কিতাব-রিসালাহশায়খ ফজলুর রহমান কাসিমি

ভারত উপমহাদেশের শাসকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা মুসলমানদের উপর কেন ওয়াজিব? [সকল পর্ব একত্রে]

ভারত উপমহাদেশের শাসকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা মুসলমানদের উপর কেন ওয়াজিব? [সকল পর্ব একত্রে]

ভূমিকা

[সম্মানিত তাওহীদবাদী ভাই ও বোনেরা! মুহতারাম শায়খ ফজলুর রহমান কাসিমি হাফিযাহুল্লাহ’র বক্ষ্যমাণ ‘ভারত উপমহাদেশের শাসকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা মুসলমানদের উপর কেন ওয়াজিব?’ লেখাটি কতটা গুরুত্ব আশা করছি আপনারা নাম দেখেই অনুধাবন করতে পেরেছেন। এই প্রবন্ধটির উর্দু সংস্করণ ইতিপূর্বে জামাআত কায়েদাতুল জিহাদ উপমহাদেশ শাখার অফিসিয়াল উর্দু ম্যাগাজিন ‘নাওয়ায়ে গাযওয়ায়ে হিন্দ’ এর গত জানুয়ারি ২০২১ ইংরেজি সংখ্যায় ‘বাররে সাগির কে হুকমারানু কে খেলাফ মুসলমানু পার লড়না কিউ ওয়াজিব হায়?’ (بر صغير کے حکمارانوں کے خلاف لڑنا مسلمانوں پر کيوں واجب ہے)   শিরোনামে  প্রকাশিত হয়েছিলো।

অতীব গুরুত্বপূর্ণ এই রিসালাহ’র বাংলা মূল সংস্করণটি লেখক আমাদের কাছে প্রেরণ করেছেন, যা এখন পুস্তিকা আকারে আপনাদের সম্মুখে বিদ্যমান।

উপমহাদেশে তাওহীদবাদী মুসলিমদের সাথে সাথে হিন্দুত্ববাদী মুশরিকদের যে অমোঘ সংঘাতের প্রেক্ষাপট ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে তার বাস্তবতা অনুধাবনের জন্য, উপমহাদেশে ইসলামী শাসন ফিরিয়ে আনা সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য এই রিসালাহটি  ইনশাআল্লাহ উপকারী হবে।

সম্মানিত পাঠকদের কাছে নিবেদন হল- লেখাটি গভীরভাবে বারবার পড়বেন, এবং নিজের করণীয় সম্পর্কে সচেতন হবেন ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ এই রচনাটি কবুল ও মাকবুল করুন! এর ফায়েদা ব্যাপক করুন! আমীন।–সম্পাদক]

 

الحمد لله وكفى وسلام على عباده الذين اصطفى، أما بعد

মুসলিম বিশ্ব ও মুসলমানদের অধিকাংশ কাফেলার বর্তমান হালাত দেখলে এমন মনে হয় যে, মুসলমানরা তাদের জন্য এ কথা মেনে নিয়েছে এবং নিজেদের ভাগ্যের বিষয়ে এ সিদ্ধান্তে পৌঁছে গেছে যে, তারা ভবিষ্যতে কখনও দুনিয়া ও দুনিয়াবাসীকে পরিচালনার দায়িত্ব নিজেদের হাতে নেবে না, যে দায়িত্ব পৃথিবীর সূচনালগ্ন থেকে তাদের উপর ছিলো এবং তাদের হাতেই ছিলো।

তাদের পরিস্থিতি দেখলে এমন মনে হয় যে, তারা তাদের সকল দায়-দায়িত্ব সেসব লোকদের হাতে ছেড়ে দিয়েছে, যারা তাদের একমাত্র মাবূদ আল্লাহ তাআলার দুশমন। মুসলমানদের প্রাণের চাইতেও প্রিয় সত্তা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের যারা দুশমন, সকল মুসলমানের দুশমন, খোদ তাদের জান-মালের যারা দুশমন এবং যারা পুরো সৃষ্টি জগতের দুশমন তাদের হাতে দায়-দায়িত্ব ন্যস্ত করে দিয়েছে। মুসলমানরা তাদের যিম্মাদারি হাতে নেয়ার সাহস একেবারেই হারিয়ে ফেলেছে। নিজেদের একমাত্র মাবূদের একক সত্তার সমর্থন করা ও তা প্রমাণিত করার হিম্মত তারা হারিয়ে ফেলেছে। নিজেদের শাসনব্যবস্থা পরিচালনার হিম্মত তারা হারিয়ে ফেলেছে। নিজেদের জীবনধারা তৈরি করার হিম্মত তারা হারিয়ে ফেলেছে। নিজের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক চালচলন, দিন-রাতের সকল কাজ-কর্ম ও কথা-বার্তার ক্ষেত্রেও তারা নিজেদের যিম্মাদারি নিজেদের হাতে নেয়ার হিম্মত হারিয়ে ফেলেছে।

অবস্থা এমন পর্যায়ে উপনীত হয়েছে যে, ‘একমাত্র মাবূদ আল্লাহ তাআলা, তাঁর কোন শরীক নেই’ মুসলমানদের এ আকীদা লালন করতে হলে কোনো রামজি (কোন হিন্দু) থেকে বা কোনো মিস্টার (কোনো ইহুদী-খ্রিস্টান-নাস্তিক) থেকে তা অনুমোদন করিয়ে নিতে হবে! মুসলমানরা তাদের দেশ ও তাদের আদালত কোন আইনে পরিচালনা করবে, তা কুরআন-হাদীস ও ইসলামী ফিকহকে জিজ্ঞেস না করে অমুসলিম নেতাদেরকে জিজ্ঞেস করতে হবে এবং তাদের কাছ থেকে তা শিখতে হবে! মুসলমানরা তাদের ব্যক্তিগত ও পারিবারিক জীবনে কোন্ পদ্ধতিতে জীবন-যাপন করবে? তা আল্লাহর কোনো দুশমনকে জিজ্ঞেস করতে হবে!!! কোনো মুসলমান যদি তার স্ত্রীকে তিন তালাক দিয়ে তাকে আজীবনের জন্য নিজের উপর হারাম করে ফেলে, তখন সে হারাম স্ত্রীর সঙ্গে বাকি জীবন কাটাতে হবে? না কি কাটানো যাবে না? এ ফাতওয়াও কোনো হিন্দু থেকে নিতে হবে!!! কোনো মুসলিম যুবক কোনো মুসলিম যুবতীর সঙ্গে মিলন করতে চাইলে তাদের বিবাহ হওয়া জরুরি কি, জরুরি নয়? তাও কোনো খ্রিস্টানকে জিজ্ঞেস করতে হবে, অথবা এ ফাতওয়া এমন এক ব্যক্তির কাছ থেকে নিতে হবে, যে এ বিশ্বজগতের জন্য কোনো সৃষ্টিকর্তাকেও স্বীকার করে না, এবং এ পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাওয়ার পর আবার একটি জীবন হবে সে কথাকেও সে স্বীকার করে না!!!

চলমান পৃথিবীতে এ বিষয়টি কোনো কাল্পনিক ও সন্দেহযুক্ত বিষয় নয়, এমনিভাবে এটি কোনো নিরাশ ব্যক্তির অপলাপ বা নিঃস্ব ব্যক্তির দুঃস্বপ্নও নয়; বরং তা এখন প্রতিদিনের বাস্তবতা এবং সকাল-সন্ধ্যার দৃশ্য। তবে আমাদের অনুভূতি শক্তি ও উপদেশ গ্রহণের জন্য উপযুক্ত দৃষ্টি শক্তি এতটাই ব্যবধানপূর্ণ যে, এসব পরিস্থিতি দেখে কারও তো ঘুম পর্যন্ত হারাম হয়ে গেছে, সব কিছু বিষাদ হয়ে গেছে এবং দীর্ঘ দিন থেকে স্থির জীবন হাতছাড়া হয়ে তারা অস্থির জীবন যাপন করে চলেছেন। অস্থির পায়চারী করে চলেছেন। অপর দিকে কারও কারও নিশ্চিন্ত, পরিতৃপ্ত ও প্রশান্তির জীবন এতটাই রসে টইটম্বুর যে, সকাল-সন্ধ্যার আনন্দ বিনোদন, রাত-দিনের বিলাস বসন ভূষণ, প্রতি মুহূর্তের সাজ-সজ্জার মাঝে বিন্দু বরাবরও ছেদ পড়েনি। তাদের ছন্দময় জীবনের কোথাও ছন্দের পতন ঘটেনি। আর আকাশ-যমীনসম পার্থক্যের এ উভয় স্তরের মাঝে আমাদের মত মানুষদের এত এত স্তর রয়েছে যা গুণে শেষ করা যাবে না।

পরিস্থিতি এতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছে যে, অকাট্য সুস্পষ্ট ফরয বিধানগুলোকে ধারণা নির্ভর সন্দেহযুক্ত বিষয়সমূহের তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে। প্রতিদিনের পালনীয় অনস্বীকার্য শরয়ী বিধানগুলোকে অনর্থক বলা হচ্ছে, সকাল-সন্ধ্যার ফরয-ওয়াজিব আমলগুলোকে ফলাফল শূণ্য আমল বলা হচ্ছে। কুরআন-হাদীস ও ফিকহে ইসলামীর উদ্ধৃতিগুলোর ইলমী পর্যালোচনা না করে, উদ্ধৃতি দেয়াকে অজ্ঞতা ও অগভীরতা হিসাবে প্রচার করা হচ্ছে। ইলমী পর্যালোচনাকে বেয়াদবি ও বদআখলাকীর শিরোনাম দিয়ে বদনাম রটানো হচ্ছে।

এসকল পরিস্থিতি থেকে প্রভাবিত হয়ে এবং হালাত থেকে ভীতসন্ত্রস্ত হয়ে লেখক ও চিন্তাশীল ব্যক্তিবর্গ চলমান পরিস্থিতির কিছু কিছু বিষয় নিয়ে লিখতে ও বলতে খুবই দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়েছেন। তারা দলীল প্রমাণের আলোকে নিজেদের চিন্তা-চেতনাকে ততক্ষণ পর্যন্ত উপস্থাপন করতে সাহস পান না, যতক্ষণ পর্যন্ত তাঁদের দলীল নির্ভর সে চিন্তা-চেতনা সমাজের প্রথাগত ধ্যানধারণার অনুকূলে না হয়।

কিন্তু পরকালের জবাবদিহিতা এমন একটি বিষয় যা থেকে কেউ বাঁচতে পারবে না। ধনী-গরিব, ক্ষমতাবান ও নিরীহ সবাই যে আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের সামনে হাজির হতে হবে, তা একটি অকাট্য বিষয়। আর প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিজের যিম্মাদারি সম্পর্কে জবাব দিতে হবে, তা একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা।

তাই আমরা বলবো-

উপমহাদেশ অর্থাৎ বর্তমানের পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারত ইতিহাসের বিচারে আমাদের দেশ? না কি আমাদের দুশমনদের দেশ? না কি এগুলো শত্রু-মিত্র, দোস্ত-দুশমন সবার দেশ? আমি যখন এ প্রশ্নটি করছি তখন আমার এ কথা স্পষ্ট করে জানা আছে যে, চলমান সময়ে এটি এমন একটি প্রশ্ন যে প্রশ্নের প্রশ্নকারী দোস্ত-দুশমন সবার দৃষ্টিতে অভিযুক্ত ও দোষী। বরং আরেক ধাপ এগিয়ে যদি বলা হয়, বর্তমান পৃথিবীতে এ ধরনের প্রশ্ন একটি অত্যাশ্চর্য বিষয় এবং চলমান পৃথিবীর প্রত্যাখ্যাত বিষয়গুলোর একটি, তাহলে তা অত্যুক্তি হবে না।

আমরা যে সময়ে ‘আমাদের’ বলে আমরা মুসলামন এবং ‘দুশমন’ বলে অমুসলিম সম্প্রদায়গুলোকে উদ্দেশ্য করছি, সে সময়ে পৃথিবীতে মানব সম্প্রদায়গুলোর মাঝে এমন পার্থক্য করা এবং মানবগোষ্ঠীকে এভাবে ভাগ করা বৈধ নয় (?) এবং এ ধরনের বিভাজনের অনুমতি নেই।

কিন্তু, যে জগৎ  স্রষ্টার সাথে আমাদের সম্পর্ক, যে রাসূলে আরাবীর সাথে আমাদের পরিচয় এবং যে পূর্বসূরি সালাফে-সালেহীনের আমরা উত্তরসূরি সে জগৎ স্রষ্টার আদেশ, সে রাসূলে আরাবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের দিকনির্দেশনা এবং সেই সালাফে-সালেহীনের ইতিহাস থেকে আমরা এ শিক্ষা পাই যে, সত্য ও হক কথা আমরা না বলে থাকতে পারবো না। আমাদের রবের পক্ষ থেকে আমরা এ অনুমতি পাবো না। এটা আমাদের প্রিয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন এবং পূর্বসূরিগণের আমানতের খেয়ানত হবে। অতএব সত্য ও হক কথাতো আমরা বলবোই। শরয়ী যিম্মাদারি থেকে আমরা সে কথাগুলো বলবো। কুরআন, সুন্নাহ ও ফিকহে ইসলামীর আলোকে বলবো। আল্লাহ তাওফীক দান করুন! আল্লাহ সাহায্য করুন!!

ইতিহাস বলে, উপমহাদেশ অর্থাৎ পাকিস্তান, বাংলাদেশ ও ভারতের ভূখণ্ডগুলো মুসলিম শাসক ও ইসলামী আইন-কানুনের অধীনে একটি দীর্ঘ সময় অতিবাহিত করেছে। যখন  কুরআন-হাদীস ও ফিকহে ইসলামীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী এ ভূখণ্ডগুলো দারুল ইসলাম ছিলো। যদিও আমরা এ বাস্তবতাকে অস্বীকার করি না যে, এ ভারত উপমহাদেশের ঐতিহাসিক পর্বগুলো পরস্পরে অনেক ব্যবধানপূর্ণ; বরং আপনি বলতে পারেন, পর্বগুলো অনেক পেঁচানোও। আপনি যদি বলেন যে, ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসের প্রতিটি শতাব্দীই তার আগের ও পরের শতাব্দী থেকে ভিন্ন রকমের, তাহলে এ দাবি আপনি করতে পারবেন। এ দাবি অবাস্তব হবে না। বিশেষভাবে এর ভৌগোলিক সীমারেখা বিভিন্ন রকম হতে থেকেছে এবং মুসলিম শাসকদের ঈমান আকীদার হালাতও বিভিন্ন রকমের ছিলো। তাদের মধ্যে কেউ কেউ এমনও ছিলো যাদেরকে শরীয়তের দৃষ্টিতে মুসলমান বলাও মুশকিল। আর কেউ ছিলো এমন, যাদেরকে মুসলমান বলা গেলেও না তারা সহীহ আকীদা বিশ্বাসের অধিকারী ছিলো, আর না তারা সহীহ আকীদার সঙ্গে পরিচিত ছিলো। এসব কারণে ইতিহাসের প্রতিটি পর্বের সুনির্দিষ্ট হালাত হিসাবে এর মূল্যায়ন একটু কঠিন।

তবে ইতিহাসের যে অংশের বিষয়ে কারও কোনো দ্বিমত নেই এবং যে অংশের উপর অস্পষ্টতার কোনো পর্দা নেই, তার শরয়ী মূল্যায়ন আমাদের সামনে এসে গেলে আমাদের বর্তমানে চলমান বিষয়গুলো সমাধান করার ক্ষেত্রে ইনশাআল্লাহ অনেক সুবিধা হবে। এমনিভাবে যেসব বিষয়ে অস্পষ্টতার কারণে আমরা সিদ্ধান্তমূলক কিছু বলতে সাহস পাই না, সেগুলোও স্পষ্ট হয়ে সামনে চলে আসবে ইনশাআল্লাহ।

ভারত উপমহাদেশের ইতিহাসে যেসকল মুসলিম শাসক ইসলামী আইন ও শরয়ী বিধান অনুযায়ী দেশ শাসন করার চেষ্টা করেছেন এবং কুরআন ও সুন্নাহের বিধান বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে কিছুটা অংশ নিয়েছেন তাঁদের নাম এই-

* নাসিরুদ্দীন মাহমূদ ৬৬৪ হিজরী

* গিয়াস উদ্দীন বলবান ৬৮৬ হিজরী

* আলাউদ্দীন খিলজী ৭১৬ হিজরী

* শামসুদ্দীন আলতামাশ ৭৩৩ হিজরী

* মুহাম্মাদ তুগলুক ৭৫২

* ফিরোজ শাহ ৭৯৯ হিজরী

* সেকান্দার ইবনে বাহলুল লূধী ৯২৩ হিজরী

* শের শাহ সূরী ৯৫২ হিজরী

* শাহজাহান তৈমুরী ১০৬৮ হিজরী

* আওরঙ্গজেব আলমগীর ১১১৮ হিজরী

উল্লেখিত শাসকবর্গ ছাড়া আরও কিছু শাসক ও আমীর-উমারা এমন অতীত হয়ে গেছেন, যারা হিন্দুস্তানের বিভিন্ন অংশে ইসলামী হুকুমত প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করেছেন এবং একটা পর্যায় পর্যন্ত তারা সফলও হয়েছেন। এ ধারাবাহিকতার সর্বশেষ ব্যক্তি যিনি ছিলেন তিনি হচ্ছেন মুগল সাম্রাজ্যের শেষ বাদশা বাহাদুর শাহ যাফর, যার পরে ইসলামী হুকুমত নামেমাত্র যতটুকু ছিলো তাও বিলুপ্ত হয়ে গেছে। এ পর্যায়ে এসে হিন্দুস্তানকে দারুল হরব ঘোষণা দেয়ার ক্ষেত্রে শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী রহিমাহুল্লাহ এর যে ঐতিহাসিক ফাতওয়া রয়েছে, তার কিছু প্রেক্ষাপটও আমাদের আলোচনায় এসে গেলে ভালো হবে এবং আলোচ্য বিষয়টি বুঝতে সহজ হবে ইনশাআল্লাহ।

আমরা সে প্রেক্ষাপট বিস্তারিত আলোচনা করতে যাবো না; বরং তার সে অংশটি আলোচনায় আনবো যে অংশের সাথে আমাদের এ আলোচনার সম্পর্ক রয়েছে এবং যে অংশটি স্পষ্ট করার দ্বারা আমাদের আলোচ্য বিষয়টির সমাধানে পৌঁছতে কোন প্রকার দ্বিধা থাকবে না ইনশাআল্লাহ। এমনিভাবে প্রেক্ষাপটের যে অংশটি সামনে আসার দ্বারা বিষয়টির চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছতে অন্য অংশগুলো দেখার প্রয়োজন হবে না, সে অংশ নিয়ে আলোচনা করবো ইনশাআল্লাহ।

হিন্দুস্তানে (উপমহাদেশ) যত দিন পর্যন্ত মুসলিম শাসকদের অধীনে ইসলামী শরীয়তের প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন ছিলো, তত দিন পর্যন্ত এ ভূখণ্ডকে দারুল হারব ঘোষণা দেয়ার কোনো প্রয়োজন ছিলো না; বরং তখন এ ভূখণ্ডকে দারুল হারব বলা জায়েযও ছিলো না। কিন্তু যখন অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে এবং রাজত্ব ও শাসন মুসলিম শাসকদের হাত থেকে অমুসলিমদের হাতে চলে গেছে, তখন এ উপমহাদেশের আসল অবস্থা অর্থাৎ এ ভূখণ্ডের শরয়ী অবস্থান স্পষ্ট করে দেয়া জরুরি ছিলো। বিশেষত যখন ১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে নবাব সিরাজ উদদৌলা এবং ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দে ফাতেহ আলী টিপু ইংরেজদের হাতে শহীদ হয়ে গেছেন এবং মুসলিম বাহিনী পরাজিত হয়ে গেছে। তখন মুসলমানদের কাছে এমন কোনো প্রতিরোধ শক্তি অবশিষ্ট থাকেনি, যে শক্তি দিয়ে ইংরেজদের মোকাবেলা করা যায়, অথবা এমন কোনো শক্তি ছিলো না, যে শক্তি দিয়ে নিজেদের শাসিত ভূখণ্ডের মধ্যে ইসলামী আইন ও শরয়ী বিধান প্রয়োগ করা যায়।

দিল্লিতে মুগল সাম্রাজ্যের নিভু নিভু বাতিটি তখনও একেবারে নিভে যায়নি। মুগল সাম্রাজ্য তখন শাহ আলম সানীর হাতে ছিলো। বাস্তব কথা হচ্ছে, শাহ আলমের হাতে তখন দিল্লি লালকেল্লার শুধু দালানগুলো ছিলো এবং শাহী আরাম-আয়েশ ও সাজ-সজ্জার উপকরণগুলো ছিলো। মুসলমানদের শাসক হিসাবে তার হাতে কিছুই ছিলো না। হিন্দুস্তানের উপর না কেন্দ্রীয় হুকুমতের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিলো, আর না আঞ্চলিক শাসকদের কোনো নিয়ন্ত্রণ ছিলো। ইংরেজ ও অন্যান্য অমুসলিম শক্তিগুলো এসকল হালাতকে যথাযথভাবে আঁচ করে নিয়েছিলো এবং শতভাগ স্বাধীনতার সাথে রাজ্যের কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের হাতে নিয়ে ফেলেছে। আইন প্রণয়ন প্রতিষ্ঠান ও আইন প্রয়োগ প্রতিষ্ঠানগুলোর উপর নিজেদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠিত করে ফেলেছে। আর সামরিক শক্তিগুলো তো আগে থেকেই তাদের হাতে ছিলো। মোটকথা হিন্দুস্তানের এমন অবস্থা ছিলো, যে অবস্থায় কোনো যিম্মাদার আলেম এবং উম্মতের কোনো রাহবার স্বস্তির সাথে বেঁচে থাকতে পারেন না। নিজের উপর অর্পিত শরয়ী যিম্মাদারী আদায় না করে এবং নিজের ফরয দায়িত্ব আদায় না করে স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারেন না।

সিরাজুল হিন্দ শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী রহিমাহুল্লাহ হিন্দুস্তান দারুল হারব হওয়ার ফাতওয়া দিলেন এবং একজন রাহবার হিসাবে উম্মতকে এ বার্তা পৌঁছে দিলেন যে, এখন থেকে তোমাদের যিম্মাদারিতে এমন কিছু ফরয দায়িত্ব অন্তর্ভুক্ত হয়েছে, যেসব যিম্মাদারি একটি দারুল ইসলামের অধিবাসী হিসাবে তোমাদের উপর আগে ছিলো না।

যে সকল প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে এবং যে সকল কারণে এ ফাতওয়া সময়ের অনিবার্য ফরয দায়িত্ব ছিলো সে কারণগুলো হচ্ছে এই-

১. হিন্দুস্তানে ইসলামী শরীয়তের আইনি অবস্থান বিলুপ্ত হয়ে গিয়েছিলো।

২. হিন্দুস্তানের প্রধান শাসক মুসলমান হওয়া সত্ত্বেও ইসলামী আইন প্রয়োগ করতে সক্ষম ছিলেন না।

৩. আইনের প্রতিষ্ঠানগুলো, আদালত ও আইন প্রণয়ন এসেম্বেলীর উপর কুরআন, হাদীস ও ইসলামী শরীয়তের নিয়ন্ত্রণ চলত না।

৪. আইনের সকল প্রতিষ্ঠান, আদালতসমূহ ও আইন প্রণয়ন এসেম্বেলীগুলো অমুসলিম শক্তির মতামত ও সিদ্ধান্তের অধীনে এবং তাদের মর্জির অধীনে ছিলো।

৫. মুসলিমরা তাদের ইবাদাত, লেনদেন ও ইসলামী চালচলনের ততটুকুই করতে পারতো, যতটুকু তারা অনৈসলামিক আইন ও অমুসলিম শাসকদের পক্ষ থেকে করার অনুমতি পেত।

৬. সেই শাসন ব্যবস্থা তাদের খরচে মাদরাসা চালাত। কিন্তু মাদরাসায় যেসব মাসআলা পড়ানো হত সেসব মাসআলা সমাজে বাস্তবায়ন করতে দিতো না।

৭. সে শাসন ব্যবস্থার কর্ণধাররা মাদরাসার প্রধান হিসাবেও দায়িত্ব পালন করতো, কিন্তু কুরআন ও হাদীসের বিধি-বিধানকে তারা অন্তর থেকে ঘৃণা করতো।

হিন্দুস্তানের এ হালাতগুলো এমন ছিলো যার বাস্তবতাকে শত্রু-মিত্র কেউ অস্বীকার করতে পারতো না, আর না এগুলোকে অস্বীকার করার কথা তাদের কারও মনে কখনও উঁকি দিয়েছে। কেননা এ হালাতগুলো এমন সূক্ষ্ম তার ও চিকন পাইপ লাইনের মাধ্যমে এ সমাজকে ঘিরে নিয়েছিলো যে, অধিকাংশ মুসলমানের খবরও ছিলো না, কোথাকার পানি কোথায় গড়িয়ে যাচ্ছে।

কিন্তু দ্বীনের সচেতন দায়িত্বশীলগণের চোখ এমনভাবে খোলা থাকে যে, তাদের সামনে দিয়ে শরীয়ত বিরোধী কোনো পরিস্থিতি এবং শরীয়ত পরিপন্থী কোনো পর্ব তাঁদের চোখকে ফাঁকি দিয়ে যেতে পারে না। পরিস্থিতির শরয়ী বিচার বিশ্লেষণ শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী রহিমাহুল্লাহ এ ভারত উপমহাদেশকে দারুল হারব বলে ফাতওয়া দিলেন এবং আল্লাহর বান্দাদের এমন একটি কাফেলা দাঁড়িয়ে গেল যারা এ ফাতওয়ার আলোকে যা যা করার ছিলো তা তা করার জন্য প্রস্তুত ছিলো।

এ ফাতওয়ার প্রেক্ষাপট এবং যেসকল পরিস্থিতির ভিত্তিতে এ ফাতওয়া দেয়া হয়েছিলো সেসব কারণ এখনো হুবহু সেভাবেই বহাল রয়েছে যা এ ফাতওয়া দেয়ার সময় ছিলো।

এ ফাতওয়ার প্রায় সোয়া দুইশত বছর পরের সময় আমরা এখন পার করছি। এ সময় পার করতে গিয়ে আমরা এখন দেখবো, যেসব প্রেক্ষাপট এবং যেসব কারণকে সামনে রেখে দুইশত সোয়া দুইশত বছর আগে ভারত উপমহাদেশকে দারুল হারব ঘোষণা করা হয়েছিলো, সেসব কারণ ও সেসকল পরিস্থিতি ধারাবাহিকভাবে আজও পর্যন্ত বিরাজ করে আসছে? না কি নয়?

এ বিষয়টি কেউ অস্বীকার করতে পারবে না যে, বিগত দুই শত বছর যাবত পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে থেকেছে। আর এটি একটি অসম্ভব বিষয় যে, এত দীর্ঘ কাল যাবত কোনো প্রকার পটপরিবর্তন ছাড়াই দুনিয়া চলবে। এটা হতে পারে না। কিন্তু আমরা যে দিকটি নিয়ে আলোচনা করছি তা হচ্ছে শরয়ী দৃষ্টিকোণ থেকে। আমরা বলতে চাচ্ছি, শরীয়তের মাপকাঠিতে যদি বিচার করা হয়, তাহলে যেকোনো জ্ঞানী ব্যক্তি এ কথা স্বীকার করতে বাধ্য হবে যে, দুইশত বছর আগের অবস্থা এবং দুইশত বছর পরের অবস্থার মাঝে কোনো প্রকার পার্থক্য হয়নি, কোনো ব্যবধান আসেনি।

একটু চিন্তা করে দেখুন-

১. ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের আইনপ্রণয়ন এসেম্বেলী, আদালতসমূহ এমনিভাবে কোনো আইনী প্রতিষ্ঠানের উপর কুরআন, হাদীস ও ইসলামী শরীয়তের কোনো প্রকার নিয়ন্ত্রণ নেই, কোনো প্রকার প্রধান্য নেই, কোনো হাত নেই।

২. উপমহাদেশের এ তিনটি দেশেই প্রতিটি আইন ও প্রতিটি কানুন সেসব দেশের শাসকবর্গের মতামত ও সিদ্ধান্তের উপর ভিত্তি করে হয়, সে শাসক মুসলিম হোক বা অমুসলিম হোক।

৩. বরং বৃটিশ এ দেশকে যে আইনের উপর পরিচালিত করে একটি দারুল ইসলামকে দারুল হারব বানিয়ে ছেড়েছিল, সেই বৃটিশ আইন-কানুন আজও এ উপমহাদেশের দেশগুলোতে আইন প্রণয়নকারী হিসাবে পূর্ণ শক্তি ও সামর্থ্য এবং পরিপূর্ণ সতেজতার সাথে কার্যকরী ও বহাল রয়েছে।

৪. এ দেশগুলোর উপর এমনসব শাসকদের আধিপত্য রয়েছে, যারা পরকালে মুক্তির জন্য শুধু একটি ধর্ম অর্থাৎ ইসলামের অনুসরণকে জরুরি মনে করে না।

৫. উপমহাদেশের এ দেশগুলোতে যেসব শাসক রয়েছে তাদের আকীদা-বিশ্বাস হচ্ছে, মুসলমানরা তাদের ইসলামী আইন-কানুন অনুযায়ী চলতে হলে, শাসকদের বানানো আইন-কানুনের কাছ থেকে অনুমতি নিতে হবে। অমুসলিমদের বানানো আইন থেকে অনুমতি নিতে হবে। আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের দুশমনদের বানানো আইন-কানুন থেকে অনুমতি নিতে হবে।

৬. এ শাসকদের আকীদা-বিশ্বাস হচ্ছে, ইসলামের উদ্ধৃতি দিয়ে, কুরআন ও হাদীসের উদ্ধৃতি দিয়ে কোনো আইন-কানুন বানানো এবং তা প্রয়োগ করা অপরাধ এবং তা শাস্তিযোগ্য অপরাধ।

এসব বিষয়ে ভারত, পাকিস্তান, বাংলাদেশ অর্থাৎ সাবেক হিন্দুস্তান (উপমহাদেশ) এর তিনটি দেশেরই অবস্থা বরাবর। এর মাঝে পার্থক্য যতটুকু আছে, তাও আমরা বলবো। এরকমভাবে শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী রহিমাহুল্লাহ যে সময়ে এ উপমহাদেশকে দারুল হারব হিসাবে ঘোষণা দিয়েছেন সে সময়ের অবস্থা এবং বর্তমানের অবস্থাও বরাবর। এ দুয়ের মাঝে যতটুকু পার্থক্য আছে তাও আমরা বলবো ইনশাআল্লাহ।

এ পর্যায়ে এসে একটি কথা মনে রাখা দরকার যে, দারুল হারব হিসাবে হিন্দুস্তান তিনটি পর্ব অতিক্রম করেছে। একটি পর্ব তো হচ্ছে, যখন ফাতওয়াটি দেয়া হয়েছে। তখন শাসক ছিলো মুসলমান, কিন্তু আধিপত্য ছিল অমুসলিমদের। আদালত ও আইনের প্রতিষ্ঠানগুলো অমুসলিমদের নিয়ন্ত্রণে এবং অনৈসলামিক আইনের অধীনে চলত। এ পর্বটি হচ্ছে ১৮০০ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত। দ্বিতীয় পর্ব হচ্ছে, যখন শাসক অমুসলিম ছিলো। এ পর্বটি ছিল ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কাল। তৃতীয় পর্ব হচ্ছে, যখন কিছু অংশের শাসক মুসলিম আর কিছু অংশের শাসক অমুসলিম, কিন্তু প্রত্যেক অংশের উপরই আধিপত্য অমুসলিমদের। আদালত ও আইনের প্রতিষ্ঠানগুলো অমুসলিম ও অনৈসলামিক আইনের অধীনে আছে। এ পর্বটি ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে এখনো পর্যন্ত চলছে।

এ তিনটি পর্বের পরস্পরে যে পার্থক্যগুলো রয়েছে তার কিঞ্চিৎ বিশ্লেষণ নিম্নরূপ-

প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে এ ভূখণ্ডের নাম ছিলো হিন্দুস্তান। এখন এ ভূখণ্ড আলাদা আলাদা তিনটি নামে পরিচিত: ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ।

প্রথম পর্বে এ ভূখণ্ডের শাসক ছিলো মুসলমান, দেশ নামেমাত্র মুসলমানদের হাতে ছিল। কিন্তু সরকারী সকল প্রতিষ্ঠানের উপর অমুসলিমদের আধিপত্য ছিলো। দ্বিতীয় পর্বে শাসক অমুসলিম ছিলো। আদালত ও আইনের প্রতিষ্ঠানগুলো তাদেরই হাতে ছিলো। আর তৃতীয় পর্বে কিছু অংশের শাসকরা নিজেদেরকে অমুসলিম মনে করে, আর কিছু অংশের শাসকরা নিজেদেরকে মুসলমান মনে করে। তবে সবার আদালত এবং আইনের প্রতিষ্ঠানগুলো অমুসলিমদের তত্ত্বাবধানে অনৈসলামিক আইনের অধীনে চলে। প্রত্যেক অংশের শাসকবর্গ, চাই তারা নিজেদেরকে মুসলিম মনে করুক বা অমুসলিম মনে করুক, প্রত্যেকে এ আকীদা বিশ্বাস লালন করে যে, আদালত ও আইনের প্রতিষ্ঠানগুলোতে কুরআন, হাদীস ও ইসলামী শরীয়াতের প্রবেশ এবং শরয়ী আইন তথা কুরআন-সুন্নাহর আইনের প্রভাব বা প্রভাব বিস্তারের প্রচেষ্টা চলমান সময়ের সবচাইতে বড় অপরাধ।

প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে অধিকাংশ মুসলমান এবং উম্মতের রাহবারগণ অমুসলিমদের আধিপত্য এবং অনৈসলামিক আইনের অধীনস্থতার উপর অসন্তুষ্ট ছিলো। কিন্তু তৃতীয় পর্বে অধিকাংশ মুসলমান অমুসলিমদের আধিপত্য এবং অনৈসলামিক আইনের অধীনতাকে সন্তুষ্টচিত্তে মেনে নিয়েছে, অথবা তার বিষয়ে নির্লিপ্তভাবে চুপচাপ আছে।

প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে অধিকাংশ মুসলমান এসকল পরিস্থিতি থেকে বের হওয়া এবং নিজেদেরকে মুক্ত করার বিষয়টিকে একটি শরয়ী যিম্মাদারী মনে করত। এখন অধিকাংশ মুসলমান মনে করে, অনৈসলামিক শাসন এবং অনৈসলামিক আইন আদালতের অধীনে জীবন যাপন করাও জীবন যাপনের একটি পদ্ধতি হতে পারে। তবে এদের মধ্য থেকে কেউ মনে করে, এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কোনো পথ নেই। আর কেউ মনে করে, এ পরিস্থিতি থেকে মুক্তির কোনো প্রয়োজন নেই। যেসব মানুষ এসব পরিস্থিতি থেকে বের হয়ে আসার প্রয়োজন অনুভব করে এবং মুক্ত হওয়াকে সম্ভব মনে করে চেষ্টাও করে যাচ্ছে, তাদের কথাও আলোচনায় আসা দরকার। যদিও তাদের অধিকাংশই ভুল পদ্ধতিতে তা করে চলেছে।

প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে অমুসলিমদের প্রতিনিধিদেরকে গভর্নর ও ভাইসরয় বলা হত, এখন তাদের প্রতিনিধিদেরকে এম্বেসেডার, দূত ও  জাতিসংঘের প্রতিনিধি বলা হয়।

প্রথম পর্বে অমুসলিমদের আধিপত্যের কোনো আইনি স্বীকৃতি ছিলো না, তবে তাদের বাহুবল চলত। দ্বিতীয় পর্বে সব কিছু তাদেরই হাতে ছিলো। তৃতীয় পর্বে তাদের আইনি স্বীকৃতি হয়ে গেছে এবং তাদের বাহুবল চলমান থাকা সত্ত্বেও তাদের আধিপত্যকে গোপন করার জন্য অনেক কৌশল ব্যবহার করা হয়ে থাকে। যে বিষয়গুলো সবাই জানেও, আবার সবাই লুকাতেও থাকে। যাকে আপনি ওপেন সিক্রেটও বলতে পারেন।

প্রথম ও দ্বিতীয় পর্বে মনে করা হত, মুসলমানদের জন্য অনৈসলামিক আইনের অধীনে জীবন যাপন করা জায়েয নেই। তৃতীয় পর্বে ব্যাপকভাবে এবং প্রকাশ্যে এ কথা মনে করা হচ্ছে যে, মুসলমানদের জন্য অনৈসলামিক আইনের অধীনে জীবন যাপন করতে কোনো সমস্যা নেই।

স্মর্তব্য যে, এ পার্থক্যগুলো এমন কিছু পার্থক্য যা মূল মাসআলার মধ্যে কোনো প্রকার প্রভাব ফেলে না। অর্থাৎ এ পার্থক্যগুলোর কারণে কোনো দারুল হারব দারুল হারব হওয়া থেকে বের হয়ে আসে না। এ পৃথিবীর কোনো একটি ভূখণ্ড দারুল হারব হিসাবে সাব্যস্ত হওয়ার জন্য যে বিষয়গুলো সেখানে পাওয়া যাওয়া জরুরি, সে বিষয়গুলো উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে (ভারত উপমহাদেশে) ছিলো, ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের পরেও সে বিষয়গুলো (ভারত উপমহাদেশে) উপস্থিত ছিলো এবং ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে এখন পর্যন্তও সে বিষয়গুলো বহাল আছে।

এরই সাথে সাথে, উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে উপমহাদেশ (হিন্দুস্তান) দারুল হারব হিসাবে ঘোষিত হওয়ার পর মুসলমানদের উপর যে সকল ফরয দায়িত্ব এসেছিল, এমনিভাবে যে সকল ফরয দায়িত্ব ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের পর মুসলমানদের উপর ছিলো, সেসকল ফরয-ওয়াজিব দায়িত্ব ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে এখনো পর্যন্ত মুসলমানদের যিম্মাদারিতে রয়েছে গেছে। চাই সে ভূখণ্ডের নাম ভারত হোক, চাই সে ভূখণ্ডের নাম পাকিস্তান হোক, চাই সে ভূখণ্ডের নাম বাংলাদেশ হোক। এ সকল ভূখণ্ডের সকল মুসলমানের উপর সেসব ফরয-ওয়াজিব দায়িত্ব হুবহু সেভাবেই বহাল আছে যেভাবে তা দুইশত বছর আগে ফরয-ওয়াজিব ছিলো। কেননা সেসব ফরয-ওয়াজিব দায়িত্ব তাদের যিম্মাদারিতে না থাকার এবং সে দায়িত্ব থেকে মুক্ত হওয়ার মত কোনো পর্ব বিগত দুইশত বছরে কখনও অতিক্রম করেনি।

***

 

 

[২য় পর্ব ]

এ পর্যায়ে তিনটি বিষয় আমরা একটু বিস্তারিত তুলে ধরতে চাই। প্রথম বিষয়টি হচ্ছে, এ ভূখণ্ড দুইশত বছর আগে কেন দারুল হারব হয়েছিল? এবং আজ পর্যন্ত কেন তা দারুল হারব হিসাবে বহাল আছে? দ্বিতীয় বিষয় হচ্ছে, ঐ সকল ঘটনাপ্রবাহের সংক্ষিপ্ত চিত্রায়ণ যা বিগত দুই শত বছর যাবত আমাদের উপর দিয়ে অতিবাহিত হয়েছে। তৃতীয় বিষয় হচ্ছে, একটি দারুল ইসলাম দারুল হারব হয়ে যাওয়ার পর তাকে পুনরায় দারুল ইসলাম বানানোর যে ফরয যিম্মাদারী আমাদের উপর অর্পিত হয়েছিল এবং যা এখনো পর্যন্ত আদায় হয়নি, সে যিম্মাদারী আদায় করার জন্য আজ দুইশত বছর পর আমরা কি করতে পারি? এ বিষয়ে শরীয়তের পক্ষ থেকে আমাদের উপর কি কি যিম্মাদারী রয়েছে?

