ফাতওয়া  নং  ১৫

ইসলামে আত্মহত্যা করার কোনো উপায় আছে কি?

ইসলামে আত্মহত্যা করার কোনো উপায় আছে কি?

ইসলামে আত্মহত্যা করার কোনো উপায় আছে কি?

প্রশ্ন-

বিষয় : আত্মহত্যা করা যাবে কি না?

আমার বাসা ঢাকায়। আমার পড়ালেখা চলাকালীন সময় এবং এর পরে বাড়িতে মায়ের কথামতো চলতে না পারায় মা বলত, তুই মরতে পারিস না! এটা প্রায় প্রতিদিনই হতো।

তারপর আমি কোন চাকুরি করতে পারছি না। আমার সংসার চালানোর মতো বয়সও হয়েছে। কিন্তু সংসারে একটা টাকাও দিতে পারছি না। যার কারণে আবার আমার মা-বাবা উভয়ে কথার ফাঁকে ফাঁকে বলে বসে, তুই মরতে পারিস না!

আমি জানি, কেউ আত্মহত্যা করলে জান্নাতে যাবে না। আমার মা-বাবা তো আমাকে এক ধরনের চাপ দিচ্ছে। তো জানতে চাচ্ছি, পরিবারের চাপের কারণে আত্মহত্যা করা যাবে কি? এবং ইসলামে আত্মহত্যা করার ভিন্ন কোনো উপায় আছে কি?

ইবরাহীম

ঢাকা

উত্তর :

بسم الله الرحمن الرحيم

ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন! প্রিয় ভাই আমার, আপনি আত্মহত্যা করবেন কেন? আপনার মতো তরুণ আত্মহত্যা করলে সমাজের মানুষকে দ্বীনের পথে ডেকে আনবে কে? আপনি কি জানেন, আপনার মধ্যে কত যোগ্যতা ও অপার সম্ভাবনা আছে? আপনি কত মূল্যবান একজন মানুষ? আমাদের প্রিয়নবি ﷺ জানিয়ে গেছেন, আপনি যদি দ্বীনের জ্ঞান অর্জন করতে পারেন, তাহলে সোনা-রূপার খনির মতো মূল্যবান হয়ে যাবেন। হাদিসে এসেছে :

الناس معادن كمعادن الفضة والذهب، خيارهم في الجاهلية خيارهم في الإسلام إذا فقهوا. صحيح مسلم: 2638

‘মানুষ সোনা-রূপার খনির মতো। জাহিলি যুগে যারা সম্মানিত ছিল, ইসলামেও তারা সম্মানিত; যদি তারা দ্বীনের ব্যুৎপত্তি অর্জন করে।’ -সহিহ মুসলিম : ২৬৩৮

আপনার প্রশ্ন থেকেও বোঝা যাচ্ছে, আপনি একজন বুঝমান এবং সচেতন মানুষ। যার কারণে আত্মহত্যার চিন্তা মাথায় আসার পরও এ বিষয়ে শরিয়াহর নির্দেশনা জানতে চেয়েছেন। নির্বোধ লোকেরা তা করে না। সুতরাং আপনাকে আল্লাহ যে মেধা দিয়েছেন, তা কাজে লাগিয়ে কয়েকটি বিষয় চিন্তা করুন।

এক. আপনি এই দুনিয়ার সামান্য কিছু পয়সা উপার্জন করতে না পেরেই হতাশ হয়ে যাচ্ছেন। অথচ জীবন যত কঠিনই হোক না কেন, মুমিন কখনো হতাশ হয় না। সে কেন হতাশ হবে বলুন? তার মনিব ও বন্ধু তো স্বয়ং আল্লাহ রাব্বুল আলামিন! হতাশ তো হয় কাফিররা। কারণ, তাদের কোনো বন্ধু নেই, কোনো মনিব নেই। আল্লাহ তায়ালা বলেন :

ذَلِكَ بِأَنَّ اللَّهَ مَوْلَى الَّذِينَ آمَنُوا وَأَنَّ الْكَافِرِينَ لَا مَوْلَى لَهُمْ (11). -محمد

‘এটা এ জন্য যে, আল্লাহ মুমিনদের অভিভাবক আর কাফিরদের কোনো অভিভাবক নেই।’ -সুরা মুহাম্মাদ (৪৭) : ১১

