জায়েজ-নাজায়েজফাতওয়া  নং  ৬৬০

ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার মতো দলকে সমর্থনের বিধান

পিডিএফ ডাউনলোড করুন

ওয়ার্ড ডাউনলোড করুন

প্রশ্ন:

ব্রাজিল বা আর্জেন্টিনার মতো দলকে সমর্থন করা কি ঈমানের জন্য ক্ষতিকর?

-মুহাম্মদ জাবের

উত্তর:

بسم الله الرحمن الرحيم

শুধু ব্রাজিল আর্জেন্টিনা নয়; বর্তমান যুগের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক স্তরের যেকোনো পেশাদারি খেলাকে সমর্থন করলেই ঈমানের ক্ষতি হবে। এমনকি অমুসলিম রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কোনো মুসলিম রাষ্ট্রের খেলাকে সমর্থন করলেও গুনাহ হবে।

কিছু খেলা একটা স্তরে শরীয়তে জায়েয এবং কাম্য। যেমন সাঁতার, দৌড়, ঘোড়দৌড়, তীর নিক্ষেপণ ইত্যাদি খেলা, এর সঙ্গে যদি কোনো নাজায়েয বিষয় যুক্ত না হয়। এসব খেলায় একদিকে যেমন মনে প্রফুল্লতা আনয়নের পাশাপাশি শরীরচর্চা হয়, শরীরের শক্তি-সক্ষমতা ভালো ও সুস্থ থাকে, অন্যদিকে এগুলো দ্বারা যে দক্ষতা অর্জিত হয়, তা জিহাদের মতো ইবাদতে শত্রুর বিরুদ্ধে কাজে লাগে। এতে করে একজন মুসলিমের খেলা পরিণতিতে ব্যক্তি ও সমাজের দুনিয়াবি উপকার বয়ে আনে এবং আখিরাতেরও পুঁজি হয়; অনর্থ কাজে পরিণত হয় না।

একারণে শরীয়তের সীমায় থেকে জিহাদ বা অন্য কোনো নেক উদ্দেশ্যে এগুলো করলে শুধু যে জায়েয তা নয়; বরং এগুলো দ্বারা ইদাদ তথা জিহাদের প্রস্তুতি গ্রহণের সাওয়াবও অর্জিত হতে পারে।

পক্ষান্তরে খেলা যদি এমন বিষয় হয়, যা শরীয়তে নাজায়েয; যেমন জুয়া, লটারি, কোনো প্রাণীকে লক্ষ বানিয়ে তীর বা ঢিল নিক্ষেপ ইত্যাদি অথবা খেলা যদি নাজায়েয বিষয়ের দিকে নিয়ে যায়, যেমন খেলার কারণে নামায, রোযা কিংবা অন্য কোনো শরঈ দায়িত্ব পালনে বিঘ্ন ঘটে বা সতর খুলে খেলতে হয় তাহলে সে খেলা সম্পূর্ণ নাজায়েয।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ (90) إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ. –سورة المائدة: 90، 91

“হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, প্রতিমার বেদি ও জুয়ার তীর এসবই অপবিত্র, শয়তানী কাজ। সুতরাং এসব পরিহার কর, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা ও বিদ্বেষ বপণ করতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর যিকির ও নামায থেকে আটকে রাখতে চায়। সুতরাং, তোমরা কি (ওসব জিনিস থেকে) নিবৃত্ত হবে?” -(সূরা মায়েদা, ০৫:৯০-৯১)

অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে-

وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَشْتَرِي لَهْوَ الْحَدِيثِ لِيُضِلَّ عَنْ سَبِيلِ اللَّهِ بِغَيْرِ عِلْمٍ وَيَتَّخِذَهَا هُزُوًا أُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ مُهِينٌ – سورة لقمان: 6

‘‘কতক মানুষ এমন, যারা অজ্ঞতাবশত আল্লাহর পথ থেকে মানুষকে বিচ্যুত করার জন্য এমন সব অনর্থক গল্প-উপন্যাস খরিদ করে, যা আল্লাহ সম্পর্কে উদাসীন করে দেয় এবং তারা আল্লাহর পথ নিয়ে ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে। তাদের জন্য আছে লাঞ্ছনাকর শাস্তি।’’ (সূরা লুকমান, ৩১:০৬)

হাদীসে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন-

كُلُّ مَا يَلْهُو بِهِ الرَّجُلُ المُسْلِمُ بَاطِلٌ، إِلَّا رَمْيَهُ بِقَوْسِهِ، وَتَأْدِيبَهُ فَرَسَهُ، وَمُلَاعَبَتَهُ أَهْلَهُ، فَإِنَّهُنَّ مِنَ الحَقِّ. -رواه الترمذي (1637). وقال الترمذي رحمه الله: وَهَذَا حَدِيثٌ حَسَنٌ.اهــــ