ভারত উপমহাদেশ কেন দারুল হারব হয়েছিল? এবং এখনো পর্যন্ত তা কেন দারুল হারব?

ভারত উপমহাদেশ কেন এবং কীভাবে দারুল হারব হয়েছে? এ বিষয়টি এক যামানা পর্যন্ত মুসলমানদের জানা ছিলো। দীর্ঘকাল পর্যন্ত তারা এটা জানতো যে, তাদের এ ইসলামী রাজ্য কীভাবে এবং কেন দারুল হারব হয়ে গিয়েছিল। ধীরে ধীরে যামানা অতিবাহিত হতে থাকল আর মুসলমান তাদের অতীতকে ভুলতে থাকলো। মুসলমানদের দৃষ্টি থেকে এবং তাদের দিল ও দেমাগ থেকে দারুল ইসলাম ও দারুল হারবের পার্থক্য হারিয়ে যেতে লাগলো। দারুল ইসলামের হাকীকত বোঝা মুসলমানদের জন্য কঠিন হয়ে গেল। যার ফলে সে বিষয়টিকে এবং সেই উপাখ্যানকে নতুন করে জাগিয়ে তোলা সময়ের দাবি হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই আমরা সে বিষয়ে কিছু বলতে যাচ্ছি।

এখানে দুটি কথা পেশ করতে চাই। একটি কথা হচ্ছে, এ বিষয়ে কিতাবের ফায়সালা। অপর কথা হচ্ছে, হিন্দুস্তানের হালাত যা এ মাসআলার মিসদাক বা প্রয়োগক্ষত্রে।

কিতাবের মাসআলা

কিতাব ও সুন্নাহর দৃষ্টিতে আমাদের মুজতাহিদ ইমামগণ দারুল হারব-এর যে সংজ্ঞা দিয়েছেন এবং একটি দারুল ইসলাম দারুল হারবে রূপান্তরিত হওয়ার যেসব কারণ উল্লেখ করেছেন তার মধ্যে বিশেষভাবে দুটি বিষয়কে ধর্তব্য করা হয়েছে। একটি হচ্ছে, কুফরের হর্তাকর্তাদের শক্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়া। অপরটি হচ্ছে, কাফেরদের আইন-কানুন বাস্তবায়িত হওয়া। এ দুটি বিষয় এমন যা মুসলমানদের পক্ষে হলে একটি দারুল হারব দারুল ইসলাম হয়ে যাবে। অর্থাৎ, যদি কোনো দেশে মুসলমানদের শক্তি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ইসলামী আইন প্রয়োগ হয় তাহলে দারুল হারব দারুল ইসলাম হয়ে যাবে।

ইমাম জাসসাস রহ. (মৃত: ৩৭০হি.) লিখেন:

ووجه هذا القول: أنَّ حكم الدار إنما يتعلق بالظهور والغلبة، وإجراء حكم الدين بها، والدليل على صحة ذلك: أنا متى غلبنا على دار الحرب، وأجرينا أحكامنا فيها: صارت دار إسلام، سواء كانت متاخمة لدار الإسلام أو لم تكن، فكذلك البلد من دار الإسلام، إذا غلب عليه أهل الكفر، وجرى فيه حكمهم: وجب أن يكون من دار الحرب. شرح مختصر الطحاوي للجصاص (المتوفي 370ه)، كتاب السير والجهاد 7/216-217، دار البشائر الإسلامية بيروت، لبنان، الطبعة الأولى 1431ه

“এই মতের যৌক্তিকতা হচ্ছে, দারের বিধান বিজয় ও শক্তির সঙ্গে সম্পৃক্ত। এমনিভাবে সেখানে শরীয়তের বিধান বাস্তবায়ন করার সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ কথা ঠিক হওয়ার পক্ষে দলীল হচ্ছে, আমরা যখন দারুল হারবের উপর বিজয় লাভ করি এবং সেখানে আমাদের বিধান জারী করি, তখন সেটি দারুল ইসলাম হয়ে যায়। চাই তা দারুল ইসলামের সঙ্গে মিলে থাকুক বা মিলে না থাকুক। ঠিক তেমনিভাবে দারুল ইসলামের কোনো শহরের উপর যদি কাফেরদের বিজয় প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায় এবং সেখানে তাদের বিধান জারী হয়ে যায়, তাহলে তা অবশ্যই দারুল হারবের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে। (শরহু মুখতাসারিত তাহাবী: ৭/২১৬-২১৭)

ইমাম সারাখসী রহ. লিখেন:

وعن أبي يوسف ومحمد رحمهما الله تعالى: إذا أظهروا أحكام الشرك فيها فقد صارت دارهم دار حرب؛ لأن البقعة إنما تنسب إلينا أو إليهم باعتبار القوة والغلبة، فكل موضع ظهر فيه حكم الشرك فالقوة في ذلك الموضع للمشركين، فكانت دار حرب، وكل موضع كان الظاهر فيه حكم الإسلام فالقوة فيه للمسلمين. المبسوط للسرخسي (المتوفي 483ه)، كتاب السير، باب المرتدين، 10/114، دار المعرفة، بيروت، لبنان

“আবু ইউসুফ ও মুহাম্মাদ রাহিমাহুমাল্লাহ বলেছেন, তারা যখন শিরকের বিধানগুলো চালু করবে তখন তাদের দার দারুল হারব হয়ে যাবে। কেননা, ভূখণ্ডের কোনো একটি অংশ আমাদের সঙ্গে বা তাদের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয় বিজয় ও শক্তি প্রয়োগের ভিত্তিতে। অতএব প্রত্যেক ঐ এলাকা যেখানে শিরকের বিধানের প্রাবল্য ও প্রচলন রয়েছে সেখানে শক্তি মুশরিকদের জন্য প্রতিষ্ঠিত। তাই তা দারুল হারব হয়ে যাবে। আর প্রত্যেক ঐ এলাকা যেখানে ইসলামের বিধানের প্রাবল্য ও প্রচলন রয়েছে, সেখানে শক্তি মুসলমানদের জন্য প্রতিষ্ঠিত।” (আলমাবসূত: ১০/১১৪)

আল্লামা কাসানী রহ. (মৃত: ৫৮৭হি.) লিখেন:

فصل: في اختلاف الأحكام باختلاف الدارين

وأما بيان الأحكام التي تختلف باختلاف الدارين؛ فنقول: لا بد أولا من معرفة معنى الدارين؛ دار الإسلام ودار الكفر؛ لتعرف الأحكام التي تختلف باختلافهما، ومعرفة ذلك مبنية على معرفة ما به تصير الدار دار إسلام أو دار كفر؛ فنقول: لا خلاف بين أصحابنا في أن دار الكفر تصير دار إسلام بظهور أحكام الإسلام فيها.

بدائع الصنائع لعلاء الدين الكاساني (المتوفي 587ه)، كتاب السير، فصل في اختلاف الأحكام باختلاف الدارين،  9/518-519، دار الكتب العلمية، بيروت، لبنان، الطبعة الثانية 1424ه

“অনুচ্ছেদ: দুই দারের ব্যবধানে বিধি-বিধানের ব্যবধান সম্পর্কে

সেসব বিধি-বিধানের বিবরণ যা দারের ব্যবধানের কারণে ভিন্ন হয়ে থাকে। এ বিষয়ে আমরা বলবো, সর্বপ্রথম দারুল ইসলাম ও দারুল কুফরের অর্থ জানা প্রয়োজন। যাতে এ দুটি দারের ভিন্নতার কারণে বিধি-বিধানের মাঝে সেসব ব্যবধান হয় তা জানা  যায়। আর এ বিষয়টি এ কথা জানার উপর নির্ভরশীল যে, দারুল ইসলাম ও দারুল কুফর কেন সৃষ্টি হয়? সে বিষয়ে আমরা বলছি, এ বিষয়ে আমাদের ইমামগণের মাঝে কোন দ্বিমত নেই যে, দারুল কুফরের মাঝে ইসলামী বিধান জারী হওয়ার দ্বারা তা দারুল ইসলাম হয়ে যায়।” (বাদায়েউস সানায়ে: ৯/৫১৮-৫১৯)

এ তিনটি উদ্ধৃতি থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে যে, কোনো দেশের উপর মুসলমানদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হওয়া এবং ইসলামী আইন প্রয়োগ হওয়া ব্যতীত সে দেশ দারুল ইসলাম হতে পারে না। যতক্ষণ পর্যন্ত কাফেরদের আধিপত্য থাকবে এবং গায়রে শরয়ী কানুন জারী থাকবে, ততক্ষণ পর্যন্ত তা দারুল হারবই থাকবে। এর সঙ্গে সঙ্গে ইমাম সারাখসীর বক্তব্য থেকে এ কথাও প্রমাণিত হয়েছে যে, আধিপত্য ও শক্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়াও বিধি-বিধানের প্রয়োগ দ্বারাই প্রমাণিত হয়। তাঁর এ বক্তব্যটি আবার দেখুন-

فكل موضع ظهر فيه حكم الشرك فالقوة في ذلك الموضع للمشركين، فكانت دار حرب، وكل موضع كان الظاهر فيه حكم الإسلام فالقوة فيه للمسلمين.

“অতএব প্রত্যেক ঐ এলাকা যেখানে শিরকের বিধানের প্রাবল্য ও প্রচলন রয়েছে সেখানে শক্তি মুশরিকদের জন্য প্রতিষ্ঠিত। তাই তা দারুল হারব হয়ে যাবে। আর প্রত্যেক ঐ এলাকা যেখানে ইসলামের বিধানের প্রাবল্য ও প্রচলন রয়েছে, সেখানে শক্তি মুসলমানদের জন্য প্রতিষ্ঠিত।” (আলমাবসূত: ১০/১১৪)

এ কারণে হিন্দুস্তানে যখন কাফেরদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয়ে গিয়েছিল, গায়রে শারয়ী আইন প্রয়োগ হতে শুরু করেছে, কুরআন সুন্নাহে বাতলানো হালাল হারাম হতে শুরু করেছে এবং হারাম হালাল হতে শুরু করেছে, এমনিভাবে ফরয দায়িত্বগুলো নিষিদ্ধ কাজে রূপান্তরিত হতে শুরু করেছে এবং নিষিদ্ধ কাজগুলো ওয়াজিব আমলের স্থলাভিষিক্ত হতে শুরু করেছে, তখন সময়ের যিম্মাদারগণ এবং হক্কানী রব্বানী উলামায়ে কেরাম এ দেশকে দারুল হারব সাব্যস্ত করে ফাতওয়া দিয়েছেন। অথচ এদেশকে যখন দারুল হারব বলে ফতোয়া দেয়া হচ্ছিলো তখন এ দেশের বাদশাহ ও শাসক মুসলমান ছিলেন। শাসনের আসনে মুসলিম বাদশাহর মুকুট শোভা পাচ্ছিলো। সালাতও পড়া হত, সিয়ামও রাখা হত, হজ্জের সফরও চালু ছিল, মুসলমানরা যাকাতও আদায় করত, আযান হত, মাহফিল চলত, দাওয়াত ও তাবলীগের কাজও চালু ছিল, মাদরাসাগুলোতে পড়া-পড়ানোও জারী ছিল। মোটকথা এমন অসংখ্য ইসলামী বিষয়াদি বহাল তবীয়তে চালু ছিল। কিন্তু এরপরও এ দেশ দারুল ইসলামের অবস্থান হারিয়ে দারুল হারবে রূপান্তরিত হয়ে গেছে। এর কারণ এটাই যে, আধিপত্য আহলে কুফরের এবং আইন-কানুন গায়রে শারয়ী, শক্তি ও প্রভাব কুফর ও শিরকের।

আর এ দুটি মৌলিক বিষয়ের উপর ভিত্তি করেই হিন্দুস্তানকে দারুল হারব সাব্যস্ত করা হয়েছে। আর এ ফাতওয়ার ভিত্তিতে কুফরী আধিপত্য ও কুফরী আইনের বিরুদ্ধে উলামায়ে ইসলামের নেতৃত্বে হিন্দুস্তানের মুসলমানরা জিহাদের ময়দানে লড়াই করতে থেকেছেন।

ইমাম আবু হানীফা রহ. -এর দুটি শর্ত

তবে একটি দারুল ইসলাম দারুল হারবে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য ইমাম আবু হানীফা রহ. অতিরিক্ত আরও দুটি কথা বলেছেন। একটি হচ্ছে, দারুল ইসলাম হওয়ার কারণে এবং দারুল ইসলাম হিসাবে একটি দেশে যে নিরাপত্তা ছিলো তা বহাল না থাকা। অপরটি হচ্ছে, সে দেশ কোনো দারুল কুফরের সঙ্গে মিলে না থাকা।

উল্লেখ্য, হিন্দুস্তান যখন দারুল হারব হয়ে গিয়েছিল তখন যারা কাফেরদের কুফরী আইন মেনে নিয়েছিল, কাফেরদের আধিপত্যকে নিজেদের জন্য কোনো মুসীবত মনে করেনি; বরং ক্ষেত্রে বিশেষে কাফেরদের অধীনস্থতাকে নিজেদের জন্য গৌরব ও গর্বের বিষয় মনে করতে শুরু করেছে, তাদের নিরাপত্তা ও শান্তির মাঝে কোনো প্রকার ছন্দপতন ঘটেনি। কিন্তু এরপরও হিন্দুস্তান দারুল হারব হয়ে গিয়েছিল। অতএব ইমাম আবু হানীফা রহ. যে নিরাপত্তার কথা বলছেন তা এ ধরনের লোকদের নিরাপত্তা নয়; কারণ যদি এ ধরনের লোকদের নিরাপত্তা উদ্দেশ্য হত তাহলে তখনও হিন্দুস্তান দারুল হারব হত না। বরং আপনি বলতে পারেন, পৃথিবীতে কোনো দারুল হারবই কখনও দারুল হারব হতে পারবে না। কেননা প্রত্যেক দারুল হারবেই আপনি এমন মুসলমান পাবেন, যারা কাফেরদের আধিপত্য ও কুফরী আইনকে মাথা পেতে মেনে নেয় এবং কাফেরদের দেশ পরিচালনা পদ্ধতিকে মনপ্রাণ দিয়ে গ্রহণ করে। তাদের নিরাপত্তা ও আরামের মাঝে কখনও বিঘ্নতা সৃষ্টি হয় না। সুতরাং এই আমান ও রাহাত ইমাম আবু হানীফা রহ.-এর উদ্দেশ্য নয়।

এ মাসআলটির আরও বিশ্লেষণের জন্য ‘বাদায়ে’-এর এ এবারতটি দেখা যেতে পারে-

واختلفوا في دار الإسلام أنها بماذا تصير دار الكفر؟ قال أبو حنيفة: إنها لا تصير دار الكفر إلا بثلاث شرائط:

أحدها: ظهور أحكام الكفر فيها، والثاني: أن تكون متاخمة لدار الكفر، والثالث: أن لا يبقى فيها مسلم ولا ذمي آمنا بالأمان الأول، وهو أمان المسلمين.

وقال أبو يوسف، ومحمد – رحمهما الله: إنها تصير دار الكفر بظهور أحكام الكفر فيها.

وجه قولهما أن قولنا دار الإسلام، ودار الكفر إضافة دار إلى الإسلام وإلى الكفر، وإنما تضاف الدار إلى الإسلام أو إلى الكفر لظهور الإسلام أو الكفر فيها، كما تسمى الجنة دار السلام، والنار دار البوار؛ لوجود السلامة في الجنة، والبوار في النار. وظهور الإسلام والكفر بظهور أحكامهما، فإذا ظهرت أحكام الكفر في دار، فقد صارت دار كفر فصحت الإضافة، ولهذا صارت الدار دار الإسلام بظهور أحكام الإسلام فيها من غير شريطة أخرى، فكذا تصير دار الكفر بظهور أحكام الكفر فيها، والله أعلم.

وجه قول أبي حنيفة – رحمه الله – أن المقصود من إضافة الدار إلى الإسلام والكفر ليس هو عين الإسلام والكفر، وإنما المقصود هو الأمن والخوف، ومعناه أن الأمان إن كان للمسلمين فيها على الإطلاق، والخوف للكفرة على الإطلاق، فهي دار الإسلام، وإن كان الأمان فيها للكفرة على الإطلاق، والخوف للمسلمين على الإطلاق، فهي دار الكفر.

بدائع الصنائع لعلاء الدين الكاساني (المتوفي 587ه)، كتاب السير، فصل في اختلاف الأحكام باختلاف الدارين،  9/519، دار الكتب العلمية، بيروت، لبنان، الطبعة الثانية 1424ه

“তবে দারুল ইসলাম কী কারণে দারুল কুফরে রূপান্তরিত হবে? এ বিষয়ে তাঁরা মতভেদ করেছেন। ইমাম আবু হানীফা বলেছেন, তিনটি শর্ত পাওয়া ব্যতীত দারুল ইসলাম দারুল হারব হবে না।

প্রথমটা হচ্ছে, সেখানে কুফরী বিধান জারী হওয়া। দ্বিতীয় হচ্ছে, দারুল হারবের পাশে হওয়া। তৃতীয় হচ্ছে, কোনো মুসলিম অথবা যিম্মী সাবেক নিরাপত্তার ভিত্তিতে নিরাপদ না থাকা। অর্থাৎ, মুসলমানদের পক্ষ থেকে দেয়া নিরাপত্তা।

আর ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ রাহিমাহুমাল্লাহ বলেন, দারুল ইসলামে কুফরী বিধান চালু হওয়ার দ্বারা তা দারুল কুফর হয়ে যাবে।

ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মাদ রাহিমাহুমাল্লাহর মতের দলীল হচ্ছে, আমাদের কোনো দার বা দেশকে দারুল ইসলাম বা দারুল কুফর বলা তাকে ইসলাম ও কুফরের দিকে নিসবত তথা সম্পৃক্ত করা হিসাবে নামকরণ করা হয়। দারকে ইসলামের দিকে বা কুফরের দিকে নিসবত করা হয় সেই দারে ইসলাম অথবা কুফরের আধিপত্যের ভিত্তিতে। যেমনিভাবে জান্নাতকে দারুস সালাম (নিরাপত্তার জায়গা) এবং জাহান্নামকে দারুল বাওয়ার (ধ্বংসের জায়গা) বলা হয়; জান্নাতে নিরাপত্তা এবং জাহান্নামে ধ্বংস পাওয়ার কারণে। আর ইসলাম অথবা কুফরের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় উভয়ের বিধি-বিধানের প্রাবল্য ও প্রয়োগের দ্বারা। অতএব যদি কোনো দারের মধ্যে কুফরের বিধান শক্তিশালী হয় এবং কুফরের বিধান জারী হয় তাহলে সে দার দারুল কুফর হয়ে যাবে এবং কুফরের দিকে দারের নিসবত সহীহ হবে। এমনিভাবে কোনো দারের মধ্যে ইসলামের বিধি-বিধান শক্তিশালী ও জারী হওয়ার দ্বারা সে দার দারুল ইসলাম হয়ে যাবে। আর কোনো শর্তের প্রয়োজন হবে না। এমনিভাবে কুফরের বিধান শক্তিশালী ও জারী হওয়ার দ্বারা দারুল কুফর হয়ে যাবে। ওয়াল্লাহু আলাম।

ইমাম আবু হানীফা রহ.-এর মতের দলীল হচ্ছে, দারকে ইসলাম বা কুফরের দিকে নিসবত করার দ্বারা মূল ইসলাম ও মূল কুফর উদ্দেশ্য নয়; বরং উদ্দেশ্য হচ্ছে নিরাপত্তা ও ভয়। এর দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, যদি কোনো প্রকার বাধা-বিপত্তি ছাড়া এবং শর্তহীনভাবে নিরাপত্তা মুসলমানদের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ভয় কাফেরদের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়, তাহলে তা দারুল ইসলাম। আর যদি শর্তহীনভাবে নিরাপত্তা কাফেরদের জন্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ভয় ও শঙ্কা মুসলমানদের জন্য হয়, তাহলে তা দারুল কুফর।” (বাদায়েউস সানায়ে’: ৯/৫১৯)

হিন্দুস্তানের অবস্থা

কুরআন ও হাদীসের বিচারে দারুল হারব ও দারুল ইসলামের যে মিসদাক ও বাস্তবক্ষেত্র  বের হয়ে আসে তার আলোকেই সমকালীন উলামায়ে কেরাম নিজেদের দেশের বিষয়ে ফাতওয়া দিয়ে থাকেন এবং দেশের অধিবাসীদেরকে তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে থাকেন। হিন্দুস্তানে মুসলমানদের বিশাল রাজত্বের উপর যখন কাফেরদের আধিপত্য ধীরে ধীরে বাড়তে থাকলো, তখন তা এ পর্যায়ে পৌঁছে গেল যে, শাসনের সিংহাসনে মুসলিম বাদশাহ অধিষ্ঠিত থাকা সত্ত্বেও দেশের আসল অবস্থান হারিয়ে গেছে। আযান, জুমা, ঈদ ইত্যাদি চালু থাকা সত্ত্বেও এ দেশের শরয়ী পরিচয় ও সংজ্ঞা বদলে গেছে।

শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ) লিখেন-

“جب كافر كسي اسلامي ملك پر قابض هو جائيں اور اس ملك  اور ملحقه اضلاع كے لئے يه نا ممكن هو كه وه ان كو  اس سے باهر نكال سكيں يا ان كو  باهر نكالنے كي كوئي اميد باقي نه رهے، اور كافروں كي طاقت ميں  يهاں تك اضافه هو جائے كه وه اپني مرضي سے اسلامي قوانين كو جائز يا نا جائز قرار ديں، اور كوئي انسان اتنا طاقتور نه هو جو كافروں كي مرضي كے بغير ملك كي مال گزاري پر قبضه كر سكے، اور مسلمان باشندے اس امن امان سے زندگي بسر نه كر سكيں جيسا كه وه پهلے كرتے تھے، تو يه ملك سياسي اعتبار سے دار الحرب هو جائے گا”۔

نقش حيات: خود نوشته سوانح، حسين أحمد مدني رحمة الله  عليه، مطبوعة دار الاشاعت، كراچي پاكستان 2/410-411، حاشيه نمبر-1

“যখন কাফের কোনো ইসলামী দেশের উপর আধিপত্য বিস্তার করে ফেলে, আর ঐ দেশ এবং সংযুক্ত জেলাগুলোর জন্য এটা অসম্ভব হয়ে যায় যে, তারা তাদেরকে সেখান থেকে বের করে দেবে অথবা তাদেরকে বের করার কোনো আশা অবশিষ্ট না থাকে এবং কাফেরদের শক্তি এতটা বৃদ্ধি পায় যে, তারা নিজেদের ইচ্ছা অনুযায়ী ইসলামী আইনগুলোকে বৈধ বা অবৈধ সাব্যস্ত করবে। আর কোনো মানুষের এতটা শক্তি নেই যে, সে কাফেরদের ইচ্ছার বিপরীতে দেশের অর্থব্যবস্থার কিংবা রাজস্ব ব্যবস্থাপনার উপর হাত দেবে। মুসলমান এমন নিরাপত্তার সঙ্গে জীবন যাপন করতে সক্ষম নয় যেভাবে তারা আগে জীবন যাপন করত। তাহলে এ দেশ রাষ্ট্রনীতি অনুযায়ী দারুল হারব হয়ে যাবে।” (নকশে হায়াত; শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. : ২/৪১০-৪১১)

শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভী (রহ) অপর এক ফাতওয়ায় লিখেন-

“اور دار الحرب اسي وقت دار الاسلام هو جاتا هے كه اهل اسلام كے احكام اس ميں جاري هو جائيں، اور كافي ميں هے:

إن المراد بدار الإسلام بلاد يجري فيها حكم إمام المسلمين ويكون تحت قهره، وبدار الحرب بلاد يجري فيها أمر عظيمها وتكون تحت قهره.اھ

اس شهر ميں مسلمانوں كے امام كا حكم هرگز جاري نهيں، نصارى كے حكام كا حكم بے دغدغه جاري هے، اور احكام كفر كے جاري هونے سے يه مراد هے كه، مقدمات انتظام سلطنت اور بندوبست رعايا وتحصيل خراج اور باج وعشر اموال تجارت ميں حكام بطور خود حاكم هوں، اور ڈاكوؤں اور چوروں كي سزا ، اور رعايا كے باهمي معاملات اور جرموں كي سزا كے مقدمات ميں كفار كا حكم جاري هو، اگر چه بعض احكام اسلام مثلا جمعه عيدين اور اذان اور گاؤكشي ميں كفار تعرض نه كيں”۔

فتاوي عزيزي، ايچ ايم سعيد كمپني، پاكستان، طبع جديد سنه1404ھ، ص: 445-455

“আর দারুল হারব তখনই দারুল ইসলাম হয়ে যায় যখন আহলে ইসলামের বিধি-বিধান সেখানে জারী হয়ে যায়। আর ‘কাফী’ গ্রন্থে এসেছে-

إن المراد بدار الإسلام بلاد يجري فيها حكم إمام المسلمين ويكون تحت قهره، وبدار الحرب بلاد يجري فيها أمر عظيمها وتكون تحت قهره

‘দারুল ইসলাম দ্বারা ঐ এলাকা উদ্দেশ্য যেখানে মুসলমানদের ইমামের বিধান জারী হয় এবং সে শহর তার শাসনের অধীনে হয়। আর দারুল হারব দ্বারা ঐ এলাকা উদ্দেশ্য যে শহরগুলোতে তাদের অধিপতির বিধান চলে এবং তাদের শাসনের অধীনে থাকে।’

এ শহরে মুসলমানদের ইমামের বিধান একদম জারী নেই। নাসারা তথা খ্রিস্টান শাসকদের বিধান ও আধিপত্য জারী। আর কুফরী বিধান জারী হওয়ার দ্বারা উদ্দেশ্য হচ্ছে, মামলা-মোকাদ্দামা, রাষ্ট্র পরিচালনার নিয়মনীতি, জনগণের সামগ্রিক বন্দোবস্ত, কর আদায়, উশর ও ব্যবসার পণ্যের মাঝে শাসকবর্গ নিজেরাই কর্তা হয়। চোর-ডাকাতদের শাস্তি, জনগণের পারস্পরিক সকল লেনদেন ও অপরাধের শাস্তির মামলাগুলোর ক্ষেত্রে কাফেরদের বিধান জারী হয়। যদিও ইসলামের কিছু বিধান যেমন, জুমা, দুই ঈদ, আযান ও গরু জবাইতে কাফেররা বাধা না দেয়।” (ফাতোয়া আযীযী : ৪৪৫)

শাহ আব্দুল আযীয (রহ)-এর এ এবারতগুলোর উপর একটু দৃষ্টিপাত করুন-

۱۔ اس شهر ميں مسلمانوں كے امام كا حكم هرگز جاري نهيں، نصارى كے حكام كا حكم بے دغدغه جاري هے

“সেখানে মুসলমানদের ইমামের বিধান একদম জারী নেই। নাসারা তথা খ্রিস্টান শাসকদের বিধান ও আধিপত্য বাধাহীনভাবে জারী।”

শাহ সাহেব (রহ) বলছেন, বিধান চলছে নাসারাদের তথা খ্রিস্টানদের। আর ইতিহাস বলছে, তখন দিল্লীর শাহী মসনদে মোগল সম্রাট বাদশাহ শাহ আলম অধিষ্ঠিত ছিলেন, যার শাসন আমল ১৮০৬ সন পর্যন্ত ছিলো। অথবা আকবার শাহ সানী শাহী মসনদে শোভা পাচ্ছিলেন, যার হুকুমত ১৮০৬ সন থেকে শুরু হয়। এ থেকে বোঝা যায়, মূর্তির মতো প্রাণহীন জড়পদার্থ সদৃশ মুসলিম বাদশাহ থাকার দ্বারা কোনো দেশ দারুল ইসলাম হতে পারে না। আর যদি সেই মূর্তি সদৃশ শাসক নাসারাদের অর্থাৎ খ্রিস্টানদের ও কাফেরদের পক্ষপাতিত্ব করতে শুরু করে, নিজের বাদশাহীর গলায় জড়িয়ে রাখার জন্য মুসলমানদের বিরুদ্ধে কাফেরদের কার্যক্রমে শরীকও হয়ে যায়, তাহলে সে দেশ অমুসলিমদের হাতে তো আছেই; বরং আরও চিন্তার বিষয় হচ্ছে, সে বাদশাহর ঈমান এখনো আছে কিনা? ঘটনাপ্রবাহ যদি এত দূর পর্যন্ত গড়ায়, তাহলে বাদশাহ বাহ্যিকভাবে যে মুসলামন ছিলো তাও আর থাকবে না।

মোটকথা, এমন মুসলমান বাদশাহের দ্বারা কোনো দার দারুল ইসলাম থাকবে না। এ দার দারুল হারব হয়ে যাবে। মুহাদ্দিসে দেহলভীর বক্তব্য এটাই।

۲۔ اور جرموں كي سزا كے مقدمات ميں كفار كا حكم جاري هو، اگر چه بعض احكام اسلام مثلا جمعه عيدين اور اذان اور گاؤكشي ميں كفار تعرض نه كيں

“চোর-ডাকাতদের শাস্তি, জনগণের পারস্পরিক সকল লেন-দেন ও অপরাধের শাস্তির মামলাগুলোর ক্ষেত্রে কাফেরদের বিধান জারী হয়। যদিও ইসলামের কিছু বিধান যেমন, জুমা, দুই ঈদ, আযান ও গরু জবাইতে কাফেররা বাধা না দেয়।”

তাঁর এ দ্বিতীয় কথাটি নিয়েও একটু চিন্তা করে দেখুন, যদি কোনো দেশে অপরাধের শাস্তির বিষয়গুলো গায়রে শরয়ী আইন অনুযায়ী চলে, অর্থাৎ দেশের আইনের বিভাগগুলো যদি কাফেরদের আইনের অধীনে হয় এবং শরয়ী আইনের অধীনে না হয়, তাহলে তা দারুল হারব। যদিও সেখানে সালাত আদায় করতে কোনো বাধা না থাকে। জুমা ও ঈদ আদায় করতে কোনো পেরেশানি না হয়। যদি আযানের মতো প্রকাশ্য ইসলামী নিদর্শনাবলীও বহাল তবিয়তে থাকে, এরপরও তা দারুল হারব; কেননা আধিপত্য কুফরের। কুফরী আইনের অধীনস্থতা রয়েছে। কুফর ও আহলে কুফরের অনুমতি নিয়ে ইসলামের কিছু বিধান আদায় হয়ে যাবে, কিন্তু এর দ্বারা কোনো দেশ দারুল ইসলাম হবে না। দলীলের সিদ্ধান্ত এটাই।

এ বিষয়ে হিন্দুস্তানের আরেকজন আলোকিত আলেমের ফাতওয়াও দেখে নিন, যিনি নিজের চোখে সে দৃশ্য দেখেছেন যখন হিন্দুস্তান ধীরে ধীরে দারুল ইসলামের মর্যাদা হারিয়ে দারুল হারবে রূপান্তরিত হচ্ছিলো। তিনি হচ্ছেন শায়খ আব্দুল হাই বুড়হানবী (রহ)।

শায়খ আব্দুল হাই বুড়হানবী (রহ) লিখেন-

“عيسائيوں كي پوري سلطنت كلكته سے لے كر دهلي اور هندوستان خاص سے ملحقه ممالك (يعني شمالي مغربي سرحدي صوبے)تك سب كے سب دار الحرب هے؛ كيوں كه كفر اور شرك هر جگه رواج پا چكا هے، اور همارے شرعي قوانين كي كوئي پرواه نهيں كي جاتي۔ اور جس ملك ميں ايسے حالات پيدا هو جائے وه دار الحرب هے۔ يهاں ان تمام شرائط كا بيان كرنا طوالت كا باعث هو گا جن كے ماتحت جمله فقها اس بات پر متفق هيں كه كلكته  اور اس كے ملحقات دار الحرب هيں”۔

نقش حيات: خود نوشته سوانح، حسين أحمد مدني رحمة الله  عليه، مطبوعه دار الاشاعت، كراچي پاكستان 2/410-411، حاشيه نمبر-1

“ নাসারাদের তথা খ্রিস্টানদের পুরো রাজ্য, কলিকাতা থেকে শুরু করে দিল্লি পর্যন্ত এবং হিন্দুস্তান বিশেষ করে যুক্তরাজ্য (অর্থাৎ উত্তর-পশ্চিমের সীমান্ত প্রদেশগুলো) পর্যন্ত সবগুলোই দারুল হারব; কেননা কুফর ও শিরক সব জায়গায় চালু হয়ে গেছে এবং আমাদের শরয়ী আইনের কোনো প্রকার তোয়াক্কা করা হয় না। আর যে দেশে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়ে যায়, তা দারুল হারব। যে সকল শর্তের আলোকে সকল ফুকাহায়ে কেরাম এ বিষয়ে একমত যে, কলিকাতা ও তার আশপাশের এলাকাগুলো দারুল হারব -এখানে সেসব শর্ত বিস্তারিত তুলে ধরতে গেলে দীর্ঘ সময় ও বিরক্তি সৃষ্টি করবে । ” (নকশে হায়াত; শাইখুল ইসলাম হুসাইন আহমদ মাদানী রহ. : ২/৪১০-৪১১)

শায়খ বুড়হানবী রহ.-এর এ কথার উপর আবার একটু চিন্তা করুন, উক্ত কথার ব্যাপারে বলা যায়, এর মাঝে যেন শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভী রহ. -এর কথাই পুনরায় উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি বলেন, اور همارے شرعي قوانين كي كوئي پرواه نهيں كي جاتي۔ اور جس ملك ميں ايسے حالات پيدا هو جائے وه دار الحرب هے ‘এবং আমাদের শরয়ী আইনের কোনো প্রকার তোয়াক্কা করা হয় না। আর যে দেশে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়ে যায় তা দারুল হারব।’ এখানেও কথা সেটাই যা এর আগে বলা হচ্ছিলো। শায়খ আব্দুল হাই বুড়হানবী রহ. হিন্দুস্তানকে দারুল হারব সাব্যস্ত করার জন্য যে ইল্লত ও কারণের প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন তা হচ্ছে, আমাদের শরয়ী কানুনের কোনো প্রকার তোয়াক্কা করা হয় না।

মুহতারাম পাঠকবর্গের কাছে আমাদের নিবেদন, আপনারা এ বিষয়টি একটু ভালোভাবে বুঝে নিন, আমাদের আইন অর্থাৎ শরীয়তে ইসলামিয়ার আইন-কানুনের যেখানে কোনো তোয়াক্কা নেই, ইসলামী আইনের যেখানে কোনো মর্যাদা নেই, সে দেশ কখনও দারুল ইসলাম হতে পারে না। সে দেশ অবশ্যই দারুল হারব। মুজতাহিদ ইমামগণ একথাই বলেছেন। হিন্দুস্তানের অবস্থা যারা নিজ চোখে দেখেছেন সেসকল উলামায়ে কেরামও একথাই বলেছেন। আর সে ভিত্তিতেই ভারত উপমহাদেশকে দারুল হারব সাব্যস্ত করা হয়েছে।

মোটকথা, এ সর্বস্বীকৃত মূলনীতি ও ফাতওয়ার আলোকে এ দেশ দারুল হারব হয়েছে এবং দারুল হারব হিসাবে স্বীকৃত হয়েছে। এর উপর ভিত্তি করেই উলামায়ে ইসলামের নেতৃত্বে কাফেরদের বিরুদ্ধে মুসলামানরা লড়াই করতে থাকেন। এর উপর ভিত্তি করেই উলামায়ে কেরাম ও সাধারণ মুসলমানরা আল্লাহর রাস্তায় শহীদ ও গাজী হওয়ার বরকতময় মর্যাদা লাভ করতে থাকেন। এর উপর ভিত্তি করেই হিজরতের আমল চলতে থাকে এবং এ সুন্নাত আবার যিন্দা হয়। এর উপর ভিত্তি করেই জিহাদের জন্য সকল প্রকারের প্রস্তুতি চলতে থাকে। এ কারণেই আমাদের মাশায়িখ ও আকাবিরের খানকাহগুলো একেকটি দুর্গে পরিণত হয়। এর উপর ভিত্তি করেই কাদিয়ানীদের মত যিন্দীক এবং অন্যান্য বিদআতী ফিরকাগুলোর সঙ্গে আমাদের মতভেদ চলতে থাকে। এর উপর ভিত্তি করেই আকাবির ও মাশায়িখগণ আমাদেরকে জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহর শিক্ষা ও দীক্ষা দিতে থাকেন।

ভারত উপমহাদেশ এখনও কেন দারুল হারব?