আল্লাহ তাআলার মতো এত বড় দয়ালু, এত বড় ক্ষমতাবান প্রভু যাদের বন্ধু, তাদের কখনো হতাশ হওয়া সাজে বলেন? এজন্যই হতাশ হওয়া গোনাহ। আল্লাহ হতাশ হতে নিষেধ করেছেন। তিনি বলেছেন,

قُلْ يَاعِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَى أَنْفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِنْ رَحْمَةِ اللَّهِ إِنَّ اللَّهَ يَغْفِرُ الذُّنُوبَ جَمِيعًا إِنَّهُ هُوَ الْغَفُورُ الرَّحِيمُ (53). –الزمر

‘বলে দাও, হে আমার বান্দারা, যারা নিজ সত্তার ওপর সীমালঙ্ঘন করেছ, তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সমস্ত পাপ ক্ষমা করেন। নিশ্চয়ই তিনি অতি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।’ -সুরা যুমার (৩৯) : ৫৩

তিনি আরও বলেছেন,

وَلَا تَيْأَسُوا مِنْ رَوْحِ اللَّهِ إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِنْ رَوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ (87). -يوسف

‘তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। নিশ্চয় আল্লাহর রহমত থেকে কেবল কাফির সম্প্রদায় ব্যতীত অন্য কেউ নিরাশ হয় না।’ -সুরা ইউসুফ (১২) : ৮৭

মহান আল্লাহর মতো এত বড় দয়ালু, এত বড় দানশীল, এত বড় ক্ষমতাধর সত্তা যার বন্ধু—তার জন্য হতাশ হওয়া বোকামি বৈ কী? আশা করি আপনার মতো বুদ্ধিমান মানুষ এমন বোকামির চিন্তা মাথা থেকে একদম ঝেড়ে ফেলবেন ইনশাআল্লাহ।

দুই. পিতা মাতার সামান্য বকার কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য আত্মহত্যার কথা ভাবছেন—তাই তো? কিন্তু মনে রাখবেন, আত্মহত্যা কখনো মানুষকে কষ্ট থেকে মুক্তি দেয় না, দিতে পারে না; বরং তা আরও কঠিন কষ্টে নিপতিত করে। আত্মহত্যা করার পর বান্দাকে যখন জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করা হবে, তখন সে বুঝবে, কত বড় মারাত্মক বোকামি সে করেছে। দুনিয়ার সামান্য কষ্ট থেকে বাঁচার জন্য এমন কঠিন আগুনে নিক্ষিপ্ত হয়েছে। কিন্তু তখন বুঝলেও তা আর কোনো উপকারে আসবে না। সেই ভয়ানক আগুন থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া যাবে না।

তিন. আত্মহত্যা করা অনেক বড় গোনাহ। কুরআন-সুন্নাহয় আত্মহত্যার ব্যাপারে কঠিন শাস্তির ধমকি এসেছে।

আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন :

وَلَا تَقْتُلُوا أَنْفُسَكُمْ إِنَّ اللَّهَ كَانَ بِكُمْ رَحِيمًا وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ عُدْوَانًا وَظُلْمًا فَسَوْفَ نُصْلِيهِ نَارًا.

‘তোমরা নিজেরা নিজেদেরকে হত্যা করো না। নিশ্চিত জেনে রেখো, আল্লাহ তোমাদের প্রতি পরম দয়ালু। যে ব্যক্তি অন্যায়ভাবে সীমালঙ্ঘন করে এরূপ করবে, অচিরেই আমি তাকে জাহান্নামে প্রবেশ করাবো। -সুরা নিসা (৪): ২৯

হাদিস শরিফে এসেছে :

“ومن قتل نفسه بشيء في الدنيا عذب به يوم القيامة”. -أخرجه البخاري برقم 6047 طـ دار طوق النجاة ، ومسلم برقم 176. طـ دار إحياء التراث العربي

‘যে ব্যক্তি দুনিয়াতে কোনো বস্তু দ্বারা আত্মহত্যা করবে, কিয়ামতের দিন তাকে সে বস্তু দ্বারা আজাব দেওয়া হবে।’ –সহিহ বুখারি : ৬০৪৭; সহিহ মুসলিম : ১৭৬

অপর হাদিসে এসেছে :

عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: من تردى من جبل فقتل نفسه، فهو في نار جهنم يتردى فيه خالدا مخلدا فيها أبدا، ومن تحسى سما فقتل نفسه، فسمه في يده يتحساه في نار جهنم خالدا مخلدا فيها أبدا، ومن قتل نفسه بحديدة، فحديدته في يده يجأ بها في بطنه في نار جهنم خالدا مخلدا فيها أبدا”. -أخرجه البخاري برقم  5778 طـ دار طوق النجاة ، ومسلم برقم 175طـ دار إحياء التراث العربي

‘রাসুল ﷺ ইরশাদ করেন, যে ব্যক্তি পাহাড় হতে পড়ে আত্মহত্যা করবে, সে জাহান্নামে চিরকাল পাহাড় হতে পড়ে শাস্তি পেতে থাকবে। যে বিষ পান করে আত্মহত্যা করবে, জাহান্নামে তার হাতে বিষ দেয়া হবে, সে চিরকাল বিষপান করে শাস্তি পেতে থাকবে। যে লোহা দিয়ে আত্মহত্যা করবে, তার হাতে লোহা ধরিয়ে দেওয়া হবে। সে লোহা দ্বারা চিরকাল তার পেট চিড়তে থাকবে।’ –সহিহ বুখারি : ৫৭৭৮; সহিহ মুসলিম : ১৭৫

এছাড়াও আরও অনেক হাদিসে আত্মহত্যার কঠিন শাস্তির কথা বলা হয়েছে। সুতরাং কষ্ট হতে বাঁচার জন্য আত্মহত্যার কোনো পদ্ধতি ইসলামে নেই এবং বাস্তবেও নেই। আত্মহত্যার অর্থই হচ্ছে, যেই বিপদ থেকে বাঁচার জন্য আত্মহত্যা করবেন, তার চেয়ে হাজার হাজার গুণ বড় বিপদে নিক্ষিপ্ত হবেন। তাই এরকম ইচ্ছা হতে অবশ্যই বিরত থাকতে হবে।

চার. আরেকটি কথা ভালো করে বুঝুন। আপনার মা-বাবা যে আপনাকে আত্মহত্যা করতে বলছেন, এটা হলো কথার কথা। বাস্তবতা হলো, আপনি আত্মহত্যা করেন—এটা তারা কখনোই চান না। আপনি বিপদে পড়লে সবার আগে আপনার মা-বাবাই আপনার সাহায্যে দৌড়ে আসবে। যদিও এভাবে কাউকে আত্মহত্যা করতে বলা ঠিক নয়। কিন্তু তারা হয়তো ভাবছেন, এভাবে বললে, আপনি আরও ভালো হওয়ার চেষ্টা করবেন, উপার্জন করার চেষ্টা করবেন—এ জন্যই বলছেন। তাই আপনি জায়েয বিষয়ে তাদের যথাসাধ্য আনুগত্য করুন, খেদমত করুন। সদাচার, মিষ্টি ভাষা ও নরম ব্যবহারের মাধ্যমে তাদের মন জয় করার চেষ্টা করুন।

পাঁচ. আর জেনে রাখুন, আল্লাহ তায়ালা আপনাকে ভালোবাসেন বলেই কিছু দুঃখ-কষ্ট দিয়েছেন, যেন আপনি সতর্ক হন এবং গোনাহ থেকে তওবা করে ফিরে আসেন, এর মাধ্যমে আপনার গোনাহ মাফ হয়ে যায়, আখিরাতে আপনার মর্যাদা ও সুখ-শান্তি বৃদ্ধি পায়। সুতরাং এই সামান্য বিপদে হতাশ হবার কী আছে! আল্লাহমুখী এবং কর্মমুখী হোন!

আল্লাহ তায়ালা বলেন,

وَلَنَبْلُوَنَّكُمْ بِشَيْءٍ مِنَ الْخَوْفِ وَالْجُوعِ وَنَقْصٍ مِنَ الْأَمْوَالِ وَالْأَنْفُسِ وَالثَّمَرَاتِ وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُمْ مُصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِنْ رَبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ [البقرة: 155 – 157]