“মুসলিম ব্যক্তি যে সব কাজের মাধ্যমে বিনোদন বা খেলা করে, তা সবই অর্থহীন ও অন্যায়। তবে তিনটি বিষয় ব্যতিক্রম: ১. ধনুক দিয়ে তীর নিক্ষেপ করা। ২. ঘোড়া প্রশিক্ষণ দেওয়া। ৩. নিজের স্ত্রীর সাথে খেলা ও আনন্দ করা। এগুলো ন্যায় ও কল্যাণকর।” –জামে তিরমিযী: ১৬৩৭।

বিশিষ্ট তাবেয়ী কাসিম বিন মুহাম্মদ রহিমাহুল্লাহ বলেন,

كُلُّ شَيْءٍ أَلْهَى عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهُوَ مَيْسِرٌ. –رواه الإمام أحمد في الزهد (1187) والخلال في الأمر بالمعروف والنهي عن المنكر للخلال (ص: 63)، ط. العلمية

“প্রত্যেক এমন বস্তু, যা আল্লাহ তাআলার যিকর ও নামায থেকে গাফেল রাখে, তা জুয়ার অন্তর্ভুক্ত।” –আয-যুহদ লিল ইমাম আহমাদ: ১১৮৭; আল-আমরু বিল মারূফ লিল-খাল্লাল: পৃ: ৬৩ (ইলমিয়্যাহ)।

ইমাম খাত্তাবী রহিমাহুল্লাহ (৩৮৮ হি.) বলেন-

قُلْتُ: وَفِي هَذَا بَيَانٌ أَنَّ جَمِيعَ أَنْوَاعِ اللَّهْوِ مَحْظُورَةٌ، وَإِنَّمَا اسْتَثْنَى رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ هَذِهِ الْخِلَالَ مِنْ جُمْلَةِ مَا حُرِّمَ مِنْهَا؛ لِأَنَّ كُلَّ وَاحِدَةٍ مِنْهَا إِذَا تَأَمَّلْتَهَا وَجَدْتَهَا مُعِينَةً عَلَى حَقٍّ، أَوْ ذَرِيعَةً إِلَيْهِ، وَيَدْخُلُ فِي مَعْنَاهَا مَا كَانَ مِنَ الْمُثَاقَفَةِ بِالسِّلَاحِ، وَالشَّدِّ عَلَى الْأَقْدَامِ، وَنَحْوِهِمَا، مِمَّا يَرْتَاضُ بِهِ الْإِنْسَانُ، فَيَتَوَقَّحُ بِذَلِكَ بَدَنُهُ، وَيَتَقَوَّى بِهِ عَلَى مُجَالَدَةِ الْعَدُوِّ. فَأَمَّا سَائِرُ مَا يَتَلَهَّى بِهِ الْبَطَّالُونَ مِنْ أَنْوَاعِ اللَّهْوِ، كَالنَّرْدِ، وَالشَّطْرَنْجِ، وَالْمُزَاجَلَةِ بِالْحَمَامِ، وَسَائِرِ ضُرُوبِ اللَّعِبِ، مِمَّا لَا يُسْتَعَانُ بِهِ فِي حَقٍّ، وَلَا يُسْتَجَمُّ بِهِ لِدَرْكِ وَاجِبٍ، فَمَحْظُورٌ كُلُّهُ. “اهــــ -معالم السُّنَن (2/ 242)، ط. المطبعة العلمية – حلب

“এই হাদীসের ভাষ্য হলো, খেলাধুলার সব প্রকারই মূলত নিষিদ্ধ। তবে রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এই কয়েকটি বিষয়কে নিষিদ্ধের তালিকা থেকে আলাদা করে অনুমতি দিয়েছেন। এর কারণ হলো, এই তিনটির প্রতিটিই কোনো না কোনোভাবে সত্য ও কল্যাণের সহায়ক বা মাধ্যম। এই তিনটির মতোই বিধান হবে, অস্ত্র প্রশিক্ষণ, দৌড়ানো ইত্যাদির মতো বিষয়গুলোর, যেসব মাধ্যমে মানুষ শরীরচর্চা করে। ফলে দেহ সবল হয় এবং শত্রুর সঙ্গে মোকাবেলায় শক্তি অর্জিত হয়। অন্যদিকে অলস ও অকর্মণ্য লোকেরা যে ধরনের খেলাধুলায় লিপ্ত থাকে— যেমন: পাশা, দাবা, কবুতর ওড়ানোর প্রতিযোগিতা এবং এ ধরনের অন্যান্য খেলাধুলা—যেগুলো দ্বারা কোনো ন্যায়ের কাজে সাহায্য নেয়া যায় না এবং কোনো ফরয দায়িত্ব পালনের শক্তিও অর্জিত হয় না, সেগুলোর সবই নিষিদ্ধ। -মাআলিমুস সুনান: ২/২৪২ (আল-মাতবাআতুল ইলমিয়্যাহ)

হেদায়া গ্রন্থকার ইমাম মারগীনানী রহিমাহুল্লাহ (৫৯৩ হি.) দাবা ও পাশা খেলা নাজায়েয হওয়ার কারণ হিসেবে বলেন-

ولأنه نوع لعب يصد عن ذكر الله وعن الجمع والجماعات فيكون حراما لقوله عليه الصلاة والسلام: “ما ألهاك عن ذكر الله فهو ميسر”. -الهداية في شرح بداية المبتدي (4/ 380، ط. دار احياء التراث العربي)