যে দুটি মৌলিক কারণে ভারত উপমহাদেশ প্রায় দুইশত বছর আগে দারুল হারব ও দারুল কুফর হয়েছিলো, এখনও সেই কারণেই ভারত উপমহাদেশ দারুল হারব ও দারুল কুফর। ভারত উপমহাদেশের উপর কাফেরদের আধিপত্য আজও শতভাগ প্রতিষ্ঠিত। আইনী প্রতিষ্ঠানগুলো ও আইনী বিভাগগুলো শতভাগ গায়রে শরয়ী ও কুফরী আইনের অধীনে পরিচালিত। শরয়ী আইনের কোথাও কোনো প্রকার তোয়াক্কা করা হয় না। ভারত উপমহাদেশের ভূখণ্ডগুলোর নাম চাই ভারত হোক, বা বাংলাদেশ কিংবা পাকিস্তান।

ভারত

যদি এ দেশের নাম ভারত হয়, তাহলে কিতাবের প্রতিটি কথা এ দেশের ক্ষেত্রে খুবই স্পষ্ট। দারুল হারবের প্রতিটি শর্ত সেখানে খুব স্পষ্টভাবে প্রযোজ্য। তার শাসক প্রকাশ্য কাফের, যার ব্যাপারে কারও কোনো দ্বিমত নেই। তার প্রতিটি আইনি প্রতিষ্ঠান ও আইনের প্রতিটি বিভাগ শতভাগ গায়রে শরয়ী ও কুফরী আইনের অধীনে পরিচালিত। সে দেশের কোথাও শরয়ী আইনের কোনো তোয়াক্কা করা হয় না। অতএব সে দেশ কিতাব ও সুন্নাহের আলোকে দারুল হারব ও দারুল কুফর। যা কোনো মুসলমানের কাছেই অস্পষ্ট নয় এবং অস্পষ্ট থাকার কোনো সুযোগও নেই।

বাংলাদেশ

আর যদি সে ভূখণ্ডের নাম বাংলাদেশ হয়, তাহলে দারুল হারব হওয়ার দুটি মৌলিক কারণ তার মাঝে খুব স্পষ্টভাবে বিদ্যমান রয়েছে। এ দেশের উপর কাফেরদের আধিপত্য শতভাগ প্রতিষ্ঠিত। এ দেশের আইনের প্রতিষ্ঠান ও বিভাগগুলো শতভাগ গায়রে শরয়ী ও কুফরী আইনের অধীনে পরিচালিত। এ দেশে শরয়ী আইনের কোথাও কোনো তোয়াক্কা নেই। অতএব এ দেশ কিতাব ও সুন্নাহর আলোকে সুনিশ্চিতভাবে দারুল হারব ও দারুল কুফর।

এক দিক থেকে ভারত ও বাংলাদেশের মাঝে সামান্য ফারাক আছে। তা হচ্ছে, ভারতের শাসক নিজেকে অমুসলিম বলে, কিন্তু বাংলাদেশের শাসক নিজেকে মুসলমান হিসাবে প্রকাশ করে। বাংলাদেশের শাসকদের দাবি, তারা মুসলমান। তারা জনসাধারণকে এ কথা বোঝাতে চায় যে, তারা শুধু মুসলমানই নয়; বরং তারা ইসলামের কল্যাণকামী, একনিষ্ঠ খাদিম।

এ বিষয়ে আমি দুটি কথা নিবেদন করতে চাই, প্রথম কথা হচ্ছে, যখন কোনো শাসক নিজেকে মুসলমান হিসাবে প্রকাশ করে, কিন্তু সে দেশের মধ্যে কুফরী আইন ও গায়রে শরয়ী কানুন প্রয়োগ করে এবং তার প্রচলন ঘটায়, শরয়ী আইনের বিপরীতে গায়রে শরয়ী আইনকে প্রাধান্য দেয়, তাহলে এমন শাসক ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যায়। বাংলাদেশের শাসকের ক্ষেত্রেও এ বিধান প্রযোজ্য। কেননা বাংলাদেশের শাসক শরয়ী বিধানের পরিবর্তে গায়রে শরয়ী কানুনকে প্রাধান্য দেয়। সকল মুসলমানকে গায়রে শরয়ী আইনের উপর চলতে বাধ্য করে, শরয়ী আইনের উপর চলা এবং শরয়ী বিধান বাস্তবায়নের জন্য আন্দোলন করাকে সংবিধান পরিপন্থী মনে করে এবং শাস্তিযোগ্য অপরাধ বলে গণ্য করে।

দ্বিতীয় কথা হচ্ছে, যদি ধরেও নেয়া হয় যে, বাংলাদেশের শাসক মুসলমান, এরপরও এ দেশ দারুল হারবই হবে। কেননা, এ শাসক হয়তো একান্ত বাধ্য। আর বাধ্য হওয়ার কারণে সে নিজেও গায়রে শরয়ী আইনের উপর চলে এবং কোটি কোটি মুসলমানকে গায়রে শরয়ী আইনের অধীনে চলতে বাধ্য করে। আর যে শাসকের এ অবস্থা সে একজন অস্তিত্বহীন শাসক। যার ফলাফল হচ্ছে, এ দেশের উপর কুফরের আধিপত্য শতভাগ। সুতরাং কুফরের আধিপত্য শতভাগ এবং আইন-কানুন শতভাগ গায়রে শরয়ী হওয়ার পর একটি দেশ দারুল হারব না হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই এবং দারুল ইসলাম হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

অথবা এ শাসক একান্ত বাধ্য নয়। যদি একান্ত বাধ্য না হয়, তাহলে তারা স্বাধীন। আর স্বাধীন হওয়ার ক্ষেত্রে স্বাধীনভাবে যে নিজেই গায়রে শরয়ী কানুনকে নিজের জন্য কানুন হিসাবে গ্রহণ করে এবং কোটি কোটি মুসলমানকে সে গায়রে শরয়ী আইনের অধীনে চলতে বাধ্য করে, সে ব্যক্তি সকল উলামায়ে কেরামের ঐক্যমতে ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাবে। আর যখন শাসক ইসলামের গণ্ডি থেকে বের হয়ে যাবে এবং আইন-কানুনও গায়রে শরয়ী হবে তখন এ দার ও এ দেশ দারুল হারব না হওয়ার কোনো সুরত নেই।

দারুল হারব হওয়ার এ মৌলিক বিষয়গুলো উপস্থিত থাকা অবস্থায় আরও হাজারো সুরত বের হতে পারে, কিন্তু সে দেশ দারুল হারব হওয়া থেকে বের হতে পারবে না। অতএব বাংলাদেশ দারুল হারব হওয়ার বিষয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নেই।

পাকিস্তান

আর যদি সে দেশের নাম হয় পাকিস্তান, তাহলে দারুল হারব হওয়ার মৌলিক দুটি কারণ সে দেশেও স্পষ্টভাবে পাওয়া যায়। বাস্তবিকভাবে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের শাসন ব্যবস্থা ও আইন প্রণয়নের মূলনীতির মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। যতটুকু পার্থক্য আছে তা আমরা একটু পর বলছি। পাকিস্তানের শাসকদের ঈমানের অবস্থা কি? তা বোঝার জন্য আপনি বাংলাদেশের শাসকদের অবস্থার উপর আবার নযর বুলিয়ে নিন। আপনি পাকিস্তানের শাসকদের হালাত অধ্যয়ন করলে আপনার সামনে এ বাস্তবতা খুব স্পষ্টভাবে উঠে আসবে যে, পাকিস্তানের সূচনাপর্ব থেকে আজকালের পারভেজ-নাওয়াজ-ইমরান-শাহবাজ পর্যন্ত কোনো শাসক, কোনো প্রেসিডেন্ট এবং কোনো প্রধানমন্ত্রীই সে দেশের আইন প্রণয়নের জন্য শরীয়তের আইনকে জরুরি মনে করেনি এবং কোনো শাসকই শরয়ী আইন-কানুনকে কুফরী আইন-কানুনের উপর প্রাধান্য দেয়নি।

আপনি যদি ইতিহাসের পাতাগুলো উল্টে দেখার জন্য সামান্য হিম্মত করেন, তাহলে দেখতে পাবেন, পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকে আজ পর্যন্ত প্রত্যেক শাসক কুরআন ও হাদীসের শরয়ী আইনের বিপরীতে মানব রচিত আইন ও ব্রিটিশদের আইনকেই প্রাধান্য দিয়েছে। শরয়ী আইনের বিপরীতে গায়রে শরয়ী আইন-কানুনকেই পাকিস্তানের কোটি কোটি মুসলমানের জন্য বেশি উপকারী মনে করেছে।

আজকের এ পাকিস্তান যখন প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিলো তখন থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত সেখানে শরয়ী আইন বাস্তবায়ন হয়নি। বর্তমানেও মানব রচিত কুফরী আইনই তার পূর্ণ শক্তি ও জৌলুস নিয়ে প্রয়োগ হয়ে চলছে। পূর্ণ সামর্থ্য ও জোশের সঙ্গেই কার্যকর হচ্ছে। এটা কেন হয়েছে? এবং কীভাবে হয়েছে? হয়ত আপনি বলবেন, পাকিস্তানের শাসকরা একান্ত বাধ্য ছিলো এবং এখনও একান্ত বাধ্য। অথবা বলবেন, তারা স্বাধীন। আপনি যা-ই বলবেন ফলাফল তাই বের হবে, যা বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই মাত্র দেখে এসেছেন।

এ পর্যায়ে আমি আপনাদেরকে আরেকবার স্মরণ করিয়ে দিতে চাই যে, ভারত উপমহাদেশকে যখন দারুল হারব সাব্যস্ত করে এখানে জিহাদ ফরয হওয়ার ফাতওয়া দেয়া হচ্ছিলো তখন এ দেশের শাসন ক্ষমতায় মুসলিম বাদশাহ শোভা পাচ্ছিলো। এরপরও তা দারুল হারব হওয়ার সিদ্ধান্ত হয়ে গিয়েছিল। কারণ এটাই ছিলো যে, আধিপত্য কুফরের ছিলো এবং আইন-কানুন কুফরী ও গায়রে শরয়ী ছিলো।

অতএব যদি ধরে নেয়া হয় যে, পাকিস্তানের বর্তমান শাসকবর্গ একান্ত বাধ্য, তাহলে তারা অস্তিত্বহীন হওয়ার কারণে এবং সেখানে আধিপত্য শতভাগ কুফরের হওয়ার কারণে তা দারুল হারব। আর যদি তারা সেসব বিষয় (শরয়ী ও গায়রে শরয়ী আইন-কানুন প্রয়োগ) প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে স্বাধীন হয়, তাহলে তারা ইসলামের গণ্ডি থেকে বাইরে চলে গেছে। অতএব পাকিস্তানের শাসকবর্গও যখন ইসলামের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে গেছে এবং আইন-কানুনও গায়রে শরয়ী, তখন এই দার অবশ্যই দারুল হারব, এর মাঝে তৃতীয় কোনো সুরত নেই।

দারুল হারব হওয়ার ক্ষেত্রে পাকিস্তান-বাংলাদেশের পার্থক্য

মুজতাহিদ ফকীহগণ যেকোন দেশ দারুল হারব হওয়ার জন্য কুরআন-সুন্নাহ থেকে যে মৌলিক দুটি শর্ত উদ্ঘাটন করেছেন, সে দুটি শর্ত বাংলাদেশ ও পাকিস্তানে সমানভাবে পাওয়া যায়। পার্থক্য শুধু এতটুকু, পাকিস্তানের সংবিধানের ভূমিকায় এমন কিছু কথা রয়েছে যা বাংলাদেশের সংবিধানের ভূমিকায় নেই। ভূমিকার সে কথাগুলোর বিশ্লেষণে যাওয়া আমাদের উদ্দেশ্য নয়। তবে একান্ত প্রয়োজনীয় কিছু কথা উপস্থাপন করবো ইনশাআল্লাহ। যাতে এ কথা স্পষ্ট হয়ে যায় যে, পাকিস্তানের সংবিধানের ভূমিকাতে বাংলাদেশের সংবিধানের ভূমিকার চাইতে অতিরিক্ত যে কথাগুলো আছে, সে অতিরিক্ত কথাগুলোর কারণে কোন দেশ দারুল ইসলাম হতে পারে না। এমনকি সে কথাগুলোর দ্বারা পাকিস্তানকে দারুল ইসলাম বানানো সে দেশের শাসকবর্গের উদ্দেশ্যও নয়।

এখানে উপরের বক্তব্যে আমরা ছোট্ট দুটি দাবি করেছি।

প্রথম দাবি হচ্ছে, পাকিস্তানের সংবিধানের ভূমিকায় বাংলাদেশের সংবিধানের চাইতে ভিন্ন ও অতিরিক্ত যে কথাগুলো আছে, সে কথাগুলোর দ্বারা পাকিস্তান দারুল ইসলাম হওয়া সম্ভব নয়।

আর দ্বিতীয় দাবি হচ্ছে, সে কথাগুলোর দ্বারা পাকিস্তানকে দারুল ইসলাম বানানো পাকিস্তানের শাসকবর্গের উদ্দেশ্যও নয়।

আমাদের এ দুটি দাবি সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করা এ নিবন্ধে একটু কঠিন হবে। কথা অনেক দীর্ঘ হয়ে যাবে। তাই সংক্ষিপ্তভাবে দুই চারটি কথা তুলে ধরছি-

১. পাকিস্তানের সংবিধানের ভূমিকায় উল্লিখিত সে কথাগুলোর মাঝে এ বিষয়ের ঘোষণা নেই যে, পাকিস্তানের আইন প্রতিষ্ঠান ও আইন বিভাগগুলো কুরআন ও হাদীসের অধীনে চলবে।

২. সে কথাগুলোর মাঝে এ বিষয়ের ঘোষণা নেই যে, পাকিস্তানের আদালত শরয়ী আইনের অধীনে পরিচালিত হবে।

৩. পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্ত পাকিস্তানে এক দিনের জন্যও শরয়ী বিধান প্রয়োগ হয়নি।

৪. পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে আজ পর্যন্তও মুসলমানদের পক্ষ থেকে শরয়ী বিধান চালু করার জন্য আন্দোলন ও দাবি চলমান রয়েছে। যার ফলে বারবারই এ বাস্তবতা স্পষ্ট হয়ে উঠছে যে, পাকিস্তানের আদালত এবং পাকিস্তানের আইন-কানুন শরয়ী আইন-কানুন নয়। সে দেশের আদালতে কুরআন হাদীসের অধীনস্থতা নেই।

৫. পাকিস্তানের সূচনা লগ্নের শাসকরা শরয়ী বিধানকে দেশের আইন হিসাবে গ্রহণ করেনি। পাকিস্তানের আকাবির উলামায়ে কেরামের মধ্য থেকে শায়খ শাব্বির আহমদ উসমানী রহ. থেকে শুরু করে পাকিস্তানের সকল আকাবির উলামায়ে কেরাম পাকিস্তানে শরয়ী আইনকে দেশের আইনী মর্যাদা দেয়ার জন্য ধারাবাহিক দাবি করতে থাকেন। আর শাসকদের পক্ষ থেকে কথা ও কাজে তা অস্বীকার করাও ধারাবাহিকভাবে চলতে থাকে।

এ বিষয়গুলো এ কথার স্পষ্ট প্রমাণ বহন করে যে, বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মাঝে শরয়ী অবস্থানের দিক থেকে কোনো ব্যবধান নেই। কোনো একটি দেশ দারুল হারব হওয়ার জন্য যেসব গুণাবলী থাকা জরুরি তার সবগুলোই পাকিস্তানে উপস্থিত আছে।

সুতরাং দলীলের আলোকে এ কথা একেবারেই স্পষ্ট যে, যেসব কারণে দুইশত বছর আগে ভারত উপমহাদেশ দারুল হারব হয়েছিল, সেসব কারণেই এ দেশ এখনও দারুল হারব। চাই তার নাম ভারত হোক, অথবা বাংলাদেশ বা পাকিস্তান। এ দেশ অর্থাৎ ভারত উপমহাদেশ (ভারত, বাংলাদেশ ও পাকিস্তান) দারুল হারব হওয়ার পর তা দারুল ইসলাম হওয়ার কোনো পর্ব তার উপর দিয়ে পার হয়নি। কোনো একটি দারুল হারব দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য যেসব কিছুর প্রয়োজন ছিলো তা এ ভূখণ্ডের কিসমতে জোটেনি।

এখন আমরা সেসব পর্বের সংক্ষিপ্ত উপাখ্যান আপনাদের সামনে তুলে ধরতে যাচ্ছি, ভারত উপমহাদেশ বিগত দুইশত বছর যাবত যে পর্বগুলো অতিক্রম করে চলেছে, কিন্তু দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হওয়ার মতো কোনো পর্ব কখনো আসেনি। হাজারো পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু দারুল ইসলাম হওয়ার জন্য যে পরিবর্তন প্রয়োজন ছিলো, তা এ ভূখণ্ডের কিসমতে জোটেনি। পরবর্তী পৃষ্ঠাগুলোতে সে কাহিনীই আমরা সংক্ষেপে তুলে ধরবো। আল্লাহ তাওফীক দান করুন।

***

 

 

[৩য় পর্ব-১ম ভাগ ]

উলামায়ে হিন্দের অবদান

এ দেশ, অর্থাৎ ভারত উপমহাদেশ (ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ) দারুল হারব হওয়ার পর দারুল ইসলাম হওয়ার পর্ব কখনও আসেনি। কেননা একটি ভূখণ্ড দারুল হারব থেকে দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হওয়ার জন্য যে বিষয়গুলো হওয়া জরুরি ছিল তা এ ভূখণ্ডের ভাগ্যে জোটেনি।

বিগত দুইশত বছরে ভারত উপমহাদেশের উপর দিয়ে বহু পর্ব অতিবাহিত হয়ে গেছে এবং হাজার রকমের পট পরিবর্তন তাতে হয়েছে। কিন্তু সেগুলোর কোনোটিই এ ভূখণ্ডকে দারুল ইসলাম বানানোর মতো ছিল না। দুইশত বছরের সে সফরের সংক্ষিপ্ত বিবরণ আমরা তুলে ধরার চেষ্টা করবো। আল্লাহ সঠিক কিছু বলার তাওফীক দান করুন।

আমাদের উপর দিয়ে কী বয়ে গেছে?

হিন্দুস্তান (তথা ভারত-বাংলাদেশ-পাকিস্তান) বিগত দুইশত বছর যাবৎ এমন এমন পর্ব অতিক্রম করেছে যেগুলো ধারণা করাও আজকের মুসলমানদের জন্য কঠিন। আর যেকোনো অতীত এমনই হয় যে, বর্তমানের মানুষেরা অতীতকে যতই পড়ুক এবং নিজের ভাবনার ঘোড়াকে যতদূরই হাঁকিয়ে নিয়ে যাক, তারা কখনও সরাসরি দর্শক ও পরিস্থিতির শিকার ব্যক্তিদের অনুভূতির নাগাল পায় না। পরিবর্তিত পরিবেশ-পরিস্থিতির অনুভূতি, অতীত ও বর্তমানের পার্থক্যগুলোকে সে সময়ের লোকেরা যেভাবে অনুধাবন করতে পারে, সে সময়ে যারা ছিল না তারা সেভাবে অনুভব ও অনুধাবন করতে পারে না।

এমনিভাবে যারা তাদের নিহত মা-বাবা, ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনের রক্তাক্ত চেহারা তাদের হত্যাকারীদের হাতে দেখেছে, তাদের প্রতিশোধ স্পৃহা ও বদলা নেয়ার দৃঢ়তা তাদের বরাবর হওয়া সম্ভব নয়, যারা সেসব হতাহতের ঘটনা নিজের চোখে দেখেনি, শুধু তা শুনেছে।

অনুরূপভাবে বাপ-দাদা থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া সহায়-সম্পত্তি এবং নিজের পরিশ্রমে তৈরি ঘরের প্রতি ভালোবাসা এক রকম হতে পারে না। নিজের রক্ত ও ঘাম ঝরানো উপার্জন এবং বিনামূল্যের দান কখনও বরাবর হতে পারে না।

নোংরা ও ময়লা আবর্জনায় বসবাসকারী নোংরা পরিবেশের দুর্গন্ধ থেকে সেভাবে কষ্ট অনুভব করে না, যেভাবে কোনো পরিচ্ছন্ন পবিত্র পরিবেশ থেকে নোংরা ও দুর্গন্ধময় পরিবেশে আগত ব্যক্তি অনুভব করে থাকে। তবে পবিত্র পরিবেশ থেকে আগত ব্যক্তির এ কষ্টও ধীরে ধীরে দূর হয়ে যেতে থাকে। দুর্গন্ধের অনুভব কমে যায়। কেন? দুর্গন্ধ দূর হয়ে গেছে? নাকি সে ব্যক্তি দুর্গন্ধকে সয়ে নিয়েছে। বাস্তবতা হচ্ছে, দুর্গন্ধ তার আপন উৎকট গন্ধ নিয়ে বহাল অবস্থায় আছে। পরিবেশও দুর্গন্ধময় এবং নোংরা ময়লা আবর্জনাও সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। কিন্তু আগন্তুকগণ সে পরিবেশকে সয়ে নিয়েছে। আপন বানিয়ে ফেলেছে।

ভূমিকাস্বরূপ সংক্ষিপ্ত আকারে কিছু কথা বলার পর আমরা হিন্দুস্তানের সংক্ষিপ্ত কাহিনীর দিকে যাবো। এটি নিয়মতান্ত্রিক কোনো ঐতিহাসিক আলোচনা নয়, যার মধ্যে অতীতের প্রতিটি বিন্দুকে তুলে আনা হবে। বরং আমরা এখানে ইতিহাসের শুধু সে অংশগুলোর প্রতি মনোযোগ দেবো যেগুলো থেকে সাহায্য নিয়ে শত শত বছরের অস্পষ্টতাগুলো দূর করার চেষ্টা করা হবে। জাতীয়তাবাদের মূর্খতা, সাম্প্রদায়িকতা নির্ভর ছড়িয়ে থাকা ঘৃণা এবং দলাদলিমূলক শত্রুতার বীজ থেকে পবিত্র হয়ে শুধু একজন মুসলমান হিসাবে, ইতিহাসের যে কথাগুলোকে সামনে নিয়ে আসা জরুরি এবং ইতিহাসের যে পরিস্থিতিগুলোর উপর চিন্তা-ফিকির করা চাই, সে কথাগুলোকেই আমরা বিস্তারিত উল্লেখ করার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

দুই কিংবা সোয়া দুই শতাব্দীব্যাপী ব্যাপ্ত এ ইতিহাসকে আমরা চারটি ভাগে ভাগ করতে পারি-

প্রথম ভাগ: হিন্দুস্তান দারুল হারব হওয়া থেকে মোগল সাম্রাজ্যের পতন পর্যন্ত। এটি প্রায় পঞ্চাশ বছরের ইতিহাস।

দ্বিতীয় ভাগ: মোগল সাম্রাজ্যের পতন থেকে ভারতের স্বাধীনতা ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত। এটি প্রায় একশত বছরের ইতিহাস।

তৃতীয় ভাগ: ভারতের স্বাধীনতা ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা থেকে পাকিস্তান বিভক্তি ও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত। যা প্রায় তেইশ/চব্বিশ বছরের সংক্ষিপ্ত একটি মেয়াদ।

চতুর্থ ভাগ: পাকিস্তান বিভক্তি ও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত, যা প্রায় পঞ্চাশ বছরের সময়কাল।

 

প্রথম ভাগ: দারুল হারব ফাতওয়া থেকে মোগল সাম্রাজ্যের পতন পর্যন্ত

(১৮০৮খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮৫৭খ্রিস্টাব্দ)

উনবিংশ শতাব্দীর শুরু, যখন হিন্দুস্তান দারুল হারব হওয়ার ফাতওয়া দেয়া হয়েছিল, তখন ভারত উপমহাদেশে মুসলমানদের অস্তিত্ব ছিল, কিন্তু তাদের কোনো শক্তি সামর্থ্য ছিল না, রাজত্বের সিংহাসন তাদের কাছে ছিল, কিন্তু রাজত্ব তাদের হাতে ছিল না। শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী রহিমাহুল্লাহ-এর ফাতওয়ার সুনির্দিষ্ট তারিখ বলা একটু মুশকিল। তবে ইতিহাসবিদগণ ১৮০৮ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৮১২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত সময়কালকে এর তারিখ হিসাবে উল্লেখ করে থাকেন। মাওলানা হোসাইন আহমাদ মাদানী রহিমাহুল্লাহ লিখেন-

“1803ع ميں جب كه ايسٹ انڈيا كمپني كے نمائندے نے شاه دهلي سے ملكي انتظام كا پروانه جابرانه طريقے سے لكھوا كر ملك ميں اعلان  كرديا كه خلق (مخلوق) خدا كي، ملك بادشاه سلامت كا اور حكم كمپني بهادر كا، تو شاه عبد العزيز نے هندوستان كے دار الحرب هو جانے كا فتوى جاري فرمايا اور مسلمانوں كو آزادئ هند كے لئے آماده كرنا ضروري سمجھا (مذكوره مفصل فتوى فتاوى عزيزية صفحه 17 پر موجود هے)۔ واقعات نے بتلا ديا تھا كه هندوستان كے موجوده حكام وامراء ميں سے اب كسي ميں طاقت اس بديسي غير مسلم قوم كے مقابله اور دفع كرنے كي ايسي نهيں رهي جس پر اطمينان كيا جائے۔ لهذا مسلمانوں كے لئے احوال پر غور كرنا اور آزادي كے لئے اپنے آپ كو تيار كرنا از بس ضروري هے، جو كه هر دار الحرب كے باشندے پر لازم هے۔ چنانچه اس كے بعد سے جد جهد شروع هوئي۔ (نقش حيات ص 410,411)

১৮০৩ খ্রিস্টাব্দে যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির প্রতিনিধিরা দিল্লির শাহ থেকে জোরপূর্বক রাষ্ট্র পরিচালনার পরওয়ানা লিখিয়ে নিয়ে ঘোষণা করে দিয়েছিল যে, সৃষ্টি আল্লাহর, দেশ মহামান্য বাদশাহর এবং আদেশ-নিষেধ কোম্পানি বাহাদুরের- তখন শাহ আব্দুল আযীয রহিমাহুল্লাহ হিন্দুস্তান দারুল হারব হয়ে যাওয়ার ফাতওয়া প্রদান করেছেন এবং হিন্দুস্তানকে স্বাধীন করার জন্য মুসলমানদেরকে প্রস্তুত করা জরুরি মনে করেছেন। (উল্লিখিত বিস্তারিত ফাতওয়া ‘ফাতাওয়ায়ে আযীযিয়া’ পৃ: ১৭-এর মাঝে রয়েছে)। পরবর্তী ঘটনাবলি এ কথা প্রমাণ করে দিয়েছে যে, হিন্দুস্তানে তখন শাসকবর্গের কারও মাঝে এ শক্তি ছিল না যে, তারা এ ভিনদেশি অমুসলিম গোষ্ঠীর মোকাবেলা করবে এবং তাদের মাঝে এমন কেউ ছিল না শত্রু প্রতিরোধের বিষয়ে যার উপর ভরসা করা যায়। আর তাই মুসলমানরা তাদের পরিস্থিতি নিয়ে চিন্তা করা এবং স্বাধীনতার জন্য নিজেদেরকে প্রস্তুত করা নিজেদের সাধ্যানুযায়ী জরুরি হয়ে পড়েছে, যা যেকোনো দারুল হারবের অধিবাসীদের উপর জরুরি। যার ফলে এরপর থেকে চেষ্টা প্রচেষ্টা শুরু হয়েছে।” -নকশে হায়াত পৃ: ৪১০-৪১১

উল্লিখিত ফাতওয়া প্রদান করার প্রায় পঞ্চাশ বছর পর হিন্দুস্তানে মোগল শাসনের অবসান ঘটেছে এবং ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে মোগল শাসনের সর্বশেষ শাসক সুলতান বাহাদুর শাহ যফরকে দেশান্তর করার মধ্য দিয়ে হিন্দুস্তান থেকে মুসলিম রাজত্বের জানাযা বের করা হয়েছে। এ পঞ্চাশ বছর সময়কালে রাজত্বের সিংহাসন মুসলমানদের হাতে ছিল, দিল্লির লাল কেল্লাও মুসলমানদের হাতে ছিল, কিন্তু এরপরও হিন্দুস্তান দারুল হারব ছিল। মোগল রাজত্ব বহাল থাকা অবস্থায়ও হিন্দুস্তান দারুল হারব ছিল, শতাব্দীর পর শতাব্দী কাল যাবৎ মুসলমানদের হাতে রাজত্ব থাকা সত্ত্বেও তা দারুল হারব হয়ে গেছে!

অনুল্লেখযোগ্য ইখতিলাফ, কিছু ইলহাদ ও কিছু পদস্খলন

এ পর্যায়ে একটি বিষয়ের প্রতি পাঠকবর্গের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি। বিষয়টি হচ্ছে, এ সময়ে হিন্দুস্তান দারুল হারব হওয়ার বিষয়ে কেউ কেউ দ্বিমতও করেছে। এমনিভাবে মোগল সাম্রাজ্য বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পরের সময়গুলোতে যখন শাসন ক্ষমতা শতভাগ কাফেরদের হাতে ছিল, তখনও কিছু মানুষ, কাদিয়ানী সম্প্রদায় এবং তাদের মতো আরও কিছু ফিরকা এ বিষয়ে ইখতিলাফ করেছে এবং ইখতিলাফ করতে থেকেছে। আর পৃথিবীতে এমন কোন মাসআলা আছে যা নিয়ে কেউ না কেউ দ্বিমত করেনি? দেখার বিষয় হচ্ছে, দ্বিমত পোষণকারী কি দলীলের আলোকে দ্বিমত করেছে? নাকি গোষ্ঠীগত গোঁড়ামির ভিত্তিতে ইখতিলাফ করেছে? নাকি নিফাক ও ইলহাদের ভিত্তিতে দ্বিমত করেছে? নাকি কোনো ভুল বোঝাবুঝির কারণে দ্বিমত করেছে? যদি কোনো শুবাহ তথা ভুল বুঝের কারণে দ্বিমত করে থাকে তাহলে সে মাযুর, আর যদি নিফাক ও ইলহাদের ভিত্তিতে দ্বিমত করে থাকে তাহলে সে অভিশপ্ত এবং গালমন্দ পাওয়ার উপযুক্ত।

হিন্দুস্তানের হকপন্থী উলামায়ে কেরাম এ বিষয়ে একমত ছিলেন যে, উনবিংশ শতাব্দীর শুরুতে ভারত উপমহাদেশের পাক ও হিন্দ দারুল হারব হয়ে গিয়েছিল। কিতাব ও সুন্নাহর আলোকে এ সিদ্ধান্তই সঠিক ছিল। এরপরও নিফাক, ইলহাদ ও যান্দাকায় পতিত লোকেরা ব্রিটিশ শাসিত এ ভারত উপমহাদেশকে দারুল ইসলাম দাবি করতে থেকেছে। তারা ব্রিটিশ হুকুমতের পক্ষ থেকে এমন নিরাপত্তা ও শান্তি পাচ্ছিলো যে নিরাপত্তা ও শান্তি ইসলামী শাসনের পক্ষ থেকেও তারা কখনও পায়নি। এ লোকদের দৃষ্টিতে ইংরেজ শাসনের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ফাসাদ ও ফিতনা ছিল এবং কাফেরদের আনুগত্য তাদের দৃষ্টিতে ওয়াজিব ছিল। সেসকল মুলহিদ ও যিন্দিকের চিন্তা-ভাবনা এবং তাদের কথাবার্তা ও মতামতের দিকে দৃষ্টি দেয়ার না কোনো প্রয়োজন আছে, আর না এর কোনো সুযোগ আছে।

তবে আহলে হক উলামায়ে কেরাম থেকেও কারও কারও কলমের মাথায় এমন কিছু কথা এসে গেছে যা দলীলের আলোকে ভুল ছিল এবং সমকালীন উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তের বিপরীত ছিল। আর এ কারণে অনুল্লেখযোগ্য কিছু দ্বিমত থাকা সত্ত্বেও শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী রহিমাহুল্লাহ হিন্দুস্তান দারুল হারব হওয়ার বিষয়ে যে ফাতওয়া দিয়েছিলেন, সে ফাতওয়ার আলোকেই হিন্দুস্তানের হকপন্থী উলামায়ে কেরাম আমল করেছেন এবং হিন্দুস্তানের উপর সাম্রাজ্য বিস্তারকারী কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ শুরু করেছেন এবং নিজেদের সীমিত সামর্থ্য ও উপায়-উপকরণ নিয়েই ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে থাকেন। কুরবানী দিতে থাকেন, আল্লাহর রাস্তায় শহীদ হতে থাকেন। আল্লাহর দুশমনদেরকে মারতে থাকেন এবং নিজেদের ফরয দায়িত্ব আদায় করতে থাকেন।

ফরয আদায়ের একটি অনুসরণীয় আদর্শ

দারুল ইসলাম, যা অনৈসলামিক প্রভাব বিস্তারের কারণে দারুল হারব হয়ে যায়, তা পুনরুদ্ধারের জন্য এবং অনৈসলামিক শাসনকে বিতাড়িত করার জন্য আল্লাহর রাস্তায় জিহাদের যে ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছিল, বালাকোটের ময়দান তার একটি স্মরণীয় উজ্জ্বল পর্ব। রায়বেরেলীর সাইয়েদ বংশের অনবদ্য মুরশিদে কামেল, মুজাহিদে মিল্লাত, সাইয়েদ আহমাদ শহীদ বেরেলবী রহিমাহুল্লাহ-এর নেতৃত্বে এবং তাঁর অসাধারণ সেনাপতি মাওলানা ইসমাঈল শহীদ রহিমাহুল্লাহ-এর পরিচালনায় সাম্রাজ্যবাদী শক্তির বিরুদ্ধে জিহাদের ধারাবাহিকতা শুরু হয়েছে।

সাইয়েদ আহমাদ শহীদ রহিমাহুল্লাহ  ও শাহ ইসমাঈল শহীদ রহিমাহুল্লাহ শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলবী রহিমাহুল্লাহ-এর দরবারেরই লালিত সন্তান। আপনি যদি ইতিহাসের পাতাগুলোতে নযর বুলিয়ে দেখেন তাহলে আপনি দেখতে পাবেন, আমাদের সালাফের ইলমী কেন্দ্রগুলো থেকে যেমনিভাবে ইলম শিখা ও শিখানোর ধারাবাহিকতা চালু ছিল, তেমনিভাবে সময়ের সকল শরঈ যিম্মাদারীও এ সকল ইলমী মারকায থেকেই আদায় হতে থেকেছে। যার ফলে এ মারকাযে ইলমী থেকেই হিন্দুস্তান দারুল হারব হওয়ার ফাতওয়া দেয়া হয়েছে এবং এ মারকাযে ইলমী থেকেই জিহাদের সূচনা হয়েছে এবং এ ইলমী মারকায থেকে শিক্ষা সমাপনকারী ইলম ও আমলের শাহসাওয়ারগণই ইসলামী হুকুমত পুনরুদ্ধারের জন্য এবং প্রভাব বিস্তারকারী শক্তিগুলোকে তাড়িয়ে দেয়ার জন্য জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত লড়াই করতে থাকেন এবং শেষ পর্যন্ত এ পথে নিজেদের গর্দানগুলো কুরবান করে দিয়েছেন।

সংক্ষিপ্তভাবে বললে বলা যায়, তখন পরিস্থিতি এমন ছিল যে, হিন্দুস্তানকে দারুল হারব ঘোষণা দেয়া হয়ে গেছে। দেশের শাসকবর্গ মুসলমান ছিল। আধিপত্য কাফেরদের ছিল। আইনের প্রতিষ্ঠানগুলো কাফেরদের আইনের অধীনে পরিচালিত হত। আধিপত্য বিস্তারকারী শক্তি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সশস্ত্র বাহিনীর মালিক ছিল। সাধারণ মুসলমানদের মাঝে মূর্খতা, ভ্রষ্টতা মহামারীর মতো ছড়িয়ে ছিল। নিফাক ও ইলহাদের জাল বিছানো ছিল। সব ধরনের ষড়যন্ত্রের ফাঁদ ঘিরে রেখেছিল। দ্বীনের প্রতিটি সুস্পষ্ট ও অকাট্য বিষয়কে সন্দেহযুক্ত করা ও বিতর্কিত করে তোলার নকশা চূড়ান্ত হয়ে গিয়েছিল। ইসলামের দুশমন, ইসলামের বিরুদ্ধে যুদ্ধরত কাফেরদেরকে সাহায্য-সহযোগিতা এবং তাদের পদচুম্বন করার জন্য ঈমান বিক্রেতাদের একটি বড় জামাত নিজেদের ঈমান বিক্রয়ের লেনদেন সম্পন্ন করে ফেলেছিল। উলামায়ে সু ও অপব্যখ্যাকারীদের একটি বড় সংখ্যা তাহরীফ ও অপব্যাখ্যার বাজার গরম করে চলছিল। জিহাদি কার্যক্রমের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অপপ্রচার চালু ছিল। দেশি-বিদেশি দুশমনের সংখ্যা ও শক্তি অনুমান করাও মুশকিল ছিল, যখন মুজাহিদগণের সংখ্যা ছিল নিতান্তই নগণ্য। উভয়পক্ষের সংখ্যা ও শক্তির মাঝে কোনোপ্রকার তুলনা করার মতো অবস্থাই ছিল না। শুধু বালাকোটের একটি রণাঙ্গনের দিকে দৃষ্টি দিয়ে দেখুন, আপনি দেখতে পাবেন মুসলিম মুজাহিদগণের সংখ্যা সাতশত, যখন শত্রুসৈন্যের সংখ্যা ছিল দশ হাজার। আপনি ইতিহাসের দিকে চোখ মেলে দেখুন, ইসলাম ও কুফরের মাঝে সংঘটিত রণাঙ্গনগুলোতে দুইপক্ষের সংখ্যার মাঝে তুলনা করার মতো কোনো অবস্থা ছিল না। কিন্তু মুসলমান যখনই নিজের রবের উপর ভরসা করে নিজেদের ঈমানি শক্তিতে বলীয়ান হয়ে লড়াই করেছে তখনই তারা বিজয় লাভ করেছে।

দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠাতাগণের পদক্ষেপ

আধিপত্য বিস্তারকারী ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার জন্য আমাদের আকাবির-আসলাফ যেসব রণাঙ্গনে লড়াইয়ের জন্য শত্রুর মুখোমুখি হয়েছেন, সেসকল ময়দানের এ একই চিত্র ছিল। কিন্তু এরপরও তাঁরা নিজেদের শরঈ যিম্মাদারী আদায় করা থেকে বিমুখ হননি। বালাকোট ময়দানের যে চিত্র আপনাদের সামনে তুলে ধরা হয়েছে তার প্রায় পঁচিশ বছর পর শামেলীর ময়দানে সে একই দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে আসে।

আমাদের আকাবিরে উলামায়ে দেওবন্দ যাঁদেরকে প্রথম সারির আকাবির হিসাবে ধরা হয়, তাঁরা জিহাদের সামান্য আয়োজন নিয়েই অগণিত সংখ্যক সশস্ত্র সৈন্যবাহিনীর বিরুদ্ধে জিহাদের ময়দানে নেমে পড়েছেন। কেননা মাসআলা ছিল দিফা তথা প্রতিরোধের। হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহিমাহুল্লাহ-এর নেতৃত্বে, কাসেম নানুতবী রহিমাহুল্লাহ সেনাপতির দায়িত্ব নিয়ে, রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী রহিমাহুল্লাহ বিচারপতির দায়িত্ব নিয়ে এবং আরও কিছু উলামায়ে কেরামের অংশগ্রহণের মাধ্যমে এ রণাঙ্গনটি সংঘটিত হতে পেরেছিল।

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে অনুপ্রবেশকারী ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার বিষয় যখন উলামায়ে হিন্দ দিল্লি জামে মসজিদে সর্বসম্মত ফাতওয়া প্রকাশ করেছিলেন, তখন সে ফাতওয়া নিয়ে মতবিনিময়ের জন্য থানাভবনে উলামায়ে কেরামের পরামর্শ ডাকা হয়েছে। আলোচ্য বিষয় এটাই ছিল যে, চলমান অবস্থায় অত্যাচারী দখলদার ইংরেজদের বিরুদ্ধে আমরা লড়াই করতে পারি কিনা? আর চলমান অবস্থায় জিহাদের বিধান কী? পরামর্শ মজলিসে দিল্লির উলামায়ে কেরামের জিহাদের ফাতওয়াকে সর্বসম্মতভাবে সমর্থন ও সত্যায়ন করা হয়েছে। হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী, মাওলানা কাসেম নানুতবী ও মাওলানা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রহিমাহুল্লাহ সবাই উপস্থিত ছিলেন। শুধু মাওলানা শায়খ মুহাম্মদ থানভী রহিমাহুল্লাহ নামের এক বুজুর্গের মত এর বিপরীতে ছিল। সে পরামর্শ মজলিসের একটি সুন্দর কথোপকোথন দেখুন-

“হযরত মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম সাহেব হযরত শায়খ মুহাম্মদ সাহেবেকে সম্বোধন করে অত্যন্ত আদবের সাথে নিবেদন করলেন, হযরত! কী কারণে আপনি ইসলাম ও দেশের শত্রুদের বিরুদ্ধে জিহাদ করাকে ফরয বলেন না, এমন কি জায়েযও মনে করেন না?

