প্রশ্ন:
আমি একজন চিকিৎসক। আমার শ্বশুর সোনালী ব্যাংকে চাকরি করতেন এবং বর্তমানে অবসরপ্রাপ্ত। বিবাহের পূর্বে আমার শ্বশুরের ব্যাংক-চাকরি নিয়ে উভয় পরিবারের মধ্যে অনেক আলোচনা হয়েছিল। ব্যাংকের উপার্জন হারাম হওয়ার কারণে এ পরিবারের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করা উচিত হবে কি না, তা নিয়ে আমরা যথেষ্ট চিন্তাভাবনা করি।
পরে জানতে পারি, তিনি ইতোমধ্যে অবসর গ্রহণ করেছেন। উল্লেখ্য, তার অবসরের পরেই আমাদের বিয়ে হয়েছে। এছাড়া তিনি ব্যাংকের চাকরি বিষয়ে অনুতপ্ত বলেও জানতে পারি। তদুপরি তিনি একটি দ্বীনি সংগঠনকে নিয়মিত মাসিক ইয়ানত প্রদান করেন। তার মেয়ে নিকাব পরিধান করেন, শরঈ পর্দা মেনে চলেন এবং সহীহভাবে কুরআন তিলাওয়াত করেন।
এছাড়া শ্বশুরের পরিবারে আমার শাশুড়ি সরকারি চাকরিজীবী, আমার সম্বন্ধীও চাকরি করেন। আমার স্ত্রীও একজন চিকিৎসক এবং বিসিএস ক্যাডার। এসব কথা উল্লেখ করার উদ্দেশ্য হলো, আমার শ্বশুর ছাড়াও পরিবারে একাধিক উপার্জনের উৎস রয়েছে।
এসব বিষয় বিবেচনা করেই আমি বিয়েতে সম্মতি দিই।
কিন্তু বিয়ের পর জানতে পারি, আমার শ্বশুর অবসরভাতা (পেনশন) গ্রহণ করেন। তার পেনশনের পরিমাণ প্রায় ২৫,০০০ টাকা। বিয়ের আগে তিনি যে পেনশন গ্রহণ করেন, এ বিষয়টি আমার মাথায় একেবারেই আসেনি।
বিয়ের পর স্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে জানতে পারি, এ বিষয়ে আমার শ্বশুরের ধারণা হলো—যদি ব্যাংকের চাকরিকে হারাম বলা হয়, তাহলে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে সরকারি সব চাকরি হারাম হবে।
এখানে আরও উল্লেখ্য যে, ওদের পরিবারের আয় মিশ্র প্রকৃতির। মূলত আমার শাশুড়ির উপার্জন থেকেই পরিবারের অধিকাংশ ব্যয় নির্বাহ করা হয়। এ বিবেচনায় আমি মাঝে মাঝে শ্বশুর বাড়িতে গেলে সেখানে খাওয়া-দাওয়া করি। পাশাপাশি যথাসাধ্য বাজার-সদাই বা অন্যান্য খরচেও সহযোগিতা করার চেষ্টা করি। আমি সরাসরি আমার শ্বশুরের সঙ্গেও এ বিষয়ে কথা বলেছি। তবে তার ধারণা হলো, এ যুক্তি মেনে নিলে প্রায় সব সরকারি চাকরিকেই হারাম বলতে হবে।
এ অবস্থায় আমার কয়েকটি প্রশ্ন—
১. আমার শ্বশুরের জন্য সোনালী ব্যাংকের চাকরি থেকে প্রাপ্ত পেনশন গ্রহণ করা কি জায়েয?
২. আমার জন্য শ্বশুর বাড়িতে গিয়ে খাওয়া-দাওয়া করা বা শ্বশুরের দেওয়া কোনো হাদিয়া গ্রহণ করা কি জায়েয হবে?
৩. আমার স্ত্রী উপার্জনক্ষম হওয়ার পরও তার বাবার খরচে প্রায় তিন বছর জীবন যাপন করেছেন। এটি কি শরঈ দৃষ্টিতে বৈধ ছিল?
৪. বর্তমান পরিস্থিতিতে এ থেকে মুক্তির উপায় কী?
