জিহাদ-কিতাল:ফাতওয়া  নং  ৬৬৯

শরীয়ত শাসিত রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সেক্যুলার রাষ্ট্রের যুদ্ধে আমাদের করণীয়

পিডিএফ ডাউনলোড করুন
ওয়ার্ড ডাউনলোড করুন

প্রশ্ন:

আমরা জানি, ইমারতে ইসলামিয়া আফগানিস্তান শরীয়ত শাসিত একমাত্র দেশ। এর প্রধানকে আমরা খলীফা বা আমীরুল মুমিনীন মনে করি। বর্তমানে তাগুত পাক বাহিনী ইমারতে ইসলামিয়ায় হামলা চালাচ্ছে। তারাও পাল্টা আক্রমণ চালাচ্ছে। এমতাবস্থায় ইমারতে ইসলামিয়ার সাহায্যার্থে এ জিহাদে শরীক হওয়া কি প্রত্যেক মুসলিমের ওপর বাধ্যতামূলক হবে? আর যারা কোনো হক তানজীমের অনুগত আছেন, তারা কী তাদের আমীর বা সংগঠনের অনুমতি ছাড়া এ জিহাদে শরীক হতে পারবে?

-মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ

উত্তর:

بسم الله الرحمن الرحيم

একটি শরীয়ত শাসিত রাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সেক্যুলার রাষ্ট্র যুদ্ধে জড়ালে, এই যুদ্ধে শরীয়ত শাসিত রাষ্ট্রের পক্ষ অবলম্বন করা, তাদের সহযোগিতা করা এবং প্রয়োজনে তাদের পক্ষে যুদ্ধে শরীক হওয়া মুসলিমদের উপর ফরয। এই ফরযের দায় নির্ভর করে তাদের প্রয়োজন এবং ব্যক্তির সামর্থ্যের উপর। বাস্তবে যুদ্ধ জয়ের জন্য তাদের যে সহযোগিতা প্রয়োজন, সেটা পূরণ করার সুযোগ ও সামর্থ্য কার কতটুকু আছে?

এই ফরয প্রথমে বর্তায় আক্রান্তদের উপর, তারপর তাদের নিকবর্তী মুসলিমদের উপর। তারা যদি যথেষ্ট না হয় বা ফরয আদায়ে শিথিলতা প্রদর্শন করে, তখন তাদের পরবর্তী মুসলিমদের উপর। এভাবে পর্যায়ক্রমে প্রয়োজন হলে সমগ্র বিশ্বের সকল মুসলিমের উপর সামর্থ্য অনুযায়ী তাদের সহযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া ফরয হয়ে যায়। এবিষয়ে ফুকাহায়ে কেরামের কারো দ্বিমত নেই।

বলা বাহুল্য, আগের যুগের যুদ্ধ ছিল সাদামাটা। উন্মুক্ত ময়দানে দুই দলের মুখোমুখি যুদ্ধ হত। স্বাভাবিকভাবেই তখন অস্ত্রের পাশাপাশি সৈন্যসংখ্যা বেশি হওয়া এবং দল ভারি হওয়া ছিল জয়-পরাজয়ের অন্যতম নিয়ামক। সেখান একজন ব্যক্তির ময়দানে উপস্থিতির অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এজন্য ফুকাহায়ে কেরাম লিখেছেন, মুসলিমরা আক্রান্ত হলে, আর কিছু না হোক, অন্তত মুসলিমদের দল ভারি করার জন্য হলেও বের হয়ে যাওয়া জরুরি।

পক্ষান্তরে আজকের যুদ্ধের ধরন সম্পূর্ণ ভিন্ন। আজকের যুদ্ধে সৈন্যসংখ্যা আগের মতো গুরুত্বপূর্ণ রয়নি। জয়-পরাজয়ের উপকরণগুলো আরো অনেক বিস্তৃত ও বিক্ষিপ্ত হয়ে পড়েছে। জনমত, মিডিয়ার সমর্থন ও প্রোপাগাণ্ডা এবং রাজনৈতিক সমর্থনের মতো অনেক বিষয় এখন যুদ্ধের জয়-পরাজয়ে বড় ভূমিকা রাখে। অপরদিকে জনসংখ্যা বৃদ্ধির ফলে আক্রান্ত রাষ্ট্রেই এই পরিমাণ সৈনিক বা মুসলিম থাকে, অনেক সময় যুদ্ধে যাদের সকলের প্রয়োজন হয় না কিংবা সকলকে কাজে লাগানোর উপযুক্ত ক্ষেত্র থাকে না। এমন ক্ষেত্রে তাদের সাহায্যের উদ্দেশ্যে বিদেশি একজন মুজাহিদের জন্য সশরীরে সেখানে চলে যাওয়া অনেক ক্ষেত্রেই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে। বরং কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায় এমন যুদ্ধের ভূমিতে বিদেশি মুজাহিদের উপস্থিতি উল্টো তাদের বোঝা হয়ে দাঁড়ায় এবং তাদের ক্ষতিরও কারণ হয়। এটা এক বিচারে বর্তমান যুদ্ধের অসুবিধার দিক।