হযরত মাওলানা শায়খ মুহাম্মদ: এ কারণে যে, আমাদের কাছে জিহাদের অস্ত্র ও উপাদান নেই। আমরা একেবারেই সহায় সম্বলহীন।

হযরত মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম সাহেব: আমাদের কাছে কি এতটুকু সামানপত্রও নেই যতটুকু বদর যুদ্ধের সময় ছিল?

হযরত মাওলানা শায়খ মুহাম্মদ: যদি আপনার সকল দলীল ও সব কথা মেনেও নেই, এরপরও জিহাদের সবচেয়ে বড় শর্ত হচ্ছে ইমাম নির্ধারণ করা। সে ইমাম কোথায়? যার অধীনে জিহাদ করা হবে?

হযরত মাওলানা মুহাম্মদ কাসেম: ইমাম নির্ধারণ করতে কতক্ষণ আর সময় লাগে! মুরশিদে বরহক হযরত হাজী সাহেব রয়েছেন। তাঁর হাতেই জিহাদের বাইয়াত করে নেয়া হোক!

হাফেয যামেন সাহেব বললেন, ব্যস, বুঝে এসে গেছে। এরপর সবাই হযরত হাজী সাহেবের হাতে জিহাদের বাইয়াত করলেন।” -নকশে হায়াত, মাওলানা হোসাইন আহমাদ মাদানী রহিমাহুল্লাহ  পৃ: ৫৫১-৫৫২

এ ঘটনাটি যেমনিভাবে ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশ, তেমনিভাবে আমাদের চলমান আলোচ্য বিষয়ে ঘটনাটি দলীল প্রমাণ নির্ভর একটি উপযুক্ত জবাবও বটে।

‘নুযহাতুল খাওয়াতিরে’ এক নযর

আল্লামা আব্দুল হাই রহিমাহুল্লাহ তাঁর প্রসিদ্ধ কিতাব ‘নুযহাতুল খাওয়াতির’ এ লিখেন-

وثار المسلمون وأهل البلاد على الحكومة الإنجليزية سنة أربع وسبعين ومائتين وألف، وقامت جماعة من العلماء والصلحاء وأهل الغيرة من المسلمين في سهارنبور ومظفر نكر فأعلنوا الحرب على الإنكليز واختاروا الشيخ إمداد الله أميراً لهم، واشتبك الفريقان في ميدان شاملي قرية من أعمال مظفر نكر فقتل حافظ محمد ضامن شهيداً، وانقلبت الدائرة على المسلمين ورسخت أقدام الإنكليز.

واشتد بطشهم بكل من اتهم بالمشاركة في هذه الثورة، وضاقت على العلماء العاملين الغيارى الأرض، وضاق مجال العمل في الهند، وقضى بعض الرفقة مدة في الاختفاء والانزواء، ولجأ بعضهم إلى الهجرة ومغادرة البلاد، وآثر الشيخ إمداد الله الهجرة إلى مكة المكرمة، ودخل مكة سنة ست وسبعين ومائتين وألف وألقى رحله بالبلد الأمين، وكان أول إقامته على الصفا ثم انتقل إلى حارة الباب حيث قضى حياته ولقي ربه.

“হিন্দুস্তানের মুসলমানরা ১২৭৪ হিজরীতে ইংরেজ হুকুমতের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছে এবং উলামায়ে কেরাম, সালেহীনের জামাআত এবং আত্মমর্যাদা সম্পন্ন মুসলমানদের একটি কাফেলা সাহারানপুর ও মুযাফফর নগরে জড়ো হয়েছেন এবং ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদের ঘোষণা দিয়েছেন। হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহিমাহুল্লাহকে নিজেদের আমীর বানিয়েছেন। মুযাফফর নগর জেলার একটি জনবসতি শামেলীর ময়দানে উভয়পক্ষের মাঝে লড়াই হয়েছে। সে যুদ্ধে হাফেজ যামেন সাহেব শাহাদাত বরণ করেন। মুসলমানদের অবস্থা দুর্বল হয়ে পড়েছে এবং ইংরেজদের অবস্থান মজবুত হয়ে গেছে।

এ বিদ্রোহে অংশগ্রহণকারী ব্যক্তিবর্গের বিরুদ্ধে ইংরেজদের পাকড়াও কঠিন হতে থাকে। জিহাদের কার্যক্রমের সাথে জড়িত আত্মমর্যাদাশীল উলামায়ে কেরামের জন্য পৃথিবী তার প্রশস্ততা সত্ত্বেও সংকীর্ণ হয়ে গেল এবং হিন্দুস্তানে কাজের ময়দান সঙ্কুচিত হয়ে যেতে লাগলো। তাঁদের কেউ কেউ কিছু দিনের জন্য আত্মগোপনে চলে গেলেন, আর কেউ কেউ হিজরতের পথ ধরেছেন। হাজী ইমদাদুল্লাহ রহিমাহুল্লাহ মক্কা মুকাররামার দিকে হিজরত করাকে প্রাধান্য দিলেন। তিনি ১২৭৬ হিজরীতে মক্কা মুকাররামায় প্রবেশ করেন এবং বালাদে আমীনে মুকীম হয়ে গেলেন। তিনি প্রথমে ‘সাফায়’ অবস্থান করেন, এরপর ‘হাররাতুল বাব’ এ স্থানান্তর হয়ে যান। সেখানে অবস্থানকালেই তিনি তাঁর রবের সাথে গিয়ে মিলিত হন।” -নুযহাতুল খাওয়াতির পৃ: ১১৯৪

সারকথা

হিন্দুস্তানের বিগত দুই কিংবা সোয়া দুই শতাব্দী ব্যাপ্ত ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত যে পটভূমি আমরা তুলে ধরছি, তার প্রথম অংশ অধ্যয়নের মাধ্যমে যে বিষয়গুলো সামনে আসে তা নিম্নরূপ:

এক. শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলভী রহিমাহুল্লাহ-এর পক্ষ থেকে হিন্দুস্তান দারুল হারব হওয়া বিষয়ক ফাতওয়া প্রকাশের পর থেকে মোগল সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি পর্যন্ত হিন্দুস্তান ধারাবাহিকভাবে দারুল হারব ছিল। এ সময়কালের মধ্যে এ ভূখণ্ড কখনও দ্বিতীয়বার দারুল ইসলাম হতে পারেনি।

দুই. প্রায় পঞ্চাশ বছরের এ সময়কালে হিন্দুস্তানের শাহী মসনদে মুসলামনই আসীন ছিল। এরপরও তা দারুল হারবই রয়ে গেছে। আকাবির উলামায়ে হিন্দ এ ভূখণ্ডকে দারুল হারবই মনে করতেন।

তিন. এ পঞ্চাশ বছর সময়কালে আগ্রাসী কাফেরদের বিরুদ্ধে উলামায়ে কেরামের নেতৃত্বে হিন্দুস্তানের মুসলমানরা লড়াই করতে থাকে এবং জিহাদ জারি রেখেছে।

চার. দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতাগণ চলমান এ জিহাদের এই রণক্ষেত্রগুলোর একটি বড় অংশের নেতৃত্ব দিয়েছেন। আর সেই সঙ্গে শিক্ষাদীক্ষার যাবতীয় যিম্মাদারী আদায় করার ক্ষেত্রেও তাঁদের মাঝে ইংরেজদের বিরুদ্ধে জিহাদের চিন্তা-ফিকির ধারাবাহিকভাবে লক্ষ করা গেছে।

পাঁচ. নিজেদের চেয়ে অনেক গুণ বেশি সংখ্যক নিয়মতান্ত্রিক সশস্ত্র বাহিনীর বিরুদ্ধে খুবই সামান্য শক্তি সামর্থ্য ও প্রস্তুতি নিয়েই তাঁরা জিহাদের ময়দানে অবতীর্ণ হন। জিহাদের সামগ্রীর স্বল্পতা, জনশক্তির স্বল্পতা এবং কোনো কোনো আলেমের দ্বিমত ও বিরোধিতাও তাঁদেরকে তাঁদের ফরয দায়িত্ব আদায় থেকে বাধা দিয়ে রাখতে পারেনি। তাদের কাছে ফরয দায়িত্ব আদায় করাটাই সবচেয়ে বড় বিষয় ছিল।

ছয়. বাহ্যিক পরাজয়ের পরও জিহাদের চিন্তা তাঁরা তাঁদের মাথা থেকে ফেলে দেননি। বরং সে উদ্দেশ্যেই তাঁরা আত্মগোপন করেন। সে জিহাদি কার্যক্রমকে জারি রাখার জন্য তাঁরা হিজরত করেন। দেশান্তর হন, শাস্তি ভোগ করেন, শাহাদাতকে গলায় জড়িয়ে নেন। কিন্তু কোনো অবস্থাতেই তাঁরা কাফেরদের সাথে সমোঝতা করেননি।

হিন্দুস্তান তখনও পর্যন্ত দারুল হারব হিসাবে যথারীতি বহাল থাকে। দারুল ইসলাম হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি তখনও পর্যন্ত সামনে আসেনি।

দ্বিতীয় ভাগ: মোগল সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি থেকে ভারতের স্বাধীনতা ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত

(১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ)

এখন হিন্দুস্তান থেকে মোগল শাসন বিলুপ্ত হয়ে গেছে। শুধু নামের রাজত্ব যতটুকু অবশিষ্ট ছিল এখন তাও নেই। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে গণহারে হত্যা ও দেশান্তরের পর ইংরেজরা নিশ্চিন্ত হতে পেরেছে যে, তাদের বিরুদ্ধে এখন এমন আর কোনো শক্তি অবশিষ্ট নেই যা তাদের অগ্রযাত্রাকে বাধা দিতে পারে। মোগল সাম্রাজ্যের সর্বশেষ বাদশাহ বাহাদুর শাহ যফরকে গ্রেফতার করে দেশান্তর করে রেঙ্গুনে পাঠিয়ে দেয়া হয়। মুসলিম মুজাহিদ ও সেনাপতিদের কাউকে ফাঁসি দেয়া হয়, কাউকে দেশান্তর করা হয়। আর এভাবে ইংরেজরা তাদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের সম্ভাব্য সকল জড় ও শিকড় উপড়ে ফেলে দেয়।

এতদিন পর্যন্ত তো ইংরেজরা একটি কোম্পানির শিরোনামের অধীনে নিজেদের সকল কার্যক্রম জারি রেখেছিল। কিন্তু ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের গণহত্যার পর তারা নিজেদেরকে সফল মনে করতে শুরু করেছে। আর তখন হিন্দুস্তানের শাসন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি থেকে সরাসরি ব্রিটিশ রাজত্বে পরিণত হয়ে যায়। ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে রানি ভিক্টোরিয়া যখন হিন্দুস্তানের শাসন নিজের হাতে নিয়েছে, আর তখনই হিন্দুস্তান সরকারিভাবে ব্রিটিশ রাজ্যের অধীনে চলে যায়। প্রায় একশত বছর ব্রিটিশ রাজত্ব হিন্দুস্তানের উপর চেপে বসে ছিল। তাদের এ আগ্রাসন দারুল হারবের অবস্থানকে দারুল হারব হিসাবে মধ্যম স্তর থেকে সর্বশীর্ষ পর্যায়ে পৌঁছে দেয়। একটি দারুল হারব ও দারুল কুফর হিসাবে ব্রিটিশ সরকার হিন্দুস্তানে কুফরের বাজারকেই গরম করে এবং মুসলমানদের ঈমান, আকায়েদ, আমল, চিন্তা-চেতনা ও শিক্ষা-দীক্ষার সকল শাখা প্রশাখাকে নির্মূল করার জন্য কার্যকরী পদক্ষেপসমূহ গ্রহণ করে। এমনিভাবে ইলমের যেসব কেন্দ্র থেকে ইসলাম ও ইসলামিয়াতের শিক্ষা ও প্রচার হত, সেসকল ইলমী মারকাযকে প্রভাবহীন ও ফায়দাহীন বানানোর সকল অপচেষ্টা চালু রাখে।

এখন আমরা দেখার চেষ্টা করবো, এ সময়কালে মুসলিম নেতৃবৃন্দ ও মুজাহিদগণ কী করছিলেন এবং এ শত বছর যাবৎ তাঁদের কর্মকাণ্ড কী ছিল। আমরা ইতিহাসের শুধু সে অংশগুলোই তুলে আনার চেষ্টা করবো যা আমাদের বিষয়বস্তুর সাথে যুক্ত। আল্লাহ তাওফীকদাতা।

উম্মতের রাহবারগণের কর্মকাণ্ড

দিল্লির উলামা মাশায়েখ: দিল্লির ওয়ালীউল্লাহী খানদানের যে ঝাণ্ডা শাহ ইসহাক রহিমাহুল্লাহ-এর হাতে ছিল, তা তাঁর শাগরেদগণের মাধ্যমে সব সময় বুলন্দ ছিল। তাঁদের মধ্যে শাহ আব্দুল গনী মুজাদ্দেদী, মাওলানা মামলুক আলী নানুতাবী, মিয়াঁ নযীর হোসাইন দেহলভী ও হাজী ইমদাদুল্লাহ মুহাজিরে মক্কী রহিমাহুল্লাহ আজমাঈনের নাম শীর্ষে রয়েছে।

আকাবিরে দেওবন্দ: ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে আযাদি আন্দোলনে পরাজয়ের পর হাজী ইমদাদুল্লাহ সাহেব রহিমাহুল্লাহ মক্কা মুকাররামা অভিমুখে রওয়ানা হন এবং অস্বাভাবিক কষ্ট ও পেরেশানি অতিক্রম করে মক্কা মুকাররামায় অবস্থান করেই জীবনের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত হিন্দুস্তানে আন্দোলনের নেতৃত্ব দিতে থাকেন। -উলামায়ে হিন্দ কা শানদার মাযী খণ্ড: ৪, পৃ: ২৮৬।

এছাড়া মাওলানা রশীদ আহমাদ গাঙ্গুহী, মাওলানা কাসেম নানুতবী, মাওলানা ইয়াকুব নানুতবী রহিমাহুল্লাহ ও তাঁদের সমকালীন ও সমমনা উলামায়ে কেরাম নিজ নিজ শক্তি সামর্থ্য অনুযায়ী ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠা ও বহাল রাখার জন্য চেষ্টা-প্রচেষ্টা করতে থাকেন।

তাঁরা হচ্ছেন সেসকল মহান ব্যক্তি যাদের সাথে আমাদের ইলমী সূত্র যুক্ত এবং যাঁদের চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও ত্যাগের বিনিময়ে আমরা ইলম, আমল ও জিহাদের ময়দানের সাথে সম্পৃক্ত হতে পেরেছি। এসকল উলামায়ে কেরাম ব্যতীত হিন্দুস্তানের বিভিন্ন অংশে বিভিন্ন চিন্তা-চেতনার মুসলিমগণ হিন্দুস্তানের আযাদি এবং হিন্দুস্তানে ইসলামী শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য বিভিন্নভাবে চেষ্টা প্রচেষ্টা করতে থাকেন। যাঁদের ফিরিস্তি অনেক দীর্ঘ এবং যাদের সবার উল্লেখ সম্ভব নয়।

মিল্লাতের অন্য মুজাহিদগণ: সাইয়েদ আহমদ শহীদ বেরেলভী রহিমাহুল্লাহ-এর জিহাদি কাফেলা বিভিন্ন শাখায় ভাগ হয়ে জিহাদের ময়দানে নিজেদের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকেন। মাওলানা বেলায়েত আলী ও মাওলানা ইনায়েত আলীর অনুসারীদের মধ্য হতে সাদেকপুরী উলামায়ে কেরাম নিজেদের এলাকায় এ চেষ্টা চালু রাখেন। মাওলানা কারামত আলী জৌনপুরীর অনুসারীগণ নিজেদের এলাকায় চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে থাকেন। মীর নেসারুদ্দীন তিতুমীরের অনুসারীরা নিজেদের হিম্মত ও দৃঢ়তা অনুযায়ী লড়াই করতে থাকেন। হাজী শরীয়াতুল্লাহর স্থলাভিষিক্ত ব্যক্তিবর্গ তাঁদের সাধ্যানুযায়ী ইসলামী শরীয়ত প্রতিষ্ঠার চেষ্টায় অংশগ্রহণ করেন। মোটকথা যাঁর কাছে যতটুকু উপায়-উপকরণ ছিল তিনি তাই কাজে লাগিয়ে দুশমনকে প্রতিহত করার জন্য কাজ করতে থাকেন।

একটি অনস্বীকার্য বাস্তবতা

এখানে একটি বাস্তবতা মেনে নিতেই হবে যে, ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দে সংঘটিত ঘটনাবলির পরে সুদীর্ঘ সময়কাল পর্যন্ত পুরা হিন্দুস্তানে এক ধরনের নীরবতা বিরাজ করছিল। যে কাফেলাগুলো তখনও পর্যন্ত উদ্দীপ্ত ছিল পূর্ববর্তী সে উদ্দীপনার সাথে এখন আর তাদেরকে দেখা যাচ্ছিলো না। মুসলমানদের পক্ষ থেকে আক্রমণ বন্ধ হয়ে যাওয়ার কারণে ইসলামের দুশমন ইংরেজরা কিছুটা নিশ্চিন্ত হয়ে যাচ্ছিলো। তারা জীবন চলার পথে প্রতিদিন যেসকল আশঙ্কার মুখোমুখি হতে হত, সেসব আশঙ্কা এখন আর একেবারেই নেই।

কিন্তু এর অর্থ কখনও এটা নয় যে, মুসলিম মুজাহিদগণ তাঁদের যিম্মাদারীর কথা ভুলে বসে ছিলেন। কেননা পরবর্তী ইতিহাস এ কথা বলে যে, কাফেরদের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের যে স্ফুলিঙ্গ তাঁদের বুকের ভেতর লুকিয়ে ছিল তা কখনও নিভে যায়নি। বরং পরিস্থিতি গুছিয়ে আনা পর্যন্ত লুকিয়ে রাখা হয়েছিল। আর এমনও হয়নি যে, ইসলামের পথের মুজাহিদগণ তখন অবসর বসে ছিলেন; বরং সময়ের চাহিদা ও প্রয়োজন অনুযায়ী আরও যেসব প্রস্তুতি নেওয়া সম্ভব ছিল সেসব প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাঁরা শুধু তাঁদের পদ্ধতি পরিবর্তন করেছিলেন। এই যা।

আমরা এ কথা বুঝতে পারি যে, সে সময়ে মুজাহিদগণ সামরিক কার্যক্রম থেকে বিরত থাকাটা বিনা কারণে ছিল না এবং এ কারণে তাদেরকে সমালোচনার পাত্র বানানোর সুযোগ নেই। তবে এ কথা বলা যায় যে, সাধারণ মুসলমানরা যদি মুজাহিদগণকে পরিপূর্ণভাবে সব ধরনের সাহায্য ও সহযোগিতা করতো এবং অন্যান্য মুসলিম দেশও যদি হিন্দুস্তানকে গোলামির এ অবস্থা থেকে বের করে আনার ক্ষেত্রে চেষ্টা-প্রচেষ্টা ব্যয় করতো, তাহলে ইতিহাসের চিত্র হয়তো ভিন্ন রকম হতো।

এ পর্যায়ে আরেকটি বিষয়ও মনে রাখা চাই। বিষয়টি হচ্ছে, উলামায়ে কেরাম দরসে হাদীসে মাশগুল হয়ে যাওয়া একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ দ্বীনি খেদমত। কিন্তু তা জিহাদ নয়। মুসলিমরা যদি দাওয়াত ও তাবলীগের কাজে লেগে যায় তাহলে তাও দ্বীনের একটি জরুরি কাজ। কিন্তু তা জিহাদ নয়। যদি কেউ ইসলাহে নফস ও তাযকিয়ামূলক কাজে সময় ব্যয় করতে শুরু করেন তাহলে সেটিও একটি দ্বীনের কাজ। যা কাম্য, কিন্তু তা জিহাদ নয়। দ্বীনি কাজের এ বিভাগগুলো যেমনিভাবে জিহাদ নয়, তেমনিভাবে এ কাজগুলো তার সাধারণ হালাতে জিহাদের প্রস্তুতিরও অন্তর্ভুক্ত হয় না। সুতরাং এ কাজগুলো وأعدوا لهم ما استطعتم “আর তোমরা যথাসাধ্য শক্তি অর্জন এবং প্রস্তুতি গ্রহণ করো” সূরা আনফালের ষাট নম্বর আয়াতের বাস্তবায়নও নয়। তবে হিন্দুস্তানের বিশেষ এ পর্বের দিকে তাকালে পরবর্তী ইতিহাস এ কথা প্রমাণ করে যে, সে সকল মুজাহিদের হাদীসের দরসের ব্যস্ততা, দাওয়াত ও তাবলীগ এবং ইসলাহ ও তাযকিয়ার চেষ্টা প্রচেষ্টা মূলত জিহাদের জন্য রাস্তা তালাশের খাতিরেই ছিল। তাঁরা বাহ্যিকভাবে নিজেদেরকে এমন সব কাজে ব্যস্ত থাকা প্রকাশ করতে চাইতেন, যা ব্রিটিশ রাজত্বের জন্য সরাসরি কোনো হুমকি ছিল না। যার ফলে এসকল তালীম-তাআল্লুম এবং দাওয়াত ও তাবলীগের বরকতে দুই তিন দশক পর এমন সব কার্যক্রম সামনে এসেছে যা হঠাৎ করে এত স্বল্প সময়ের প্রচেষ্টায় সংঘটিত হওয়া সম্ভব ছিল না।

আকাবির উলামায়ে কেরাম জিহাদ ব্যতীত আরও যে সকল শিরোনামে ইমারতে ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠার জন্য কাজ করে গেছেন এবং এর জন্য আরও যেসকল চেষ্টা প্রচেষ্টা করেন, তার সংক্ষিপ্ত কিছু এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করবো ইনশাআল্লাহ।

শামেলী যুদ্ধের পর

শামেলী যুদ্ধ এবং মোগল সাম্রাজ্য পতনের প্রায় নয় বছর পর শামেলী ময়দানের সফল মুজাহিদ মাওলানা কাসেম নানুতবী রহিমাহুল্লাহ ১৮৬৬ খ্রিস্টাব্দে দারুল উলুম দেওবন্দ প্রতিষ্ঠা করেন। দারুল উলুম দেওবন্দে অন্যান্য শাস্ত্র ছাড়াও দরসে হাদীসের অনেক গুরুত্ব ছিল। এ মাদরাসার প্রথম তালিবে ইলম হলেন মাহমুদ হাসান, যিনি পরবর্তীতে শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী নামে প্রসিদ্ধ হন।

শায়খুল হিন্দ মাওলানা মাহমুদ হাসান দেওবন্দী রহিমাহুল্লাহ

শায়খুল হিন্দ রহিমাহুল্লাহ জিহাদ ও খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য যেসকল কার্যক্রম সম্পাদন করেন, আপনি বলতে পারেন, সেসকল চিন্তা-চেতনার উৎস মূলত শামেলী রণাঙ্গনের মুজাহিদগণ। শায়খুল হিন্দ রহিমাহুল্লাহ ইলমী প্রজ্ঞা, চিন্তাগত উৎকর্ষতা ও জিহাদের জযবা সরাসরি সেসকল ব্যক্তি থেকে গ্রহণ করেন যারা তাঁদের সব শক্তি সামর্থ্য শামেলীর ময়দানে আল্লাহর রাস্তায় পেশ করে দিয়েছেন। সাইয়েদুত তায়েফা হাজী সাহেব (মৃ:১৮৯৯খ্রি.), মাওলানা গাঙ্গুহী (মৃ:১৯০৫খ্রি.) ও মাওলানা কাসেম নানুতবী (মৃ:১৮৮০খ্রি.) রহিমাহুল্লাহ -এ তিন মহান ব্যক্তির প্রত্যেকের কাছ থেকে বিভিন্ন দ্বীনি ইলম শেখার সুযোগ তিনি পান। যার ফলে তাঁর চিন্তা-চেতনা ও কর্মকাণ্ডের সেসব সন্দেহ ও অস্পষ্টতা প্রবেশ করতে পারেনি, যা গণতন্ত্রের ফাসাদ এবং দেশীয় জাতীয়তাবাদ ও গোঁড়ামির নষ্টামির মাধ্যমে রাজনৈতিক চিন্তা-চেতনার মাঝে প্রবেশ করেছে।

শায়খুল হিন্দ রহিমাহুল্লাহ ১৮৬৬খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯০৫খ্রিস্টাব্দ প্রায় চল্লিশ বছরের দীর্ঘ সময় পর্যন্ত এ সৎসঙ্গ থেকে উপকৃত হতে থাকেন যা খালেস ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য একমাত্র কর্মপদ্ধতি জিহাদ ও কিতাল ফী সাবীলিল্লাহর চিন্তা-চেতনার মাধ্যমে প্রকাশিত হয়। যা কিতাবুল্লাহ ও সুন্নতে রাসূলের বাতলানো পদ্ধতিতে ঢেলে সাজানো ছিল। আর এ কারণেই সে সকল ব্যক্তি সাম্রাজ্যবাদী ইংরেজদের মতো বড় শক্তির বিরুদ্ধে লড়াই করতেও কোনোপ্রকার দ্বিধাবোধ করেননি এবং সহায় সম্বলহীন অবস্থায়ও নিজেদের দায়িত্ব আদায়ে অবহেলাকে কোনোপ্রকার প্রশ্রয় দেননি।

আর ১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দের পরবর্তী সময়গুলো যাকে আমরা নীরবতার সময় বলে আখ্যা দিয়েছি, যা মূলত নীরবতার সময়কাল ছিল না; বরং সে সময়ে গোপনভাবে গেরিলা পদ্ধতিতে খিলাফত প্রতিষ্ঠা ও জিহাদের প্রস্তুতি চলছিল, সে সময়গুলোতে শায়খুল হিন্দ রহিমাহুল্লাহ সে সকল মহান ব্যক্তির সান্নিধ্যের বরকতে হাদীসের দরসগাহগুলোতে, তাযকিয়ার খানকাগুলোতে এবং দাওয়াত ও তাবলীগের শিরোনামে নিজের যিম্মাদারি আদায় করেন।

শায়খুল হিন্দের কর্মপদ্ধতি

বাহ্যিক নিষ্ক্রিয়তার এই সুদীর্ঘ সময় অতিক্রম করার পর শায়খুল হিন্দ রহিমাহুল্লাহ আত্মপ্রকাশ করেন। তিনি তাঁর আকাবির পূর্বসূরিগণের ত্যাগ ও কুরবানীর ফল সংগ্রহ করার জন্য মৌলিকভাবে তিনটি পদক্ষেপ গ্রহণ করেন। প্রথমত, কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াই করার জন্য হিন্দুস্তানের মুসলমানদেরকে প্রস্তুত করা। দ্বিতীয়ত, তাঁর আত্মার সন্তান অর্থাৎ শাগরেদগণের মাঝে দ্বীনের মূল রূপ জাগিয়ে তোলা এবং তাঁদেরকে তাঁদের দায়িত্ব ও ফরয যিম্মাদারির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা। তৃতীয়ত, পৃথিবীর সকল মুসলিম দেশকে এক সারিতে এনে খিলাফতে উসমানিয়াকে সাহায্য করা এবং কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদে উদ্বুদ্ধ করা। মূলত এটাই সেই উত্তরাধিকার যা তিনি তাঁর আকাবির পূর্বসূরিদের থেকে পেয়েছেন এবং এটাই সে স্ফুলিঙ্গ ছিল, যা থেকে তিনি জিহাদের বাতি প্রজ্বলিত করেন।

শায়খুল হিন্দ রহিমাহুল্লাহ তাঁর এ তিনটি পদক্ষেপ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে প্রথমটির জন্য আযাদ হিন্দ এবং দ্বিতীয়টির জন্য জমইয়াতুল আনসার শিরোনামে কাজ শুরু করেন, আর তৃতীয় পদক্ষেপের জন্য বাইরের দেশগুলো সফর করেন। এ তিনটি পদক্ষেপের সংক্ষিপ্ত ছক দেখুন।

নুযহাতুল খাওয়াতিরের বিবরণ

শায়খুল হিন্দ রহিমাহুল্লাহ-এর তিনটি পদক্ষেপের সংক্ষিপ্ত ছক আপনি নুযহাতুল খাওয়াতির-এর এ ইবারতে পেয়ে যাবেন-

وكان قد وضع خطة لتحرير الهند من حكم الإنجليز، كان يريد أن يستعين فيها بالحكومة الأفغانية والخلافة العثمانية، وهيأ لها جماعة من تلاميذه وممن يثق بهم من أصحابه، وكان في مقدمتهم المولوي عبيد الله السندي، وأرسله إلى أفغانستان، وكان الاتصال بينه وبين تلاميذه وأصحابه في الحدود الشمالية وفي أفغانستان، ولما تم لهم بعض ذلك ومهدوا الأرض للثورة واشتدت عليه الرقابةفي الهند سافر إلى الحجاز سنة ثلاث وثلاثين وثلاثمائة وألف، وأقام بمكة وقابل غالب باشا الوالي التركي سراً، ثم سافر إلى المدينة المنورة وقابل أنور باشا وزير الحربية وجمال باشا القائد العام للجيش العثماني الرابع حين زار المدينة المنورة، وفاوضهما في طرق إعانة المسلمين في الهند ونفي الإنجليز منه، وأخذ منهما رسالة سرية إلى الشعب الهندي، والوعد بتأييد القضية الهندية، وحمل أهل الهند على مساعدة الشيخ محمود حسن والاعتماد عليه، وأخذت صور هذه الوثيقة، وقرر تسريبها إلى الهند وأفغانستان بطريقة سرية، واشتهرت فيها بعد بالرسائل الحريرية وصلت إلى الهند، وأراد الشيخ محمود حسن أن يصل إلى الحدود الشمالية الحرة بين أفغانستان والهند عن طريق إيران فسافر إلى الطائف، ورجع إلى مكة وأقام بها مدة، ودرس في صحيح البخاري وحج، وكان ذلك سنة أربع وثلاثين وثلاثمائة وألف. واكتشفت الحكومة الإنجليزية المؤامرة، وعرفت قضية الرسائل الحريرية، فصرفت عنايتها إلى القبض على زعيم هذه الحركة وقطب رحاها، وكان الشريف حسين أمير مكة قد خرج عن الدولة المتبوعة العثمانية، وثار عليها بتحريض الدولة الإنكليزية فأوعزت إلى الشريف بإلقاء القبض عليه وتسليمه إلى الحكومة الإنجليزية، فألقي القبض عليه في صفر سنة خمس وثلاثين وثلاثمائة وألف، ومعه المولوي حسين أحمد الفيض آبادي والحكيم نصرت حسين الكوروي والمولوي عزيز كل والمولوي وحيد أحمد، وسفر هؤلاء في الثامن عشر من ربيع الأول سنة خمس وثلاثين وثلاثمائة وألف إلى مصر ومنها إلى مالطه حيث وصلوا سلخ ربيع الآخر سنة خمس وثلاثين وثلاثمائة وألف.

