প্রশ্ন: মোবাইলে ছবি তোলা ও ভিডিও ধারণের বিধান কী?
-আবু আম্মার
উত্তর:
بسم الله الرحمن الرحيم
দ্বীনি প্রয়োজন কিংবা শরীয়ত সম্মত দুনিয়াবি প্রয়োজনে মোবাইলে ছবি তোলা ও ভিডিও করা জায়েয। যেমন পরিচয়পত্র, পাসপোর্ট, অপরাধী শনাক্তকরণ, চিকিৎসা, শিক্ষা, দাওয়াত ও জিহাদ ইত্যাদি ক্ষেত্রে ছবি ও ভিডিও ধারণ করা। -ফাতাওয়াল লাজনাতিদ দায়েমা: ১/৬৬০ (রিয়াসাতু ইদারাতিল বুহুস); তাকমিলা ফাতহুল মুলহিম: ৪/৯৮ (আশরাফিয়্যা), ফাতাওয়া উসমানী: ৪/৩৫৯-৩৬১ (মাকতাবাতু মাআরিফিল কুরআন, করাচি); জাদিদ ফিকহী মাসায়েল: ২/২২৭-২২৮, (কুতুবখানা নাঈমিয়্যা-দেওবন্দ)
তবে শুধু বিনোদনের জন্য যেকোনো প্রাণীর ছবি তোলা ও ভিডিও করা ঠিক নয়। এটি একটি অহেতুক কাজ। একজন মুসলমানের জন্য অহেতুক কাজে জড়ানো শোভনীয় নয়। অহেতুক কাজ থেকে বিরত থাকাকে আল্লাহ তাআলা মুমিনের অন্যতম বৈশিষ্ট হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:-
قَدْ أَفْلَحَ الْمُؤْمِنُونَ * الَّذِينَ هُمْ فِي صَلَاتِهِمْ خَاشِعُونَ * وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ. [المؤمنون: 1 – 3]
“নিশ্চয়ই সফলতা অর্জন করেছে মুমিনগণ, যারা তাদের নামাযে আন্তরিকভাবে বিনীত। যারা অহেতুক বিষয় থেকে বিরত থাকে।” –(সূরা মুমিনুন, ২৩:০১-০৩)
সুনানে তিরমিযীর এক হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন:
«إِنَّ مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ المَرْءِ تَرْكَهُ مَا لَا يَعْنِيهِ». -سنن الترمذي ت شاكر: 82318
“অপ্রয়োজনীয় বিষয় পরিত্যাগ করা ব্যক্তির ইসলামের সৌন্দর্যের অংশ।” –তিরমিযী: ২৩১৮
তথাপি কেউ করলে তা নিয়ে অতিরিক্ত বাড়াবাড়ি ও কঠোরতা কাম্য নয়। কেননা মোবাইলে ছবি ও ভিডিও করার মাসআলাটি উলামায়ে কেরামের মাঝে মতভেদপূর্ণ। উভয়দিকেই উল্লেখযোগ্য উলামায়ে কেরাম আছেন এবং সবারই গ্রহণযোগ্য দলীল আছে। আর মতভেদপূর্ণ মাসআলায় কোন একটি মতের উপর আমলকারীকে কঠোরভাবে বাধা প্রদান ও তা নিয়ে বাড়াবাড়ির সুযোগ নেই।
সুফিয়ান সাওরী রহিমাহুল্লাহ (১৬১ হিজরী) বলেন,
إذا رأيت الرجل يعمل العمل الذي قد اختلف فيه وأنت ترى غيره فلا تنهه. –الفقيه والمتفقه: 2/136
“যখন তুমি মতভেদপূর্ণ মাসআলায় কাউকে কোনো একটি মতের অনুসরণ করতে দেখ, তবে তুমি ভিন্নমতের অনুসারী হলেও তাকে নিষেধ করো না।” -আলফকিহ ওয়াল মুতাফাক্কিহ, খতীব বাগদাদী: ২/১৩৬ (দারু ইবনুল জাওযী)
ইমাম নববী রহিমাহুল্লাহ (৬৭৬ হি.) বলেন,
إنما يأمر وينهى من كان عالما بما يأمر به وينهى عنه، وذلك يختلف باختلاف الشيء، فإن كان من الواجبات الظاهرة والمحرمات المشهورة كالصلاة والصيام والزنا والخمر ونحوها فكل المسلمين علماء بها، وإن كان من دقائق الأفعال والأقوال ومما يتعلق بالاجتهاد لم يكن للعوام مدخل فيه ولا لهم إنكاره، بل ذلك للعلماء. ثم العلماء إنما ينكرون ما أجمع عليه، أما المختلف فيه فلا إنكار فيه. -شرح مسلم للنووي: 2/23