“কেননা, উপর্যুক্ত খেলা আল্লাহর যিকর, জুমআ ও জামাআত থেকে বিরত রাখে। ফলে তা হারাম হবে। রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘যে বস্তুই তোমাকে আল্লাহর যিকর থেকে বিরত রাখবে, তা জুয়ার অন্তর্ভুক্ত হবে’। [উক্ত হাদীসটি মারফূ হিসেবে পাওয়া যায় না। বরং কাসিম বিন মুহাম্মদ রহিমাহুল্লাহ-এর বক্তব্য হিসেবে পাওয়া যায়। -নসবুর রায়াহ: ৪/২৭৫ (মুআসসাসাতুর রাইয়ান)]” –হেদায়া: ৪/৩৮০ (দারু ইহয়াইত তুরাস)

আল্লামা আলাউদ্দীন হাসকাফী রহিমাহুল্লাহ (১০৮৮ হি.) বলেন-

)و) كره تحريما (اللعب بالنرد و) كذا (الشطرنج) … وأباحه الشافعي وأبو يوسف في رواية … وهذا إذا لم يقامر ولم يداوم ولم يخل بواجب، وإلا فحرام بالاجماع. (و) كره (كل لهو) لقوله عليه الصلاة والسلام «كل لهو المسلم حرام إلا ثلاثة ملاعبته أهله وتأديبه لفرسه ومناضلته بقوسه».-الدر المختار (6/ 395)، ط. دار الفكر

“পাশা খেলা (সবার মতে) নাজায়েয। তদ্রূপ (আমাদের মতে) দাবা খেলাও নাজায়েয। ইমাম শাফেয়ী ও আবু ইউসুফ রহিমাহুল্লাহ-এর এক বর্ণনা মতে দাবা জায়েয। উক্ত মতভেদ হচ্ছে, যখন খেলায় জুয়া থাকবে না; নিয়মিত খেলবে না এবং খেলার কারণে কোনো ওয়াজিব আদায়ে ব্যাঘাত ঘটবে না। অন্যথায় (উপর্যুক্ত তিনটির কোনো একটি পাওয়া গেলে) সবার মতে তা হারাম। …” –আদ্দুররুল মুখতার: ৬/৩৯৫ (দারুল ফিকর)।

আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী রহিমাহুল্লাহ (১২৫২ হি.) বলেন-

)قَوْلُهُ فَكَانَ مَنْدُوبًا) إِنَّمَا يَكُونُ كَذَٰلِكَ بِالْقَصْدِ؛ أَمَّا إِذَا قَصَدَ التَّلَهِّيَ أَوِ الْفَخْرَ أَوْ لِتُرَى شَجَاعَتُهُ فَالظَّاهِرُ الْكَرَاهَةُ، لِأَنَّ الأَعْمَالَ بِالنِّيَّاتِ، فَكَمَا يَكُونُ الْمُبَاحُ طَاعَةً بِالنِّيَّةِ تَصِيرُ الطَّاعَةُ مَعْصِيَةً بِالنِّيَّةِ ط. … (قَوْلُهُ فَيُبَاحُ كُلُّ الْمَلَاعِبِ) أَيْ الَّتِي تُعَلِّمُ الْفُرُوسِيَّةَ وَتُعِينُ عَلَى الْجِهَادِ. وَعَنِ الْجَوَاهِرِ قَدْ جَاءَ الْأَثَرُ فِي رُخْصَةِ الْمُصَارَعَةِ لِتَحْصِيلِ الْقُدْرَةِ عَلَى الْمُقَاتَلَةِ دُونَ التَّلَهِّي فَإِنَّهُ مَكْرُوهٌ.اهــــ -رد المحتار (٦/ ٤٠٢)، ط. دار الفكر

“খেলাধুলা তখনই কাম্য, যখন উদ্দেশ্য সঠিক হবে। কিন্তু যদি উদ্দেশ্য হয় কেবল খেলাধুলার আনন্দ, গরিমা প্রদর্শন কিংবা নিজের বীরত্ব দেখানো, তবে স্পষ্টতই তা নাজায়েয হবে। কেননা সমস্ত আমল নিয়তের ওপর নির্ভরশীল। যেমন নিয়তের কারণে কোনো মুবাহ কাজ ইবাদতে পরিণত হয়, তেমনই নিয়তের কারণে কোনো ইবাদতও গুনাহে পরিণত হতে পারে। (তাহতাবী) …

(হাসকাফী রহিমাহুল্লাহ-এর বক্তব্য) ‘সব ধরনের খেলা জায়েয’—এর অর্থ হলো, ঐ সকল খেলা, যা বীরত্ব শিক্ষা দেয় এবং জিহাদের কাজে সহায়ক হয়। ‘আল-জাওয়াহির’ গ্রন্থে এসেছে, হাদীসে যুদ্ধের সক্ষমতা অর্জনের উদ্দেশ্যে কুস্তির অনুমতি দেওয়া হয়েছে; নিছক বিনোদনের জন্য নয়। অন্যথায় তা নাজায়েয।” -রদ্দুল মুহতার: ৬/৪০২ (দারুল ফিকর)।