نزهة الخواطر لعبد الحي الحسني المتوفى سنة1341 ه، ص1378:، دار ابن حزم بيروت الطبعة الأولى1420 ه1999 عـ

 

‘নুযহাতুল খাওয়াতির’-এর এ বিবরণ থেকে জানা যায়, তিনি প্রথমে হিন্দুস্তানের মুসলমানদের অন্তরে আগ্রাসী কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদের জযবা সৃষ্টি করার চেষ্টা করেন। এরপর এ প্রচেষ্টাকে একটি বিশেষ বিন্যাসে বিন্যস্ত করে মূল উদ্দেশ্যকে নববী পদ্ধতি ও মাসুর পদ্ধতিতে বাস্তবায়ন করার জন্য মুজাহিদ সংগ্রহ করেন। আফগানিস্তান ও সীমান্ত এলাকাগুলো থেকে তাঁর শাগরেদ ও ভক্ত মুরিদগণের মাধ্যমে এ কাজটি এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করেন। কাফেরদের বিরুদ্ধে এ দুটি ফ্রন্টকে একটি পর্যায়ে প্রস্তুত করার পর বাইরের দেশগুলোতে সফর শুরু করেন। আর সে সফরে তিনি মুসলিম বিশ্বের দায়িত্বশীল ও নেতৃবৃন্দের সাথে সম্পর্ক স্থাপন করার চেষ্টা করেন। বিশেষভাবে খিলাফতে উসমানিয়া তুর্কী যা তখন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় ইসলামী হুকুমত ও দারুল ইসলাম ছিল, তার দায়িত্বশীল ব্যক্তিবর্গের সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য বিশেষভাবে চেষ্টা করেন এবং তিনি সে প্রচেষ্টায় উল্লেখযোগ্য পর্যায়ে সফলও হন। উসমানী খিলাফতের প্রভাবশালী দায়িত্বশীলগণের সাথে তিনি সাক্ষাৎ করেন, সমস্ত সুরতহাল তুলে ধরেন এবং নিজের পদক্ষেপ ও পরিকল্পনার বিন্যাস ও ছক তাঁদের সামনে পেশ করেন। সম্মিলিতভাবে কাজ করার বিষয়ে উভয়পক্ষ ঐক্যমতে পৌঁছান। মুসলমানদের এ আন্তর্জাতিক সমস্যা সমাধান করার জন্য আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজ শুরু হয়। শায়খুল হিন্দ রহিমাহুল্লাহ-এর জীবনী গ্রন্থগুলোতে আপনি এর বিস্তারিত বিবরণ পাবেন। এমনিভাবে শায়খুল ইসলাম হোসাইন আহমদ মাদানী রহিমাহুল্লাহ রচিত ‘নকশে হায়াত’ কিতাবেও এর বিস্তারিত বিবরণ দেখা যেতে পারে।

গাদ্দার ও মুনাফিক সব জায়গাতেই থাকে

‘নুযহাতুল খাওয়াতির’-এর বক্তব্য থেকে আপনি এ কথাও জানবেন যে, গাদ্দারদের গাদ্দারির কারণে এ সকল পরিকল্পনা ইংরেজদের হাতে চলে যায় এবং এ বৈশ্বিক চিন্তা-চেতনার প্রাণ পুরুষ শায়খুল হিন্দ রহিমাহুল্লাহকে গ্রেফতার করার জন্য ইংরেজ সর্ববিদ চেষ্টা শুরু করে দেয়। মক্কার আমীর শরীফ হোসাইন ইংরেজদের ইঙ্গিতে শায়খুল হিন্দকে গ্রেফতার করে ইংরেজদের হাতে তুলে দেয়, যারা তাঁকে দীর্ঘকালব্যাপী মাল্টার দ্বীপে বন্দী করে রাখে।

কথা সংক্ষেপ করতে চাচ্ছি, কিন্তু বিষয়টিই এমন যে, কিছু কথা না বলে সুরতহাল স্পষ্ট করা একটু জটিল মনে হচ্ছে। মাল্টার দ্বীপে শায়খুল হিন্দের সঙ্গে আরও অন্যান্য উলামায়ে কেরামও বন্দী জীবন কাটান। সেসব উলামায়ে কেরামের মধ্যে মাওলানা হোসাইন আহমদ মাদানী রহিমাহুল্লাহ অন্যতম, যিনি তাঁর শায়খের সাথে মাল্টায় বন্দী ছিলেন।

১৯১৭ থেকে ১৯২০ পর্যন্ত সময়কালে প্রায় তিন বছর এ বন্দীদশা বলবৎ ছিল। এ সময়টি শায়খুল হিন্দ রহিমাহুল্লাহ-এর জীবনের শেষ পর্ব ছিল এবং সিদ্ধান্তমূলক পর্বও ছিল। যে সময়ে তিনি তাঁর জীবনের সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টাকে একটি ফলাফলের দিকে নিয়ে যেতে প্রয়াসী হন। বিশ্বের একজন যিম্মাদার হিসাবে তিনি নিজ দেশের সাধারণ মুসলমানদেরকে কাফেরদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে উদ্বুদ্ধ করেন, নিজের শাগরেদ ও ভক্ত মুরিদদেরকে কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার জন্য একটি বিশেষ বিন্যাসে বিন্যস্ত করেন এবং বিশ্বের মুসলিম দেশগুলোর প্রভাবশালী দায়িত্বশীলগণকে এ কাজের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করে বিশ্বব্যাপী একটি পরিকল্পনার ছকও আঁকেন। আর একে বাস্তবায়ন করার পর্বে এসে চেষ্টা-প্রচেষ্টায় রত অবস্থায় শত্রুর হাতে বন্দী হয়ে যান। বন্দী অবস্থায়ও যতটুকু সম্ভব নিজের এ চিন্তা-চেতনাকে ব্যাপকতা দান করার জন্য কাজ করতে থাকেন এবং অন্যদেরকেও এর জন্য উৎসাহ দিয়ে যেতে থাকেন।

শায়খুল হিন্দের চিন্তা-চেতনা এবং তাঁর কর্মকাণ্ডের উপর দৃষ্টিপাত করলে আপনি নববী পথ ও পদ্ধতির ঝলক দেখতে পাবেন। তিনি তাঁর চিন্তা-ভাবনায় পুরা উম্মতের যিম্মাদারি নিজের কাঁধে অনুভব করতেন। আর সে কারণেই তিনি সবাইকে সঙ্গে নিয়ে চলেছেন। এমন ব্যক্তি কখনও পরিস্থিতির শিকার হন না, পরিস্থিতির কারণে বিচলিত ও প্রভাবিত হন না এবং বড় থেকে বড় শক্তি দেখেও ঘাবড়ে যান না।

বন্দী থেকে মুক্তি পাওয়ার পর বিভিন্ন অসুস্থতায় আক্রান্ত হয়ে কয়েক মাস পরই তিনি ইন্তিকাল করেন। তিনি তাঁর অনুপস্থিতিতে আল্লাহর কালিমা বুলন্দ করা, খিলাফত পুনরুদ্ধার করা এবং দারুল হারবকে পুনরায় দারুল ইসলামে রূপান্তরিত করার জন্য জিহাদের একটি অনুসরণীয় উদাহরণ রেখে যান। আল্লাহ তাঁর সকল নেক চেষ্টা প্রচেষ্টাকে কবুল করুন।

***

 

 

 

[৩য় পর্ব-২য় ভাগ ]

ইতিহাসের উল্লিখিত অংশের সাথে আমরা যুক্ত

১৮৫৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত ইতিহাসের যে অংশটি আমরা উল্লেখ করে আসছি, তা সে ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত একটি অংশ এবং হিন্দুস্তানের লক্ষ লক্ষ বর্গ মাইল থেকে শুধু ছোট্ট একটি ভূখণ্ডের ইতিকথা যার সঙ্গে আমরা যুক্ত এবং যার সঙ্গে আমাদের দ্বীনি, ইলমী, ইসলাহী ও দাওয়াতী যোগসূত্র রয়েছে। এছাড়াও আরও শত শত কারগুজারি রয়েছে যা এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করার মতো। কিন্তু এখানে আমরা শুধু উদাহরণস্বরূপ কিছু তুলে ধরতে চাই, যা আমাদের মূল আলোচ্য বিষয়কে সুস্পষ্ট করার ক্ষেত্রে সাহায্য করবে।

ইতিহাসের এ অংশ এবং এ ধরনের অন্যান্য উদাহরণ থেকে নিম্নোক্ত কথাগুলো খুব স্পষ্টভাবে আমাদের সামনে উঠে আসে-

০১. মোগল সাম্রাজ্যের সম্পূর্ণ পতন এবং ইংরেজদের পরিপূর্ণ ক্ষমতা দখলের পরও দারুল ইসলাম পুনরায় প্রতিষ্ঠা করা এবং ইসলামী খিলাফত প্রতিষ্ঠা করার জন্য হিন্দুস্তানের আনাচে-কানাচে বিভিন্নভাবে চেষ্টা-প্রচেষ্টা চলমান থাকে।

০২. শায়খুল হিন্দ রহিমাহুল্লাহ-এর মৃত্যু, অর্থাৎ ১৯২০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত হিন্দুস্তান দারুল হারবই ছিল এবং তা পুনরায় দারুল ইসলামে রূপান্তরিত তথা পরিবর্তিত হওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়নি।

০৩. মুনাফিকরা তাদের নিফাক ও গাদ্দারিতে তৎপর রয়েছে।

০৪. দারুল উলুম দেওবন্দের প্রথম সারির সন্তান এবং প্রথম সারির মুখপাত্র হিসাবে, এমনিভাবে দারুল উলুম দেওবন্দের প্রতিষ্ঠাতাগণ ও শামেলীর ময়দানের মুজাহিদগণের একজন উপযুক্ত ওয়ারিস হিসাবে শায়খুল হিন্দ রহিমাহুল্লাহ পৃথিবীর মানুষদের সামনে এ কথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, দারুল উলুম দেওবন্দের সাথে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের দায়িত্ব কী, তাদের চিন্তা-ফিকির কোন পথে কোনভাবে চলবে এবং তাদের কর্মপদ্ধতি কী হবে?

মুসলিম বিশ্বে গণতন্ত্রের দুর্গন্ধ

আমরা এ কথা স্বীকার করি যে, শায়খুল হিন্দ রহিমাহুল্লাহর পর থেকে নববী পদ্ধতিতে সশস্ত্র জিহাদ ও কিতালের মাধ্যমে খিলাফত প্রতিষ্ঠার অনুসৃত পদ্ধতিতে কাজ করার চিন্তা-ফিকিরের মাঝে কিছুটা দুর্বলতা সৃষ্টি হয়ে গিয়েছিল। এ পর্যায়ে পাঠকবর্গ স্মরণ রাখা চাই যে, এটা সে সময়, যখন গণতন্ত্রের দুর্গন্ধ মুসলিম বিশ্বে ছড়িয়ে পড়ছিল এবং হিন্দুস্তানও সে দুর্গন্ধে প্রভাবিত ছিল। কাফেরদের সহস্র অপকর্মের মাঝে গণতন্ত্রের অসারতা বিশেষভাবে অনুভব হত না। কিন্তু মুসলমানদের স্বচ্ছ সুন্দর দ্বীন এবং পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন শরীয়তের মাঝে এ গণতন্ত্র প্রাণবিনাশী বিষ হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

কামাল আতাতুর্কের মতো মুলহিদ-মুরতাদ ও ইসলামের নিকৃষ্টতম শত্রু আত্মপ্রকাশ করে এবং ইসলামী খিলাফতকে শিকড়সহ উপড়ে ফেলার জন্য গণতন্ত্রের কৌশল ব্যবহার করে। কাফের বন্ধুদের মাধ্যমে সে আপন লক্ষ্যে অগ্রসর হয়। যেসব জাহেলি প্রথা-প্রচলনকে ইসলাম পায়ে পিষে ফেলেছিল, এই খবিস সেসব জাহেলি প্রথা-প্রচলনকে গণতন্ত্রের ছত্র ছায়ায় আবার জাগিয়ে তোলার চেষ্টা করেছে এবং ইসলামের সকল নিশানা ও চিহ্নকে বিলুপ্ত করে দেওয়ার জন্য সব ধরনের পথ ও পদ্ধতি গ্রহণ করে।

যাই হোক, এ উপাখ্যান অনেক দীর্ঘ। আমরা এর বিবরণে জড়াতে চাই না। শুধু পৃথিবীর তৎকালীন চলমান অবস্থার একটি চিত্র পাঠকবর্গের সামনে তুলে ধরা উদ্দেশ্যেই প্রাসঙ্গিকভাবে এসব ব্যক্ত করলাম। যাতে সংশ্লিষ্ট কথাগুলো বোঝা সহজ হয়।

একটি দুঃখজনক বাস্তবতা

এ সময়ের আরেকটি দুঃখজনক বাস্তবতা দৃশ্যমান, যা স্বীকার না করে কোনো উপায় নেই। তা হচ্ছে, শায়খুল হিন্দ রহিমাহুল্লাহর শেষ যমানা পর্যন্ত রাজনীতি, নেতৃত্ব, ইসলামী শরীয়তের প্রয়োগ, খিলাফত ও ইসলামী ইমারতের প্রতিষ্ঠা ইত্যাদি বিষয়ের ফরিযা ও দায়িত্ব একটি শরঈ যিম্মাদারী ও দায়িত্ব হিসাবে উলামায়ে কেরাম ও দাঈ ও শরীয়তের রাহবারগণ শতভাগ নিজেদের হাতে রেখেছেন এবং নিজেদের নিয়ন্ত্রণে পরিচালনা করেছেন। তখন প্রতিটি বিষয়কে তাঁরা শুধু এবং শুধুই কুরআন ও সুন্নাহর দৃষ্টিতে দেখতেন।

শরীয়তের মানদণ্ডে বিচার করতেন এবং শরীয়তের দৃষ্টিতে যা সঠিক মনে করতেন তা বাস্তবায়ন করতেন, এর বিপরীত সব কিছুকে ত্যাগ করতেন। তখন সকল কিছুর কেন্দ্রবিন্দু একমাত্র শরীয়তই ছিল। আর তারই আলোকে সকল সিদ্ধান্ত গৃহীত হত। শরীয়তের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করা হতো না এবং শরীয়তের বাতলানো সীমানাকেই নিজেদের বিচরণের সীমানা হিসাবে মেনে নিতেন।

কিন্তু এর পরবর্তীতে অবস্থা কিছুটা এমন হয় যে, বলা যায়, উলামায়ে কেরাম এবং সত্য দ্বীনের রাহবারগণ সত্য বলা, জান কুরবান করা, জিহাদের জযবা ও উদ্দীপনা, শরীয়তের আনুগত্য, মোটকথা সর্বক্ষেত্রে শরঈ যিম্মাদারীর প্রাপ্য হক তাঁরা আদায় করতে থাকেন, কিন্তু ধীরে ধীরে নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব তাঁদের হাত থেকে বের হয়ে যেতে থাকে।

মাশায়েখে ইসলাম ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ

তৎকালীন নেতৃত্বশীলরা নিজেদেরকে একজন মুসলিম রাহবার মনে করে, মুসলিম রাহবার হিসাবে পরিচয় দেয়ার পরিবর্তে একজন সফল নেতা হিসাবে পরিচয় দিতে বেশি পছন্দ করতো। এসব নেতার মধ্য থেকে যারা মুসলিম ছিল, তারা দ্বীন ও শরীয়তকে সম্মান করত, নিজের ধর্মকে ভালোবাসতো এবং তার উপর আমলও করত, ইসলামের পক্ষে তাদের অসংখ্য অবদানও রয়েছে। কিন্তু তারা সকল ক্ষেত্রে ইসলামী শরীয়তকে হাকেম তথা সিদ্ধান্তদাতা হিসাবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল না। তারা সামাজিক, রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক বিষয়গুলোকে কুরআন ও সুন্নাহের আলোকে সমাধান দেওয়ার প্রতি আগ্রহী ছিল না। তাদের কথাবার্তা ও চিন্তা-চেতনায় কুরআন-হাদীস ও দ্বীন-শরীয়তের কোনো প্রভাব দেখা যেত না।

তারা উলামায়ে কেরাম ও মুসলমানদের দ্বীনি রাহবারগণের জযবা ও উদ্দীপনাকে নিজেদের পার্থিব চিন্তা-চেতনা ও লক্ষ্যগামী করায় প্রয়াসী ছিল। দুনিয়াবি নেতা হিসাবে যেসব চিন্তা-ভাবধারা ও পদক্ষেপের মধ্যে তারা সম্পৃক্ত ছিল এবং যেসব চেষ্টা-প্রচেষ্টায় তারা লিপ্ত ছিল, সেসবের জন্য দ্বীন ও শরীয়তের কিছু বহাল থাকুক অথবা না থাকুক, তা নিয়ে তাদের কোনো ফিকির ছিল না। এরূপ ছিল তাদের কর্মকাণ্ড ও পদক্ষেপের বাস্তবতা।

যাই হোক এ পর্যায়ে আমি দুটি কথা পেশ করছিলাম-

* একটি হচ্ছে, শায়খুল হিন্দ রহিমাহুল্লাহর পর কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদের বিষয়টি এমন কিছু মানুষের হাতে পর্যবসিত হয়, যারা রাজনৈতিক নেতা হলেও মূলত তারা মুসলমানদের রাহবার ছিল না। তারা ইংরেজদের থেকে হিন্দুস্তানকে স্বাধীন করতে চাইতো, কিন্তু কাফেরদের থেকে মুসলমানদেরকে স্বাধীন করতে চাইতো না। তারা কাফেরদের আধিপত্য খতম করতে চাইতো, কিন্তু কুরআন ও সুন্নাহর আইন তথা ইসলামী শরীয়তের পরিপূর্ণ বাস্তবায়ন চাইতো না। এটা ঠিক যে, তারা ব্রিটিশ সাম্রাজ্য চাইতো না, কিন্তু তারা ইসলামী খিলাফতও চাইতো না। তারা ইংরেজদের শাসন থেকে হিন্দুস্তানকে মুক্ত করতে প্রয়াসী, কিন্তু সেই হিন্দুস্তানকে দারুল ইসলাম বানাতে চাইতো না। এগুলো ছিল তাদের পদক্ষেপ-কর্মকাণ্ডের প্রয়াস পরিসর। এটি হচ্ছে প্রথম কথা।

* আমি দ্বিতীয় যে কথাটি বলছিলাম তা হচ্ছে, এ পরিস্থিতিতে উলামায়ে কেরাম ও উম্মতের রাহবারগণ কিছুটা অসহায় হয়ে পড়েন। কেউ তো ভালো কিছুর আশায় পেরেশান হয়ে পড়েন। কোনো না কোনোভাবে মুসলমানদের জন্য কিছু করতে চাইতেন। কেউ কেউ নেতাদের চাপাবাজিতে ধোঁকা খেয়ে প্রতারিত হন। কেউ নিজেদের দাবি আদায়ের বিষয়ে নিজেদের উপর আত্মবিশ্বাসী ছিলেন। আর কেউ সেসব নেতার হাতে নেতৃত্ব সঁপে দেওয়া ব্যতীত আর কোনো পথ খুঁজে পাচ্ছিলেন না। আর এগুলো ছিল উলামায়ে কেরাম ও উম্মতের রাহবারদের অসহায় দশার ফিরিস্তি।

মূলত বাস্তবতা এই দাঁড়ায় যে, খিলাফত-রাজনীতি ও নেতৃত্বের বিষয়গুলোতে উলামায়ে কেরাম এক প্রকার বিরক্ত হয়ে উঠছিলেন। আর বিরক্তির ছাপ তাঁদের মাঝে প্রকাশ পাচ্ছিলো। সেই সঙ্গে রাজনীতি ও ইমারতের বিষয়াদিতে তাঁদের আগ্রহ-উদ্দীপনা অবনতির দিকে যাচ্ছিলো। বলা যায়, শায়খুল হিন্দ রহিমাহুল্লাহর পর থেকে অধঃপতনের এ পরিস্থিতি তিনটি পর্বে তার চূড়ান্ত স্তরে গিয়ে পৌঁছেছে।

প্রথম পর্ব ছিল: অধিকার ও দাবির সাথে নিজেদের হক আদায় করা। এ পর্বে হিন্দুস্তানের স্বাধীনতা পর্যন্ত চেষ্টা প্রচেষ্টা চালু ছিল।

দ্বিতীয় পর্ব: অনুরোধ আবেদন-নিবেদন ও আবদার করে নিজেদের হক আদায় করা। হিন্দুস্তান স্বাধীন হওয়ার পরও বহু বছর পর্যন্ত এ পর্বে চেষ্টা-প্রচেষ্টা চলতে থাকে।

তৃতীয় পর্ব: সবকিছু থেকে হাত ধুয়ে ফেলার উপর সন্তুষ্ট থাকা এবং এর উপর প্রশান্তি প্রকাশ করা। বরং খিলাফত, ইমারত, নেতৃত্ব ও রাজনীতির প্রতি ঘৃণা প্রকাশ। দুর্ভাগ্যবশত, আমরা আজ পর্যন্ত এ পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে জীবন কাটিয়ে চলছি।

সারকথা

সারকথা হিসাবে কিছু বাস্তবতার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাচ্ছি-

* তৎকালীন নেতৃত্বের কথা ও কাজে এ বিষয়ে একবারেই স্পষ্ট ছিল যে, হিন্দুস্তানের স্বাধীনতার জন্য তাদের কর্মপ্রয়াস, চেষ্টা-প্রচেষ্টাগুলো দ্বারা তারা একটি দারুল হারবকে একটি দারুল ইসলামে রূপান্তরিত করার অভিপ্রায় উদ্দেশ্য ছিল না।

* হিন্দুস্তান স্বাধীনতার মূল চাবিকাঠি এবং নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব উলামায়ে কেরামের হাত থেকে বের হয়ে রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। যার ফলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সঙ্গে এই বিষয়ক সকল আদান-প্রদান রাজনৈতিক নেতারাই সম্পন্ন করে।

* এই নেতারা হিন্দুস্তানকে ব্রিটিশদের থেকে স্বাধীন করে ইসলামের পরিবর্তে গণতন্ত্রের দিকে নিয়ে গেছে।

* আর তাছাড়া রাজনৈতিক নেতারা ব্রিটিশ শাসনের আইন-কানুন স্বাধীন হিন্দুস্তানে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে কোনোপ্রকার পরিবর্তনের প্রয়োজনও বোধ করেনি।

আরেকটি বাস্তব চিত্র উদ্ঘাটন:

মুহতারাম পাঠকবর্গের মনোযোগকে আমি আরেকটি বাস্তবতার দিকে সম্প্রসারিত করতে চাই। আর তা হচ্ছে, ১৪ই আগস্ট ও ১৫ই আগস্টের দিনকে যথাক্রমে পাকিস্তান ও ভারতের স্বাধীনতা দিবস হিসাবে স্মরণ করা হয়, যা সম্পূর্ণই ভুল ও ধোঁকা। এই দিন দুটিতে না পাকিস্তান স্বাধীন হয়েছে, আর না ভারত স্বাধীন হয়েছে। এই দিনে ভারত উপমহাদেশ মূলত টুকরা টুকরা হয়েছিল। একটি টুকরাকে ভারত রাজ্য নাম দেওয়া হয়েছে এবং অপরটিকে পাকিস্তান রাজ্য নাম দেওয়া হয়েছে।

এক টুকরার পরিচয় ছিল এই-

সরকারি সংবিধান: বাদশাহী। বাদশাহ: ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জর্জ ষষ্ঠ। গভর্নর জেনারেল: ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৪৮ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত মাউন্ট বেটন।

প্রধানমন্ত্রী: ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জওহর লাল নেহেরু। আর অপর টুকরার পরিচয় ছিল অনেকটা এরকম-

সরকারি সংবিধান: বাদশাহী। বাদশাহ: ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত জর্জ ষষ্ঠ। ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দ পর্যন্ত রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ। গভর্নর জেনারেল: মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ।

এগুলো হচ্ছে ইতিহাসের সেসব বাস্তব চিত্র যা সাধারণ জনগণ ও সাধারণ মুসলমানদের দৃষ্টির আড়ালে রয়ে গেছে। কিন্তু ইতিহাসের পাতা থেকে এ সত্যগুলোকে মুছে দেওয়া সম্ভব নয়। আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে এ ভারত উপমহাদেশে বহু রকমের পরিবর্তন এসেছে, কিন্তু একটি বিষয় যার মাঝে কোনো পরিবর্তন আসেনি, তা হচ্ছে হিন্দুস্তান দারুল হারব থেকে দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হয়নি। যার ফলে দুই টুকরার কোনো টুকরার শিরোনামই দারুল ইসলাম ছিল না।

একই কারণে দারুল হারব থেকে দারুল ইসলামে হিজরত করার কোনো বিষয় আলোচ্য বিষয়ের অন্তর্ভুক্তই ছিল না। ভারত বিভক্তের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে হিজরত করা ওয়াজিব হওয়া কিংবা হারাম হওয়া বিষয়ক কোনো আলোচনাই আলোচ্য বিষয়ে স্থান পায়নি। উভয় অংশের কোটি কোটি মুসলমানের জন্য শরীয়তের সিদ্ধান্ত কী? এর তাহকীক ও তালাশ কোথাও কোনো আলোচনার আলোচ্য বিষয় ছিলই না এবং এর কোনো সুযোগও ছিল না। কিছু মানুষকে মুহাজির নাম দেওয়া হয়েছে। কিন্তু সেখানে আনসার কারা ছিলেন? হিজরতের বিধি-বিধান ও মাসায়েলের প্রয়োগ না সীমানার এ পাড়ে ছিল, আর না ওই পাড়ে ছিল।

সব শেষ কথা হচ্ছে, ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ যাকে হিন্দুস্তানের স্বাধীনতা দিবস মনে করা হয়, সে সময়ে ভারত ও পাকিস্তান অস্তিত্ব লাভ করেছে ঠিক, কিন্তু হিন্দুস্তান দারুল হারব থেকে দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হতে পারেনি। না এ অংশ, আর না সে অংশ।

হিন্দুস্তানের স্বাধীনতা ও পাকিস্তান প্রতিষ্ঠা থেকে পাকিস্তান বিভক্ত ও বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা পর্যন্ত

(১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দ থেকে ১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ)

যেভাবে আমরা উল্লেখ করেছি যে, ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদীরা হিন্দুস্তানকে দুই টুকরা করা তথা বিভক্ত তো করেছে, কিন্তু তারা বহাল তবিয়তে উভয় অংশের উপর রাজত্ব করতে থাকে। আর যখন তারা এ বিষয়ে নিশ্চিত হয়েছে যে, তাদের স্থানীয় প্রতিনিধি ও দালালরা তাদের চাহিদা অনুযায়ী কাজ করবে, তখন তারা তাদের প্রতিনিধিদেরকে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ইখতিয়ার দিয়ে দিয়েছে। নবগঠিত দুটি রাজ্যে অবস্থাদির চিত্র অনেকটা এরকম ছিল-

* আদালতগুলোতে সেসব আইন-কানুনেরই অনুসরণ চলছিল, যে আইন অনুযায়ী ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের আগে ব্রিটিশ শাসকরা হিন্দুস্তানকে পরিচালনা করে আসছিল।

* উভয় রাজ্যে মাশায়েখে ইসলাম ও উম্মতের রাহবারগণকে রাষ্ট্র যন্ত্রের প্রভাবশালী পদগুলো থেকে অনেক দূরে রাখা হয়েছে।

* উভয় অংশে গণতন্ত্র মজবুতভাবে তার নীতিমালার উপর প্রতিষ্ঠিত ছিল।

* উভয় অংশে ধর্মনিরপেক্ষতা আপন মূলনীতি ও আকীদা বিশ্বাসের উপর মজবুতভাবে প্রতিষ্ঠিত ছিল।

* বিভক্তির আগে মুসলমানরা তাদের দ্বীনের উপর যে পরিমাণ আমল করতে পারতো, নিজেদের গণ্ডির মাঝে যতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারতো, বিভক্তির পর কোনো রাজ্যেই সে পরিমাণও বাস্তবায়ন করা সম্ভব থাকেনি।

* উভয় অংশে কোনো আইন-কানুনের কোনো একটি শাখাও পরিবর্তন ও পরিবর্ধনের ক্ষেত্রে কুরআন সুন্নাহর দ্বারস্থ হওয়ার প্রয়োজন আছে বলে মনে করা হত না।

* সীমানার উভয় প্রান্তে আইন প্রণয়ন পরিষদে কুরআন-হাদীস অথবা ফিকহে ইসলামীর উদ্ধৃতি দিয়ে কথা বলাকে একটি অনর্থক ও হাস্যকর বিষয় মনে করা হত।

* উভয় অংশের মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপর প্রয়োগকৃত আইন-কানুন যে কেউ তৈরি করতে পারতো, হোক সে হিন্দু, কিংবা শিখ, অথবা বৌদ্ধ, কিংবা ইহুদী বা খ্রিস্টান।

* যেকোনো ধর্মের অনুসারী মুসলমানদের বিচারপতি ও শাসক হতে পারে। তারা তাদের উপর যেকোনো প্রকারের আইন জারি করতে পারে। এ অংশেও, ওই অংশেও।

* ইসলামী খিলাফত, ইসলামী ইমারত ও শরীয়ত বাস্তবায়নের জন্য অস্ত্র হাতে নেওয়া ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। এ অংশেও, ওই অংশেও।

উল্লেখিত শিরোনাম ও দফাগুলোর বিশ্লেষণ অনেক বিস্তৃত। আপনি বলতে পারেন, বিগত এক শতাব্দীকাল যাবৎ ঘটে যাওয়া পরিস্থিতি ও ঘটনাপ্রবাহগুলো এ শিরোনামগুলোর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ, যা আমাদের বাপ-দাদা তথা পূর্বপুরুষরা দেখেছেন, আর এখন আমরা বিস্ফারিত চোখে দেখে চলেছি।

ভারতের মুসলমানরা আহলে কিতাব শাসকদের হাত থেকে স্বাধীনতা লাভ করেছে, আর অমনি তাদের উপর মুশরিক শাসক এসে চেপে বসেছে। ভারত শাসন ব্যবস্থা শতভাগ গায়রুল্লাহর বিধানের উপর প্রতিষ্ঠিত। রাজনৈতিক সুবিধার জন্য মুসলমানদেরকে যখন যতটুকু দিতে চায়, তখন ততটুকু দিয়ে দেয়। কখনও পার্লামেন্টের কোনো চেয়ার, কখনও প্রশাসনের কোনো পদ, কখনও কোনো জলসার সভাপতিত্ব, আবার কখনও মাদরাসা মসজিদে কিছু হাদিয়া তোহফা পাঠিয়ে দেওয়া, আর কখনও রাষ্ট্রীয় কোনো অবদানের জন্য শুভেচ্ছা-স্বাগতমের ধ্বনি দিয়ে অভ্যর্থনা দেওয়া ইত্যাদি।

অপর দিকে পাকিস্তানের শাসকরা নিজেদেরকে মুসলিম বলে দাবি করে, কিন্তু নিজেকে শিয়া রাফেজি পরিচয় দিতেও দ্বিধাবোধ করে না। সবাই গণতান্ত্রিক ও ধর্মনিরপেক্ষ; ইসলামী আইন বাস্তবায়নকে বৈধ মনে করে না। মানব রচিত আইন অনুযায়ী রাষ্ট্র পরিচালনা করাকে মূল তরিকা ও আসল সহীহ পদ্ধতি মনে করে।

গায়রে শরঈ আইন অনুযায়ী দেশ পরিচালনাকে জরুরি মনে করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণের উপর গায়রে শরঈ শাসন এবং কুফরী নীতি চালিয়ে নেওয়ার জন্য যা যা করা দরকার তা করে। মুসলমানদের উপর কুফরী আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে যেখানে যেখানে বাধার সম্মুখীন হয়, সেখানে কিছু নিফাক আর কিছু মিথ্যা দিয়ে কাজ চালিয়ে নেয়।

পাকিস্তান এভাবেই চলছিল, আর এভাবেই বাইশ-তেইশ বছর কেটে গেছে। এরপর ক্ষমতা দখলের লড়াইয়ে পূর্ব ও পশ্চিমের ক্ষমতাশীলদের মাঝে ঝগড়া বেঁধে যায়। পাকিস্তান দুই টুকরা হয়ে যায় এবং বাংলাদেশ নামে একটি নতুন দেশ অস্তিত্ব লাভ করে।

পাকিস্তানের বিভক্তি এবং বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা থেকে বর্তমান পর্যন্ত

(১৯৭১ খ্রিস্টাব্দ থেকে বর্তমান পর্যন্ত)

যাদের হাতে বাংলাদেশের অস্তিত্ব লাভ করেছে তারা নিফাকের মালা গলা থেকে ছুঁড়ে ফেলে সুস্পষ্ট ভাষায় কুফরের ঘোষণা দেয় এবং চারটি সর্ব স্বীকৃত কুফরী মূলনীতির উপর সংবিধানের ভিত্তি রাখার কথা ঘোষণা করে। মুসলমানদের জন্য আলাদা ভূখণ্ডের যে দাবির ভিত্তিতে পাকিস্তান অস্তিত্ব লাভ করেছে, সে ধারণাকেই মূল থেকে মুছে দেওয়া হয় এবং আইনের যেখানে যেখানে ইসলাম ও মুসলমানের উল্লেখ আছে সেখান থেকে সে শব্দগুলো তুলে দিয়ে বাঙ্গালী ও বাংলাদেশি অথবা এ জাতীয় কোনো শব্দ ব্যবহার করা হয়।

দেশের সংবিধান হুবহু সে সংবিধানই যা ব্রিটিশ শাসনামলে ছিল এবং যা অখণ্ড পাকিস্তান থাকা কালে ছিল। রাষ্ট্র যন্ত্রের কোনো পর্যায়ের কোনো পদের জন্য ইসলাম অথবা মুসলমান হওয়ার শর্ত নেই। আইন প্রণয়ন পরিষদ, সর্বস্তরের বিচারপতি, রাষ্ট্রপ্রধান মোটকথা প্রত্যেকটি পদে মুসলিম-অমুসলিমের মাঝে কোনোপ্রকার পার্থক্য রাখা হয়নি। এ অবস্থাই ব্রিটিশ ভারত, স্বাধীন ভারত, পাকিস্তান ও আজকের বাংলাদেশে সকল পর্বে, সব সময়ে অব্যাহত থাকে।

ব্রিটিশ ভারত থেকে শুরু করে আজকের বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পঞ্চাশ বছর অতিক্রম হয়ে যাওয়ার পর পর্যন্তও যে বিষয়গুলোতে কোনোপ্রকার পরিবর্তন আসেনি সেগুলো হচ্ছে এই-

* প্রত্যেক যুগেই এবং প্রত্যেক পর্বেই দেশের সংবিধান গায়রে ইসলামী ছিল এবং এখন পর্যন্তও গায়রে ইসলামীই আছে।

* শাসন ও নেতৃত্ব মুসলমানদের জন্য নির্দিষ্ট নয়। মুসলিম অমুসলিম সবারই এ অধিকার আছে যে, সে ক্ষমতার আসনে বসবে এবং সবার উপর শাসনের লাঠি ঘোরাবে। আইনগতভাবেই এটা সবার অধিকার।

* সংবিধানের দৃষ্টিকোণ থেকে আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে কুরআন-হাদীস তথা ইসলামী শরীয়তের কোনোপ্রকার দখল নেই এবং কুরআন-হাদীসে বর্ণিত মূলনীতির আলোকে কোনোপ্রকার দাবি তোলারও অধিকার নেই। দাবি তোলার অধিকার আছে বলে যাকে উল্লেখ করা হয়, তাও কুফরী সংবিধানের সিদ্ধান্তের উপর নির্ভরশীল। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার অনেক পরে রাষ্ট্রীয় কিছু সুবিধার জন্য শরীয়তের বেঞ্চের ভিত্তি রাখা হয়েছে। কিন্তু তার কোনো ফায়দা মুসলমানদের কপালে জোটেনি।

* আইন প্রণয়ন পরিষদের সদস্যবৃন্দ যেকোনো ধর্মের হতে পারে। প্রত্যেক ধর্মের অনুসারী মুসলমানদের জন্য আইন প্রণয়নের অধিকার রাখে এবং সে আইন মুসলমানরা মানতে বাধ্য।

* ইসলামী শরীয়তের সুস্পষ্ট ও অকাট্য বিধি-বিধানের খেলাফ অসংখ্য আইন ও সিদ্ধান্ত রয়েছে। আর যে আইনগুলো শরীয়তের খেলাফ নয়, সেগুলোও কুরআন-সুন্নাহ মোতাবেক হওয়ার কারণে আসেনি; বরং ঘটনাক্রমে তা হয়ে গেছে।

* এসকল গায়রে শরঈ আইনের অনুসরণ করার উপর এবং এর বিপরীত না করার উপর অঙ্গীকার করা জরুরি।

* শরীয়ত কর্তৃক নির্ধারিত ফরয ওয়াজিবগুলোর তালীম, তাবলীগ এবং সেগুলোর প্রতি উদ্বুদ্ধ করার অনুমতি নেই। বরং ঈমানের সকল শাখার তালীম, তাবলীগ ও উদ্বুদ্ধ করণ ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ।

* যিনা, মদ্যপান, সুদ, প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পরও বিবাহ নিষিদ্ধ হওয়া। কাফের ও আইম্মাতুল কুফরের সাথে বন্ধুত্ব, জিহাদের প্রতিরোধ এবং মুজাহিদদেরকে সব ধরনের গাল-মন্দ করার বৈধতা দেয়া। খিলাফত ও ইমারতে ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠাকে প্রতিরোধ করার জন্য সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ। কাফেরদের বিরুদ্ধে জিহাদ করাকে মানবতা বিরোধী কাজ বলে সাব্যস্ত করা, ইসলাম ও গায়রে ইসলামের ভিত্তিতে জিহাদ করাকে অবৈধ সাব্যস্ত করা এবং এ ধ্যান-ধারণাকে ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ বলে সাব্যস্ত করা। দারুল ইসলাম ও দারুল হারব শিরোনামে পৃথিবী ভাগ করাকে হঠকারিতা, মৌলবাদী চিন্তাধারা, পশ্চাদপদ মানসিকতা ও সন্ত্রাসবাদ হিসাবে চিহ্নিত করা।

শরীয়ত বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা-প্রচেষ্টাকারীদের বিরুদ্ধে যুদ্ধেরত কাফেরদের সঙ্গ দেওয়া। ইলমে দ্বীন শিক্ষাকে ওয়াজিব হিসাবে সাব্যস্ত না করা। মুসলমানদেরকে গুনাহ করতে বাধ্য করার জন্য বাধ্যতামূলক আইন প্রণয়ন করা এবং তা প্রয়োগ করা। অমুসলিমদেরকে তাদের আকীদা বিশ্বাস এবং তাদের কুফরের প্রচার, প্রসার ও শিক্ষাদানের অনুমতি প্রদান, সরকারিভাবে তার ব্যবস্থাপনা, তার প্রতি উদ্বুদ্ধকরণ, সার্বিক সহযোগিতা করা এবং তাদের সকল ধর্মীয় অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ করা। ইসলামের বিধি-বিধানের উপর আমল করার জন্য গায়রে ইসলামী সংবিধানের সাথে মিল রাখা জরুরি এবং ইসলামী বিধি-বিধানের উপর আমল করার জন্য গায়রে ইসলামী সংবিধানের দায়িত্বশীলদের কাছ থেকে অনুমতি নেওয়া জরুরি হওয়াসহ এমন অসংখ্য বিষয় রয়েছে।

