হেবা-মীরাস-অসিয়তফাতওয়া  নং  ৬৭৪

মৃত কন্যার মেয়ে কি নানার সম্পত্তিতে উত্তরাধিকার পাবে?

পিডিএফ ডাউনলোড করুন
ওয়ার্ড ডাউনলোড করুন

প্রশ্ন:

আমার দাদার ২২ শতাংশ জমি ছিল। তাঁর এক ছেলে (আমার বাবা) ও এক মেয়ে (আমার ফুফু) ছিলেন। আমার ফুফু দাদার জীবদ্দশায় ইন্তেকাল করেন এবং তাঁর একমাত্র মেয়ে রেখে যান। পরে দাদা ইন্তেকাল করেন। তখন দাদার একমাত্র জীবিত সন্তান ছিলেন আমার বাবা।

এখন প্রশ্ন হলো, আমার ফুফুর মেয়ে কি আমার দাদার (অর্থাৎ তার নানার) সম্পত্তিতে কোনো উত্তরাধিকার পাবে? নাকি সম্পূর্ণ সম্পত্তি আমার বাবা পাবেন? কুরআন, সুন্নাহ ও নির্ভরযোগ্য ফিকহের দলীলসহ জানালে উপকৃত হবো।

-মুহাম্মদ শাহরুখ

উত্তর:

بسم الله الرحمن الرحيم

মীরাস সূত্রে আপনার ফুফুর মেয়ে আপনার দাদার সম্পদের অংশ পাবেন না। কারণ মৃতের সন্তান থাকলে নাতি-নাতনিরা মীরাস পায় না। -কিতাবুল আসল: ৬/৯ (ওযারাতুল আওকাফ); আল-মুখতাসারুল কাফী: ৬/৫৬৭ (আসফার); রদ্দুল মুহতার: ৬/৭৯২ (দারুল ফিকর)

তবে নাতনি যেহেতু দাদার ওয়ারিস না, তাই দাদা চাইলে মৃত্যুর আগে তাকে কিছু সম্পদ দেয়ার অসিয়ত করতে পারতেন।-কিতাবুল আসল: ৫/৪৪৪ (ওযারাতুল আওকাফ); আল-মুখতাসারুল কাফী: ৬/৩৫২ (আসফার)।

বরং ওয়ারিসরা সচ্ছল হলে কিংবা মীরাসের দুই-তৃতীয়াংশ তাদের জন্য যথেষ্ট হলে, মায়্যিতের জন্য এক-তৃতীয়াংশ বা তার চেয়ে কম অসিয়ত করা মুস্তাহাব। -বাদায়েউস সানায়ে: ১০/৫০১ (দারুল হাদীস); তাবয়ীনুল হাকায়েক: ৬/১৮২ (আমীরিয়্যাহ-বূলাক); রদ্দুল মুহতার: ৬/৬৫১, ৬৫২ (দারুল ফিকর)।

বিশেষ করে ওয়ারিস নন এমন কোনো অসচ্ছল কিংবা অসহায় নিকটাত্মীয় থাকলে তার জন্য অসিয়ত করার ফযীলত আরো বেশি। বরং কোনো কোনো ইমামের মতে এমন নিকটাত্মীয়ের জন্য অসিয়ত করা ওয়াজিব। -তাফসীরে তাবারী: ৩/৩৮৪ (মুআসসাসাতুর রিসালা)

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

كُتِبَ عَلَيْكُمْ إِذَا حَضَرَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ إِنْ تَرَكَ خَيْرًا الْوَصِيَّةُ لِلْوَالِدَيْنِ وَالْأَقْرَبِينَ بِالْمَعْرُوفِ حَقًّا عَلَى الْمُتَّقِينَ –سورة البقرة: 180

“যখন তোমাদের কারো মৃত্যুক্ষণ উপস্থিত হবে, সে যদি অর্থ-সম্পদ রেখে যায়, তাহলে তার উপর মা-বাবা ও আত্মীয়-স্বজনের জন্য ন্যায়সঙ্গতভাবে অসিয়ত করা ফরয। এটা মুত্তাকীদের উপর অবশ্য কর্তব্য।” (সূরা বাকারা, ০২:১৮০)

আয়াতের ব্যাখ্যায় ইমাম কুরতুবী রহিমাহুল্লাহ (৬৭১ হি.) বলেন-

قال ابن عباس والحسن: نسخت الوصية للوالدين بالفرض في سورة” النساء” وثبتت للأقربين الذين لا يرثون، وهو مذهب الشافعي وأكثر المالكيين وجماعة من أهل العلم. … وقال ابن عمر وابن عباس وابن زيد: الآية كلها منسوخة، وبقيت الوصية ندبا… قال قوم: الوصية للأقربين أولى من الأجانب، لنص الله تعالى عليهم.اهــــ -تفسير القرطبي (2/ 263-264)، ط. دار الكتب المصرية – القاهرة

“ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা ও হাসান বসরী রহিমাহুল্লাহ বলেন, মা-বাবা (ও নিকটাত্মীয়)-এর জন্য অসিয়তের বিধান সূরা নিসার মীরাসের আয়াত দ্বারা রহিত হয়ে গেছে। তবে ওয়ারিস নন এমন নিকটাত্মীয়দের জন্য উক্ত বিধান বাকি আছে। উক্ত মতটি শাফেয়ী এবং অধিকাংশ মালেকীসহ এক জামাআত উলামায়ে কেরামের মাযহাব।

ইবনে উমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা, ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা ও ইবনে যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, অসিয়ত (ফরয হওয়া)-এর বিধান রহিত হয়ে গেছে। এখন মুস্তাহাব হিসেবে বাকি আছে।