‘আমি অবশ্যই তোমাদেরকে পরীক্ষা করব ভয়-ভীতি দ্বারা, ক্ষুধা দ্বারা এবং প্রাণ, সম্পদ ও ফসলহানি দ্বারা। সবরকারীদের সুসংবাদ দাও। যারা বিপদগ্রস্ত হলে বলে, ‘ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন’ (আমরা সকলে আল্লাহরই এবং আমরা তাঁর কাছেই ফিরে যাব)। তারা ওই সব লোক, যাদের প্রতি তাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে বিশেষ করুণা ও দয়া রয়েছে এবং তারাই দায়াতের ওপর রয়েছে।’ –সুরা বাকারা (২): ১৫৫-১৫৭

আয়াতের ব্যাখ্যায় আল্লামা তাকি উসমানি দাঃবাঃ বলেন :

‘এ বাক্যের ভেতর প্রথমত এই সত্যের স্বীকারোক্তি রয়েছে যে, আমরা সকলেই যেহেতু আল্লাহ তাআলার মালিকানাধীন, তাই আমাদের ব্যাপারে তাঁর যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের অধিকার রয়েছে। আবার আমরা যেহেতু তাঁরই, আর কেউ নিজের জিনিসের অমঙ্গল চায় না, তাই আমাদের সম্পর্কে তাঁর যেকোনো ফায়সালা আমাদের কল্যাণার্থেই হবে; হতে পারে তাৎক্ষণিকভাবে সে কল্যাণ আমাদের বুঝে আসছে না। দ্বিতীয়ত এর মধ্যে এই সত্যেরও প্রকাশ রয়েছে যে, একদিন আমাকে আল্লাহ তায়ালার কাছে যেতেই হবে। আর আমি যখন তাঁর কাছে যাব, তখন এই বিপদ-আপদ ও দুঃখ-কষ্টের সওয়াবও লাভ করব ইনশাআল্লাহ।’ -তাওজিহুল কুরআন : ১/১০৬

রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন :

إذا أراد الله بعبده الخير عجل له العقوبة في الدنيا، وإذا أراد الله بعبده الشر أمسك عنه بذنبه حتى يوافي به يوم القيامة، … إن عظم الجزاء مع عظم البلاء، وإن الله إذا أحب قوما ابتلاهم، فمن رضي فله الرضا، ومن سخط فله السخط. رواه الترمذي 2396 وقال: هذا حديث حسن غريب من هذا الوجه.

‘আল্লাহ তাআলা যখন তাঁর বান্দার কল্যাণ কামনা করেন, তখন দুনিয়াতেই তাকে পাপের শাস্তি দিয়ে দেন। আর যদি তিনি বান্দার অকল্যাণ চান, তবে তার গোনাহের শাস্তি অবশিষ্ট রাখেন এবং কিয়ামতের দিন পূর্ণরূপে তাকে শাস্তি প্রদান করেন। নিশ্চয়ই দুঃখ-কষ্ট যত বেশি হবে, প্রতিদানও তত বড় হবে। আল্লাহ তাআলা যখন কোনো সম্প্রদায়কে ভালোবাসেন, তখন তাদেরকে বিপদ-আপদে ফেলেন। যারা এতে সন্তুষ্ট থাকে (সবর করে) আল্লাহও তাদের প্রতি সন্তুষ্ট হয়ে যান। আর যারা অসন্তুষ্ট হয়, আল্লাহ তাআলাও তাদের প্রতি নারাজ হয়ে যান।’ –সুনানুত তিরমিজি : ২৩৯৬

উপরের পাঁচটি বিষয় চিন্তা করে আপনি বর্তমান সমস্যার সমাধানের জন্য এবং নিজের ভবিষ্যৎকে সুন্দর করার জন্য গুরুত্বসহকারে নিম্নবর্ণিত কাজগুলোর প্রতি মনোযোগী হোন—

এক. নিজের জীবনে কী কী গোনাহ আছে, তা স্মরণ করে এখন থেকে সবগুলো গোনাহ ছেড়ে দিন। কারণ, হাদিসে এসেছে, বান্দার গোনাহের কারণে তাকে রিজিক থেকে বঞ্চিত করা হয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন :

… وإن الرجل ليحرم الرزق بالذنب يصيبه. رواه ابن ماجه، (90) وابن حبان في صحيحه (872) وقال البوصيري في مصباح الزجاجة : (4/187) : هذا إسناد حسن. وقال الشيخ عوامة في تعليقه على المصنف (15/410) : (ورواه الحاكم 1/493 وصححه واوفقه الذهبي، والحديث صحيح أو حسن).