“আমর বিল মারূফ ও নাহী আনিল মুনকার এমন ব্যক্তিই করবে, যে আদেশ-নিষেধ সম্পর্কে জ্ঞান রাখে। এটি বিষয়ভেদে ভিন্ন হয়। যদি তা প্রকাশ্য ফরয এবং প্রসিদ্ধ হারাম বিষয় যেমন সালাত, সাওম, ব্যভিচার, মদ ইত্যাদি হয়, তবে সব মুসলমানই এ সম্পর্কে জানে। কিন্তু যদি এটি সূক্ষ্ম কাজ এবং কথা হয়, যা ইজতিহাদের সাথে সম্পর্কিত, তাহলে সাধারণ মানুষের এতে কোনো দখল নেই এবং এক্ষেত্রে তাদের বারণ করার অধিকার নেই; বরং তা আলেমদের কাজ। আর আলেমরাও কেবল সেই বিষয়গুলো থেকে বারণ করবেন, যার ব্যাপারে সবাই একমত। যে বিষয়গুলোতে মতভেদ আছে, সেখানে বারণ করার সুযোগ নেই।” -শরহে মুসলিম: ২/২৩ (দারু ইহয়ায়িত তুরাস)
উল্লেখ্য: প্রাকৃতিক বিভিন্ন দৃশ্য, গাছ-গাছালি, ফুল, পাহাড়-পর্বত, বাড়ি-গাড়ি ইত্যাদির মতো প্রাণহীন জিনিসের ছবি/ভিডিও তোলা ও সংরক্ষণ করা সর্বসম্মতিক্রমে জায়েয।
সহীহ বুখারীর এক হাদীসে এসেছে,
عَنْ سَعِيدِ بْنِ أَبِي الحَسَنِ، قَالَ: كُنْتُ عِنْدَ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُمَا، إِذْ أَتَاهُ رَجُلٌ فَقَالَ: يَا أَبَا عَبَّاسٍ، إِنِّي إِنْسَانٌ إِنَّمَا مَعِيشَتِي مِنْ صَنْعَةِ يَدِي، وَإِنِّي أَصْنَعُ هَذِهِ التَّصَاوِيرَ، فَقَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ: لاَ أُحَدِّثُكَ إِلَّا مَا سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُولُ: سَمِعْتُهُ يَقُولُ: «مَنْ صَوَّرَ صُورَةً، فَإِنَّ اللَّهَ مُعَذِّبُهُ حَتَّى يَنْفُخَ فِيهَا الرُّوحَ، وَلَيْسَ بِنَافِخٍ فِيهَا أَبَدًا» فَرَبَا الرَّجُلُ رَبْوَةً شَدِيدَةً، وَاصْفَرَّ وَجْهُهُ، فَقَالَ: وَيْحَكَ، إِنْ أَبَيْتَ إِلَّا أَنْ تَصْنَعَ، فَعَلَيْكَ بِهَذَا الشَّجَرِ، كُلِّ شَيْءٍ لَيْسَ فِيهِ رُوحٌ. -صحيح البخاري: 2225
“তাবিয়ি সায়ীদ ইবনে আবুল হাসান বলেন, “আমি ইবনে আব্বাসের (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) নিকট বসে ছিলাম। এমতাবস্থায় একব্যক্তি তাঁর নিকট এসে বললেন, হে আবু আব্বাস, আমি এমন একজন মানুষ যে নিজের হাতের কর্ম করে নিজের জীবিকা উপার্জন করি। আমি এসব ছবি তৈরি করি। তখন ইবনে আব্বাস রা. বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ (ﷺ) কে যা বলতে শুনেছি তা ছাড়া আর কিছুই বলব না। আমি তাঁকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি কোনো ছবি তৈরি করবে আল্লাহ তাকে শাস্তি দিতে থাকবেন যতক্ষণ না সে সেই ছবির মধ্যে প্রাণ সঞ্চার করবে। আর সে কখনোই তাতে প্রাণ সঞ্চার করতে পারবে না। একথায় ওই ব্যক্তি কঠিনভাবে ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে উঠল এবং তার মুখমণ্ডল হলদে হয়ে গেল। তখন ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা তাঁকে বললেন, আহা বেচারা! তুমি যদি অন্য কিছু না করতে পার তবে তুমি এ সকল প্রাণহীন গাছগাছালির ছবি তৈরি করবে।” -সহীহ বুখারী: ২২২৫
فقط، والله تعالى أعلم بالصواب
আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি (উফিয়া আনহু)
২৩-১০-১৪৪৭ হিজরী
১২-০৪-২০২৬ ঈসায়ী