত্রণ নাই, সে অন্যদের গোস্বা দেখলে আরও গোস্বান্বিত হয়। তার গোস্বার আগুন আরও কঠিনভাবে জ্বলে উঠে।
তাই এমন ব্যক্তিদের মূর্খতাসুলভ আচরণ দেখার পর আমাদের গোস্বাকে সংবরণ করা এবং তাদেরকে এড়িয়ে যাওয়াটাই হচ্ছে প্রকৃত বিবেকবানদের কাজ।
কেউ যখন গোস্বার সময় কষ্ট করে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে থাকে, তখন এটাই তার মধ্যে ধীরে ধীরে হিলমের গুণ তৈরি করে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে উত্তম আখলাক দান করুন। মানুষকে কষ্ট দেয়া থেকে হেফাযত করুন এবং কেউ কষ্ট দিলে হিলম দ্বারা তা মোকাবেলা করার তাওফীক দান করুন। আমীন।
বিক্ষিপ্ত দুটি কথা
০১. কুরআন মুত্তাকীদের জন্য হেদায়াত। সুতরাং যে তাকওয়ার যে স্তরে আছে তার জন্য কুরআন সে পর্যায়ের হেদায়াত। কিন্তু যখন কেউ তাকওয়ার একদম প্রথম ধাপ (ঈমান) থেকেও বের হয়ে যায়, তখন তার জন্য কুরআন হেদায়াত থাকে না।
কুরআনের দুটি দিক আছে। এ কুরআন দ্বারা কেউ হেদায়াত পায়। আবার কেউ গোমরাহ হয়। সুতরাং কেউ যখন ঈমানের কাতার থেকে বের হয়ে যায়, আর অন্তরের মধ্যে কুরআনের প্রতি সন্দেহ-সংশয় এবং হেদায়াত গ্রহণে অনীহা থাকে, তখন এমন ব্যক্তিকে কুরআন আরও গোমরাহ করে দেয়। يضل به كثيرا و يهدي به كثيرا، وما يضل به إلا الفاسقين.
ফিসক যখন অনেক বেড়ে যায়, তখনই মানুষের অন্তরে হকের ব্যাপারে শক-শুবাহ বাড়তে থাকে। আর তখনই এসব লোক নাস্তিক হয়। আল্লাহ তাআলা আমাদের হেফাযত করুন।
০২. মুত্তাকীদের গুরুত্বপূর্ণ একটি সিফাত হলো, তাদের যতটুকু আছে ততটুকু থেকেই কষ্ট করে হলেও তারা দান করে থাকে।
কুরআনে তাকওয়ার উপর সবচেয়ে সমৃদ্ধ আয়াত তিনটি। তিনটি আয়াতেই দান করার বিষয়টি বিশেষভাবে এসেছে-
প্রথম জায়গায়- ومما رزقناهم ينفقون (“যারা আমার দেওয়া রিযিক থেকে (চাই কম থাকুক বা বেশি) খরচ করে।”)
২য় জায়গায়- وآتى المال على حبه (“যারা সম্পদের প্রতি আকর্ষণ থাকা সত্ত্বেও সম্পদ দান করে।”)
৩য় জায়গায়- الذين ينفقون في السراء والضراء (“যারা সচ্ছল অবস্থায় এবং অসচ্ছল অবস্থায় দান করে।”)
এই আয়াতগুলো থেকে বুঝা যায়, কষ্ট করে দান করাটা আল্লাহ তাআলার কাছে অত্যন্ত প্রিয়। আল্লাহ তাআলা রমযানে আমাদেরকে খুব তাওফীক দান করুন।
শেষের দুটি কথা ছিল বিক্ষিপ্ত। যেহেতু রমযানের প্রস্তুতির সাথে সম্পর্কযুক্ত না, তাই এগুলোকে আলাদাভাবে উল্লেখ করলাম। আল্লাহ তাআলা আমাদের কাজে ইখলাস দান করুন, এবং কাজগুলো কবুল করুন। তাঁর দ্বীনের জন্য আমাদেরকে ফেদা হওয়ার তাওফীক দান করুন।
সর্বশেষ তিনটি ছন্দ দিয়ে শেষ করছি।
خَلّ الذنوبَ صغيرَها … وكبيرَها ذاكَ التّقَى
واصنع كماشٍ فوقَ أرضِ … الشوكِ يحذَرُ ما يرَى
لا تَحْقِرَنَّ صغيرةً … إنّ الجبالَ مِنَ الحَصَى
ছোট-বড় সকল গুনাহ পরিত্যাগ কর, এটাই হচ্ছে তাকওয়া,
কাঁটাদার জমিনে পথিক যেমন সতর্কতার সাথে কাঁটা দেখে দেখে হাঁটে, তুমিও ওভাবে দ্বীনের পথে খুব সতর্কতার সাথে হাঁটো,
কোনো ছোট গুনাহকে ছোট মনে করো না, নিশ্চয় পাহাড়গুলো ছোট ছোট কংকরের সমষ্টি।
وصلى الله تعالى على خير خلقه محمد وآله وصحبه أجمعين، وآخر دعوانا أن الحمد لله رب العالمين
আরো পড়ুন-