উল্লেখ্য, বিয়ের পূর্বে আমি কয়েকজন আলেমের সঙ্গে পরামর্শ করেছিলাম যে, এ ধরনের পরিবারের মেয়েকে বিয়ে করা যাবে কি না। তারা বলেছেন, এ বিয়ে নাজায়েয নয়; তবে এড়িয়ে যাওয়া উত্তম।
-মুহাম্মাদ আল কায়েস
উত্তর-১:
আপনার শ্বশুরের জন্য সুদি ব্যাংকের পেনশনের টাকা ভোগ করা জায়েয নয়। তার দায়িত্ব হারাম থেকে মুক্তি লাভের উদ্দেশ্যে উক্ত টাকাগুলো কোনো গরীবকে কিংবা মুসলিমদের কল্যাণমূলক কাজে দান করে দেয়া।
-রদ্দুল মুহতার: ৬/৩৮৫ (দারুল ফিকর); আল-বাহরুর রায়েক: ৮/২২৯ (দারুল কিতাবিল ইসলামী); আল-মাজমু শরহুল মুহাযযাব: ৯/৩৫১ (দারুল ফিকর); আহকামুল-মালিল-হারাম, ৪০৫ (দারুন নাফায়েস)
উত্তর-২:
আপনার জন্য শ্বশুরের দেওয়া হাদিয়া বা খাবার গ্রহণ জায়েয হওয়ার সুরত হচ্ছে:
ক. যদি তার ব্যাংকের হারাম উপার্জন ছাড়া হালাল উপার্জন থাকে এবং তিনি নির্দিষ্টভাবে হালাল থেকে খাওয়ান বা হাদিয়া দেন।
খ. অথবা হালাল হারাম যদি মিশ্রিত হয় এবং হালালের পরিমাণ বেশি হয়, সেখান থেকে কিছু দিলেও গ্রহণ করতে পারবেন।
পক্ষান্তরে তিনি যদি সুনির্দিষ্টভাবে হারাম উপার্জন থেকে দেন বা তার হারাম-হালাল মিশ্রিত এমন অর্থ থেকে দেন, যেখানে হারামের পরিমাণ বেশি, তাহলে তা গ্রহণ করা জায়েয হবে না।
-আল-মুহিতুল বুরহানী: ৫/৩৬৭ (দারুল কুতুব); মাজমাউল আনহুর: ২/৫২৯ (দারু ইহয়াইত তুরাস); ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৩৪২ (দারুল ফিকর)
উল্লেখ্য, ব্যাংকের চাকরি হারাম হলে সরকারি সব চাকরি হারাম হবে এই ধারণা ঠিক নয়। সরকারি কিছু চাকরি জায়েযও আছে। এবিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন:
সাইটে প্রকাশিত প্রবন্ধ: সরকারি চাকরি করা কি বৈধ?
ফাতওয়া নং ১৩০: সরকারি সকল চাকরিই কি হারাম?
উত্তর-৩:
আপনার স্ত্রীর নিজের খরচের ব্যবস্থা থাকার পরও যদি বাবার হারাম উপার্জন ভোগ করে থাকেন, তাহলে তা উচিত হয়নি।
-রদ্দুল মুহতার: ৩/৬১৪ ও ৫/৯৯ (দারুল ফিকর); আহকামুল মালিল হারাম: ২৮৯-২৯০ (দারুন নাফায়েস)
উত্তর-৪:
এখন মুক্তির উপায় হচ্ছে, তওবা করা এবং যে পরিমাণ হারাম অর্থ ভোগ করেছেন, অনুমান করে সে পরিমাণ অর্থ গরীবকে কিংবা জনকল্যাণমূলক কাজে দান করে দেওয়া।
-আল-মাবসূত: ১১/৭৭ (দারুল মারিফাহ); রদ্দুল মুহতার: ৪/২৮৩ (দারুল ফিকর); আল-ইখতিয়ার: ৩/৬১ (মাতবাআতুল হালবী); হিদায়া: ৪/২৯৮ (দারু ইহয়াইত তুরাস); ফাতহুল কাদীর: ৯/৩৩০ (দারুল ফিকর); ফিকহুল বুয়ূ: ২/১০৬৫ (মাকতাবাতু মায়ারিফুল কুরআন); আহকামুল মালিল হারাম: ২৮৪
6আবু মুহাম্মাদ আব্দুল্লাহ আলমাহদি (উফিয়া আনহু)
২৫-১২-১৪৪৭ হি.
১২-০৬-১৪৪৭ হি.