মুফতী শফী রহিমাহুল্লাহ (১৩৯৬ হি.) বলেন-

فَهٰذِهِ الرِّوَايَةُ تَدُلُّ عَلَى عَدَمِ جَوَازِ اللَّهْوِ مُطْلَقًا، وَأَمَّا اسْتِثْنَاءُ الثَّلَاثِ أَوِ الْأَرْبَعِ فِي بَعْضِ الرِّوَايَاتِ فَذٰلِكَ لِأَنَّهَا لَيْسَتْ مِنَ اللَّهْوِ حَقِيقَةً، بَلْ أَفْعَالٌ مُفِيدَةٌ تَقْتَضِيهَا الْحِكْمَةُ، وَإِنَّمَا سُمِّيَتْ لَهْوًا بِصُورَتِهَا، كَمَا دَلَّ عَلَيْهِ حَدِيثُ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ رَضِيَ اللَّهُ عَنْهُ عِنْدَ أَصْحَابِ السُّنَنِ الْأَرْبَعَةِ فِي الْجِهَادِ، قَالَ: قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فِي حَدِيثٍ طَوِيلٍ: «لَيْسَ مِنَ اللَّهْوِ ثَلَاثٌ: تَأْدِيبُ الرَّجُلِ فَرَسَهُ، وَمُلَاعَبَتُهُ أَهْلَهُ، وَرَمْيُهُ بِقَوْسِهِ وَنَبْلِهِ» …  فَعُلِمَ أَنَّ الْمُسْتَثْنَى مِنَ اللَّهْوِ إِنَّمَا اسْتُثْنِيَ لِأَنَّهُ لَيْسَ بِلَهْوٍ حَقِيقَةً بَلْ صُورَةً فَقَطْ، فَعُلِمَ أَنَّ اللَّهْوَ مُطْلَقًا لَا يَجُوزُ.اهــــ -أَحْكَامُ الْقُرْآنِ (٣/ ١٨٩)، ط. إدارة القرآن والعلوم الإسلامية

“এই বর্ণনাটি প্রমাণ করে যে, সব ‘লাহ্‌ও’ (খেলা) নাজায়েয। আর কিছু বর্ণনায় যে তিনটি বা চারটি বিষয়কে এর ব্যতিক্রম হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে, তার কারণ হলো, সেগুলো প্রকৃত অর্থে ‘লাহ্‌ও’ নয়। বরং সেগুলো এমন উপকারী কাজ, যা প্রজ্ঞা ও হিকমতের দাবি। শুধু বাহ্যিক সাদৃশ্যের কারণে সেগুলোকে ‘লাহ্‌ও’ বলা হয়েছে।

যেমনটি উকবা ইবনে আমের রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর হাদীস প্রমাণ করে, যা সুনান গ্রন্থসমূহের ‘জিহাদ’ অধ্যায়ে বর্ণিত হয়েছে। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসল্লাম এক দীর্ঘ হাদীসে বলেছেন, ‘তিনটি কাজ লাহ্‌ও নয়: ঘোড়াকে প্রশিক্ষণ দেওয়া, স্ত্রীর সঙ্গে আনন্দ-রসিকতা করা এবং তীর-ধনুক দ্বারা লক্ষ্যভেদ করা’।

অতএব বোঝা গেল, যে বিষয়গুলোকে লাহ্‌ও থেকে বাদ দেওয়া হয়েছে, সেগুলোকে এজন্য বাদ দেওয়া হয়েছে যে, এগুলো প্রকৃত অর্থে লাহ্‌ও নয়। বরং কেবল বাহ্যিক সাদৃশ্যের কারণে সেগুলোকে লাহ্‌ও বলা হয়েছে। ফলে এটি সুস্পষ্ট হলো যে, প্রকৃত অর্থে কোনো ‘লাহ্‌ও’ জায়েয নয়।” —আহকামুল কুরআন: ৩/১৮৯ (ইদারাতুল কুরআন)।

একটু পরে শফী রহিমাহুল্লাহ আরো বলেন-

وَلِهٰذَا صَرَّحَ الْفُقَهَاءُ أَنَّ الْمَلَاهِيَ الْمُبَاحَةَ أَيْضًا إِنَّمَا تُبَاحُ إِذَا اشْتَغلَ بِهَا لِتِلْكَ الْأَغْرَاضِ وَالْفَوَائِدِ، لَا إِذَا قُصِدَ بِهَا التَّلَهِّي فَقَطْ، فَإِنَّهَا أَيْضًا لَا تَجُوزُ بِقَصْدِ التَّلَهِّي وَاللَّعِبِ. فمَنْ اشْتَغَلَ فِي المُصَارَعَةِ والسِّباحَةِ وَالْمُسَابَقَةِ وَالرِّمَايَةِ وَأَمْثَالِهَا مِنَ اللَّهْوِ الْمُبَاحِ بمَحْضِ قَصْدِ التَّلَهِّي كَانَ مَكروها. -أحكام القرآن للتهانوي: 3/192، ط. إدارة القرآن والعلوم الإسلامية