 

‘…. নিশ্চয় ব্যক্তিকে তার পাপের কারণে রিজিক হতে বঞ্চিত করা হয়।’ -সুনানে ইবনি মাজাহ : ৯০; সহিহ ইবনে হিব্বান : ৮৭২

দুই. আগামী দিনগুলোতে গোনাহ বর্জনের দৃঢ় প্রত্যয় রাখার পর অতীতের সকল গোনাহের জন্য দিল থেকে আল্লাহর কাছে তওবা করুন এবং কান্নাকাটি করে ক্ষমা প্রার্থনা করুন। হাদিসে এসেছে :

من لزم الاستغفار جعل الله له من كل هم فرجا، ومن كل ضيق مخرجا، ورزقه من حيث لا يحتسب. رواه أبو داود : (1518)، وقال الحافظ ابن حجر في «الأمالى المطلقة» : (ص: 251 ط. المكتب الإسلامي: 1416 هـ) : (هذا حديث حسن غريب). وقال الشيخ أحمد شاكر في تعليقه على «مسند أحمد» : (رقم: 2233) : (إسناده صحيح(

‘যে বেশি বেশি ইস্তেগফার ও ক্ষমা প্রার্থনা করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে সকল দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি থেকে মুক্তি দান করবেন, তার সব সঙ্কট দূর করে দেবেন এবং তাকে অকল্পনীয়ভাবে রিজিক দান করবেন।’ -সুনানে আবু দাউদ : ২২৩৩

তিন. আল্লাহর প্রতি এবং ইবাদতের প্রতি বেশি মনোযোগী হোন। ফরজ ইবাদতগুলো যথাযথভাবে পালন করুন। বেশি বেশি নফল নামাজ, রোজা, জিকির ও তেলাওয়াত করার চেষ্টা করুন। সাধ্যানুযায়ী দান-সদকা করুন; যদিও তা একেবারে অল্পই হোক না কেন। আল্লাহ তাআলা বলেন :

وَمَنْ يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَلْ لَهُ مَخْرَجًا وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ إِنَّ اللَّهَ بَالِغُ أَمْرِهِ قَدْ جَعَلَ اللَّهُ لِكُلِّ شَيْءٍ قَدْرًا [الطلاق: 2، 3]

‘যে-কেউ তাকওয়া অবলম্বন করবে, আল্লাহ তার জন্য সংকট থেকে উত্তরণের পথ তৈরি করে দেবেন এবং তাকে এমনভাবে রিজিক দান করবেন, যা তার ধারণার বাইরে। যে-কেউ আল্লাহর ওপর নির্ভর করে, আল্লাহই তার জন্য যথেষ্ট। নিশ্চিতভাবে জেনে রেখো, আল্লাহ তার কাজ পূরণ করেই থাকেন। (অবশ্য) আল্লাহ সবকিছুর জন্য একটা পরিমাণ নির্দিষ্ট করে রেখেছেন।’ -সুরা তালাক (৬৫) : ২-৩

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে :

مَنْ عَمِلَ صَالِحًا مِنْ ذَكَرٍ أَوْ أُنْثَى وَهُوَ مُؤْمِنٌ فَلَنُحْيِيَنَّهُ حَيَاةً طَيِّبَةً وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَجْرَهُمْ بِأَحْسَنِ مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ [النحل: 97]

‘যে ব্যক্তিই মুমিন হয়ে সৎকর্ম করবে, সে পুরুষ হোক বা নারী, আমি অবশ্যই তাকে উত্তম জীবন যাপন করাব এবং তাদের উৎকৃষ্ট কর্ম অনুযায়ী তাদের প্রতিদান অবশ্যই প্রদান করব।’ -সুরা নাহল (১৬) : ৯৭

এ আয়াতের তাফসিরে ইমাম ইবনে কাসির রহ. বলেন :

هذا وعد من الله تعالى لمن عمل صالحا بأن يحييه الله حياة طيبة في الدنيا وأن يجزيه بأحسن ما عمله في الدار الآخرة. والحياة الطيبة تشمل وجوه الراحة من أي جهة كانت. وقد روي عن ابن عباس وجماعة أنهم فسروها بالرزق الحلال الطيب. (تفسير ابن كثير ت سلامة 4/ 601 دار طيبة الطبعة: الثانية 1420هـ(