অপরদিকে সুবিধার দিক হচ্ছে, একজন মুসলিম যুদ্ধের ভূমি থেকে অনেক দূরে অবস্থান করেও, যুদ্ধের অনেক প্রয়োজন পূরণ করতে পারেন। যেন ময়দানে না থেকেও যুদ্ধে অংশ গ্রহণের সুযোগ। অনলাইনে অফলাইনে আলোচনা ও লেখালেখির মাধ্যমে শরীয়াহ রাষ্ট্রের পক্ষে জনসমর্থন তৈরি, রাজনৈতিক সমর্থন আদায়, অর্থ সংগ্রহ করে অর্থ প্রেরণ এবং বিভিন্ন সামরিক গবেষণা ও উদ্ভাবনের মাধ্যমে তাদের শক্তিশালী করতে পারেন।

সুতরাং বর্তমানে ইমারতে ইসলামিয়াকে সাহায্য করার ফরিযা আদায়ের একমাত্র এবং অগ্রগণ্য সুরত এটা নয় যে, যে কেউ সেখানে হিজরত করে চলে যাবেন। বরং সেখানে চলে যাওয়া তাদের সাহায্যের অনেক সুরতের একটি, যা সবসময় উপযুক্ত নাও হতে পারে। তাই এই ফরয আদায়ের জন্য জরুরি হচ্ছে, প্রথমে তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং তাদের প্রয়োজনটা বুঝা। তাদের প্রয়োজন ও চাহিদা মোতাবেক যার যার সামর্থ্য অনুযায়ী সহযোগিতায় এগিয়ে যাওয়া। সরাসরি তাদের সঙ্গে যোগাযোগ সম্ভব না হলে এদেশে তাদের প্রতিনিধি থাকলে তাদের মাধ্যমে যোগাযোগ করা। যোগাযোগ স্থাপিত হওয়ার আগ পর্যন্ত তাদের পক্ষে জনমত তৈরি করা এবং শত্রু রাষ্ট্রের মুখোশ উন্মোচন করার মতো বুদ্ধিবৃত্তিক যে কাজগুলোর সুবিধা শরীয়াহ রাষ্ট্রকে এখান থেকেই পৌঁছানো সম্ভব, যার যার সাধ্য অনুযায়ী সেগুলো করার চেষ্টা করতে পারি।

আরও জানতে দেখুন:

প্রবন্ধ: তুফানুল আকসা || উলামায়ে কেরামের ফতোয়া ও মূল্যায়ন: একটি বিশ্লেষণ

ফাতওয়া নং ২৩৯: কীভাবে অন্য দেশে হিজরত করে জিহাদি কাফেলায় শরীক হতে পারি?

ফাতওয়া নং ৬৩৬: হিজরতের আকাঙ্ক্ষী, করণীয় কী?

কোনো জিহাদি জামাআত যদি হক হয়ে থাকে, তাহলে এবিষয়গুলো তাদের আপনার চেয়ে ভালো বুঝার কথা। বাস্তবে তাদের প্রয়োজন ও আপনার সামর্থ্য সঙ্গত হলে আপনাকে আটকে রাখার কথা নয়। সুতরাং শুধু আবেগের বশবর্তী হয়ে হক জামাতের আনুগত্য থেকে বের হওয়ার সুযোগ নেই। আপনার আগ্রহ ও আবেদন পেশ করুন, তারা সঙ্গত মনে করলে পাঠানোর ব্যবস্থা করবেন, অন্যথায় এখানে থেকে ইমারার কী সহযোগিতা করা যায়, সে পথ করে দেবেন ইনশাআল্লাহ।

فقط، والله تعالى أعلم بالصواب

আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি (উফিয়া আনহু)

২৫-০৩-১৪৪৮ হি.

০৮-০৯-২০২৬ ঈ.

Related Articles

Back to top button
অ+
অ-