“এ কারণেই ফকীহগণ স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, মুবাহ বিনোদনমূলক বিষয়গুলো তখনই বৈধ হবে, যখন সেগুলো উপকারী ও কল্যাণকর উদ্দেশ্যে করা হবে; নিছক তামাশা ও বিনোদনের উদ্দেশ্যে নয়। কেননা, মুবাহ বিষয়গুলোও শুধু বিনোদন ও খেলতামাশার উদ্দেশ্যে হলে, তা নাজায়েয হয়ে যায়। সুতরাং কেউ কুস্তি, সাঁতার, দৌড়প্রতিযোগিতা, তীরন্দাজি ইত্যাদি বৈধ বিনোদনে কেবল খেল-তামাশার উদ্দেশ্যে লিপ্ত হলে, তার এ বিনোদন নাজায়েয হবে।” -আহকামুল কুরআন: ৩/১৯২ (ইদারাতুল কুরআন)।

মুফতী তাকী উসমানী হাফিযাহুল্লাহ বলেন-

فَالضَّابِطُ في هذا البابِ عِنْدَ مَشايِخِنا المُسْتَفادُ مِن أُصولِهِم وأقوالِهِم: أَنَّ اللَّهوَ المُجَرَّدَ الَّذي لا طائِلَ تَحْتَهُ، ولَيْسَ له غَرَضٌ صحيحٌ مُفِيدٌ في المَعاشِ ولا المَعادِ حَرامٌ، أو مَكْروهٌ تَحْريمًا. وهذا أَمْرٌ مُجْمَعٌ عَلَيْهِ في الأُمَّةِ، مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ بَيْنَ الأَئِمَّةِ، وما كانَ فيه غَرَضٌ ومَصْلَحَةٌ دينيَّةٌ أو دُنْيويَّةٌ، فإن وَرَدَ النَّهْيُ عنه مِنَ الكِتابِ أو السُّنَّةِ كما في النَّرْدَشيرِ كانَ حَرامًا، أو مَكْرُوهًا تَحْريمًا، وأُلْغِيَتْ تِلْكَ المَصْلَحَةُ والغَرَضُ لِمُعارَضَتِها لِلنَّهْيِ المَأْثُورِ، حُكْمًا بِأَنَّ ضَرَرَهُ أَعْظَمُ مِن نَفْعِهِ … وهذا أَيْضًا مُتَّفَقٌ عَلَيْهِ بَيْنَ الأَئِمَّةِ، غَيْرَ أَنَّهُ لَمْ يَثْبُتِ النَّهْيُ عِنْدَ بَعْضِهِم فَجَوَّزَهُ ورَخَّصَ فيه، وثَبَتَ عِنْدَ غَيْرِهِ فَحَرَّمَهُ وكَرِهَهُ، وذلك كالشَّطْرَنْجِ، فإنَّ النَّهْيَ الوارِدَ فيه مُتَكَلَّمٌ فيه مِن جِهَةِ الرِّوايَةِ والنَّقْلِ، فَثَبَتَ عِنْدَ الحَنَفِيَّةِ وعامَّةِ الفُقَهاءِ فَكَرِهُوهُ، لَمْ يَثْبُتْ عِنْدَ ابْنِ المُسَيِّبِ وابْنِ المُغَفَّلِ، وفي رِوايَةٍ عِنْدَ الشَّافِعِيِّ أَيْضًا فَأَباحُوهُ.اهـــــ -تكملة فتح الملهم: (4/ 381، 382)، ط. دار إحياء التراث العربي

“এ ক্ষেত্রে আমাদের শায়খদের উসূল ও বক্তব্যের আলোকে যে মূলনীতিটি পাওয়া যায় তা হলো, যেগুলো নিছক বিনোদন ও খেল-তামাশা, যাতে না আছে দ্বীন-দুনিয়ার কোনো উপকার, আর না ভালো কোনো উদ্দেশ্য, সেসব খেল-তামাশা হারাম বা মাকরূহে তাহরিমী। এ বিষয়ে উম্মতের ইজমা এবং ইমামগণের ঐকমত্য রয়েছে।

আর যেসব খেলাধুলায় দ্বীনি বা দুনিয়াবি কোনো উপকার ও উদ্দেশ্য আছে, তবে কুরআন-সুন্নায় সেগুলোর উপর নিষেধাজ্ঞা এসেছে, যেমন, পাশা খেলা, তাহলে সেসব খেলাধুলাও হারাম বা মাকরূহ তাহরিমী। হাদীসে নিষেধাজ্ঞার কারণে তাতে যে উপকারিতা ও উদ্দেশ্য আছে, সেগুলো ধর্তব্য হবে না। এবং ধরা হবে, এগুলোতে যে উপকার রয়েছে, ক্ষতির পরিমাণটা তার চেয়ে বেশি। এটিও ইমামগণের সর্বসম্মত বিষয়। তবে কারো কাছে নিষেধাজ্ঞার হাদীসটি প্রমাণিত না হওয়ার কারণে জায়েয বলেছেন ও অবকাশ দিয়েছেন। আর বিপরীতে কারো কাছে হাদীসটি প্রমাণিত হওয়ার কারণে হারাম ও মাকরূহ বলেছেন। এর উদাহারণ হচ্ছে, দাবা খেলা। এ বিষয়ে বর্ণিত নিষেধাজ্ঞামূলক হাদীসের সনদ ও বর্ণনাগত প্রামাণিকতা নিয়ে মতভেদ রয়েছে।