‘এটা আল্লাহ তাআলার পক্ষ হতে ওয়াদা, যে ব্যক্তি নেক আমল করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে দুনিয়াতে উত্তম জীবন যাপন করাবেন এবং আখিরাতে তার আমলের উত্তম প্রতিদান দান করবেন। ‘উত্তম জীবনে’ প্রশান্তির সব ধরনের উপকরণ অন্তর্ভুক্ত। ইবনে আব্বাস রা. এবং অনেক মুফাসসির এর ব্যাখ্যা করেছেন, উৎকৃষ্ট ও হালাল রিজিক দ্বারা।” –তাফসিরে ইবনে কাসির : ৪/৬০১

চার. রিজিকের জন্য বেশি বেশি করে নিচের এই দুয়াগুলো করুন :

اَللّٰهُمَّ إنِّي أَسْأَلُكَ عِلْمًا نَافِعًا وَرِزْقًا طَيِّبًا وَعَمَلاً مُتَقَبَّلاً

‘হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি উপকারী ইলম, হালাল রিজিক এবং মাকবুল আমল।’

اللَّهُمَّ اكْفِنِي بِحَلاَلِكَ عَنْ حَرَامِكَ، وَأَغْنِنِي بِفَضْلِكَ عَمَّنْ سِوَاكَ.

‘হে আল্লাহ, আপনি আপনার হালাল বস্তু দ্বারা আপনার হারাম বস্তু থেকে আমাকে রক্ষা করুন এবং আপনি ব্যতীত অন্য সবার থেকে আমাকে অমুখাপক্ষেী করে দিন।’

বিশেষ করে যদি ভোররাতে উঠতে পারেন, বেশি ভালো হয়। তখন আল্লাহ বান্দাকে ডেকে ডেকে বলতে থাকেন :

من يدعوني، فأستجيب له من يسألني فأعطيه، من يستغفرني فأغفر له

‘কে আমাকে ডাকবে? আমি তার ডাকে সাড়া দেবো। কে আমার কাছে চাইবে? আমি তার চাওয়া পূরণ করব। কে আমার কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করবে? আমি তাকে ক্ষমা করব। -সহিহ বুখারি : ১১৪৫ সহিহ মুসলিম : ৭৫৮

পাঁচ. ‘ইয়া রাযযাকু!’ ‘ইয়া রাযযাকু!’ বেশি বেশি পড়ুন।

ছয়. সর্বশেষ একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা শুনুন! ফতোয়াটি পড়ার পর এই কথাটি একটু নির্জনে বসে বসে চিন্তা করে দেখবেন, কথাটি বাস্তবসম্মত কি না?

শয়তান হয়তো কুমন্ত্রণা দিয়ে বারবার আপনার মনে একটি সমস্যা ঢুকিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। সে আপনাকে বলতে চায়, ছোটখাটো কাজ করা অথবা ছোট চাকরি বা ব্যবসা করা তোমার দ্বারা মানায় না। এটা তোমার জন্য অপমানজনক। এ জন্য আপনি শুরুতেই বড় পদের ও অনেক মর্যাদার চাকরি, বা বড় ব্যবসা-বাণিজ্যের কথা চিন্তা করে সাধারণ কোনো চাকরি বা ব্যবসা করতে পারছেন না। অন্যথায় ঢাকা শহরে থাকা একটা শিক্ষিত ছেলের মুখে এমন কথা কিছুতেই সম্ভব নয় যে, আমি কোনো উপার্জন করতে পারি না এবং মা-বাবাকে টাকাপয়সা দিতে পারি না বিধায় তারা আমাকে মরতে বলেন। ঢাকা শহরে আপনার চেয়ে অনেক ছোট ছোট ১০/১২ বছরের অশিক্ষিত বহু বাচ্চাও দৈনিক ৫০০/৭০০ টাকা পর্যন্ত উপার্জন করে নিজেদের মা-বাবা’র হাতে তুলে দেয়। গাড়িতে যারা ৫০০/১০০০ টাকার পুঁজি নিয়ে হকারি করে, যারা রাস্তার মোড়ে ঝাল মুড়ি বিক্রি করে, কিংবা কাঁচা তরকারি বিক্রি করে, এরকম দুই চারজনের সঙ্গে একটু কথা বলে দেখুন, ওরা কত টাকা পুঁজি খাটিয়ে দৈনিক কত টাকা উপার্জন করে।