এসব বিষয় নিয়ে চিন্তা করলে আপনি বুঝতে পারবেন যে, শাহ আব্দুল আযীয দেহলভী রহিমাহুল্লাহ যে পরিস্থিতিতে এবং যে বিষয়গুলোকে সামনে রেখে এ ভূখণ্ড তথা ভারত উপমহাদেশকে দারুল হারব বলে ফাতওয়া দিয়েছিলেন, হুবহু সে পরিস্থিতি ও সে বিষয়গুলো এখনও বর্তমান ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে উপস্থিত রয়েছে।

বিভক্তির পর এ তিনটি দেশ নিজ নিজ অবস্থানে নিজ নিজ পদক্ষেপ ও শাসন ব্যবস্থার মাধ্যমে জাতিকে এ বার্তা দিতে থাকে যে, ইসলাম ও মুসলিম শিরোনামে এ দেশগুলোতে শাসন করা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। তারা এ বার্তা দিতে থাকে যে, আইন প্রণয়ন পরিষদের মাধ্যমে কুরআন-হাদীসে বর্ণিত কোনো মূলনীতিকে আইনের মর্যাদা দেওয়া, কুরআন-হাদীসের আলোকে চলমান কোনো আইনকে অকার্যকর করা ক্ষমার অযোগ্য অপরাধ। এ তিন দেশের আদালতগুলোতে কুরআন-হাদীসের ভিত্তিতে কোনো আইনের বিপরীত অবস্থান গ্রহণ করাকে মূর্খতা ও নির্বুদ্ধিতার সমার্থবোধক মনে করা হয়। বাস্তবতা এটাই।

পাকিস্তানের শরীয়তের বেঞ্চ দেখে কেউ ধোঁকা খাবেন না

আমরা আগেও উল্লেখ করে এসেছি যে, পাকিস্তানে শরীয়তের বেঞ্চ শিরোনামে যে বেঞ্চ রয়েছে, বছরের পর বছর পর্যন্ত এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না। আর যখন তা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তখন তা আদালতি কার্যক্রমের শত ভাগের এক ভাগকেও আওতাভুক্ত করতে পারেনি। তাছাড়া কোনো দেশে আলাদাভাবে শরীয়তের বেঞ্চের উপস্থিতিই এ কথা প্রমাণ করে যে, সে দেশের আইন-কানুন কুফরী ও গায়রে শরঈ। এ ‘শক্তি ও সামর্থ্য’ দিয়ে পাকিস্তানের এ শরীয়তের বেঞ্চ দেশের আইনের খেলাফ কখনও কোনো সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন করাতে পারেনি। সর্ব স্বীকৃত সুদের মাসআলা নিয়ে পাকিস্তানের সর্বোচ্চ আকাবির উলামায়ে কেরাম নিজেদের জীবন শেষ করে দিয়েছেন, কিন্তু তাঁদের সকল চেষ্টা-প্রচেষ্টা অনর্থক প্রমাণিত হয়।

ইতিহাসের কিছু পৃষ্ঠা উল্টানোর পর

এ পর্যায়ে আমি দুটি আয়াতের দিকে পাঠকবর্গের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই। কারণ এই দুটি আয়াতই আমাদের জন্য সান্ত্বনা ও প্রশান্তির আধার।

تِلْكَ أُمَّةٌ قَدْ خَلَتْ لَهَا مَا كَسَبَتْ وَلَكُمْ مَا كَسَبْتُمْ وَلَا تُسْأَلُونَ عَمَّا كَانُوا يَعْمَلُونَ

“ওই জাতি তো অতীত হয়ে গেছে। তারা যা কামাই করেছে তা তাদের জন্য, আর তোমরা যা করবে তা তোমাদের জন্য। তাদের আমলের বিষয়ে তোমাদেরকে জিজ্ঞেস করা হবে না।” – (সূরা বাকারা, ০২:১৩৪)

قَالَ فَمَا بَالُ الْقُرُونِ الْأُولَى * قَالَ عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّي فِي كِتَابٍ لَا يَضِلُّ رَبِّي وَلَا يَنْسَى *

“সে (অর্থাৎ ফেরাউন মুসাকে লক্ষ করে) বললো, আচ্ছা বলতো, আগের লোকদের কী অবস্থা? মুসা বলল, তাদের বিষয়ে জ্ঞান আমার রবের কাছে কিতাবের মধ্যে রয়েছে। আমার রব ভুলও করেন না, বিস্মৃতও হন না।” (সূরা তহা, ২০:৫১-৫২)

বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, খায়রুল কুরূনের পর সালাফে সালেহীনের যতগুলো তাবাকা ও স্তর রয়েছে তাঁরা সবাই অবশ্যই আমাদের পূর্বসূরি ও আমাদের অগ্রপথিক পথ প্রদর্শক, কিন্তু চার দলীলের বিপরীতে তাঁরা আমাদের জন্য হুজ্জত কিংবা দলীল নয়। তাঁদের খাস কোনো কর্মপদ্ধতি অথবা চিন্তা-চেতনার বিষয়ে সুনিশ্চিত কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়াও আমাদের জিম্মাদারি নয় এবং শরঈ দলীলের বিপরীতে তাঁদেরকে দলীল হিসাবে গ্রহণ করাও আমাদের জন্য বৈধ নয়। শরঈ যেকোনো বিষয়ের ক্ষেত্রে আমাদের কর্মপদ্ধতির সিদ্ধান্তের জন্য আমাদের সামনে কুরআন মাজীদ রয়েছে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের তেইশ বছরের নববী জীবন রয়েছে, সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম-এর শরীয়ত অনুশীলন ও প্রয়োগের শত বছরের অভিজ্ঞতা রয়েছে।

আমাদের দুর্বলতা

এ প্রসঙ্গে একটি কথা মনে এসেছে, যা না বলে চলে যাওয়া সমীচীন মনে হয় না। তা হচ্ছে, মক্কার মূর্তিপূজারি মুশরিকরা সাইয়েদিনা ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে তাদের মুক্তাদা তথা অনুকরণীয় পূর্বসূরি মনে করতো। নিজেদেরকে মিল্লাতে ইবরাহীম এবং ইবরাহীমের বংশধর বলে পরিচয় দিতে গর্ববোধ করতো। ইহুদীরা ইবরাহীম আলাইহিস সালামকে ইহুদী মনে করতো, আর খ্রিস্টানরা তাঁকে খ্রিস্টান মনে করতো। কিন্তু আল্লাহ রাব্বুল আলামীন স্পষ্ট করে বলে দিয়েছেন-

مَا كَانَ إِبْرَاهِيمُ يَهُودِيًّا وَلَا نَصْرَانِيًّا وَلَكِنْ كَانَ حَنِيفًا مُسْلِمًا وَمَا كَانَ مِنَ الْمُشْرِكِينَ * إِنَّ أَوْلَى النَّاسِ بِإِبْرَاهِيمَ لَلَّذِينَ اتَّبَعُوهُ وَهَذَا النَّبِيُّ وَالَّذِينَ آمَنُوا وَاللَّهُ وَلِيُّ الْمُؤْمِنِينَ

“ইবরাহীম ইহুদীও ছিলেন না, খ্রিস্টানও ছিলেন না। তিনি ছিলেন একজন একনিষ্ঠ মুসলিম, আর তিনি মুশরিকও ছিলেন না। নিঃসন্দেহে ইবরাহীমের সবচাইতে কাছের লোক একমাত্র তারাই যারা তাঁর অনুকরণ করছে, আর এ নবী এবং যারা তাঁর উপর ঈমান এনেছে। আর আল্লাহ এ মুমিনদের সঙ্গে রয়েছেন।” (সূরা আলে ইমরান, ০৩:৬৭-৬৮)

বলার উদ্দেশ্য হচ্ছে, সর্বস্বীকৃতি ব্যক্তিবর্গকে নিজের পূর্বসূরি হিসাবে প্রকাশ করতে সবাই আগ্রহী থাকে, কিন্তু তাঁদের যথাযথ অনুসরণ করার জন্য মানসিকভাবে প্রস্তুত থাকে না। আমাদের আকাবির উলামায়ে কেরামও বার বার এ পরিস্থিতিরি মুখোমুখি হয়েছেন। কেউ আছে যারা নিজেদেরকে ওয়ালিউল্লাহি চিন্তাধারার ধারক-বাহক বলে দাবি করে, কিন্তু শাহ ওয়ালিউল্লাহ রহিমাহুল্লাহর সংস্কারমূলক অবদানগুলোকে গ্রহণ করতে রাজি নয়। শাহ আব্দুল আযীয দেহলভী রহিমাহুল্লাহর নাম উচ্চারণ করে গর্ববোধ করে, তাঁর ফাতওয়া তাদের মনকে জয় করে, কিন্তু তাঁর ফাতওয়া গ্রহণ করে সে মোতাবাকে আমল করা থেকে মন পালিয়ে বেড়ায়।

সাইয়েদ আহমদ শহীদ ও শাহ ইসমাঈল শহীদ রহিমাহুমুল্লাহর জিহাদি জযবার সাথে একমত বলে প্রকাশ পায়, কিন্তু জিহাদের কথা বললে নাক ছিটকাতে থাকে। মক্কী, গাঙ্গুহী, নানুতাবীর নাম উল্লেখ করলে মন-মস্তিষ্ক, দেহ-প্রাণে সতেজতা ফুটে উঠে, কিন্তু শত্রু নিধনের জন্য নিজের প্রাণ ও মাল কুরবান করাকে বৈধ মনে করে না। শায়খুল হিন্দের স্মরণে গর্বে বুক ফুলে যায়, কিন্তু খিলাফত প্রতিষ্ঠার জন্য চিন্তা-ভাবনা ও কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে উলামায়ে কেরামের অংশগ্রহণ করাকে নাজায়েয মনে করে।

যাই হোক, এগুলো হচ্ছে আমাদের কিছু দুর্বলতা। কিন্তু যে যাই বলুক, আমাদের করার মতো কাজ শুধু একটি। আর তা হচ্ছে, আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের নাযিলকৃত শরীয়ত, আল্লাহর কিতাব ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের রেখে যাওয়া আদর্শ। তাই ইতিহাসের এ সংক্ষিপ্ত দাস্তান উল্লেখ করার পর এবার সেসব জিম্মাদারি ও দায়িত্ব নিয়ে কথা বলবো, যা কুরআন ও হাদীসের আলোকে আমাদের উপর বর্তায়। আল্লাহ সঠিক কথা বলার তাওফীক দান করুন।

 

 

 

[৪র্থ পর্ব (শেষ)]

ভারত উপমহাদেশ যখন মুসলমানদের হাত থেকে বের হয়ে অমুসলিমদের হাতে চলে গেছে এবং মুসলমানরা একটি দারুল হারবে জীবন যাপন করতে বাধ্য হয়ে পড়েছে, তখন সময়ের চাহিদা ও দায়িত্বকে সামনে রেখে উলামায়ে কেরাম তাঁদের নিজ নিজ যিম্মাদারী আদায়ের জন্য দুটি কাজ করেছেন।

এক. মাসআলার শরঈ অবস্থান স্পষ্ট করে দিয়েছেন এবং সুস্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করে দিয়েছেন যে, হিন্দুস্তান বর্তমান অবস্থায় দারুল হারব। এরপর একথা স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, দারুল হারবে অবস্থানকারী মুসলমানদের দায়িত্ব কী?

দুই. দ্বিতীয়ত তাঁরা যে কাজটি করেছেন তা হচ্ছে, দারুল হারবকে পুনরায় দারুল ইসলামে ফিরিয়ে নেয়ার জন্য আমলীভাবে জিহাদ শুরু করেছেন এবং সে জন্য যা যা প্রস্তুতির প্রয়োজন ছিল সে প্রস্তুতি গ্রহণে লেগে পড়েছেন।

এ পর্যায়ে আমি ভূমিকা স্বরূপ কিছু কথা তুলে ধরতে চাই, যে কথাগুলো সম্পর্কে আমি আশাবাদী যে, সে কথাগুলোতে কেউ কোনো দ্বিমত করবেন না। আর আমি এটাও আশা করছি যে, এ কথাগুলো সামনে রাখলে আমরা আমাদের দায়িত্বগুলো বুঝে নেয়া সহজ হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। কথাগুলো হচ্ছে এই-

০১. যিম্মাদারী আদায় করতে দেরি হলে কিংবা আদায় করতে অলসতা করলে সে কারণে যিম্মাদারীতে কোনোপ্রকার শিথিলতা আসে না এবং যিম্মাদারী হালকা হয়ে যায় না।

০২. কোনো এক প্রজন্ম যদি তাদের উপর অর্পিত দায়িত্ব আদায় না করতে পারে, তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের উপর থেকে সে দায়িত্ব চলে যায় না। দায়িত্ব বহাল থাকে।

০৩. এ দেশগুলোতে কুফরী শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত রাখার পেছনে মূল শক্তি হচ্ছে এ দেশগুলোর শাসকবর্গ। অন্য বিভাগগুলো তাদের সহযোগী।

০৪. দ্বীন ও শরীয়ত প্রতিষ্ঠা, খিলাফত প্রতিষ্ঠা এবং ইমারতে ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠা করা মুসলমানদের উপর অর্পিত একটি ফরয দায়িত্ব। আর এ ফরয আদায় করতে গিয়ে বাধাদানকারী যেসব প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সেগুলো দূর করাও ফরয।

০৫. হালাত ও পরিস্থিতির কারণে ফরয আদায়ের পদ্ধতিতে পরিবর্তন আসতে পারে, কিন্তু মূল বিধান মুলতবি হতে পারে না।

০৬. ফরয জিহাদের দায়িত্ব জিহাদের প্রস্তুতি এবং আমলীভাবে জিহাদের দ্বারাই আদায় হতে পারে, অন্যান্য ফরয দায়িত্ব আদায় করা এর বদলা হতে পারে না। যেমন নামায, রোযা, হজ ইত্যাদি আদায় করার দ্বারা জিহাদের দায়িত্ব আদায় হতে পারে না।

০৭. সেসব কাজকেই জিহাদের প্রস্তুতি বলা হবে যেসকল কাজকে কুরআন ও হাদীসে জিহাদের প্রস্তুতি হিসাবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ কয়েকটি কথা উল্লেখ করার পর আমরা দেখার চেষ্টা করব যে, চলমান সময়ে ভারত উপমহাদেশ তথা ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের মুসলমানদের উপর এ ক্ষেত্রে কী কী দায়িত্ব বর্তায়।

উল্লেখিত শিরোনামগুলোর উপর আলোচনা শুরু করার আগে আমরা সবাই এ কথার উপর একমত হয়ে যাই যে, আমরা প্রত্যেকটি কথাকে শরীয়তের দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করার চেষ্টা করব এবং সে জন্য আল্লাহর কাছে তাওফীক চাইবো।

ইতিহাস থেকে আমরা শিক্ষা গ্রহণ করব। দিক নির্দেশনা নেব। পথ অনুসন্ধানের পদ্ধতি শিখবো। শত্রুর মোকাবেলা করে বিজয় হওয়ার সূত্রগুলো শিখে নেব। মুনাফিক, মুলহিদ ও যিন্দিকদের ষড়যন্ত্র ও ধোঁকা থেকে নিজে বাঁচার এবং নিজের জাতিকে বাঁচানোর কৌশল শিখবো। কিন্তু সিদ্ধান্ত আমরা কুরআন ও হাদীস থেকেই নেব। অর্থাৎ শরীয়তের দলীল এবং আইম্মায়ে মুজতাহিদীন থেকেই নেব ইনশাআল্লাহ। আল্লাহ আমাদেরকে তাওফীক দান করুন।

আমাদের দায়িত্ব কী?

আমাদের আজকের প্রথম দায়িত্ব সেটিই যা ঐ যামানায় শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী রহিমাহুল্লাহ এবং সে যামানার অন্য রাহবারগণ আদায় করেছেন। অর্থৎ এই দেশগুলোর শরঈ অবস্থান দলীলের আলোকে সবার সামনে স্পষ্ট করে তুলে ধরা। এমনিভাবে সাইয়েদ আহমাদ বেরেলভী রহিমাহুল্লাহ ও শাহ ইসমাঈল শহীদ রহিমাহুল্লাহ যে দায়িত্ব আদায় করেছিলেন, সে দায়িত্বই আজ মুসলমানদের উপর অর্পিত। অর্থাৎ যতটুকু সামর্থ্য আছে শত্রুর মোকাবেলায় ময়দানে ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্য ততটুকুকে সাজিয়ে নেয়া। কার্যকরভাবে জিহাদের জন্য নগদেই ফিকির শুরু করা এবং একটি সফল জিহাদের জন্য যে যে প্রস্তুতি নেয়া জরুরি সেসব প্রস্তুতি গ্রহণ করা। এখন আমরা এগুলোর কিঞ্চিৎ বিবরণ তুলে ধরবো ইনশাআল্লাহ।

প্রথম দায়িত্ব:

দখলদার শত্রু ও তাদের দালালদের হাত থেকে ছিনিয়ে নেয়া দারুল ইসলাম পুনরুদ্ধার করা

ইতিহাসের সংক্ষিপ্ত পাঠ থেকে আমাদের সামনে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, ভারত উপমহাদেশ একবার দারুল হারব হয়ে যাওয়ার পর তা আর দারুল ইসলামে রূপান্তরিত হতে পারেনি। যেসকল পরিস্থিতি ও প্রেক্ষাপটকে সামনে রেখে এ ভূখণ্ডকে দারুল হারব সাব্যস্ত করা হয়েছিল, হুবহু সে অবস্থা ও প্রেক্ষাপটই এখনও ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশে বিরাজ করছে। সে কারণে দারুল ইসলাম পুনরুদ্ধার করার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাওয়া মুসলমানদের উপর ফরয। আর তা করতে গিয়ে যে যে বাধা-প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হচ্ছে সেগুলো দূর করার জন্য জিহাদ করাও মুসলমানদের উপর ফরয। আর এ জিহাদ যেহেতু নিজেদের ভূমিকে পুনরুদ্ধারের জিহাদ, সেহেতু এটি একটি দিফায়ী ফরযে আইন জিহাদ।

এই বিষয়ের দলীলগুলো দেখার আগে ভূমিকা হিসাবে কিছু কথা তুলে ধরা হয়েছিল, সেগুলোর উপর আরেকবার নযর বুলিয়ে নিন এবং সে কথাগুলো নিয়ে আরেকটু ফিকির করুন।

মাজমাউল আনহুর শরহু মুলতাকাল আবহুর-এর ইবারত দেখুন-

)فإن هجم) أي: غلب (العدو) أي: على بلد من بلاد الإسلام، أو ناحية من نواحيها.

وفي المغرب الهجوم الإتيان بغتة، والدخول من غير استئذان (ففرض عين فتخرج المرأة، والعبد بلا إذن الزوج، والمولى)؛ لأن المقصود لا يحصل إلا بإقامة الكل فيفرض على الكل وحق الزوج، والمولى لا يظهر في حق فروض الأعيان، وكذا يخرج الولد بغير إذن والديه، والغريم بغير إذن دائنه وإن الزوج، والمولى إذا منعا أثما.

وفي البحر امرأة مسلمة سبيت بالمشرق وجب على أهل المغرب تخليصها ما لم تدخل حصونهم وحرزهم قال في الذخيرة إذا جاء النفير إنما يصير فرض عين على من يقرب من العدو وهم يقدرون على الجهاد فأما من وراءهم يبعد من العدو، فإن كان الذين هم بقرب العدو عاجزين عن مقاومة العدو القادرين إلا أنهم لا يجاهدون لكسل بهم، أو تهاون افترض على من يليهم فرض عين، ثم من يليهم كذلك حتى يفترض على هذا التدريج على المسلمين كلهم شرقا وغربا انتهى. (مجمع الأنهر في شرح ملتقى الأبحر، أحكام الجهاد(

অনুবাদ: “(যদি আক্রমণ করে) অর্থাৎ জয় লাভ করে (শত্রু) অর্থাৎ দারুল ইসলামের কোনো শহরের উপর, অথবা দারুল ইসলামের কোনো অংশের উপর।

‘মুগরিব’ কিতাবে আছে, الهجوم এর অর্থ হচ্ছে, হঠাৎ চড়াও হওয়া এবং অনুমতি ছাড়া প্রবেশ করা। (তখন ফরয আইন। সুতরাং মহিলা ও গোলাম নিজেদের স্বামী ও মনিবের অনুমতি ছাড়া বের হয়ে যাবে।) কেননা সবার অংশগ্রহণ ছাড়া উদ্দেশ্য আদায় হবে না। তাই সবার উপর ফরয হয়ে যাবে এবং স্বামী ও মনিবের অধিকার ফরযে আইন বিষয়ের ক্ষেত্রে কোনোপ্রকার প্রভাব ফেলবে না। এমনিভাবে ছেলে তার বাবার অনুমতি ছাড়া, ঋণী ব্যক্তি ঋণদাতার অনুমতি ব্যতীত বের হয়ে যাবে। স্বামী ও মনিব যদি বাধা দেয় তা হলে তারা গুনাহগার হবে।

‘বাহর’ কিতাবে আছে, যদি কোনো মুসলিম নারী পূর্ব প্রান্তে শত্রুর হাতে বন্দী হয়ে যায়, তা হলে তাকে ছাড়িয়ে আনা পশ্চিম প্রান্তের মুসলিমদের উপর ওয়াজিব। যতক্ষণ না ঐ মহিলা তাদের কেল্লায় কিংবা তাদের সংরক্ষিত সীমানায় প্রবেশ করে। ‘যখীরাহ’ কিতাবে আছে, যখন ‘নফীরে আম’ হবে তখন যারা শত্রুর কাছে থাকবে তাদের উপর ফরযে আইন হয়ে যাবে, যদি তাদের জিহাদ করার মতো শক্তি থাকে। আর শত্রু থেকে দূরে অবস্থানকারী মুসলমানদের দায়িত্ব হচ্ছে, শত্রুর নিকটবর্তী মুসলিমরা যদি শত্রু প্রতিরোধে অক্ষম হয়ে যায়, অথবা প্রতিরোধ করতে সক্ষম, কিন্তু অলসতা ও গাফলতের কারণে জিহাদ না করে, তখন তাদের পরবর্তী নিকটবর্তীদের উপর জিহাদ করা ফরয হয়ে যাবে। অতঃপর তৎপরবর্তী যারা নিকটে তাদের উপর। এরকমভাবে পূর্ব পশ্চিমে বসবাসকারী সকল মুসলমানের উপর জিহাদ ফরয হয়ে যাবে।”

ইনায়াহ শরহে হিদায়াহ-এর বক্তব্য দেখুন-

ثم الجهاد يصير فرض عين عند النفير العام على من يقرب من العدو وهو يقدر عليه، وأما من وراءهم فلا يكون فرضا عليهم إلا إذا احتيج إليهم، إما لعجز القريب عن المقاومة مع العدو، وإما للتكاسل فحينئذ يفرض على من يليهم ثم وثم إلى أن يفترض على جميع أهل الإسلام شرقا وغربا على هذا التدريج. (العناية شرح الهداية، كتاب السير(

অনুবাদ: “এরপর যখন নফীরে আম হবে তখন যে মুসলমানরা দুশমনের কাছাকাছি হবে এবং তারা দুশমনকে প্রতিহত করতে সক্ষম, তাদের উপর জিহাদ ফরযে আইন হয়ে যাবে। এছাড়া যারা তাদের থেকে দূরে রয়েছে তাদের উপর ফরয হবে না, যতক্ষণ না তাদের প্রয়োজন পড়ে। যদি কাছের মুসলমানরা তাদের দুর্বলতার কারণে অথবা তাদের অলসতার কারণে দুশমনকে প্রতিহত করতে অক্ষম হয়ে যায়, তাহলে তাদের কাছাকাছি যারা রয়েছে তাদের উপর হয়ে যাবে। এরপর যারা তাদের কাছে রয়েছে তাদের উপর। এরপর তাদের কাছে যারা রয়েছে তাদের উপর। এভাবে পরম্পরায় পূর্ব পশ্চিমের সকল মুসলমানের উপর ফরয হয়ে যাবে।”

‘আল-মাউসুআতুল ফিকহিয়্যাহ আল-কুয়াইতিয়্যাহর ইবারত দেখুন-

إذا استولى الكفار على بقعة من دار الإسلام صار الجهاد فرض عين على جميع أفراد الناحية التي استولى عليها الكفار، رجالا ونساء، صغارا وكبارا، أصحاء ومرضى، فإذا لم يستطع أهل الناحية دفع العدو عن دار الإسلام، صار الجهاد فرض عين على من يليهم من أهل النواحي الأخرى من دار الإسلام، وهكذا حتى يكون الجهاد فرض عين على جميع المسلمين، ولا يجوز تمكين غير المسلمين من دار الإسلام. ويأثم جميع المسلمين إذا تركوا غيرهم يستولي على شيء من دار الإسلام.

……….

ولا يجوز لغير المسلمين دخول دار الإسلام إلا بإذن من الإمام أو أمان في مسلم. ولا يجوز لهم إحداث دور عبادة لغير المسلمين: كالكنائس، والصوامع، وبيت النار …. . (الموسوعة الفقهية الكويتية، في كلمة دار(

অনুবাদ: “যখন কাফেররা দারুল ইসলামের কোনো অংশের উপর চড়াও হবে, তখন যে এলাকার উপর কাফেররা হামলা করেছে সে এলাকার প্রত্যেক মুসলমানের উপর জিহাদ করা ফরযে আইন হয়ে যায়। পুরুষ-নারী, ছোট-বড়, সুস্থ-অসুস্থ সবার উপর। যদি সে এলাকার মুসলমানরা দারুল ইসলাম থেকে শত্রুকে প্রতিহত করতে সক্ষম না হয়, তাহলে তাদের এলাকার সাথে যুক্ত নিকটবর্তী এলাকার মুসলমানদের উপর জিহাদ ফরয হয়ে যাবে। এভাবে সকল মুসলমানের উপর জিহাদ ফরয হয়ে যাবে। আর কাফেরদেরকে দারুল ইসলামে জায়গা করে নেয়ার সুযোগ দেয়া জায়েয নেই। যদি কাফেরদেরকে দারুল ইসলামের কোনো অংশে দখল দেয়ার জন্য ছেড়ে দেয়া হয়, তাহলে সকল মুসলমান গুনাহগার হবে।

আর অমুসলিমরা ইমামুল মুসলিমীনের অনুমতি ব্যতীত অথবা কোনো মুসলিমের পক্ষ থেকে নিরাপত্তা প্রদান ব্যতীত দারুল ইসলামে প্রবেশ করা জায়েয নেই। এমনিভাবে অমুসলিমরা ইবাদতখানা বানানোও জায়েয নেই। যেমন গির্জা, মন্দির, অগ্নিকুণ্ড ইত্যাদি বানানো…।”

উল্লেখিত উদ্ধৃতিগুলোর বক্তব্য অনুযায়ী, শত্রু যদি দারুল ইসলামের উপর চড়াও হয়, তাহলে দারুল ইসলামের অধিবাসীদের উপর ওয়াজিব দায়িত্ব হলো, শত্রুর মোকাবেলা করে দারুল ইসলামকে পুনরুদ্ধার করা। আর এটি একটি ফরযে আইন দায়িত্ব। এমনিভাবে এ কথাও স্পষ্ট যে, যদি দারুল ইসলামকে পুনরুদ্ধারের চেষ্টা ছেড়ে দিয়ে তা শত্রুর হাতে তুলে দেয়া হয়, তা হলে প্রত্যেক মুসলমান গুনাহগার হবে। এ বিষয়ে ফিকহের ইবারত এভাবে এসেছে-

ويأثم جميع المسلمين إذا تركوا غيرهم يستولي على شيء من دار الإسلام

অতএব ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের প্রথম যিম্মাদারী হচ্ছে, ফরযে আইন জিহাদ আদায় করার জন্য ময়দানে নেমে পড়বে এবং এর জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করবে।

এ দেশগুলোর শাসকবর্গ যেহেতু এ দেশগুলোকে দারুল ইসলাম বানাতে প্রস্তুত নয়, সে কারণে এসব দেশের শাসকের বিরুদ্ধে সশস্ত্র কার্যক্রম শুরু করা মুসলমানদের দায়িত্ব। চলমান পরিস্থিতিতে মুসলমানদের জন্য জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ ব্যতীত আর কোনো পথ খোলা নেই। এ কারণে ভারত উপমহাদেশের মুসলমানদের উপর জিহাদ ফরযে আইন।

দ্বিতীয় যিম্মাদারী:

কাফের ও মুরতাদ শাসকদেরকে শাসন ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দেয়ার জন্য জিহাদ করা।

উলামায়ে কেরামের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হচ্ছে, যদি কোনো কাফের শাসন ক্ষমতার মসনদে বসে যায়, অথবা মুসলিম শাসক কুফরে লিপ্ত হয়, তা হলে সে শাসককে সরিয়ে কোনো মুসলিম শাসককে ক্ষমতার মসনদে বসানো ফরয দায়িত্ব। কাজী ইয়াজ রহিমাহুল্লাহ-এর একটি ইবারত দেখুন-

لا خلاف بين المسلمين أنه لا تنعقد الإمامة للكافر، ولا تستديم له إذا طرأ عليه، وكذلك إذا ترك إقامة الصلوات والدعاء إليها، وكذلك عقد جمهورهم البدعة.

وذهب بعض البصريين إلى أنها تنعقد لها وتستديم على التأويل، فإذا طرأ مثل هذا على وال من كفر اْو تغير شرع أو تأويل بدعة، خرج عن حكم الولاية وسقطت طاعته، ووجب على الناس القيام عليه وخلعه، ونصب إمام عدل أو والي مكانه إن اْمكنهم ذلك. (إكمال المعلم شرح صحيح مسلم للقاضي عياض، باب وجوب طاعة الأمراء في غير معصية(

অনুবাদ: “মুসলমানদের মাঝে এ বিষয়ে কোনো দ্বিমত নেই যে, কাফেরের জন্য ইমামত তথা শাসন ক্ষমতা সাব্যস্ত হয় না। আর কোনো মুসলিম শাসক শাসক হিসাবে বহাল থাকে না, যখন তার মাঝে কোনো কুফর প্রকাশ পায়। এমনিভাবে যখন নামায প্রতিষ্ঠা করা এবং নামাযের দিকে আহ্বান করা ছেড়ে দেয়, তখন তার জন্য ইমামত তথা শাসন ক্ষমতা সাব্যস্ত হয় না। এরকমভাবে বিদআতের ক্ষেত্রেও অধিকাংশের মত এটাই।

কোনো কোনো বসরী উলামায়ে কেরামের মতে তাবীল তথা ব্যাখ্যা সাপেক্ষে বিদআতির জন্য ইমামত তথা শাসন ক্ষমতা সাব্যস্ত হবে এবং তা বহাল থাকবে। অতএব এরকম কুফর কিংবা শরীয়তের বিধান পরিবর্তন করে দেয়া, অথবা বিদআতের ব্যাখ্যা করার প্রবণতা কোনো মুসলিম শাসকের মাঝে পাওয়া গেলে, সে শাসক ক্ষমতা থেকে বের হয়ে যাবে এবং তার আনুগত্য বহাল থাকবে না। মুসলমানরা তার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে যাওয়া, তাকে ক্ষমতাচ্যুত করা এবং তার জায়গায় একজন ইনসাফগার শাসককে বসানো ওয়াজিব হয়ে যাবে, যদি তা তাদের দ্বারা সম্ভব হয়।”

কাজী ইয়ায রহিমাহুল্লাহ এখানে সর্বসম্মত মত উল্লেখ করেছেন যে, যদি কাফের শাসক মুসলমানদের উপর ক্ষমতা দখল করে বসে, অথবা মুসলিম শাসক কুফর করে বসে, তা হলে তাকে সরিয়ে কোনো মুসলিম শাসককে শাসন ক্ষমতায় বসানো মুসলমানদের উপর ফরয। আর এ কথা স্পষ্ট যে, কোনো কাফের অথবা মুরতাদ শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করা সশস্ত্র কার্যক্রম ছাড়া সম্ভব নয়। সে কারণে ফলাফল দাঁড়ায়, এ শাসকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা মুসলমানদের উপর ফরয। ভারত উপমহাদেশের শাসকরা কাফের কিংবা মুরতাদ হওয়ার বিষয়ে এ নিবন্ধের দ্বিতীয় পর্বে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। এখানে আলোচ্য বিষয়ে সংশ্লিষ্টতার কারণে সে বিষয়টির প্রতি সংক্ষেপে ইঙ্গিত করে যাচ্ছি-

ভারতের শাসক মূল থেকেই কাফের। প্রকাশ্য মুশরিক। তার কুফরের বিষয়ে সন্দেহ করা কুফর। কাফেরকে কাফের মনে করা ফরয। আর পাকিস্তান ও বাংলাদেশের শাসকরা জন্মগতভাবে মুসলমান থেকে থাকলেও তারা মুরতাদ হয়ে গেছে। যদিও তারা নিজেদেরকে মুসলিম হিসাবে প্রকাশ করে এবং ইসলামের কিছু বিধানের উপর আমলও করে। তারা মুরতাদ কারণ, তাদের মাঝে স্পষ্ট কুফর রয়েছে। সলফ ও খলফ তথা পূর্ববর্তী ও পরবর্তী সকলের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হচ্ছে, যদি কোনো শাসক দেশ পরিচালনা করার জন্য ইসলামী শরীয়ত তথা কুরআন সুন্নাহকে অর্থাৎ আল্লাহর বিধানকে সংবিধান হিসাবে গ্রহণ না করে এবং তৎপরিবর্তে গায়রুল্লাহর বিধানকে গ্রহণ করে, তাহলে সে কাফের। এ বিষয়ে আপনি সলফ ও খলফের কিছু বক্তব্য দেখুন-

হাকীমুল উম্মত মাওলানা শাহ আশরাফ আলী থানভী রহিমাহুল্লাহ লিখেন-

أمر مخل بالإمامت

١- اختياري يعني خلع بلا سبب.

٢-غير اختياري، مثل مرض مانع عن العمل وأسر ممتد، وعجز عن العمل.

٣-كفر.

٤- غير متعدي إلى الغير، مثل شرب خمر وغيره.

٥- متعدي، يعني ظلم بأخذ الأموال اجتهادي.

٦-متعدي، يعني ظلم بأخذ الأموال غير اجتهادي.

٧-بالإكراه على المعصية.