হানাফি ও অধিকাংশ ফুকাহায়ে কেরামের নিকট নিষেধাজ্ঞার হাদীসটি প্রমাণিত, তাই তারা মাকরূহ বলেছেন। আর ইবনুল মুসাইয়াব, ইবনুল মুগাফফাল এবং এক বর্ণনা অনুসারে ইমাম শাফী রহিমাহুল্লাহর নিকট হাদীসটি প্রমাণিত নয়, তাই তারা বৈধতা দিয়েছেন। –তাকমিলাতু ফাতহিল মুলহিম: ৪/৩৮১, ৩৮২ (দারু ইহয়াইত তুরাস)।

এতো হচ্ছে, স্বাভাবিক খেলার বিষয়; যেখানে খেলা নিছক খেলার জন্য। কিন্তু খেলা যখন জুয়া, যিনা ও অশ্লীলতার যত উপকরণ রয়েছে, এসবের কেন্দ্রবিন্দুতে রূপান্তিত হয়, খেলা যখন নামায, রোযা ইত্যাদির মতো অসংখ্য নেক ও ফরয কাজের প্রতিবন্ধক হয়, তখন তা যে কতটা নিকৃষ্ট ও গর্হিত এবং কত জঘন্যতম নাজায়েয, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

আর নাজায়েয বিষয়কে সমর্থন করাও নাজায়েয। নাজায়েয বিষয়কে উত্তম মনে করা এবং নাজায়েয বিষয়ে খুশি হওয়া ও খুশি প্রকাশ করা ঈমান পরিপন্থী।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ. –سورة المائدة: 2

‘গুনাহ ও জুলুমের কাজে একে অন্যের সহায়তা করো না।’ (সূরা মায়েদা, ০৫:০২)

ইমাম ইবনে বাত্তাল রহিমাহুল্লাহ (৪৪৯ হি.) বলেন-

ودل الحديث على أنه من آوى أهل المعاصى والبدع أنه شريك فى الأثم، وليس يدل الحديث على أن من أحدث حدثًا أو آوى محدثًا فى غير المدينة أنه غير متوعد ولا ملوم على ذلك؛ لتقدم العلم بأن من رضى فعل قوم وعملهم أنه منهم، وإن كان بعيدًا عنهم.اهـــ -شرح صحيح البخارى لابن بطال (10/ 350)، ط. مكتبة الرشد

“হাদীস থেকে প্রমাণিত হয় যে, যে ব্যক্তি গুনাহগার ও বিদআতিদেরকে আশ্রয় দিবে, সে তাদের গুনাহের অংশীদার হবে। তবে হাদীসটির অর্থ এ নয় যে, যে ব্যক্তি মদীনার বাইরে কোনো অপরাধ করবে অথবা কোনো অপরাধীকে আশ্রয় দিবে, তার ব্যাপারে কোনো শাস্তির ধমকি নেই কিংবা সে এজন্য নিন্দিত হবে না। কারণ আগে থেকেই জানা কথা যে, যে ব্যক্তি কোনো সম্প্রদায়ের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট থাকে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত; যদিও সে তাদের থেকে দূরে অবস্থান করে।” -শরহে সাহীহিল বুখারী লিবনিল বাত্তাল: ১০/৩৫০।

আরো দেখুন: তাফসীরে কুরতুবী: ৪/২৯৪, ৫/৪১৮ (দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যাহ); ফাতহুল বারী: ১৩/২৮১ (দারুল ফিকর)।

বলা বাহুল্য, বর্তমানে বিশ্বকাপ নামে যে আন্তর্জাতিক খেলা চলছে, তা আরো অসংখ্য কারণেই নাজায়েয খেলা থেকেও অনেক জঘন্য ও ভয়ঙ্কর রূপ ধারণ করেছে। যেমন:

ক. উন্মাদনা: বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে সমগ্র বিশ্ব জুড়ে পুরো মানব জাতির মধ্যে যে উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ে বা ছড়িয়ে দেয়া হয় তা রীতিমতো ভয়ঙ্কর। কোটি কোটি মানুষের উন্মাদনা দেখলে মনে হয়, এ খেলাই যেন তাদের জীবনের পরম ও চরম সত্য, জীবনের প্রধান লক্ষ্য ও উপলক্ষ্য, সফলতার চূড়ান্ত মানদণ্ড এবং বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন। ফলে সমর্থিত দলের পরাজয়ে আত্মহননের পথ বেচে নেয়ার মতো অপরিণামদর্শিতায়ও কুণ্ঠিত হয় না অসংখ্য ব্যার্থ ও তরুণ প্রাণ। অথচ টিভির পর্দা দর্শন ও হৈ হুল্লুড় করে মানুষের কষ্টের কারণ হওয়া এবং জীবনের মূল্যবান সময় নষ্ট করা ছাড়া বিশ্বকাপের সঙ্গে এই নির্বোধধের ন্যূনতম কোনো প্রাপ্তি অপ্রাপ্তির সম্পর্ক নেই।