অনেকে বলেছেন, অনাত্মীয়ের জন্য অসিয়ত করার চেয়ে নিকটাত্মীয়ের জন্য অসিয়ত করা উত্তম। কেননা, আল্লাহ তাআলা নিকটাত্মীয়ের জন্য অসিয়ত করার কথা বলেছেন।” –তাফসীরে তাবারী: ২/২৬৩, ২৬৪ (দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যাহ)

আয়াতের ব্যাখ্যায় ইবনে কাসীর রহিমাহুল্লাহ (৭৭৪ হি.) বলেন-

إن وجوب الوصية للوالدين والأقربين الوارثين منسوخ بالإجماع، بل منهي عنه للحديث المتقدم «إن الله قد أعطى كل ذي حق حقه فلا وصية لوارث» فآية الميراث حكم مستقل ووجوب من عند الله لأهل الفروض والعصبات، رفع بها حكم هذه بالكلية، بقي الأقارب الذين لا ميراث لهم يستحب له أن يوصى لهم من الثلث استئناسا بآية الوصية وشمولها، … والآيات والأحاديث بالأمر ببر الأقارب والإحسان إليهم كثيرة جدا.اهـــــ -تفسير ابن كثير (1/ 361)، ط العلمية

“মা-বাবা ও নিকটাত্মীয় ওয়ারিসদের জন্য অসিয়ত করা ফরয হওয়ার বিধান সবার মতে মানসুখ (রহিত)। বরং (বর্তমানে) তা নিষিদ্ধ। হাদীসে এসেছে, ‘নিশ্চয় আল্লাহ প্রত্যেক হকদারকে তার প্রাপ্য হক দিয়েছেন; সুতরাং কোনো ওয়ারিসের জন্য অসিয়ত নেই।’ অতএব মীরাসের আয়াত একটি স্বতন্ত্র বিধান এবং আল্লাহর পক্ষ থেকে যাওয়িল ফুরূয ও আসাবাদের জন্য ওয়াজিব। এর মাধ্যমে অসিয়তের বিধান সম্পূর্ণরূপে রহিত হয়ে গেছে। তবে যেসব নিকটাত্মীয় ওয়ারিস নয়, তাদের জন্য এক-তৃতীয়াংশ সম্পদ থেকে অসিয়ত করা মুস্তাহাব। এর পক্ষে অসিয়তের আয়াতের ব্যাপকতাকে সমর্থন হিসেবে গ্রহণ করা যায়। এছাড়া আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সদ্ব্যবহার এবং তাদের প্রতি অনুগ্রহ করার নির্দেশ সম্বলিত আয়াত ও হাদীস অনেক রয়েছে।” –তাফসীরে ইবনে কাসীর: ১/৩৬১ (ইলমিয়্যাহ)।

আর যদি দাদা অসিয়ত না করে থাকেন এবং ওয়ারিসরা সব প্রাপ্তবয়স্ক হয়, তাহলে তাদের জন্য ওয়ারিস নন এমন নিকটাত্মীয়দেরকে সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু হাদিয়া দেয়া মুস্তাহাব।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-

وَإِذَا حَضَرَ الْقِسْمَةَ أُولُو الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينُ فَارْزُقُوهُمْ مِنْهُ وَقُولُوا لَهُمْ قَوْلًا مَعْرُوفًا -سورة النساء: 8

“আর যখন (মীরাস) বণ্টনের সময় (ওয়ারিস নয় এমন) আত্মীয়, ইয়াতীম ও মিসকীন উপস্থিত হয়, তখন তাদেরকেও তা থেকে কিছু দেও এবং তাদের সাথে উত্তম কথা বলো। (সূরা নিসা, ০৪:০৮)

সাঈদ বিন যোবায়ের রহিমাহুল্লাহ বলেন-

“وَإِذَا حَضَرَ الْقِسْمَةَ أُولُوا الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينُ فَارْزُقُوهُمْ مِنْهُ” قَالَ : إنْ كَانُوا كِبَارًا رُضِخُوا، وَإِنْ كَانُوا صِغَارًا اعْتُذِرَ إلَيْهِمْ، فَذَلِكَ قَوْله “قَوْلاً مَعْرُوفًا”. –رواه ابن أبي شيبة (31544) والطبري في التفسير (7/ 16)، ط. مؤسسة الرسالة

“আর যখন (মীরাস) বণ্টনের সময় (ওয়ারিস নয় এমন) আত্মীয়, ইয়াতীম ও মিসকীন উপস্থিত হয়, তখন তাদেরকেও তা থেকে কিছু দেও’— যদি ওয়ারিসরা প্রাপ্তবয়স্ক হয়, তাহলে নিকটাত্মীয়দেরকে কিছু দিয়ে দেয়া হবে। আর যদি ওয়রিসরা অপ্রাপ্তবয়স্ক হয়, তাহলে নিকটাত্মীয়দের কাছে ক্ষমা চাওয়া হবে। আর এটাই হচ্ছে আয়াতে উল্লেখিত ‘উত্তম কথা’।” –মুসান্নাফে ইবনে আবী শায়বাহ: ৩১৫৪৪; তাফসীরে তাবারী: ৭/১৬ (মুআসসাসাতুর রিসালা)।

আরো দেখুন: আহকামুল কুরআন লিল-জাসসাস: ২/৯১ (ইলমিয়্যাহ); তাফসীরে কুরতুবী: ৫/৪৯ (দারুল কুতুবিল মিসরিয়্যাহ); ফাতহুল কাদীর লিশ-শাওকানী: ১/৪৯৩ (দারু ইবনে কাসীর)

فقط، والله تعالى أعلم بالصواب

আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি (উফিয়া আনহু)

০২-০৪-১৪৪৮ হি.

১৪-০৯-২০২৬ ঈ.

Related Articles

Back to top button
অ+
অ-