 

قسم ثالث: نعوذ بالله كافر هو جاوئے خواه  بكفر تكذيب وجحود وخواه بكفر عناد ومخالفت وخواه بكفر استخفاف واستقباح امور دين۔ ّ (امداد الفتاوى، جلد 5، ص 129)

قسم ثالث كا حكم:  حكمران معزول هو جاوے گا، اگر جدا نه هو تو (مسلمانوں پر) بشرط قدرت جدا كر دينا على الاطلاق واجب هے۔ لقوله في العبارة الثالثة كالردة۔ مگر اس ميں شرط يه هے كه وه كفر متفق عليه هو، بدليل الحديث الأول كفرا بواحا عندكم من الله فيه برهان مع انضمام الإجماع المذكور سابقا۔ اور جس طرح اس كا كفر هونا قطعي هو  اسي طرح اس كا صدور بھي يقيني هو، مثل رؤت عين كے، نه كه محض روايات ظنيه كے درجه ميں، كما دل عليه قوله عليه السلام : إلا أن تروا، المراد  رؤية العين، بدليل تعديته إلى مفعول واحد۔ (إمداد الفتاوى، جلد 5، ص 133)

অনুবাদ: “শাসন ক্ষমতায় বাধাদানকারী বিষয়সমূহ:

০১. ইখতিয়ারি। অর্থাৎ কোনো কারণ ছাড়া ক্ষমতাচ্যুত করা।

০২. গায়রে ইখতিয়ারি। যেমন, এমন অসুস্থতা যা কাজ করতে বাধাগ্রস্ত করে। দীর্ঘ বন্দী জীবন এবং কাজ করতে অক্ষম হওয়া।

০৩. কুফর।

০৪. অপরকে আক্রান্ত করে না এমন। যেমন মদপান ইত্যাদি।

০৫. অপরকে আক্রান্ত করে এমন। যেমন কারো সম্পদ নিয়ে নেয়ার মাধ্যমে জুলুম। ইজতেহাদি।

০৬. অপরকে আক্রান্ত করে এমন। যেমন কারো সম্পদ নিয়ে নেয়ার মাধ্যমে জুলুম। গায়রে ইজতেহাদি।

০৭. গুনাহ করতে বাধ্য করার কারণে।

তৃতীয় প্রকার: নাউযুবিল্লাহ! কাফের হয়ে যাবে। চাই মিথ্যা প্রতিপন্ন করার কুফর হোক, অস্বীকার করার কুফর হোক, চাই অবাধ্যতা ও বিরোধিতার কুফর হোক, চাই দ্বীনি বিষয়াবলিকে হেয় ও নিন্দা করার কুফর হোক…” (ইমদাদুল ফাতাওয়া ৫/১২৯)

তৃতীয় প্রকারের হুকুম: শাসক ক্ষতাচ্যুত হয়ে যাবে। যদি সে নিজে নিজে ক্ষমতা ছেড়ে না দেয়, তা হলে মুসলমানদের শক্তি থাকলে সর্বাবস্থায় তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে দেয়া ওয়াজিব। لقوله في العبارة الثالثة كالردة এ ইবারতের আলোকে। তবে এ ক্ষেত্রে শর্ত হচ্ছে, কুফরটি সর্বজন স্বীকৃত কুফর হতে হবে। এর দলীল হচ্ছে, প্রথম হাদীস: স্পষ্ট কুফর যা সম্পর্কে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে প্রমাণ আছে। এরই সাথে পূর্বে যে ইজমা উল্লেখ করা হয়েছে তা সহ। আর যেমনিভাবে তার ঐ কুফর কুফর হওয়াটা অকাট্য হতে হবে, তেমনিভাবে তা প্রকাশ পাওয়ার বিষয়টিও নিশ্চিত হতে হবে। চোখে দেখার মতো। ধারণা নির্ভর বর্ণনার ভিত্তিতে নয়। এর দলীল হচ্ছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বাণী: ‘তবে যদি তোমরা দেখ…’ উদ্দেশ্য হচ্ছে, চোখের দেখা। এর দলীল হচ্ছে, শব্দটিকে একটি মাফউলের দিকে মুতাআদ্দী করা হয়েছে।” (ইমদাদুল ফাতাওয়া ৫/১৩৩)

মুফতী তকী উসমানী হাফিযাহুল্লাহ সাহেব লেখেন-

“اس كے علاوه حضرت حكيم الامت رح فرماتے هيں كه، ايك اور صورت ايسي هے جس ميں امير كا فسق دوسروں تك متعدي هو رها هو، يعني أمير لوگوں كا دين خراب كر رها هو، مثلا لوگوں كو معصيت پر مجبور كر رها هوتو اگر يه عمل كسي ايك يا دو افراد كے ساتھ هوتو اس كا حكم اكراه كا هوگا، اور اكراه كے احكام جاري هوں گے۔ ليكن اگر امير نے اس كو ايك مستقل پاليسي بنا ليا كه وه مستقل طور سے لوگوں كو معصيتوں پر مجبور كرنے لگا هےاور اس ميں غير اسلامي قوانين كو شريعت كے مقابلے ميں زياده بهتر سمجھتا هے تو يه كفر صريح هے اور اگر فوقيت نهيں ديتا ليكن تاويلا (شريعت كي غلط تشريح كر كے) يا تكاسلا (سستي كي بناء پر) اس كو چھوڑا هوا هے تو بھي اگر چه يه كفر صريح نه هو، ليكن كفر كے حكم سے ملحق هو سكتا هے، كيوں كه اس سے شريعت كا استخفاف لازم آتا هے، لهذا اس صورت ميں بھي خروج جائز هے۔” (اسلام اور سياسي نظريات، ص: 367)

অনুবাদ: “এছাড়া হযরত হাকীমুল উম্মত রহিমাহুল্লাহ বলেন, আরেকটি সুরত এমন আছে যে ক্ষেত্রে আমীরের অপরাধ ও গুনাহ অন্যদের পর্যন্ত গড়ায়। অর্থাৎ আমীর মানুষের দ্বীন নষ্ট করছে। উদাহরণস্বরূপ, মানুষদেরকে গুনাহ করতে বাধ্য করছে। এক্ষেত্রে এ আচরণটি যদি এক/দুইজনের সাথে হয় তা হলে তা ‘ইকরাহ’ তথা বাধ্য করার হুকুমে হবে এবং ইকরাহের বিধি-বিধান প্রয়োগ হবে। আর যদি আমীর তার এ আচরণকে একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ নীতি হিসাবে গ্রহণ করে, এবং সে নীতির অধীনে মানুষকে গুনাহ করতে বাধ্য করতে শুরু করে। সে ক্ষেত্রে সে অনৈসলামিক আইন কানুনকে শরীয়তের বিপরীতে বেশি উত্তম মনে করে, তা হলে এটা স্পষ্ট কুফর। আর যদি প্রাধান্য না দেয়, কিন্তু তাবীল করে (শরীয়তের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে) অথবা অলসতাবশত (অলসতা করে) তাকে ত্যাগ করে থাকে, সেক্ষেত্রে এটা যদিও স্পষ্ট কুফর নয়, কিন্তু তা কুফরের বিধানের সাথে যুক্ত হতে পারে। কেননা এর দ্বারা শরীয়তকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়। তাই এ ক্ষেত্রেও তার বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করা জায়েয।…” (ইসলাম আওর সিয়াসী নযরিয়াত পৃ: ৩৬৭)

মুফতী কেফায়াতুল্লাহ রহিমাহুল্লাহ-এর ফাতওয়া দেখুন-

خلاف شرع حكم كرنے والے حكمران طاغوت هيں، ان كو “اولي الامر” ميں داخل كرنے والے كي امامت نا جائز هے۔

سوال: جو شخص آيت شريفه (وأولي الأمر منكم) كو  حكام آئين پر محمول كرتا هو اور حكام آئين موجوده كے حكم كو اس آيت  شريفه سے استدلال كركے واجب العمل كهتا هو تو ايسے شخص كا شريعت ميں كيا حكم هے؟ اور اس شخص كے پيچھےنماز پڑھنا جائز هے يا نهيں؟ (المستفتي نمبر 1462، مولوي محمد شفيع صاحب، مدرس اول مدرسه اسلاميه شهر ملتان، 23 ربيع الاول 1356ھ، بمطابق 3 جون 1937ع)

جواب:  (واولي الأمر منكم) سے علماء يا حكام مسلمين مراد هيں۔ يعني ايسے حكام جو مسلمان هو اور خدا اور رسول صلى الله عليه وسلم كے حكم كے موافق احكام جاري كريں۔ ايسے مسلمان حاكم جو خدا اور رسول كے احكام كے خلاف حكم جاري كريں ( ومن لم يحكم بما أنزل الله فأولئك هم الكافرون) ميں داخل هيں اور خدا اور رسول كے خلاف حكم جاري كرنے والوں كو  قرآن پاك ميں طاغوت فرمايا گيا هے، اور طاغوت كي اطاعت حرام هے۔پس جو شخص ايسے حكام كو جو الهي شريعت اور آسماني قانون كے خلاف حكم كرتے هيں (وأولي الأمر منكم) ميں داخل قرار دے وه قرآن پاك كي نصوص صريحه كي مخالفت كرتا هے۔ انگريزي قانون كے ما تحت خلاف شرع حكم كرنے والے خواه غير مسلم هو خواه نام كے مسلمان؛ طاغوت هيں اور اولي الامر ميں كسي طرح داخل نهيں هو سكتے۔ ان كو اولي الامر ميں داخل كرنے والا يا مجنون هے يا جاهل هے يا فاسق، اور ايسي حالت ميں اس كو مقتدا بنانا اور امام مقرر كرنا نا جائز هے۔ فقط محمد كفايت الله كان الله له۔ (كفاية المفتي، جلد1، ص139)

অনুবাদ: “শরীয়তের খেলাফ শাসনকারী শাসক তাগুত। তাকে যারা ‘উলুল আমর’ এর অন্তর্ভুক্ত মনে করবে তাদের ইমামতি করা নাজায়েয।

প্রশ্ন: যারা পবিত্র আয়াতে কারীমা وأولي الأمر منكم কে চলমান আইনের শাসকদের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে এবং এ আয়াতের আলোকে দলীল দিয়ে চলমান মানবরচিত আইনের শাসকদের হুকুমকে মান্য করা ওয়াজিব বলে, এমন ব্যক্তির শরঈ হুকুম কী এবং এমন ব্যক্তির পেছনে নামায পড়া জায়েয আছে? নাকি নেই? (মুস্তাফতী নম্বর ১৪৬২, মৌলভী মুহাম্মদ শফী সাহেব, মুদাররিসে আউয়াল, মাদরাসায়ে ইসলামিয়া, মুলতান শহর, ২৩ রবিউল আউয়াল ১৩৫২হি: মোতাবেক ৩জুন ১৯৩৭খ্রি.)

উত্তর:

(وأولي الأمر منكم) দ্বারা উলামা অথবা মুসলিম শাসক উদ্দেশ্য। অর্থাৎ এমন শাসক যারা মুসলমান হবে এবং আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের বিধান অনুযায়ী হুকুম জারি করবে। আর এমন শাসক যে আল্লাহ ও রাসূলের বিধানের বিপরীত হুকুম জারি করে, তা হলে সে (ومن لم يحكم بما أنزل الله فأولئك هم الكافرون)-এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে এবং আল্লাহ ও রাসূলের বিধানের বিপরীত বিধান যারা জারি করে কুরআন পাকে তাদেরকে তাগুত বলা হয়েছে, আর তাগুতের আনুগত্য হারাম।

অতএব ইলাহী শরীয়ত ও আসমানি বিধানের বিপরীত শাসনকারী শাসককে যারা (وأولي الأمر منكم) এর অন্তর্ভুক্ত বলে সাব্যস্ত করে, তারা কুরআন পাকের স্পষ্ট বক্তব্যের বিরোধিতা করে। ইংরেজদের আইনের অধীনে শরীয়তের খেলাফ শাসনকারী ব্যক্তি, চাই গায়রে মুসলিম হোক কিংবা নামের মুসলিম হোক, সর্বাবস্থায় সে তাগুত, সে কোনো অবস্থায় (وأولي الأمر منكم) এর অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। তাদেরকে যারা (وأولي الأمر منكم) এর অন্তর্ভুক্ত মনে করে তারা হয়ত পাগল, নয়ত মূর্খ, নয়ত ফাসেক। এমতাবস্থায় তাকে মুকতাদা ও অনুসরণীয় বানানো এবং তাকে ইমাম বানানো জায়েয নেই। -মুহাম্মদ কেফায়াতুল্লাহ, আল্লাহ তাঁর পক্ষে।  (কেফায়াতুল মুফতী ১/১৩৯)

মুফতী রশীদ আহমদ লুধিয়ানভী রহিমাহুল্লাহ-এর ফাতওয়া

سوال: حكومت برما اپنے مسلم باشندوں پر ظلم كر رهي هے حتى كه ان كے مذهبي احكام پر پابندي لگا رهي هے، فرائض شرعيه كي ادائيگي ميں مانع هو رهي هے،  دريں حالات مسلم باشندوں پر ايسي حكومت سے جهاد كرنا فرض هے يا نهيں؟ نيز اموال زكوة كے ذريعےايسے مجاهدين كي مدد كي جا سكتي هے يا نهيں؟ بينوا تؤجروا۔

الجواب باسم ملهم الصواب: ان حالات ميں ايسي حكومت كافره سے جهاد كرنافرض هے، اس مقصد كے ليے ايسي نتظيم  ضروري هے جو علمائے ماهرين، متقنين و أهل بصيرت كي نگراني ميں حدود شريعت كے اندر كام كرے، دوسرے ممالك كے مسلمانوں پر بھي بالترتيب الاقرب فالأقرب تعاون كرنا فرض هے، اور جهاد كي استطاعت نه هو تو وهاں سے هجرت كرنا فرض هے۔ (أحسن الفتاوى، ج6، ص 28)

অনুবাদ: “প্রশ্ন: বার্মা হুকুমত তাদের মুসলিম অধিবাসীদের উপর জুলুম করছে, এমন কি তাদের ধর্মীয় বিধি-বিধানের উপরও পাবন্দি লাগিয়ে দিচ্ছে। শরঈ ফরয দায়িত্বসমূহ আদায় করার ক্ষেত্রে বাধা দিচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে এমন শাসকের বিরুদ্ধে জিহাদ করা মুসলমানদের উপর ফরয কিনা? এমনিভাবে যাকাতের মাল দ্বারা এমন মুজাহিদীনকে সাহায্য করা যাবে কিনা?

উত্তর:

এমন পরিস্থিতিতে এমন কাফের হুকুমতের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ফরয। আর এ উদ্দেশ্যে এমন একটি সংগঠন থাকা জরুরি যা অভিজ্ঞ উলামায়ে কেরাম, বলিষ্ঠ ও দূর দৃষ্টি সম্পন্ন ব্যক্তিবর্গের তত্ত্বাবধানে শরীয়তের সীমানার মধ্যে থেকে কাজ করবে। অন্যান্য দেশের মুসলমানের উপর ধারা পরম্পরা নিকটবর্তী হিসাবে সাহায্য করা ফরয। আর যদি জিহাদ করার মতো শক্তি না থাকে, তা হলে হিজরত করা ফরয।” (আহসানুল ফাতাওয়া ৬/২৮)

ইমাম ইবনে কাসীর রহিমাহুল্লাহ-এর সুস্পষ্ট বক্তব্য:

ইবনে কাসীর রহিমাহুল্লাহ এ বিষয়ে বিস্তারিত ও সুস্পষ্ট কথা বলেছেন। তিনি أَفَحُكْمَ الْجَاهِلِيَّةِ يَبْغُونَ وَمَنْ أَحْسَنُ مِنَ اللَّهِ حُكْمًا لِقَوْمٍ يُوقِنُونَ এ আয়াতে কারীমার ব্যাখ্যায় লিখেন-

وقوله: {أفحكم الجاهلية يبغون ومن أحسن من الله حكما لقوم يوقنون} ينكر تعالى على من خرج عن حكم الله المحكم المشتمل على كل خير، الناهي عن كل شر وعدل إلى ما سواه من الآراء والأهواء والاصطلاحات، التي وضعها الرجال بلا مستند من شريعة الله، كما كان أهل الجاهلية يحكمون به من الضلالات والجهالات، مما يضعونها بآرائهم وأهوائهم، وكما يحكم به التتار من السياسات الملكية المأخوذة عن ملكهم جنكزخان، الذي وضع لهم اليساق وهو عبارة عن كتاب مجموع من أحكام قد اقتبسها عن شرائع شتى، من اليهودية والنصرانية والملة الإسلامية، وفيها كثير من الأحكام أخذها من مجرد نظره وهواه، فصارت في بنيه شرعا متبعا، يقدمونها على الحكم بكتاب الله وسنة رسوله صلى الله عليه وسلم. ومن فعل ذلك منهم فهو كافر يجب قتاله، حتى يرجع إلى حكم الله ورسوله [صلى الله عليه وسلم] فلا يحكم سواه في قليل ولا كثير. (تفسير القرآن العظيم، ابن كثير(

অনুবাদ: “(এ আয়াতে কারীমা) ‘তারা কি জাহিলিয়াতের ফায়সালা চায়? আর আল্লাহর বিধান (ফায়সালা) এর চাইতে উত্তম আর কার বিধান হতে পারে সেসব লোকের জন্য যারা বিশ্বাস করে’। আল্লাহ তাআলা সেসব লোকের কর্মপন্থার অসারতা বর্ণনা করছেন, যারা আল্লাহর বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, যে বিধানে সকল কল্যাণ নিহিত রয়েছে এবং যা সব ধরনের ত্রুটি থেকে মুক্ত। এমন পবিত্র বিধান থেকে মুখ ফিরিয়ে রায় কিয়াসের দিকে, মনস্কামনার দিকে এবং সেসব বিধানের প্রতি ঝুঁকেছে যারা কোনোপ্রকার শরঈ দলীলের তোয়াক্কা না করে নিজের পক্ষ থেকে বিধান তৈরি করে নিয়েছে। যেমনিভাবে জাহেলি যুগের মানুষ নিজেদের মূর্খতা ও গোমরাহি, নিজেদের মত ও মর্জি অনুযায়ী বিধি-বিধান জারি করে ফেলত। আর যেমনিভাবে তাতারিরা রাষ্ট্রীয় বিষয়াদিতে চেঙ্গিস খানের দেয়া বিধি-বিধানের অনুসরণ করত। যে তাদের জন্য ‘ইয়াসাক’ তৈরি করেছিল। আর তা হচ্ছে কিছু বিধি-বিধানের সমষ্টি যা সে ইহুদী, খ্রিস্টান ও ইসলাম ধর্মসহ বিভিন্ন ধর্ম থেকে সংগ্রহ করেছে। আর তাতে অনেক বিধান এমন রয়েছে যা সে শুধুই নিজের চিন্তা-ভাবনা ও মনস্কামনা থেকে গ্রহণ করেছে। তখন তা তার বংশধরদের মাঝে অনুসৃত বিধান হিসাবে গৃহীত হয়েছে, যাকে তারা আল্লাহর কিতাবের বিধান এবং তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের সুন্নাহের উপর প্রধান্য দিতো। তাদের মধ্য থেকে যেই এ কাজ করবে সেই কাফের, তার বিরুদ্ধে জিহাদ করা ওয়াজিব, যতক্ষণ না সে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিধানের দিকে ফিরে আসে এবং ছোট বড় সকল ক্ষেত্রে আল্লাহর বিধান ব্যতীত অন্য কোনো বিধানকে গ্রহণ না করে।”

সুতরাং এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেল যে, এ তিনটি দেশ (ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশ)-এর শাসকবর্গ হয়ত জন্মগতভাবে কাফের, অথবা তারা মুরতাদ। উভয় অবস্থায় তাদেরকে শাসন ক্ষমতা থেকে সরিয়ে দিয়ে কোনো মুসলমানকে শাসক বানানো মুসলমানদের উপর ওয়াজিব। আর এর জন্য যত ধরনের ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি তা গ্রহণ করা ফরয। যেহেতু জিহাদ ব্যতীত এ উদ্দেশ্য হাসেল করা সম্ভব নয়, সেহেতু উপমহাদেশের কাফের ও মুরতাদ শাসকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা মুসলমানদের উপর ফরয।

যদি কেউ এ মাসাআলায় দ্বিমত করেন এবং মুসলিম দাবিদার শাসকদেরকে কাফের মানতে প্রস্তুত না হন, তা হলে এ জাতীয় দ্বিমতের কারণে এসকল শাসকের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ফরয হওয়ার মাসআলায় কোনোপ্রকার প্রভাব পড়ে না। ভারতের ক্ষেত্রে তো বিষয়টি স্পষ্ট, অতএব ভারতের শাসকদের বিরুদ্ধে জিহাদ ফরয হওয়ার মাসআলায় তাঁদের কোনো দ্বিমত থাকার সুযোগ নেই। আর যেসব শাসক নিজেদেরকে মুসলিম দাবি করে তাদের বেলায়ও জিহাদ ফরয হওয়ার মাসআলা বরাবর। কেননা তারা খিলাফতে ইসলামিয়া ও ইমারতে ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠার পথে বাধা প্রদানকারী। আর আল্লাহ বিধান বাস্তবায়ন করার পথে যে বাধা হবে, তার বিরুদ্ধে জিহাদ করা ফরয। অতএব এসকল শাসকের বিরুদ্ধেও জিহাদ করা ফরয হওয়ার মাসাআলায় এ সকল দ্বিমতকারী ব্যক্তির জিহাদের মাসআলায় দ্বিমত না করা চাই।

সাম্প্রতিককালে আপনারা আশা করি দেখেছেন, আফগানিস্তানে আমেরিকান শয়তানদের থেকে মুক্ত হওয়ার চুক্তির (দোহা চুক্তির) ফলাফলে যুদ্ধবিরতির পরও ইমারতে ইসলামিয়ার মুজাহিদীন জিহাদ বন্ধ করেননি। অথচ তাদের যুদ্ধ এমন সব লোকের সাথে চলছিল যারা নিজেদেরকে মুসলমান হিসাবে প্রকাশ করে। এ লড়াই সম্পর্কে তালেবান মুজাহিদীনের বক্তব্য এটাই ছিল যে, ইমারতে ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠার জন্য তাদের বিরুদ্ধে লড়াই চলছে। অতএব যতক্ষণ পর্যন্ত ইমারতে ইসলামিয়া মজবুতভাবে প্রতিষ্ঠিত না হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত জিহাদ চলতে থাকবে। আর এ জিহাদ সেসব ব্যক্তির বিরুদ্ধে যারা ইমারতে ইসলামিয়ার জন্য বাধা।

আশা করি আপনাদের এ কথাও জানা আছে যে, আফগান জাতীয় সেনাদলের বিরুদ্ধে তালেবানের এ লড়াইকে পাকিস্তান ও বাংলাদেশের উলামায়ে কেরাম সমর্থন করেছেন। মুফতী তাকী উসমানী সাহেবসহ অন্যান্য উলামায়ে কেরাম আফগান বাহিনীকে কাফের মনে না করলেও তাদের বিরুদ্ধে তালেবানের লড়াইকে অবশ্যই সমর্থন করেন। অতএব বোঝা যাচ্ছে, ইসলামের দাবিদার শাসকদেরকে তাকফীর করার ক্ষেত্রে যারা দ্বিমত করেন, তাঁরাও এ কথা মানতে হবে যে, এ সকল শাসকের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ফরয।

তৃতীয় যিম্মাদারী: খিলাফতে ইসলামিয়া ও ইমারতে ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠা

মুসলমান যখন সামষ্টিকভাবে একটি ভূখণ্ডে বসবাস করে, তখন তাদের সামষ্টিক একটি রূপও হয়, আর সে সামষ্টিক অবস্থানের উপর শরীয়তের কিছু বিধি-বিধানও আরোপ হয়, যাকে শরীয়ত বাস্তবায়ন কিংবা ইমারত প্রতিষ্ঠা বলে প্রকাশ করা হয়। এ বিষয়টিকে কুরআন, হাদীস ও ফিকহ যেভাবে মূল্যায়ন করে তা খুবই সংক্ষেপে তুলে ধরছি।

কুরআন কী বলে?

মানবজাতির অস্তিত্ব, আল্লাহর বিধান প্রয়োগের যিম্মাদারী, আল্লাহর বিধানের বিজয়, রাসূল প্রেরণের মৌলিক উদ্দেশ্য অন্যান্য ধর্ম ও বিধানের উপর আল্লাহর বিধানের প্রাধান্য দেয়া, মুশরিক কাফের ও মনস্কামনার বিরুদ্ধে আল্লাহর বিধান প্রয়োগ, প্রতিটি ছোট বড় বিষয়ের ক্ষেত্রে আল্লাহর হাকিমিয়্যাত, রাসূলের খিলাফত ও উম্মতের প্রতিনিধিত্ব এবং আল্লাহর বিধান থেকে বিমুখ হওয়ার ফলাফলের বিবরণ ইত্যাদি। এগুলো এমন কিছু বিষয় যেগুলোর প্রতি কুরআন কারীম বার বার বিভিন্নভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে এবং এ বিষয়গুলোতে কুরআনের নির্দেশনা খুবই স্পষ্ট ও স্বচ্ছ।

নিচের আয়াতগুলো দেখুন-

وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي جَاعِلٌ فِي الْأَرْضِ خَلِيفَةً قَالُوا أَتَجْعَلُ فِيهَا مَنْ يُفْسِدُ فِيهَا وَيَسْفِكُ الدِّمَاءَ وَنَحْنُ نُسَبِّحُ بِحَمْدِكَ وَنُقَدِّسُ لَكَ قَالَ إِنِّي أَعْلَمُ مَا لَا تَعْلَمُونَ.

অনুবাদ: “স্মরণ কর যখন তোমার রব ফেরেশতাগণকে বলেছেন, আমি জমিনের বুকে প্রতিনিধি বানাতে যাচ্ছি। তারা বললেন, আপনি জমিনে এমন কাউকে সৃষ্টি করবেন, যারা সেখানে ফাসাদ সৃষ্টি করবে এবং রক্ত ঝরাবে? অথচ আমরা আপনার তাসবীহ ও হামদ করছি এবং আপনার পবিত্রতা বর্ণনা করছি। তিনি বলেন, আমি জানি যা তোমরা জান না।” –(সূরা বাকারা, ০২:৩০)

তাফসীরে জালালাইনে এসেছে-

{و} اذكر يا محمد {إذ قال ربك للملائكة إني جاعل في الأرض خليفة} يخلفني في تنفيذ أحكامي فيها

অনুবাদ: “(আর) স্মরণ কর হে মুহাম্মাদ (যখন তোমার রব্ব ফেরেশতাদেরকে বলেছেন, আমি জমিনের বুকে খলীফা বানাতে যাচ্ছি) যারা জমিনের বুকে আমার বিধি-বিধান বাস্তবায়ন করার ক্ষেত্রে প্রতিনিধিত্ব করবে।”

هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُونَ.

অনুবাদ: “ঐ আল্লাহ তিনিই তো যিনি তাঁর রাসূলকে হেদায়াত ও সত্য ধর্ম নিয়ে পাঠিয়েছেন, যাতে তিনি এ দ্বীনকে সকল ধর্মের উপর বিজয়ী করেন, চাই মুশরিকরা যতই অপছন্দ করুক।” –(সূরা তাওবা, ০৯:৩৩)

هُوَ الَّذِي أَرْسَلَ رَسُولَهُ بِالْهُدَى وَدِينِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّينِ كُلِّهِ وَكَفَى بِاللَّهِ شَهِيدًا.

অনুবাদ: “ঐ আল্লাহ তিনিই তো যিনি তাঁর রাসূলকে হেদায়াত ও সত্য ধর্ম নিয়ে পাঠিয়েছেন, যাতে তিনি এ দ্বীনকে সকল ধর্মের উপর বিজয়ী করেন, সাক্ষী হিসাবে আল্লাহই যথেষ্ট।” –(সূরা ফাতহ, ৪৮:২৮)

وَأَنِ احْكُمْ بَيْنَهُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ وَلَا تَتَّبِعْ أَهْوَاءَهُمْ وَاحْذَرْهُمْ أَنْ يَفْتِنُوكَ عَنْ بَعْضِ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ إِلَيْكَ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَاعْلَمْ أَنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ أَنْ يُصِيبَهُمْ بِبَعْضِ ذُنُوبِهِمْ وَإِنَّ كَثِيرًا مِنَ النَّاسِ لَفَاسِقُونَ.

অনুবাদ: “আপনি তাদের মাঝে ফায়সালা করুন ঐ (শরীয়ত) অনুযায়ী যা আল্লাহ অবতীর্ণ করেছেন এবং তাদের মনস্কামনার অনুসরণ করবেন না। আর আপনি সতর্ক থাকুন, যেন আল্লাহ আপনার প্রতি যা নাযিল করেছেন তার কোনো কিছু থেকে তারা আপনাকে বিচ্যুত করতে না পারে। যদি তারা মুখ ফিরিয়ে নেয় তা হলে আপনি জেনে রাখুন, আল্লাহ তাদেরকে তাদের কোনো গুনাহের শাস্তি দিতে চাচ্ছেন। আর অধিকাংশ মানুষ ফাসেক ও নাফরমান।” –(সূরা মায়েদা, ০৫:৪৯)

فَلَا تَخْشَوُا النَّاسَ وَاخْشَوْنِ وَلَا تَشْتَرُوا بِآيَاتِي ثَمَنًا قَلِيلًا وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَئِكَ هُمُ الْكَافِرُونَ.

অনুবাদ: “(তখন তাদেরকে বলে দেয়া হয়েছিল) তোমরা মানুষকে ভয় করো না, তোমরা আমাকে ভয় কর। আর তোমরা সামান্য মূল্যের বিনিময়ে আমার আয়াতগুলো বিক্রয় করে দিও না। আর যারা আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান দিয়ে ফায়সালা করে না তারাই তো কাফের।” –(সূরা মায়েদা, ০৫:৪৪)

হাদীসের নির্দেশনা

এমনিভাবে হাদীসে নববীতে খিলাফত ও ইমারতে ইসলামিয়ার এমন প্রতিচ্ছবি তুলে ধরা হয়েছে, যা সামনে রাখার পর উম্মতের জন্য কোনোপ্রকার সন্দেহ সংশয়ের বিন্দুমাত্র বাকি থাকে না।

আমীর ও খলীফার গুণাগুণ, ইমামের যিম্মাদারী, রাজনীতি তথা পরিচালনার পদ্ধতি, আনুগত্যের ধরন, রাজনীতি তথা পরিচালনা ও আনুগত্যের গুরুত্ব, পরিচালনার দায়িত্ব থেকে দূরে থাকা ও আনুগত্য না করার উপর ধমকি, আমীরের জন্য পরিচালনার সীমারেখা, অধীনস্থদের জন্য আনুগত্যের সীমারেখা,  ইজতিমায়ী ও সামষ্টিক জীবনের গুরুত্ব, আমীর ব্যতীত সামষ্টিক জীবনের ধারণা অসম্ভব হওয়া, খিলাফত, বাইয়াত, বাইয়াত রক্ষা করা, বিদ্রোহ করা ওয়াজিব হওয়া, জায়েয হওয়া ও হারাম হওয়া ইত্যাদি রাজনৈতিক তথা উম্মতকে পরিচালনা বিষয়ে হাদীসের কিতাবাদিতে আলাদা আলাদা অধ্যায়সমূহ রয়েছে। মোটকথা, হাদীসে নববীতে সিয়াসত তথা উম্মতকে পরিচালনা করার এমন কোনো দিক অস্পষ্ট অথবা গুরুত্বহীনভাবে রেখে দেয়া হয়নি যা নিয়ে আমরা এখন সন্দেহ কিংবা সংশয়ে পড়তে হবে। ফালিল্লাহিল হামদ। সম্মানিত পাঠকবর্গ নিচে উল্লেখিত হাদীসগুলো দেখতে থাকুন এবং বাস্তব অবস্থা প্রত্যক্ষ করতে থাকুন-

عن أبي هريرة رضي الله عنه: أنه سمع رسول الله صلى الله عليه و سلم يقول: من أطاعني فقد أطاع الله ومن عصاني فقد عصى الله ومن يطع الأمير فقد أطاعني ومن يعص الأمير فقد عصاني وإنما الإمام جنة يقاتل من ورائه ويتقى به فإن أمر بتقوى الله وعدل فإن له بذلك أجرا وإن قال بغيره فإن عليه منه. (صحيح البخاري، كتاب الجهاد والسير، باب يقاتل من وراء الإمام ويتقى به(

অনুবাদ: “আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে আমার আনুগত্য করল সে আল্লাহর আনুগত্য করল, আর যে আমার অবাধ্যতা করল সে আল্লাহর সঙ্গে অবাধ্যতা করল। আর যে আমীরের আনুগত্য করল সে আমার আনুগত্য করল, যে আমীরের অবাধ্যতা করল সে আমার অবাধ্যতা করল। ইমাম হচ্ছে ঢাল। তাঁর অধীনে থেকে যুদ্ধ করা হবে এবং তাঁর মাধ্যমেই আত্মরক্ষা করা হবে। অতএব আমীর যদি আল্লাহর ভয় ও ইনসাফের হুকুম করে তা হলে সে এর বিনিময় পাবে। আর যদি এর বিপরীত কিছু বলে তা হলে তার বোঝাও তার উপর চাপানো হবে।”

عن أم الحصين قالت: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: إن أمر عليكم عبد مجدع يقودكم بكتاب الله فاسمعوا له وأطيعوا. (صحيح مسلم، كتاب الإمارة، باب وجوب طاعة الأمراء في غير معصية وتحريمها في معصية (

অনুবাদ: “উম্মে হুসাইন থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যদি তোমাদের উপর কোনো নাক কাটা গোলামকেও আমীর বানিয়ে দেয়া হয়, যে তোমাদেরকে আল্লাহর কিতাবের আলোকে পরিচালনা করে, তা হলে তোমরা তাঁর কথা শোনো এবং তাঁর আনুগত্য কর।”

نافع عن عبد الله رضي الله عنه: عن النبي صلى الله عليه و سلم قال (السمع والطاعة على المرء المسلم فيما أحب وكره ما لم يؤمر بمعصية فإذا أمر بمعصية فلا سمع ولا طاعة. (صحيح البخاري، كتاب الجهاد والسير، باب السمع والطاعة للإمام، وصحيح مسلم، كتاب الإمارة، باب وجوب طاعة الأمراء في غير معصية وتحريمها في معصية (

অনুবাদ: “আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, পছন্দ অপছন্দ সকল অবস্থায় মুসলিম ব্যক্তির উপর শোনা ও আনুগত্য করা ওয়াজিব, যতক্ষণ না সে গুনাহের আদেশ দেয়। আর যখন গুনাহের আদেশ দেবে তখন তার কথা শোনাও হবে না এবং তার আনুগত্যও করা হবে না।”

وعن عبادة بن الصامت قال: بايعنا رسول الله صلى الله عليه وسلم على السمع والطاعة في العسر واليسر والمنشط والمكره وعلى أثرة علينا، وعلى أن لا ننازع الأمر أهله، وعلى أن نقول بالحق أينما كنا لا نخاف في الله لومة لائم. وفي رواية: وعلى أن لا ننازع الأمر أهله إلا أن تروا كفرا بواحا عندكم من الله فيه برهان. (المصدر السابق(

অনুবাদ: “উবাদাহ ইবনে সামিত রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমরা রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের হাতে এ বিষয়গুলোর উপর বাইয়াত হয়েছি: শোনা ও আনুগত্য করা, কঠিন অবস্থায় এবং সহজ অবস্থায়, পছন্দনীয় ক্ষেত্রে, অপছন্দনীয় ক্ষেত্রে এবং আমাদের উপর অন্যকে প্রাধান্য দেয়ার ক্ষেত্রেও। খিলাফত ও ইমারতের বিষয়ে আমরা যেন শাসকদের সাথে লড়াই ঝগড়া না করি। যেখানেই হোক আমরা যেন সত্য কথা বলি, আল্লাহর বিষয়ে আমরা কোনো নিন্দাকারীর নিন্দাকে যেন ভয় না করি।

অপর এক বর্ণনায় আছে, আমরা যেন শাসকদের সাথে শাসন ক্ষমতা নিয়ে লড়াই না করি, তবে যদি তোমরা স্পষ্ট কুফর দেখ, যার পক্ষে আল্লাহর পক্ষ থেকে তোমাদের কাছে প্রমাণ আছে।”

وعن ابن عباس قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: من رآى أميره يكرهه فليصبر، فإنه ليس أحد يفارق الجماعة شبرا فيموت إلا مات ميتة جاهلية. (صحيح البخاري، كتاب الأحكام، باب السمع والطاعة للإمام ما لم تكن معصية(

অনুবাদ: “ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে দেখে তার আমীর তাকে তার অপছন্দনীয় কোনো কাজে বাধ্য করছে সে যেন তার উপর সবর করে। কেননা যে জামাত থেকে এক বিঘত পরিমাণ দূরত্বে অবস্থান করবে এবং ঐ অবস্থায় সে মারা যায় তাহলে সে জাহেলি মৃত্যুবরণ করল।”

وعن عبد الله بن عمر قال: سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول: من خلع يدا من طاعة لقي الله يوم القيامة ولا حجة له، ومن مات وليس في عنقه بيعة مات ميتة جاهلية. (المصدر السابق(

অনুবাদ: “আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আমীরের আনুগত্য থেকে হাত গুটিয়ে নেবে, সে কিয়ামতের দিন এমন অবস্থায় আল্লাহর মুখোমুখি হবে যে, তার পক্ষে কোনো দলীল থাকবে না। আর যে ব্যক্তি ইমামুল মুসলিমীনের হাতে বাইয়াত না করা অবস্থায় মারা গেল, সে জাহেলি মৃত্যুবরণ করল।”

وعن أبي هريرة عن النبي صلى الله عليه وسلم قال: كانت بنو إسرائيل تسوسهم الأنبياء كلما هلك نبي خلفه نبي وإنه لا نبي بعدي وسيكون خلفاء فيكثرون. قالوا فما تأمرنا؟ قال: فوا ببيعة الأول فالأول أعطوهم حقهم فإن الله سائلهم عما استرعاهم. (صحيح البخاري، كتاب الأنبياء، باب ما ذكر عن بني إسرائيل(

অনুবাদ: “আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহ আনহু থেকে বর্ণিত, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, বনি ইসরাঈলের শাসন ক্ষমতা নবীগণ পরিচালনা করতেন। এক নবীর মৃত্যুর পর আরেক নবী আসতেন। আর আমার পর কোনো নবী আসবেন না। আমার পর খলীফাগণ হবে এবং তাঁরা অনেক হবেন। সাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহ আনহুম জিজ্ঞেস করলেন, সে ক্ষেত্রে আপনি আমাদেরকে কী আদেশ করেন? তিনি বলেছেন, প্রথম জনের বাইয়াতকে রক্ষা কর, এরপর পরবর্তী প্রথম জনের বাইয়াতকে রক্ষা কর। তাঁদেরকে তাঁদের হক আদায় করে দাও, কেননা আল্লাহ তাআলা তাঁদেরকে তাঁদের অধীনস্থদের বিষয়ে জিজ্ঞেস করবেন।”

وعن أبي سعيد قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: إذا بويع لخليفتين فاقتلوا الآخر منهما. (صحيح مسلم، كتاب الإمارة، باب إذا بويع لخليفتين(

অনুবাদ: “আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহ আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন দুই খলীফার হাতে বাইয়াত হবে, তখন তোমরা তাদের দুইজনের শেষে বাইয়াত গ্রহণকারীকে (দ্বিতীয় জনকে) হত্যা করে দাও।”

وعن عبد الله بن عمرو قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: من بايع إماما فأعطاه صفقة يده وثمرة قلبه فليطعه إن استطاع، فإن جاء آخرينازعه فاضربوا عنق الآخر. (صحيح مسلم، كتاب الإمارة، باب الوفاء ببيعة الخلفاء الأول فالأول(

অনুবাদ: “আব্দুল্লাহ ইবনে আমর রাযিয়াল্লাহ আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যে ব্যক্তি কোনো ইমামের হাতে হাত দিয়ে নিষ্ঠার সাথে বাইয়াত হয়েছে, সে যেন যথাসাধ্য তার আনুগত্য করে। এরপর যদি অপর কেউ তার সঙ্গে ক্ষমতা নিয়ে কাড়াকাড়ি করতে আসে, তা হলে তার গর্দান উড়িয়ে দাও।”

عن الحارث الأشعري قال: قال النبي صلى الله عليه و سلم وأنا آمركم بخمس الله أمرني بهن السمع والطاعة والجهاد والهجرة والجماعة فإن من فارق الجماعة قيد شبر فقد خلع ربقة الإسلام من عنقه إلا أن يرجع ومن ادعى دعوى الجاهلية فإنه من جثا جهنم فقال رجل يا رسول الله وإن صلى وصام ؟ قال وإن صلى وصام. وفي رواية: وزعم أنه مسلم. (سنن الترمذي، كتاب الأمثال عن رسول الله صلى الله عليه و سلم، باب ما جاء في مثل الصلاة والصيام والصدقة، ومسند أحمد في مسند الحارث الأشعري(

অনুবাদ: “হারেস আশআরী রাযিয়াল্লাহ আনহু বলেন, নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, আমি তোমাদেরকে পাঁচটি বিষয়ে আদেশ করছি, যে পাঁচটি বিষয়ে আল্লাহ আমাকে আদেশ দিয়েছেন। শোনা, আনুগত্য করা, জিহাদ করা, হিজরত করা ও জামাতবদ্ধ থাকা। কেননা যে জামাত থেকে এক বিঘত পরিমাণ দূরে সরে যাবে, সে তার গলা থেকে ইসলামের বন্ধনকে খুলে রাখলো, যতক্ষণ না সে ফিরে আসে। আর যে জাহেলিয়াতের দিকে ডাকে, সে জাহান্নামীদের একজন। এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলো, ইয়া রাসুলাল্লাহ! যদি নামায রোযা আদায় করে তবুও? তিনি বললেন, হ্যাঁ, নামায রোযা করলেও এবং নিজেকে মুসলিম মনে করলেও।”

أبو سعيد الخدري رضي الله عنه قال: قال رسول الله صلى الله عليه وسلم: إذا خرج ثلاثة في سفر فليؤمروا أحدهم. (سنن أبي داود، كتاب الجهاد، باب في القوم يسافرون يؤمرون أحدهم(

অনুবাদ: “আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন তিন জন সফরে বের হবে তখন তারা যেন তাদের একজনকে আমীর বানিয়ে নেয়।”

ফিকহ ও ইজতিহাদের সিদ্ধান্ত

উল্লেখিত আয়াত ও হাদীস থেকে প্রত্যেক জমানার মুজতাহিদ, মুফাসসীর ও মুহাদ্দিস উলামায়ে কেরাম সেসব মাসআলা বের করেছেন তা বিস্তারিত নিম্নরূপ-

শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিস দেহলভী রহিমাহুল্লাহ বলেন-

اعلم أنه يجب أن يكون في جماعة المسلمين خليفة لمصالح لا تتم إلا بوجوده، وهي كثيرة جدا يجمعها صنفان:

أحدهما ما يرجع إلى سياسة المدينة من ذب الجنود التي تغزوهم وتقهرهم، وكف الظالم عن المظلوم، وفصل القضايا، وغير ذلك، وقد شرحنا هذه الحاجات من قبل.

