ফাতওয়া  নং  ২৫৬

শরিয়তে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণার হুকুম কী?

শরিয়তে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণার হুকুম কী?

পিডিএফ ডাউনলোড করুন

ওয়ার্ড ডাউনলোড করুন

শরিয়তে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণার হুকুম কী?

প্রশ্ন:

শরিয়তে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণা করার হুকুম কী?

প্রশ্নকারী- আব্দুর রহমান

উত্তর:

ইসলামে ত্যাজ্যপুত্র ঘোষণার কোন ভিত্তি নেই। কেউ করলে তা দ্বারা পিতা-পুত্রের বংশীয় সম্পর্ক বাতিল হবে না এবং পুত্র মিরাস থেকেও বঞ্চিত হবে না।

পিতা-পুত্রের সম্পর্ক রক্তের সম্পর্ক, মুখের কথার সম্পর্ক নয়, যে ত্যাজ্য করে দিলেই বাতিল হয়ে যাবে।

এমনিভাবে ইসলাম প্রত্যেক ওয়ারিসের জন্য অংশ নির্ধারণ করে দিয়েছে। কারো জন্য সেই নির্ধারিত অংশ বাতিল করার সুযোগ নেই। পিতার মৃত্যুর পর পুত্র স্বয়ংক্রিয়ভাবে মিরাসের উত্তরাধিকারী হয়ে যাবে। ত্যাজ্য করার দ্বারা এতে কোন প্রভাব পড়বে না।

সন্তান শরীয়াহ অনুযায়ী না চললে কিংবা পিতা মাতার অবাধ্য হলে, তার সমাধান এই নয় যে, তাকে ত্যাজ্য ঘোষণা করতে হবে। বরং পিতার উচিৎ সন্তানের ইসলাহের সর্বাত্মক চেষ্টা করা। মায়া মমতা, ভালোবাসা ও পরিমিত শাসন এবং আল্লাহর কাছে গোপনে প্রকাশ্যে রোনাজারির মাধ্যমে দ্বীনের পথে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করা।

হ্যাঁ, কোনো সন্তান যদি হারাম পথে অর্থ অপচয়কারী হয়, তাহলে পিতা মাতা তাকে প্রয়োজনের অতিরিক্ত অর্থ দিবে না;  প্রয়োজনে মৃত্যুর পূর্বেই অল্প রেখে নিজেদের বাকি সম্পদ নেক কাজে খরচ করে দিবে, যাতে সে হারাম পথে ব্যয় করার সুযোগ না পায়। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন,

وَلَا تُؤْتُوا السُّفَهَاءَ أَمْوَالَكُمُ الَّتِي جَعَلَ اللَّهُ لَكُمْ قِيَامًا وَارْزُقُوهُمْ فِيهَا وَاكْسُوهُمْ وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلًا مَعْرُوفًا. النساء:5

“আর যে সম্পদকে আল্লাহ তোমাদের জীবন-যাত্রার অবলম্বন করেছেন, তা নির্বোধদের হাতে তুলে দিও না। বরং তা থেকে তাদেরকে খাওয়াও, পরাও এবং তাদের সঙ্গে ন্যায়সঙ্গত কথা বল।” –সূরা নিসা: ৫

ولو كان ولده فاسقا فأراد أن يصرف ماله إلى وجوه الخير ويحرمه عن الميراث هذا خير من تركه، لأن فيه إعانة على المعصية. ولو كان ولده فاسقا لا يعطي له أكثر من قوته. -البحر الرائق شرح كنز الدقائق ومنحة الخالق وتكملة الطوري: 7/ 288

“কারো সন্তান যদি ফাসেক হয়, আর সে তাকে মিরাস থেকে বঞ্চিত করে নিজের সম্পদ নেক কাজে খরচ করে দিতে চায়, এটা এমন সন্তানের জন্য সম্পদ রেখে যাওয়া অপেক্ষা উত্তম। কারণ, এমন সন্তানের জন্য সম্পদ রেখে যাওয়া মানে তাকে গুনাহের কাজে সহযোগিতা করা। এমনিভাবে কারো সন্তান যদি ফাসেক হয়, তাহলে তাকে প্রয়োজনীয় খাবারের অতিরিক্ত সম্পদ দিবে না।” –আলবাহরুর রায়েক: ৭/২৮৮