খ. পুঁজিবাদের প্রতারণা: পুঁজিবাদি কর্পোরেটরা এই খেলার মাধ্যমে মানবজাতিকে পরিকল্পিতভাবে উন্মাদনায় ঠেলে দিয়ে শত শত বিলিয়ন ডলারের অর্থ বাজার থেকে হাতিয়ে নেয়। আয়োজক রাষ্ট্রকে হাজার হাজার মিলিয়ন ডলার খরচ করতে হয়। এই অর্থের যোগানের জন্য রাষ্ট্রকে সাধারণ মানুষের উপর দীর্ঘমেয়াদি করের বোঝা চাপিয়ে দিতে হয়। যা শরীয়তের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ জুলুম ও নাজায়েয।

গ. অপরাধের স্বর্গরাজ্য: বিশ্বকাপকে কেন্দ্র করে আয়োজক দেশে পতিতাবৃত্তি, জুয়া ও মাদক ইত্যাদির মতো সমাজ বিধ্বংসী যে স্বর্গরাজ্য ও অপ্রতিরোধ্য সয়লাব তৈরি হয়, তার মরণঘাতী ঢেউ বিশ্বের প্রতিটি রাষ্ট্রে গিয়ে আছড়ে পড়ে। এই অপরাধযজ্ঞের আয়োজন ও আনুষ্ঠানিকতার বিবরণ দেখলে যে কারো বিভ্রম হতে পারে যে, এটা আদতেই ফুটবল বিশ্বকাপ, না ফুটবলের নামে যিনা-বিশ্বকাপ কিংবা মাদক-বিশ্বকাপ?

ঘ. মনস্তাত্ত্বিক বিকারগ্রস্ততা: এই বৈশ্বিক আয়োজন ও ‘প্রয়োজনের’ সবচেয়ে ভয়ঙ্কর দিক হচ্ছে মনস্তাত্ত্বিক বিকারগ্রস্ততা। যারা এসব নির্বুদ্ধিতা ও অপরিনামদর্শিতার পেছনে নিজের জীবন যৌবন সব বিলিয়ে দেয়, পশ্চিমারা তাদের মধ্যে এমন বুদ্ধি-প্রতিবন্ধিত্ব ও মানস্তাত্বিক বিকারগ্রস্ততা তৈরি করতে পেরেছে যে, তাদের এখন ভালো মন্দের তমিয করার সক্ষমতাও হারিয়ে গেছে। এটা ওদের বড় সফলতা। মুসলিম তরুণরাও আজ ফালতু ও অনর্থ বিষয়কে মূল্যবান মনে করছে। গুনাহ ও অপরাধকে ‘মানুষকে আনন্দ দেয়া’, ‘সুস্থ সমাজ বিনির্মাণ’ ইত্যাদির মতো নেক কাজ মনে করছে। ফলে এতসব গুনাহের উৎস হওয়া সত্ত্বেও তাদের মনে এখনো প্রশ্ন হচ্ছে, জায়েয না নাজায়েয? নিতান্তই দুঃখের বিষয়। গুনাহকে গুনাহ মনে করলে তো ঈমান বাঁচানো যায়, গুনাহ থেকে তওবার পথ বের হয়। কিন্তু কেউ যখন গুনাহকে গুনাহ মনে করে না; বরং ভালো ও কল্যাণকর মনে করে, তখন তার ঈমান চলে যায়।

ঙ. দাজ্জালি এজেন্ডার প্রাক প্রস্তুতি: আমরা জানি শেষ যামানায় দাজ্জাল আসবে। দাজ্জালের প্রধান কাজ হবে প্রতারিত করা। সবকিছুর বাস্তবতা উল্টো মেরুতে ঘুরিয়ে দেয়া। নিজে যেখানে আল্লাহর বড় দুশমন, সেখানে মানুষকে প্রতারিত করে নিজেকে আল্লাহ দাবি করবে এবং অসংখ্য মানুষ প্রতারিত হয়ে তা বিশ্বাসও করবে। এই খেলাও দাজ্জালের বাহিনী কর্তৃক দাজ্জালি এজেন্ডারই প্রাক প্রস্তুতি বলা যায়। যেখানে অনর্থ ও গুরুত্বহীনতার প্রবাদ হচ্ছে ‘এটা কোনো খেলা নয়’, সেখানে আজ খেলাকেই করে তোলা হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে দামি ও মূল্যবান বিষয়ে। বাস্তবে যার বৈষয়িক ও বস্তুগত মূল্য নিতান্তই গৌণ ও শূন্য, তাকে বানানো হয়েছে সবচেয়ে দামি ও সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ। যে খেলোয়াড় সময় ও অর্থের অপচয় ছাড়া মানুষকে কিছুই দিতে পারে না, এমন আদর্শ বিবর্জিত, মাদকাসক্ত, ব্যভিচারি অপদার্থকে উপস্থাপন করা হয় ভবিষ্যত প্রজন্মের অনুকরণীয় আদর্শ, আইডল ও বীর হিসেবে।