وثانيهما ما يرجع إلى الملة، وذلك أن تنويه دين الإسلام على سائر الأديان لا يتصور إلا بأن يكون في المسلمين خليفة ينكر على من خرج من الملة، وارتكب ما نصت على تحريمه أو ترك ما نصت على افتراضه أشد الانكار، ويذل أهل سائر الأديان ويأخذ منهم الجزية عن يد وهم صاغرون، وإلا كانوا متساوين في المرتبة لا يظهر فيهم رجحان إحدى الفرقتين على الأخرى، ولم يكن كابح يكبحهم عن عدوانهم. (حجة الله البالغة، من أبواب سياسة المدن(

অনুবাদ: “জেনে রাখো, মুসলমানদের জামাতে একজন খলীফা থাকা ওয়াজিব, এমন কিছু প্রয়োজনে যা খলীফাতুল মুসলিমীন ব্যতীত সম্পন্ন হওয়া সম্ভব নয়, আর সে প্রয়োজনগুলো সংখ্যায় অনেক। এসব মোট দুই প্রকার:

দুই প্রকারের এক প্রকার হচ্ছে, যা রাষ্ট্র পরিচালনার সাথে সম্পৃক্ত। যার মধ্যে রয়েছে সেসব বাহিনীকে প্রতিহত করা, যারা তাদের সঙ্গে লড়াই করে এবং তাদের উপর বিজয়ী হওয়ার চেষ্টা করে। মাজলুম থেকে জালিমের জুলুম দূর করা। আইন-আদালতের বিষয়গুলো তত্ত্বাবধান করা। ইত্যাদি।

আর দ্বিতীয় প্রকার হচ্ছে যা মুসলিম জাতির সাথে সম্পৃক্ত। আর তা হচ্ছে, সকল ধর্মের উপর ইসলাম ধর্মের শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠা করা, মুসলমানদের একজন খলীফা ব্যতীত কল্পনা করা যায় না। কেউ ইসলাম থেকে বের হয়ে গেলে তাকে প্রতিহত করবেন, শরীয়ত যে কাজগুলোকে হারাম করেছে তা কেউ করলে তাকে বাধা দেবেন, শরীয়ত যে কাজগুলোকে ফরয করেছে সেগুলো কেউ ছেড়ে দিলে, তাকে কঠোরভাবে দমন করবেন। অন্যসব ধর্মের অনুসারীদেরকে অপদস্থ করবেন। তাদেরকে লাঞ্ছিত করে তাদের কাছ থেকে জিযিয়া আদায় করবেন। নচেৎ তারা সম্মানের দিক থেকে বরাবর হয়ে যাবে, এক দলের উপর আরেক দলের প্রাধান্য প্রকাশ পাবে না এবং তাদেরকে তাদের সীমালঙ্ঘন থেকে নিয়ন্ত্রণ করার মতো কোনো নিয়ন্ত্রণকারী লাগাম থাকবে না।”

ইমাম নসফী রহিমাহুল্লাহ বলেন-

قال النسفي: والمسلمون لا بد لهم من إمام يقوم بتنفيذ أحكامهم، وإقامة حدودهم، وتجهيز جيوشهم وأخذ صدقاتهم، وقهر المتغلبة والمتلصصة وقطاع الطريق، وإقامة الجمع والأعياد، وقطع المنازعات الواقعة بين العباد، وقبول الشهادات القائمة على الحقوق، وتزويج الصغار والصغيرات الذين لا أولياء لهم، وقسمة الغنائم، أي نحو ذلك من الأمور التي لا يتولاها آحاد الأمة. (شرح العقائد النسفية ص: 96-97)

অনুবাদ: “মুসলমানদের জন্য একজন ইমাম থাকা জরুরি, যে সকল বিধি-বিধান বাস্তবায়নের দায়িত্ব নেবেন, তাদের দণ্ডবিধান করবেন, বাহিনী তৈরি করবেন, সাদাকা উসূল করবেন, জালিম, চোর ও ডাকাতদেরকে নিয়ন্ত্রণ করার ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন, জুমা ও ঈদের নামাযের দায়িত্ব আদায় করবেন, মানুষের মাঝে সংঘটিত ঝগড়া-বিবাদের মীমাংসা করবেন, বিভিন্ন প্রকারের হক পাওনা দেওনার ক্ষেত্রে সাক্ষ্য গ্রহণ করবেন, যেসব শিশু, ছেলে-মেয়ের অভিভাবক নেই, তাদেরকে বিয়ে-শাদী দেয়ার দায়িত্ব নেবেন, গনীমতের মাল বণ্টন করবেন। ইত্যাদি এমন সব কাজ উম্মতের ব্যক্তি বিশেষ যার দায়িত্ব নিতে পারে না।”

‘আল-ফিকহুল ইসলামী ওয়া আদিল্লাতুহু-এর ইবারত দেখুন-

وقال الإيجي في المواقف: إن في نصب الإمام دفع ضرر مظنون، وإن دفع هذا الضرر واجب شرعاً. وبيان ذلك أننا نعلم علماً يقارب الضرورة أن مقصود الشارع، فيما شرع من المعاملات، والمناكحات، والجهاد، والحدود والمقاصات، وإظهار شعائر الشرع في الأعياد والجماعات، إنما هو مصالح عائدة إلى الخلق معاشاً ومعاداً، وذلك المقصود لا يتم إلا بإمام يكون من قبل الشارع يرجعون إليه فيما تعين لهم.

وهناك برهان آخر يستتبع القيام بالوظيفة المقدسة للبشر: وهو أن مرفق القضاء الذي تقوم به الدولة أمر ضروري لفض المنازعات الدائمة بين البشر، لا سيما بعد زوال النظام القبلي الذي يحكم فيه رئيس القبيلة بالعرف والهوى الشخصي، وعدم جدوى اللجوء إلى التحكيم إذا تعذر اتفاق المتخاصمين، فلم يبق إلا القضاء الذي يلجأ إلىه كل إنسان بمفرده.

ومهمة القضاء في الإسلام لا تقتصر على إقامة العدل بالمفهوم الإلهي، وفصل الخصومات، وتطبيق أحكام الشريعة، وإنما يشمل كل ما من شأنه رعاية الحرمات الدينية، واحترام الفضيلة، وإقرار المعروف، ومكافحة المنكرات والفواحش بمختلف ألوانها.

فلولا القضاء لاستأصل البشر بعضهم، وهلكوا جميعاً، فكان وجوده رحمة، وتنظيمه فريضة، وقيام الدولة به ووجودها من أجله أمراً محتماً.

وإذا لا حظنا أن مهمة الدولة في الإسلام حراسة شؤون الدين والدنيا، وتحقيق السعادة للبشر في الحياة الدنيا والآخرة، علمنا مدى الأهمية المنوطة بالدولة المستلزمة للسعي الفوري في إيجادها، ولولا ذلك لعمت الفوضى، وشاع الفساد، وانتشر الظلم بين العباد.

والخلاصة: إن تلازم وجود الدولة مع دعوة الإسلام ودين الإسلام أمر لا يمكن فصله في مفهوم إنسان، منذ أن قامت دولة المدينة باعتبارها أول نواة لوجود الدولة بالمعنى الحديث القائم على أركان ثلاثة: هي الشعب، والإقليم (الوطن) والسلطة السياسية أو السيادة.

 

অনুবাদ: “আলঈজী ‘মাওয়াকেফ’ এ বলেছেন, সম্ভাব্য সকল সমস্যা প্রতিহত করা ইমামুল মুসলিমীন নির্ধারণ করার উপর মওকুফ। আর সমস্যাগুলো এমন যা প্রতিহত করা শরীয়তের দৃষ্টিতে ওয়াজিব। এর ব্যাখ্যা ও বিবরণ হচ্ছে, আমরা জানি, সকল লেন-দেন, বিবাহ, জিহাদ, দণ্ডবিধি, কিসাস, ঈদ, জামাআতের মাধ্যমে ইসলামের নিদর্শনাবলীর প্রকাশ, এসব কিছুকে বিধিবদ্ধ করার ক্ষেত্রে বিধানদাতার এমন কিছু উদ্দেশ্য রয়েছে, যা দুনিয়া ও আখিরাত উভয় জগতের বিষয়াদির সাথে সম্পর্কযুক্ত। আর এ উদ্দেশ্যগুলো ইমামুল মুসলিমীন ব্যতীত সম্পন্ন হতে পারে না। যে ইমামুল মুসলিমীন বিধানদাতার পক্ষ থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত হবেন এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিষয়াদির ক্ষেত্রে সবাই তার শরণাপন্ন হবে।

এখানে আরেকটি দলীল রয়েছে, যা মানুষের একটি পবিত্র যিম্মাদারী বাস্তবায়ন করাকে এর অধীনে নিয়ে আসে, আর তা হচ্ছে আদালতের ব্যবস্থাপনা, যার দ্বারা একটি রাষ্ট্র ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠিত হয়। মানুষদের পরস্পরে যেসকল ঝগড়া-বিবাদ চলতেই থাকে, এসব লড়াই ঝগড়া দূর করার জন্য একটি জরুরি বিভাগ হচ্ছে আদালত। বিশেষ করে গোত্রীয় শাসন, যার মধ্যে গোত্রের প্রধান সাধারণ প্রথা প্রচলন এবং নিজের মনস্কামনা অনুযায়ী বিচার করত, তা শেষ হয়ে যাওয়ার পর বিবাদমান দুটি পক্ষ যদি একজন বিচারকের ব্যাপারে একমত না হতে পারে, তাহলে বিচারকের শরণাপন্ন হওয়াটাই বেকার হয়ে যায়। অতএব একটি বিচারালয় ব্যতীত কোনো কিছুই স্বাভাবিক থাকতে পারে না, যে বিচারালয়ে মানুষ যেতে পারে এবং তার আশ্রয় নিতে পারে।

ইসলামে বিচারের যিম্মাদারী শুধু আদল ইনসাফ প্রতিষ্ঠা, মামলা মুকাদ্দমার ফায়সালা ও শরঈ বিধি-বিধান বাস্তবায়নের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। বরং এর মাঝে প্রত্যেক ঐ বস্তু অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যার মাঝে দ্বীনের পবিত্রতা রক্ষা এবং মর্যাদাপূর্ণ বিষয়গুলোর প্রতি সম্মান প্রদর্শনের দাবি রয়েছে। যার মাঝে ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা এবং অন্যায় ও মনস্কামনার সব ধরনের মূলোৎপাটন রয়েছে।

সুতরাং যদি বিচার ব্যবস্থা না থাকতো, তাহলে মানুষ মানুষকে মূলোৎপাটন করে ছাড়ত এবং সবাই ধ্বংস হয়ে যেত। তাই এ ব্যবস্থাপনার অস্তিত্ব একটি রহমতস্বরূপ, এর ব্যবস্থা করা ফরয, এর মাধ্যমে শাসন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা এবং এর জন্যই তার অস্তিত্ব একটি অনিবার্য বিষয়।

আর আমরা যখন দেখব, ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, দুনিয়ার সকল বিষয়াদির প্রহরা দেয়া এবং দুনিয়া ও আখিরাতে মানব জাতির সৌভাগ্যের বার্তা পৌঁছানো, তখন আমরা বুঝতে পারব যে, ইসলামী রাষ্ট্র ব্যবস্থার প্রয়োজন কতটুকু এবং এর অস্তিত্বের জন্য যে চেষ্টা প্রচেষ্টা করা চাই তা কতটুকু নগদ জরুরি কাজ। যদি এটা না হত তাহলে বিশৃঙ্খলা ব্যাপক হয়ে যেত, ফাসাদ সৃষ্টি হয়ে যেত এবং মানুষদের মাঝে জুলুম অত্যাচার ব্যাপক হয়ে যেত।

মোটকথা, দাওয়াতে ইসলাম ও দ্বীন ইসলামের সাথে রাষ্ট্র ও শাসনের অত্যাবশ্যকীয়তা এমন একটি বিষয় যাকে আলাদা করা মানুষের বিবেকে সম্ভব নয়।”

আল্লামা কাসানী রহিমাহুল্লাহ বলেন-

]كتاب آداب القاضي] [بيان فرضية نصب القاضي[

الكلام في هذا الكتاب في مواضع، في بيان فرضية نصب القاضي، وفي بيان من يصلح للقضاء، وفي بيان من يفترض عليه قبول تقليد القضاء، وفي بيان شرائط جواز القضاء، وفي بيان آداب القضاء، وفي بيان ما ينفذ من القضايا، وما ينقض منها؛ إذا رفع إلى قاض آخر، وفي بيان ما يحله القاضي وما لا يحله، وفي بيان حكم خطأ القاضي في القضاء، وفي بيان ما يخرج به القاضي عن القضاء.

(أما) الأول فنصب القاضي فرض؛ لأنه ينصب لإقامة أمر مفروض، وهو القضاء قال الله سبحانه وتعالى {يا داود إنا جعلناك خليفة في الأرض فاحكم بين الناس بالحق} [ص: 26] وقال تبارك وتعالى لنبينا المكرم عليه أفضل الصلاة والسلام: {فاحكم بينهم بما أنزل الله} [المائدة: 48] والقضاء هو: الحكم بين الناس بالحق، والحكم بما أنزل الله عز وجل، فكان نصب القاضي؛ لإقامة الفرض، فكان فرضا ضرورة؛ ولأن نصب الإمام الأعظم فرض، بلا خلاف بين أهل الحق، ولا عبرة – بخلاف بعض القدرية -؛ لإجماع الصحابة – رضي الله عنهم – على ذلك، ولمساس الحاجة إليه؛ لتقيد الأحكام، وإنصاف المظلوم من الظالم، وقطع المنازعات التي هي مادة الفساد، وغير ذلك من المصالح التي لا تقوم إلا بإمام، لما علم في أصول الكلام. (بدائع الصنائع في ترتيب الشرائع، للكاساني الحنفي ৫৮৭ه، كتاب آداب القاضي، بيان فرضية نصب القاضي(

অনুবাদ: “কিতাবু আদাবিল কাজী-এর কয়েকটি জায়গায় এ বিষয়ে আলোচনা রয়েছে। যেমন: কাজী নির্ধারণ করা ফরয হওয়ার বয়ান, কাজী হওয়ার উপযুক্ততার বয়ান, কাজীর আদব ও শর্তাবলির বয়ান, ফায়সালার ক্ষেত্রে যেসব ফায়সালা বাস্তবায়ন হবে এবং যেসব ফায়সালা অন্য কাজীর কাছে গিয়ে মুলতবী হয়ে যাবে সেসবের বয়ান, কাজী যাকে হালাল বলে এবং যাকে হালাল বলে না এ বিষয়ক বয়ান, ফায়সালা করার ক্ষেত্রে কাজীর ভুলসমূহের বয়ান এবং যেসব কারণে কাজী বিচার করার অধিকার হারিয়ে ফেলে সেসবের বয়ান।

এগুলোর মধ্যে সর্ব প্রথম বিষয় হচ্ছে বিচারপতি নির্ধারণ করা। এ বিষয়টি ফরয। কেননা তাকে নিয়োগ দেয়া হয় একটি ফরয দায়িত্ব পালন করার জন্য। আর তা হচ্ছে বিচার। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন, ‘হে দাউদ! আমি তোমাকে জমিনের বুকে খলীফা বানিয়েছি। অতএব তুমি হক দ্বারা মানুষদের মাঝে ফায়সালা কর’। আল্লাহ তাআলা আমাদের নবী কারীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে সম্বোধন করে বলেন, “আপনি মানুষদের মাঝে তা দ্বারা ফায়সালা করুন, যা আল্লাহ নাযিল করেছেন।”

আর কাজা হচ্ছে, মানুষের মাঝে হক ফায়সালা করা এবং আল্লাহ যা নাযিল করেছেন তা দিয়ে ফায়সালা করা। সুতরাং কাজী নিয়োগ করা হচ্ছে ফরয প্রতিষ্ঠা করার জন্য, তাই অত্যাবশ্যকীয়ভাবে কাজী নিয়োগ করাও ফরয হবে। আর তা এ জন্য যে, রাষ্ট্রপ্রধান নির্বাচন ফরয এবং এ বিষয়ে উলামায়ে কেরামের মাঝে কোনো দ্বিমত নেই। আর কাদারিয়া গোষ্ঠীর কিছু লোক যে দ্বিমত করে তার কোনো ধর্তব্য নেই। কারণ এ বিষয়ে সাহাবায়ে কেরামের ইজমা রয়েছে। তাছাড়া এর প্রয়োজনও সুস্পষ্ট। বিধানসমূহ বাস্তবায়নের জন্য, জালিম থেকে মজলুমের হক আদায় করার জন্য, পরস্পরের লড়াই ঝগড়াকে দূর করার জন্য যা ফাসাদের মূল ইত্যাদি কার্যক্রম যা ইমাম তথা রাষ্ট্রপ্রধান ব্যতীত সম্ভব নয়, যা ইলমে কালামের মূলনীতি থেকে জানা যায়।”

এসকল ‘নস’ ও বক্তব্য থেকে এ বিষয়টি স্পষ্ট হয়ে গেছে যে, মুসলমানদের ইজতিমায়ী জীবন কোনো একজন ইমাম কিংবা শাসক ব্যতীত চলতে পারে না। সে কারণে একজন ইমাম ও শাসক নির্বাচন করা মুসলমানদের উপর ফরয। যখনই কোনো কারণে মুসলমানদের এ ইমাম ও শাসক থাকবে না, তখন ইমাম ও শাসক নির্বাচন করে নেয়া জরুরি। এ ইমাম ও শাসক ব্যতীত মুসলমানদের ইজতিমায়ী জীবনের কোনো ধারণা নেই। আর এ ইমাম ও শাসক নির্বাচনের ক্ষেত্রে যেসব বাধা আসবে, তা প্রতিহত করাও জরুরি। এ বাধাগুলো দূর করার জন্য যত ধরনের প্রস্তুতি নিতে হয়, তা নেয়া সকল মুসলমানের উপর ফরয।

আর এ কথাও স্পষ্ট যে, ভারত উপমহাদেশের প্রতিটি অংশে ইমাম ও শাসক নিয়োগ করার জন্য এবং শরঈ আইন বাস্তবায়ন করতে গেলে, এ ভূখণ্ডগুলোর অর্থাৎ ভারত, পাকিস্তান ও বাংলাদেশের গায়রে শরঈ ও কুফরী আইনের পতাকাবাহী শাসকদেরকে ক্ষমতাচ্যুত করা ব্যতীত তা সম্ভব নয়। আর এ উদ্দেশ্য অর্জিত হওয়ার জন্য জিহাদ করা জরুরি। অতএব ভারত উপমহাদেশের কাফের ও মুরতাদ শাসকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা মুসলমানদের উপর ফরয।

সারসংক্ষেপ

এ আলোচনার প্রেক্ষিতে এ ফলাফল বেরিয়ে আসে যে, ভারত উপমহাদেশের শাসকদের বিরুদ্ধে এমন তিনটি কারণে জিহাদ করা মুসলমানদের উপর ফরয, যে তিনটি কারণের যেকোনো একটির উপস্থিতিই জিহাদ ফরয হওয়ার জন্য যথেষ্ট। ঐ তিনটি কারণ যেগুলো আমরা বিস্তারিত আলোচনা করে আসছি সেগুলো হচ্ছে এই-

প্রথম কারণ: মুসলমানদের এ ভূখণ্ডকে (যাকে দুই শত বছর আগে দারুল হারব ঘোষণা দেয়া হয়েছিল এবং যা দ্বিতীয়বার আর দারুল ইসলাম হতে পারেনি) দারুল ইসলাম বানানোর পথে বাধা প্রদানকারীদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা মুসলমানদের উপর ওয়াজিব।

দ্বিতীয় কারণ: মুসলমানদের এ ভূখণ্ডের কিছু শাসক, প্রকাশ্য কাফের ও মুশরিক, আর কিছু স্পষ্ট কুফরে লিপ্ত হওয়ার কারণে মুরতাদ হয়ে গেছে। এসকল কাফের ও মুরতাদ শাসককে ক্ষমতাচ্যুত করে একজন মুসলিম শাসক নিয়োগ করার জন্য কাফের ও মুরতাদ শাসকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা মুসলমানদের উপর ওয়াজিব।

তৃতীয় কারণ: এ ভূখণ্ডগুলোতে মুসলমানদের ইজতিমায়ী জীবন রয়েছে। এখানে কোটি কোটি মুসলমান বসবাস করে, কিন্তু তাদের কোনো মুসলিম শাসক নেই, যে শাসক তাদেরকে আল্লাহর বিধান অনুযায়ী পরিচালনা করবেন। শতাব্দীর পর শতাব্দী তারা গায়রে শরঈ আইনের অধীনে এবং অমুসলিম শাসকদের শাসনের মধ্যে জীবন যাপন করে চলেছে। তাদের কোনো খিলাফতে ইসলামিয়া নেই, তাদের কোনো ইমারতে ইসলামিয়া নেই এবং তাদের এমন কোনো মুসলিম শাসক নেই, যার অধীনে তারা শরঈ আইনের আলোকে জীবন কাটাতে পারে। আর শরীয়তের পক্ষ থেকে মুসলমানদের জন্য এ অবস্থায় জীবন যাপন করার অনুমতি নেই। অতএব একটি ইমারতে ইসলামিয়া ও একটি খিলাফতে ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠার জন্য এর বিরুদ্ধে অবস্থানকারী শাসকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা মুসলমানদের উপর ওয়াজিব।

একটি দারুল ইসলাম দারুল হারব হয়ে যাওয়ার পর তাকে পুনরায় দারুল ইসলামের মর্যাদায় ফিরিয়ে আনা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ফরয দায়িত্ব। দারুল ইসলামের শাসক সুস্পষ্ট কুফরে লিপ্ত হওয়ার পর তাকে ক্ষমতাচ্যুত করে একজন মুসলিম শাসক নিয়োগ দেয়া একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ফরয দায়িত্ব। এমনিভাবে কোনো ভূখণ্ডে আল্লাহর বিধানের বাস্তবায়ন ও প্রয়োগ না থাকলে, সেখানে আল্লাহর বিধানের প্রয়োগ এবং খিলাফতে ইসলামিয়া ও ইমারতে ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠা একটি স্বয়ংসম্পূর্ণ ফরয দায়িত্ব।

এ তিনটি বিষয়ে কারো দ্বিমত থাকার সুযোগ নেই। অতএব ভারত উপমহাদেশের শাসকদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা মুসলমানদের উপর ওয়াজিব। চাই সে শাসক ভারতের হোক, কিংবা পাকিস্তানের হোক, অথবা বাংলাদেশের হোক।

আরেকবার দৃষ্টিপাত করুন

ক. উপমহাদেশের তিনটি দেশ যেহেতু দারুল ইসলাম থেকে দারুল হারবে রূপান্তরিত হয়েছে এবং এখনো তা দারুল ইসলামের দিকে ফিরে আসেনি, সেহেতু এ দেশগুলোকে দারুল ইসলামে ফিরিয়ে আনা মুসলমানদের উপর একটি ফরয যিম্মাদারী। এ পথে বাধা প্রদানকারীরা নিজেদেরকে মুসলিম হিসাবে প্রকাশ করুক কিংবা কাফের, সর্বাবস্থায় তাদেরকে প্রতিহত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করা ফরয।

খ. ভারত উপমহাদেশের কোনো কোনো অংশের শাসক প্রকাশ্য কাফের, আর কোনো কোনো অংশের শাসক সুস্পষ্ট কুফরে লিপ্ত। সর্বাবস্থায় কাফের শাসকদেরকে সরিয়ে মুসলমানদের শাসক হিসাবে কোনো মুসলিম শাসককে শাসন ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করা মুসলমানদের উপর ফরয। এর জন্য জিহাদের কোনো বিকল্প নেই। অতএব এ ফরয দায়িত্ব আদায় করতে গেলে যেই বাধা দেবে, তার বিরুদ্ধে জিহাদ করা মুসলমানদের উপর ফরয।

গ. মুসলমানদের ইজতিমায়ী জীবন শরঈ আইন তথা কুরআন হাদীসের আইনের অধীনে চলা ফরয। যেখানে এ কুরআনের আইনের কর্তৃত্ব নেই, সেখানে কুরআনের আইনের প্রতিষ্ঠা তথা খিলাফতে ইসলামিয়া ও ইমারতে ইসলামিয়া প্রতিষ্ঠা করা মুসলমানদের উপর একটি ফরয যিম্মাদারী। এ ফরয যিম্মাদারী আদায় করতে গেলে যেই বাধা দেবে, তার বিরুদ্ধে জিহাদ করা মুসলমানরদের উপর ফরয।

এ মাসআলায় নিজে সন্দেহের মাঝে পতিত হওয়া এবং অপরকে সন্দেহের মধ্যে ফেলা উচিত নয়। বরং শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিস দেহলভী রহিমাহুল্লাহ-এর রূহানী সন্তান এবং সাইয়েদ আহমদ বেরেলভী শহীদ রহিমাহুল্লাহ ও শাহ ইসমাঈল শহীদ রহিমাহুল্লাহ-এর উত্তরসূরি আকাবির উলামায়ে কেরাম, উম্মতের শীর্ষস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের জন্য উচিত হবে এবং তাদের কাছে এটা সময়ের দাবি যে, তাঁরা এ মাসআলাকে উম্মতের সামনে খুব স্পষ্ট করে তুলে ধরবেন। এ কাজটি একটি শরঈ যিম্মাদারী, ইলমী আমানত এবং সলফের সঠিক অনুসরণ।

মাসআলার তাহকীক করার সময় এবং উম্মতের সামনে এর শরঈ অবস্থান স্পষ্ট করার সময় মাসআলার উপর আমল করার জটিলতা, পরিবেশ পরিস্থিতির অস্থিতিশীলতা ইত্যাদি গুরুত্বহীন কিছু বিষয়, সত্য প্রকাশের ক্ষেত্রে এগুলো বাধা না হওয়া চাই। মাসআলার তাহকীকের সময় দলীল ও দলীলের প্রয়োগ সঠিক হওয়া কাম্য, দলীল থেকে ফলাফল বের করা সঠিক হওয়া কাম্য, আমানতদারী রক্ষা করা কাম্য, কোনোপ্রকার তাহরীফ-অপব্যাখ্যা না হওয়া কাম্য। এ বিষয়গুলো সামনে রেখে, এ মূলনীতিগুলোর আলোকে মাসআলার সুরতহাল সুস্পষ্ট ভাষায় বলে দেয়াই শরঈ যিম্মাদারী।

এটা হচ্ছে ইলমী যিম্মাদারী, যা আদায় করাকে আমরা জরুরি মনে করেছি। ইলমের এ দস্তরখানায় উলামায়ে কেরাম ও মুফতীয়ানে কেরামকে আমরা স্বাগত জানাই। মাসআলার শরঈ অবস্থান উম্মতের সামনে স্পষ্ট হয়ে গেলে তা বাস্তবায়নের পদ্ধতিও বের হয়ে আসবে ইনশাআল্লাহ। মাসআলার যদি তাহকীক না হয় এবং তা প্রকাশ্যে না আসে, তা হলে তার উপর আমল করার তাকাযাই সৃষ্টি হবে না এবং ফরয দায়িত্ব আদায়ের উদ্দীপনাও হারিয়ে যাবে।

জিহাদ একটি ইজতিমায়ী আমল

স্মরণ রাখা চাই যে, জিহাদ একটি ইজতিমায়ী আমল। এককভাবে এ দায়িত্ব আদায় করা যায় না। অতএব হয়ত আমরা চলমান ইজতিমায়ী কোনো কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাবো। যদি নির্ভরযোগ্য ইজতিমায়ী কোনো কর্মধারা না পাওয়া যায়, তা হলে নিজের শক্তি সামর্থ্য অনুযায়ী কোনো ইজতিমায়ী কার্যক্রম চালু করার পেছনে নিজের সাধ্যের সবটুকু ব্যয় করে দেব। একটি অনিবার্য বিষয় ও একটি অকাট্য ফরয যিম্মাদারী আদায়ের জন্য একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত মুকাল্লাফ মুসলিমকে যা যা করতে হয় তার সবই তার করা চাই। ব্যক্তিগতভাবে নিজেই প্রস্তুতি নিতে থাকবে এবং ইজতিমায়ীভাবে জিহাদ করার সম্ভাব্য সব সুরত বাস্তবায়নের জন্য চেষ্টা করতে থাকবে। তালাশের স্পৃহা এমন থাকতে হবে যেমন ছিল ঐ তাওবাকারী বান্দার, যে নিরানব্বইটি হত্যা করে তাওবার পথ তালাশ করে ফিরছিল। আর ইজতিমায়ী শক্তি সংগ্রহের চেষ্টা প্রচেষ্টা এমন হওয়া চাই, যা ইসলামের ইতিহাসের বিভিন্ন পর্বে আমরা দেখতে পাই। ইসলামী খিলাফত ও ইসলামী ইমারত দুশমনের হাতে নিশ্চিহ্ন হয়ে যাওয়ার পরও যেভাবে দ্বিতীয়বার মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে, আমাদেরও সে পথেই চলতে হবে। এ উদ্দেশ্যে দূর অতীতে তাতারিদের বিরুদ্ধে মুসলমানদের সফল জিহাদ এবং নিকট অতীতে রাশিয়ানদের বিরুদ্ধে এবং সাম্প্রতিককালে আমেরিকানদের বিরুদ্ধে আফগান মুজাহিদীনের সফল জিহাদকে আদর্শ হিসাবে সামনে রাখা যেতে পারে। আর চলমান শাসন ব্যবস্থাগুলো থেকে বিমুখ হওয়া এবং তাদের থেকে নিজেকে মুক্ত রেখে এমন দূরত্ব বজায় রাখা চাই, যেভাবে আসহাবে কাহফ তাদের সময়ের শাসকদের থেকে দূরত্ব বজায়ে রেখেছিলেন।

আমাদের দুর্বলতা ও ওযর

আমাদের দুর্বলতা হচ্ছে, উম্মতের অধিকাংশই দীর্ঘকাল থেকে এ যিম্মাদারীর বিষয়ে গাফেল। আর সে গাফলতের কারণে যেসব দুর্বলতা সৃষ্টি হওয়ার ছিল সেসব দুর্বলতা সৃষ্টি হয়ে গেছে। একটি দুর্বলতা হচ্ছে, জিহাদ ফরয হওয়ার মাসআলাটি স্পষ্ট না হওয়া। দ্বিতীয় দুর্বলতা হচ্ছে, একটি সফল জিহাদের নকশা ও নমুনা দৃষ্টির সামনে না থাকা। এটি খুবই স্বাভাবিক একটি বিষয় যে, যে মাসআলার উপর অনুশীলন হবে না এবং যার কোনো আমলী বাস্তব রূপ সামনে না থাকবে, তার শরঈ অবস্থান সম্পর্কে উম্মত বেখবর হতে থাকবে, গাফেল হয়ে যাবে। আর তা-ই হয়েছে।

আর এরই সাথে আন্তর্জাতিকভাবে ইসলামের শত্রুদের পক্ষ থেকে জিহাদের বিরুদ্ধে এত বেশি পরিমাণে প্রোপাগাণ্ডা ছড়ানো হয়েছে যে, খোদ মুসলমানরা তাদের জিহাদের ফরয দায়িত্ব সম্পর্কে সন্দেহের মাঝে পড়ে গিয়েছে। অনুরূপভাবে জিহাদ ও মুজাহিদীনকে এতভাবে বদনাম করা হয়েছে যে, মুসলমানরা তাদের একটি ফরয দায়িত্ব আদায়কে ফিতনা ফাসাদ মনে করতে শুরু করেছে। ফলাফল এই দাঁড়িয়েছে যে, জিহাদের সম্ভাব্য কোনো সুরত চিন্তা করা, তাদের জন্য অসম্ভব হয়ে গিয়েছে।

এমন বৈরি পরিস্থিতিতে এ মাসআলার বাস্তব রূপ, এর অনিবার্যতা স্পষ্ট করে দেয়া, মুসলমানদের সামনে জিহাদ ফরয হওয়ার প্রকাশ্য ঘোষণা দেয়া, এর বাস্তবায়নের রূপরেখা তৈরি করার জন্য চিন্তা-ফিকির করা এবং এর প্রয়োগের জন্য চেষ্টা প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া, সমকালীন রাহবারগণের সবচাইতে বড় যিম্মাদারী।

তাই এখন আমাদের দুর্বলতাকে এবং আমাদের ওযরকে শরীয়তের কষ্টিপাথরে মেপে নিতে হবে। কাল্পনিক দুর্বলতা, ধারণা নির্ভর ওযর ও ফাসেকের খবর তথা তথ্য সন্ত্রাসের ভিত্তিতে জিহাদের ফরয দায়িত্ব থেকে দূরে থাকা এবং মাসআলার শরঈ অবস্থান স্পষ্ট করা থেকে বিরত থাকা জায়েয নেই। যে বীর পুরুষ মুজাহিদগণ জিহাদের ময়দানে কুরবানী দিয়ে চলেছে, তাদের সঙ্গে আমাদের আচরণ কেমন হওয়া চাই, তা জানা থাকা বর্তমান পৃথিবীর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর একটি।

মনে রাখা উচিত, একথা সহীহ যে, জিহাদের জন্য প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেয়ার আগে এবং শত্রুর সঙ্গে মোকাবেলা করার জন্য যে পরিমাণ শক্তির প্রয়োজন, সে পরিমাণ শক্তি ও প্রস্তুতির আগে প্রকাশ্যে জিহাদের ময়দানে শত্রুর মোকাবেলায় অবতীর্ণ হওয়া উচিত নয়। এ কথাটি যেমন সহীহ তেমনিভাবে এ কথাগুলো সহীহ যে, প্রথমত, অসামর্থ্য ও দুর্বলতার ওযর পেশ করে ফরয যিম্মাদারী আদায় থেকে ফিকিরহীন থাকা, দ্বিতীয়ত, কোনো উপযুক্ত জামাত তালাশ না করা, অথবা কোনো একটি জামাত তৈরি করার জন্য কোনোপ্রকার চিন্তা-ফিকির না করা, তৃতীয়ত, এককভাবে ও ব্যক্তিগতভাবে যতটুকু প্রস্তুতি নেয়া যায় ততটুকুর প্রতিও কোনোপ্রকার ভ্রূক্ষেপ না করা, সর্বোপরি মুজাহিদীনকে সাহায্য-সহযোগিতা থেকে বিমুখ থাকাও জায়েয নেই। মোটকথা এ ধরনের কোনো আচরণই গ্রহণ করা জায়েয নেই, যে কারণে মুজাহিদীনের জিহাদি কার্যক্রমে ব্যাঘাত ঘটতে পারে।

আল্লাহ রাব্বুল আলামীন আমাদেরকে তাঁর দ্বীনের জন্য জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহে অংশ গ্রহণ করার তাওফীক দান করুন।

وصلى الله على خير خلقه محمد وآله وأصحابه أجمعين!

تمت ولله الحمد

Related Articles

Back to top button
অ+
অ-