মনে রাখবেন, বাস্তবেই যদি আপনার অন্তরে এমন কুমন্ত্রণার সমস্যা থাকে, তাহলে এটা অনেক বড় সমস্যা। এটা থেকে আপনাকে বের হতেই হবে। অন্যথায় যত পরামর্শই করুন, আপনার সমস্যার সমাধান সহজে হবার নয়।

আমি বলছি না, আপনাকে হকারি করতে হবে। আপনি সামান্য পুঁজি খরচ করে ছোট্ট একটা ফলের দোকান দিন। না হয় বড় একটা মসজিদের সামনে ছোট্ট একটা টং দোকান নিয়ে আতর-টুপি বিক্রি করা শুরু করুন। মানুষ প্রথম ধাপেই বড় ব্যবসায়ী হতে পারে না। ছোট থেকেই বড় হতে হয়। হালাল উপার্জনের নিয়তে আল্লাহর ওপর ভরসা করে শুরু করে দেখুন, আল্লাহ অবশ্যই তাতে বরকত দান করবেন ইনশাআল্লাহ। এখন তো আপনি মা-বাবার বোঝা হয়ে আছেন, তখন হয়তো আপনার মা-বাবার সকল খরচ আপনিই বহন করতে পারবেন ইনশাআল্লাহ।

আর যদি এটা না পারেন এবং এই সামান্য কয়টা টাকা উপার্জনের জন্য আপনার মতো ছেলেকে আত্মহত্যার চিন্তা করতে হয়, তাহলে প্রয়োজনে হকারি করেন, তবুও ভালো। কারণ, পরের বোঝা হওয়ার অসম্মান থেকে যেকোনো হালাল পেশা অবলম্বন করে নিজের উপার্জন নিজে করা অনেক বড় সম্মান ও মর্যাদার বিষয়; চাই তা বাহ্যত যত ছোট পেশাই হোক না কেন। আল্লাহ তাআলার কাছে মর্যাদার মাপকাঠি তো তাকওয়া ও তাঁর ভয়।

আল্লাহ তাআলা বলেন :

إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ. [الحجرات : 13]

‘নিশ্চয় আল্লাহর কাছে তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে মর্যাদার অধিকারী ওই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে সর্বাধিক মুত্তাকি।’ -সুরা হুজুরাত (৪৯): ১৩

দাউদ আলাইহিস সালাম বর্ম বানিয়ে জীবিকা নির্বাহ করতেন। যাকারিয়া আলাইহিস সালাম ছিলেন কাঠমিস্ত্রি। মুসা আলাইহিস সালাম দশ বছর পর্যন্ত ছাগল চরিয়েছেন। বরং আমাদের নবিজিসহ সকল নবিই ছাগল চরিয়েছেন। (দেখুন—সুরা আম্বিয়া (২১) : ৮০; সুরা সাবা (৩৪) : ১০ সুরা কাসাস (২৮) : ২৭; সহিহ বুখারি : ২০৭২, ২২৬২ সহিহ মুসলিম : ২৩৭৯) তো আমাদের সম্মান ও মর্যাদা নিশ্চয়ই নবি-রাসুলগণের চেয়ে বেশি নয়। সুতরাং তাঁরা এসব কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারলে, আমরা কেন সম্মান রক্ষার নাম করে নিজেদের ও অন্যদের কষ্ট দেবো? কেন এভাবে অভাব অনটনে পড়ে থাকব? আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করে যেকোনো হালাল কাজে নেমে পড়ুন। ইনশাআল্লাহ আল্লাহ তাতে বরকত দান করবেন। আপনি উপার্জন শুরু করলে আপনার মা-বাবার অন্তরেও আপনার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি হবে। মানুষের দৃষ্টিতেও আপনার সম্মান বৃদ্ধি পাবে।

আল্লাহ তাআলা আপনাকে হিম্মত ও সাহস দান করুন। ভরপুর তাওফিক দান করুন। আপনার অন্তর প্রশান্তিতে পূর্ণ করে দিন। সব ধরনের দুখ-কষ্ট দূর করে দিন। আমিন, ইয়া রব্বাল আলামিন।

 

আবুমুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি

১২ রমজান, ১৪৪১ হি.

০৬ মে, ২০২০ ইং