ঠিক যেমন একই শ্রেণির; বরং আরো বেশি ধোঁকা ও প্রতারণার আরেকটি জগৎ হচ্ছে সিনেমা ও অভিনয় জগৎ। অভিনয় মানে মিথ্যা। অভিনয় মানে অবাস্তব। অভিনয় মানে ভান করা। অভিনয় মানে প্রতারণা। অভিনয় মানে কপটতা। প্রতারণার প্রবাদ হচ্ছে ‘অভিনয় করো?’ তার মানে বাস্তবে অভিনয় একটা ফালতু ও কপট বিষয়। এই বাস্তবতা সবাই জানে। তবুও আজ এই অভিনয়-পেশা পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান ও লাভজনক ব্যাবসা। এমন সব মাদকাসক্ত, অর্থলোভী ও ব্যভিচারি অভিনেতারা তারুণ্যের দৃষ্টিতে অনুকরণীয় আইডল ও আদর্শ। সবাই জানে নায়কের বীরত্বের হাকীকতই হচ্ছে, ‘আমি ধরলে তুমি শুয়ে পড়বে’। তবুও সবাই মনে করে সে অনেক শক্তিশালী বীর অনেক বড় বাহাদুর। ফলে নখ রাখা থেকে চুল কাটা এবং ছেড়া প্যান্ট থেকে কানে দূল পরার মতো যতসব রুচিহীন ও বিকৃত স্বভাবের বিষয়গুলোতেও আজ তরুণ সমাজ ব্যাপকভাবে তাদের অনুসরণ করে আপ্লুত হয়, গর্ববোধ করে, নিজেকে ধন্য ও ভাগ্যবান মনে করে। যে তরুণের সর্বোচ্চ স্বপ্ন এমন ‘ফিল্মি বীর’ হওয়া, সে তরুণ যে সমাজে স্মার্ট ও কর্মঠ হয়েও বাস্তবে ও স্বরূপে একজন বখাটে বেকার, একথা সমাজের কজন ভাবে? কজন বোঝে?

এভাবেই তারা সবকিছুর প্রকৃতি ও বাস্তবতাকে উল্টে দিয়ে মূলত দাজ্জালের অনুসারীদের বাহিনী তৈরি করছে। যারা দাজ্জালের অনুসারীদের প্রেমে এখনি সামান্য খেলা দেখা এবং অন্যের জয় পরাজয়ের ভোগ উপভোগকে কেন্দ্র করে, ঝগড়া ঝাটি, মারামারি, খুনোখুনি ও আত্মহত্যায় লিপ্ত হচ্ছে।

মুসলিম তরুণদের চিন্তা করা উচিত, আজ যারা হাজার কিলো দূর থেকে সামান্য ভার্চুয়াল দর্শনে মেসি-নেইমারদের মতো নরাধমের প্রেমে পড়ে যায়, স্টাইলিশ চুল রাখা ও ছেড়া প্যান্ট পরার মতো কাণ্ডজ্ঞানহীন বিষয়ের মমতা ত্যাগ করে যারা নবীর সুন্নত ও ইসলামী আদর্শ ধারণ করতে পারে না, তারা আদৌ দাজ্জালের সামনে ঈমান নিয়ে টিকতে পারবে কি না?

ঈমানের দাবিদার এই যুবকদের ভাবা উচিত, যখন সে চোখের সামনে দেখবে, দাজ্জাল কারো প্রাণ কেড়ে নিচ্ছে, আবার প্রাণ ফিরিয়ে দিচ্ছে, দাজ্জালের অনুসরণ করলে মুহূর্তেই ক্ষমতাধর ও বিত্তশালী বনা যাচ্ছে, তখন সে কিভাবে দাজ্জালের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবে? কিভাবে ঈমানের উপর অটল অবিচল থাকবে?

আমার প্রিয় মুসলিম তরুণ! তুমি যদি মনে কর, এখন না পারলেও তখন পারবে, আমি বলব এটা শুধুই আত্মপ্রবঞ্চনা ও নফসের প্রতারণা। আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে বেরোবার সময় আজই; কাল নয়। সুতরাং আজই তওবা কর, এখনি ফিরে আস। আল্লাহ আমাদের সকলকে বিশেষ করে ভবিষ্যত প্রজন্ম তরুণ ও যুবসমাজকে পশ্চিমাদের অন্ধ অনুকরণ ও গোলামি থেকে এবং গোলামির মানসিকতা থেকে হেফাযত করুন। আমীন।

فقط، والله تعالى أعلم بالصواب

আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি (উফিয়া আনহু)

০২-০৪-১৪৪৮ হি.

১৪-০৯-২০২৬ ঈ.

Related Articles

Back to top button
অ+
অ-