তবে কারো মৃত্যুর পর যে সম্পদ থেকে যাবে, ভালো মন্দ সকল ওয়ারিসই শরয়ী নিয়মানুযায়ী সেখান থেকে মিরাস পাবে। তখন কোনো ওয়ারিসকে কম দেয়া কিংবা কাউকে বঞ্চিত করার অধিকার কারো নেই।

উল্লেখ্য, সন্তান অবাধ্য হওয়ার এবং বখে যাওয়ার পেছনে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পিতা মাতার ভূমিকাই প্রধানত দায়ি থাকে। অধিকাংশ পিতা মাতাই সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর থেকে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া পর্যন্ত; সন্তানের দ্বীন ও সুশিক্ষা প্রদান এবং নীতি নৈতিকতার ওপর লালন পালনের যে অধিকার ও ফরজ দায়িত্ব পিতা মাতার ওপর রয়েছে, তা যথাযথভাবে আদায় করেন না। যথাসময় সন্তানের হক আদায় না করাই মূলত তাদের বখে যাওয়ার এবং পিতা মাতার অবাধ্য হওয়ার কারণ হয়। একটি শিশু যখন আদর্শ গ্রহণ ও ধারণের জন্য জীবনের সবচেয়ে উপযুক্ত ও গুরুত্বপূর্ণ অংশটি, দ্বীনি শিক্ষা ও আদর্শ থেকে বঞ্চিত হয়ে নিজের খেয়াল খুশি অনুযায়ী অতিবাহিত করে এবং প্রাপ্ত বয়স্ক হতে হতে এসব অপরাধপ্রবণতা তার নেশায় পরিণত হয়, তখন অনেক চেষ্টা করেও তাকে সংশোধন করা যায় না। আবু হুরাইরা রাযি. থেকে বর্ণিত,

1385- قَالَ النَّبِيُّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كُلُّ مَوْلُودٍ يُولَدُ عَلَى الْفِطْرَةِ فَأَبَوَاهُ يُهَوِّدَانِهِ أَوْ يُنَصِّرَانِهِ أَوْ يُمَجِّسَانِهِ………. – صحيح البخاري ـ م م 2/100

“রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, প্রত্যেক মানব শিশু ফিতরাতের (স্বভাবধর্ম ইসলামের) ওপর জন্মগ্রহণ করে। এরপর তার মাতাপিতা তাকে ইহুদি বা খ্রিস্টান অথবা অগ্নি উপাসকে রুপান্তরিত করে।” –সহীহ বুখারি: ১৩৮৫

বিষয়টি আমাদের সকলেরই খুব গভীরভাবে অনুধাবন করা জরুরি এবং সন্তানের ভূমিষ্ঠ হওয়ার দিন থেকেই তার দ্বীন ধর্ম, শিক্ষা দীক্ষা, উত্তম আখালাক ও আদর্শের ওপর গড়ে তোলার প্রতি সর্বাধিক গুরুত্বারোপ করা জরুরি। বরং জন্মের আগে থেকেই সেরকম আমল ও ফিকির জারি রাখা এবং নেক সন্তানের জন্য দোয়া করা জরুরি। যেমনটি সকল নবী রাসূল ও সালিহিনদের ব্যাপারে কোরআনে কারীমের অসংখ্য আয়াতে বর্ণিত হয়েছে।

আরও দেখুন সূরা নিসা: ১১-১৪; জামে তিরমিযি: ২১২১; মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবা ৩১৬৮৮; আলবাহরুর রায়েক: ৭/২৮৮; মওসুওয়্যাহ ফিকহিয়্যাহ: ৩৬/১৬৭; ইমদাদুল ফাতাওয়া ৪/৩৬৪; ফাতাওয়া উসমানি: ২/২৮৪

فقط، والله تعالى أعلم بالصواب

আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি (উফিয়া আনহু)

০৫-১০-১৪৪৩ হি.

০৭-০৫-২০২২ ঈ.